ফন্ট সাইজ:
থিম:
বনফুল

পর্ব 34

লেখক: নূপুর ইসলাম

#বনফুল
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_৩৪

নাবিলা আজ অনেকটা দিন পর কিচেন রুমে এলো। না, তাদের বাড়ির সেই বড় মাপের শৌখিনতার চাদরে মোড়ানো চিরচেনা কিচেন রুম না, বড় চাচার বাগানবাড়ির ছোট্ট কিচেন রুম। সিলিন্ডার গ্যাস, টুকটাক প্রয়োজনীয় জিনিস এই তো। এছাড়া তেমন কিছু আর নেই।

তাছাড়া অধিকাংশ রান্নাই হচ্ছে মাটির চুলায়, তাই এখানে খাবার টাবার গুছিয়ে রাখা ছাড়া তেমন কোনো ঝামেলাও নেই। তবে বারান্দা ভর্তি আজ দুনিয়ার কিছু। কাল অনুষ্ঠানের বাজার সদাই থেকে শুরু করে ডেকোরেশনের প্লেট, গ্লাস, এটা সেটা কোনো কিছুই আর বাকি নেই।

এত বড় বারান্দা, তবুও পুরো ঠাসা হয়ে গেছে। তার মধ্যে পুরো উঠান আজ ঝিলমিল করছে বাতিতে। বাবুর্চি এসেছে, তাদের সঙ্গে এসেছে তাদের কাজ করার লোক। তাদের কাজ, গল্প, কথায় বিষণ্ন এই নিশ্চুপ বাড়িটা পুরো মুখরিত হয়ে আছে।

নাবিলার মানুষজন খুব একটা ভালো লাগে না। কোনো অনুষ্ঠান আয়োজনও ভালো লাগে না। তবে বড় চাচার এই হাসি হাসি মুখটা দেখতে ভালো লাগছে। এই যে এখনো কিচেন রুমের জানালা দিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে দেখল। আশপাশের মানুষজন আসছে যাচ্ছে। তাদের সাথে কী সুন্দর কথা বলছে।

নাবিলা হেসেই চুলার দিকে এগিয়ে গেল। ঝটপট কয়েক কাপ কফি আর হালকা নাস্তার আয়োজন করল। আলাদা করে তৈরি করতে হয়নি অবশ্য, বড় চাচা তাদের জন্য ফল টল থেকে শুরু করে, কোন কিছুই আর বাদ রাখেনি। সব এনে হাজির।

সেই নাস্তাই ট্রেতে সুন্দর করে গুছিয়ে বেরিয়ে এলো। খালিদ ভাই বারান্দায় চেয়ারে বসে ফোনে কথা বলছে। এতক্ষণ অবশ্য বড় চাচা, নাবিলও ছিল। বড় চাচা বসে বসে গল্প করবে, সেই সময় আছে তার? আর নাবিল মাত্রই গোসল করতে গেল। এত এত জার্নিতে এখন গোসল না করলে নাকি আর ভালো লাগবে না।

এত জার্নি কোথায় করল, নাবিলার সেটাও মাথায় এলো না। ফোন করলেই বলেছে, এই তো কাছেই বন্ধুর বাড়ি। এই কাছেই বন্ধুর বাড়ি থেকে এত এত ঘোরার জায়গা কোথায় পেল, কে জানে? আরেকজন তো এসেই পটাং হয়ে শুয়ে পড়েছে। চাচা কিছু খাওয়ার জন্য বেশ কয়েকবার ডাকল, তবে এই বান্দাও আর রুম থেকে বেরোয়নি।

তবে আসমানি খালা এসে তাকে ফিসফিস করে বলে গেল, -- কাহিনি তো আমার কাছে ঠিক লাগে না, আম্মা। হঠাৎ করে গায়েব। তার মধ্যে এসেই এমন সমানে গোসল। তুমি তো এইসব বিদেশি পার্টিগো চেনো না। আমাদের গায়ে একবার একজন এলো। কী ভালো মানুষ। এরে সাহায্য করে, ওরে সাহায্য করে। ওমা, যাওয়ার পর দেখি কাজের বেডি পুয়াতি।

নাবিলা কি বলবে ভেবে পেল না। তবে আসমানি খালা নিজের মতো বলল, -- এহন তো আর সেই যুগ নাই। ঠিক বন্ধুদের নিয়ে ইটিশপিটিশ করে আসছে। আজকাল দিনের পুলাপান পাহাড় ঘুরতে যায়, সাগর ঘুরতে যায়, তার সঙ্গে মাইয়াও নিয়া যায়। তা না হলে এমন গায়েব হয়? সব প্ল্যান করল নোভার গলায় গলায় মিলে, এহন এই মেয়েই বাদ। বুঝো তাহলো? নোভা আম্মা কতবার ভিডিও কল দিছে, তুমি জানো? এই দুই বান্দার একজনও ধরে নাই। আহারে, সঙ্গ দোষে লোহা ভাসে। আমার নাবিল আব্বাটা গেল।

নাবিলা চুপচাপ কিছুক্ষণ তাকিয়ে তাকিয়ে আসমানি খালার হায় হুতাশ দেখল। বাবা, খালিদ ভাইয়ের সাথে সাথে তারাও এসেছে। এসেছে আলাদা আলাদা, তবুও টাইমিং এমন এক হলো কী করে, কে জানে?

নাবিলা আর ওতশত ভাবল না। এত কিছু ভাবতে তার ভালোও লাগে না। তাই এগিয়ে খালিদ ভাইয়ের সামনে টিটেবিলে সুন্দর করে রাখল। রেখে নিজেও বসল।

এতদিনের পরিচয় থাকলেও কখনো এমন সামনাসামনি বসা হয়নি, না কখনো কিছু করার সুযোগ পেয়েছে। তাই বড় যত্ন করেই কফি মগটা এগিয়ে দিল।

খালিদ ফোন রেখেই শান্ত চোখে একবার নাবিলার দিকে তাকাল। মেয়েটার সাথে এত কিছু হয়ে গেছে, তার জানা ছিল না। জানা ছিল না, তার বন্ধুর কোনো অংশও আছে। যদি জানত, দুনিয়া গায়েব করে হলেও আগলে রাখার চেষ্টা করত। তবে সেই সুযোগ সে পায়নি। প্রমাণ পেতেই নাবিলাকে ছাড়ানোর জন্য লেগে গেছে। আর ছাড়াতেই গায়েব।

তেমন কাউকে তো আর চেনে না। তবে ভার্সিটি থেকে তার নানির বাড়ির ঠিকানা পেয়েছিল। কিন্তু গিয়ে লাভ হয়নি। নাবিলা সেখানে ছিল না। আর না কোথায় আছে, কেউ জানে? তবে তখন জেনেছিল, তার বাবার বাড়ি তাদের ওখানেই। তবে কোন বাড়ি,কোন এলাকা, কোনটার খোঁজই বের করতে পারেনি। তার নানির বাড়ির এলাকার মানুষ এলাকার নাম জানে, ঠিকানা জানে না। আর যারা জানে, মানে আদনানরা, তারা সোজা এক কথায়ই বলেছে, তাদের মেয়েকে তার মতো থাকতে দিন।

সে আর মাথা তেমন ঘামায়নি। ভেবেছে, পরিবার আছে। তারা হয়তো সামলে নেবে। তাছাড়া বন্ধু তো আর বেঁচে নেই, মেয়েটা সব ভুলে নিজের মতো ভালো থাকুক।

সেই থাকার মাঝেই নাবিলা নিজে থেকে তার সাথে দেখা করতে এলো। আর যখন পরিচয় দিল, তার ভিমড়ি খাওয়ার জোগাড়। চিরশত্রুর মেয়ে রে বাবা! শুধু তার না। এলাকায় প্রায় অর্ধেক মানুষের সাথে এই মহিলার বনিবনা নেই। তার সাথে তো আরো নেই।

অবশ্য সেই থেকে কখনো আর খোঁচাখুঁচি করেনি। তবুও নাবিলার মায়ের সাথে তার অলিখিত একটা দ্বন্দ্ব সব সময়ই আছে। আর সেই দ্বন্দ্ব আজ আরও পোক্ত হবে। তাই শান্তভাবেই কফি মগটা হাতে তুলে নিল। নিতে নিতে বলল, -- নোভা ঠিক আছে?

নাবিলা কোনো উত্তর দিল না। অপূর্বের কথাটা মনে পড়ল। কেউ যখন কাউকে পছন্দ করে, তার ক্ষতি চাইতে পারে না। আর এই কথার মানে তার বুঝতে সমস্যা হয়নি। তাই চুপচাপ রইল। নিজের জন্য নেওয়া কফিতে চুমুক দিল।

খালিদ সবই খেয়াল করল। সে, যে কোন কাজ স্বাভাবিক ভাবে করতে পারে, তাই আজও স্বাভাবিকভাবেই বলল, -- নোভাকে বিয়ে করতে চাই আমি।

নাবিলার সাথে সাথে কফি মাথায় উঠে গেল। কাশতে কাশতে দম আটকে যাওয়ার জোগাড়। খালিদ নাবিলার হাত থেকে আলতো করে কফির কাপটা নিয়ে নিচে রাখল। রেখে পানির গ্লাস হাতে দিয়ে বলল, -- আমার কোনো অতীত নেই, নাবিলা। যা আছে, সেইটুকু সবই তুমি জানো। জানি, তোমার বোন রাজি হবে না। তার আবার নায়ক মহানায়ক ভাবওয়ালা ছেলে পছন্দ। তবে আমি পিছু ছাড়ব না। আমার তুমি ছাড়া কেউ নেই। তাই সবার আগে তোমাকেই জানালাম। এরপর জানাবো আমার চিরশত্রুকে। তার রিয়েকশনটা আমার দেখার খুব ইচ্ছে।

নাবিলা পানি মুখে দেবে কি? হাতে গ্লাস নিয়েই হাঁ করে তাকিয়ে রইল। তারপর ঢোক গিলে বলল, -- সোহাগকে কি করেছেন আপনি?

খালিদ জিভ কেটে কানে হাত রাখল। রেখে বলল, -- খালিদ খুনখারাবি করে না, নাবিলা। তবে এই দুনিয়ায় টাকা দিয়ে সব হয়। তাই ওই সব নিয়ে তুমি ভেবো না তো।

-- বাবার গাড়ি আপনি নষ্ট করেছেন?

খালিদ হাসল। হেসে বলল,-- একটা কাজে এসেছি, নাবিলা। কাজটা ভালো না খারাপ, এখনো বুঝতে পারছি না। তবে তোমাকে কষ্ট দেওয়ার ইচ্ছে আমার কখনো হবে না। তবে পেলে মাফ করে দিও।

নাবিলা কি বলবে ভেবে পেল না। খালিদ ভাই কি বলছে, সেটাও বুঝতে পারল না। তখনই বড় চাচা এসে বসল। আমুদে স্বরে বলল, -- দেখে টেখে কাজ না করালে, একটা কাজও ঠিক হয় না। সব ফাঁকিবাজের দল।

খালিদ আগের মতোই হাসল। হেসে কথা ঘুরিয়ে বলল, -- তোমার মোবাইল কি হয়েছে, নাবিলা?

নাবিলা নিজেকে সামলে নিলো। হাতের পানির গ্লাসটা রেখে বলল, -- কই, কিছু না তো।

-- ফোন ঢুকছে না। আর আমার নাম্বার, মানে যেটা শেষে সেভেন সিক্স। সেটা তুমি কাউকে দিয়েছ?

নাবিলা ভ্রু কুঁচকে তাকাল। কাকে দেবে সে? তাই শান্ত ভাবেই মাথা দুপাশে নেড়ে বলল, -- উঁহুম।

-- তোমার নাম্বারে কল ঢুকছে না। আমার মনে হয়, আমার নাম্বারটা ব্লক হয়েছে। আর অন্য একটা নাম্বার থেকে কল আসছে। এসেই কথা বার্তা নেই। ঝড়ের মতো তিন, চারটা গালি। সাথে সাথে ফোন কাট। মেয়ে, তবে সব এত তাড়াতাড়ি হয়, কণ্ঠটা ঠিকমত ধরতে পারছি না।

বড় চাচা ঠোঁট টিপে হাসলেন। নাবিলা অবশ্য হাসল না। অবাক হয়ে বলল, -- কী দেয়?

-- গালি। ভয়ংকর টাইপের না। এই হালকা পাতলা। যেমন,- চুন্নি, ধেমরি, থেবরি, শাঁকচুন্নি। মানে দেবে দিক, অন্তত জেন্ডারটা ঠিক রাখা উচিত।

নাবিলা এবার হেসে ফেলল। আসাদুজ্জামানও হাসলেন। হেসে বললেন, -- আসলেই অন্যায়। দেখি, নাম্বারটা দেখাও।

খালিদ দেখাল। নাবিলা নিজেও দেখল। এই নাম্বার তাদের কারও পরিচিত না। তবে নিজের মোবাইল বাড়িয়ে বলল,
-- দেখুন তো, কী সমস্যা?

খালিদ দেখার জন্য নেবে, তখনই অপূর্ব টেনে নিল। সে গোসল টোসল করে পুরো ফিট হয়ে এসেছে। অবশ্য শুধু গায়ের কাপড়ই। বাকি সবই এলোমেলো, গোসল করেছে পানিও মনে হয় ঠিকমতো মুছেনি, হাতা টাতায় ছোপ ছোপ ভেজা। আর চুল, সব সময়ের মতোই ভেজা এলোমেলো।তার মধ্যে এত শীতের মাঝেও খালি পা।

সেই পা নিয়ে নাবিলার পাশের চেয়ারে বসতে বসতে বলল, -- আমি দেখছি। বলেই কফির মগ টেনে নিয়ে চুমুক দিল।

খালিদ কিছু বলল না। সে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ তাকিয়ে রইল। এতদিন খেয়াল করেনি। আসলে সেভাবে খেয়াল করাও হয়নি। অবশ্য দেখাই হয়েছে হাতে গোনা দুবার। তবে চেয়ারে বসতে বসতে একবার চোখ তুলে তার দিকে তাকাল। তার ভেতরটায় কেন জানি একটু ধাক্কা খেল। নাবিলা কি বিষয়টা খেয়াল করেছে? নাকি তার মনের ভুল। অবশ্য শাহরিয়ারের সাথে অনেকটা সময় তার যোগাযোগ ছিল না। তাই মনের ভুলও হতে পারে। আবার নাও পারে। মানুষে মানুষে কিছু কিছু মিল থাকা অস্বাভাবিক না।

আসাদুজ্জামানও কিছু বললেন না। তবে নাবিলা একটু বড় চাচার দিকে চেপে বসল। অপূর্ব পুরো সোজা ভাবে বসেনি, বসেছে গা ছেড়ে, আধশোয়ার মতো করে। পাশাপাশি হওয়ায় মাথাটা তার দিকে ঝুঁকে গেছে। তাই কিছুক্ষণ আগের স্বাভাবিক মুখটা নাবিলার এখন নেই। দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিয়েছে। তার মধ্যে মোবাইলটা টেনে নেওয়ার সময় আঙুলে আঙুল লাগল। নাবিলা সেই হাতটা গুটিয়ে ওড়নার আড়ালে নিল।

গল্প শোনার পর অপূর্বের দিকে আর সে তাকায়নি। তাকাতে ইচ্ছে করেনি। তাছাড়া অপূর্বও তার সাথে আর কথা বলেনি। এই যে সন্ধ্যায় যখন ফিরল। সবার সাথেই কথা বলল, তবে নাবিনা না চোখ তুলে তাকিয়েছে, না সে আগ বাড়িয়ে কথা বলেছে। হয়তো আর বলার মতো ইচ্ছেই নেই।

যাক, ভালোই হয়েছে। নাবিলা এটাই চেয়েছে। দূরে থাকুক। তবে এই মানুষটার প্রতি সে কৃতজ্ঞ। এতদিন বুকের ভেতরে মনে হতো কিছু একটা জমাট বেঁধে আছে। তবে সবাই কে বলার পর থেকে কেন জানি হালকা হালকা লাগছে। বাড়ির অবশ্য কেউ খেয়াল করেনি। নাবিলা গত দু'দিন রাতে ঠিকঠাক ঘুমাচ্ছে।

তবে বোকা নাবিলা, নিজের ভাবনা আর এতটাই গুটিয়ে গেছে যে অপূর্ব কোন কফির মগ টেনে নিয়েছে, সে খেয়ালই করেনি। তবে খালিদ দেখল। দেখে নিশ্চুপই নিজের কফিতে চুমুক দিল।

দেখল আসাদুজ্জামানও। আর দেখেই এই ঠান্ডায় তার কপাল ঘামতে লাগল। তাই নাবিলার রাখা পানির গ্লাসটা এবার তিনি তুলে নিতে নিতে বললেন, -- নাবিলা মা, নোভাকে একটু দেখে আয় তো। ধপাস করে পড়েছে। কোমড়ে চোট কি রকম পেয়েছে, কে জানে। বেশি পেলে আমার কাছে ব্যথার স্প্রে আছে। একটু দিয়ে দে তো, মা।

নাবিলা সাথে সাথে উঠল। সে নিজেও যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। তাই হনহনিয়ে এগিয়ে গেল।

যেতেই আসাদুজ্জামান বললেন, -- এই দুদিন কোথায় ছিলে?

খালিদ খুকখুক করে কাশল। অপূর্বের দৃষ্টি নাবিলার মোবাইলে। সে কিছুই করছে না। এই মেয়ের মোবাইলে দেখার মতো কিছুই নেই। তবুও দেখতে দেখতে বলল, -- বন্ধুর বাড়ি।

-- কোন বন্ধুর বাড়ি?

-- তুমি চিনবে না, বাবা।

আসাদুজ্জামানের কেন জানি বিশ্বাস হলো না। সে মিথ্যা বলে না, আসলেই বলে না। তবে নাবিলার জন্য বলেছে। কিন্তু তার ছেলে তার মতো না। সে যেমন মুগ্ধ করে গল্প বলতে পারে, তার মনে হলো অতি স্বাভাবিকভাবেই মিথ্যাও বলতে পারে।

তাই একবার খালিদ আরেকবার অপূর্বের দিকে তাকালেন। দুই ধুরন্ধর একসাথে এখানে আসাটা কেন জানি তার কাছে কাকতালীয় মনে হলো না।
......

নাজিম কিছুটা ভয়ে ভয়ে রুমে এলো। রোকেয়া বসে আছে চুপচাপ, খাটে আধশোয়া হয়ে। গায়ে খয়েরি রঙের চাদর। অল্প পাওয়ারের বাতির, আধো আলো, আধো ছায়ায় মুখের ভাবভঙ্গি ঠিক ধরতে পারল না। তবে খুব একটা যে সুবিধা না, আন্দাজ করতে পারছে।

না করার তো কিছু নেই। খালিদ রোকেয়ার দুই চোখের বিষ। অবশ্য বিষ হওয়ার মতো তেমন কিছু নেই। নাবিলার ভুলে খালিদের কোনো হাত নেই। সে বন্ধুর জায়গায় দাঁড়িয়ে বন্ধুকে সাহায্য করেছে। নাবিলা নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিয়েছে। আর রইল আগের গাটাগাটি, সেগুলো এক এলাকায় থাকলে হয়ই। তবে হিসেব নিকেশ করলে ঐ গাটাগাটির চেয়ে উপকারের পাল্লাই বেশি।

এই যে কী সুন্দর সব ম্যানেজ করল। পারত তারা? উঁহুম! কেস করে পুলিশের মুখের দিকে তাকিয়ে বসে থাকতে হতো। এলাকায় যতই হাকডুম বাকডুম করো, থানায় গেলে পুলিশের মর্জির ওপর আর কিছু চলে? আর তাদের কাজের ধরন দুনিয়া জানে, এর চেয়ে কচ্ছপের গতি বেশি।

তাই রোকেয়া যাই বলুক, এই ছেলেটা তার ভারি পছন্দ। কাজ টাজ তো ভালোই যে কোনো সময় যখন তখন ফোন দেন। তবে কোনো বাহানা নেই, দৌড়ে আসে। কতবার রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে গেছে। কোনো বিরক্তি নেই, ক্লান্তি নেই, বরং কী সুন্দর হাসিমুখে সঙ্গ দেয়।

এই যে এখানে আসবে, হঠাৎ করেই তার গাড়ি নষ্ট। কী হলো, কিছুই বুঝল না। সুস্থ সবল দোকানের সামনে রেখে দোকানে বসল। মালামালের হিসেব কষল। ওমা, বের হবে তখন দেখে গাড়ি আর স্টার্ট নেয় না।

পড়ল না বিপদে। কিছুক্ষণের মধ্যে রওনা দেবে। আর এখন এই যন্ত্রণা। ব্যস, কোথা থেকে যেন এই ছেলে এসে হাজির। আর একবার হাজির হলে নাজিমের আর কোনো টেনশন থাকে না। খালিদই সব ব্যবস্থা করে। আজও করল। করে গাড়ি গ্যারেজে পাঠাল। সিএনজি ঠিক করে দিল। দিয়ে বলল,

-- চাচা, আপনাদের সাথে একটু কথা ছিল। মানে চাচি আর আপনার সাথে। কবে ফিরবেন আপনারা?

কবে ফিরবে, সেটা আবার কি কথা ? সে বরং সাথে করেই ধরে নিয়ে এসেছে। এমন ধরা নতুন না। অনেকবারই নিয়ে গেছে। তাছাড়া নিজের গাড়ির ব্যাপার আলাদা। রাত করে সিএনজিতে টাকা পয়সা নিয়ে একা একা, তার সাহস হলো না। এমন কত কাহিনি হয়। নির্জন রাস্তায় গিয়ে মেরে টেরে সব নিয়ে গায়েব। তাই নিজের সেফটির জন্যই ধরে এনেছে।

নিজের সেফটির জন্য এনেছে, এদিকে ছোট মেয়ে অন্ধকারে দেখে চিৎপটাং। শুধু চিৎপটাং না, আশপাশের মানুষও এসে হাজির। কী একটা অবস্থা!

অবশ্য এই ছেলের হুলিয়াই এমন। নাজিমের তো ধারণা, সেভ করে চুল দাড়ি কাটলে তিনি খালিদকে চিনবেই না। এই চুল দাড়ির পেছনে আসল চেহারা যে কী, সেটা তার মাথায় কোনোদিনই আসে না।

তাই নিজের স্বাভাবিকতা বজায় রেখেই খাটের আরেক পাশে বসল। বসে বলল, -- শরীর ভালো তো তোমার?

রোকেয়া উত্তর দিল না। শান্ত চোখে তাকাল।
নাজিম সেই শান্ত চোখ দেখে বলল, -- খালিদ কালই চলে যাবে। টেনশন করো না। কাজ আছে ওর। আমাদের মতো বসে থাকে নাকি? ও তো আমি হাত ধরলাম বলেই এলো।

তাছাড়া কী কথাও নাকি আছে। ভাবলাম, রাত দুপুরে একা যাব। ভাই ব্যাংক থেকে টাকা তুলে আনতে বলেছে। রিস্ক না? তাই তো নিয়ে এলাম।

-- কি কথা?

-- সেটা তো জিজ্ঞেস করিনি। আচ্ছা দাঁড়াও, ডেকে নিয়ে আসি। বড় ভাইয়ের সাথে কথা বলছে। বড় ভাই কিন্তু খুব খুশি হয়েছে। আর রাতের খাবারের আয়োজন কী বলতো? এমনিতে ধরে বেঁধে নিয়ে যাই আলাদা কথা। আজ নিয়ে এসেছি নিজের বাড়ি। আচ্ছা, আমি দেখছি। এই সমস্যার সমাধান আমার নাবিলা আম্মাই করতে পারবে।

রোকেয়া কোনো উত্তর দিল না। নোভার চিৎকার শুনেই দৌড়ে বেরিয়েছে। তার মেয়েদের সামান্য থেকে সামান্য জিনিসেও তার পিলে চমকে ওঠে। তার মধ্যে এমন চিৎকার। তার বুঝি আর হুঁশ আছে?

কীভাবে দৌড়ে গেছেন, তিনি নিজেও জানেন না। তবে গিয়ে দেখেন এই বিটলা দাঁড়িয়ে আছে। সে তো কিছুটা অবাক অবশ্যই হয়েছে।

তবে কিছু বলবে তার আগেই আসমানি এগিয়ে নোভাকে তুলতে তুলতে বলল, -- এক জায়গায় আইবেন। একটু মানুষের মতো আসা যায় না? এমন বনমানুষ হইয়া ঘুরেন। মানুষ বিনা কথায় পটল তুলব।

খালিদ আসমানির কথা শুনে হাসল। আজকে অবশ্য গলে যাওয়ার লক্ষণ দেখল না। তবে অতি ভদ্রভাবে বলল, -- ভালো আছেন, চাচি?

রোকেয়া অবাক তখন রাগে পরিণত হয়ে গেছে। হয়েই নাবিলার দিকে কঠিন চোখে তাকাল। নাবিলা নিজেও ততক্ষণে বিস্মিত। মা খালিদ ভাইকে পছন্দ করে না। তাই সব কাজে এগিয়ে এলেও মায়ের সামনে খুব একটা পড়ে না। তবে আজ সোজা এখানে। তাই নোভা যেমন দেখে ভয়ে চিৎকার দিয়েছে, সে হয়েছে অবাক।

সেই অবাক রেখেই কিছু বলবে, তখনই তাদের বাড়ির দুই মাহায়শয়ের আগমন। খুবই স্বাভাবিকভাবে, খালিদকে দেখেও কোনো হাবভাব দেখা গেল না। তবে অপূর্ব দেখেই সব সময়ের মতো সুন্দর করে হ্যান্ডশেক করল।

রোকেয়া নিশ্চুপ তাকিয়ে তাকিয়ে শুধু দেখল। কিছু একটা ঠিক নেই। কী নেই, রোকেয়া বুঝতে পারছে না।

তখনই নাজিম এলো। তার সাথে কে বলার আর অপেক্ষা রাখে না। আর তাকে দেখেই পুরো মোমের মতো গলে গিয়ে বলল, -- বিরক্তির জন্য দুঃখিত, চাচি। দুটো কথা বলব। বলেই চলে যাব।

এই গলা দেখেই রোকেয়ার মেজাজ চড়ে গেল। তবে কোনো সিনক্রিয়েট করল না। স্বাভাবিকভাবেই বলল, -- বসো।

খালিদ বসল। বসে নাজিমের দিকে একপলক তাকিয়ে বলল, -- আমি আমার বন্ধুর সন্তানের কবরটা দেখতে চাই। আমাদের আপন বলে তো আর কেউ ছিল না। এই যে আপনারা আপনাদের আপন মানুষদের জন্য দোয়া করছেন। আর আমি একটু চোখের দেখাটা দেখতে পারব না?

নাজিম চমকাল। খালিদ এই খবর পেলো কি করে? তবে রোকেয়া শান্তভাবেই বলল, -- আর দ্বিতীয়?

-- আমি নোভাকে বিয়ে করতে চাই।

চলবে……

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 34 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন