ফন্ট সাইজ:
থিম:
বনফুল

পর্ব 28

লেখক: নূপুর ইসলাম

#বনফুল
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_২৮

অপূর্ব যেতেই নাবিলা ধীরে ধীরে বারান্দার দিকে এগোলো। তার শরীর এখনও মুদু কাঁপছে। না, শীতে না। এই সামান্য শীত নাবিলাকে কাবু করতে পারে না। সে কাবু হয় অন্য কিছুতে। এই অন্য কিছুর গভীরতা কেউ আঁচ করতে পারে না। কেউ না।

তবে অপূর্ব এখন কোথায় যাচ্ছে, নাবিলা জানে। কোন আসরের কথা বলেছে, সেটাও বুঝতে পারছে। সবাইকে নিয়ে ভাবার এই অসাধারণ গুণ সবার থাকে না। তবে এই মানুষটার আছে। তাই সে ভালো করেই জানে, নাবিলার কষ্টের কাছে এই কষ্ট ধুলোবালির মতো। নোভা যদি সবটা শুনে, নিজেকে সামলে নেওয়ার শক্তি পেয়ে যাবে। বড় বোনের প্রতি নাবিলের যে ক্ষোভ জন্মেছে, তা হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে। আর খালিদ ভাইয়ের প্রতি এদের যে ঘৃণা, সেটাও চিরদিনের জন্য শেষ হয়ে যাবে।

আর অপূর্ব, আপনি কি এখনের মতো তখনও এমন ভালো চাইবেন? অনুমানের উপর পাজল মেলানোর গল্পের চেয়েও বাস্তব গল্প কতটা ভয়ংকর। আপনি জানেন না, সত্যিই জানেন না। এই দুনিয়ায় মেয়ে হওয়াই পাপ, মেয়ে হয়ে পাপ করাও পাপ। পাপের শাস্তির হিসেবেও হয় পাপ। আর এই যে পাপে ভরা একটা শরীর, এই শরীর নিয়ে যেদিকেই যাওয়া হোক, সেই দিকেই পাপ।

নাবিলা আর এগুতে পারে না। বারান্দা পর্যন্ত যাওয়ার শক্তি সে পেলেও না। তাই এই যে সাদা শুভ্র রঙের বাড়িটার সুন্দর সিঁড়িটা, সেখানেই বসে পড়ল। শীতের ছোঁয়ায় সিঁড়িগুলো হিমশীতল, তার ওপর জমে আছে কুয়াশার আস্তর। সেই আস্তরে সিঁড়িগুলো আঁধভেজা। আর এই আঁধভেজা সিঁড়িতে বসতেই নাবিলা কিছুটা কেঁপে উঠল। আর উঠতেই নাবিলা মৃদু হাসল। বড় বিষাদের সেই হাসি।

এমন ঠান্ডা ফ্লোরে এর আগেও একদিন এক রাত বসে ছিল। ছোট্ট একটা রুম, ঐ যে রুমের সামনে মোটা মোটা লোহার শিকল। গায়ে থাকা কাপড় এলোমেলো, চুল এলোমেলো, চোখ, মুখ মৃত মানুষের মতো ফ্যাকাশে।

সেই ছোট্ট রুমে বাহিরের আলো বাতাস ঢোকে না। দিন কখন ফুরুলো, রাত কখন গভীর হলো টেরও পেল না। তার সব ধ্যান ভাঙল সেই মোটা শিকের দরজা খোলার শব্দে।

নাবিলা ঘোর লাগা চোখে তাকিয়ে দেখে। এক পিচাশ এগিয়ে আসছে, কে যেন পাশ থেকে বলল, -- মেয়েটা প্রেগন্যান্ট স্যার, বাড়ির মানুষ দুনিয়ায় কিছু করছে। যদি উনিশ বিশ কিছু হয়ে যায়। বিপদ হয়ে যাবে।

পিচাশ হাসে, কি ভয়ংকর সেই হাসি! নাবিলা শূণ্য চোখে সেই হাসি দেখে। দেখতে দেখতে পিচাশ তার কোমরের বেল্ট খুলতে খুলতে এগিয়ে আসে। এসে একটু ঝুঁকে বলে,-- যা বলি, চুপচাপ তাই করবি। যদি বাচ্চাকে বাঁচাতে চাস। তা না হলে, মিথ্যা রিপোর্ট বানাতে পুলিশের জুরি নেই।

নাবিলা সিঁড়িতে শুয়ে পড়ল। থরথর করে কাঁপছে তার শরীর। সেই কাঁপা শরীর নিয়েই ঐ যে আবছায়া আকাশ, কুয়াশার চাদরে লুকিয়ে আছে। সেই আকাশের দিকেই নিভু নিভু চোখে তাকিয়ে রইল।

তার ধ্বংসের গল্প শুরু হয় ছোট্ট নাবিলাকে দিয়ে। বয়স কত তখন চার, পাঁচ। মায়ের তখন জীবন যায় যায় অবস্থা। জরায়ুর সমস্যা, প্রেগন্যান্সি, তার মধ্যে নানান শারীরিক সমস্যায় জর্জরিত। নিজের জীবনই বাঁচে না, সন্তানকে আগলে নেবে কী করে।

ছোট নাবিলা সেই সমস্যা বোঝে না। সে শুধু মাকে খোঁজে, বাবাকে খোঁজে। খোঁজে সেই তার চিরচেনা বাড়িটা। ঘুমের মাঝে হাতড়ে হাতড়ে নিজের পরিচিত বালিশ, কম্বল, তার প্রিয় কোলবালিশ টাও খুঁজে। খুঁজে বাবা মায়ের মাঝের সেই সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়টা। কিন্তু কিছুই আর তার নাগালে আসে না।

সারাদিন যায় বিমর্ষ হয়ে নানির বুকে, কাঁধে মাথা রেখে। চোখ খুলে না, দুনিয়া দেখে না, কোন কিছু তাকে স্পর্শ করে না।

নানি কোলে করেই পুরো বাড়ি ঘোরে। এটা ওটা দেখিয়ে মন ভোলাতে চেষ্টা করে। রাস্তায় আইসক্রিম এলে, হাওয়াই মিঠাই এলে, সাথে কতশত খেলনা। ছোট্ট নাবিলার কিছুতেই কিছু আসে যায় না। তার মা লাগবে মা, মা এনে দাও।

প্রথম কিছুদিন খুব চিৎকার চেঁচামেচি, কান্না, যে কাছে আসে তাকেই এটা ওটা ছুঁড়ে মারে, হাতের কাছে যা পেত তাই দিয়ে আঘাত করে। তারপর ধীরে ধীরে পুরো শান্ত। একেবারে শান্ত। দিনের মতো দিন যায়, নাবিলা আর মা বায়না করে না। বরং বাবা মা আর ঐ যে ছোট্ট ছোট্ট ভাইবোন। তাদের দেখলেই অশান্ত সে।

তার নানির বাড়ি আরেক উপজেলা শহর। একই জেলায় অন্তভুক্ত হলেও, দূরত্ব কিছুটা আছে। এই আমলে এসেও তাদের যৌথ পরিবার। ছেলে, ছেলের বউ, নাতি নাতনি নিয়ে ভরা সংসার। সমবয়সী থেকে শুরু করে বড় ছোট কত কাজিন। তবে তাদের সাথে নাবিলা তেমনভাবে কখনও মিশেনি। খুব একটা কথাই বলত না। তার সারাদিন যেত শান্তভাবে নানির আঁচল ধরে নানির পেছনে পেছনে ঘুরতে ঘুরতে, আর রাতে উষ্ণ পরম আদরে বুকের মাঝে। যেই বুক বয়সের ভারে ভারি হয়েছে, তবে ক্লান্ত কখনও হয়নি।

দিনের পর দিন যেতে লাগল। নাবিলার সময়ও কাটতে লাগল। তখন থেকেই সে একেবারে শান্ত, চুপচাপ। কারও সাথে চিৎকার চেঁচামেচি তো ভালোই, কখনও উঁচু গলায় কথাই বলে নি। তবে সে ভয়ংকর রকমের জেদি। সব সময় না। কিন্তু মাঝে মাঝে যেটা বলবে, সেটাই। তার একটু নড়চড় হলে চুপচাপ বসে যেত। সেই বসায় না কারো কথা শুনত, আর খাবার তো ভালোই, পানিটুকুও স্পর্শ করত না।

সেই ছোট্ট সময়েও তার হাইয়েস্ট রেকর্ড ছিল তিন দিন। ব্যস, এর পর নাবিলাকে কেউ আর ঘাঁটিয়ে দেখেনি। তার মা-ও না।

নাবিলার দিন কাটতে লাগল তার নিজের সাজানো গোছানো জীবনে। যে গোছানো জীবনে স্কুল, বাড়ি, আর তার সবচেয়ে প্রিয় পরিপাটি রুম আর নানি।

ততদিনে অবশ্য খুব একটা না মিশলেও কাজিনদের সাথে কিছুটা মিশে গেছে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে যাকে একটু বেশি পছন্দ করত, সে বড় মামার ছেলে আদনান ভাই। ছন্নছাড়া, কোনো কিছুতে সিরিয়াস না হওয়া, লেখাপড়ায় লাড্ডু। উঠতে বসতে মুখের বকা থেকে শুরু করে মামির ঝাড়ুর বাড়ি, জুতার বাড়ি, বেলনের বাড়ি। কোন কিছু আর বাদ নেই। পড়ছে তো পড়ছেই।

নাবিলা দেখে এতো মজা পেত। অবশ্য মামিকেও দোষ দিয়ে লাভ নেই। বাড়িতে কম, এই ছেলে বাইরেই থাকত বেশি। কিন্তু লেখাপড়া ঠেলেঠুলে করলেও, একটা জিনিস সে খুব মন লাগিয়ে করে, অভিনয়।

ভার্সিটির থিয়েটারে যুক্ত ছিল সে। বাড়িতে দুই আনার দাম না থাকলেও ভার্সিটিতে তার আবার সেই সুনাম। আর সেই সুনামের কর্ণধার ছিল তাদের সিনিয়র শাহরিয়ার ভাই।

যার নামের অর্থ রাজা, শাসক, অধিপতি। আর সে তার নামের মতোই ছিল। যেমন দেখতে, তেমন তার চালচলন, হাবভাব, নাক উঁচু। সব সময় ব্র্যান্ডের কাপড়, ব্র্যান্ডের জুতা, ব্যাগ, ওয়াচ, এমনকি তার বেশ দামি বাইক।

ব্যক্তিগতভাবে তেমন না চিনলেও সে খুবই পপুলার বয় ভার্সিটিতে। অনেক মেয়েরই ক্রাশ ছিল সে। শুধু সুন্দর বলে না, তার অভিনয়ের জন্য। এত সুন্দর করে চরিত্রে মিশে যেত। টুকটাক তখন বিজ্ঞাপন, মডেলের সাথেও যুক্ত ছিল। সবার ধারণাই ছিল, এই একদিন ঠিক ক্যারিয়ার দাঁড় করিয়ে ফেলবে।

সেই শাহরিয়ারকে নাবিলা প্রথম দেখল কলেজে পড়ার সময়। না, তার নিজের কলেজে না। সে পড়েছে গার্লস কলেজে। সেখানে ছেলেদের কারবার নেই। তবুও কত মেয়েদের বয়ফ্রেন্ড, বন্ধু। কলেজ শেষ হলেই ঘুরতে যাওয়া। তার এমন কিছু ছিল না। তার সব মনোযোগ থাকত একাডেমিক বই, গল্প-উপন্যাসের বই, আর তার প্রিয় আঁকিবুঁকি।

সে দেখল আদনান ভাইয়ের ভার্সিটিতে। কী যেন প্রোগ্রাম, হয়তো প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এমন কিছু। বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাঝে তাদের নাটকও ছিল। তারা সব কাজিন মিলে আদনান ভাইয়ের তরফ থেকে নাটক দেখতে গেল। গিয়েই অসম্ভব সুন্দর এক ছেলেকে দেখল। যার শরীরের প্রতিটা কোণায় কোণায় অহংকার। একে ধমকাচ্ছে, ওকে ধমকাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ধমকাচ্ছে মেয়েদের। কোনো কারণে সে মেয়েদের সহ্যই করতে পারে না। উনিশ-বিশ হলেই চেঁচিয়ে উঠছে। আর হাসি, হাসি কি চিজ এই বান্দায় মনে হয় চেনেও না।

সৌন্দর্য নাবিলাকে টানার কিছু নেই বরং এই ব্যবহারে সে হলো বিরক্ত। আদনান ভাইয়ের মুখে শাহরিয়ার ভাই, শাহরিয়ার ভাই শুনতে শুনতে দেখার যে ইচ্ছে ছিল, সব সেদিনই মরে গেল।

তবে মুগ্ধ হলো তার অভিনয় দেখে। মঞ্চে সে ভিন্ন এক মানুষ। কী সাবলীল অভিনয়। যাদের এতক্ষণ ধমকে মাথা ধরিয়ে ফেলেছে, তাদের সাথেই সাথে সাথে তাল মিলিয়ে কী সুন্দর মিশে যাওয়া। নাবিলা পুরো নাটক
মুগ্ধ চোখেই দেখল। দেখে বাড়ি ফিরে খেয়াল করল, সে আসলে নাটকের আর কিছুই দেখেনি, সে দেখেছে শুধু একজনকে।

নাবিলা জোরে মাথা ঝাঁকিয়ে বের করার চেষ্টা করে। এমন নাক উঁচু খাইষ্টা মানুষকে মনে রাখার কিছু নেই। সুরুত দেখেছে, নাটক দেখেছে, কাহিনি খতম। তবে সে তো জানে না, সেইদিন থেকে কাহিনি শুরুই হয়েছে মাত্র।

নাবিলা মোটামুটি ভালো স্টুডেন্ট। এইচএসসি খুব ভালো করেই শেষ হলো। তখন মা খুব চাইছিলেন, সে ভার্সিটি সেখান থেকে শুরু করুক। কাছে আছে, ভালো ভার্সিটি আছে, অনেক সুযোগ সুবিধাও আছে।

তবে নাবিলার তখন মায়ের ওপর দুনিয়ায় রাগ জেদ। সেই রাগ জেদ থেকেই আদনান ভাইয়ের ভার্সিটিতেই ভর্তি পরীক্ষা দিল। তার ভাগ্য হয়তো এটাই চেয়েছিল, তাই খুব সহজেই হয়ে গেল।

ততদিনে আদনান ভাইয়ের শাহরিয়ার ভাই লাস্ট ইয়ার। তবে আছে আগের মতোই। নিজের মতো আসছে যাচ্ছে, মেয়েদের হৃদয় হরণ করছে।

নাবিলা কখনও অতশত খেয়াল করেনি। সে তার মতো, বাকি সবাই তার মতো। তবুও কোনো কারণে যখন ভার্সিটির কোনো কোণা দিয়ে সেই নাক উঁচু মানুষটা হেঁটে যায়, বাকি সব মেয়েদের মতো তাকিয়ে না থাকলেও, এক পলক ঠিক তাকিয়ে যায়।

দিনের মতো দিন যাচ্ছিল। সেই যাওয়ার মাঝেই শোনা গেল এবারের ভার্সিটির প্রোগ্রামে আগেই কুফা লেগে গেছে। একটা ইম্পর্ট্যান্ট রোলের জন্য একটা ছোট, নিষ্পাপ মুখের মেয়ে লাগবে। সেই হিসেবে এক ফ্রেশারকে নেওয়া হয়েছিল। সব হয়ে গেছে, সময়ও তো আর বেশি নেই। একটা এক্সিডেন্টে মেয়েটার পা ভেঙে শেষ। এখন এত অল্প সময়ে কী করবে, কেউ বুঝতে পারছে না। তাই ইমার্জেন্সিতে একটা মেয়ে দরকার।

দরকার শুনতেই দুনিয়ায় মেয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। পড়লে কী হবে? অল্প সময়, অভিনয় না জানলেও কিছুটা তো জানতেই হবে।

কাউকেই তেমন মনে ধরে না। সবার মেজাজ তুঙ্গে। সেই তুঙ্গে সময় নাবিলা আদনান ভাইয়ের খোঁজে গেল। মামি ফোনের ওপর ফোন দিচ্ছে, না পেয়ে তাকে পাঠিয়েছে। কোন দরকার, নাবিলা জানেও না। তবে হুকুম করা হয়েছে, যেখানেই আছে খুঁজে বের কর হারামজাদাকে।

নাবিলা মাঝে মাঝে জেদ আর ঘ্যাড়ত্যাড়ামি ছাড়া খুবই শান্ত, শিষ্ট, চুপচাপ লক্ষ্মীমন্তর মেয়ে। নানি থেকে শুরু করে মামা মামিদের কাছে নিজের সন্তানের চেয়েও ভালো। আর ভালো মেয়ে বুঝি বড়দের হুকুম মানবে না! তাই দৌড়ে গেল। যেতে গিয়েই অঘটন ঘটল। সেই শাহরিয়ারের সাথে এক ধাক্কা খেল।

ধাক্কায় তার দোষ নেই। সে দৌড়ে গেলেও, তাল ঠিক ছিল। তাছাড়া তার দৌড় আর পিপীলিকার দৌড়ের মাঝে খুব একটা তফাৎ নেই। তবে রাগে চোখ মুখ বন্ধ করে হনহনিয়ে আসছিল বরং সে'ই। আর আসতেই এক ধাক্কা লাগল। লাগতে দেরি, বিশাল এক ধমক আসতে দেরি হলো না। শুধু ধমক না, সে ভেবেছে নাবিলাও অডিশন দিতে এসেছে। তাই ধমকের সাথে খুব তাচ্ছিল্য করে বলল,
-- অভিনয়ের অ-ও নেই। নাচতে নাচতে একেকজন চলে এসেছে। নিজেদের ভাবে শাকিরা। মনে করে কোমর দোলালেই বাকি সব হয়ে যাবে। যতসব।

জানা কথা, নাবিলা কিছুই বলতে পারল না। তবে তার গায়ে এত লাগল। ঠিক আছে, ভালো অভিনয় জানে। তবে অন্যদের এমন ছোট করা কেন? সেও নিশ্চয় একদিনে এমন পাকা হয়নি?

নাবিলার তখন কী হলো কে জানে। তার পরের ঠিক অডিশনে হাজির হয়ে গেল। আদনান ভাই আগে তাকে দেখেনি। নাম বলতেই চমকে তাকাল। নাবিলা অবশ্য ডানে বামে কিছুই দেখল না। তার গায়ে তখন ভয়ংকর জেদ, আর সেই জেদ থেকেই অডিশন দিল। তাও সামনে বসা সেই অহংকারী, নাক উঁচু মানুষটার চোখে চোখ রেখে।

এক শটে সবাই মুগ্ধ। এত দ্রুত চোখের পানি কেউ আনতে পারবে বলে মনে হয় না। এই মেয়ে বেষ্ট। দলের সবাই নাবিলার পক্ষে ভোট দিল।

তবে ঐ যে নাক উঁচু। সে কিন্তু দিল না। সে নির্বিকার ভাবে বলল, -- অভিনয়, ভয়েস সব ঠিক আছে। তবে বডি ল্যাঙ্গুয়েজ ঠিক নেই। প্রচুর খাটতে হবে, এত সময় কই?

তবে সবাই বোঝাল। নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো। বাকিটুকু এক্সট্রা খেটে কভার করা যাবে। আমরা সবাই তো আছিই। ব্যস, দলের অন্যদের মতের বিরুদ্ধে গিয়ে সে আর কিছু বলল না। তবে সেই না বলার জ্বালা নাবিলা হাড়ে হাড়ে টের পেল রিহার্সালে। উঠতে বসতে ধমক আর ধমক। আদনান ভাই তো দেখে চুপিচুপি বলেই ফেলল, -- বাদ দে নাবিলা। শাহরিয়ার ভাই হয়তো কোনো কারণে তোকে দেখতে পারছে না। তা না হলে এতটা রুডও সে না।

নাবিলার জেদ চাপে। সে তো করেই দেখাবে। সব ধমক, সব হজম করে সে করে যেতে লাগল। তবে এই খাইষ্টার মনে দোলা দিলো কি না, বোঝা গেল না। কিন্তু আদনান ভাই ছাড়াও বাকি সবাই নাবিলা ভক্ত হয়ে গেল। সবার মুখে এক কথা, নাবিলার মতো ভালো মেয়েই নেই।

নাবিলা কোনো ভালো মেয়ে না, বরং প্রচণ্ড জেদি, একগুঁয়ে, ঘ্যাতেড়া মেয়ে। যে নেমেছে আরেক জেদি মানুষকে হারাতে। তবে হারাতে হারাতে তার আগে সে নিজেই হেরে গেছে। নাকি সেও হেরেছে।

নাবিলা নতুন। তার জীবন গেছে নানির আঁচলে তলে। ছেলে বন্ধু তো ভালোই, খুব একটা মেয়ে বন্ধুও নেই। তাই ছেলে মেয়ে একসাথে রিহার্সালে তার বড়ই সংকোচ, কেমন জড়তায় ঘিরে ধরে। সেই ধরা কেউ খেয়াল না করলেও, সে করে। করে যতটুকু দূরত্ব মাপা যায় ঠিক ততটা মেপেই নিজে যেমন সব করে, তেমনি সবাইকেও করিয়ে ছাড়ে। তবে হাবভাবেই। তবে মুখে, মুখ তো না যেন ককটেল। যখনি খুলে, নাবিলা আঁতকে উঠে।

সবার কমবেশি প্র্যাকটিস থাকলেও নাবিলার নেই। কোনো রকমই নেই। তাই সব রিহার্সালের শেষে এক্সট্রা সময় হিসেবে একেক সময় একেকজন শিখিয়ে কভার করে দিচ্ছিলো। আর সেই দিন পড়ল এই খাইষ্টার দিন।

উঠতে বসতে ধমকায়, আর আজ একা। মাথা টাথা ফাটিয়ে দেবে কি না কে জানে। তবে সেদিন নতুন এক শাহরিয়ারকে দেখল নাবিলা। যে খুব যত্ন করে অভিনয় শেখাতে পারে। সে যেমন খুব যত্ন করে আঁকিবুঁকি করে, এই মানুষটার রক্তেও সেই অভিনয় আছে।
সেই রিহার্সালের মাঝেই প্রথম বার ভালো করে নাবিলার সাথে কথা বলল। বলল,

-- তুমি যে প্রচন্ড জেদি একটা মেয়ে, সেটা জানো?

নাবিলা স্বাভাবিকভাবেই মাথা নেড়ে হ্যাঁ জানাল। মানে সে জানে।

-- তবে আমার চেয়ে বেশি না।

নাবিলা আগের চেয়েও স্বাভাবিকভাবে বলল,
-- আপনার সাথে তো আমি জেদের কম্পিটিশন করছি না।

-- তাহলে এখানে কী করছ?

-- বোঝাতে, সবাই কোমর দেখিয়ে শাকিরা হতে চায় না।

শাহরিয়ার হেসে ফেলল। প্রাণখোলা হাসি। সেদিন প্রথমবার মানুষটার হাসি নাবিলা দেখল। আর দেখেই তার মন বলল, -- নাবিলা, তুই শেষ, শেষ, শেষ।

সেই হাসি দিয়েই শুরু। আর শাহরিয়ার নামক নাক উঁচু মানুষটার ধমক তাকে আর খেতে হয়নি। তাই পরের দিনগুলো নাবিলার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দিনগুলো ছিল। তার ভার্সিটির সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্ত ছিল রিহার্সালের সময়। কীভাবে যে সময় কেটে যেত, বুঝতেই পারত না। সময় কীভাবে যাচ্ছে বুঝতে না পারলেও একটা জিনিস ঠিক বুঝতে পারত। বাকি সব মেয়েদের মতো সেও মরে গেছে। যেই যাওয়া থেকেই রিহার্সালের সময় কোনো কারণে ভুলেও যদি একটু স্পর্শ লেগে যেত, নাবিলা এমন কেঁপে উঠত।

সেই কেঁপে উঠাও এই মানুষটা বুঝত। ভালো ভাবেই বুঝত। তবে কোন কারণে সে নিশ্চুপ। যেন কিছু বুঝেই না। অথচ বাকি সবার কাছ থেকে ঠিক দূরত্ব মেপে দিত। একবার আদনান ভাইকেই হেসে হেসে গায়ে পড়ার জন্য এমন ধমক দিল। আদনান ভাইয়ের তব্দা খাওয়ার যোগাড়।

তখন তার বয়স কম, আবেগ বেশি। সেই আবেগের সময়ে অনুভূতি লুকিয়ে রাখা দুষ্কর। তাও আবার এমন কাছে থেকে।

তাই সেই দিনও যখন শাহরিয়ার ভাইয়ের সাথে তার একা রিহার্সাল পড়ল। সেই রিহার্সালে নাবিলা তার হুঁশ জ্ঞান সব হারাল। হারিয়ে জড়িয়ে ধরল। ধরে ফিসফিস করে বলল, -- ভালোবাসি, ভালোবাসি।

শাহরিয়ার প্রথমে কোন রিয়্যাক্ট করেনি। বরং নাবিলা ঠিক বুঝল, সে থমকে গেছে। তবে কিছুক্ষণ পরই, গায়ে কোনো বিষাক্ত পোকা পড়লে যেমন ছুড়ে মারে, তেমনি ছুড়ে ফেলে হনহনিয়ে চলে গেল।

নাবিলার দোষ ছিল। সত্যিই ছিল। কোন সাহসে সে বামুন হয়ে চাঁদে হাত দিতে গেছে। তাও ভাগ্য ভালো, অপমান করেনি। ভার্সিটির এক মেয়েকে এই খাইষ্টার অপমানেরও রেকর্ড আছে।

এই কাহিনীর পরে এই রিহার্সালের আর মানে হয় না। তার জায়গায় অন্য মেয়ে থাকলে হয়তো আর ফিরেও আসত না। তবে নাবিলা কখনও পিছু হাঁটে না, না তার জন্য কাউকে বিপদে পড়তে দেবে। কেননা সে ভালো করেই জানে। সময় খুব একটা নেই। তার খামখেয়ালির জন্য এতগুলো মানুষ বিপদে পড়বে।

সে পরের দিন ঠিকই হাজির হলো। তবে শাহরিয়ার এখনও নাবিলাকে চেনেনি। তাই নাবিলার রিহার্সাল আগের মতোই চলতে লাগল। বরং আগের চেয়েও আরও জোরালো। শেষ সময়ে সব পার্ফেক্ট। আর এই পারফেক্টে নাবিলা চার চাঁদ লাগিয়ে দিল।

তবে এই লাগায় শাহরিয়ার কোথাও নেই। নেই আগের মতো কেঁপে ওঠা। নাবিলা সবার সাথে ঠিক, শাহরিয়ারের সাথে তার চেয়েও বেশি ঠিক।
আর এই বেশি ঠিকই হয়তো শাহরিয়ারের ভেতরে ভেঙে চুড়ে দিল।

কারণ সে ধরেই নিয়েছিল, নাবিলা আর আসবে না। আসলেও স্বাভাবিক হতে পারবে না। অতিরিক্ত আবেগী মেয়েরা তার আবেগ ধরতে পারে না। সেদিনও যেমন পারেনি, সামনেও পারবে না।

নাবিলা ভাঙেনি, এক মুহূর্তের জন্যও ভাঙেনি। তবে শেষ সময়ে এসে একটু নড়ে গিয়েছিল। ঐ যে, ঐ মুহূর্তে, মঞ্চে শাহরিয়ার হাত ধরে আকুতির একটু সিন ছিল, সেই সিনের সময়ই নাবিলা আবার ভেঙে গেল। গিয়ে সেই পাষাণের হাত ধরতেই চোখে পানি চলে এলো। যেই পানিতে সেদিন শুধু অপূর্ব মুগ্ধ হয়নি, আরেকজনও ভেসে নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল।

নাবিলার সব আগেই ঠিক করা ছিল। এই নাটকের শেষ দিনই এই ভার্সিটির শেষ দিন। হলোও তাই, একদিকে নাটক শেষ হলো, আরেকদিকে নাবিলা বেরিয়ে এলো। সেই যে এলো, ভার্সিটির মুখোমুখি আর হয় নি।

বাসায় ফিরেই সোজা জানাল, এবার সে আর পরীক্ষায় বসবে না। সামনে বছর মায়ের কাছে ফিরে যাবে। অন্য ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার চেষ্টা করবে।

মা খুশিতে কোনো শব্দ করলেন না। নানি কিছুদিন ঘাইঘুই করলেন, তারপর হাল ছেড়ে দিলেন।

নাবিলার জীবন আটকে গেল তার সেই রুম, আর্ট আর বইয়ে। সেই বই নেওয়ার জন্যই নাবিলা একদিন বেরোল। রিকশার জন্য দাঁড়াতেই চমকাল। রাস্তার ওপাশে শাহরিয়ার দাঁড়িয়ে আছে। দু’হাত পকেটে পুরে, সোজা দৃষ্টি একপলকে তার দিকে।

সেই দৃষ্টিতে রাগ, জেদ, আগুন আর... নাবিলার ভেতর কয়েক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল। এই দৃষ্টি কোনো মেয়ের না বোঝার কিছু নেই।

সেই বোঝার মাঝেই শাহরিয়ার ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। এসে ঠিক দাঁড়াল তার সামনে। দাঁড়িয়ে সোজা বলল, -- আমার হবে, নাবিলা?

নাবিলা কিছুক্ষণ নিশ্চুপ তাকিয়ে রইল। কোন উত্তর সে দিল না। বরং তার পাশ দিয়ে যাওয়া খালি একটা রিকশা ডেকে নিজের মতো উঠে বসল।

সেই বসা দেখে সে বলল, -- তুমি ভালো করেই জানো, আমি তোমার চেয়েও জেদি।

নাবিলা এবারো উত্তর দিল না। রিকশাওয়াকে এগোতে বলল। তবে রিকশাওয়ালা হা করে পেছনে দিকে তাকিয়ে আছে। নাবিলা সেই দৃষ্টির সাথে নিজেও তাকালো। তাকাতেই হৃদয় ধক করে উঠল।

শাহরিয়ার রাস্তার মাঝ বরাবর দাঁড়িয়ে আছে। আগের মতোই সোজা, দু’হাত পকেটে পুরে। সাঁই সাঁই করে গাড়ি তার আশপাশ দিয়ে যাচ্ছে।

নাবিলার ভেতর কেঁপে উঠল। তারপর কী হলো কে জানে। রিকশা থেকে নেমে কীভাবে দৌড়ে গেল, একমাত্র সে'ই জানে। কেননা প্রচন্ড জেদি নাবিলা, কেন জানি এই মানুষটার সামনেই বারবার হারে। এই যে, এবারও হেরে গেল।

চলবে.....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 28 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন