#বনফুল
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_৩০
নাবিলার পুরো দিন গেল পুরো দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে। এই হুঁশ আছে, এই নেই। সকালে গায়ে যেন আগুন লেগে গেছে। আসমানি তো মাথার তেলের সাথে হাজার দোয়া ইউনুস পড়া হয়ে গেছে। চোখ মুখ পুরো ফ্যাকাশে।
তবে নাবিলার জন্য এটা এমন নতুন কিছু না। তার জীবনই যাচ্ছে, আজ এই অসুখ তো কাল অন্য। তাই জ্বর ছেড়ে শরীর ঠান্ডা হতেই ফট করে চোখ খুলে তাকালো। তাকিয়ে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ তাকিয়েই রইল। তার দৃষ্টি সোজা উপরের কাঠের সিলিংয়ের দিকে। সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে থাকলেও আসলে কোথায় আছে, কী করছে, দিন না রাত, সে ধরতে পারছে না। তার শুধু মনে আছে, সে বারান্দায় শুয়ে পড়েছিল। তারপর…
এরপর আর কিছুই নাবিলার মনে নেই। মনে করার চেষ্টা করল এমনও না। মাথা, নাক পুরো ভার হয়ে আছে, ঢোক গিলতে গেলে গলায় ব্যথা জানান দিচ্ছে। ঠান্ডা ফ্লোরে শুয়ে ছিল, এতটুকু ভোগান্তি তো পোহাতেই হবে।
ভোগান্তি নিয়ে তার কখনও মাথা ব্যথা হয় না। আজও হলো না। তাই কম্বলটা গলা পর্যন্ত টেনে আবার চোখ বন্ধ করে ফেলল। আলোগুলো চোখে বিঁধছে।
চোখ বন্ধ করতেই রোকেয়া কপালে হাত রাখলেন। সারা রাত আর সারা দিন জ্বরে ছিল একেবারে বেহুঁশ। তারা তো ভয়ই পেয়ে গিয়েছিল। তবে অপূর্ব বলল, -- ভয় পাওয়ার কিছু নেই। এই ওষুধটা কোনো রকম খাইয়ে দিন। হালকা কুসুম গরম পানি দিয়ে শরীর স্পঞ্জ করে দিন। জ্বর কমে যাবে। আর না কমলে গাড়ি তো আছেই, ডাক্তার কাছে নিতে সমস্যা হবে না।
জ্বর সকালের পর থেকেই কমেছে, তবে নাবিলা ছিল বেহুঁশের মতো। এই একটু নড়ছে, এই আবার ঘুম। আবার কিছুক্ষন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে, আবার ঘুম।
এই মেয়েটার কিছু হলেই তার কলিজা কেঁপে উঠে। অথচ দুঃখের সাগরে হাবুডুবু খেয়েছে, সে জানতেও পারেনি। তাই হুঁশ ফিরতেই আসমানি আর সে ধরে তুলে কোনো রকমে একটু খাইয়ে আবার ওষুধ দিয়েছে। ব্যস, তারপর থেকেই ভালো। তবে এই মেয়ে কিছু বলতে পারবে বলে মনে হয় না।
তাই কপাল থেকে হাত সরিয়ে বললেন, -- ওঠ, আর কত শুয়ে থাকবি?
-- কয়টা বাজে, মা?
-- সন্ধ্যা হয়ে এলো।
-- তোমার শরীরের এখন কী অবস্থা?
-- তোর চেয়ে তো ভালোই।
নাবিলা মৃদু হাসল। হেসে বলল, -- কাজী পাড়ার এখন কী অবস্থা?
-- ভালো।
ভালো, বললেও অবস্থা যে কী সে নিজেও সঠিক বুঝতে পারছে না। তবে ভিডিও আর নেই। ভেবেছিল সকাল সকাল না জানি কিসের মুখ দেখতে হয়। এসব ব্যাপারে গ্রামের মানুষ অন্যরকম হয়। বাড়ি এসে এসে অপমান করে যেতেও এদের গায়ে লাগবে না। তবে সেটা হয়নি। অল্প সময় ভিডিওটা ছিল। তাছাড়া গ্রামের টুকটাক মানুষ ভিডিও দেখলেও, সেটা যে নোভা বুঝে ওঠার আগেই সব ডিলিট হয়ে গেছে। এখানের মানুষ আর চেনে কয়জন?
তাছাড়া নাবিলের কাছে শুনল। এইসব নাকি অপূর্ব করেছে। তার তো পরিচিত মানুষের অভাব নেই। সেই পরিচিতদের মধ্যে ঘাঘু টাইপের বন্ধুও আছে। না থাকার তো কিছু নেই। তার কাজই এইসব। তাদের দিয়েই সব করেছে। এমনকি খালিদ নাকি সকালে আরেকটা ভিডিও পাঠিয়েছে।
সেটাই আবার এখন ঘুরছে পুরো সোশ্যাল মিডিয়ার জগৎ জুড়ে। আর এই ভিডিও হলো খালিদের পুরো বাড়ির ভিডিও। নোভা ভেতরে গেছে, এক দু’মিনিটের মধ্যেই বেরিয়ে এসেছে। খালিদ বাড়ি ফিরেছে তার অনেক পরে। ঘণ্টাখানেক তো হবেই।
তাদের এলাকার মানুষ স্তব্ধ। আর যারা কমেন্টে ছি ছি করেছে, আজ তারাই দ্বিধায় ভুগছে। অনেকে তো বলছেও -- মেয়েটার পরিবারের আইনের কাছে যাওয়া উচিত। এমন হেনস্তার মানে কী? এই সব সস্তা লোকদের জন্যই ভালো মেয়েরা বিপদে পড়ে।
নাজিম সকালেই থানায় গিয়ে মানহানির মামলা করেছে। করে তাকে ফোন করে বলছে, -- সব সামাল দেওয়া হচ্ছে, তুমি টেনশন করো না। ছেলে মেয়েদের দেখে রাখো।
ছেলে মেয়েদের কী দেখে রাখবে। ছেলে মেয়েরাই তাকে দেখে রাখছে। নাবিল ঘুরে ফিরে বলছে, কোন টেনশন নেবে না মা। দেখো সব ঠিক হয়ে যাবে।
সন্তানেরা বড় হলে বুঝি এমনই হয়। তাই কীভাবে সামাল দিচ্ছে, তিনি নিজে কিছুই জানেন না। অথচ আজ পর্যন্ত বাড়ির সব কিছু সামাল দিয়ে এসেছে সে,আর আজ দিচ্ছে অন্য দু’টো মানুষ। অপূর্ব আর খালিদ।
অপূর্ব ঘরের ছেলে। এসেছে কিছুদিনের জন্য। তাই তাকে নিয়ে রোকেয়ার আলাদা ভাবনা নেই। তবে খালিদকে তিনি একদমই দেখতে পারেন না। এমন ছেলেদের না দেখতে পারাটাই স্বাভাবিক। সানাউল্লাহ যেবার নির্বাচনে জয়ী হলেন, তার অনেকটা দিন আগে খালিদ কাজীপাড়ায় পা রাখল। বয়স কত ছিল তখন ঠিক জানেন না। তবে এসে এখানকার কলেজে ভর্তি হলো। টিংটিঙে, শুকনা, ইয়া লম্বা। হাঁটতে গেলে একটু ঝুঁকে হাঁটে। ঐ বয়সেই কী ভয়ংকর হাবভাব। নোভা ছোটবেলায় প্রথম দিন দেখে এক চিৎকার দিয়ে তার গলা ঝাপটে ধরেছিল।
প্রথম থেকেই এই ছেলের সাথে তার বনিবনা ভালো না। এই ছেলে বেয়াদব টাইপের, আর সে তো সেই। ব্যস,, দা-কুমড়ার সম্পর্ক। সব সময়ই ছিল। তবে সেই সম্পর্ক বদলে গেল তাদের দোকানের ঝামেলায়। ঝামেলা লাগিয়েছিল খালিদের জেলেপেলেরাই। তার পেছনে আঙুল নাড়াতে, এই ছেলে খুব ভালোবাসত।
নাবিলা বলতে গেলে বাড়ি থেকে তখন বেরই হয় না। কে কী করল, সেই মাথাব্যথাও নেই। তবে খালিদের নাম শুনে একটু যেন অবাক হলো। অবাক হলেও রোকেয়াকে কিছু বুঝতে দিল না। সে গিয়ে ধরল নাবিলকে। ধরেই বলল, "একটা ছবি দেখাতো।"
নাবিল সাথে সাথেই দেখাল। পার্টি অফিসের পেইজ ভর্তি খালিদের ছবি। আর দেখামাত্রই নাবিলা চমকে উঠল। আর সেই চমকেই অনেক দিন পর বাড়ি থেকে বের হলো। সেই বেরোনোর পর থেকেই খালিদ পুরো বদলে গেল। অন্তত তাদের বাড়ির মানুষদের সাথে।
রোকেয়া বোকা না। সে নাবিলাকে জিজ্ঞেস করল। নাবিলা কখনো কিছু জিজ্ঞেস করলে মিথ্যা বলে না। সেবারও বলল না। আর এরপর খালিদকে তো দেখার প্রশ্নই ওঠে না। সে সোজা ঘোষণা দিল, কেউ যেন খালিদের আশপাশে না থাকে। কিন্তু এই খালিদ, তাদের আগে পিছনে গলে গলে পড়তেই লাগল।
আর এখন দেখো। দিন যাচ্ছে, এই ছেলের সাথে সব কেমন জট পাকিয়ে যাচ্ছে। সে জানে, সব ঠিক হয়ে যাবে। তবে মেয়েদের দোষ থাকলেও দোষ, না থাকলেও দোষ। এখন সবাই তাদের পক্ষেই কথা বলবে। কিন্তু যখন অন্য কোনো সমস্যা তাদের সাথে হবে, ঠিক এই বিষয় নিয়েই তখন আবার আঙুল তুলবে। সবাই সত্য জানে, তবুও তুলবে। মানুষকে হেয় করতে মানুষের যে বড় সুখ।
তাই তিনি ঠিক করলেন, নাবিলার বিয়ের পরপরই নোভারটাও সেরে ফেলবেন। লেখা পড়া যা করার, বিয়ের পর করুক। এমনিতেই এই মেয়ে লক্ষ্মীমন্ত বউ হওয়ার মেয়ে না। এই যে কাল থেকে কী হয়েছে, কে জানে? এই রুমে পাই রাখছে না। তার রুমে গিয়ে নাবিলার মতো মটকা মেরে পড়ে আছে।
সেই পড়ার মাঝেই একবার বললেন, -- দেখ, নাবিলা উঠেছে কি না। সে সোজা, তেজ নিয়ে বলল পাবর না।
অন্য সময় হলে এক চড় বসাতেন গালে। তবে এত কাহিনির মধ্যে ওর মনের অবস্থাও হয়তো ঠিক নেই। তাই আর নতুন করে কিছু বললেন না।
রোকেয়া সন্ধ্যার বাতি জ্বালালেন। কাল থেকেই সবার খাওয়া দাওয়া ঠিক নেই। ভাবলেন সন্ধ্যার হালকা নাস্তা তৈরি করবেন। তাই বেরিয়ে যেতে যেতে বললেন, -- ওঠ, ফ্রেশ হয়ে নে। চা করছি, খেলেই দেখবি মাথা ঝরঝরে।
রোকেয়া বেরিয়ে গেলেন। নাবিলা কম্বলের ভেতরেই চুপচাপ শুয়ে রইল। ওঠার কোন লক্ষণ তার মাঝে দেখা গেল না। তবে এই যে তার বেহুঁশ হওয়া জ্বর। তার জীবনের ধ্বংসের প্রথম সিঁড়িটা হয়তো এই জ্বরের মধ্যে দিয়েই শুরুটা হয়েছিল।
সেই দিন জ্ঞান ফিরেছিল কিছু সময়ের মাঝেই। রাস্তায় কিছু মানুষ মাথায় পানি ঢেলে হুঁশ ফেরালো। আসলেই কি হুঁশ ফিরেছিল? না, শুধু চোখ দুটো খুলেছিল। খুলে চুপচাপ উঠে বসেছিল।
এলোমেলো ভেজা চুল, ধুলো বালিতে জামা মাখামাখি। সেই মাখামাখি জামা নিয়েই রাস্তার ধারে বসে রইল। চুপচাপ, একা। আসতে যেতে মানুষ কৌতূহলী চোখে দেখতে দেখতে কত সময় গেল। হকার, ফেরিওয়ালারা ভাবল, মাথায় গন্ডগোল আছে। তবে তার তেমন কোনো ভাবান্তরই হলো না।
সে বসে আছে একটা ফোনের আশায়। এই বুঝি শাহরিয়ার ফোন করে,সব সময়ের মতো উদ্বিগ্ন গলায় বলবে, -- তুমি যা দেখেছ সব ভুল, নাবিলা। আমার কাছে এসো, আমি সব ঠিক করে দিচ্ছি।
সেই ফোন আসে না। সকাল থেকে সন্ধ্যা হয়। বাড়ি থেকে ফোনের পর ফোন আসে। তবে নাবিলা যেই ফোনের আশায় বসে থাকে, সেই ফোন আর আসে না।
নাবিলা তবুও বসে থাকে। কথা দিয়েছে সে? বিশ্বাস রাখবে। ছাড়ার যদি কারণ আসে, ছেড়ে যাবে না সে। বিশ্বাস রাখবে, অবশ্যই রাখবে। যতক্ষণ না শাহরিয়ার নিজের মুখে কিছু বলে। সেই পর্যন্ত রাখবে।
তবে শাহরিয়ার আসে না, তার ফোনও আসে না। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে, রাত হয়। তবুও তার শাহরিয়ারের ফোন আসে না। তবে নাবিলা জানে না, যার আশায় সে বসে আছে, সে ততক্ষণে দুনিয়ার মায়া ছেড়ে গেছে।
নাবিলা এই খবর পায় না। সে বাড়ি ফেরে আধা পাগলের মতো। ফিরেই উথাল পাথাল জ্বর। দিন দুনিয়ার কোনো হুঁশ জ্ঞান নেই। এই যে এখনের মতো। আর যখন হুঁশ এলো, নানির রক্তশূন্য মুখটা দেখল। দেখল মামা মামিদের শুকনো মুখ। দেখল আদনান ভাইয়ের চোখে পানি।
তাদের ব্যাপারটা আদনান ভাইই কিছুটা জানত। একই ভার্সিটি, না জানার তো কিছু নেই। তবে তারা এতটা এগিয়ে গেছে, সেটা সে জানে না। ঐ যে লোক দেখানো কোনো কিছুতে সে নেই। তাই কেউ খুব একটা ধরতেও পারেনি। সবাই ভাবত, একসাথে থিয়েটারে আছে, বন্ধু মতো হয়ে গেছে।
সেই চোখের পানি নিয়েই আদনান ভাই একটা কাগজ তার হাতে আস্তে করে ধরিয়ে দিল। দিয়ে বেরিয়ে গেল।
নাবিলার বুঝতে অসুবিধে হলো না, কি? এই মানুষটার সব কিছুই তার পরিচিত। এই যে ভাঁজ করা কাগজ, এই কাগজটাও পরিচিত। তাই কাঁপা কাঁপা হাতে ভাঁজগুলো খুলল।
এই মানুষটার সব কিছুই সুন্দর। এই যে হাতের লেখা,এই লেখাগুলোও সুন্দর। তবে সেই সুন্দর লেখা আজ বড় এলোমেলো। কয়েক জায়গায় কালি অস্পষ্ট। নাবিলার যেমন চোখ থেকে টুপটাপ পানি পড়ছে, তারও বুঝি পড়েছিল? নাবিলা সেই টুপটাপ বৃষ্টির অস্পষ্ট চোখেই চিঠিতে চোখ রাখল।
আমার নাবিলা,
এই পৃথিবীতে শুধু আমার বলে কিছু যদি থাকে, সেটা একমাত্র তুমি, নাবিলা। তুমি ছাড়া আমার বলতে আর কেউ নেই। কখন ছিলও না। আমার এই না পাওয়ার পাপী জীবনে, তুমি সবচেয়ে বড় পাওয়া। ঐ যে বামুনের হাতে চাঁদ চলে আসে, সেই রকম পাওয়া। আর এই মূল্যবান পাওয়ার সামনে দাঁড়ানোর সাহস আমার নেই। যদি থাকত, ঐ যে তুমি দৌড়ে বেরিয়ে গেলে, তখন আমিও দৌড়ে তোমার পা ঝাপটে ধরতাম। ধরে বলতাম, আমি তোমাকে ধোকা দেয়নি তো। যা পাপ আমার, সব তোমার সাথের দেখা হওয়ায় আগে। দেখা হওয়ার পরে এই শাহরিয়ার শুধু তোমার, সত্যিই তোমার।
খালিদ আর আমি একই পথের পথিক জানো? তফাৎ, খালিদকে রাস্তায় ফেলে গেছে আর আমাকে রেখে গেছে এতিমখানার দরজার সামনে। সাথে ছোট্ট একটা কাগজ, “এই ছেলেটার নাম শাহরিয়ার, ধর্ম ইসলাম। আল্লাহ নামে রেখে গেলাম। ওকে দেখে রাখবেন। "
খালিদ এতিমখানায় আসে পাঁচ ছয় বছর বয়সে। তার এক দূর সম্পর্কের চাচা রেখে যান। তার পালিত বাবা মারা গেছেন। ভরণপোষণ করার মতো কেউ নেই। তাই নাম, পরিচয়, আর কিছু টাকা, তার সাথে ছোট একটা কাপড়ের পুটলি।
আমি ছোটবেলা থেকেই অন্যরকম। তার মধ্যে আল্লাহ দিয়েছেন ভুবনভোলানো রূপ। যে রূপ দেখলেই যে কেউ মায়ায় পড়ে। আর এই মায়াই আমার জন্য কাল হয়েছিল সেই ছোট্ট বয়সে, ভালো মন্দের জ্ঞান হওয়ার আগেই। এক রাতে এক স্যার ঘুম থেকে টেনে নিজের রুমে নিয়ে গেলেন। কিছু বোঝার আগেই ভয়ংকর এক অনুভূতি। তার সাথে গলার ভেতরে মুড়ানো দলা পাকানো কাপড়। সেই কাপড় ভেদ করে চিৎকার বেরিয়ে আসে না।
তবুও এই ছেলেটা কোথা থেকে যেন এসে হাজির। হাতে এক টুকরো রড। সেই রড দিয়েই মাথার পেছনে এক বাড়ি। না, সেই বাড়িতে সেই পিশাচ মরেনি, তবে অনেকের টনক নড়েছিল।
সেই থেকে খালিদ আর আমি একসাথে। আমি শান্ত, চুপচাপ। সে মারামারি, কাটাকাটি আজ এই বিচার, সেই বিচার।
সে যেমন আমায় আগলে রাখত, আমিও তাকে আগলে রাখা শুরু করলাম। সে আগলে রাখত মানুষের নজর থেকে, আর আমি ধমকে, মেরে সব কিছু থেকে ফিরিয়ে।
তবে এখানেও আমাদের ভাগ্য সহায় ছিল না। খালিদের সেই চাচা আবার এসে হাজির। তখন সবে মাত্র আমরা এসএসসি দিয়েছি। রেজাল্ট বেরোবে বেরোবে করছে। আঠারোর পরে নিজেদের রাস্তা নিজেদেরই দেখতে হয়। দুজনে মিলে কতশত প্ল্যান করতাম। সেই প্ল্যানে পানি ঢালল তার চাচা সানাউল্লাহ এসে।
খালিদ অবশ্য কিছুতেই যাবে না। তবে তাকে জোর করে আমি পাঠালাম। অন্তত একজনের জীবন সুন্দর হোক।
কেননা যত প্ল্যানই করি, এই দুনিয়া বড়ই নিষ্ঠুর। এই এতিমখানা থেকে বেরিয়ে কেউ আর স্বপ্ন পূরণ করতে পারে না। পেটে ভাতে বেঁচে থাকাটাই দায় হয়ে যায়। সেখানে স্বপ্ন বড়ই বিলাসিতা। তাই একজন ভালো থাকুক। আর তার ভালোতেই আমার ধ্বংসটা হয়তো সেখান থেকেই শুরু হয়েছিল।
আমাদের এতিমখানা ছিল এনজিও পরিচালিত। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মানুষ আসত। কেউ বাবা মার মৃত্যুবার্ষিকি উপলক্ষে খাবার দাবার নিয়ে, বিভিন্ন নেতারা আসত লোক দেখানো চ্যারিটি করতে, আবার কেউ কেউ আসত বাচ্চা দত্তক নিতে।
এদের মধ্যে মাঝে মাঝে আসত কাদের মল্লিক। বয়স ষাটের কাছাকাছি। দুনিয়ার নাকি টাকার মালিক। সেও একদিন এলো তার দ্বিতীয় স্ত্রী সোহানা মল্লিককে নিয়ে। তার বয়স ষাটের কাছাকাছি হলেও তার স্ত্রীর বয়স বড়জোর পঁচিশ ছাব্বিশ।
সেই স্ত্রী নিয়েই অনেক দান খয়রাত করল। করে যাওয়ার সময় আমাকে বলল, -- আমার একটা ফার্মহাউস আছে। দেখাশোনার জন্য লোক দরকার। যদি রাজি থাকো যেতে পারো। থাকা খাওয়া বাবদ কিছু টাকা পাবে।
এই চাকরি আমার কাছে সোনার হরিণ ছিল। থাকা খাওয়ার চিন্তা নেই, তার মধ্যে লেখাপড়াটাও অনায়াসে চালানো যাবে। তাছাড়া বছর তিনেক পরে সে যাবেটাই কোথায়? তার চেয়ে ভালো, আগেই ব্যবস্থা হয়ে গেল।
প্রথম বার বাইরের দুনিয়ায় পা রাখলাম। খুশি মনেই রাখলাম। চাওয়া পাওয়া তো বেশি নেই। শুধু পেটে ভাত আর লেখাপড়া।
সেখানে আমার সময় খুব ভালো কাটতে লাগলো। সুন্দর, গোছানো বাড়ি। কাজটাজও তেমন নেই। সে ছাড়াও ছুটা বুয়া আছে। তার কাজ, পুরো বাড়ি পাহারা দেওয়া, আর মাঝে মাঝে রাতে দুনিয়ায় লোক আসে, সারারাত পার্টি চলে, সকাল হলে যে যার মতো চলে যায়। সেই চলে যাওয়ার পরে সব আবার গোছগাছ করে রাখা।
এভাবেই কেটে গেল কয়েকটা মাস। কেটে যেতে যেতে একদিন, সব সময়কার মতো সারারাত পার্টি হলো। সকাল হতে সবাই চলেও গেল। তবে গেল না, সোহানা মল্লিক।
ঐ যে আল্লাহ দিয়েছে মন মাতানো রূপ। এতিমখানায় খাবার, অযত্নের ভারে তা চাপা পড়লেও, এখানে এসে কয়েক মাসে তা ফুলে ফেঁপে উঠেছে। আর উঠতেই নজর লেগে গেছে।
তবে এবার বাঁচানোর জন্য কোনো খালিদ আসেনি। বয়স হয়তো কম, তবুও শক্তির তো কম নেই। তাই গলা চেপে ধরতে সময় লাগেনি।
তবে সোহানা নামক এই পিচাশিনীর কোনো ভাবান্তর হয়নি। বরং আমার কাঁধে হাত রেখে, গালে আঙুল ছুঁইয়ে বড় শান্তভাবে বলেছিল,- এই রুম থেকে বের হলেই তুমি থাকবে জেলে। আমি আমার স্বামীকে সুন্দর করে কী বলব, তুমি ভালো করেই জানো। কেউ আসবে নাও তোমার কথা বিশ্বাস করতে। বরং পুরো দুনিয়া জানবে, বাড়ির মালকিনকে একা পেয়ে কাজের লোকের হামলা। তাও আবার ইজ্জতে। মল্লিক কে চেনো তুমি? তার সম্মানে হাত, জেল তো ভালোই, বাঁচতেও দেবে না সে।
আর আর আর, যদি আমি যা বলি তাই করো, তাহলে হয়তো ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়েও দিতে পারি। এখন ভাবো, ঝট করে ভাবো। কষ্ট হচ্ছে তো আমার।
ঐ বয়সে ভয় ছাড়া কিছুই কাজ করেনি, নাবিলা। বিশ্বাস করো, কিছুই না। কে আছে আমার? কে বিশ্বাস করবে আমার কথা? তাই পাপের জগতে আমি নিজেকে বাঁচানোর জন্যই পা রেখেছিলাম খুব সহজে।
একদিন, দুদিন, কতদিন ঘুমাতে পারিনি আমি। পুরো নারীজাতটার প্রতি ঘৃণা জমে গিয়েছিল, নাবিলা। একটা নারী কতটা নিকৃষ্ট হতে পারে, আমি এই পিচাশিনী দেখে বুঝেছি। আর তোমাকে দেখে বুঝেছি,, একটা মেয়ে কতটা সুন্দর হতে পারে, পবিত্র হতে পারে, কতটা হৃদয় উজাড় করে ভালোবাসতে পারে।
ঐ যে ছেলেদের দেখে সংকোচে গুটিয়ে যেতে, হাতের একটু ছোঁয়া লাগলে কেঁপে উঠতে। তোমার আপন কাজিন, তাও হেসে হেসে দুষ্টামি করলে, তুমি কিছুটা গুটিয়ে যেতে।
আমার তখন কি ইচ্ছে করত জানো, লুকিয়ে রাখি তোমাকে। কেউ না দেখুক, কারো ছোঁয়া না লাগুন। তুমি থাকো মখমলের মোড়ানো চাদরে।
ধীরে ধীরে সময় গড়াল। সেই ভীতু শাহরিয়ার থেকে আমি হয়ে গেলাম, তোমার ভাষায় খাইষ্টা শাহরিয়ার। নিজেকে বিলিয়ে দিচ্ছি, তো সুবিধা নেব না কেন? নিলাম, ভালো করেই নিলাম। জীবনের যতো অপূর্ণ ইচ্ছে, নিজেকে বিলিয়ে পূর্ণ করলাম।
সোহানা মল্লিক আমার জন্য পাগল। আমি যা বলি, সে তাই করত। আর তার এক কথাই ছিল, যা খুশি করো, যা খুশি নাও। তবে তাকে ছাড়া যাবে না।
আমার জীবনে আমি ভালোই ছিলাম। তেমন কোন চাওয়া পাওয়া আর বাকি ছিল না। ইচ্ছে ছিল, ধীরে ধীরে মিডিয়ায় কাজ করার। সে হিসেবেই যাচ্ছিলাম। তবে কপালের লিখা তো, লিখে আরেকজনে। ইচ্ছে যতো যাই করো, লিখা যা আছে তা হবেই।
তোমার আগে কত কত মেয়ে আমার রূপে মরেছে। ভালোবাসি, ভালোবাসি বলে ফেনা তুলেছে। তবে আমার জন্য কেউ চোখের পানি ফেলেনি, নাবিলা। কেউ তার সাজানো গোছানো দুনিয়া ছাড়ার চেষ্টা করেনি। তবে তুমি কেন করলে? কেন, আমার অপমান হজম করে, এতগুলো মানুষকে নিয়ে ভাবলে। কেন, হুট করে হারিয়ে গেলে?
জানো নাবিলা, তুমি প্রথম মেয়ে যাকে আমি ঘৃণা করতে পারিনি। তোমার সবকিছুতে সংকোচ, জড়তা, মুগ্ধতা আমার প্রতি জেদ, সবকিছুই কেন জানি আমাকে টেনেছে। খারাপ মানুষ দেখতে দেখতে হয়তো ভেতর পচে গিয়েছিল। তাই শুভ্রতা দেখেই খুব সহজেই মুগ্ধ করে ফেলেছে।
তাই তোমার জড়িয়ে ধরে বলা ভালোবাসি আমাকে ছুঁতে পারেনি, তবে তোমার চোখের পানি ঠিক ছুঁয়েছিল, ছুঁয়ে ছিল তোমার ওই শুভ্র মনটা।
আর ছুঁতেই আমার পাগল হওয়ার দশা। একদিকে আমার ঘৃণার অতীত, আরেকদিকে তুমি, নাবিলা। আমাকে বেছে নিতে হতো একজনকে। তোমাকে ধোঁকা দেওয়া আমার পক্ষে তো সম্ভব না। আমি চাইলেই, দুটোতেই থাকতে পারতাম। তবে যেই মন তুমি ছুঁয়েছো, সেই মনের খাঁচা আমি আর বিকাতাম কি করে?
খালিদের সাথে যোগাযোগ আমি নিজেই বিচ্ছিন্ন করেছিলাম। আমার কালো জীবনের ছায়া তার ওপর না পড়ুক। সে ভালো থাকুক, তার মতো।
তবে অনেকদিন পর আমি নিজে থেকেই তার সাথে যোগাযোগ করলাম। ঐ যে বললাম, নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। তোমার মতো, এই মানুষটাও আমাকে বাসে। তাই এগিয়ে এলো সাথে সাথেই। আমার কাজ নিয়ে, কোনো প্রশ্ন না, কোনো জিজ্ঞাসা না। শুধু বলল, -- সত্যি ভালোবাসিস?
-- অনেক।
-- কি করতে পারবি তার জন্য?
-- মরতে পারব।
আমার হাতে সাথে সাথে ব্লেড ধরিয়ে বলেছিল, -- প্রমাণ দে।
আমি সাথে সাথে নিজের হাতে এক টান মেরেছিলাম।
তুমি কতবার এই দাগ দেখে জিজ্ঞেস করেছ, কিসের দাগ এটা? কিসের দাগ?
এটা তোমাকে পাওয়ার দলিলের দাগ, নাবিলা। এটা তোমাকে পাওয়ার প্রমাণের দাগ।
ব্যস, সোহানার তো কীর্তির শেষ নেই। খালিদ যেন কী থেকে কী করে, মাদকের মামলায় ফাঁসিয়ে দিল। একবার ফাঁসলে দুনিয়ায় কিছু উঠে, তারও উঠল। মুখ বাঁচানো দায়। তারমধ্যে থানা পুলিশ।
বড়লোকেরা জেলে যায় না। তারা জামিন নিয়ে যায় দেশের বাইরে। সব ঠান্ডা হলে আবার ফিরে আসে।
সোহানাও দেশের বাইরে ছেলে মেয়ে নিয়ে পাড়ি জমাল। আর আমি দৌড়ে গেলাম তোমার কাছে।
সব ঠিক ছিল। তবে সমস্যা হলো, সোহানা ছয় সাত মাস পর আবার যোগাযোগ শুরু করল। কেস, তোলার কাজ করছে সে। অতি শীঘ্রই দেশে আসছে।
আমি পাগল হয়ে গেলাম। তোমাকে হারানোর ভয় জেঁকে ধরল। তাই ছুটে তোমার কাছে গেলাম। গিয়ে তোমাকে চাইলাম। সাথে চাইলাম এক বছরের সময়। আসলে খালিদ আমাদের বাইরে পাঠানোর ব্যবস্থা করছিল। ঐ যে তোমার সব কাগজ টাগজ নিলাম। সেগুলো নিয়েই সব ব্যবস্থা করছিলাম। আর হলেই তোমাকে নিয়ে একেবারে হারিয়ে যেতাম আমি। আর গেলেই আমাদের একটা সংসার হতো, হতো একটা একটা পরিবার। হতো একটা খুশির রাজ্য।
তবে উপরওয়ালার সে ইচ্ছে হয়নি, তাই সোহানার কানে সব খবর ঠিকই পৌঁছে গেল। আর যেতেই সে দেশে ফেরার সব ব্যবস্থা করে আমার পেছনে লেগে গেল। আমি জানি, সে আমাকে কিছুই করত না। তবে তোমাকে শেষ করে ফেলত। বড় কৌশলে। বড় হাতিয়ারের তো দরকার ছিল না। আমার অতীতই আমার ফাঁসির দড়ি, যেটা তোমার গলায় সে খুব যত্ন করে পরাতো।
তাই পায়ে পড়ে ভিক্ষা চেয়েছিলাম। নিজের জন্য না, তোমার জন্য। জানি তো, বাঁচতে পারবে না তুমি।
তবে সে আর ভিক্ষা দেবে কি? উপরে যিনি আছেন, তিনিই দেননি। তাই তো ঠিক সেই সময়েই, তুমি এসে হাজির।
ভাগ্যিস চলে গেছো। কী করে তোমার সামনে দাঁড়াতাম বলো তো? কি করে চোখে চোখ রাখতাম। আমি তোমার সব সহ্য করতে পারব। তবে ঘৃণা, সেটা সম্ভব না। তাই
যে পৃথিবীর বুকে তুমি আমাকে ঘৃণা করবে, সেই পৃথিবীর বুকে কী করে বাঁচব বলতো, নাবিলা?
ভালো থেকো, অনেক অনেক ভালো থেকো। মৃত্যুর আগে এটাই আমার শেষ ইচ্ছা। তবে ঘৃণা করোনা নাবিলা। আমি তোমাকে ধোকা দেইনি। যা করেছি, শুধু তোমার এই শুভ্র ভালোবাসারটুকু পাওয়ার একটু লোভ থেকেই করেছি।
চলবে......