#বনফুল
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_২৯
নাবিলা কাঁপতে কাঁপতেই কাত হয়ে কুঁজো হয়ে শুলো। ফ্লোরের হিমশীতল ঠান্ডা শরীর ভেদ করে ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে। হাত পা একেবারে বরফের মতো ঠান্ডা, মাথাটা ধীরে ধীরে অবশ হয়ে আসে। নাবিলা উঠতে ইচ্ছে করে না, ওঠেও না। এই শরীর, এই মন, এই দেহ, প্রতিটা সত্তাকেই শাস্তি দিতে ইচ্ছে করে তার। শাস্তি। কঠিন থেকে কঠিন শাস্তি। হাহ্! কিন্তু দেওয়ার শক্তি কই?
শাহরিয়ার আর নাবিলার প্রেমের শুরু সেখান থেকেই। নাবিলা শান্ত, চুপচাপ, কোমল। আর শাহরিয়ার ঠিক তার উল্টো অশান্ত, মেজাজী, রুক্ষ। সেই রুক্ষ স্বভাব নিয়েই সে সোজাভাবে বলেছিল, "আমার কেউ নেই, নাবিলা। কেউ না। এটা যদি তোমার কোনো সমস্যা হয়, নির্দ্বিধায় চলে যেতে পারো। শাহরিয়ার কখনও তোমাকে বিরক্ত করবে না।
আর যদি সমস্যা না হয়… তাহলে চলে এসো, নাবিলা। কথা দিচ্ছি, আমার পুরো দুনিয়া এক পাশে, আরেক পাশে শুধু তুমি থাকবে।
কেউ নেই, এই কথা শুনে দূরে চলে যাবে? নাবিলা বুঝি এতোটাই স্বার্থপর? সে তো ডান বাম কোন কিছু দেখে, ভেবে ভালোবাসেনি৷ ব্যস, ম্যাজিকের মতো হয়ে গেছে। ঐ যে প্রথম দিন অভিনয় দেখে, দ্বিতীয় বার হাসি দেখে, তারপর.. তারপর আর হিসেবই নেই।
এক পশলা বৃষ্টি যেমন ঝুপ করে এসে শীতল মায়ায় ভিজিয়ে যায়, তেমনি নাবিলা ঝুপ করেই ডুবে গেছে এই মানুষটায়। কোনো কারণ নেই, কিছু জানার নেই, কিছু চাওয়ারও নেই। সে শুধু জানে, এই নাকউঁচু, খাইষ্টা, জেদি মানুষটা আজ থেকে তার। শুধুই তার। যার এই নাবিলা ছাড়া আর কেউ নেই, সত্যিই নেই। কেন নেই, সেটা নাবিলা জানতে চায় না। তবে এইটুকু সে ঠিকই জেনে গিয়েছিল, এই মানুষটার হাত সে ছাড়বে না, কোনোদিনও না।
আবার সে ভার্সিটিতে যাওয়ার শুরু করল। নানি খুশি হলেন, তবে মা নিরাশ হয়ে গেলেন। আর ধরেই নিলেন, তার মেয়ে আর তাদের বাড়ি ফিরে আসছে না। তবে উপরওয়ালার লিখন তো অন্য কিছু। তাই নাবিলা ভালোবাসা নামক সুখের ভেলায় ভেসে আসল দুনিয়াই ভুলে গেল।
নতুন নতুন প্রেম তার। তাও স্বপ্নে দেখা রাজকুমারের মতো মানুষের সাথে। এতো এতো প্রাণিপ্রার্থী তার, তবুও তার মতো সাধারণ দেখতে সাধারণ মেয়ের প্রতি কেন এতো টান, তার বুঝে আসে না। বোঝার অবশ্য চেষ্টা করে, তাও না। বরং খুশিতে সাত রঙের রঙিন হয়ে প্রজাপতির ডানায় উড়তে লাগল সে।
তবে তার তুলনায় শাহরিয়ার স্থির, ধীর। লোক দেখানো কোন কিছুতে সে নেই। নাবিলাকে সে যত্ন করে, আগলে রাখে, তার সবকিছুতেই নাবিলা। নাবিলা ছোট ছোট বিষয়েও সে। তবে অন্য সব প্রেমিকের মতো নাবিলার ঠোঁট খোঁজে না, সুযোগ পেলে আঙুলের ভাঁজে আঙুল রাখে না, লাইব্রেরির বইয়ের তাকের ভিড়ে নিয়ে জড়িয়ে ধরে না।
তবে মুগ্ধ চোখে নাবিলাকে দেখে, তার সব কথা মনোযোগ দিয়ে শোনে। নাবিলা কিছু বলার আগেই, নিশ্চুপ সব কাজ করে ফেলে।
তাই দিন যেতে যেতে নাবিলা বুঝে, এই মানুষটার ভালোবাসার রঙ ভিন্ন। দুনিয়া ভিন্ন। সবকিছু ভিন্ন। আর এই ভিন্নতার ওপর রাগ, জেদ, অহংকারের শক্ত এক খোলস। তবে ভেতরে পদ্মকোমলের মতো নরম। যে নরম মন নাবিলা নামের মেয়েটার আশপাশ দিয়ে ঘুরে। ঘুরে ফিরে একটা কথা হাজারবার বলে, -- ভালোবাসো, নাবিলা?
নাবিলা তখন খিলখিল করে হাসে। হেসে এই যে ফর্সা তীরের ফলার মতো নাক। সেই নাকটা আঙুলের ডগায় আলতো ছুঁয়ে বলে, -- ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভালোবাসি।
দিনের মতো দিন কেটে যায়, বছর শেষ হওয়ার পথে। শাহরিয়ারের লাস্ট ইয়ার। পরীক্ষা শেষ হলেই ভার্সিটির পাট শেষ। তবে নাবিলার তো না। তাই সেই শেষ হওয়ার মাঝেই একদিন শাহরিয়ার এলো। বড় এলোমেলো হয়ে। অথচ এই ছয় সাত মাসে তার শার্ট, টিশার্টের একটা ভার্জও ভাঙতে দেখেনি, মাথার চুলোগুলো উষ্কশুষ্ক দেখেনি, তবে সেই দিন দেখে মনে হলো কিছু নিয়ে খুব উদ্ভিগ্ন। সেই উদ্ভিগ্ন নিয়েই সব সময়ের মতো সোজা বলল, -- বিয়ে করবে, নাবিলা?
নাবিলা ভীষণ অবাক হলো। প্রথমে তো বিশ্বাসই হলো না। তাই অবাক হয়েই বলল, -- কি করব?
প্রথমবার মানুষটা নিজে থেকে তার হাত ধরল। বড় কোমল করে। ধরে আঙুলের ভাঁজে আঙুল রেখে বলল, -- আমার হয়ে যাও, নাবিলা। প্লিজ! নাহলে আমি বাঁচতে পারব না।
শাহরিয়ার অন্যরকম, অন্তত এই কয়েক মাসে নাবিলা ঠিক বুঝে গেছে। বরং নাবিলাই তার পেছনে মৌমাছির মতো ঘুরে। রাগ করে, গাল ফুলায়, মাঝে মাঝে আঙুলের সাথে আঙুল ছোঁয়ায়। তবে সে আস্তে করে হাত সরিয়ে নেয়।
নাবিলা কটমট করে তাকালে, সে নিজের মতো বলবে -- ভালোবাসাকে নোংরা হাতে ছুঁতে হয় না, নাবিলা। যদি কখনো ছুঁই, সেটা ছুঁব পুরো অধিকার নিয়ে, পবিত্র ভাবে। ব্যস, সেইদিন পিছুহেঁটে যেও না।
নাবিলা পিঁছু হাঁটেনি। এক বাক্যে বলেছিল, -- হ্যাঁ, করব।
-- বিশ্বাস আছে, তোমার শাহরিয়ারের উপর?
-- আছে।
-- ব্যস, যা হয়ে যাক। এই বিশ্বাসটুকু রেখো। আজ থেকে ঠিক এক বছর পর আমি নিজে তোমার পরিবারকে সব জানাবো।
সেই দিনই, রুপালি পাড়ের লাল টকটকে এক সুন্দর, সিম্পল শাড়িতে তাদের বিয়ে হলো। মালা বদল হলো হলুদ গাঁদার মালা দিয়ে।
আর সেই বিয়ের দিনই শাহরিয়ার একজন মানুষের সামনে নিয়ে তাকে দাঁড় করালো। করিয়ে বলল, -- নাবিলা, আমার জীবনে আপন বলতে কেউ নেই। তবে একটা মানুষ আছে। সেই মানুষটা তুমি আমার পরিবার বলো, ভাই বলো, আত্মা বলো, যা কিছু বলো, সব হলো আমার এই খালিদ। আমরা একসাথে বড় হয়েছি, সুখ দুঃখ ভাগ করেছি। ভাগ্য দু'জনকে দু'দিকে নিয়েছে তবে আমরা কখনও আলাদা হয়নি। কখনও হবোও না। তাই জেনে রাখো, যদি তোমার শাহরিয়ার কে তুমি ছাড়া কেউ নিস্বার্থভাবে ভালোবাসে, সে হলো এই খালিদ।
নাবিলা সাথে সাথে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করল। আর করতেই মানুষটা এত খিলখিল করে হাসল। সমবয়সী তারা, পায়ে হাত দিয়ে সালাম করতে হবে কেন?
তবে তাদের খুশিতে মানুষটা এত খুশি ছিল। খুশিতে চোখ মুখ জ্বিলজ্বিল করছিল। সেই খুশি নিয়েই বলল, -- ছোট বেলা থেকে আমাকে মারের উপরে রেখেছে । তাই আমার রাখাল সে। দুষ্ট রাখাল। আর এই দুষ্ট রাখাল ছাড়া আমারও পৃথিবীতে কেউ নেই, নাবিলা। আজ থেকে আরেকজন হলো, তুমি। তুমি শুধু আমার রাখালের রাখালিন না, আমার ছোট বোন। আর আমার ছোট বোনের কাছে একটা আবদার রইল। হাত যখন ধরেছ, যদি কখনো ছাড়ার মতো কোনো কারণ হয়, তবুও ছেড়ে যেও না। তুমি তার কাছে কী, তুমি নিজেও জানো না। তুমি মুখ ফেরালে সে হেসে হেসে দুনিয়া থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে।
শাহরিয়ারের অনেক কিছুই নাবিলার মাথায় ঢোকে না। তার পরিবার নেই। পড়াশোনা করছে, নামি দামি এলাকায়, শৌখিনতার মোড়ানো এক ফ্ল্যাটে থাকে। তার চালচলন, কাপড়, লাইফস্টাইল সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। টুকটাক মডেলিং বা বিজ্ঞাপনের কাজ করে এমন বিলাসবহুল জীবন সম্ভব হয় কি না, নাবিলা ছোট্ট মাথায় ঢোকে না। নাকি খালিদ ভাই সাহায্য করে, সেটাও বুঝতে পারে না।
এবারও বুঝল না। তবে এইটুকু কেন জানি সেই দিন ঠিক বুঝল, এই ঝলমল করা বাহ্যিক দৃষ্টির বাইরে মানুষগুলো দুঃখী। খুব দুঃখী। আর এই দুঃখগুলো নাবিলা একদিন ঠিক ভুলিয়ে দেবে।
এই ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টায়, নাবিলা নিজের দুনিয়াই ভুলে গেল। ভুলে গেল নিজের সবকিছু। বাড়ির মানুষ এসবের কিছুই অনুমান করতে পারল না। না পারল এই দুনিয়ার কেউ।
তাদের দিন কাটতে লাগলো রঙিন স্বপের মতো। সেই স্বপ্নে বিভোর হয় শাহরিয়ারের বিশাল শৌখিনতার ফ্ল্যাটে। সেই ফ্ল্যাটে নাবিলা আসে যায় নিজের বাড়ির মতো। দারোয়ান থেকে সবাই তার পরিচিত। তারা তাকে এক ডাকেই চেনে। শাহরিয়ার নামক ভীষণ সুন্দর মানুষটার খুব আপনজন সে। আর এই আপনজনের কাছে তার দুনিয়ায় লুটিয়ে দিয়েছে, দিয়েছে তার জীবন, তার সুখ, এমনকি ফ্ল্যাটের এক্সাটা চাবিও। এই চাবি দিয়ে নিজের মতো আসে। শাহরিয়ার বাড়িতে থাক না থাক, এটা সেটা কিনে, বড় যত্ন করে নিজের গোপন সংসার রাঙিয়ে তুলে।
আর এই সাজানো থেকে শুরু করে, কোনো কিছুতেই শাহরিয়ারের হস্তক্ষেপ নেই, নিষেধ নেই, আগের মতো মেজাজও নেই। বরং সে যা করে, সে শুধু মুগ্ধ চোখে দেখে।
সেই মুগ্ধতার রেশ ধরেই নাবিলার দুই সার্কেল মিস। তার টনক নড়ল তিনের কাছাকাছি গিয়ে। গোপনে বিয়ে করেছে, প্রেগন্যান্ট হয়েছে তাতে নাবিলার একটুও ভয় হলো না। এতদিনে এটা ঠিক বুঝে গেছে, দুনিয়া উল্টে গেলেও এই মানুষটা নাবিলাকে ধোঁকা দেবে না। তবে সে তো জানে না, ধোকা সব সময় মানুষ দেয় না, নিয়তিও দেয়। আর নিয়তির দেওয়া বড় নিষ্ঠুর। সে ছোট দেখে না, বড় দেখে না, ক্ষমতা, উঁচু, নিচু কিছুই দেখে না। শুধু দেখে কর্ম। আর কর্মের ফল ফিরে আসবেই।
নাবিলা খুশিতে উড়ে উড়ে গেল। মাঝ মাঝে তার ছোট্ট পেটটায় মুখ গুঁজে বলত, -- বাড়ির সবাইকে জানানোর সাথে সাথে আমি বাবা হতে চাই, নাবিলা। আমার একটা পরিবার হোক। আমার একটা বাড়ি হোক। যেই বাড়িটা আমাদের সুখের রাজ্য হোক।
তাদের সুখের রাজ্য অবশ্যই হবে। এখন বাকি সব জাহান্নামে যাক। এখন গিয়েই সোজা টেনে বাড়িতে নিয়ে আসবে। এসে সবাইকে বিয়ের কথা জানাবে। নানির দিক থেকে সমস্যা হবে না। সে বিয়ের কথা না জানলেও কিছুটা জানে। তবে মা কী করবে, কে জানে?
নাবিলা কোনোদিনই কলিংবেল বাজায় না। আজও বাজালো না। চাবি দিয়ে সোজা ঢুকে গেল। আর যেতেই থমকে দাঁড়াল। শুধু কি সে? থমকে গেছে আরেকজনও। সেই একজন হলো, তার প্রিয় শাহরিয়ার।
সোফায় মধ্যবয়সী এক নারী বসে। গায়ে দামি শাড়ি, দামি জুতা। মেকআপের আড়ালে বয়সের ভাঁজ লুকানো। মুখে তাচ্ছিল্যের হাসি।
তার পায়ের কাছেই শাহরিয়ার। বড় আকুতি নিয়ে কিছু বলছিল। তবে হয়ত, নাবিলা বড় ভুল সময়ে এসে গেছে।
নাবিলা কি করবে বুঝতে পারল না। তবে সেই না বোঝার মাঝে সেই মহিলা বলল, -- ওহ, এই সেই মাল? রঙটা একটু চাপা, তবে বডি ফিগার সেই। তাই তো বলি, আমার খাঁচার পাখি উড়াল দিতে চায় কেন?
নাবিলা বিস্ময় নিয়ে শাহরিয়ারের দিকে তাকাল। ছেলেরা কাঁদে না। শাহরিয়ারের মতো শক্ত ছেলেরা তো আরও না। তবে সেই দিন শাহরিয়ারের চোখ থেকে টুপ করে পানি গড়িয়ে পড়ল।
নাবিলা ওই গড়িয়ে পড়া পানির দিকে ফিরে তাকাল না। সে যেভাবে এসেছিল, সেভাবেই বেরিয়ে এলো। কী করে, কিভাবে রাস্তা পর্যন্ত এলো নাবিলা বুঝতে পারল না। তবে মেইন রাস্তায় এসেই নিজের আর তাল সামলাতে পারল না। সেখানেই লুটিয়ে পড়ল।
এই যে আজ যেমন ঠান্ডা শীতল ফ্লোরে পড়ে আছে, ঠিক তেমনি সেই দিনও পড়ে রইল। দুনিয়ার মানুষেরা কৌতুহল নিয়ে ঘিরে ধরল, তবে কেউ এসে আগলে নিল না।
তবে সেই দিন কেউ এসে আগলে না নিলেও আজ ঠিক নিলো। নাবিলা তা জানতেও পারল না। কত যত্নে তাকে কোলে তুলে নেওয়া হলো, কত যত্নে হিম ধরা শরীরটা সযত্নে কম্বলে মুড়িয়ে দেওয়া হলো। জানলোও না কতটা বিষাদ নিয়ে তাকে রেখে আস্তে করে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
আর এই সবকিছু নাবিলা না জানলেও, খাটের আরেক পাশে মূর্তির মতো বসা নোভা চুপচাপ দেখল। দেখলো, অসম্ভব সুন্দর মুখটা কি রকম, তার আপার জন্য দুশ্চিন্তায় নীল বর্ণের হয়ে আছে।
........
মোবাইলটা বাজতেই সোহাগ চোখ মুখ কুঁচকাল। ঘুমিয়েছে এসে বলতে গেলে মাঝরাতে। দুপুর থেকে তারা আছে প্রাক্তন কাউন্সিল জুয়েল চাচার বাড়িতে। শুধু সে না, তার সাথী ইমন, রুমেল, সবাই। থাকার অবশ্য কারণ আছে।
খালিদ চুপচাপ বসে থাকবে না, তারা ভালো করেই জানে। সামান্য নোভার কানে কথা লাগাতে যদি রাস্তায় কেলানি খাওয়াতে পারে, আর এখানে করেছে বিরাট এক অকাজ।
তাই করেই সোজা জুয়েল চাচার কাছে এসেছে। সব বলেছে। ভেবেছিল রাগ করবে, আপাতত এলাকায় ঝামেলা পাকাতে নিষেধ করেছিল। তবে তাদের ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে খুশি হয়েছে। খুবই খুশি। পিঠ চাপড়ে বলেছে, সাবাস।
এক ঢিলে অনেক পাখি মারা গেছে। নাবিল পুরো শাহেস্তা। রোকেয়া বুড়ি তার গালে থাপ্পড় মেরেছে, কেস করেছে। আর খালিদ সেই সুযোগ নিয়ে ইচ্ছে মতো ছেঁচা দেওয়ার জন্য পুলিশকে মদন দিয়েছে। আর আগের পরের ঝামেলা তো আছেই। তার মধ্যে এখন লেগে গেছে সানাউল্লাহর ইমেজ নিয়েও টানাটানি। তার ভাতিজা এমন কুকর্ম করবে। এলাকার মানুষ এমনিই বুঝি চুপচাপ বসে থাকবে?
আর এই কারণেই তাদের চাচা বেজায় খুশি হয়েছে। আর তাদের চিন্তা করতে একদম নিষেধ করেছে। বাকি জিনিস সব সে সামলে নেবে। নিয়েছেও। রাতে সানাউল্লাহ ফোন এলো চাচার কাছে। তাদের সবাইকে নিয়ে একটু বসতে চায়।
তবে চাচা সুন্দর করে বললেন, -- সানাউল্লাহ ভাই, খিচুড়ি পাকিয়েছে আপনার ভাতিজা, আকাম করেছে আপনার ভাতিজা। এই যে ভাইরাল ভিডিও, একটু খোঁজ নিয়ে দেখেন। এগুলোর পেছনেও আপনার ভাতিজারই হাত। রোকেয়া আপাকে তো নতুন চিনি না। তার এত বদনামের মেয়ে, তাকেই যেন তেন পোলার হাতে দেয় নাই। আর এখানে ছোট মেয়ে। খালিদের মতো ছেলের কাছে দেবে?
এইসব ট্রিক খুব পুরোনো সানাউল্লাহ ভাই। ভিডিও ভাইরাল। তারপর গোপনে বিয়ে টিয়ে দিয়ে বলা এরা, স্বামী স্ত্রী। দুশমনি করে কেউ ভিডিও ছেড়ে দিয়েছে।
তাই বসার হলে ভাতিজা আর রোকেয়া আপার সঙ্গে বসেন। আমার, আমার ছেলে পেলেদের নিয়ে তো লাভ নাই। তারা আগেও নাই, পিছনেও নাই। তাই মাফ করেন। এমনিতেই কিছুদিন আগে মারামারি করল দু’পক্ষ। কেস খেল শুধু আমার পুলাপান। দুনিয়ার ভোগান্তি ভুগল। বাপ মা নিয়ে হাতে পায়ে পর্যন্ত ধরতে হলো। তাই আর কোনো ঝামেলা চাই না। আপনাদের ঝামেলা আপনারা মেটান। আমাগো আমাদের মতো থাকতে দেন। এর মধ্যে দয়া করে টানাটানি করবেন না।
আর টানাটানির লক্ষণ দেখা যায়নি। তবে সমস্যা হলো। কয়েক ঘণ্টায় তাদের বদৌলতে ভিডিও ভাইরাল হলেও, মাঝরাতেই ভিডিও পুরো গায়েব হয়ে গেছে। পুলিশের কাছে গেলে আইডি ফেক হোক আর যাই হোক, কোন ডিভাইস, কোন এলাকা এসব বের করতে সময় লাগে না। তাই সব করেছে অন্য জায়গায় গিয়ে। যেই মোবাইল দিয়ে করেছে, সেটা আপতত ড্রেনে।
ডান বাম তো ভালোই, কোনো প্রমাণই রাখেনি। তাই যেই আইডিগুলো থেকে ভিডিও ছাড়া হয়েছে, তা যে কারো হাতে চলে গেছে, বুঝতে বাকি রইল না। অবশ্য না বোঝার কিছু নেই। ফেক আইডি, তেমন সিকিউরিটি টিকিউরিটি জোরালো নেই। হ্যাক করতে সময় লাগবে দু’মিনিট।
তবে ডিলিট করুক আর যাই করুক, যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে। এত সহজে আর এই কালি মিটছে না।
আর খালিদের বাড়ির ফুটেজ সে নিজের হাতে ডিলিট করেছে। দোকানদার অবশ্য এর কিছুই জানে না। তাদের এক ছোট ভাইদের দোকান। আড্ডা দেওয়ার ফাঁকে হাত সাফাই করেছে। তো তাদের ধরার মতো কোনো প্রমাণ খালিদের নেই। বরং কিছু করতে গেলেই সে আরও ফাঁসবে।
তাই কিছুদিন জুয়েল চাচা তার বাড়িতেই থাকতে বলেছে। সানাউল্লাহ কিছু না করলেও খালিদ বহুত ধুরন্ধর। একটাকে হাতে পেলেই সব চাল ঘুরিয়ে দেবে। তবে এলাকার বাইরে যাওয়া যাবে না। গেলে সন্দেহ ঘুরেফিরে তাদের ওপরই আসবে। তাই এলাকায় থাক। আর যাই হোক, সানাউল্লাহ তার বাড়িতে এসে কিছু করার মতো বোকামি করবে না।
তাই গল্প আড্ডা দিতে দিতে পুরো মাঝরাত । রাতেই একেকজন যে যেমন পেরেছে, ঘুমিয়ে গেছে। সেই আরামের ঘুমই কে বেরাম করছে, আল্লাহই জানে।
তাই বড় অনিচ্ছায় ফোন রিসিভ করল। করতেই তার ছোট ভাই কেঁদে বলল, -- ভাইয়া, আপার তো অবস্থা খারাপ। হাসপাতালে নিতে হবে।
সোহাগ বড় বিরক্ত হলো। বাপ তার প্রবাসী। বড় বোনের বিয়ে হয়েছে। বাচ্চা হওয়ার জন্য বাপের বাড়ি এসেছে। বাড়ি থেকে শুরু করে সব কাজ তাকেই করতে হয়। ধুর! বলেই ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে উঠল। রাতে হালকা বাংলা খেয়েছে। মাথা এখনও ঝিমঝিম করছে। সেই ঝিমঝিম নিয়েই জুয়েল চাচার কাজের লোককে বলে বেরিয়ে এলো। তবে পুরো বাড়ি এমন মরার অন্ধকার হয়ে আছে কেন, কে জানে? কারেন্ট নেই?
সে অতশত মাথা ঘামালো না। সে কিছুটা ঢুলে ঢুলে এগিয়ে গেলো। এখনও ভোরের আলো ভালো করে ফুটেনি। তার মধ্যে কী যে শীত পড়েছে। কুয়াশা পুরো অন্ধকার করে রেখেছে। ভালো করে আলো ফোটার আগেই হাসপাতালে সব ব্যবস্থা করে ফিরে আসতে হবে। এই খালিদের বাচ্চার ভরসা নেই।
খালিদের নাম মনে হতেই সোহাগ থমকে দাঁড়াল। নেশা আর ঘুমের ঘোরে ভালো করে ঠিকমতো চিন্তা করতে পারেনি। তবে ফোনের কণ্ঠটা তার ছোট ভাইয়েরই ছিল তো? কান্নার কারণে ঠিা ধরতে পারেনি, তবে এখন মনে হলো কিছু টা অন্যরকম ছিল। আর হতেই তার ভেতর কেঁপে উঠল।
গত রাতে ন’টা দশটার দিকে তার মা ফোন করেছিল। তার বড় আপার মোবাইল থেকে। তার মোবাইল নাকি পাচ্ছে না। ঘরেই ছিল। সন্ধ্যায় নাকি বাবার সাথে কথা বলেছে। বলে ড্রয়ারের ওপরেই রেখেছিল। এখন পুরো ঘর তছনছ করেও পাচ্ছে না।
সোহাগ এত টেনশনে আর অত মাথা ঘামায়নি। আছে হয়তো ঘরেই। ভালো করে খোঁজাখুঁজি করার কথা বলে ফোন কেটেছে।
তবে এখন মনে হলো, ফোন হারায়নি, কোনোভাবে গায়েব করা হয়েছে। করা কোনো বড় কথা না, অন্তত খালিদের কাছে তো না। তারা যদি দোকানের সিসি ফুটেজ হাতসাফাই করতে পারে, খালিদও পারে। মাকে জিজ্ঞেস করলেই পাওয়া যাবে,কেউ না কেউ অবশ্যই বাড়িতে এসেছিল। আর এসেই অতি সুন্দর করে মোবাইল সরিয়ে ফেলেছে।
সোহাগ আর না এগোনোর,আর না পেছনের কোনো সাহস পেলো। সে ভালো করেই জানে, ট্র্যাপে ফেঁসে গেছে সে। আর শুধু সে না, জুয়েল চাচাও ফেঁসেছে। বেশ ভালো করেই ফেঁসেছে।
তাই তাড়াতাড়ি পকেটের মোবাইলটা বের করে এক আছাড় মারতে চাইল। তার আগেই কুয়াশার জাল ভেদ করে কেউ তার হাত মুচড়ে ধরল। যেন তেন ধরা না। সোহাগ এক চিৎকার দিতে গেল। সেই চিৎকারও বেরোল না। তার আগেই কেউ মুখ চেপে ধরেছে। ধরে তার মতোই বলল, -- ডাল ভাতের দাওয়াত তোদের গায়ে লাগে না। মোরগ পোলাও খাওয়াবো, আমি ওতটাও দিলদরিয়া না। তবে প্রমিস, ডিম ঠিক খাওয়াবো। অবশ্য কোন দিক দিয়ে সেটা বড় কথা না।
সেই ধরার মিনিট বিশ পরে, ঐ যে খালিদের কাছে অচেনা নাম্বার থেকে মেসেজ এসেছিল, নাবিলার বিয়ে ভাঙার খবর দিতে। সেই নাম্বারেই খালিদ আজ মেসেজ পাঠালো, " অসংখ্য ধন্যবাদ ভিডিওটা সরানোর জন্য। নাবিলের হোয়াটসঅ্যাপ দেখুন। আর সাহায্য যখন নিজে থেকে এগিয়ে করতে এসেছেন, আরেকটুও না হয় করুন।
অপূর্ব বাকি মেসেজটুকুও পড়ল। তাতে তেমন ভাবান্তর হলো না। সে এগিয়ে গেল নাবিলের কাছে। তার মোবাইল নিয়ে দেখল। দেখে একটু হাসল।
হেসে নোভার গলে যাওয়া পার্টির বুদ্ধির প্রশংসা না করে পারল না। অবশ্য এত এত কাহিনি থেকে নাবিলাকে যদি পুরো আড়াল করতে পারে, এই আর এমন কি?
তাই নাবিলের দিকে তাকিয়ে বলল, -- ছোট চাচাকে ফোন দাও। থানায় যেতে বলো। আর আমি যা বলছি সেভাবে করতে বলো।
চলবে.......