#বনফুল
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_৩৮
আরশি উৎসুক নয়নে দরজার দিকে তাকালো। তার গায়ে স্কাই ব্লু রঙের প্রিন্সেস গাউন, মাথায় হালকা সোনালি কাঁধছোঁয়া চুলগুলো সাইডে ফিশটেল ব্রেইড করে গোঁছানো। ঠিক যেন দেখতে তার ফেভারিট ডিজনি প্রিন্সেস এলসার মতো। এলসার মতোই শুভ্র তুষারের ন্যায় সুন্দর, নিখুঁত ছোট মুখের আদল। সেই আদলের মিষ্টি টানা চোখদুটোতে আজ একরাশ চিন্তার রেশ। সেই রেশ নিয়েই নিঃশব্দে দরজার দিকেই তাকিয়ে রইল।
আজ আরশির জন্মদিন। গুণে গুণে এবার আট বছরে পা রাখল সে। মাম্মা পাপার একমাত্র প্রিন্সেস সে। প্রতি বছর এই দিনটা আরশির কাছে খুব স্পেশাল। সকাল হতেই দাদা দাদি থেকে শুরু করে একে একে সবাই হাজির হয়। সাথে কত্ত কত্ত গিফট। আর সন্ধ্যায় স্কুলের ফ্রেন্ডদের নিয়ে পার্টি। সেই পার্টিতে কত্ত মজা!
তবে এই সব মজা আর গিফটের ভিড়েও আরশি একটা গিফটের জন্য খুব খুব অপেক্ষায় থাকে। সেখানে তার জন্য কোনো টয় থাকে না, থাকে না কোনো জুয়েলারিও। বরং প্রতিবারই থাকে একেক রকম, একেক জিনিস।
একবার দিয়েছে এত্তগুলো কালার আর ব্রাশ। আরেকবার দিয়েছে কী সুন্দর একটা ডায়েরি। ডায়েরির প্রতিটা পাতায় ছোট ছোট স্টার, লাইট অফ করলেই কী সুন্দর ঝিকিমিকি করে। সেই ডায়েরিতে সে কাঁচা কাঁচা হাতে তার ছোট ছোট কথা, গোপন উইশগুলো লিখে রাখে।
আরেকবার দিয়েছে তারই ছবি, হাতে আঁকা। ইশ, কী যে সুন্দর! ছবিটা সে নিজের বেডের একেবারে হেডের কাছে রেখে দিয়েছে। সকালে চোখ খুললেই প্রথম সেটার দিকে তাকালেই তার এতো ভালো লাগে।
আর এই গিফটগুলো পাঠায় তার কথা বন্ধু। এই কথা বন্ধুকে আরশি কখনো দেখেনি, তবে তাকে নিয়ে আরশির কত কথা! স্কুলের বন্ধু থেকে শুরু করে আত্মীয় স্বজন, কেউই আর বাদ নেই। তার সব কথায় একবার না একবার এই কথা বন্ধু থাকবেই।
এই কথা বন্ধু তার কীভাবে বন্ধু হলো, আরশি জানে না। তবে বোঝ হওয়ার পর থেকে মাঝে মাঝেই একজনের ফোন আসে। সেই ফোনের মানুষ পাপার সাথে কথা বলে, মাম্মার সাথে কথা বলে, আর সবার শেষে তার সাথে। সে তো আর প্রথমে জানে না কে। তাই ছোট হাতে ফোন তুলে বলত, -- কে?
ওপাশ থেকে কেউ মিষ্টি করে বলত,
-- বন্ধু, তোমার কথা বন্ধু।
-- তুমি আমার কথা বন্ধু?
-- হুম।
-- তাহলে আমিও বন্ধু?
-- উঁহুম।
-- তাহলে?
-- তুমি আমার বনফুল।
-- বনফুল কী?
-- যেই ফুলকে আমি খুব খুব পছন্দ করি, ভালোবাসি, তবে নিজের আঙিনায় ফোটাতে পারি না। সেই ফুল।
এত ভারী কথার মানে আরশি বোঝে না। তবে এই কথা বন্ধুর সাথেই তার ভাব হয়ে গেল। কী সুন্দর করে কথা বলে। সেই কথার মাঝেই সব সময় একটা প্রশ্ন থাকে,
-- তুমি সবচেয়ে বেশি কাকে ভালোবাসো, আরশি?
আরশি অকপটে বলে, পাপাকে। পাপা তার সুপারহিরো। মাম্মাকেও ভালোবাসে, তবে পাপার চেয়ে একটু কম।
তুমি কিন্তু মাম্মাকে বলবে না, হুম? আমি আবার মাম্মার চোখের মণি, কষ্ট পাবে তো।
কথা বন্ধু তখন আলতো করে হাসে। তবে সে আরশির সিক্রেট কাউকে বলে না। একবার ক্লাসের সবচেয়ে দুষ্টু ছেলেটার খাতা চুপিচুপি ছিঁড়ে দিলো, একবার শয়তান মোনা কে এক ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলো, দুধ খেতে তার ভালো লাগে না, তাই মাম্মার চোখের ফাঁকি দিয়েই দেয় ফেলে । আর চকলেটের জার থেকে চুপিচুপি চকলেট কত চুরি করে।
কোনোটাই সে কাউকে বলে না। তবে এই কথা বন্ধুকে বলে।
বলে স্কুলে কী করে, বাড়িতে কী করে, তার বন্ধুদের সিক্রেট বলে, তার মিনি বিড়ালটা সাথে কত মজা করে, সেটা বলে। সব সব, সবকিছু। সে বলে, কথা বন্ধু মন দিয়ে শোনে।
আর এই যে তার জন্মদিন, এই জন্মদিনেই সব সময় সকালে ঘুম থেকে ওঠেই সবার আগে কথা বন্ধুর পাঠানো গিফট নিয়ে সে উপুর হয়ে পড়ে।
আজকে অবশ্য তেমন কিছু হয়নি। কারণ আজ সে গাল ফুলিয়ে আছে। কোনো গিফট চায় না সে, তার তো কোনো কিছুর দরকারই নেই। সে বলার আগেই পাপা সব কিছু এনে হাজির করে। কত ব্যস্ত তিনি! সেই ব্যস্ততার মাঝেও আরশি সবার আগে। তো, গিফট দিয়ে সে কী করবে?
তাই কথা বন্ধুকে বলেছে, "এবারের জন্মদিনে আমি তোমাকেই চাই। তুই না এলে আমি কেকই কাটব না।"
এই যে সবাই বসে আছে পাপা, মাম্মা, দাদু, দাদা, নানা, নানু, তার বন্ধুরা সবাই। অথচ সেই কথা বন্ধুর কোনো খবরই নেই।
আর এই কষ্টেই আরশির শুভ্র মুখটা লালচে হয়ে আসে। চোখ দুটোতে টলমলো পানি। পানি গড়িয়ে পড়বে ঠিক তখনই জুবায়ের এগিয়ে এসে কোমল গলায় বলে, -- সে যখন বলেছে আসবে, তাহলে অবশ্যই আসবে। হয়তো কোনো কাজে একটু লেট হচ্ছে। আমরা বরং কেকটা কেটে ফেলি। তারপর কত আয়োজন বাকি। এই যে কত মানুষ বসে আছে। তারাও তো লেট হচ্ছে, তাই না মানণি?
আরশি কোনো উত্তর দিল না। তার শুভ্র তুষারের মতো মুখ রক্তিম হয়ে গেছে। এত জেদ মেয়েটার! যা বলবে, সেটাই করা চাই মানে চাই।
পায়েল দূর থেকেই বাপ মেয়ের কাণ্ডকারখানা দেখে। দেখেই হেসে ফেলে। দুনিয়ায় পুরো হুমকি ধুমকি দিয়ে চলে, তবে মেয়ের সামনে গলায় আওয়াজ আসে না।
আর মেয়েও লাখে একটা। এই রাত শেষ হয়ে ভোর হলেও কেক জীবনেও কাটবে না। যার জন্য অপেক্ষা, সে না আসা পর্যন্ত অন্তত না। বলেছে তো বলেছে, এইটুকু ভালো করেই জানে।
তাই এগিয়ে স্বামীকে খোঁচা মেরে বলল, -- এত বড় ডাক্তার, দুনিয়ার মানুষের মন ব্রেইন নিয়ে নাচানাচি, নিজের মেয়ের বেলায় কই যায় এত এত ট্রিকস?
জুবায়েরও সমান তালে বলল, -- এত চোখের মণি আপনার, নিন। পারলে ঠান্ডা করুন। দেখি কত গুণ আপনার?
পায়েল মুখ বাঁকাল। তবে মেয়েকে কিছুই বলল না। বরং লাল টুকটুকে গালে পটাপট দুটো চুমু দিল।
আরশি চোখ পাঁকিয়ে তাকালো। বড় হচ্ছে না সে, এখনও কি বেবি? সবার সামনে চুমু খাও কেন? এমনিতেই স্কুলে সবাই বাবু বাবু বলে তাকে।
জুবায়ের আর পায়েল মেয়ের চোখ পাঁকানো দেখে দুজনেই হেসে ফেলল।
আর ঠিক তখনই একটা গাড়ি তাদের বাড়ির গেইট দিয়ে ঢুকল। আরশির চোখমুখ খুশিতে ঝিলিক দিয়ে উঠল। আর উঠতেই নিজের লম্বা গাউনটা একটু উঁচু করে ধরে দৌড়ে গেল। গিয়ে দাঁড়াল একেবারে গেটের কাছে। চোখেমুখে তার কৌতূহলের উচ্ছ্বাস।
সেই উচ্ছ্বাসভরা মুখটা দেখেই নাবিলার চোখে পানি চলে এলো। চোখভরা সেই পানি নিয়েই গাড়ির ভেতর থেকে এক পলকে তাকিয়ে রইল। ঠিক যেমন করে তাকিয়ে ছিল চার বছর আগে।
ঠিক চার বছর আগেই নাবিলা প্রথম এই বাড়িতে পা রেখেছিল। তখন সন্ধ্যার আয়োজন প্রায় শেষ। রাস্তার ধারে ধারে সোডিয়ামের আলোগুলো জ্বলে উঠেছে। জ্বলে উঠেছে এই সুন্দর গোছানো ছিমছাম ডুপ্লেক্স বাড়িটির আঙিনার বাতিগুলো।
ঢাকা থেকে সিলেট, দূরত্ব তো কম না। সেই দীর্ঘ পথ পেরিয়ে ক্লান্ত, নিস্তেজ নাবিলা গাড়ি থেকে নামতেই থমকে দাঁড়ালো।
উঠানে চার পাঁচ বছরের একটা মেয়ে। ছোট্ট একটা প্যাডেল গাড়ি নিয়ে উঠানের এ মাথা থেকে ও মাথা ধুমছে ছুটে বেড়াচ্ছে। আশে পাশের কোন কিছুরই তার খেয়ালে নেই। ছোট ছোট সোনালি চুলগুলো বাতাসে এলোমেলো হয়ে দুলছে। মুখভরা খিলখিল হাসি। সেই হাসি নিয়েই একবার নাবিলার দিকে তাকালো।
আর তাকাতেই নাবিলার বুক ধক করে উঠল। শাহরিয়ার... সেই মুখ, সেই চোখ, সেই তীরের ফলার মতো নাক। আর সেই চেনা হাসি। বিস্ময়ে নাবিলা মূর্তির মতো সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। চোখ থেকে টপটপ করে পানি গড়িয়ে পড়তে
লাগল।
নাবিলার চোখের পানি দেখেই মেয়েটা থমকে গেল। আর যেতেই নিজের ভারসাম্য আর রাখতে পারল না। গাড়িটাসহ উল্টে পড়ল। আর পড়তেই এক চিৎকার দিয়ে উঠল,-- ম্মামা!
নাবিলার বুক কেঁপে উঠল। আর সাথে সাথেই এগোতে চাইল, কিন্তু তার আগেই বাড়ির ভেতর থেকে এক নারী ছুটে বেরিয়ে এলো। এসে আগলে ধরল। কী সুন্দর সেই আগলে ধরা!
মমতায় ভেজা হাত মেয়েটার শরীর, মুখ, মাথা জুড়ে বুলিয়ে দিলো। দিল মমতা মাখা আদর। আদরের ফাঁকে গাড়িটার দিকে একবার রাগী চোখে তাকালো। সেই তাকানোতেই যেন মেয়েটার সব ব্যথা উবে গেল। ঠোঁটে আবার ফিরে এলো খিলখিল হাসি।
আর সেই হাসি দেখেই নাবিলা আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। পড়ে যেতে নিল, শরীর কাঁপছে তার। আর ঠিক তখনই দুটো হাত আগলে ধরল, বড় যত্নে। বন্ধু হয়েছে তার, যেই বন্ধুর একটাই চাওয়া, নাবিলা নামের মেয়েটি ভালো থাকুক। তবে দুঃখের সাথে তার জনম সন্ধি। চাইলেই বুঝি ভালো থাকা যায়?
তাই তো এই বন্ধুর অনুরোধ তার কানে বাজে, " দ্বিতীয় কোনো সেই ছোট্ট্ নাবিলা, আর না হোক।"
সত্যিই আর না হোক। এই যে মেয়েটা, এই মেয়েটার জন্ম তার অস্তিত্ব থেকে। জন্ম নিলেও, এই মেয়ের অস্তিত্বের দুনিয়ায় সে নেই। কোথাও নেই। অনেক আগেই মুছে গেছে। এই ভাগ্য মুছে ফেলেছে। তাই তো নিজের সন্তানকে হাতের কাছে পেয়েও, নাবিলা বুকে টেনে নিতে পারল না, না পারল দৌড়ে তার কাছে যেতে।
নাবিলার ভেতর ভেঙে চুঙে আসে। কত কত দুঃখ সে পেঁড়িয়ে এসেছে। সব দুঃখকেই তার আজ তুচ্ছ মনে হলো। নিজের সন্তান বুকে না নেওয়া কষ্টের কাছে, এই পৃথিবীতে আর কোনো বড় কষ্ট নেই। কোথাও নেই। আর এই কষ্টেই নাবিলা অপূর্ব বুকে মাথা রাখল। রেখেই পাগলের মতো মাথা ঢুকল।
ছোট একটা মেয়ে, মায়ের গলা জড়িয়ে সেই কান্না দেখল। দেখল সেই গলা জড়িয়ে ধরা মাও। দেখে বুঝতে তার সময় লাগে না। আর বুঝতেই মেয়েকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরে। তার চোখেও পানি, দুজনেই যে মা। একজন কাঁদে সন্তানকে পাওয়ার লোভে, আরেকজন কাঁদে হারানোর ভয়ে।
আর নাবিলার বন্ধু চুপচাপ বসে থাকে, বড় যত্নে আগলে। না ফেরায়, না নিষেধ করে। যতক্ষণ ইচ্ছে, কাঁদুক। সাদা টিশার্ট ভিজে শুকিয়ে আসে। না নড়ে, না কিছু বলে। সুন্দর গোছানো বাড়িটার উঠানের সামনে দুটো মানুষ, একজনের বুকে আরেক মুখ গুঁজে দুনিয়া ভুলে কাঁদছে।
কাঁদতে কাঁদতে নাবিলা নিন্তেজ হয়, শান্ত হয়, ক্লান্ত হয়। সেই ক্লান্ত শরীরটা অপূর্ব কোমল করে পাজোকোলে তুলে দাঁড়ায়। একবার তাকায় ঐ ভয়ে শুকনো মুখ দুটির দিকে। তারপর আস্তে আস্তে গাড়ির দিকে এগোতে এগোতে বলে,
-- ঐ দেড় বছর তোমার চিকিৎসা করেছে ডাক্তার জুবায়ের। বেশ নামকরা মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। স্বাভাবিক সে তোমার বিষয়ে সবই জানেন। জানেন তোমার অবস্থা, তোমার নানি টেনশন, জানে এই বাচ্চার ভবিষ্যৎ। আর সব কিছুর জানার বাইরে কি আছে জানো? উপরে জিনি আছেন তিনি। তার সব কিছু এতোই নিখুঁত, কার গল্প কোন দিক দিয়ে লিখছেন সেটা বোঝাই যায় না।
ডাক্তার জুবায়ের নিঃসন্তান। এমন না তাদের সন্তান হয়নি।
অনেক চিকিৎসার পর তার স্ত্রী কনসিভ করেন। কিন্তু বাচ্চাটা জন্ম নেয় কনজেনইটাল হার্ট ডিফেক্ট নিয়ে। হাজার চেষ্টা করেও বাঁচানো যায়নি।
সেই থেকেই তার স্ত্রী অসুস্থ। আর তিনি ভালো করেই জানেন, তার স্ত্রী কিসে সুস্থ হবে। তবে হাজার চেষ্টা করেও আল্লাহ তাদের দিকে আর মুখ তুলে তাকায়নি।
আর সেই সময়ে তুমি এসেছিলে আল্লাহর নিয়ামত হয়ে। অন্তত ডাক্তার জুবায়েরের জন্য। আর তারপর কি হয়েছে, সেটা বলার প্রয়োজন পড়ে না। তারা এই ফুলকে নিয়ে সেই বছরই দেশ ছেড়েছিল, সবাই জানে বাহিরে গিয়ে চিকিৎসা করে তাদের আবার সন্তান হয়েছে। এই সন্তানই তোমার বনফুল নাবিলা।
এই বুনফুলের ভাগ্য তোমার আর শাহরিয়ারের মতো হয়নি। বরং শাহরিয়ারের জীবন আর তোমার সুখের বিনিময়ে তার ভাগ্য লেখা হয়েছে। আর এই ভাগ্যের লেখা তুমি ছাড়া খন্ডানোর আর কারো সাধ্য নেই।
এখন তুমি যদি তোমার সন্তানের সামনে গিয়ে দাঁড়াও, এই গোছানো সুখের দুনিয়া তখনই ছিন্ন হয়ে যাবে। এই ফুল এদের সাথে জড়িয়ে গেছে, নাবিলা। টেনে ছিঁড়তে গেলেই এখন মুষড়ে যাবে, ঠিক সেই ছোট্ট নাবিলার মতো, যে নানির ভালোবাসায় বড় হলেও, প্রিয় উষ্ণ চাদরের অভাব কখনও ভুলতে পারেনি। এই মেয়েটাও আর পারবেনা। এখন সিদ্ধান্ত তোমার।
নাবিলা আর কোন টু'শব্দ করেনি। সে জানে, বড্ড দেরি হয়ে গেছে। যেই দেরি আর কোনোদিনও পূরণ হবে না। তাই নিস্তেজ হয়ে পড়ে রইল। এই যে, যার একটু আঙুলের ছোঁয়ার গুটিয়ে হাত ওড়নার পেছনে নিয়ে গেছে, তারই চওড়া উষ্ণ বুকে।
সেই বুকের মানুষও বিনা দ্বিধায় আগলে আগের মতোই বলল, -- আমার গিফটের কথা ভুলো না, নাবিলা। যে চলে যাওয়ার, চলে গেছে। তোমার ফুল ভালো আছে। এখন তোমার পালা। এগিয়ে যাও। জানি সহজ না, তবু আমি জানি, তুমি পারবে। অন্তত যেই মানুষটা তোমাকে নিজের সব কিছুর উর্ধ্বে গিয়ে ভালোবেসে দুনিয়ায় মায়া ছেড়ে চলে গেছে। তার শেষ ইচ্ছের জন্য হলেও, ভালো থাকো নাবিলা।
নাবিলা ভালো আছে, সত্যিই আছে। তবে এই উষ্ণ বুকের মানুষটা যখন তার দুনিয়ায় ফিরে গেছে। সবার কত্তো মন খারাপ। নোভা তো ইচ্ছে মতো কেঁদেছে। তবে নাবিলা নির্বিকার। আর এই নির্বিকার নাবিলা হাতে ছোট্ট একটা গিফট বক্স গুঁজে জিজ্ঞেস করেছিল, -- আমাকে মিস করবে না, নাবিলা?
নাবিলা কিছু বলতে পারে নি। তখনও না, এখনও না। এই যে হাজার ব্যস্ততার মাঝে তাকে হঠাৎ হঠাৎ ফোন করে বসে। নাবিলা কিছু বলতে পারে না
বলতে পারে না, প্রথম অডিশনের দিন, অগণিত মানুষের ভিড়ে সে শুধু একটা মুখই দেখেছিল। অনেকদিন পর আবার যখন ভার্সিটির মাঠে পা রাখলো। ভয়ভরা বুকের টিপটিপ আওয়াজের মাঝে শুধু একটাই কথা কানে বাজছিল, -- আমি জানি, তুমি পারবে।
আরো বলা হয়নি, আমার প্রথম উপার্জনের টাকায় সবার জন্য যখন কিছু না কিছু সে কিনেছে। তার মধ্যে সবার আগে কিনেছে তার জন্য তার প্রিয় ক্যামেরা।
সে যেমন গিফট বক্স হাতে ঢেলে গুঁজে দিয়ে গেছে, সে কখনও পারে না তার জন্য কেনা ক্যামেরার কথা বলতে। তখনও না, এখনও না।
আর এই না পারার কোনো আফসোস নাবিলার নেই।
কলঙ্কমাখা জীবন তার। এই জীবনে তার ছায়া কারও গায়ে না পড়ুক। সে ভালো থাকুক নিজের রঙিন দুনিয়ায়। যে দুনিয়া নাবিলা দূর থেকে দেখে তার মতোই দোয়া করে, -- তার দূরের বন্ধু দূরে থাকুক, সবসময় ভালো থাকুক।
নিজেকে সামলে নেয় নাবিলা। চোখের পানি মুছে ফেলে খুব যত্ন করে। ফুল স্লিভ ব্লাউজের ওপর আইভরি হোয়াইট সিল্কের শাড়িটা গুছিয়ে নেয়। গুছিয়েই গাড়ি থেকে যখন নামে তখন সে অন্য এক নাবিলা।
যার কোমরছোঁয়া সোজা চুল, চোখে মায়ামাখা কাজল, ঠোঁটে হালকা গোছানো লিপস্টিক, তাকিয়ে থাকার মতো শরীরের বাঁক। এই নাবিলার সাথে অপূর্বর ফেরি টেইল গার্লের কোনো মিল নেই। বরং এই নাবিলা গত চার বছরে তরুণ প্রজন্মের কাছে এক নামেই পরিচিত, -- মিষ্টি মেয়ে নাবিলা।
যার শুরু একটা ওয়েব সিরিজ দিয়ে। আর শুরুতেই তাক লাগিয়ে দিয়েছিল পুরো সোশ্যাল দুনিয়ায়ই। তারপর একের পর এক হিট নাটক, টেলিফিল্ম, শেষে বড় পর্দা। কেউ কেউ তো বলে ফেলে, মিষ্টি মেয়ে কবরীর উত্তরসূরি এই নাবিলা।
তবুও নাবিলা থামে না। থামতে পারে না। তার প্রিয় বন্ধু বলেছে, -- আমি জানি, তুমি পারবে।
নাবিলা অবশ্যই পারে। তাই বুকের জ্বলন বুকে চেপে, শাড়ির কুঁচির ভাঁজে ছন্দ তুলে এগিয়ে যায় নাবিলা। ঐ যে তার বনফুল চোখে মুখে বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে, এগিয়ে যায় সেই তার বনফুলের দিকে। সেইদিন টেনে বুকে নিতে না পারলেও, আজ টেনে নেয় অনায়াসেই। কথা বন্ধু যে তার। মায়ের টেনে নেওয়া অধিকার না থাকলেও, কথা বন্ধুর ঠিক আছে।
চলবে......