ফন্ট সাইজ:
থিম:
বনফুল

পর্ব 36

লেখক: নূপুর ইসলাম

#বনফুল
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_৩৬

আসাদুজ্জামান ক্লান্ত ভঙ্গিতে বারান্দায় এসে বসলেন। গায়ে ঘিয়ে-রঙের পাঞ্জাবি, মাথায় টুপি। বসলেন ছেলের জন্য, তার ছেলে শেষ সময়ে গিয়েছে গোসল করতে। অথচ জোহরের আজান পড়বে পড়বে করছে। অন্য দিন হলে সমস্যা ছিল না। তবে আজকের দিনটা তো আর পাঁচ দশটা দিনের মতো না। অন্তত তার কাছে তো না-ই।

মায়ের মৃত্যুর পর এই প্রথম নিজ ভিটায় এমন করে আয়োজন করা হলো। না হলে এতদিন যা'ই করেছেন, সবই সীমাবদ্ধ ছিল সেই শহরেই। ছোট করে, সংক্ষিপ্তভাবে।

অবশ্য এমন বড় কিছু করার ইচ্ছে যে আগে কখনও ছিল, তা ও না। নির্ভেজাল মানুষ তিনি। নিয়ম মাফিক জীবনেই সীমাবদ্ধ ছিলেন। কিন্তু যখন থেকে এখানে এসে থাকা শুরু করেছেন, তখন থেকেই মনের ভেতরে এই ইচ্ছেটুকু হতে শুরু করল। আর সেই ইচ্ছেটাই এত তাড়াতাড়ি পূরণ হয়ে যাবে, তা তার কল্পনাতেও ছিল না।

তবে আল্লাহর হয়তো এমন ইচ্ছেই ছিল। তাই তো এত শীতের মধ্যেও সূর্যটা আজ খুব সকালে উঁকি দিয়েছে। উঁকি দিয়েই ঝলমলে রোদ চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। সেই রোদের সাথে সাথে ছড়িয়ে পড়েছে সুস্বাদু খাবারের আয়োজনের ঘ্রাণও।

সেই আয়োজনের শুরুটা হয়েছে এতিমখানা আর মাদ্রাসার বাচ্চাদের আগমনে। জোহরের নামাজের আগে কোরআন খতম দেওয়া হবে, সেই হিসেবেই তারা এসে হাজির হয়েছে। এসেই মিষ্টি মধুর কণ্ঠে তেলাওয়াতের সুরে এতদিনের নিস্তেজ বাড়িটা যেন হঠাৎ মুখর হয়ে উঠেছে।

তবে কোথাও যেন একটু সুতো কাটা। আর কোথায় সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। নাবিল তাকে সবই বলল। আর বলল আসমানি। সে আরো দু'ডিগ্রি উপরে। খালিদ কী কী কাণ্ড করেছে, সবই পাট বাই পাট বলে গেলে। এও বলল, এই ছেলের হাত নিয়ত নাকি কোনটাই ভালো না।

তিনি সব শুনে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে ছিলেন। আসলে কোন ঘটনার কোন প্রতিক্রিয়া দেবেন, বুঝে উঠতে পারেননি। তবে নাবিলার জন্য বুক জমাট বেঁধে আছে।
সেই জমাট থেকেই সারা সকাল সন্ধ্যা মন ফুরফুরে রেখে সব কাজ উড়ে উড়ে করলেও, এরপর কেন জানি আর শরীর চলল না। ছোট ভাইয়ের হাত ধরে চুপচাপ বসে রইলেন।

দু’ভাই একই মায়ের ঔরস থেকে হলেও, দুজন ভিন্ন জগতের। বড়বেলায় ভালো, ছোটবেলায়ও গলায় গলায় কখনও ভাব ছিল না । তাই তো আজ এই চঞ্চল, সবকিছুতে উদাস, ছন্নছাড়া ভাইটাকে নিজের চেয়েও অনেক অনেক বড় মনে হলো।

কিন্তু কাজ তো কাজই। এক আয়োজনে হাত দিয়েছেন, মাঝপথে ছেড়ে দেবেন কী করে! তবে কাজ নিয়ে আর তাকে মাথা ঘামাতে হয়নি। তার দুই ছেলে সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। আর তাদের সাথে নিয়েছে খালিদ।

তাদের বাড়ির কোনো কাজ দেখবে আর এই ছেলে এগিয়ে আসবে না, এমন ঘটনা নেই। অন্তত এই তিন চার বছরে এমন হয়নি । অবশ্য সব কাজ গুছিয়ে সকালেই এই ছেলে গায়েব।

আসাদুজ্জামানের শুনেই এমন মন খারাপ হলো। মন খারাপ থেকেই যা কখনো করবেন বলে কল্পনাও করেননি, সেটাই করলেন প্রথমবার। নাবিল অপূর্ব দুটোকেই দিলেন এক ধমক।

প্রথমবার ছেলেটা তাদের বাড়ি এসেছে। তাও নিজে থেকে না। কারণ যাই থাক, যাই হোক, এভাবে চলে যাবে কেন? তারা কি করেছে? ছেলেটাকে জোর করে হলেও তো রাখবে, নাকি?

নাবিল জানালো, তারা করেছে। তবে তার ছেলের তেমন ভাবান্তর হলো না। বরং হেসে নিজের মতোই বলল,

-- ছোট মেয়ে বাঁচাতে চাইলে, দূরে দূরেই রাখো।

-- বাঁচাতে চাইলে কী? আমরা না দিলে জোর করে নেবে?

-- নিতেও পারে। যে নিজেই গলা ছেড়ে বলে, আমি ভালো না। তো, তার তো আর খারাপ নিয়ে মাথাব্যথা থাকার কথা না।

-- এতই সোজা সব কিছু?

-- উঁহু। তবে মেয়ে সেধে গেলে, কারও সাধ্য আছে ধরে রাখার?

-- সেধে যাবে মানে?

-- মেয়েদের একটা সমস্যা কি জানো, বাবা। তাদের তুমি দুনিয়া দিয়েও ভুলাতে পারবে না, দুনিয়া দিয়ে বাঁধতে চাইলেই, বাঁধতে পারবে পারবে না। কিন্তু নিজের দুঃখ, কষ্ট আর অপূর্ণতাগুলো যদি তাদের হাতে তুলে দাও, তারা সেগুলো বড় মায়া করে আগলে ধরবে। এই ধরার মায়াময় গুণটা উপরওয়ালা বিশেষ ভাবে তাদের দিয়ে দিয়েছেন। সামনের মানুষটা ভালো না মন্দ, সুন্দর না অসুন্দর, সেসব তারা তখন আর দেখেই না। তারা শুধু এটুকুই দেখে,
কেউ একজন তাকে নিজের পুরো দুনিয়া বানিয়েছে।
আর যে মেয়েটা কারও দুঃখ কষ্টের পুরো দুনিয়া হয়ে ওঠে,
সেই দুনিয়াকে তারা কোনো দিনই উপেক্ষা করতে পারে না। নাবিলা পারেনি, নাবিলার ছোট বোনও পারবে না।

এই কথা শুনে আসাদুজ্জামানের গলা আরও শুকিয়ে এলো। সেই আসা থেকেই নাবিলাকে একবার উঁকি দিয়ে দেখলেন। সে কাল রাতে আর নিজেদের রুমে যায়নি। রোকেয়ার রুমেই পুরো স্তব্ধ হয়ে আছে। না ঘুম আছে, না খাওয়া। তবে এতদিন পর কী বা করবেন তারা?

তাকে দেখে আবার নোভাকে দেখতে গেলেন। সে জেগেই আছে। তাকে দেখেই দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরল। ধরে ঝরঝরিয়ে কেঁদে বলল,

--- আমার খুব কষ্ট হচ্ছে, বড় চাচা। আমি'ই সহ্য করতে পারছি না। আপুর কেমন লাগছে? তোমরা বাবুটাকে খুঁজে আনো, বড় চাচা। এই বাবুটাকে নিয়ে আমরা অনেক দূরে চলে যাব। সেখানে তো আর কেউ কিছু জিজ্ঞেস করবে না, জানবেও না।

আসাদুজ্জামানের নিজের চোখও ভিজে এলো। তবে তখনই তিনি ঝট করে বুঝে গেলেন, খালিদ কেন সকাল সকাল চলে গেছে। আর হান্ড্রেড পার্সেন্ট গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারেন। দোয়া এক দিয়ে শেষ হবে, নাবিল আর অপূর্বও খালিদের মতো গায়েব হয়ে যাবে। আর কেন হবে, তিনি হয়ত বুঝতে পারলেন।

কিন্তু রোকেয়াকে নিয়ে একটু ভয় ছিল। মহিলাদের তেমন কাউকেই বলা হয়নি। কিছু পরিচিত আশপাশের মুখ আছে, তাদের না বললেই না। তাই তাদের জন্য আলাদা করে বসার ঘরে বসানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে।

যতই খাবার দাবার ভালো হোক। বাড়ির কর্ত্রী বলো আর বউ, সেটা একমাত্র রোকেয়াই। আর সে যদি রুমে চুপচাপ বসে থাকে, কেউই আর ভালো কিছু বলবে না।

কিন্তু রোকেয়া তার সব ভয় দূর করে, মহিলারা আসতেই বেরিয়ে এসেছে। বাড়ির বউয়ের যে দায়িত্ব, মুখে হাসি না থাকলেও ঠিকই পালন করছে। পালন করলেও তার ইচ্ছে ছিল, তার পরিবারের প্রতিটা সদস্য একসাথে রবের দরবারে হাত তুলবেন। সেটা হয়তো আর সম্ভব হবে না।

তখনই অপূর্ব বেরিয়ে এলো। গায়ে তার সেই দিনের পাঞ্জাবি। ভিজে ছোপ ছোপ হয়ে আছে। গোসল করে পরিপাটি ভাবে গায়ে কাপড় দিতে এই ছেলের কী সমস্যা কে জানে! তবে আজও দেখে মনে মনে তিনি মাশাল্লাহ বললেন। যেভাবেই থাকুক, তাকালেই কেন জানি চোখ লেগে যায়।

অপূর্ব এসেই বলল, -- তুমি ছোট চাচা নাবিলকে নিয়ে বেরোও, আমি এক মিনিট আসছি।

আসাদুজ্জামান হাল ছেড়ে বললেন,
-- আবার কোথায়?

-- তুমি বেরোও। বেরোতে বেরোতেই দেখবে, আমি এসে গেছি।

আসাদুজ্জামান আর কথা বাড়ালেন না। নাজিমের খোঁজে গেলেন। অপূর্ব তার ভেজা এলোমেলো চুলগুলো আরও একটু এলোমেলো করতে করতে নোভার দরজায় টোকা দিল। নোভার মেজাজ এখন আর তুঙ্গে উঠল না। বরং হাল ছেড়ে বলল, -- কে?

-- ভাইয়া।

নোভা ভেতর থেকেই মুখ বাঁকিয়ে বলল, -- ছায়ের মাথার ভাইয়া।

-- কেন?

নোভা উত্তর দিল না। তার মন ভালো নেই। তারমধ্যে এই খালিদ বেটা কী বলে গেল, সব তার মাথার ওপর দিয়ে গেছে। সেই যাওয়ার মধ্যে আবার কিছুক্ষণ আগে এক মেসেজ পাঠিয়ে দিয়েছে। সেখানে লেখা,

“একটু ভুল হয়ে গেছে, নোভা। আসলে রাতে যখন নাবিলার সব কথা শুনে নাবিলের হাতে মুখ গুঁজে ভেউভেউ করে কাঁদলে, তখন দূর থেকে দেখে বুকের ভেতরটা এমন মোচড় দিল, তখনি বুঝলাম। আসলে পছন্দ না, শিওর ভালোবাসা।”

এই মেসেজ পড়েই সাথে সাথে সে মোবাইল বন্ধ করে বসে আছে। আর ঠিক করেছে, জীবনে আর ভেউভেউ করে কাঁদবে না। কাঁদবে না বলেই নোভার আবার চোখে পানি এসে জমলো। তার আপার কাছে যেতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু সাহস হচ্ছে না। গেলেই যদি হাউমাউ করে কেঁদে দেয়!

-- নোভা।

-- হুম।

-- একটা কাজ দেবো, করবে?

নোভা সাথে সাথে সোজা বলল,
-- না।
-- কেন?
-- একজনকে বকা দিতে দিতে মুছে ছালি পড়ে যাচ্ছে। আবার এসেছেন। আমি আর আপনারা কোন কিছুতেই নেই।

-- প্লিজ…

-- না।

-- এবারই শেষ।

নোভা আর উত্তর দিল না। অপূর্ব দরজার ওপাশ থেকেই বলল, -- মানুষকে সব সময় বর্তমান দিয়ে বিচার করতে হয়, নোভা। অতীত, রক্ত, বংশ, এই সব কিছু দিয়ে না। এই সব কখনও মানুষকে সুখ, শান্তি দিতে পারে না। না পরে ভালো রাখতে।

নোভা বুঝতে পারল না। ভ্রু কুঁচকে বলল,
-- মানে?

-- আমি জানি, তুমি ব্রেভ গার্ল। সময় এলে ঠিক বুঝে যাবে। এখন আমি নামাজে যাচ্ছি। আমার বাবার ইচ্ছে, তার পুরো পরিবার একসাথে মোনাজাতে হাত তুলবে। বাকি সবাই তুলবে, আমি জানি। তবে একজন তুলবে না। তুমি একটু তার কাছে যাবে?

নোভা উত্তর দিল না। কার কথা বলছে, সে জানে।

অপূর্ব আর দাঁড়ালো না, চলে গেল। যেতেই নোভা বাথরুমে গেল। অজু করে সাদা ওড়নায় পুরো মুখ মুড়িয়ে তাদের আপার কাছে গেল। যাওয়ার আগে ভালো করে চোখ মুখ মুছল। মুছে গিয়েই, সে যে সেইদিন দাঁত ব্যথায় মরার মতো পড়ে ছিল, আর সে এক ঝাঁকি দিয়ে তুলেছ, ঠিক সেই দিনের মতোই আজকে এক ঝাঁকি দিল।

আর কেউ না জানুক, নোভা তো জানে। তার আপা তাদের জন্য সব কিছুতেই ঠিক থাকতে পারে। এক সাগর দুঃখ নিয়েও পারে।

....

রোকেয়া সবার মাঝে বসে আছে চুপচাপ। কিছুক্ষণের মধ্যেই দোয়া মোনাজাত হবে। তবে তার মন পড়ে আছে মেয়েটার ওপর। সেই যে চুপচাপ হয়েছে আর একটা শব্দও বলেনি।

তখন খালিদ বেরোতেই রোকেয়া এক দৃষ্টিতে তার মেয়ের নিস্তেজ, বিধ্বস্ত মুখটা দেখলেন। ভাইয়ের হাত ধরে সোজা তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। তার সাথে দেখলেন ছেলের কঠিন মুখ। আজ মায়ের ভয় নেই, উনিশ বিশ হলে টাকা বন্ধের টেনশন নেই। আজ শুধু বোনের শক্ত এক লাঠি। যেই লাঠি বোনের জন্য আঘাত করতেও পিছ পা হবে না।

রোকেয়ে সেই কঠিন মুখটা দেখেই একটু হাসলেন। না, এখন আর কোনো রাগ জেদ নেই। ভয়ও নেই। রোকেয়া ভয় পায় না। তবে এই সন্তানগুলো তার খুব প্রিয়। হাজার লাঞ্ছনা, হাজার কষ্টের মাঝে এই সন্তানগুলোই তার একটু শান্তি। মারেন, বকেন, যাই করেন, তবে এই সন্তানগুলোর জন্যই তিনি ভালো থাকেন। তাই বিধ্বস্ত মেয়ের দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন।

নাবিলা মায়ের বাড়ানো হাতটা সাথে সাথে আঁকড়ে ধরল। ধরেই ফুঁপিয়ে উঠল। উঠে বলল,

-- আমাকে বলো মা। সব বলো। কী জানি না আমি?

রোকেয়া মেয়েকে আগলে নিজের পাশে বসালেন। এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে, কাঁপতে থাকা শরীরটা বুকে জড়িয়ে নিলেন। তবে মুখ দিয়ে শব্দ বের করতে পারলেন না। মৃত্যুর আগে মা নিজের মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন, "আমি বাঁচব না, রোকেয়া। আমার সময় শেষ। তবে তুই আমার এই অর্ধমৃত শরীরটা ছুঁয়ে কসম করে বল, নাবিলা কখনও এই সত্য জানবে না। "

নাবিলা জানে নি। রোকেয়া সেই কসম অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে৷ একটু সুখের আসায় কত মিথ্যা বলেছে। ভালো একটা ছেলে খুঁজেছে। যে তার মেয়েকে আগলে রাখুক, যার ভালোবাসায় মেয়েটার সব কষ্ট মুছে ফেলুক। তবে মিথ্যার খুঁটি সব সময়ই নড়বড়ে। সে বুঝেনি, মেয়েটা বুঝেছে, তাই তো এত কিছু।

নাবিলা কাতর স্বরে ডাকে, -- মা...

রোকেয়া এবারো উত্তর দেয় না। নাবিলার দেখে ভেতর ভেঙে চুড়ে আসে। সেই ভাঙা সুর নিয়েই বলে,

-- আমার কিছুই নেই, মা। একেবারে নিঃস্ব একটা মানুষ আমি। সব মানুষের হাজার হাজার কষ্ট থাকলেও, অন্তত নিজের সম্মানটা থাকে। আমারও সেটুকুও নেই। এই নিঃস্ব মানুষটা তোমার কাছে হাত পাতছে মা। সত্যটা আমাকে বলো। যতো কষ্টের হোক, বলো। আমি শুধু চুপচাপ শুনব। কোন অভিযোগ, কোন রাগ, কোন জেদ করব না। শুধু শুনব।

রোকেয়া সহজে কাঁদে না। সব কষ্টকে দমিয়ে নিজের ভেতরে দাফন করতে পারে। পারে বলেই এতকিছুর পরও সোজা দাঁড়িয়ে আছে। তবে আজ তার চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ল।

নাবিলা সেই পানি পাগলের মতো দু’হাতে মুছল। তার এই এক জীবনে কাউকে সে কিছুই দিতে পারেনি। দিয়েছে শুধু কষ্ট আর কষ্ট। তাই মুছতে মুছতে বলল,

-- কেঁদো না মা। তোমার এই চোখের পানি আমি সহ্য করতে পারব না।

রোকেয়া হাসল। বড় কষ্টের সেই হাসি। হেসে বলল,
-- সামান্য এই চোখের পানি সহ্য করতে পারিস না? আর মা হয়ে আমি কতকিছু সয়েছি? একজন মায়ের চোখের সামনে সন্তানের ধ্বংস দেখা কতটা কষ্টের, সেটা জানিস তুই?

-- না মা, জানি না। এই জানার ভাগ্যটুকু আমার হয়নি। কাউকেই দোষী করি না আমি। শাহরিয়ার, নানি, তুমি কাউকেই না। ব্যস, দোষী নিজের এই কপালকে। তবে মা, তোমরা সবাই যার যার ভালো চাইতে গিয়ে আরেকজনের সন্তানের সাথে অন্যায় করে ফেলেছো। আমি তো খারাপ মা-ই। নিজের সন্তানের খেয়াল রাখতে পারিনি। তবে তোমার বিপদে তোমার সন্তানকে তোমার মা আগলে রেখেছিল। তুমি কেন সেই মা হতে পারোনি?

-- কারণ আমি সেই মা হতে চায়'ই নি। আমি যেমন তেমনি ঠিক আছি। তবে যার মতো মা হতে তুই বলছিস, সবচেয়ে বড় অন্যায়টটা সেই করে ফেলেছে নাবিলা। ভালোবাসা যে বড় অন্ধ। এই অন্ধ যে হয় তার কাছে ন্যায় অন্যায় বলে কিছু নেই।

নাবিলা বিস্মিত চোখে তাকাল। রোকেয়া নাবিলার সেই বিস্মিত মুখটা দেখলো। দেখে বলল, -- আমরা কেউই খারাপ না নাবিলা। ব্যস, যার যার জায়গায় থেকে ঠিক।

নাবিলা আবার মায়ের হাতটা আঁকড়ে ধরে,বিস্মিত সুরেই হড়বড় করে বলে,
-- বলো মা। কী করেছে নানি? আমার সন্তানের সাথে কী করেছে সে?

রোকেয়া নাবিলার হাত আস্তে করে ছাড়িয়ে নিল। নিয়ে নিজের নিস্তেজ শরীরটা টেনে উঠে দাঁড়াল। তারপর ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে মাথায় একটু হাত বুলিয়ে নিশ্চুপ বেরিয়ে গেলো।

তবে নাজিম গেল না। বউয়ের কোনো ভয় আজ তাকে ভীতু করল না। অনেক হয়েছে আর কত? তাই নিজের চোখের পানিটুকু মুছলেন। মুছে এগিয়ে মেয়ের পাশে বসে হাত টা শক্ত করে ধরলেন। ধরে নাবিলা যা জানে না, সব বললেন। বললেন নাবিলার ফুটফুটে মেয়ের কথা, বললেন তার নানির কসমের কথা। তারপর নাবিলের দিকে তাকিয়েই সিলেটের ঠিকানা বললেন। বলে মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন, -- আমাদের মাফ করে দিস মা। মাফ করে দিস।

নাবিলা আর একটাও শব্দ বলতে পারল না। চোখ থেকে পানি গড়াল না। বাবার হাতটুকু ধরে শক্ত হয়ে বসে রইল অনেকক্ষণ। তারপর নিস্তেজ কণ্ঠে বলল,
-- ও কি বেঁচে আছে বাবা?

-- আমরা জানি না মা।

-- আমার সবাই ছিল, তবুও বাবা মায়ের উষ্ণ চাদরে বড় হওয়া হয়নি। কারণ যাই থাক, হয়নি। শাহরিয়ার জানেই না, বাবা মা কী। আমার সন্তানের ভাগ্যও একই হলো। তার ভাগ্য একটু ভিন্ন হলে কী হতো বাবা?

নাজিম উত্তর দিতে পারলেন না। মেয়েকে বুকে আগলে নিয়ে চুপচাপ বসে রইলেন। নাবিল চোখের পানি নিয়ে বাবা, আর বোনকে দেখলো। দেখে নিজের মতো বেরিয়ে গেল।

তারপর রোকেয়া আর রুমে যায়নি। বলতে গেলে যাওয়ার সাহস হয়নি। ভাঙতে ভাঙতে মেয়েটা শেষ। আর এই ভাঙা দেখতে দেখতে তারা শেষ।

তখনই তার ধ্যান ভাঙল আসমানির কণ্ঠ শুনে। মোবাইল হাতে ধরিয়ে নিচু করে বলে গেলো,
-- আপনের বড় ভাবি সমানে ফোন দিতাছে। ধরেন, কোন কাহিনী কে জানে?

রোকেয়ার কথা বলতে ইচ্ছে করল না। তবুও ফোন নিয়ে রিসিভ করলেন। করতেই বড় ভাবি ওপাশ থেকে আমুদে স্বরে বলল,
-- রোকেয়া, আজকের খবর টবর দেখেছো? বিরাট এক কাহিনী ঘটে গেছে। এজন্যই বলে, পাপ বাপকেও ছাড়ে না। এখন দেখো আল্লাহর বিচার।

রোকেয়া আগা মাথা কিছুই বুঝতে পারল না। তবুও শান্তভাবে বলল, -- কী হয়েছে ভাবি ?

-- তোদের ওখানে পত্রিকা যায় না নাকি? না গেলে মোবাইল দেখো। মোবাইলে নিউজ ছড়িয়ে আছে।

-- কিসের নিউজ?

-- ওই বেজন্মা ইন্সপেক্টর আবদুল বাশার। কি হয়েছে জানো? মাঝরাতে ময়লার এক ভাগাড়ের পাশে তাকে পাওয়া গেছে । কেউ ছেঁচা মার দিয়ে ভর্তা করে ফেলেছে। যেই বদমাইশ কত মানুষের জীবন বরবাদ করেছে কে জানে? এমন ক্ষোভ বের করেছে দুই হাতে হাড্ডি কিছু আর অবশিষ্ট নেই, সব গুড়াগুড়া। সেটা যেমন তেমন, ওই পার্টও গুড়াগুড়া। পুরো ভর্তা বুঝোছো। বাকি জীবনে আর কিছু করতে পারবে না। তবে জানে মারেনি।
সকালে জ্ঞান ফিরেছে, কিছুই বলতে পারছে না।
কোন আত্মীয়ের বিয়েতে নাকি গিয়েছিল। রাতের অনুষ্ঠান। দুনিয়ায় মানুষ। কে কী করেছে, কে জানে। মাথা নাকি হালকা ঘুরছিল, তাই বউ বাচ্চা রেখে একাই বাড়ি ফিরছিল।

তখনই চোখের পলকে মাথায় কালো কাপড়। তারপর শুধু ঘন্টা আর ঘন্টা। কোথায় নিয়েছিল, কে করেছে, কিছুই বলতে পারছে না। তবে শাস্তিটা পেয়েছে একেবারে মনমতো।

রোকেয়া আর কথা বলতে পারল না। স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। দুইয়ে দুইয়ে চার মেলাতে সময় লাগল না। আর লাগল না বলেই, প্রথমবার মনে হলো তার ছেলে বড় হয়ে গেছে। প্রথমবার মনে হলো অপূর্ব ছেলেটা সত্যিই অপূর্ব। আর প্রথমবার মনে হলো, খালিদ নামের বেয়াদব ছেলেটা আসলে অতটাও বেয়াদব না।

ঠিক তখনই বাইরে থেকে মোনাজাতের দোয়া ভেসে এলো। সবাই একসাথে রবের দরবারে হাত তুলল। রোকেয়াও তুলল সাথে সাথে। শুকরিয়া জানাতে দেরি হয়ে না যায় । তার চোখে পানি, শান্তির, তৃপ্তির, আনন্দের।

তার সাথে অন্য রুমে থেকে কাঁপা কাঁপা হাতে নাবিলাও হাত তুলল। হাত তুলল নোভা। আসাদুজ্জামান জানেন না, তার ইচ্ছে পূরণ হয়ে গেছে। তার পুরো পরিবার একসাথেই হাত তুলেছে। আর সেই হাতের মাঝেই একজোড়া হাত আজও একটাই দোয়া চাইল, -- "তার চোখের প্রতি ফোঁটা পানি সুখের সাগরে পরিণত হোক। "

চলবে......

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 36 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন