#বনফুল
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_৩৯
নোভা ঘুম থেকে উঠেই দুটো ধাক্কা খেলো। যেন তেন ধাক্কা না। সে নিজে তো ভালোই, তার পুরো দুনিয়াই হেলে দুলে গেল। অবশ্য তার জায়গায় থাকলে যে কেউই হেলে দুলে যাবে। সে আর কোন ছাতার মাথা।
নোভারা এসেছে তার নানুবাড়িতে। আজ না, বরং সপ্তাহ হয়ে এলো। অবশ্য নানু মারা যাওয়ার পর আর এই বাড়িতে তেমনভাবে কখনোই আসা হয়নি। মা-ই আসে নি, তারা আর আসবে কী? তবে মামাতো বোনের বিয়ে। মামারাও খুব করে বললেন। মা আর কোনো অমত করতে পারে নি। তাছাড়া এমনিতে না এলেও আত্মীয় স্বজনের বিয়েতে না এলে হয়?
তাও আবার একমাত্র বোন। তার মামাদের কাছে এখনও তার মা আদরের একমাত্র বোনই। খারাপ ভালো যাই থাক, তাদের বোনই। তাই গায়ে হলুদের দিন সবাই এসে হাজির। আপা অবশ্য এসেছে একেবারে বিয়ের দিন। বিয়ের দিনটা কোনোরকম ছিল, তারপরই চলে গেছে। আর কোথায় গেছে, বাড়ির সবাই জানে? অবশ্য এখন পুরো দুনিয়াই জানে।
জন্মদিনের আয়োজনটা ছিল ভীষণ জমকালো। অনেকেই ছবি তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেছে। সকাল হওয়ার আগেই পুরো অনুষ্ঠানের ছবিগুলো ছড়িয়ে পড়েছে অনলাইনে। তার সাথে আছে হরেক রকম নিউজ।
"মিষ্টি মেয়ে নাবিলা সিলেটে। এসেছে এক রিলেটিভের মেয়ের জন্মদিনে। সেলিব্রিটি হওয়া সত্ত্বেও তার ব্যবহার ছিল সহজ ও প্রাঞ্জল। বাড়তি কোনো ঢং ছাড়াই সবার সঙ্গে মিলেমিশে, সবার মতো স্বাভাবিকভাবে সময় কাটিয়েছে।"
নোভা সেই হরেক রকম নিউজ আর ভিডিও ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বেশ কয়েকবার দেখল। দেখল ওই যে মিষ্টি মুখের ছোট্ট মেয়েটাকে। তারা অবশ্য সামনাসামনি কেউই দেখেনি। তবে নোভার দেখলেই ভেতরটা এমন লাগে, তখন নানুকে আর দেখতে ইচ্ছে করে না।
তবে অপূর্ব ভাইয়া বলেছে, -- নাবিলার জীবনের বড় উপকার তোমার নানুই করেছে, নোভা। তোমরা শুধু নাবিলার দিক থেকে ভাবছো, তাই এমন খারাপ লাগছে। তবে পুরো গল্পটা একবার ভাবো তো। সেই সময় নাবিলার হুঁশ নেই, শাহরিয়ার নেই, বিয়ে নেই, প্রমাণ নেই, কিছুই নেই।
আজ নাবিলা ঠিক আছে, যদি না হতো? কী পরিচয় হতো মেয়েটার? চাচি, বাকি সবাই গলা ফাটিয়ে কিছু বললেও কেউ বিশ্বাস করত না। হ্যাঁ, হয়তো তোমরা আগলে রাখতে। তবে বড় হতে হতে দুনিয়ায় সবচেয়ে নিকৃষ্ট রূপটা সে দেখত। যেমন দেখেছে শাহরিয়ার, যেমন দেখছে খালিদ।
খালিদের সব ভালো একদিকে, জন্মের সত্য একদিকে। দুনিয়ার এমন কোনো শক্তি নেই, এটা মুছে ফেলবে। তুমি মুছতে পারছো নোভা?
নোভা উত্তর দিতে পারে নি। তাবে আর রাগও আসে নি। কিন্তু ছবির মিষ্টি মেয়েটাকে ঠিক দেখে। দেখে একটু জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করে। তবে সাহস হয় না। আপার মতো তো সে সাহসী না। ঠিক ঝরঝরিয়ে কেঁদে ফেলবে।
সেই ছবি ভিডিও দেখতে দেখতেই সকাল থেকে ঝুম বৃষ্টি। বিয়ের ঝামেলাও শেষ। কাছের আত্মীয় স্বজন ছাড়া সবাই চলে গেছে। নোভারও বাড়িতে ফেরার জন্য মন আকুপাকু করছে, তবে মা জানাল দুটো দিন পরে যাবে।
বাবা শুনেই পালানোর পায়তারা করল। তার সাথে বড় চাচাও। তারা এখানে বসে বসে করবে কী? তবে মা শান্তভাবে বলল, " কিছু কাজ আছে, কাজ শেষে একসাথেই ফিরি।"
মায়ের শান্ত কথার উপরে টেকে কার কথা? তাই বাবা, বড় চাচা দুজনেই চুপচাপ বসে গেলেন। তবে বাড়িঘর সব খালি, তাই মা নাবিলকে চলে যেতে বললেন।
নাবিল শুনেই স্বস্তির হাঁফ ছাড়ল। শুধু মায়ের জন্য আসা, তা না হলে এমন সময় কাজী পাড়া ছাড়ে কে? পুরো কাজী পাড়া এখন গরম হয়ে আছে। কয়েক দিনের মাঝেই নির্বাচন। অবশ্য তারা ভালো করেই জানে, এবারও জয় খালিদ ভাইয়ের পক্ষে। তবুও কাজের তো শেষ নেই। তাই বিনা শব্দে সে নেচে নেচে চলে গেছে।
আর নোভা এই ঝুম বৃষ্টিতে করবে কী? কাঁথা টেনে টুনে আরামসে ঘুমিয়ে গেছে। ঘুম থেকে উঠেই প্রথম যে ধাক্কাটা খেল, তা হলো তার মোবাইল নেই। বালিশের পাশেই রেখে ঘুমিয়েছিল। ও মা! উঠে দেখে নেই। জানালা খোলা, বাড়ি ভরা মানুষ। কাকে বলবে সে? তার দুঃখে চোখে পানি চলে এলো। না, মোবাইলের জন্য না। আজকাল তার ইনকাম ভালো, চাইলেই নিজের টাকাই এমন মোবাইল কিনতে পারবে।
তবে তার যতো দুঃখ আইডির জন্য। ফোর সিক্সটি ফাইভ ফলোয়ারের পেইজ আছে। কাল রাতেও একটা ধামাকাদার ভিডিও ছেড়েছে। যেন তেন ভিডিও না, তার মামাতো বোনের মেহেদির ভিডিও। বাসন্তী রঙের লেহেঙ্গায় চিকন কোমর দুলিয়ে নোভা ময়ূরের মতো পেখম তুলে নেচেছে। সেই নাচের ভিডিও। এত সুন্দর এসেছে! নোভা নিজের ভিডিও দেখে নিজেই মুগ্ধ।
আর সেই ভিডিও সাথে সাথেই মিলিয়ন ভিউস। অবশ্য হবেই না কেন, সেই ঘটনার পর থেকে তার চাকা ঘুরছে তো ঘুরেছেই। এখন নোভা সামান্য খাবারের ভিডিও ছাড়লেও সাথে সাথে লাখ লাখ ভিউয়ার্স। অবশ্য মিষ্টি মেয়ে নাবিলার বোন, এটাও একটা প্লাস পয়েন্ট। সেই পয়েন্টের পাসওয়ার্ডই মনে নেই । ভেবেছে চেঞ্জ করবে। তবে সময় আর পেল কই। আহারে তার মোবাইলটা!
এই মোবাইলের বদৌলতে আপার মতো আজকাল তারও অনেক অফার টোফার আসছে। তবে মা আর কোনো মেয়েকে ওই দিকে যেতে দেবে না। আপাকেও চায়নি। তবে সিলেট থেকে ফেরার পর আপু পুরো বিছানায়… না, এবার মাথা খারাপ হয়নি। তবে এবারের কষ্ট যে একজনের মায়ের, আর সেই কষ্ট থেকে টেনে তুলেছেন অপূর্ব ভাইয়া।
সুন্দর করে বোঝাতে তার চেয়ে আর কে পারে? কতভাবে, কত সুন্দর করে যে বুঝিয়েছেন! বুঝিয়েছেন, একজনের স্বপ্ন যত্ন করে তোমাকে শিখিয়ে দিয়ে গেছে নাবিলা। সেই স্বপ্নের সুযোগ যেহেতু আছে, সেখান থেকেই না হয় নতুন করে শুরু করো।
তার সাথে বুঝিয়েছেন বাড়ির সবাইকে। তবুও মা কি মানেন? তাদের জীবন যেখান থেকে শুরু, সেখানকার মানুষ এই দুনিয়াটাকে ঘৃণার চোখে দেখে। এই দুনিয়ায় যে মেয়ে যায়, সে নষ্টা। মা তো কিছুতেই যেতে দেবে না। সে চায় শুধু মেয়ের সুখের একটা সংসার হোক।
তবে অপূর্ব ভাইয়া তার মতোই বুঝিয়েছে, -- সংসার আপনার মেয়ের অবশ্যই হবে, চাচি। আপনি যখন চাইবেন, তখনই হবে। আপনার কোনো সন্তান আপনার কথার বাইরে যাবে না। তবে সেই সংসারে সুখ কখনো হবে না। এটা আমি যেমন জানি, সেটা আপনিও জানেন।
তাই ওকে একটু বাঁচতে দিন, চাচি। নিজে যতদিন সৎ, দুনিয়ার কোনো কাজই খারাপ হয় না। তাছাড়া এখানে অভিনয় কোনো ফ্যাক্ট না। ফ্যাক্ট, নাবিলার কোনো কিছুর মধ্যে ডুবে যেতে হবে। সেটা যে কোনো কাজ হোক। কী কাজ, সেটা তার ওপর ছেড়ে দিন। তার যেটায় মন টানে, সেটায়ই যেতে দিন। শুধু বাধা না, বরং ভরসা হয়ে যান, চাচি। ভয় নেই, একবার যেই মানুষ ভুল করে, দ্বিতীয়বার আর ভুলের পথে হাঁটে না।
এরপর মা আর তেমন কিছু বলেনি। তবে অন্য মেয়েকেও দেবে, এমনও না। তাই দুটো বছর তাদের গেল পুরো এলোমেলো। আপা আবার নতুন করে ভার্সিটিতে ভর্তি হলো। নোভাদের ভার্সিটিতেই, এক বছরের জুনিয়র হিসেবে। তাই নোভার আর নাবিলের ফাইনাল শেষ হলেও, আপা এখনও ঝুলছে। তার পাশাপাশি চলছে তার কাজ।
মায়ের লেখাপড়া হজম হলেও, অভিনয়টা হজম হয় না। তাই আপার সাথে ঝুলে ঝুলে সব জায়গায় যান। সব জায়গায় গিয়ে সবাইকে পেরেশানের ওপর রাখেন। একবার তো সেটের এক স্টাফকে দিলেন এক চড়। চড় খেয়ে সেই স্টাফ আর কাজই করবেন না।
দুনিয়ায় কেচাল। পরে প্রোডিউসার বুঝিয়ে শুনিয়ে রেখেছেন। আর মায়ের জন্য আলাদা স্টাফ দিয়েছেন। তাও মায়ের মন গলে? মেয়ের অভিনয় হজম হয় না, আবার সেটা নিয়ে বড় গলায় ডিরেক্টরদের পিন্ডি চটকাতে থাকেন।
তবে ততদিনে এটা ঠিক বুঝে গেছেন, এই মেয়ের আর যাই হোক, সংসার আর হবে না। জোর করেও না। তাই বড় মেয়ের হাল তিনি ছেড়েই দিয়েছেন।
তবে সেই হাল ছাড়লেও উঠে পড়ে লাগলেন নোভার পেছনে। তখন সে থার্ড ইয়ারে। যদিও নোভার কোনো চিন্তাভাবনা নেই। তবে ঘুরেফিরে শুরু হলো সেই আপার কাহিনি। মা খুঁজে খুঁজে তার জন্য বিয়ের প্রোপোজাল আনেন, আর ওই জঙ্গল পার্টি সুন্দর করে বিয়ে ভাঙেন। এই ভাঙায় এবার অবশ্য কোনো লুকোচুরি নেই। নিজের পার্টি অফিসে তুলে নেন। কাঁধে হাত রেখে সুন্দর করে বলেন, এই মেয়ে এই এলাকার ভাবি। এই যে আপনার সামনে কাজী পাড়ার খালিদ ভাই, এই খালিদের প্রেয়সী। সারা জীবন বিয়ে না হলেও সমস্যা নেই, তবে সে এই এলাকার বাইরে যাবে না।
এই ভাঙা নিয়ে মা আর খালিদ ভাইয়ের মাঝে ধুমধাড়াক্কা লেগে গেল। যেন তেন লাগা না, বিরাট বিচার শালিশ বসে গেল। আর কাউন্সিল বিচার সাইডে রেখে সবার সামনে দিলেন তার ভাতিজার জন্য বিয়ের প্রস্তাব, বড় ঘটা করে।
আপার ঘটনার পরে খালিদ ভাই মায়ের চোখের বিষ কিছুটা কমেছিল। তবে এই ঘটনার পর চোখের বিষ তো ভালোই, সারা শরীরের বিষে পরিণত হলো।
অবশ্য বাবা একবার গাইগুই করে বললেন,
ভেবে দেখা যায়। অতীত কি সেইটা তো আর কেউ জানে না। সবাই জানে কাউন্সিলের আপন ভাতিজা। তাছাড়া ছেলে তো ভালো। আমাদের কত উপকার করে। তাছাড়া ছোট মেয়ে চোখের সামনে রইল।
বড় চাচাও সহমত পোষণ করলেন। এতদিনে তো ছেলেটাকে চেনা হয়ে গেছে। তাছাড়া অপূর্ব যাওয়ার আগে বলেছিল, " খালিদের কেউ নেই, বাবা। যে জিনিসে তার হাত নেই, তার জন্য তাকে ঘৃণা করো না। বরং কখনো যদি সুযোগ আসে, তবে ওর পাশে থেকো।"
তবে মা মানলে তো? বরং সোজা ঘোষণা দিলেন, তিনি বিয়ে না দিলেও এই অসভ্য ফাজিলের কাছে মেয়ে দেবেন না। জীবনেও না।
দেওয়া, না দেওয়া নিয়ে নোভার তখন মাথাব্যথা নেই। সে তখন দুনিয়ায় ব্যস্ত, একদিকে ভার্সিটি, আর অন্যদিকে তার পেইজ হুরহুর করে ওপরে উঠছে। বিয়ের সময় আছে নাকি?
তবে নিয়ম করে এই জঙ্গল পার্টি তাকে জ্বালাতে লাগল, বিয়ে ভাঙতে লাগল। ভার্সিটির পথে বাইক নিয়ে রিকশার পেছনে পেছনে যেতে লাগল। এই লাগায় তার কোনো ক্লান্তি নেই। বরং প্রতিদিন ওই যে রাত, ঘুমানোর আগে ছোট একটা মেসেজ। সেই মেসেজে কোনো ভালোবাসার কথা থাকে না। রাগের কথা থাকে না। অভিযোগ থাকে না। তবে একেকদিন তার জীবনের একেক কথা লেখা থাকে। থাকে তাদের ছোটবেলার কথা, এতিমখানার কথা, লিখে এই যে দীর্ঘ জীবন। এই জীবনের অলি গলিতে বেঁচে থাকার ক্লান্তিহীন এক দৌড়ের কথা। যে দৌড় চলছে তো চলছে।
নোভা মেসেজগুলো মন দিয়ে পড়ে। মাঝে মাঝে তার নরম কোমল বালিশ ভিজে। তবে কোন উত্তর দেয় না। ব্যস, প্রতিদিন নিয়ম করে অপেক্ষা করে। আর যেই দিন রিকশার পেছনে বাইকটা না দেখে, কেমন শূন্যতা লাগে। এই শূন্যতা রাত হলে বুকে জমাট বেঁধে থাকে। তবে দিনে যখন জ্বালাতে আসে, তখন আবার গলা চেপে ধরতে ইচ্ছে করে।
তার ইচ্ছে অবশ্য এই মানুষটার কিছুই আসে যায় না। বরং নোভার সব কথাতেই সে হাসে। হাসবে আর বলবে, -- বুড়ো হয়ে যাচ্ছি নোভা।
নোভাও তার মতো উত্তর করে, -- তো, আমি কি করব?
-- তুমিই সব করতে পারো। তবে জানি তো করবে না। মায়ের মেয়ে না।
নোভা আর কিছু বলে না। প্রথম প্রথম বলত। আর কত? আর এভাবেই বছর কেটে গেল। সেই কাটার মাঝেই আজ কোন গ্রহণ লাগল, নোভা সেটাই বুঝতে পারল না। সেই না বোঝার মাঝেই দ্বিতীয় ধাক্কাটা খেল।
ছোট মামার শালার ছেলে নাকি তাকে পছন্দ করেছে। না করার উপায় আছে? বিয়েতে যে কোমর ঢুলিয়েছে, সেই ঢুলানি দেখে ফিট হবে না? এমন ছেলে এই বিয়ে বাড়িতে আছে?
তাই তার মা তলে তলে টেম্পু তো ভালোই, পুরো ট্রাক চালিয়ে ফেলেছে। তাই বাবা, বড় চাচাকে যেতে দেয়নি। আপা নেই, নাবিলকে অতি কৌশলে সরিয়েছেন। জানা কথা, খালিদ ভাইয়ের কানে গেলেই ঝামেলা পাকাবে। আর আপা আর নাবিলা পুরো খালিদ ভাইয়ের পক্ষে। নাবিল অবশ্য এই ব্যাপারে কখনও কিছু বলে না। ভালোও না, মন্দও না। তবে আপা একবার শুধু হাত ধরে বলেছিল,
-- কোনো জোর নেই নোভা। তবে আমরা যাকে ভালোবাসি, তার হাত ধরার চেয়ে আমাদের যে ভালোবাসে, তাদের হাত ধরা অনেক ভালো। কারণ নিজের ভালোবাসার মানুষও অনেক সময় ধোঁকা দেয়, তবে এই মানুষগুলো কখনও ধোঁকা দেয় না।
তখন নোভার বলতে ইচ্ছে হয়েছিল, -- তাহলে তুমি অপূর্ব ভাইয়ার হাতটা ধরছো না কেন? সে তোমাকে কতটা ভালোবাসে জানো? ভালোবাসে বলেই বিনা দ্বিধায় দূরে চলে গেছে। সেই দূরত্ব একমাত্র তুমি চাইলেই মিটবে, তা না হলে কখনও না।
তবে নোভা বলতে পারে না। সে আর আপা একই মায়ের পেটে জন্ম নিলেও, দুজনের ভাগ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। চাইলেই ঝট করে কিছু বলা যায় না।
তবে সেই দিন একটা কথা ঠিক জিজ্ঞেস করেছিল।
-- তুমি শাহরিয়ার ভাইয়াকে ঘৃণা করো, আপা?
আপা তখন হেসে বলেছিল, -- না, আমি তাকে ঘৃণা করি না। যে মানুষ আমার ঘৃণার ভয়ে হেসে হেসে এই দুনিয়া থেকে চলে গেছে, তাকে আমি ঘৃণা করি কী করে? তাকে আমি ঘৃণা করি না, এই তিল পরিমাণও না। আর না কখনও করতে পারব।
তাই এই বিয়ের কথা শুনে নোভা কিছুক্ষণ থম মেরে বসে রইল। তবে থম মারার কিছু নেই। খালিদ ভাই না থাকলে তার বিয়ের ঘণ্টা আরও অনেক আগেই বাজত। অনার্স কমপ্লিট হওয়ার আগেই বাচ্চাদের কা কা শুরু হয়ে যেত। তাই নোভা কী করবে বুঝতে পারল না। পেইজের দুঃখে কাঁদবে, না বিয়ের সুখে কাঁদবে, সেইটাই বুঝতে পারল না।
সে না বোঝার মাঝেই আসমানি খালা এলো পান চিবোতে চিবোতে। এসেই বলল,
-- মুখ লটকাই বইয়া রইছো ক্যা? ছেলে তো ভালো, চেনাজানা, দোষ নাই। তবে দেখতে একটু হাবলার মতো। তবে হাবলা ছেলেরা জামাই হিসেবে ভালো। বউয়ের কথায় উঠে বসে।
নোভা বিরক্ত মুখে বলল,
-- যাও তো খালা, মেজাজ খারাপ করবে না।
-- তোমার মেজাজ ভালো থাকে কবে?
নোভা উত্তর দিল না। বালিশে মুখ গুঁজে পড়ে রইল।
আসমানিও মাথা ঘামাল না। নাবিলা আম্মার বিকেলে একটা অনুষ্ঠান আছে, সেটাই দেখার জন্য টিভি ছাড়ল। ছাড়তে ছাড়তে বলল, -- আসমানির এমন কোন কাজ নাই, পারে না। কোন কাজ থাকলে কও।
নোভা সাথে সাথেই মাথা উঁচু করল। আসমানির অবশ্য হেলদোল হলো না। চ্যানেল ঘোরাতে ঘোরাতে বলল, -- তোমার গলা পার্টি মেইন রোডে আছে, একলা যাইবার পারবা, না আমারো সাথে ভাগতে হইবো?
নোভা বিস্ময় চোখে বলল, -- কে দাঁড়িয়ে আছে?
-- গলা পার্টি, জঙ্গল পার্টি, বিটলা আর কি কি বলো ইয়াদ নাই।
নোভা হা হয়ে গেলো। তার হা দেখে আসমানি বলল,
-- বড় ভাই ফোন করে বলেছে।
-- আর মা?
-- আগুন লাগব আগুন, তবে বড় ভাইয়ে কইল, যদি নোভা রাজি থাকে তবেই কিছু করবা। তা না হলে কিচ্ছু না। আমাদের মেয়ের ইচ্ছে সবার আগে। বাকি সব তারা সামলে নেবে।
নোভা হেসে ফেলল। তবে সাথে সাথেই আবার মুখ অন্ধকার করে বলল, -- আমার মোবাইল চুরি হয়ে গেছে, খালা।
আসমানি আঙুল থেকে চুন মুখে পুড়ল। পুড়তে পুড়তে মনে মনে বলল, " ব্যাটা যে কী জিনিস গলায় ঝুলাইতেছে, ব্যাটা নিজেও জানে না। জীবন তেজপাতা হয়ে যাইব নখরা
ঝেলতে ঝেলতে। বলেই মুখে বলল, -- উঠো, ওই ব্যাগে একটা বোরকা আছে, পড়ো।
নোভা মুখ অন্ধকার করেই বোরকা টেনে নিল। নিতে নিতে ফট করে বলল, -- আমার মোবাইল মা সরিয়েছে, তাই না?
আসমানি কোনো উত্তর দিল না। তার চোখ মুখ জুড়ে বিরক্তির ছাপ। যেন দুনিয়ার সব বিরক্তি একসাথে জমে আছে। তবে বোকা নোভা তো জানে না। এই বিরক্তিটুকুও আসলে চোখের পানি আড়াল করার আসমানির নিজের আয়োজন।
নিজের কোনো সন্তান নেই তার। সেই শূন্যতা থেকে একসময় স্বামীর সংসার ভাঙল। এই পুলাপানগুলোই তার কাছে নিজের সন্তানের মতো। আর নোভা, এই পাগল মেয়েটাই তো ছিল তার সব সময়ের সঙ্গী। সেই সঙ্গী আজ ধীরে ধীরে নিজের আলাদা জগৎ, আলাদা সংসারের পথে হাঁটছে।
তাই উপরে উপরে যতই বিরক্তি দেখাক, ভেতরে ভেতরে তার মন নরম হয়ে আছে। তাই আল্লাহ দরবারে দোয়া চেয়ে বলল, -- এই নাদান মেয়েটা আজ হয়তো একটা অন্যায় করতে যাচ্ছে। সেই অন্যায়টা তুমি ক্ষমার চোখে দেইখো আল্লাহ। একজনের জেদের জন্য সবার কষ্টের তো মানে হয় না। বাপ, চাচার সবার ভোট আছে। তাই দোষ মাপ।
নোভা বোরকা পরে একাই বেরিয়ে গেল। বাড়ি থেকে মেইন রোড খুব একটা দূরে না। সে ধীরে ধীরে এগোতে লাগল। তার মনে ওতো ভয় টয় নেই। মা গালে দুটো ঠিক লাগাবে, তবে দূরে সরিয়ে দেবে না জানে।
তাই যেতে যেতে দূর থেকেই সে দেখল, ওই যে দাড়ি গোঁফের জঙ্গল। সাদা পাঞ্জাবি গায়ে, পথের দিকে ব্যাকুল হয়ে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
আজ নোভা দাড়ি গোঁফে ভরা মুখটা দেখল না। দেখল শুধু সেই ব্যাকুল চোখদুটো। আর সেই চোখের দিকে তাকিয়েই হেসে ফেলল।
অনেক অনেক দিন আগে রুপালী পাড়ের লাল শাড়ি, গলায় গাঁদা ফুলের মালা নিয়ে খালিদের সামনে নাবিলা যেমন দাঁড়িয়ে ছিল। তেমনি সেই ফুলের মালা নিয়ে খালিদ নাবিলার সামনে দাঁড়িয়ে। খালিদ কিছু বলতে পারল না, তবে নাবিলা চোখে পানি নিয়ে বলল, -- আমার বোনটাকে দেখে রাখবেন খালিদ ভাই। মায়ের উপরে গিয়ে আপনার হাতে তুলে দিলাম। এই দেওয়ার অভিযোগ যেন আমার বোন কখনও না করতে পারে।
খালিদ এবারও কিছু বলল না। শুধু একটা বড় শ্বাস ফেলল। তারপর ভাইয়ের হাত ধরে দাঁড়িয়ে লাল টুকটুকে শাড়িতে তার পরিবারের নতুন সদস্যের দিকে তাকাল। নতুন সদস্য, তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। যে সদস্য শুধু তার জন্যই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে।
এই ঋণ কি কোনোদিন শোধ করা যাবে?
উঁহু, কখনোই না। এই জীবন তো ভালো, মৃত্যুর পরেও না।
তখনই নোভা খালিদের দিকে তাকাল। তাকাতেই চোখে চোখ পড়ল। আর পড়তেই নোভা সেই আগের মতো মুখ বাঁকালো। আর বাঁকাতেই খালিদ হেসে ফেলল।
চলবে....