#বনফুল
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_৩৭
কাজী পাড়ার আজকের সকাল শুরু হয়েছে ঝিলমিল রোদের ঝিকিমিকিতে। শীতের প্রকোপ নেই বললেই চলে। সেই রোদের আলোয় হরেক রঙের ইট পাথরের বাড়িগুলো যেন আড়মোড়া ভেঙে, ঘুম জড়ানো চোখে দাঁড়িয়ে আছে। তার সাথে মিশে আছে চিরচেনা রিকশার টুংটাং শব্দ, সবজিওয়ালার হাঁকডাক, হকারদের ব্যস্ততা আর মানুষের নিত্যকার কোলাহল।
সেই কোলাহলের মাঝেই চোখ মুখ পুরো কুঁচকে নোভা ভোঁতা মুখে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো। গায়ে বেগুনি রঙের সালোয়ার স্যুট। চুলগুলো শক্ত করে বাঁধা পনিটেলে, কাঁধে ফুলছাপের টোট ব্যাগ। সেই ব্যাগ নিয়েই সব সময়ের মতো হেলে দুলে এগিয়ে গেল।
আজকাল তাদের মরা বাড়ি আরও মরা। কোনো আনন্দ নেই, কোলাহল নেই, মায়ের রাগ নেই, আসমানির খালার ঘরবাড়ি ভেঙে চুরে কাজ নেই, তাদের প্রিয় আপার ভূতের মতো ঘোরাও নেই। ব্যস, সবাই খাচ্ছে, ঘুমাচ্ছে, প্রতিদিনের নিয়ম মাফিক কাজ করে যাচ্ছে। সেই কাজও যেন বড় বিষণ্নতায় চাদরে মোড়ানো।
আর এই বিষণ্নতার চাদরে মুড়িয়ে গেছে সেই রাত থেকে। সেই রাতের পর সকাল তো হয়েছে, তবে তাদের জীবনের অন্ধকারের ঘোর এখনও কাটেনি। বরং আরও যেন আঁটসাঁটভাবে জড়িয়ে আছে।
আর এই জড়ানোতে কারও ভালো থাকার কথা না। নোভাও নেই। তবুও বাড়ির প্রতিটা মানুষ ভালো থাকার কি নিপুণ অভিনয়। আর এই ভালো অভিনয় করতে পারলেই তো, এই যে একেবারে ভেঙে চুরে শেষ হয়ে যাওয়া মানুষটা, এই মানুষটাকেও ভালো রাখা যাবে।
তাই তো মা সব সময়ের মতো মেয়েকে আগলে রাখছেন। এবার অবশ্য শুধু মা না, বাড়ির সবাই। বড় চাচা নিয়ম করে আপার পাশে বসেন। আশ পাশ তো ভালোই পত্রিকার টুকটাক খবর নিয়ে আলোচনা করেন। বাবা সুযোগ পেলেই ফিসফিস করে এটা ওটার অভিযোগ জমা দিয়ে আসেন। আসমানি খালা আগের মতোই এক হাতা তেলের চিকিৎসা দিব্যি চালিয়ে নিচ্ছেন। আর সে পুরোই আপার রুমে শিফট হয়ে গেছে। কথা বলতে বলতে মাথার পোকা নাড়িয়ে দিচ্ছে। তবে আপা সেই আপাই। ঐ যে সেই দিন রাতে চুপচাপ হলো, সেই রাতের মতোই একদম চুপচাপ, নিশ্চুপ।
সেই দিন মানুষের কোলাহল, ব্যস্ততা আর দৌড়াদৌড়িতে বড় চাচার বিশাল বাড়িটা সারাদিন মুখরিত থাকলেও, দুপুর থেকে বিকেল হলো, বিকেল থেকে সন্ধ্যা। তারপর ধীরে ধীরে সবই ফিরে এলো সেই পুরোনো খোলসে। আর ফিরতেই মা শান্তভাবে সবাইকে জানালেন কাল সকালেই তারা ফিরে যাবে। যা গোছগাছ করার, করে নাও।
কেউ কোনো আলাদা প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। সবার ভাব এমন, যেন জানত এমনই হবে। তাছাড়া আপার অবস্থা ঠিক নেই। খাওয়া নেই, ঘুম নেই, রাগও নেই, জেদও নেই। ব্যস, পুরো চুপচাপ হয়ে গেছে। সেই চুপচাপের মাঝেই শুধু নাবিলের হাতটা আঁকড়ে ধরে বলেছে,
-- আমি সিলেট যেতে চাই। আমার সন্তানের খোঁজ বের করতে চাই। যে অবস্থায়ই থাক। আমি শুধু জানতে চাই, তার সাথে কী হয়েছে। নিবি না আপাকে?
এভাবে মানুষ বাঁচে? আবার সন্তানকে খুঁজে বের করা! কিন্তু জোর দিয়ে কিছু বলার সেই অবস্থাও কারো নেই। তবে নাবিল আপার মাথায় হাত রেখে বলেছে, -- অবশ্যই নেবো। ব্যস, একটু সময় দাও। বিশ্বাস আছে না ভাইয়ের ওপর? সেই বিশ্বাসটুকু রাখো। ততদিন নিজের খেয়াল রাখো, আপা। এভাবে না খেয়ে বসে থাকলে, তুমি ভালো করেই জানো কিছুই সম্ভব না।
আপা আর কিছু বলেনি। আগের মতো পুরো চুপচাপ হয়ে গেছে। গাড়ি তো তাদের ছিলই। সকাল হতে না হতেই তারা ফিরে এসেছে। তবে বড় চাচা এসেছেন দুদিন পরে। সব গোছগাছের ব্যাপার আছে, চাইলেই ফট করে আসা যায় না।
তবে বাড়িটার প্রতি নোভার আলাদা একটা মায়া পড়ে গেছে। তাই ফেরার সময় এতো খারাপ লাগল। অবশ্য আপার খারাপের কাছে এই খারাপ কিছুই না।
তাই বাসায় ফিরতেই মা সবার আগে আপাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে দৌড়ে গেলো। যদি আগের মতো হয়ে যায়। আগে পুরো উন্মাদের আগে এমনই তো পুরো চুপচাপ হয়ে গিয়েছিল।
তবে এখনও তেমন কিছু হয়নি। পুতুলের মতো আছে, যে যা বলছে, করছে। খাবার দিলে খাচ্ছে, না দিলে নেই। সারাদিন চুপচাপ। আগের মতো রঙ-তুলির আঁকাবুকি নেই, বই পড়া নেই, গান শোনা নেই। শুধু মূর্তির মতো চুপচাপ বসে থাকা। তবে মাঝে মাঝে হঠাৎ জিজ্ঞেস করবে, -- নাবিল ফিরেছে?
নাবিল ফেরেনি। বাড়ির দুই পুত্র আজ সপ্তাহের ওপর বাড়ি নেই। সেই দিন রাতেই তারা বেরিয়ে গেছে। আর বেরিয়েই পুরো গায়েব। অবশ্য এবারের এই গায়েব হওয়া নিয়ে কারও কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। চোখ থাকতেও যেমন মানুষ অনেক কিছু দেখে না, তেমনি এই বাড়ির মানুষগুলোর চোখেও যেন অদৃশ্য এক কাপড় বাঁধে ফেলেছে। দেখছে, শুনছে, তবে কোনো অনুভূতি নেই।
তবে যাওয়ার আগে অপূর্ব ভাইয়া তার রুমে এলো। সে অবশ্য সব সময়ের মতোই স্বাভাবিক। স্বাভাবিকভাবেই বলল,
--শেষবার আরেকটু উপকার করো।
নোভা হাল ছেড়ে বলল, -- শেষবার তো দুপুরে ছিল।
-- এত প্রিয় ভাইয়া আমি, একটা বোনাস হিসেবে তো আরেকবার করতেই পারো।
-- কে বলেছে আপনি প্রিয়?
-- প্রিয় না?
-- না।
-- সত্যি?
-- ফাও কথা রাখুন তো। মন মেজাজ এমনিতেই ঠিক নেই।
-- তাহলে ঝটপট করে দাও। চলে যাই।
নোভা ক্লান্তভাবে বলল, -- বলুন।
-- মেয়েটা মনে হয় একটু জব্দ হয়েছে, বুঝেছো। তাই আমার সিম আমি নিয়ে যাই। তার আগে শেষবার কয়েকটা গালি দিয়ে ফিনিশ লাইন একেবারে টেনে দাও তো।
নোভা আর কথা বাড়াল না। সোজা ফোন দিল। আজ অবশ্য ঝট করে কাটল না। রিসিভ হতেই ধীরে সুস্থে বলল,
-- বেহায়া, বদচালানি, ঘিলু ছাড়া মুরগি।
অপূর্ব হেসে ফেলল। ওপাশ থেকে আরেকজনও হাসল। হাসতেই নোভার হাত থেকে মোবাইল পড়ে যেতে যেতে বাঁচল। কোনো রকমে আঁকড়ে ধরে বিস্মিত চোখে অপূর্বর দিকে তাকাল।
অপূর্ব মোবাইলটা নিয়ে লাইন কেটে সিম খুলতে খুলতে বলল,
-- নোভা, কখনো কাঁচা হীরে দেখেছো? দেখতে সাধারণত মাটির ঢেলা বা অস্বচ্ছ পাথরের মতো হয়। কিছু কিছু মানুষও তেমন। এই যে যে অপূর্ব ভাইয়াকে তোমার এত পছন্দ। সে চকচকে, সুন্দর, কাচের মতো উজ্জ্বল। তবে হীরে কিন্তু না। আমার হাজার দোষ আছে। দোষ মানেই এই না যে আমি খারাপ। আমার দিক থেকে আমি ভালো। আমি নিজের মতো বাঁচতে ভালোবাসি। সেই ভালোবাসার মাঝে যেটা ভালো লেগেছে, করেছি।
তবে কিছু কিছু মানুষ একেবারে খাঁটি হয়। আর সেই খাঁটি মানুষগুলো ঐ কাঁচা হীরের মতোই দেখতে খুব সাধারণ, অস্বচ্ছ। ব্যস, তাদের পালিশ করার প্রয়োজন পড়ে। কেন জানো? তাদের আগলে নেওয়ার কেউ নেই। গুছিয়ে দেওয়ার কেউ নেই।
অপূর্বর হাজার সমস্যা থাকতে পারে। তবে মাথায় শক্ত বৃক্ষের মতো, তার মায়ের ছায়া ছিল। তবে তাদের কেউ ছিল না। তারা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে নিজের চেষ্টায়। আর এই চেষ্টার ওপরে আর কিছু নেই। সত্যিই নেই।
নোভার আজ আর বুঝতে অসুবিধা হলো না। তাই তার মতোই বলল,
-- আমার কেন মনে হচ্ছে, আপনি আমাকে ওই জঙ্গলের জন্য ম্যানিপুলেট করছেন?
অপূর্ব আগের মতোই হাসল। হেসে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল,
-- কারণ আমি তোমাকে খুব পছন্দ করি, নোভা। আমার ছোট বোন অর্পিকে যতটা করি, ঠিক ততটাই। আর খালিদ যদি আমার বোনকে পছন্দ করত। বিশ্বাস করো, আমি ঘাড়ে ধরে তার হাতে তুলে দিতাম। তবে তোমাকে পারছি না, শুধু চাচির জন্য।
এই দুনিয়ায় খারাপ মানুষের যেমন অভাব নেই, তেমন ভালো মানুষেরও নেই। কিন্তু খাঁটি, শুদ্ধ মানুষের বড় অভাব। সেই মানুষ খুঁজে পেলে, কেন আমি ম্যানিপুলেট করব না?
নোভা আর কিছু বলেনি। অপূর্ব ভাইয়াও আর দাঁড়ায়নি। নিজের মতো চলে গেছে। আর যেতেই নোভার ভেতরে অন্য রকম অস্থিরতা শুরু হয়েছে। সেই অস্থিরতার কোনো কূল কিনারা নেই। অবশ্য এই কয়দিনে আর কোনো মেসেজ বা কল আসেনি। একটাও না।
আর না আসাতেই নোভা হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেও এলাকায় এসে প্রথম দুদিন সে বেরই হয়নি। একরাশ জড়তা সংকোচ ঘিরে ছিল। তবে মায়ের জন্য টেকা যায় না। এতদিন ভার্সিটি বন্ধ, এখন আর কিসের বসে থাকা!
ভার্সিটিতে যাওয়ার ব্যাপারে নোভার সমস্যা নেই। বরং যেতেই তার আগ্রহ। তবে যে কাণ্ড হয়েছে, কেউ যদি কিছু বলে বসে, এই ভয়। তাই প্রথম দুদিন গেল গাড়িতে।
তারপর বাবার কাজ থাকায় বেরোতে হলো নিজে নিজে।
অবশ্য মা বলেছিল, "চল, আমি দিয়ে আসি।"
তবে বড় চাচা সুন্দর করে বললেন, -- মা, হয়তো এলাকা রাস্তা সব পার করে দেবে। ভার্সিটি বাকি সব কী? সমস্যা আসবেই। তবে সব ফেস টু ফেস করার সাহস থাকতে হবে। আর আমার নোভা মা তো এমনিতেই সাহসী। ব্যস, একটু ঘাবড়ে আছে। এখন এই ঘাবড়ে যাওয়ার কাছে মাথা নত করা যাবে না। কখনোই না। আজ যদি করো, তো হেরে গেছো।
নোভা হারেনি। যে দোষ করেইনি, সেটার জন্য কিসের এত সংকোচ? তাই সোজা বেরিয়ে এসেছে। তবে তেমন কিছুই হয়নি। এলাকার মানুষ তার মাকে জমের মতো ভয় পায়। তাই মুখের সামনে আগেও তেমন কিছু বলেনি, এখনও না। ভার্সিটিতেও তেমন কিছু হয়নি। বরং সে এখন সেলিব্রিটি। বন্ধুরা মাথায় করে ঘুরছে, ছবি তুলছে।
তবে অবাক করার বিষয় হচ্ছে, সে মোড়ে দাঁড়ালেই কোথা থেকে যেন একটা না একটা খালি রিকশা এসে হাজির। প্রথম দুদিন নোভা খেয়াল করেনি। আসতেই উঠে ভার্সিটিতে চলে গেছে। তবে পরে খেয়াল করল। আর খেয়াল হতেই বুঝতে বাকি রইল না, বেটা জঙ্গল দূরে থাকলেও তার সব খবর তার কাছে যাচ্ছে। আর এই যে সবাই চুপ, এটা শুধু তার মার ভয়ে না। এই জঙ্গলের ভয়ে।
তাই তারপর আর মোড় থেকে ওঠেই না। কিছুদূর হেঁটে সামনেই এগোলেই রিকশার স্ট্যান্ড, নোভার জন্য বড় কষ্টের। তাও সেই কষ্টকে তুচ্ছ করে সেখানেই গিয়েই উঠছে।
আজও সেই উদ্দেশ্যে মোড় পেরুবে তখনি খেয়াল করল, আজ কোন রিকশা আসেনি। নোভা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়েও দেখল। তবে খবর নেই। একটু অবাকও হলো। তারপর মুখ বাঁকিয়ে স্ট্যান্ডের দিকে এগোতে লাগল। ঠিক তখনই তার পাশ ঘেঁষে একটা বাইক এসে থামল।
কার বাইক নোভা জানে। তবুও বিস্ময়ে নিয়ে তাকাল। না, খালিদ ভাইকে দেখে বিস্ময় হওয়ার কথা তার না। তবে সে ভালো করেই জানে, তিন মাথা এক জায়গায়ই ছিল। তাই বাকি কথা মাথা থেকে বেরিয়েই গেল। বরং এগিয়ে বলল, -- বাচ্চাটার খোঁজ পেয়েছেন, খালিদ ভাই?
খালিদ সেই কথায় দিকে গেল না। নিজের মতো স্বাভাবিকভাবে বলল, -- এসো, পৌঁছে দিই।
তখনই নোভার সব মনে পড়ে গেল। মনে পড়ল সেই ভিডিও। তবে আজ জড়তা সংকোচে পড়ল না। মুখের বারোটা বাজিয়ে বলল, -- আপনার মনে হয় আমি যাব?
-- কেন, আগে যাওনি?
-- হ্যাঁ, গিয়েই তো গলায় ফাঁস পড়েছে। শিক্ষা হয়নি বুঝি! তাছাড়া আপনার খারাপ নিয়ত যদি জানতাম, তাহলে কখনো যেতাম না।
-- খারাপ নিয়তের কী হলো? বিয়ে করতে চাওয়া পাপ?
-- এই আপনি জান তো! আপনার থোবড়া টোবড়া কখন আমি ফাটিয়ে টাটিয়ে ফেলি ঠিক নেই। এসেছে আমার বিয়েওয়ালা!
খালিদ হেসে ফেলল। প্রাণখোলা হাসি। হেসে বলল,
-- আমার সাইজ দেখেছো? এক ধমক খেলে মাটির আধা হাত নিচে চলে যাবে।
নোভাও সমান তালে বলল,
-- আমার সাইজ দেখেছেন। আমি আপুর মতো পাখির সাইজ। একবারে ঘুঁটা দিয়ে চোখের গুটি বের করে ফেলব। এসেছে নোভাকে ভালোবাসতে! হাট্!
বলেই নোভা আর দাঁড়াল না। কে কোন দিক দিয়ে দেখবে, আবার শুরু হবে আরেক কাহিনি। তাই সোজা হেঁটে গেল। যেতেই রিকশা পেল। উঠে বসতেই দেখল, খালিদের বাইক পেছনে।
নোভা ফুঁস করে শ্বাস ফেলল। এ তো দেখা যায়, সত্যিই জ্বালিয়ে মারবে। নোভা সাথে সাথে রিকশার হুড তুলে বসে রইল।
ভার্সিটিতে যেতেই মেসেজ এলো। সেখানে লেখা,
“সপ্তাহখানেক পর হাসলাম, নোভা। এই হাসিটুকুর জন্য কতটা যোগ্যতা দরকার? আমি সেই পর্যন্ত বিনা কথায় চলে যাব। তবে যেটা আমার হাতে নেই, সেটা কীভাবে করব,বল তো?”
নোভা নিশ্চুপ কিছুক্ষণ মেসেজটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর এই মেসেজের বিপরীতে কিছুই বলল না। তবে পাঠাল,
"আপনি চলে এসেছেন কেন, খালিদ ভাই?"
সাথে সাথেই মেসেজের উত্তর এলো। নোভা মেসেজটার দিকে এক পলক তাকিয়ে রইল। তার চোখে পানি। পানিটুকু মুছেই মাকে ফোন দিল।
নাবিলা ফ্লোরে বসা, চুপচাপ। তার পেছনেই খাটে আসমানি খালা। চুলে জট লেগে আছে। আগে যাও টুকটাক করত, এখন কিছুই নেই। তাই আসমানি নিজেই বসেছে একটু গুছিয়ে দিতে। দিতে দিতেই কলিং বেল বাজল।
আসমানি বড় বিরক্ত হলো। বড় ভাই, ছোট ভাই কেউই বাড়িতে নেই। রোকেয়া আফা গেছে ব্যাংকে। পুরো বাড়ি খালি। তাই বিরক্তি নিয়ে উঠে দাঁড়াল। এমন সাত সকালে এলো টা কে ?
সে এগিয়ে মনিটরের দিকে গেলো। গিয়ে দেখেই সাথে সাথে দৌড়ে দরজা খুলতে গেল। আর খুলতেই অপূর্ব স্বাভাবিকভাবে বলল, -- সব ঠিক, খালা?
আসমানি কিছু বলতে পারল না। একবার অপূর্ব, একবার নাবিলের দিকে তাকাল। নাবিল অবশ্য কিছুই বলল না। সোজা ঢুকে গেল। ঢুকেই করুণ মুখে আপার রুমের দিকে তাকাল। অপূর্ব সেই দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে বলল, -- তোমার দায়িত্বটা আমাকে দেবে, নাবিল?
নাবিল অসহায় চোখে তাকাল। খালিদ ভাইয়ের ব্যাপারটা বুঝতে তার অনেকটা সময় লাগলেও, অপূর্ব ভাইয়েরটা বুঝে গেছে অনেক আগেই। তাই এইটুকু ঠিক জানে, তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি এই মানুষটাই আগলে রাখবে। তাই সাথে সাথেই মাথা নাড়াল।
নাড়িয়ে রুমে চলে গেল। যেতে যেতে বলল, -- খালা, মাথাটা জ্যাম হয়ে আছে। একটু চা করত।
আসমানি বোকা না। তবে আজ আর কোনো ঝামেলা করল না। সোজা কিচেনরুমের দিকে চলে গেল।
আর অপূর্ব এসে দাঁড়াল নাবিলার দরজার সামনে। সেই যে শুভ্র পর্দায় আড়ালে সুন্দর মিষ্টি একটা রুম, সেই রুমে। অনেকটা দিন পর। সেই গল্পের আসরের পর আর কোনো কথা হয়নি। অবশ্য সে ইচ্ছে করেই বলেনি। অথচ বোকা মেয়েটা ভেবেছে, তাকে সবার মতো ঘৃণা করছে। তার কি আর ঘৃণা করা সম্ভব?
তাই আর দাঁড়াল না, আজ নকও করল না। ভালো করেই জানে, করে লাভও নেই। তাই শুভ্র পর্দাটা সরিয়ে সোজা এগিয়ে গেল। গাঢ় নীল রঙের জামায় মোড়ানো বিষণ্ন মুখটা দেখে তার সব সময়ের মতো গলা শুকিয়ে এলো। অবশ্য এই শুকনো গলার তৃষ্ণা সে কখনো কাউকে বুঝতে দেয় না। আজও দিল না।
বরং নিজেই এগিয়ে এসে হাঁটু ভেঙে নিচে বসল। নাবিলার মুখোমুখি হলেও মাঝখানে রয়ে গেল একটুকরো দূরত্ব, যেটা চাইলে সে মুহূর্তেই মুছে দিতে পারে। কিন্তু এই দূরত্ব তার তো না। তাই মুছতে হলে নাবিলাকেই এগিয়ে আসতে হবে। আর না হলে, কোনোদিনও না।
তাই একদৃষ্টিতে ঐ যে চুপচাপ বসে আছে, সেই মুখটার দিকে তাকিয়ে রইল। তেল মাখানো খোলা চুলগুলো এলোমেলো ভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। সাদা ওড়নাটা বড় অবহেলায় গায়ে জড়ানো। আর মুখ সব সময়ের মতো অপূর্বর মুগ্ধতায় মোড়ানো। সেই মুগ্ধতায় মোড়ানো মুখের দিকে তাকিয়েই সেই আগের মতো এক চুকটি মারল।
মারতেই নাবিলা চমকাল। চমকে অপূর্বের দিকে তাকাল। তাকাতেই অপূর্ব হেসে স্বাভাবিকভাবে হাত বাড়িয়ে বলল, -- বন্ধু হবে, নাবিলা?
নাবিলা বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে রইল। অপূর্ব সেই বিস্ময়ভরা চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, -- আমি দশ মিনিটের মধ্যে সিলেটের উদ্দেশ্যে রওনা দেব। ভেবে দেখো। আমি অচেনা কোনো মানুষকে সাথে নেব না।
নাবিলার চোখ থেকে চুপ করে এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল। তারপর সাথে সাথে আস্তে করে হাতটা বাড়িয়ে দিল। তবে অপূর্বের হাত ছোঁয়ার সাহস হলো না। অপূর্ব নিজেই এগিয়ে আলতো করে হাতটা ধরল। ধরে বলল, -- সেই চার-পাঁচ বছরের নাবিলাকে মনে আছে, নাবিলা? যে ঘুরে ঘুরে মাকে খোঁজে, বাবাকে খোঁজে। তোমার কাছেও এই বন্ধুর ছোট্ট একটা অনুরোধ। দ্বিতীয় কোনো সেই ছোট্ট্ নাবিলা, আর না হোক।
চলবে……
আন্তরিক ভাবে দুঃখিত আমার প্রিয় মানুষের। ভেবেছি সময়মতো শেষ করতে পারব। তাই আজ বলিনি। তবে লিখতে লিখতে দেরি হয়ে গেছে। অপেক্ষায় রাখার জন্য আমি সত্যি দুঃখিত।