#বনফুল
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_৩৫
পুরো রুমজুড়ে পিনপতন নীরবতা। এই নীরবতার মাঝে নাজিমের মনে হলো, সে যে কোনো সময় মাথা ঘুরে পড়ে টড়ে যাবে। ঘাড়ে করে যে অ্যাটম বোমা নিয়ে এসেছে, সে যে এমন ফাটা ফাটবে, তার কল্পনায়ও ছিল না। অথচ সব সময় গলে গলে পড়া মোম। এই মোম যে বোম হয়ে যাবে, তা কি আর নাজিম জানে?
খালিদ, নাবিলাকে নিয়ে অনেকে অনেক কথাই বলেছে। আর কেউ না জানুক, সত্য তো তারা জানত। তাই কখনো তেমনভাবে মাথা ঘামায়নি। তাছাড়া নাবিলাকে কী নজরে খালিদ দেখে, তারা ভালো করেই জানত। ভেবেছে, নাবিলার বিয়ে হলেই সব কথা এমনিই মাটি চাপা পড়ে যাবে। তাছাড়া মানুষের মুখ তো আর ধরে ধরে বন্ধ করা সম্ভব না।
তাই পিঠপিছে যা বলার বলুক। তারা থেকেছে তাদের মতো। রোকেয়ার হাজার নিষেধাজ্ঞা থাকলেও সে কখনো অতশত ভাবেনি। এই ছেলে মন খুলে মিশেছে, সেও মিশেছে। নাবিল যে এই ছেলের পুরো নেওটা, সেটাও জানে। তবে ছোট মেয়ের কাহিনি কোন দিক দিয়ে কী হলো,কিছুই তো মাথায় ঢুকছে না।
এজন্যই বলে, বউয়ের কথা পইপই শুনতে হয়। সে শুনে তবে পইপই শুনেছে বলে কখনো মনে হয় না। ঘর থেকে বেরিয়েই সে চলে নিজের মর্জির মতো। তাই তো আজকে এই দশা। রোকেয়া যে তাকে এবার ভর্তা ভর্তা করে ফেলবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
তাই ঢোক গিলে একবার রোকেয়ার, আরেকবার খালিদের দিকে তাকাল। খালিদ বসে আছে আগের মতোই। রোকেয়ার হাবভাবও শান্ত। সেই শান্ত ভাবেই মাঝখানে নাজিম নিজেই এগিয়ে বলল,
-- খালিদ, আমি তোমাকে খুব স্নেহ করি। সেই স্নেহ থেকেই বলছি। নোভাকে আমরা এখন বিয়ে দেব না। ও ছোট মানুষ। দেখছই তো, কেমন পাগল। আরেকটু বুদ্ধি সুদ্ধি হোক। তোমার টাকা পয়সা, নাম গুণের কোনো কিছুই অভাব নেই। কাউন্সিলয়ের মতো মাথার ওপর চাচা আছে। মেয়ের তোমার অভাব হবে না, আমি ভালো করেই জানি। তাই আমার মেয়ে থাক।
আর আমরা জানি না তার কবর কোথায়। পৃথিবীর আলোর মুখ সে দেখেনি। এমন বাচ্চাদের ডাকঢোল পিটিয়ে জানাজা হয় না। আর তখন সময় কেমন ছিল, তুমি ভালো করেই জানো। তাই এসব কথাও থাক।
আসো, বড় ভাই এক হাতে সব সামাল দিচ্ছে। আমরা বরং সেখানে যাই। তোমার চাচির শরীর ভালো না, তুমি তো জানোই। ডাক্তার চিন্তামুক্ত থাকতে বলেছে। অযথা চাপ দিও না।
-- সবই জানি, চাচা। যাকে আল্লাহ নেওয়ার, নিয়ে গেছে। তাকে নিয়ে আলাদা চিন্তার কিছু নেই। তাছাড়া সব কিছুরই একটা নির্দিষ্ট জায়গা থাকে। নদীতে নিশ্চয়ই ভাসিয়ে দেননি।
-- ভাসিয়েই দিয়েছি।
নাজিম আর খালিদ দুজনেই রোকেয়ার দিকে তাকাল। দুজনের একজনও অবাক হলো না। তারা ধরেই নিয়েছে, যখন মুখ খুলবে, এমন কিছুই বলবে।
রোকেয়া সোজা হয়ে বসলেন। অল্পতে রেগে যাওয়ার ব্যাধি আছে তার। আর আজ তো আগুন লেগে যাওয়ার জোগাড়। তবু নিজেকে যথাসাধ্য শান্ত রাখলেন। বাড়িভরা মানুষ। চুন থেকে পান খসলেই পুরো গ্রাম রটবে। এমনিতেই একের পর এক কাহিনি হচ্ছে। এত কাহিনি ভালো লাগে না। তাই শান্তভাবেই বললেন,
-- তোমার সাহস দেখে অবাক হয়ে গেছি, খালিদ। আমার মেয়ের প্রস্তাব রাখো তুমি? সারা জীবন বসিয়ে রাখলেও তো আমি তোমার কাছে মেয়ে দেব না।
-- কেন? জন্মপরিচয় নেই বলে?
-- হাজার কারণ আছে, তবে এই হাজার কারণের মধ্যে এইটাও আছে।
-- ঠিক! থাকারই কথা। আসলে দুনিয়ায় খুব বড় ইস্যু এটা। তাই তো যাদের পরিচয় আছে, মিথ্যা বলে হলেও নিজের কলিজার টুকরোদের চাপিয়ে দেওয়ার দুনিয়ায় আয়োজন একেকজন করে। ভালো না মন্দ খোঁজও করে না। তাই তো তারাও সত্য মিথ্যা যাচাই না করেই উল্টো দৌড় মারে। অথচ যারা মাথায় করে রাখবে, তাদের হাজার দোষ।
রোকেয়ার বুঝতে এক সেকেন্ডও লাগল না। খালিদ কাকে খোঁচা মারছে। তাই রেগেই বলল, --- খালিদ…
-- গায়ে লাগলে দুঃখিত, চাচি। আসলে আমার আর আপনার দুঃখ সেমই। এক দোষে আপনি মেয়ে পাড় করতে পারছেন না, আরেক দোষে আমি নিজে পাড় হতে পারছি না। অথচ দুজনের একজনেরও এতে কোনো হাত নেই।
-- তোমার ভাগ্য ভালো, দূরে আছো তুমি। তা না হলে চাপা ছুটিয়ে ফেলতাম আমি। বেয়াদবের বেয়াদব। আমার দুই মেয়ের এক মেয়ের নামও যদি তোমার মুখে শুনি, ভদ্রতারও ধার ধরব না আমি।
খালিদ আগের মতোই হাসল। সে বসে আছে রুমের আরেক পাশে বেতের চেয়ারে। দাঁড়িয়ে সেই চেয়ারটাই টেনে সোজা রোকেয়ার সামনে রাখল। রেখে আবার বসে বলল,
-- এতটুকু ঠিক আছে, চাচি? মানে এখান থেকে চাপা ছুটাতে আপনার অসুবিধা হবে না তো? আসলে কথা এখনও বাকি আছে তো। অসুস্থ মানুষ আপনি। কষ্ট করে সেখানে তেড়ে যাবেন কেন? যা করবেন, আরামে বসে বসেই করেন। এটা তো মানেন, খালিদ সব সময় আপনাদের ভালোই চেয়ে এসেছে।
নাজিমের মাথা ঘুরে উঠল। ওরে আল্লাহ! কেউ তাকে এই আগুন থেকে বাঁচাও।
রোকেয়া দাঁত চিবিয়ে বললেন,
-- তুমি কি আমার সাথে মশকরা করছ?
-- জ্বি না, চাচি। মশকরা করব কেন? আপনার সাথে কি আমার মশকরার সম্পর্ক নাকি? ভদ্রভাবে ছোট্ট দুটো আর্জি রেখেছি। আমি চাইলে প্রেমের চেষ্টা করতে পারতাম। তবে আমার আবার এইসব পোষায় না ।
তাছাড়া বরই গাছ থাকলে যেমন আসতে যেতে সবাই কম বেশি এক না একটায় ঢিল ছোড়েই, মেয়ে থাকলেও তেমনি। বিয়ের সম্বন্ধ আসবেই। এখানে আমি মশকরার কিছু তো দেখছি না।
এখন ইচ্ছে হলে দেবেন, না দিলে না দেবেন। তবে হ্যাঁ, সেটা আলাদা কথা। যেহেতু আমি ভালো টালো খুব একটা ছেলে না, একটু তো জ্বালাবই। তাই পরে আবার বলবেন না, ভদ্রভাবে কথা বলতে আসিনি।
রোকেয়া রাগে ফুঁসে উঠল। খালিদ সেই ফুঁসে ওঠা দেখে আগের মতোই বলল, -- আচ্ছা, আপাতত বিয়ের কথা থাক। বেড়াতে এসেছেন, বেড়ান। এখন আসি প্রথম আর্জিতে। আসলে এটার জন্যই এসেছিলাম। তবে এর পর তো আর আপনি আমার চেহারাও দেখবেন বলে মনে হয় না। তাই এক ঢিলেই দুই পাখি মারলাম।
তবে চাচি, আপনার কথায় খুব কষ্ট পেয়েছি। ফেরেশতা ছিল, চলে গেছে। ভাসিয়ে দিয়েছেন, এভাবে না বললেও পারতেন। হয়তো আপনার কাছে কিছু না, তবে সে আমার পরিবারের অংশ। দুনিয়া মানুক আর না মানুক, এরাই আমার পরিবার। শাহরিয়ার, নাবিলা , আর এই এক টুকরো চাঁদ। না থাক তারা আমার সাথে । পরিবার হতে হলে এক ছাদের নিচে থাকতে হয় না, এই দুনিয়ায় থাকতে হয় না। ব্যস, এই যে মন, এই মনের মধ্যে থাকতে হয়।
আর সেই চাঁদকে কেউ তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করবে, এটা আমি হজম করতে পারব না। আর সেটা যে'ই হোক। তাই এই অধমের প্রতি একটু দয়া রাখুন, চাচি।
-- হুমকি দিচ্ছো?
-- জ্বি না, চাচি। হুমকি এটাকে বলে না। এটাকে বলে রিকোয়েস্ট। হুমকি হলো এটা, খালিদ ছাড়া আপনার ছোট মেয়ের বিয়ে জীবনেও হবে না। আর আপনি যদি ঠিকঠাকভাবে সব সমাধান না করেন, তাহলে আমি আস্তে করে নাবিলাকে ডাকব। ডেকে একটা প্রশ্নই করব, -- “কেমন মা তুমি, নাবিলা? সন্তানের কবরের খবরটা নেওয়ার প্রয়োজন মনে করোনি?”
আর এই এক প্রশ্নে নাবিলার কী হবে, আপনি ভালো করেই জানেন।
কথা শেষ হতে দেরি , তবে খালিদের গালে ঠাস করে একটা পড়তে দেরি হয়নি। রোকেয়া রাগে কাঁপছে। আরেকটাও দিয়ে ফেলতেন, তবে নাজিম ফেরাল। ফিরিয়ে খালিদের দিকে তাকিয়ে বলল,
-- এই তোমার আমাদের ভালো চাওয়া?
খালিদের অবশ্য তেমন ভাবান্তর হয়নি। থাপ্পড় খাওয়া গালে হাত বুলিয়ে বলল,
-- আমি খারাপ চাইলাম কোথায়, চাচা? ছোট্ট একটা প্রশ্ন করেছি। বলে দিলেই তো ঝামেলা খতম। আমি একটু যাব, দেখে আসব, ব্যস, খতম। সে দুনিয়াতে নেই, তার শেষ ঠিকানাটা বলতে আপনাদের এত সমস্যা কেন? সেটাই তো বুঝতে পারছি না।
-- তুমি এই মুহূর্তে এই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবে।
-- আপনি বললে অবশ্যই বেরিয়ে যাব, চাচি। তবে আগে একটু ক্লিয়ার করেন আপনি। আগুন লাগিয়ে যাব, না সুন্দর করে বিদায় নিয়ে যাব।
রোকেয়া নিজের ধৈর্য হারালেন। এই ছেলেকে তো সে গলা চেপে মেরে ফেলবে। তাই তেড়ে উঠতে চাইলেন। নাজিম রোকেয়াকে ঝাপটে ধরে বলল,
-- আমরা জানি না, খালিদ। সত্যিই জানি না।
-- বেশ, বিশ্বাস করলাম আপনাদের কথা। তো ঠিকানাটা দিন। ওই দেড় বছর সিলেটে কোথায় ছিল নাবিলা? নাকি এটাও জানেন না?
নাজিমের গলা শুকিয়ে এলো। তবে রোকেয়া নিজের তেজ নিয়েই বলল, -- বলব না। যা, যা খুশি কর। একবার শহরে যাই, তোর গলায় কয়টা মামলার মালা পড়াই তুই দেখ।
-- সেটা আপনি পড়াতেই পারেন। আপনাদের তরফ থেকে খালিদের সব কিছুই কবুল। তবে ঠিকনা টা বলেন।
-- বলব না।
-- কেন?
-- কৈফিরত দেব তোর কাছে, রোকেয়া এত খারাপ দিনও আসেনি।
-- বাচ্চা টা কি বেঁচে আছে চাচি?
রোকেয়া একটু থমকালেন। তারপর নাজিমের দিকে তাকিয়ে বললেন, -- একে এই মুহূর্তে যদি এখান থেকে না দূর করো। খুন করে ফেলব আমি।
নাজিম অসহায় চোখে খালিদের দিকে তাকালো। খালিদ বড় একটা শ্বাস ফেলল। এবার আর তার মধ্যে গলে যাওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। তাই শান্তভাবেই বলল,
-- বুঝলে নাবিলা? তোমাকে ধোঁকা শুধু তোমার নিয়তি দেয়নি, তোমার আপনজনেরাও দিয়েছে।
রোকেয়া চমকে দরজার দিকে তাকালেন। নাজিমও চমকে নিজেও তাকাল। তাকিয়েই অবশ্য কাউকেই দেখল না।
তবে খালিদ জানে, নাবিলা এখানেই আছে। তাকে এই পর্যন্ত আনার দায়িত্ব ছিল নাবিলের। সে জানে, নাবিল অবশ্যই আনবে।
তাই খালিদ উঠে দরজার কাছে এগিয়ে গেলো। দরজার পাশ ঘেঁষে জবুথবু হয়ে নাবিলা বসে আসে। নাবিল বোনকে কি সুন্দর আগলে ধরে আছে।
খালিদের দেখতে ভালো লাগলো। তাই এগিয়ে হাঁটু ভেঙে নাবিলার সামনে বসল। তারপর কোমল করে বলল,
-- ভেঙে পড়ো না, নাবিলা। মেয়েরা সব অবস্থায় ভেঙে গুড়ো গুড়ো হলেও মায়েরা কখনো ভাঙে না। যাও, নিজের সন্তানের অস্তিত্ব খুঁজে বের করো।
বলেই খালিদ এগিয়ে সিঁড়ি কাছটায় দাঁড়াল। অপূর্ব বাবুচিদের সাথে মিশে গেছে। সবার সঙ্গে অতি সহজে মিশে যাওয়ার অসম্ভব সুন্দর একটা গুণ এই ছেলের আছে।
তাই সেই দিন রাতে মেসেজ দিতেই সে কলব্যাক করেছে। মেসেজ অপূর্ব দিলেও ফোন তুলেছে নাবিল। আর নাবিলের কাছ থেকে সব শুনল। শুনে তো তার মাথার রগ তখনই ছিঁড়ে গেছে। ইচ্ছে করেছে কুত্তার বাচ্চাটাকে গিয়ে ভর্তা করে ফেলতে।
কিন্তু তখনই অপূর্ব ফোন টেনে নিয়েছে। এই ছেলের মাথা একেবারে ঠান্ডা। ঠান্ডা মাথায় শুধু বলেছে,
-- খালিদ, মৃত্যু কী জানেন? মুক্তি। অপরাধীদের এত সহজে মুক্তি দিতে হয় না। তাদের দিতে হয় শাস্তি। এমন শাস্তি, সে বেঁচে থাকবে, তবে তিলে তিলে মৃত্যুর যন্ত্রণা নেবে।
ব্যস, সেই শাস্তি দিয়েছে তারা খুব সুন্দর করে। দুই ভাই দিয়েছে তাদের বোনের সম্মানের শাস্তি। আর একজন কী?
খালিদ আর ভাবে না। কিছু কিছু বিষয় না ভাবাই ভালো। থাক তাদেরটা তাদের মতো।
তারপরই গিয়েছে নাবিলার বাবার কাছে। সে তো চাইলেই আর ফট করে এখানে আসতে পারে না। আর নাবিলরা এসেছে তাদের পেছনেই এক সিএনজিতে। পুলিশ, চাইলেই তো ঠাস করে কিছু করা যায় না। তাই একটু সময় লেগে গেছে।
অবশ্য সেখান থেকে আবার গিয়েছিল নাবিলার নানার বাড়িতে। নাবিলা সিলেটে কোথায় ছিল, সেটা জানতে। তবে এই ঠিকানা নাবিলার নানি আর নাবিলার মা ছাড়া কেউ জানে না। তাই মুখ খোলানোর জন্য এই রাস্তা। রোকেয়া চাচি দুনিয়া উল্টে গেলেও মুখ খুলবে না। আর যদি খুলে, সেটা করতে পারবে একমাত্র নাবিলা।
তখনই অপূর্ব এগিয়ে এলো। এসে বলল,
-- সব ঠিক?
-- নাবিলা এরপর ভালো থাকতে পারবে?
-- সে এমনিতেই ভালো নেই। নতুন করে আর কী ভালো থাকবে?
খালিদ শান্ত চোখে তাকাল। অপূর্ব নিজের মতোই বলল,
-- এগোতে হলে কোনো পিছুটান রাখতে নেই। কষ্ট কে দমিয়ে লুকিয়ে না, আকাশে উড়িয়ে দিতে হয়। যে উড়াতে পারে, তাকে আর কোন কিছুই ভাঙতে পারে না।
-- বাচ্চাটা বেঁচে আছে?
-- আমি জানি না। তবে আমরা ঠিক জানব। খুঁজলে নাকি এই দুনিয়ায় সব পাওয়া যায়। চলেন দেখি খালিদ, কতটুকু সত্য।
-- আর নাবিলা?
-- তাকে নিয়ে আপনার আর ভাবতে হবে না। অনেকতো করলেন। এবার একটু নিজেকে নিয়ে ভাবেন।
-- আমার নাম্বার ব্লক আপনি করেছেন?
-- হ্যাঁ।
-- কেন?
অপূর্ব উত্তর দিল না। খালিদ অপূর্বর নির্বিকার মুখটা দেখে ঠোঁট টিপে হাসল। হেসে বলল,
-- একটা মেয়ে সমানে গালি দিচ্ছে, জানতে পারি কেন?
-- সোজা গিয়ে রাইট, সেই মেয়ে ঐ রুমেই আছে। ইচ্ছে হলে নিজে গিয়েই জানতে পারেন।
খালিদ অবাক হলো না। নাম্বার ব্লকের কথা মাথায় আসতেই, এটাও ধরে ফেলেছে সে। তাই নোভার রুমের দিকে যেতে যেতে বলল,
-- বললে হয়ত, বিশ্বাস করবেন না। তবে আমার নিজের জন্য যেমন আফসোস হচ্ছে, ঠিক ততটাই আফসোস আপনার জন্যও হচ্ছে।
-- কেন?
-- আপনি বলেন?
অপূর্ব কোনো উত্তর দিল না। সে পকেটে দু’হাত গুঁজে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার দৃষ্টি অবশ্য সামনের দিকে না। যেখানে এতক্ষণ নাবিলা বসে ছিল, ঠিক সেখানে। শীতের কালো ফ্লোরে টুপটাপ করে ঝরে পড়া চোখের পানিগুলো এখনও সেখানে স্পষ্ট। অপূর্ব সেই ভেজা দাগগুলোর দিকেই নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
খালিদ উত্তরের আর আশাও করল না। যার কোনো এক্সপেক্টেশন নেই, তার পাওয়া না পাওয়ার কোনো কষ্টও নেই।
তাই সোজা এগিয়ে গেল। তবে একটু এগোতেই আসমানির সামনে পড়ল। যেন তেন পড়া না। সে এমনভাবে দাঁড়িয়েছে, তাকে টপকে কোনো দিকে না যাওয়া সম্ভব না। আর দাঁড়িয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল,
-- কই যান?
খালিদ কোনো উত্তরের ধার টার ধরল না। বরং হাত বাড়িয়ে ঝট করে একটু নিচু হলো। হতে দেরি আসমানি এক লাফে সাইড হতে দেরি হলো না। চোখ হয়েছে মার্বেলের মতো বড় বড় , মুখ বোয়াল মাছের হাঁ।
খালিদ ঠোঁট টিপে হেসে নিজের পায়ের গোড়ালি চুলকাতে চুলকাতে বলল,
-- দুনিয়ার মশা খালা, দু’দণ্ড শান্তিতে দাঁড়াতেও পারছি না। কিন্তু আপনার হলো কী? এমন লাফিয়ে উঠলেন কেন?
আসমানি উত্তর দিতে পারল না। সে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। কলজে কাঁপছে তার। নোভা আম্মা ঠিকই বলে, এই দাঁড়ি মুছের খাম্বা তো দুনিয়ায় বিটলা। আবার জিগাই লাফিয়ে উঠলেন কেন?
খালিদ আগের মতোই ঠোঁট টিপে হাসল। হেসে নিজের মতোই এগিয়ে গেল। এর ঝটকা পটকা কাটার আগেই কথা শেষ করা দরকার।
নোভা মাত্রই কুঁকাতে কুঁকাতে এপাশ থেকে ওপাশ হয়েছে। ধপাস করে পড়ে, কোমর আর কোমর নেই। অবশ্য আপা স্প্রে দিয়েছে। কালকে বোঝা যাবে কাহিনী কি?
তখনই দরজায় টোকা পড়ল। আর পড়তেই তার মেজাজ তুঙ্গে উঠে গেল। খোলা দরজা, এই বাড়িতে এত ঢংয়ের মানুষ দিন দিন কোথা থেকে আসছে, সেটাই তো বুঝতে পারছে না। তাই ঝাঁঝিয়ে বলল,
-- কে?
-- খালিদ।
নোভা ঝট করেই সোজা বসে গেল। এতক্ষণ কোমরের টানাটানিতে এপাশ থেকে ওপাশও হতে না পারলেও। এখন যে সোজা বসে গেছে, সেই খেয়ালও নেই।
বরং চোখ মুখ তার কুঁচকে গেছে। এই গলা পার্টি এখানে কেন? অবশ্য সে এখন জানে, এই লোক আসলে ওতটাও খারাপ না। তবুও ভিডিওর কথা মনে পড়ল। আর পড়তেই একরাশ সংকোচ জড়তা ঘিরে ধরল। ছিঃ। তাই সাথে সাথেই বলল,
-- আপা এই ঘরে নেই। হয়তো মায়ের রুমে।
খালিদ আর অপেক্ষা করল না। সোজা ঢুকে গেল। নোভা তো টাস্কি খাওয়ার জোগাড়। সেই জোগাড়ের মাঝেই খালিদ স্বাভাবিকভাবে এগিয়ে এলো। এসে ওই রুমের মতো এখানেও চেয়ার টেনে সোজা নোভার সামনে বসল।
নোভা কম্বল গলা পর্যন্ত টেনে সোজা পিছিয়ে গেলো। পারলে খাটের হেডবোর্ড ভেঙে ওপাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়।
খালিদ দেখে বলল, -- বেশি সময় নেব না। এই ধরো পাঁচ মিনিট।
নোভা কিছুই বলতে পারল না। হচ্ছে কী, কিছুই তো তার মাথায় আসছে না। আর তার মাথায় না আসার মাঝেই খালিদ বলল,
-- আমার সম্পর্কে আশা করি এখন সবই জানো। লুকানোর কিছু নেই। আমি এতিম, জন্মপরিচয় নেই। শাহরিয়ার নাবিলাকে বলেছিল, এটা সমস্যা হলে চলে যাও, আমি বিরক্ত করব না।
তবে আমি আবার এত ভালো না। যেটায় আমার হাত নেই, সেটা নিয়ে কিসের এত মাথাব্যথা? তবে যেটায় আছে, সেটা হলো, আমি তোমাকে পছন্দ করি, নোভা। ভালোবাসি কি না বলতে পারছি না। আসলে ভালোবাসা নিয়ে আমার তেমন কোনো অভিজ্ঞতা নেই। অন্য কিছুতেও নেই। অন্য কিছু বুঝেছ? মানে ওই এক্স ওয়াই জেড। পিওর সিঙ্গেল, পিওর ভা....
নোভা এক চিৎকার দিতে গেল। কী বলে এই পাগলছাগল!
খালিদ অবশ্য আগেই জানত। তাই আগেই কাছে এসে বসেছে। তার সাদা ইজ্জতে এই মেয়ে দাগ লাগিয়ে যে দেবে, তাতে কোন সন্দেহ নেই। গলা দিয়েছে আল্লাহ দশ হাত। এই দশ হাত তাকে দেখলেই বিশ হাত করতে উঠে পড়ে লাগে। তাই মুখ খুলতেই ঝট করে মুখ চেপে ধরল। ধরে ধমকে বলল,
-- জন্মের গাধী, বাড়ি ভরা মানুষ। চিৎকার দিলে কী হবে জানো?
নোভা পুরো শক্ত হয়ে গেল। আসলেই তো। তাই হা করা মুখ খালিদের হাতের নিচেই সাথে সাথে বন্ধ করে ফেলল।
খালিদ স্বস্তির শ্বাস ফেলল। ফেলে মুখ থেকে হাত সরিয়ে আগের জায়গায় গিয়ে বসল। তারপর শান্তভাবেই বলল,
-- নোভা, আমার জীবনে হাসির মতো কোনো কারণ নেই। তবে একটা মেয়ের জন্য আমি অনেক সময় প্রাণ খুলে হেসেছি। এই হাসিটা আমার সারা জীবনের জন্য চাই। আমি জানি, আমি কোনো দিক দিয়েই তোমার যোগ্য না। তবে আমি তোমাকে চাই। পছন্দ হলেও চাই, না হলেও চাই। কারণ, এই হাসি এই মেয়েটা ছাড়া দুনিয়ায় আর কারো দ্বারা সম্ভব হবে না। উঁহুম, আর কারো দ্বারা না।
চলবে…