#বনফুল
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব-৩৩
দুপুরের খাবারের পর রোকেয়া সিঁড়িতে এসে বসলেন। গায়ে হালকা মিষ্টি রঙের কাপড়। ভেজা চুলগুলো পিঠে ছড়িয়ে। গতদিনের নানান ঝামেলা চিন্তার রেশ
চোখে মুখে আজ নেই বললেই চলে।
বরং কিছুটা স্বস্তিই চোখে মুখে। যেই অসম্মানের ভয়ে কুঁকড়ে গিয়েছিলেন, আল্লাহ সেই রকম হতে দেননি। সব আত্মীয় স্বজন খোঁজ খবর নিচ্ছে, পুলিশ নিজেদের স্টেটমেন্ট দিয়েছে। সেই স্টেটমেন্টই এখন সোশ্যাল দুনিয়ায় ঘুরছে। তবে সোহাগ ছেলেটার কি হলো কে জানে? খোঁজ খবরই নেই।
তার কেন জানি ঘুরে ফিরে সন্দেহ খালিদের উপরেই আসে। দুনিয়ার বিটলা। কোন দিকের প্যাচ কোন দিক দিয়ে লাগিয়ে দেয় বোঝা যায় না। তাদের উপকার করলেও, মন কেন জানি তার দিকে কখনও সায় দেয় না।
যাইহোক, বিপদ গেছে আপদ গেছে। তার মেয়েদের এখন ভালো একটা দিক হলেই হলো। তাছাড়া ভালো একটা সম্বন্ধও আবার হাতে এসেছে। তারা ফিরলেই তার বড় ভাই এগিয়ে কথা বলবেন।
তাই রোকেয়া মনে সেই স্বস্তি নিয়েই কাপড়ের আঁচলটা গুছিয়ে আরাম করেই বসল। গত দুদিন শীতে মুড়িয়ে থাকলেও, আজকের দিনের শুরুটা হয়েছে ঝিলমিল রোদ দিয়ে। সেই শেষ দুপুরের ঝিলমিল রোদ আর উঠানের এক পাশে প্যান্ডেলের লোকদের হাঁকডাক, আরেক পাশে ধুমছে পুকুর খননের কাজ বসে দেখতে দেখতে তার খারাপ লাগল না।
আর এই কাজেই বড় ভাই মহাব্যস্ত হয়ে আছেন। কাল শুক্রবার, তার মধ্যে সে ফিরবে সোজাই বলেছে। থাকল তো কম না। তার মধ্যে প্রচুর শীত। আর এই শীতের আবহাওয়া কাউকেই খুব একটা স্যুট করছে না। নাবিলা বারো মাসেরই রোগী, কিন্তু নোভাকে সকালে দেখলো হাঁচির পর হাঁচি দিচ্ছে। চোখ মুখ নাক সব লাল হয়ে আছে।
তাই অনেক হয়েছে, এবার সত্যিই ফেরা দরকার। তো বড় ভাই আর কি করবেন। শুনে এই শক্রবারেই দোয়ার আয়োজন করবেন বলে জানালেন।
নাজিম রাতে আসবে। গত দু'দিনের দৌড়ঝাঁপে কাজ জমে গেছে, সেগুলোই ক্লিয়ার করে বিকেলের দিকে রওনা দেবে। সবাই যেহেতু একসাথে হয়েছে, বসে থেকেও তো আর লাভ নেই।
দাওয়াত থেকে শুরু করে বাজার সদাই কম কিছু তো না। সব দিকেই এক হাতে নজর রাখতে হচ্ছে। তার মধ্যে আদরের ছেলে আর ভাতিজা গত দু'দিন ধরে গায়েব। ঐ যে গল্পটা আসর বসালো, তার পরদিন ভোরেই বেরিয়ে গেছে। কোনো বন্ধু নাকি দাওয়াত করেছে। তাড়াতাড়িই ফিরে আসবে। কিন্তু সেই তাড়াতাড়ি আজও শেষ হয়নি। বন্ধুরা মিলে নাকি কোথায় কোথায় ঘুরছে। এদিকে নোভা মুখ ফুলিয়ে বসে আছে। তাকে রেখে দিব্যি তারা ঘুরে বেড়াচ্ছে, এটা সে মানতে পারছে না।
তবে তাদের জন্য তো আর বসে থাকা যায় না। তাই বেচারা বড় ভাইয়ের ওপর সব চোট পড়ে গেছে। অবশ্য তাকে দেখে বোঝার উপায় নাই। বরং রোকেয়ার মনে হচ্ছে, বড় আমুদেই করছে।
অবশ্য আপাতত জরুরি কাজটুকু করবে। করে তাদের সাথেই ফিরে যাবে। ছেলে যতদিন আছে আর কোনো কাজ টাজ করবেন না। এই পুকুরের কাজটা জুরুরি ছিল, তাই লোক লাগানো হয়েছে ডাবল। কাল পর্যন্ত হয়তো হয়েও যাবে। আশপাশের মানুষ, গ্রামের কিছু মাথা, এতিমখানা আর পুকুর খননের মানুষদের নিয়েই দোয়ার কাজটা একেবারে শেষ হয়ে যাবে। আর হলেই রোকেয়া ফিরে যাবে। নিজের বাড়ির চেয়ে স্বস্তি আর কোথাও আছে নাকি?
আসাদুজ্জামান জামান পুকুরের পাশেই ছিলেন।রোকেয়াকে সিঁড়িতে বসা দেখে এগিয়ে এলেন। বাজার সদাই করা শেষ, মাংসটা বাকি। সেটাই আনতে যাবেন। বাবুর্চি রাতে আসবে, সব ব্যবস্থাও রাতে হবে। রান্না শুরু হবে ভোররাত থেকে। সন্ধ্যার মধ্যে যদি সব ব্যবস্তা না করেন, তাহলে ঝামেলা পোহাতে হবে।
তাই রোকেয়ার দিকে এগিয়ে এসে বললেন,
-- নাবিলরা কোথায় গেছে, কিছু জানো?
রোকেয়া দু'পাশে মাথা নাড়ল। নাবিল ভোরে তাকে ডেকে আস্তে করে বলল, --আম্মু, অপূর্ব ভাইয়ার সাথে যাচ্ছি।
রোকেয়ার তখন চোখে মুখে ঘুম। ভেবেছিল আশপাশেই হয়তো হাঁটতে যাবে, আর মাথা ঘামায়নি। পরে শোনে কোন বন্ধুর নাকি বাড়ি। কাছে থাকলে দু’গালে দুটো বসাত। কিন্তু এখন তো আর সম্ভব না। বাড়িতে ফেরা যাক আগে তারপর যা দেখার দেখছে।
-- কবে আসবে কিছু বলেছে? সকাল থেকে ফোন দিচ্ছি, আজকে তো ফোনই রিসিভ করছে না।
রোকেয়া এবারো দু'পাশে মাথা নাড়ল। সে অবশ্য ফোন দেইনি। দেবেও না। যার বলার, একেবারে বাড়িতে।
আসাদুজ্জামান বড় একটা শ্বাস ফেললেন। হঠাৎ কোথায় গেছে, কে জানে! কোনো খবর নেই। তাই শ্বাস ফেলেই সিঁড়ির আরেক পাশে বসলেন। বসে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ বসলেন। চাইলে ঝট করে কিছু বলতে পারেন না তিনি। তাই জড়তা কাটিয়ে আস্তে করে বললেন,
-- আমার মনে হয়, নাবিলাকে সত্যটা বলা উচিত।
-- কেন?
-- কারণ এটা অন্যায়।
-- আমি তো ন্যায়-অন্যায়ের জামিন নিয়ে বসে নেই, ভাই। আমি শুধু চাই আমার মেয়ের সুন্দর, গোছানো একটা জীবন হোক। এই সত্য জানলে, এমনিতেই মরা। বাকি যেইটুকু আছে, সেইটুকুও মরে যাবে।
আচ্ছা ঠিক আছে, গোয়েন্দাগিরি করে মেয়ের সন্তান মেয়ের কাছে এনে দিলাম। তারপর, তারপর কি? দুনিয়া জানে ওই মার্ডারের সাথে নাবিলার কোনো কানেকশন নেই। ভালো বন্ধু ছিল, সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার মল্লিকেরা করেছে। বিয়ে, বাচ্চা এই প্রশ্নগুলোর কী জবাব দেবেন মানুষের কাছে? কোনো প্রমাণ আছে তার বিয়ে হয়েছিল? সবাই তারপর সেটাই বলবে। সোহনার মতো, শাহরিয়ারের অতীতের মতো, তার মেয়েও সেই রাস্তাই গেছে। প্রেম করেছে, দিনের পর দিন ঐ ফ্ল্যাটে গেছে। আর এই বাচ্চা অবৈধ দিনের ফসল। আবার এও বলতে পারে, আকাম কুকাম করে, মারা মানুষের ঘাড়ে ফেলছে। হারামজাদা তো সব করছে পেটে পেটে। ভার্সিটির একটা পুলাপানের কাছেও কোন খবর নেই।
পুরোনো ঘা খুটলে কাঁচা হয়, ক্ষত বাড়ে, যন্ত্রণা বাড়ে। অন্য কোনো লাভ হয় না। তাই বিশ্বাস করেছি,বিশ্বাসটুকু রাখুন। অন্য কোনো ঝামেলা আমি চাই না।
আসাদুজ্জামান রোকেয়ার সাথে সহমত হলেন। আসলেই দুনিয়াটা তো এত সোজা না। তাছাড়া কী ই বা হবে এই বাচ্চার কথা জেনে? বেঁচে আছে কি না, তাও তো কেউ জানে না। এখন এসব জানলে মেয়েটারই কষ্ট শুধু বাড়বে। তাই উঠতে উঠতে বললেন, -- আমি একটু বাজারে যাচ্ছি। এসে পড়ব। বাড়ি ভরা মানুষ, সাবধানে থেকো।
রোকেয়া কোনো উত্তর দিল না। চুপচাপ বসে রইল।
নাবিলাকে যখন জামিনে বের করা হলো, তখন সে একেবারে শান্ত, মূর্তির মতো। দাঁড় করিয়ে রাখলে সোজা দাঁড়িয়ে থাকে, বসিয়ে রাখলে বসেই থাকে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা, না নড়ে না কিছু শোনে। কাউকে চেনে বলেও মনে হয় না। অনেক ডাকাডাকির পর ফাঁকা চোখে তাকিয়ে থাকে। কিছু দেখছে বলেও মনে হয় না।
বাচ্চাটাকে সে এবরশন করাতে চেয়েছিল। সেজন্য সেখান থেকেই সোজা ডাক্তারের কাছে নেয়। সেখানে গিয়ে জানে আরেক ধ্বংসের কথা। না, নাবিলা কিছু বলেনি, বলার মতো অবস্থায়ই বা ছিল কি?
আল্ট্রাসোনোগ্রাফি করতে গিয়ে ডাক্তারের সন্দেহ হয়। না হওয়ার তো কিছু নেই। পেট, শরীর ....
রোকেয়া আর ভাবতে পারে না। এই ঝিকিমিকি মিষ্টি রোদ আর মিষ্টি লাগে না। আগুনের মতো লাগে, সেই আগুনে জ্বলে পুড়ে শেষ হয়। তবুও কষ্ট কমে না।
এই অবস্থায় এবরশন সম্ভব না। প্রাণের ঝুঁকি আছে। করতে হলে ঝুঁকি নিয়েই করতে হবে। রোকেয়ার আর সাহস হয়নি। কত কষ্ট দেবে মেয়েটাকে! শেষমেশ আল্লাহ উপরে ছেড়ে দিছে। আল্লাহ যা ভালো মনে হয় করুক।
মা তাকে নিয়ে গেলেন অনেক দূরে। এই সমাজ, এই মানুষ, এই সব কিছুর আড়ালে। সেই আড়াল থেকেই একদিন মা ফোন করে জানালেন সন্তানটা বেঁচে নেই।
না থাকারই কথা। নাবিলা তখন পুরো উন্মাদ। কাউকে চেনে না, কেউ কাছে গেলে ভয়ে গুটিয়ে যায়। চিৎকার চেঁচামেচি করে। নিজেকে আঘাত করে। হাত পা বেঁধে রাখতে হয়। এই অবস্থায় বাঁচবে কী করে?
আল্লাহ জিনিস আল্লাহ নিয়ে গেছে। এই যাওয়াতে কষ্টের চেয়ে তখন, রোকেয়ার স্বস্তিই বেশি হলো।
সেই স্বস্তির পরই নাবিলার চিকিৎসা শুরু হলো। পুরোপুরি সুস্থ না হলেও অনেকটা হলো। সেই সুস্থতার পরই রোকেয়া তাকে নিজের কাছে নিয়ে আসেন। সেই আসার পর সব ঠিক। কিন্তু সেই ঠিকের মাঝেই আসে তার মায়ের শেষ সময়।
নাবিলাকে নিয়ে আসার পর আর মায়ের সাথে সে যোগাযোগ রাখে নি। আগেই যদি জানাতো, এতো কিছু হতোই না। তবে নাতির ভালোবাসা এমন অন্ধই হয়েছে, নাতির জীবনই ধ্বংস হয়ে গেছে।
তবে মা তো মা-ই। অসুস্থের খবর শুনে মুখ ফিরিয়ে রাখতে পারেনি, দৌড়ে গেল। সেই যাওয়ার পর মা আবার এক ধাক্কা দিলো। বেইমান সাধে বলে। নাতনি নিজের কাছে রাখতে গিয়ে, লুকিয়ে লুকিয়ে দুনিয়া লুকিয়ে ফেলেছেন।
তাই হাত ধরে ভেজা কণ্ঠে জানালো, " নাবিলার মেয়ে সন্তান হয়েছিল। ফুটফুটে সুস্থ সবল বাচ্চা। তবে কি করেছি, সেটা বলব না। আমার মৃত্যুর সাথে সাথে এই সত্য এখানেই শেষ। আমার নাবিলাকে ভালো ঘর দেখে বিয়ে দিবি, রোকেয়া। তুই পেটে রাখতে পারিস, কিন্তু এই বুকে রেখেছি আমি। আমার নাতনি খুব সুখী হবে, দেখিস। অনেক সুখী। আর এই সুখের জন্য আমি জাহান্নামে গেলেও যাব, কিন্তু কোনো কাঁটা থাকতে দেব না।"
মেয়ের খুশির কাছে রোকেয়াও নিষ্ঠুর হয়ে গেল। না, সে আর জানতে চায়নি। কি হবে জেনে? সে যেখানে আছে, সেখানেই ভালো থাকুক। আর আমার মেয়ে আমার মেয়ের মতো থাকুক।
-----
নাবিলা এখন পুরোপুরিই সুস্থ। সুস্থ হলেও গত দু’দিন ঠিক জ্বরে ভুগেছে। না, বেহুঁশ হয়ে পড়ে ছিল না। ব্যস, রুম থেকে আর বের হয়নি। বের না হওয়া তার জন্য নতুন কিছু না। দিনের পর দিন তার এভাবেই কেটে গেছে। বরং এই দু’দিন তার বলতে গেলে বেশ ভালোই গেছে। কম্বলের নিচ থেকে আর বের হয়েই দেখিনি। সময়মতো খাবার, ওষুধ আর বই, এই তিন নিয়েই তার সারাটা বেলা অনায়াসেই কেটে গেছে।
আজও কেটেছে। তবে সন্ধ্যার পর কেন জানি রুমে আর বসতে ইচ্ছে করল না। নিজের হাতের তৈরি কফি নিয়ে বাইরে বসতে ইচ্ছে হলো।
তাই এলোমেলো চুলগুলো হাত দিয়ে খোঁপা করে বেরিয়ে এলো। বেরোতেই টুপ করে কারেন্ট চলে গেল। নাবিলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে গেল। অন্ধকারে কোন দিকে যাবে বুঝতে পারল না। ঠিক তখনই উঠানের আরেক প্রান্ত থেকে নোভা মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে ডেকে বলল, -- এই আপা, মজার একটা জিনিস। দেখে যাও!
নাবিলা সাথে সাথেই এগিয়ে গেল। এগোতেই ঠান্ডা, শীতল একটা বাতাস গায়ে লাগল। গত কয়েকদিন ছিল কুয়াশায় ঢাকা, হিমশীতল শীতের চাদরে মোড়ানো। আজও শীত আছে, তবে কিছুটা কম।
এমন সবুজ গাছগাছালির মাঝে সাদা শুভ্র বাড়ি। বড় চাচার চিন্তাভাবনা আসলেই বেস্ট। নাবিলা বিছানায় আধশোয়া হয়েই এই সবুজ পাতার ঝিকিমিকি দেখেছে। এমন মিষ্টি রোদ, সাথে বই আর এক কাপ চা, এর চেয়ে সুন্দর জিনিস আর কী হতে পারে! তবে তার রং তুলিটাকে খুব মিস করেছে। এই রোদের লুকোচুরি খেলাটা তার শুভ্র সাদা কাগজে বন্দি করতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু ব্যাগভর্তি বই আনলেও রং তুলি তো দূরের কথা, সামান্য একটা পেনসিলও আনেনি। অবশ্য বড় চাচাকে বললেই এনে দিতেন, কিন্তু বলতেও ইচ্ছে করেনি।
নোভা দাঁড়িয়ে আছে পুকুরের পাশে। না এখন আর মানুষজন নেই। তবে কিছুক্ষণের মাঝেই বার্বুচিরা এসে পড়বে। তাই আসমানি খালাকে নিয়েই শেষ এক রাউন্ড দিচ্ছে। কেননা মা কড়া করে বলেছে, মানুষ আসলে রুম থেকে আর বের হওয়া যাবে না।
নাবিলাও এসে দাঁড়াল পুকুরটার পাশে। অনেকটা কাজ হয়ে গেছে। বড় চাচা নাকি সান বাঁধানো ঘাট করবে। তখন নিশ্চয়ই খুব সুন্দর হবে। কখনও এসে দেখা হবে কি না, কে জানে? তাই বড় একটা শ্বাস ফেলে বলল, -- কী হয়েছে?
নোভা হেসে ফেলল। কিছুই হয়নি। আপা বারান্দায় থমকে দাঁড়িয়ে ছিল। অন্ধকারে প্রথমে না দেখলেও লাইট জ্বালাতেই খেয়াল করল। তাই এমনি এমনি ডাকা। তাছাড়া এই ভূতের বাড়িতে আটকে আছে। যারা ঘোরার, তারা তো ঠিকই ঘুরছে। আর সে ঘুরে ফিরে এই চার দেওয়ালের মধ্যেই বন্দি হয়ে আছে।
মা একা বের হতে দেবে না। বড় চাচা ব্যস্ত। সে আর করবে কী? দিন রাত বসে বসে এই মাটি কাটার কাজ দেখছে। এর চেয়ে তো বাড়িতেই ভালো থাকত। অন্তত ভার্সিটি যেত, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়া হতো।
বন্ধুদের কথা মনে হতেই নোভার ভেতরটা খুশিতে টগবগ করে উঠল। সে তো ভাই সেলিব্রিটি হয়ে গেছে! এই ভিডিওর কাণ্ডে তার ফ্যান ফলোয়ার রাতারাতি আকাশ ছুঁয়ে গেছে। সব ছবিতে লাইক, কমেন্ট, শেয়ার, ভাইরে ভাই!
সে অবশ্য আর ছবি টবি কিছুই ছাড়ে নি। আগের ছবিতে একেক জন মোটিভেশনাল কমেন্ট করে করে রাতারাতি রিচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। দেখো কাণ্ড! সে ভেবেছিল, এই মুখ আর দেখাতে পারবে না। অথচ এখন এই মুখ দেখার জন্যই সবাই বসে আছে। বন্ধুরা কলের পর কল দিচ্ছে। নোভা তো এখন ভাই টপে।
এই টপের কথাগুলো বলার জন্যই সেইদিন সকালে অপূর্ব ভাইয়ার রুমে গেলে। ওমা! তারা সূর্য ওঠার আগেই গায়েব। তবে রাতে গিয়েছিল আপার জন্য ওষুধ আনতে। গিয়ে দেখে, এমন শীতেও সেই দিনের পাতলা কম্বল টেনে বান্দা শোয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। অথচ পায়ের কাছে মোটা কম্বল। সে দেখেই বলল,
-- এই কম্বলের কাহিনি কী?
-- কাহিনি হলো, কম্বলটা আমার খুব পছন্দ হয়েছে। এটা আমি নিয়ে যাচ্ছি। এটা হবে অপূর্ব দ্য গ্রেট বংশের বংশীয় পরম্পরার কম্বল। আমি গায়ে দেব, মৃত্যুর আগে ছেলের হাতে তুলে দেব। তারপর ছেলে দেবে তার ছেলের হাতে, তার ছেলে দেবে তার ছেলের হাতে। এভাবে চলতেই থাকবে, চলতেই থাকবে।
নোভা হেসে ফেলল। হেসে বলল,
-- কম্বলটা আমার মায়ের। আমাদের দিয়েছিল এক্সট্রা হিসেবে। আপনার কাছে এলো কীভাবে, সেটাই তো বুঝতে পারছি না।
অপূর্ব ভাইয়া হাসল। হেসে শুয়ে চোখ বন্ধ করে বলল,
-- আমার ওই কালো ব্যাগের পকেটে ওষুধ। যা আছে সব নিয়ে যাও। তোমাদের উচিত একটা ফার্মেসি খোলা, বা লজিং মাস্টারের মতো লজিং ডাক্তার রাখা। দেশে এসেছি, কিন্তু একদিনও এমন পাইনি, পুরো পরিবার সুস্থ!
নোভা আবার হেসে ফেলল। কথাটা আসলেই ঠিক। হেসে ওষুধ নিয়ে চলে এসেছে। তবে খেয়াল করল, অপূর্ব ভাইয়া একবারও আপুর কথা জিজ্ঞেস করেনি। এমনকি সারা রাত আপা জ্বরে ভুগল একটু খবরও নেয়নি। নাকি আপুর গল্প শুনে সব ভালো লাগা উড়ে গেছে? যদি যায়, তাহলে অপূর্ব ভাইয়ার সাথে সে আর জীবনে কথা বলবে না।
সে অপূর্ব ভাইয়াকে পছন্দ করে। কেমন পছন্দ করে, নিজেও জানে না। অপূর্ব ভাইয়া কথাই মনে হয় কিছুটা ঠিক। প্রথম দিন জেনে এমন কষ্ট লাগল। কিন্তু এখন আর কিছুই লাগছে না। বরং আপার কথা জিজ্ঞেস না করায় তার রাগ লাগছে। অথচ খুশি হওয়ার কথা ছিল।
এই রাগ নিয়েই রাতে তার ভালো ঘুম হলো। না হওয়ার কোনো কারণ ছিল না। গত দু’রাত ঘুমের ছিটেফোঁটাও ছিল না। তাই কম্বল-টম্বল টেনে শুতেই ঘুম। ঘুম ভাঙল একেবারে সকালে। আর সকালে উঠেই এক লাফে সেলিব্রিটি!
তাই হেসেই বলল,-- কিছুই না আপা। চল, পুকুরে নামি।
নাবিলার কোনো ইচ্ছে হলো না। তাছাড়া চাদরও আনেনি। শীতে গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। সে চলে যাবে, এমন সময় গেটের কাছে সিএনজির শব্দ পাওয়া গেল। বাবা এসেছে নিশ্চয়ই। নাবিলা হেসে দরজার দিকে এগোল। কিন্তু তাকে পেছনে ফেলে নোভা দৌড়ে গেল।
আসমানি দেখেই বলল, -- উল্টাইয়া পাল্টাইয়া পড়ব, দেইখো!
বলতে দেরি, গেটের কাছে গিয়েই ধপাস করে পড়তে দেরি হলো না। জুতার নিচে কাদা মাটি, তার ওপর গেটের সামনের পাকা অংশে কুয়াশা। না পড়ে উপায় আছে।
আর পড়ার শব্দেই পকেট গেট দিয়ে একজন উঁকি দিল। গায়ে সাদা পাঞ্জাবি, মুখ ভর্তি চুল দাড়ি। অন্ধকারে মুখ দেখা না গেলেও সাদা জামা আর দাড়ি দেখে নোভা এমন চিৎকার দিল। এক চিৎকারে বাড়ির মানুষতো ভালোই আশপাশের মানুষও জড়ো হয়ে গেল।
চলবে......