ফন্ট সাইজ:
থিম:
বনফুল

পর্ব 32

লেখক: নূপুর ইসলাম

#বনফুল
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_৩২

নাবিলা নিশ্চুপ বসে রইল বেশ কিছু সময়। হাতে তার এখনও সেই চায়ের কাপ। দৃষ্টিও সেই চায়ের কাপে। না, ঠোঁটে ছোঁয়ানো হয়নি এখনও। বরং ধোঁয়া ওঠা গরম চা এখন শান্ত। তার মতোই শান্ত এই রুম, এই রুমের প্রতিটা মানুষ।

আসাদুজ্জামান গল্প আগেই জানেন, তবুও নাবিলা কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে আজও চোখ ভিজল। চোখ ভিজল আসমানিরও। প্রিন্টের লাল কাপড়ের আঁচলে বারবার ভেজা চোখটা মুছল। কপাল যখন পুড়ে, সব দিক দিয়েই পুড়ে। এইডা নতুন কিছু না। যে পাবে, সব দিক দিয়েই পাবে। আর যার যাবে, চার কুল ভেঙেই যাবে।

নাবিল পুরো স্তব্ধ। কত কিছু হয়ে গেছে, তারা কিছু জানেই না। তবে একেবারে ছোট তো ছিল না। বাবা-মাকে আজ তার কাছে শক্ত বিশাল পাহাড়ের মতো মনে হলো। মা তো সব সময়ই এমন তবে ওই আলাভোলা বাবাটাকেও আজ শক্ত বিশাল বট বৃক্ষের মতো মনে হলো। যার দিন দুনিয়ার হুঁশ না থাকলেও, সঠিক সময়ে সঠিক বাবা হতে পেরেছেন। তাই তো এত কিছু হজম করে দিব্যি তাদের আগলে রেখেছে, আড়াল করেছে। এক সন্তানের দুঃখে বা ভুলে অন্য সন্তানের জীবনে কোনো ছন্দপতন তো ভালো, বরং সব দিকই খেয়াল রেখেছেন।

তার সাথে এই যে শেষ হয়ে যাওয়া মেয়েটা, এই মেয়েটাকে ভুলের শাস্তি না দিয়ে ভালোবাসার চাদরে মুড়িয়ে নিয়েছেন। কখনও বুঝতেই দেয়নি, ভুল করেছো তুমি, বিশ্বাস ভেঙেছো আমাদের। আঙুল তুলে কড়া শাসনে বলেনি নাক কেটেছো তুমি, মাথা নিচু করেছো তুমি। বরং বড় মেয়ে তার ভরসার জায়গা। যা কিছু হোক, যা কিছু করুক। বড় মেয়ের কাছে আস্তে করে বলে হালকা হন তিনি। সন্তানেরা যেমন মায়ের কাছে বলে, তাদের বাবা বলে তাদের বড় মেয়ের কাছে।

ছোটবেলা নোভা ও তার দুজনেরই খুব আক্ষেপ ছিল। আপাকে বাবা-মা বেশি ভালোবাসে। ঈদ, জন্মদিন, যা কিছু হোক, সবার আগে আপা। তার জন্য সব কিছু স্পেশাল। এই যে তাদের বাড়ির রুম, আপা এই বাড়িতে কখনও পা রাখেনি। তবে সবচেয়ে ভালো রুমটা সবার আগে তার জন্যই বরাদ্দ।

ছোট ছিলাম, অবুঝ ছিলাম। হিংসা জেঁকে ধরত। তবে ওই যে, নানুবাড়িতে গিয়ে যখন জানালার কার্নিশ ঘেঁষে ভয়ে ভয়ে একটু উঁকি দিতাম। সব হিংসে রাগ কোথায় যে গায়েব হয়ে যেত। তখন বলতে ইচ্ছে করত, আমাদের সাথে চলো আপা। আমাদের বাড়ির হাজার পূর্ণতার মাঝে একটা কোণা সব সময় অপূর্ণ। সেটা তুমি, আপা। আমাদের জন্য মায়ের কোল ছাড়া হয়েছো, তার জন্য আমাদের সবার প্রতি অভিমান। আর আমরা এই যে তোমার জন্য সব ছাড়া হচ্ছি। তো হয়ে গেলো না শোধবোধ।

কিন্তু কখনও বলা হয়নি, আপা সেই সুযোগ তাদের কখনও দেয়নি। তবে সেই আপা যখন নিঃস্ব, বিধ্বস্ত অবস্থায় অনেকটা দিন পরে আমাদের কাছে ফিরে এলো, সেই দিন যেমন বাক্যহারা হয়েছিল, আজও হলো। তফাৎ, সেই দিন বোনের অবস্থা দেখে হয়েছিল, আজ অবস্থার কারণ জেনে হলো। আর এও জানল, ভাগ্যের কাছে মানুষ কতটা অসহায়।

স্তব্ধ হয়ে বসে আছে নোভাও। তবে সেই স্তব্ধতা ভিজে যাচ্ছে চোখের পানিতে। ওই যে সোয়েটারের ওপর গায়ে হালকা গোলাপি রঙের চাদর, চাদরটা ভিজে রঙ পাল্টে দুঃখের আলপনা একে যাচ্ছে নিজ ছন্দে।

এত এত ব্যথা নিয়ে, তাদের কত আবদার, কত দুষ্টুমি, কত হাবিজাবি পাগলামি সব হাসিমুখে হজম করেছে। কখনও একটু ঝাড়ি তো ভালো, মুখ কালো তো ভালো, উঁচু গলায়ও কথা বলেনি। অথচ একটু বিপদে পড়তেই তার চেহেরার রং বদলে গেছে। আঙুল তাক করেছে, ঝাড়ি মেরেছে, উঁচু গলায় কথা বলেছে অথচ এই সবের হাজার গুণ নিয়ে সে দিব্যি বেঁচে আছে, খাচ্ছে, ঘুমাচ্ছে। আর একটু গায়ে কালি লাগতেই সে মরতে চাইছে,ঘর থেকে বেরোবে না বলে শপথ করে বসে আছে।

নোভা আর কিছু ভাবলই না। ঝট করে উঠে এগিয়েই নাবিলাকে ঝড়িয়ে ধরল। ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলল, -- স্যরি আপু, স্যরি।

নাবিলা চায়ের কাপটা আস্তে করে রাখল। নিজের সাথে যুদ্ধ তার, নিজেই শত্রু নিজেই হাতিয়ার। তাই আজকে তার চোখে পানি নেই, তবে টকটকে লাল। জ্বর বেড়েছে বোধহয়। সব কিছুই দেখছে ঘোলা। সেই ঘোলা চোখে
আদুরে ছোট বোনের মুখটা দু'হাতের আজলায় নিয়ে বলল, -- উঁহুম! আপাদের স্যরি বলতে হয় না। তারপর নাবিলের দিকে তাকালো। জানালার কার্নিশ ঘেঁষে উঁকি দেওয়া ছেলেটাকে ডেকে কখনও কাছে না নিলেও, আজ হাত বাড়িয়ে দিল।

নাবিল সাথে সাথে এগিয়ে এলো। হাঁটু গেড়ে বসল তার আপার সামনে। বসতেই নাবিলা মৃদু হাসল। উপওয়ালা কিছু কেড়ে নেন, আবার দু'হাত ভরে দিয়েও দেন। তা না হলে, এত এত ভালোবাসা পাওয়ার কিসের যোগ্যতা তার?তাই হেসেই ছোট ভাইয়ের মাথার চুলগুলো এলোমেলো করে দিল।

আর এই সবকিছুর মাঝেই অপূর্ব খুব স্বাভাবিকভাবে তার হাতের নুডুলসের বাটিটা নামিয়ে রাখল। না, খাওয়া হয়নি আর। নাবিলা পুরো গল্পটা বলেছে নিজের হাতের চায়ের কাপে চোখ রেখে। তাই সে খেয়াল করেনি, যে দৃষ্টি তাকে ভেতর থেকে কাঁপিয়ে দেয়, চোখ ফেরাতেই সেই দৃষ্টি তার ওপর এসে থেমেছে। আর এতক্ষণে একবারও সরে অন্য কোথাও যায়নি।

নাবিলার ভেজা কণ্ঠ, তিরতির করে কাঁপতে থাকা শুষ্ক ঠোঁট, বড় যত্নে চোখের পানিকে চোখের কোণ পর্যন্ত শাসিয়ে রাখা আর গল্পের প্রতিটা শব্দ।

অপূর্ব পুরোটা শুনেছে নিশ্চুপে, এক ধ্যানে, তীক্ষ্ণ, ধারালো মনোযোগ নিয়ে। মা ছোটবেলা থেকেই চাইতেন, সে যেন বাবার মতো না হয়। কিন্তু রক্ত তো আর চাইলেই অস্বীকার করা যায় না। তাই চেহারায় মায়ের মতো হলেও, স্বভাবে কিছুটা বাবারই প্রতিচ্ছবি। বাবা যেমন সবকিছু খুব স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেন, সেও পারে। তাই তো গলার কাছে জমাট বাঁধা অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে সে এখনো স্বাভাবিক। স্বাভাবিক তার চোখ মুখ।

তাছাড়া একটা জায়গায় এসে অপূর্ব একেবারেই ভিন্ন। না মা, না বাবা। সেখানে সে শুধুই অপূর্ব। সামান্য থেকে সামান্য বিষয়ও সে গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখে, শোনে, ভাবে।

ভার্সিটির সেই এক পলক দেখার পর তাদের আর কখনো দেখা হয়নি। হওয়ার কথাও না। দু’জন সম্পূর্ণ ভিন্ন জগতের মানুষ। তবু কোনো এক অদ্ভুত কারণে মাঝেমধ্যেই এই মেয়েটার কথা তার মনে পড়ত। ঐ যে টলমলো চোখের স্নিগ্ধ মুখটা কখনও যদি একটু নিশ্চুপ বসত, রাতে চোখে যখন ঘুম এসে ধরা না দিতো, উদাস দুপুরে বা ভিন দেশের কোথাও ক্লান্ত শরীরের বিষন্ন সন্ধ্যায়। চোখের সামনে হঠাৎ ভেসে উঠত।

না, এই ভেসে উঠা কখনোই তার স্বাভাবিক জীবনের ছন্দে প্রভাব ফেলেনি। তবে কোথাও একটা ছিল, মনের অজানা অলি গলিতে। তা না হলে ভুলতে পারেনি কেন?

দেশের বাইরে থাকার জীবনটা সবার যেমন থাকে ঠিক তেমনই। পড়াশোনা, কাজ, ব্যস্ততা, সবকিছু চলছিল নিজের নিয়মে। সেই নিয়মের মাঝেই হঠাৎ সিদ্ধান্ত বাবার সাথে দেখা করবে। ব্যস, সেই সিদ্ধান্ত থেকেই নিজের মতো করে সব ব্যবস্থা করে ফেলে।

নাবিলা যেমন তার নানুর সাথে ক্লোজ, তার জীবনও কিছুটা তেমন। বাবার সাথে ডিভোর্সের পরে সেও তো নানু বাড়িতেই তো ছিল। তাই নানু মুখে প্রায়ই শুনত, "আমরা যতই বাহাদুরি করি, বড় গলায় বলি, আমার যা মন চায় তাই করব। আসলে আমরা পুতুল। এই যে চার আঙুলের কপাল, এই কপালের পুতুল। এখানে যা লেখা আছে, হবেই।"

আসলেই হয়। এই মেয়েটার সাথে তার আবার দেখা হওয়ার কথা লেখাই ছিল। ঠিক এই সময়ে,তাই তো সেই এক ঝলকের দেখা। আর মনের কোথাও আটকে যাওয়া। আসতে যেতে জীবনের চলার পথে কত মানুষের সাথে দেখা। তবে এমন আটকে যায় কে?

অপূর্ব কাজীপাড়ায় প্রথমবার পা রেখেই প্রথম যেই নামটা শোনে তা হলো নাবিলা। অচেনা জায়গায় এসে ঢাকার মতো শহরে ঠিকানা খোঁজা সহজ কথা না। সকাল থেকে প্রায় দুপুর পর্যন্ত অলি-গলি ঘুরেছে। ঠিকানা দেখাতেই একেকজন একেক গল্প বলেছে। কেউ বলেছে খালিদের কথা, কেউ পাগলের কথা, আবার চায়ের দোকানে বসে শুনল খুনখারাবির গল্প।

তখন নাবিলাকে না চিনলেও, পরে এলাকায় এসেছে, একেক জন দেখেছে। আস্তে আস্তে সবই সবার কাছে, পুরোপুরি না হলেও, কিছুটা অনুমান কিছুটা ঠিক মিলিয়ে নিয়েছে।

তবে খালিদের জন্য হোক আর চাচির জন্য, সামনাসামনি কেউ মুখ তেমন আর খোলেনি। তবে পিঠ পিছে বলাও থামেনি। সুযোগ পেলেই তারা নিজ দায়িত্বে গল্পের ডালপালা মেলে শুনিয়ে দিয়েছে। তেমনি বলেছে তাকেও।

তখন বাড়ি খোঁজা নিয়েই তার মাথায় গণ্ডগোল। কোথাকার কোন নাবিলা, তার সম্পর্কে আগ্রহ থাকার কথা না। তাই হয়ও নি। তারপর সেই থমকে যাওয়া ইনসিডেন্ট।

এই ইনসিডেন্টের চেয়েও থমকেছে নাবিলাকে দেখে। তার চিনতে এক সেকেন্ডও লাগেনি। সেই রাতেই তার বুকে অচেনা এক ঝড়। যেই ঝড় এই সব কিছুতে দক্ষ অপূর্ব সামাল দিতে পারে না। এমন দম বন্ধের অনুভূতি, না চোখে ঘুম আসে, না নিশ্বাস ফেলতে পারে। তাই চুপচাপ বাবার রুমে চলে গেছে।

সন্তানেরা যত বড় হোক, যত ক্ষমতা বান হোক, সব কাজে যত পারদর্শী হোক। বাবা, মায়েরা এক দেখাই বুঝে যান, সন্তানের ভেতরের অবস্থা। তার বাবারও বুঝতে সময় লাগল না। তবে তিনি এটা বুঝতে পারেন নি, নাবিলা নামের মেয়েটার গল্পের অর্ধেক পাজল তার ছেলে সে রাতেই মিলিয়ে ফেলেছে। আর এর জন্যই তার ভেতরে যত ঝড়।

যেই মেয়েটার এক এক ফোঁটার চোখের পানির জন্যই একদিন সে হাত তুলে মোনাজাত করেছিল। সেই মেয়েটিই চোখের পানির গহীন এক সমুদ্রে ডুবে গেছে। এমন ডুবে গেছে, যেখান থেকে আর ফেরা হয়নি। ফিরেছে শুধু দেহটা।

যেই দেহটার কোনো অনুভূতি নেই, যে যা বলে, চাবি দেওয়া পুতুলের মতো করে চলে। চার দেয়ালের ভেতরে সে বুকের আগুন নিয়ে তার কাছের মানুষদের যত্ন করে, আগলে রাখে, ভালোবাসে। সবকিছু ঠিকঠাক সামলায়।

আর সেই আগুন যন্ত্রণা দ্বিগুণ হলো, অপূর্ব নামের ছেলেটার আগমনে। যেই আগুনে প্রথম দেখাই কুপোকাত সে।

অপূর্ব আবার সব পাজল মেলায়। কিছু একটা ঠিক নেই। অন্তত তার সঙ্গে নেই। অবশ্য বিষয়টা বুঝতে অপূর্বর খুব বেশি সময় লাগেনি।

আজব এই দুনিয়া। আর এই দুনিয়ায় আজব আজব গল্প। তা না হলে মায়ের ডুপ্লিকেট হয়েও চোখের পাশটা ভিন্ন হবে কেন? কেন ভিন্ন তার দৃষ্টি। আর এই ভিন্নতা নিয়ে বৃত্তের মতো ঘুরতে ঘুরতে তারা এসে থেমে গেছে এক বিন্দুতে। কী হতো, যদি গল্পটা অন্যভাবে লেখা হতো?

রাত বাড়ে। যে যার মতো রুমে ফিরে যায়। অপূর্ব সেখানেই বসে থাকে। নাবিলা তার দিকে আর একবারও ফিরে তাকিয়ে দেখেনি। মেয়েটা এমন ভীতু। সে ধরে নিয়েছে, দুনিয়ার বাকি সবার মতো অপূর্বও তাকে ঘৃণার চোখেই দেখবে। যদি দেখারই হতো, অনেক আগেই দেখতে ফেরি টেইল গার্ল। তা না হলে, অপূর্ব আজ এখানে থাকত না, না তুমি আসতে গল্পের আসরে আর না শুরু হতো নতুন কোন গল্প।

তাই আড়মোড়া ভেঙে পাদুটো ছড়িয়ে আধশোয়া হয়ে বলল, -- নাবিলা ওই দেড় বছর কোথায় ছিল, বাবা?

আসাদুজ্জামান বড় একটা শ্বাস ফেললেন। সবাই চলে গেলেও তিনি বসে আছেন আগের মতোই। রোকেয়া কাছে শুধু কি হয়েছে শুনেছে, তবে নাবিলা গল্প আজ চোখের সামনে দেখল। তাছাড়া নিজের গল্প, নিখুঁত ভাবে একমাত্র নিজের বলাই সম্ভব। তাই শ্বাস ফেলেই বললেন,-- ওর নানুর দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়ের বাড়ি।

-- সেটা কোথায়?

-- সিলেট।

অপূর্ব একটু থামল! তারপর বলল, -- ওর বেবিটার কবর কোথায় বাবা?

আসাদুজ্জামান অপূর্ব মতোই কিছুক্ষণ নীরব রইলেন। তারপর বললেন, -- আমি জানি না। বলেই তিনি উঠলেন। উঠতে উঠতে বললেন, -- একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
-- হুম।
-- তোমার প্রথম মুগ্ধতার মেয়েটা কি নাবিলা?

অপূর্ব হাসল। এই না হলে তার বাবা। মেয়ের মুখে গল্প শুনেই পাজল ঠিক মিলিয়ে ফেলেছেন। তাই হেসে নিজেও উঠে দাঁড়াল। দাঁড়িয়ে ভণিতা ছাড়া সোজাই বলল, -- হ্যাঁ।

আসাদুজ্জামান অসহায় চোখে তাকালেন। অপূর্ব সেই চোখের দিকে তাকাল না। বরং বেরিয়ে যেতে যেতে বলল,
-- আমার ধারণা ছিল, আমার বাবা মিথ্যা বলে না। বাট আই ওয়াজ রং। টোটালি রং।

........

কাজী পাড়ার প্রাক্তন কাউন্সিল জুয়েন নিজের বাড়িতে পুলিশ দেখে অবাক হলেন না। অতি লোভে যে তাতি নষ্ট সেটাই হারে হারে আজ টের পেলেন।

কাল থেকে সোহাগ গায়েব৷ সোহাগের মা ফোন করে না পেয়ে সবার আগে তার বাড়িতেই দৌড়ে এসেছে। শেষ বার কথায় তার বাড়ির কথা বলেছে। মিথ্যা বলেনি, ছিল তো তার বাড়িতেই। তবে হারামজাদা কখন বেরিয়ে গেছে বুঝতেও পারে নি । ঘুম ছিল, ঘুম থেকে উঠে বাকি গুলোর মুখে শুনে সোহাগ নেই।

সে প্রথমে ওতো মাথা ঘামায়নি, ভেবেছে আছে হয়ত আশে পাশেই। তবে বেলা গড়াতেই ঘাম ছুটল। দৌড়ে গেলো সিসিটিভি ফুটেজ দেখতে। কোন কিছুই পেলো না। তবে সকালের দিকে একবার কারেন্ট গিয়েছিল। পনেরো বিশ মিনিটর জন্য। সেইটুকু ছাড়া সব আগের মতোই। সোহাগের ভেতরের আসার ভিডিও তো আছে, তবে বাহির হওয়ার কোন ভিডিও নেই।

সোহাগের বাড়ির মানুষের পাগল হওয়ার অবস্থা। থানায় গিয়ে সাথে সাথেই মিসিং ফাইল করল। তার সাথে আরো দুজনও সকাল সকাল আরেক কাজ করেছেন। কাজী পাড়ার বিখ্যাত নাট বল্টু নাজিম, আর আমাদের জনদরদি বর্তামান কাউন্সিউল সানাউল্লাহ। গলায় গলায় মিলে মানহানির মামলা।

তাদের ছেলে মেয়ের অশ্লীন ভিডিও তৈরি করে সোশ্যাল মিডিয়ায় হেনেস্তা। কারো নাম উল্লেখ করেনি। জানা কথা করবেও না। তারা এক ঢলে তিন চার পাখি মেরেছে, তারাও মারবে। তাই এমনিতে পুলিশ না নড়লে চড়লেও। এই মামলা করার সাথে সাথে নড়ে চড়ে শুধু বসেনি, উড়ে উড়ে চলছে। অবশ্য পরপর ঘটনায় পুরো সাত নাম্বার ওয়ার্ড গরম। না লেগে উপায় আছে?

সোহাগ কোথায় জুয়েল জানে। না জানার কিছু নেই। সানাউল্লাহ কাউন্সিল হলেও তার সব শক্তি খালিদ। দেখে আলা ভোলা হাসি খুশি টাইপের ছেলে মনে হলেও, খুব স্বাভাবিক ভাবে যে কোন কাজ করতে পারে।

সানাউল্লাহরা আগে থেকে নম্র ভদ্র শান্ত। তার অন্য ভাই বোন, বাপ চাচারা সবই এই ক্যাটগরির। মাঝখান থেকে এটা এমন ইবলিশ হলো কেন জানে? তাই তার প্রিয় মানুষদের যেই উপায়ে বদনাম করেছে, সেও সেই রাস্তায়ই নিছে। নাজিমের মাইয়ার মতো ঢোকার ভিডিও তো আছে, তবে বাইর হওয়ার নাই।

ভেবেছিল সকাল সকাল আরো নাটক দেখবে, ওমা ভিডিও গায়েব। সেটা না হয় গায়েব রাতারাতি আরেক ভিডিও ঘুরছে পুরো ফেজবুকের জগৎ জুড়ে। সেইদিন খালিদের পুরো বাড়ির ভিডিও। নোভা ভেতরে গেছে, এক দুমিটের মাঝেই বেরিয়ে এসেছে, খালিদ বাড়ি ফিরেছে তার অনেক পরে। ঘন্টা খানেক তো হবেই।

সোহাগ নিজ হাতে এই ভিডিও ডিলিট করে দিয়েছিল। ছিল শুধু তার নিজের মোবাইলে। এই ভিডিও যেহেতু সোশ্যাল মিডিয়ায়, তাই সোহাগ কোথায় না বোঝার কিছু নেই।

তাই এই শীতের সকালেও জুয়েলের কপাল একটু ঘামল। সেই ঘামটুকু মুছে নিজেকে বাঁচানোর জন্য সোহাগদের সব কীর্তি নিজের মুখেই বলল। নোভা, খালিদের মাঝে কিছু নেই। তাদের বদনাম করার জন্য এমন করেছিল। সে ভাই কোন কিছুতেই নাই। নিজের পুলাপান, তাই রাতটুকু আশ্রয় দিয়েছিল।

তবে তার কথা পুলিশ বিশ্বাস করবে কেন? দোকানদার নিজে এসে পুরো ভিডিও তাদের কাছে দিয়ে গেছে আর সোহাগদের সব কীর্তি বলছে। তাছাড়া সোহাগের শেষ লোকেশন তার বাড়ির। সামনের নির্বাচনের সানাউল্লাহকে বদনামের জন্য নিশ্চয়ই সোহাগকে ব্যবহার করেছে। তা না হলে, সবাইতো সোজা আঙ্গুল সানাউল্লাহ, খালিদের দিকেই যেত। নিজেদের কীর্তি ফাঁস করার জন্য গুম করে ফেলেছে।

তাই পুলিশ তার কোন কথা বিশ্বাস করল না। বরং তাকে সহ বাকি সব কয়টাকে সাথে সাথে গ্রেফতার করল। করতেই কাজী পাড়ায় পুরো সরগরম হয়ে গেলো। তার সাথে সানাউল্লাহ পরিচিত লোক, খালিদের ছেলেপেলে ধুমসে সোহাগের খোঁজ শুরু করল। সোহাগের মাকে গিয়ে
সান্ত্বনা দিল। ঠিক আছে মনে জেদ পুষে তাদের বদনাম করতে চাইছে। বদনাম করছে, শাস্তি পেত। তবে এই বাবা মায়ের দোষ কি? সন্তান নিখোঁজ হলে বাবা মায়ের কেমন লাগে, আরেক বাবা মায়েরা বুঝি বুঝবে না?

এলাকায় সানাউল্লাহর বাহ্ বাহ্ পড়ে গেলো। এমন কাউন্সিল এই জীবনে কেউ চোখে দেখেনি। আর খালিদের মতো পুলাই হয় না। তা না হলে, আজকাল চাচার জন্য এত করে কে?

সেই সুনামে ভেসে ভেসে খালিদের বাড়িতে ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে গেল। ফিরে গা এলিয়ে দেবে, তখনই পরপর দুটো মেসেজ এলো। একটা নোভার নাম্বার থেকে। সেখানে একটা শব্দই লেখা, " স্যরি। "

কিসের স্যরি, কেন স্যরি, খালিদ কোন আগা মাথায়ই বুঝতে পারল না। বরং ধন্যবাদ দিলে বুঝত কাহিনী। এত বড় বিপদ থেকে বাঁচাল। সেখানে লিখছে স্যরি। এই মেয়ের কোন কাজই তো ঠিকঠাক নেই।

আরেকটা মেসেজ এসেছে অপূর্বর সেই নাম্বার থেকে। যেখানে লেখা,
"আই নিড ইউর হেল্প, খালিদ। বাই দ্যা ওয়ে, তোমার বন্ধু কেসটা কোন ইন্সপেক্টর হ্যান্ডেল করেছিল?"

চলবে.....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 32 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন