ফন্ট সাইজ:
থিম:
বনফুল

পর্ব 31

লেখক: নূপুর ইসলাম

#বনফুল
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_৩১

দরজায় টুকটুক দুটো মৃদু শব্দ। শব্দ মৃদু হলেও, নোভার ঠিক মাথায় গিয়ে লাগল। মন মেজাজ শরীর সব এমনিতেই খারাপ। তার মধ্যে এই শব্দ আগুনে ঘি পড়লে যেমন ধপ করে জ্বলে উঠে, তেমনি নোভার শরীরও ধপ ধপ জ্বলতে লাগল। এতো ঢং মানুষের আসে কোথা থেকে?

তাই কোনো শব্দ তো ভালোই নড়চড়ও করল না। আগে যেমন ছিল, তেমনি রইল। তাছাড়া মায়ের রুম, দরজা পুরো হাট করে খোলা। তারমধ্যে সে আছে, কম্বল-টম্বল মুড়ে পুরো প্যাকেট হয়ে।

না হয়ে উপায় আছে? তার বাপের জীবনে এমন শীত চোখে দেখেনি। কম্বলের নিচ থেকে বেরোলেই শরীরে শীত কাটার মতো বিঁধছে। অথচ শহরে এখনো পাতলা একটা চাদর টানলেই গরমে ধোঁয়া উড়তে থাকে। আর এখানে দেখো,শীতের কাপড় তো দূরের কথা, কম্বলের নিচ থেকেই বেরোনো দায়।

এরমধ্যে খাওয়া নেই, ঘুম নেই, চোখের আর পানি ও নেই। সবকিছু তার লাগছে অনুভূতিশূন্য। মনে হচ্ছে, সে গায়েব হয়ে যাক। এই জীবন থেকে, এই বারো সমস্যা থেকে, এই দুনিয়া থেকে।

তখনই আবার দরজায় শব্দ হলো। নোভা বিরক্ত হয়ে দাঁতে দাঁত চাপল। আরে বাবা, আসবি আয়। এত ঢং করার কী আছে, সেটাই তো মাথায় ঢুকছে না। তাছাড়া তাদের বাড়ির মানুষদের মধ্যে এই ঢং একজনই করে, নাবিল। তাই বিরক্ত নিয়েই বিশাল এক ঝাড়ি দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে কম্বলের ভেতর থেকে মাথা বের করল।

আর করতেই অপূর্ব ভাইয়ার সুন্দর মুখটা দেখল। যে দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গায়ে গাঢ় নীল রঙের ক্যাজুয়াল কটন বেন্ডের ফুল স্লিভ সোয়েটার। স্লিম ফিট শরীরে কী সুন্দর মানিয়ে আছে। তবে চুলের সাথে এই বান্দার কী সমস্যা, কে জানে? সব সময়ের মতো আজও এলোমেলো। ফর্সা নাক আর ঠোঁটটা গোলাপি হয়ে আছে। অপূর্ব ভাইয়া কি কখনো সিগারেট খেয়েছে? কি জানি! এক দিন না বলল দুনিয়ায় হাবিজাবি খেয়েছে। সেই দুনিয়ায় সিগারেটও আছে নিশ্চয়ই।

-- আসবো, নোভা?

নোভা কথার উত্তর দিল না। আবার কম্বলের ভেতরে মাথা ঢুকিয়ে নিল। কাল থেকে তার সময় যাচ্ছে, তার এই ছোট্ট জীবনের সবচেয়ে খারাপ সময়। প্রথম এই ভিডিও… ছিঃ। কী নোংরা। এই জীবনে কি আর খালিদ ভাইয়ের সামনে দাঁড়াতে পারবে? খালিদ ভাই কি? তার তো ধারণা, সে কখনো আর ঘর থেকেই বেরোতে পারবে না। বেরুলেই মনে হবে, সবাই মুখ টিপে হাসছে। সেই ভিডিওটা সত্য না সবাই জানে। তবুও মনে হবে, তারা মজা নিচ্ছে, আড়চোখে দেখছে। আর এমন হলে তো নোভা মরেই যাবে।

সেই মরা টরাও যখন কিছুটা সামলে এলো, তখন আবার মন ভাঙল তার। জীবনে প্রথমবার প্রেমে পড়ল। সেই প্রেম আবার পড়ে আছে তার বড় বোনের ওপর। এর চেয়ে বড় দুঃখ আর কী হতে পারে? নোভার চিৎকার দিয়ে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু কাঁদতেও পারছে না। তবে আজ প্রথম বার আসমানি খালা এক হাতা তেল তার মাথায় ঢাললেন। ঢেলে হাত বুলিয়ে বললেন, -- যা হয়, ভালোর জন্যই হয়। এতো তেনাইয়ে তো লাভ নাই। তাছাড়া ছ্যাকা ট্যাকা খাওয়া মাইয়াগো স্বামী ভাগ্য ভালো হয়। স্বামীরা মাথায় তুলে নাচে। আসমানীর কথা মিলাই নিও। তুমি হইবা স্বামী সোহাগী। স্বামী তোমার মুখের এক কথায় দুনিয়া লুটাই দিবো।

নোভার এই কথা শুনে মনের দুঃখ আরও বাড়ল। এর মানে খালা আগেই বিষয়টা ধরেছে। তার কেন চোখে পড়েনি? তাই ঝাড়ি মেরেই বলল, -- যাও তো খালা, ভালো লাগছে না।

-- তা তো লাগবোই না। দুনিয়া সাক্ষী, ভালো কথা কারো গায়ে সয় না।

-- সইতে হবে না আমার। যাও।

আসমানি চলে গেল। যেতে যেতে বলল, -- বড় আফা সন্ধ্যার নাস্তা বানাচ্ছে। বারান্দায় বসে সবাই একসাথে খাবে। তাই আসো। না এলে, এসে গালে চটকানা মেরে নেবে। এমনিতেই সারা দিন যে বেয়াদবি করছো। ভাগ্য ভালো, তাই এখনও গাল সহি সালামত আছে।

চটকানা কথায় আজ আর নোভা ভয় আসে নি। তাই নোভা যায়নি, যাওয়ার ইচ্ছেও হয়নি। আপার মতো এক হাতা তেল মাথায় নিয়েই মটকা মেরে পড়ে আছে। আহারে, এইভাবে ছ্যাকাটা খেতে পারল!

-- চলে যাব?
-- যান।
-- কেন, ভাইয়াকে আজ ভালো লাগছে না?

ভাইয়া, শব্দটা শুনেই নোভার চোখে পানি চলে এলো। এত কিছু বোঝে, নোভার হাবভাব বুঝি বুঝেনি? তখনই সেই দিনের গল্পটার কথা মনে পড়ল। আজ আর মোরাল বুঝতে তার সমস্যা হলো না। এও হলো না, তার বোঝার অনেক আগেই এই মানুষটা সব বুঝে গেছে।

অপূর্ব নিজের মতো করে ভেতরে এলো। অল্প পাওয়ারের এক বাতি জ্বলছিল। সেটা নিভিয়ে বাতি জ্বালাল। রুমের আরেক পাশে দুটো সুন্দর বেতের চেয়ার, সামনে একটা ছোট্ট টেবিল। বাবা এগুলো কোথা থেকে জোগাড় করেছে, কে জানে। সবকিছু এত সুন্দর।

অপূর্ব সেই বেতের চেয়ার দুটোর একটাতে গিয়েই বসল। বসতে বসতে বলল, -- আমি যে তোমাকে খুব পছন্দ করি, সেটা কি তুমি জানো নোভা?

নোভা উত্তর দিল না। চোখের পানি কম্বলের নিচেই দু'হাতে মুছল। এই পানিও বেইমান। এতক্ষণ এক ফোঁটাও আসেনি। এখন চাচ্ছে না, ঠিক ঝরঝরিয়ে পড়ছে।

-- মানুষের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়টা আসে প্রথম প্রেমে পড়ার মুহূর্তে। ওই সময়টা অদ্ভুত রকমের ম্যাজিক্যাল। চারপাশের সবকিছু হঠাৎ করেই সুন্দর হয়ে যায়। রংগুলো আরও উজ্জ্বল লাগে, অপছন্দের বিষয়গুলোও মধুর মনে হয়। যে গানটা কোনোদিন ভালো লাগেনি, হঠাৎ সেই সুরটাই বুকের ভেতর ঢুকে পড়ে। ট্রাস্ট মি, দিস ইজ দ্য বেস্ট ফিলিং ইন দ্য ওয়ার্ল্ড।

এই অনুভূতিটা প্রায় সবাই একবার না একবার ফিল করে। কেউ স্বীকার করে, কেউ করে না। কারোটা বোঝা যায়, কারোটা যায় না। বাট ফিল তো করেই। প্রত্যেক মানুষই জীবনে একবার প্রেমে পড়ে। পার্থক্য শুধু এইটুকু, কেউ মুখে বলে, কেউ চুপচাপ গোপনে মনের ভেতরে যতনে আগলে রাখে।

কিন্তু সত্যিটা কী জানো? এই প্রেমে পড়ার নাইন্টি নাইন পার্সেন্ট কেবল প্রেম পর্যন্তই থাকে। পূর্ণতা তো দূরের কথা, আমরা প্রেম বলতে যেটা বুঝি, সেটাও অনেক সময় হয় না। কিছুদিন মন-প্রাণ উজাড় করে ভালোবাসার ভান চলে, মনে হয় এই মানুষটার জন্য মরেও যাওয়া যাবে। তারপর হঠাৎ করেই আবার সব ঠিক হয়ে যায়। একসময় গিয়ে এই প্রেমের কথা মনে পড়লে নিজেরই হাসি পেয়ে যায়।

আর রইল সেই ওয়ান পার্সেন্ট। এই এক পার্সেন্ট মানুষ পূর্ণতা পায়, হ্যাঁ, পায়। বাট সেই পূর্ণতায় আর মুগ্ধতা থাকে না। সম্পর্কটা ধীরে ধীরে গলার কাঁটার মতো হয়ে যায়। কেন জানো? কারণ একদিন না একদিন এই ভ্রম টা কেটে যায়। ঐ যে একদিন বললাম। ভালোলাগা আর ভালোবাসার ডিফারেন্স সবাই বুঝতে পারে না। কারণ প্রথম প্রেমটা বেশিরভাগ সময়ই হয় অবুঝ বয়সে, যখন আমরা ফিলিংস বুঝি, কিন্তু মিনিংটা বুঝি না।

আমি তোমার ফিলিংসকে ছোট করছি না, নোভা। নট অ্যাট অল। পৃথিবীর সেরা অনুভূতিগুলো কখনোই ছোট হয় না। ওগুলো অলওয়েজ দ্য বেস্ট। আর আমি নিজেকে লাকি মনে করি, কারণ এই সুন্দর অনুভূতির দ্য মোস্ট প্রিটি গার্লের কোনো পার্টে আমি একটু হলেও আছি।

বাট ট্রুথ ইজ ট্রুথ। প্রথম প্রেমটা বেশিরভাগ সময়ই শুরু হয় সৌন্দর্য দেখে। তখন আমরা মানুষটাকে নয়, তার একটা ইমেজকে ভালোবাসি। তোমার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে, নোভা। আর এটাই সত্যি।

অপূর্ব নামের ছেলেটা যদি দেখতে কুৎসিত, কাদাকার, বা অন্য কোনো খুঁত নিয়ে হাজির হতো, তখন যতই ফেমাস হোক, ভালো ফটোগ্রাফার হোক, প্রথম দেখায় মুগ্ধ হতে না, না প্রেমে পড়ার মতো কারণ হতো। বরং হয়তো খালিদের মতোই কোন অদ্ভুত নাম ঠিক দিয়ে দিতে।

নোভা ফট করে উঠে বসল। সব কথাই মন দিয়ে শুনেছে সে। কথা একেবারে ফেলনা না। তবে শেষের কাহিনী কি? তাই বিরক্ত মাখা সুরে বলল, -- এখানে এই খালিদ বিটলা আসছে কেন?

-- আসলে সমস্যা?

-- তার নাম আমার সামনে আর কোন দিনও নেবেন না।

-- ওকে। তবে বদনামটা তো তোমার একার হয়নি, তারও হয়েছে। তাছাড়া এই কাজটা সে করেনি।

-- আপনি জানেন?

-- হ্যাঁ, আমি জানি।

-- কচু জানেন আপনি।

-- তুমি খুব বোকা, নোভা।

-- ভালো। তাতে আপনার কী?

অপূর্ব নোভার রাগী মুখটা দেখল। দেখে বলল, -- আচ্ছা যাও, আর না বললাম। এখন আমার একটা কাজ করতে পারবে?

-- কী কাজ?

অপূর্ব একটা সিম এগিয়ে দিল। দিয়ে বলল, -- এই সিমে একটা নাম্বার আছে।

-- তো?

-- নাম্বারটা একটা মেয়ের। এই রুপ নিয়ে কি যে যন্ত্রণায় আছি সেটা আর বলো না। ওই যে জাকির, তার বোন। দাওয়াতে গেলাম। মাথা ঘুরে গেছে। এখন জ্বালিয়ে মারছে।

-- তো আমি কী করব?

-- প্রতিদিন একটা করে গালি দেবে।

-- কী দেবো?

-- গালি, স্লাং।

-- কেন?

-- এই যে বললাম, জ্বালিয়ে মারছে।

-- তো আপনি দিন, আমাকে দিচ্ছেন কেন?

-- কারণ তুমি মেয়ে। ভুলেও কিন্তু কথা বলতে যাবে না। সে জানে এটা আমার নাম্বার। আর আমার নাম্বার থেকে একটা মেয়ে ফোন করে তাকে বকাঝকা করছে, এটা সে মানতে পারবে না। পিছু ছাড়বে। বুঝতেই পারছ। এতদিনের বন্ধুত্ব, এমনিতে পিছু না ছাড়লে নষ্ট হয়ে যাবে। তাই প্লিজ, এই উপকারটা করো।

নোভা কী বলবে, ভেবে পেল না। অপূর্ব ঠেলে সিমটা নোভার হাতে দিল। দিতে দিতে বলল, -- চলো, এখনি একবার করি।

-- মানে?

অপূর্ব মানে বলল না। সে নাবিলার মোবাইল নিয়ে সিমটা সেট করল। করে সেই নাম্বারে কল দিল। দিয়ে নোভার হাতে ধরিয়ে দিল। নোভা কি করবে দিশে পেলো না। ওপাশ থেকে রিসিভ হতে না হতেই অপূর্ব এমন তারা দিল। নোভা কিছু ভাবার সময়ই পেল। তারাহুরো করে বলল, -- চুন্নি, খাটাশ, ভেটকি। আর কিছু বলবে তার আগেই অপূর্ব টেনে ঠাস করে লাইন কেটে দিল। দিয়ে এক থামজাপ দেখালো।

নোভা হতভম্ব হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপরই হেসে ফেলল। অপূর্ব শান্ত চোখে সেই হাসি দেখল। দেখে নিজেও ঠোঁট টিপে একটু হাসল। হেসে বলল, -- আজকের মতো ডান। এখন চলো। চাচি সবার জন্য কত কষ্ট করে নাস্তা তৈরি করেছে। একসাথে শীত প্লাস গরম গরম খবার। এর চেয়ে ভালো আর কিছু হতেই পারে না।

সেই সব তো যেমন তেমন, নোভা অবাক হয়ে বলল, -- আজকের মতো মানে?

সেটা আমি পরে বুঝিয়ে দেবে। বোন হয়েছো, ভাইয়ের এতটুকু উপকার করবে না? এখন চলতো।

নোভা হতভম্বের মতোই এগিয়ে গেলো। এদিকে খালিদ আছে থানায়। থানার বসেই মোবাইলের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল। তার এই নাম্বার নাবিলা ছাড়া আর কেউ জানে না। অচেনা নাম্বার দেখে ভেবেছিল সে। কিন্তু ঝড়ের গতিতে কি থেকে কি হলো, কিছু ই তো মাথায় এলো না। অবশ্য নাবিলা ও জানে না, বারান্দায় বেহুঁশ হওয়ার পর সারা রাত তার মোবাইল কোথায় ছিল, আর কি কি হয়েছে।

-----

নাবিলা বিছানা উঠল একেবারে এশার আজানের পর। উঠে চোখে মুখে পানি দিলো, ফ্রেশ হলো। তারপর গায়ে চাদরটা টেনে বেরিয়ে এলো।

রোকেয়া ধরেই নিয়েছিল এই মেয়ে আসবে না। খাবার আলাদা করে তুলে রেখেছে। ভেবেছে উঠলে দিয়ে আসবে। তবে নিজে থেকেই আসবে, ভাবে নি। তাই আসাতে একটু অবাকই হলো। তাছাড়া চোখ মুখ এখনো ফ্যাকাশে হয়ে আছে। মেয়েটা যে কি সমস্যা হচ্ছে, সেটাই বুঝতে পারছে না।

অপূর্ব নিজের মতোই চায়ের কাপে চমুক দিল। প্রথমে বারান্দায় বাসার কথা থাকলেও, কুয়াশায ঠান্ডায় জমে জাওয়ার জোগাড়। তাই বসেছে খাবার ঘরে। সেই ঘরেই নাবিলা এসেছে। তাতে অবশ্য তার ভ্রুক্ষেপ দেখা গেল না। বরং নডুলসের বাটিটা টেনে হাতে তুলে নিল। তবে নোভার মুখটা মলিন হলো। আপাকে ঝাড়ি মেরেছে, কথা শুনিয়েছে, সারা রাত জ্বরে বেহুঁশ। দেখবে ভালো কথা, বরং রাগে অন্য রুমে গিয়ে বসে ছিল। আর খবরই নেয়নি।

মলিন হলো নাবিলের মুখও। তবে নোভার মতো সে চুপচাপ বসে রইল না। বরং এগিয়ে চেয়ার টেনে দিল। আসলে আপাকে স্যরি বলা দরকার। তখন নোভা বেয়াদবি করল। সে দেখল, তবে মেজাজ এমন খারাপ ছিল। আপা তার দিকে তাকালো। সে চুপচাপ বসে রইল। দুনিয়ায় মানুষ না চিনুক, তারা তো জানে আপা কেমন? তবুও রাগে জেদে ফিরে তাকিয়ে দেখেনি।

তাই বসেই হাত ধরে বলল, -- স্যরি আপা।

নাবিলা মৃদু হাসল। তবে আজ ভাইয়ের চুলগুলো এলোমেলো করে দিল না। টেবিলের উপর চায়ের কাপ। সেই কাপ টেনে নিলো। নিয়ে বলল, -- অপূর্ব, আপনি বলেছেন, গল্প শুনতে হয় আসর জমিয়ে। তাই বেরিয়ে এলাম। এমন আসর হয়ত, আর নাও হতে পারে। তাই না?

অপূর্ব কিছু বলল না৷ তবে রোকেয়া ভ্রু কুঁচকে বলল, -- কিসের গল্প?

-- আমার গল্প মা।

রোকেয়া নিশ্চুপ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর ঝট করে উঠে হনহনিয়ে চলে গেলেন। নোভা, নাবিল দুজনেই অবাক হলো। অবাক হলো না, আসমানি। সে নিজের মতোই বসল। সে গল্প পুরোটা না জানলেও, কিছুটা জানে। তবে নাবিলা আম্মা বলবে। সে বুঝি শুনবে না?

আসাদুজ্জামান বড় একটা শ্বাস ফেললেন। তবে উঠে চলে গেলেন না। মানুষ যখন নিজের ভয়ংকর গল্প বলার মতো শক্তি অর্জন করতে পারে, তখন আর তাকে কেউ ভাঙতে পারে না। কোনো পরিস্থিতিই না। এর পর থেকে নাবিলা আর ভাঙবে না। আর এই এগোনেতে তার বড় চাচা বুঝি পাশে থাকবে না? তাই বড় আদুরে কণ্ঠে বলল, -- তুমি বলো মা, আমরা শুনছি।

নাবিলা কিছুক্ষণ নিশ্চুপ বসল। বসে অপূর্ব দিকে একবার তাকালো। শাহরিয়ারের সাথে কাকতালীয় ভাবে এই মানুষটার চোখের দিকটা খুব মিল। শুধু চোখের দিক না। এই যে এক্ষুনি যদি চোখ তুলে তাকায়, সে কেঁপে উঠবে। ঠিক এভাবেই শাহরিয়ার তার দিকে তাকাতো। তাকিয়েই থাকত। নাবিলা কত রাগ করত। তাই অনেক দিন পর যখন মনিটরে সেই নজরটা দেখল। সে নিজেকে ঠিক রাখতে পারেনি। কখন লুটিয়ে পড়েছে, বুঝতেই পারেনি। অথচ এই মানুষটাকে নাবিলা কখনোও দেখেনি, ঐ যে গ্যারেজে বসা দেখল। তখনোও কিছু মনে হয়নি, তবে চোখ তুলে যখন তাকালো। দুনিয়ায় অন্ধকার হয়ে এলো।

সেই অন্ধকারের মূল কাহিনী নাবিলা শুধু করল তার মৃদু আওয়াজে৷ সেই ছোট্ট নাবিলার গল্প, তার জেদের গল্প, তার শাহরিয়ারের গল্প আর তার এই দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার গল্প।

নাবিলার জীবন সেখানেই থমকে গেল। নানি, মামা, মামিরা সবাই তখন দিশেহারা। কী করবে, কাকে বলবে, কিছুই বুঝে উঠতে পারল না। মামারা মাকে জানাতে বলল। শুধু যদি বিয়ের ব্যাপার হতো, তাহলে চুপচাপ হজম করে যেত। কিন্তু এখন যে অবস্থা, তা হজম করা সম্ভব না। তাছাড়া নাবিলার শরীরের যে কন্ডিশন, এই অবস্থায় অন্য কোনো ব্যবস্থায় যাওয়াও যাবে বলে মনে না। তিন মাসের কাছাকাছি। নাবিলা জীবন নিয়ে টানাটানি লাগবে।

তবে নানি সোজা কসম দিলেন। তিনি আপাতত কাউকে জানাতে দেবেন না। রোকেয়া বিশ্বাস করে তাকে কলিজার টুকরো দিয়েছিল। সে কি দেখে রাখতে পারল? নাবিলা তাকে পছন্দের কথা বলেছে। আদনান কে জিজ্ঞেস করেছে। সে বলল, " সোনার টুকরো ছেলে "। ব্যস তিনি আর মাথা ঘামননি। ভেবেছেন পড়ালেখা শেষ হোক। চার হাত এক করে দেবে। শুধু তার নাবিলা ভালো থাকলেই হলো।

আদরে আদরে এতটাই অন্ধ হয়ে গিয়েছিল যে ভালো মন্দের শাসন দূরের কথা, কোন কিছুতে কখনো নিষেধই করেননি। তাছাড়া নাবিলার মতো শান্ত শিষ্ট মেয়ে এমন করবে, তার ভাবনাতেও আসেনি। তাই তিনি ঠিক করলেন, কিছুদিনের জন্য নাবিলাকে নিয়ে সরে যাবেন।

কিন্তু তার আগেই পুলিশ এসে হাজির। এসে ডানে বামে আর কোনো কথা নেই। নাবিলাকে গ্রেপ্তার করা হলো। নাবিলার কোনো ভয় নেই, হেলদোল নেই, মহিলা পুলিশ তাকে টেনে গাড়িতে তুলল। আর সে শান্তভাবেই গাড়িতে গিয়ে বসল। নানি কাঁদছে, মামারা পুলিশের সাথে কথা বলছে। আদনান ভাইয়ের তো প্রায় হাতাহাতিই বেধে যাওয়ার জোগাড়।

তাদের এক কথা। কি দোষ করেছে তাদের মেয়ে? পুলিশ নাবিলা নিয়ে গেলো। নিতে নিতে একটা কথাই জানালো। ঐ দিন ফ্ল্যাটে একমাত্র আপনার মেয়েই গেছে। প্রেমিকসহ দুটো খুন করেছে।

নাবিলার কানে এই সব কিছুই ঢোকে না। এই দুনিয়ায় কি সে আদৌ আছে? কখন বাড়ি থেকে তাকে আনা হলো, কখন এই মোটা মোটা শিকের ছোট্ট রুমে বন্ধি করা হলো, নাবিলা জানেই না। তার ধ্যান ছুটল দরজা খোলার শব্দে।

দুনিয়ায় কি শুধু সোহানার মতোই পিচাশিনী থাকে, না রক্ষকের বেশে ভক্ষকও থাকে। তারা দিনের আলোতে, মানুষের মতোই দেখতে তবে রাতের আঁধারে সেই একই পিচাশ।

সেই পিশাচ কেই দেখল কোমরের বেল্ট খুলতে খুলতে এগিয়ে আসছে। নাবিলার গলা শুকিয়ে এলো। তবুও টু শব্দও বের করতে পারল না। সেই দির রাতে নাবিলা মরল, ধ্বংস হলো, নিঃশেষ হলো। তারপর ধীরে ধীরে সে তলিয়ে গেল, গহীন থেকে গহীনে।

সেই দিন ফ্ল্যাটে শুধু শাহরিয়ারের লাশই পাওয়া যায়নি, পাওয়া গিয়েছিল সোহানা মল্লিকের ক্ষতবিক্ষত লাশও। যেন কত দিনের ক্ষোভ এই শরীরটার ওপর। সেই ক্ষোভ শেষ করেই দারোয়ানকে দুটো ঠিকানা, দুটো চিঠি আর ছোট্ট একটা প্যাকেট হাতে তুলে দিয়ে বলেছিল, -- আমার আপনজনদের পৌঁছে দিও, চাচা। এই শেষবার। একজন আমার মুখের কথা শোনার জন্য ব্যাকুল হয়ে বসে আছে।

দারোয়ান ঠিকভাবেই পৌঁছে দিয়েছিল। তবে সে তো জানে না, সেটাই ছিল শাহরিয়ারের সাথে শেষ দেখা। তাই পৌঁছে দেওয়ার খবরটা দিতে গিয়েই দেখে দরজা হাট করে খোলা। সেই খোলা দরজা দিয়ে একটু উঁকি দিতেই তার কলিজা কেঁপে ওঠে। আর উঠতেই দৌড়ে বাড়িওয়ালা, পুলিশকে খবর দিয়েছে। পুলিশ এসে দেখে, ড্রইংরুমে শরীর মুখ থেঁতলানো এক মহিলার লাশ। আর বেডরুমে, ওই যে অসম্ভব সুন্দর ছেলেটা, যার রুপ দেখলেই মায়ায় জড়িয়ে ধরে। সেই ছেলেটা ভয়ংকরভাবে শূন্য ভেসে আছে।

তাদের সবকিছু বের করতে খুব বেশি সময় লাগেনি। বছরখানেক আগেই মাদক সংক্রান্ত ঘটনায় দুনিয়াজুড়ে কেলেঙ্কারি হয়ে গিয়েছিল। বাড়ির সম্মান তখন থেকেই টালমাটাল। সেই লজ্জা আর চাপ ঢাকতেই কাদের মল্লিক পানির মতো টাকা ঢাললেন। এই টাকার জোরেই সোহানা মল্লিক এক রাতেই পরিচিত হলেন মানবদরদি নারী হিসেবে। এতিম এক ছেলেকে তুলে এনে তার জীবন বদলে দিয়েছিলেন। লেখা পড়া থেকে সব খরচ নিজে চালাতেন। এমনকি নিজের সন্তানের মতোই আগলে রাখতেন । অনেক দিন দেশের বাইরে থাকার পর সেই ছেলেটার সাথে দেখা করতে আসাই যেন কাল হলো তার। প্রেমিকের বিশ্বাসঘাতকতায়, প্রেমিকারই হাতে নির্মমভাবে খুন আর সেই হত্যাকাণ্ডের বলি হলেন সোহানা মল্লিকও।

ব্যস, এভাবেই পুরো দুনিয়ায় একদিনের জন্য নাবিলা ছেয়ে গেল। কাজীরপাড়ার কেউ বড় নাবিলাকে দেখেনি। তবে খালিদ দেখেছে, রোকেয়া দেখেছে। আর দেখতেই দুজনের পুরো দুনিয়া হেলে উঠল।

যেই মায়ের কাছে, নিজের নাড়ি ছেঁড়া ধন সপে গিয়েছিল। সেই মায়ের কাছ থেকেই সবার আগে মুখ ফেরালেন। তবে ফেরালেই বুঝি সব ঠিক হয়? হয় না? তাই দুনিয়া এক করে ফেললেন মেয়েকে ছাড়াতে। তবে কাদের মল্লিকের সাথে পেরে উঠে না। এই দুনিয়ায় খারাপের ক্ষমতা যে অনেক। আর এই ক্ষমতার কাছে ভালো টিকতে পারে না।

কাটায় যেমন কাটা তুলে, তেমনি তুলল খালিদ। সেই দিন আরেকটা চিঠি আর ছোট্ট ব্যাগটা খালিদের জন্যই ছিল।ব্যাগে ছিল একটা মেমোরি কার্ড। সেটায় কি আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আর চিঠিটা ছিল একটা বাক্যের “আমার নাবিলাকে দেখে রাখিস।”

বললেই বুঝি দেখে রাখা যায়? ভাগ্য হয়েছে তাদের বেলা বড়ো নিষ্ঠুর। একই জায়গা, নাবিলার কাছে চিঠি পৌঁছুতে সময় লাগেনি। তবে খালিদ অন্য জায়গায়, তার মধ্যে বাড়িতে ছিল না। চিঠি আর বন্ধুর পরিণিতি খবরটা পেতে পেতে বড্ড দেরি হয়ে গেছে। আর এই দেরিতেই নাবিলা নামের মেয়েটি নিঃশেষ হয়ে গেছে।

খালিদ রোকেয়াসহ কারো সামনে আসেনি। কাউকে চেনেও না। তবে রাতারাতি সে বাজি ঘুরিয়ে দিয়ছে। না দেওয়ার তো কিছু নেই। সোহানা মল্লিকের কীর্তি তো কম ছিল না। শাহরিয়ার শুধু একটু সুখের আশায় চুপচাপ সরে যেতে চেয়েছিল। এখন তো আর কোনো বাঁধা নেই। তাই তো সে শেষই, এই পিচাশিনীও শেষ হোক।

তারপরই সব পত্রিকার, টিভি, নিউজ ঘুরে নাবিলা থেকে সোহানা মল্লিক আর শাহরিরারের দিকে গেলো। কেননা, খালিদ, পুলিশের কাছে প্রমাণ দেয়নি। দিয়েছে সাংবাদিকদের কাছে। আর তারাই পুলিশসহ পুরো মল্লিক বাড়িকে হেলিয়ে দিল।

মাঝখান থেকে নাবিলা নামের মেয়েটিকে মল্লিক বাড়ির মানুষ বউয়ের কীর্তির উপর পর্দা টানতে ব্যবহার করেছে। এটাই সুন্দর করে তার পরেরদিন জানানো হলো, এও বলা হলো মেয়েটা নির্দোষ, ভালো বন্ধু ছিল, একই থিয়েটারে নাটক করত। ব্যস, এইটুকুই। এই খুন, এই পাপের কোনো কিছুতে এই মেয়েটা নেই।

নাবিলা জামিন সাথে সাথেই হলো। হলে কি? নাবিলা আর তখন নাবিলা নেই। প্রথম প্রথম একেবারে শান্ত, তারপর আস্তে আস্তে পুরো অশান্ত।

আর এই অশান্ত নাবিলাকে নিয়ে পুরো আড়াল হয়ে গেলেন তার নানি। রোকেয়ার উপায় নেই, তবে কড়া করে জানালেন। মেয়ে সুস্থ হলেই তিনি একেবারে নিজের কাছে নিয়ে যাবেন।

নিলোও তাই। নাবিলা সুস্থ হলো। মায়ের মেয়ে মায়ের কাছে ফিরে এলো। তবে দেড় বছর, নানি বাড়ির এলাকার সবাই জানল, নাবিলা বাবার বাড়ি চলে গিয়েছিল। আর বাবার বাড়ির সবাই তো আগে থেকেই জানে, সে থাকে নানির বাড়িতে।

ব্যস, কেউ না কিছু জানল, না বুঝল। নাবিলা নিজেও জানল না। শুধু আবছাভাবে মনে পড়ে নানুর কোলে ছোট, সাদা, ধবধবে ছোট একটা ফুল। তার বুনফুল। যেই ফুল ফোটার আগেই তার বাবার মতো, তার মায়ের মতো নিশ্চুপ ঝরে, নিশ্চুপই হারিয়ে গেছে।

চলবে......

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 31 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন