ফন্ট সাইজ:
থিম:
আয় তবে সহচরী

4

লেখক: উম্মে_হাবিবা

হসপিটাল থেকে আসার তিনদিন পার হয়েছে। পুতুল এখন পুরোপুরি সুস্থ। প্রথম দুদিন হাতে ব্যাথার জন্য কান্না করলেও এখন আর করে না। আগের মতোই হেসে খেলে ছোটাছুটি করে বেড়ায়। ছোট্ট ছোট্ট পায়ে পুরো ঘরে দৌড়াদৌড়ি করে। দৌড়াতে গিয়ে ধপাস করে পড়ে গেলে খিলখিলিয়ে হেসে আবারও দৌড়ায়।

মেহরিমা মেয়েটার এমন হাসিখুশি মুখ দেখে প্রশান্তি পায়। অসুস্থ, চুপচাপ পুতুলকে তার একদম সহ্য হয় না। তার পুতুল সবসময় এমন হাসবে,খেলবে তাদের ছোট্ট ঘরটা আনন্দে মাতিয়ে রাখবে এটাই তার চাওয়া। চুপচাপ পুতুলকে দেখলে তার বুক ভার হয়। অস্থির অস্থির লাগে।

পুতুল অসুস্থ থাকার এই দুদিন তার কাছে দুই যুগের সমান মনে হয়েছে। যতবারই ওই আদুরে ফ্যাকাশে নিশ্চুপ পুতুলের মুখটা দেখেছে ততবারই কেঁদে ফেলেছে। আল্লাহর কাছে কতো সাহায্য চেয়েছে। অবশেষে রব তার ফরিয়াদ শুনেছেন। তার পুতুলকে আবারও তার কোলে ফিরিয়ে দিয়েছেন।

মেহরিমা পুতুলকে দেখে নিয়ে পা বাড়ালো পাশের ঘরে। ওখানে তার মেজ আপা থাকে। মানসিক ভারসাম্যহীন সে। সারাদিন একজায়গায় বসে থাকে। তুলোর একটা পুতুল বুকে জড়িয়ে কিসব বিরবির করে। কখনো হাসে,কখনো কাঁদে, কখনো আবার নিজে নিজেই পাগলামি করে। হাতের কাছে যা পায় তাই দিয়েই নিজেকে আ'ঘাত করে। মেহরিমা নিজের আপার এমন পরিনতি মেনে নিতে পারে না। আপাকে দেখলেই সেই র'ক্তাক্ত ছোট্ট দেহটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। কেমন নৃ'শংস ভাবে ক্ষ'তবিক্ষত করেছিলো জা'নোয়ার গুলো। অতোটুকু প্রাণের উপরও মায়া হয় নি তাদের।

অতীত ভেবে মেহরিমার চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়লো দুফোঁটা পানি। আলগোছে চোখের পানি মুছে ভাতের থালা হাতে এগিয়ে গেলো বোনের কাছে। সামনাসামনি বসে ডাকলো নিচু স্বরে

--মেজ আপা।

জেসমিন মাথা তুললো। ছোট বোনকে দেখে হেঁসে বললো

--ছুটকি এসেছিস। দেখ না বাবু উঠে গেছে। তুই কোলে নিবি বাবুকে? আমাকে একটু আগে বলছিলো ছোট মনি কখন আসবে? কখন এসে আমায় আদর করবে?

মেহরিমার বুকটা ভার হয়ে উঠলো। জেসমিন এখনও তুলোর পুতুল টা বাড়িয়ে আছে। ছোট বোন কোলে নিচ্ছে না দেখে তাড়া দিয়ে বললো

--চুপচাপ বসে আছিস কেনো? বাবুকে কোলে নে।

মেহরিমা ভাতের থালা পাশের রেখে কাঁপা হাতে পুতুলটা নিজের বাহুতে জড়িয়ে নিলো। বোনকে দেখাতে পুতুলটাকে মিছেমিছে আদর করতে লাগলো।

জেসমিন খুশিতে হাত তালি দিয়ে বললো

--ছুটকি দেখ বাবু হাসছে। ছোটমনির কোলে উঠে বাবু হাসছে।

মেহরিমা বোনের দিকে অসহায় চোখে তাকিয়ে রইলো শুধু। কি বলে স্বান্তনা দিলে তার আপা সামন্য পুতুল নিয়ে আর এমন পাগলামি করবে না জানা নেই অষ্টাদশীর। কল্পনার জগৎ থেকে বেরিয়ে কবে আবারও সুস্থ, স্বাভাবিক আচরণ করবে তা ও অজানা।

মেহরিমা পুতুলটা আলতো করে পাশে রাখলো। জেসমিন মন খারাপ নিয়ে বললো

--ছুটকি বাবুকে রেখে দিলি কেনো? ওকে আর আদর করবি না।

মেহরিমা বোনের হাত ধরলো। শান্ত স্বরে বললো

--আদর করবো তো আপা। কিন্তু তার আগে যে তোকে খেতে হবে। তুই না খেলে বাবু তো অসুস্থ হয়ে পড়বে। তুই কি চাস বাবু অসুস্থ হয়ে কষ্ট পাক।

--না না আমি খাবো। অনেক গুলো খাবার খাবো। তাহলে আমার সোনা সুস্থ থাকবে তো?

--থাকবে আপা। তুই ঠিক মতো খাবার, ঔষধ খেলে বাবু সুস্থ থাকবে।

জেসমিনের মুখের হাসি ফুটলো। পাশে রাখা পুতুলের মাথায় আদর করে দিয়ে বাবু হয়ে বসলো। হাতে,পায়ে শেকলের টান লাগলে ছোট বোনকে বললো

--ছুটকি এগুলো খুলে দে না। দেখ না এগুলো আমার হাতে,পায়ে অনেক ব্যাথা দেয়। খুব কষ্ট হয় আমার।

মেহরিমা ভেজা গলায় বললো

--খুলে দেবো আপা। সব বাঁধন খুলে দেবো। তোকে আর বন্দী করে রাখবো না। দ্রুত সুস্থ হয়ে যা আপা,তোকে বন্দী দেখতে যে আমারও ভালো লাগে না।

মেহরিমার চোখে পানি দেখে অস্থির হলো জেসমিন। দ্রুত হাতে বোনের চোখের অশ্রু গুলো মুছে দিয়ে বললো

--তুই কাঁদিস না ছুটকি,আমি ভালো আছি। একদম কষ্ট হচ্ছে না আমার। আমাকে খাইয়ে দিবি না। অনেক ক্ষুধা লেগেছে তো।

মেহরিমা ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকানোর চেষ্টা করলো। খাবার হাতে বোনের মুখে তুলে দিলো। জেসমিন কয়েক লোকমা খাওয়ার পর মুখ কুচকে বললো

--আর খাবো না ছুটকি। প্রতিদিন পানি ভাত খেতে ভালো লাগে না। ভাত গলায় আটকায়। একদিন তরকারি দিয়ে ভাত দিস তো। সেদিন অনেক গুলো ভাত খাবো। আজ রেখে দে।

মেহরিমা বলার মতো কোনো কথা খুঁজে পেলো না। এখন তারা যেসব খাবার খায় ছ'মাস আগে এসব কখনো চোখেও দেখেনি। যেখানে দিনে তিনবেলায় তারা নতুন নতুন পদ দিয়ে খাবার খেতো সেখানে এখন একবেলা ও খাবার জোটে না। এ কেমন ভাগ্য দিলো তাদের খোদা? কবে একটু সুখের দেখা মিলবে তাদের?

মেহরিমা আড়ালে চোখের পানি মুছলো। জেসমিন তার মতো পুতুল নিয়ে ব্যস্ত। পুতুলকে বুকে জড়িয়ে ঘুম পাড়াচ্ছে। মেহরিমা বোনকে আর জোড় করলো না। ভাত পাশে রেখে হাত ধুয়ে নিলো। ঔষধের বক্স থেকে ঔষধ বের করে বোনের হাতে দিলো। জেসমিন ঔষধ মুখে নিয়ে নাম মুখ কুচকে বললো

--এগুলো অনেক তিতা ছুটকি। খেতে একদম মজা লাগে না। ওসব না খেলে কি বাবু সুস্থ থাকবে না?

শেষ কথাটা অসহায় ভাবে বললো জেসমিন। মেহরিমা পানি এগিয়ে দিয়ে বললো

--আপাতত খেতে হবে আপা। বাবুর সুস্থতার জন্য হলেও খেতে হবে। কিচ্ছু করার নেই।

জেসমিন অল্প একটু পানি খেলো। মেহরিমা নিজের ওড়না দিয়ে বোনের মুখ দিলো। বোনকে বিছানায় শুইয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বললো

--এখন একটু ঘুমাও আপা। দেখবে ভালো লাগবে।

জেসমিন চুপচাপ মেনে নিলো। পুতুলটা বুকে জড়িয়ে চোখ বুজে বললো

--গান শোনা তো ছুটকি। ওই যে ওই গান টা। তুই মাঝে মাঝে আমাদের শোনাস ওটা।

মেহরিমা বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়ালে হেলান দিলো চোখ বুজে ভেজা স্বরে গেয়ে উঠলো

~খোকা ঘুমালো পাড়া জুড়ালো
বর্গি এলো দেশে
বুলবুলিতে ধান খেয়েছে
খাজনা দেব কিসে~

****************************
--বজ্জাত বিলায়ের বাচ্চা, কোথায় তুই? একবার শুধু সামনে আয় নোড়া দিয়ে টাকিয়ে তোর দাঁত আমি ভেঙে ফেলবো। কত বড় সাহস চুরি করে আমার চকলেট খেয়ে ফেলিস।

অষ্টাদশী কন্যা রা'গে ফোসফাস করতে করতে রুমের এ মাথা থেকে ও মাথা হন্নে হয়ে খুজে বেড়াচ্ছে তার পোষা বিড়াল দাবিয়াকে। দুবছর আগে অনেক শখ করে এই বিড়াল টা কিনেছিলো সে। কিন্তু কেনার পরই বিড়াল টা একটু বড় হলে সে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে খাল কেটে আসলে সে কুমিড় এনেছে। নেহাতই একটু ভালোবাসে বলে বজ্জাত বিলাই এখনও তার কাছে আছে নইলে কবেই এটাকে ঘাড় ধরে বের করে দিত।

দাবিয়াকে খুজে না পেয়ে রা'গ যেন বেড়ে গেলো অষ্টাদশীর। পুনরায় চেচিয়ে বললো

--বিং বিং এর বাচ্চা কোন গর্তে লুকিয়েছিস তুই? বের হ বলছি। এখনি বের হ। আমি খুঁজে পেলে কিন্তু সারাদিন না খাইয়ে রাখবো তোকে।

অষ্টাদশী কন্যার সাজিয়ে রাখা পুতুলের মাঝে ঘাপটি মে'রে বসে আছে সাদা রঙের বিড়াল দাবিয়া ওরফে বিং বিং। পুতুলের ফাঁক থেকে চোখ দুটো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছে মালিককে। সারা মুখে তার চকলেট দিয়ে ভর্তি। একটু আগেই একটা চকলেটের অর্ধেক তার সূচালো দাঁত দিয়ে ছিড়ে কুট কুট করে খেয়েছে। তার মালিকের বদৌলতে মানুষের অনেক খাবার খাওয়ার সৌভাগ্যই তার হয়েছে। সেই জন্য চকলেট, চিপস এমনকি কোক পেলে সে মজা করে খেয়ে নেয়।

মেয়েটার চেঁচানোর আওয়াজে নিচ থেকে চলে এলেন এ বাড়ির বড় বউ রোজিনা। মেয়েটাকে এমন হন্নে হয়ে কিছু খুঁজতে দেখে কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো

--শায়েরী মা আমার, এভাবে কি খুঁজছিস তুই আমাকে বল। আমি খুঁজে দিচ্ছি।

শায়েরী তার বড়মার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট ফুলিয়ে কেঁদে ফেললো। হাতের অর্ধেক চকলেট টা দেখিয়ে বললো

--দেখো মামনি,ভালো করে দেখো বজ্জাত বিং বিং কি করেছে। আমার শখ করে কিনে আনা চারশ টাকার চকলেট চুরি করে খেয়ে ফেলেছে।

রোজিনা বেগম মেকি হেসে শায়েরির হাত থেকে চকলেটটা নিজের হাতে নিলো। উল্টে পাল্টে দেখলো পুরো চকলেট টায় জায়গায় জায়গায় ছিড়ে খাওয়া। মানুষের খাওয়ার উপযোগী আর নেই। রোজিনা বেগম শায়েরীর হাত ধরে নিয়ে বিছানায় বসলো। এক হাতে জড়িয়ে নিয়ে বললো

--থাক না আম্মু অবলা প্রাণী টাকে মাফ করে দে। একটু না হয় ভুল করে চকলেট খেয়ে ফেলেছে তাই বলে তুই এমন বাচ্চাদের মতো কাঁদবি?

--ভুল করে খেয়েছে? তোমার তাই মনে হয় মামনী? বজ্জাত বিলাইয়ের বাচ্চা চুরি করে খেয়েছে। ছোঁচা বেড়াল একবার খুঁজে পায়। আজই ঘাড় ধরে বাসা থেকে বের করে দেবো। দু ইঞ্চির ছাও আমাকে জ্বালিয়ে মারলো।

শায়েরী রা'গে ফোসফাস করছে। রোজিনা বেগম মেয়েটার কথা শুনে মিটিমিটি হাসলো। আশেপাশে চোখ বুলিয়ে খুজলো মহারাণী ঠিক কোথায় লুকিয়েছে। পুতুলের আড়ালে সাদা লেজের নড়াচড়া দেখে বুঝে গেলেন মহারাণী অবস্থান। এটাও পারে বটে। এতো বকা খায় তবুও শুধরবে না।

রোজিনা বেগম শায়েরীকে মানাতে বললো

--থাক আম্মু আর কাঁদতে হবে না। আমি রায়হান কে ফোন করে বলবো আসার সময় তোর জন্য অনেক গুলো চকলেট আনতে। তখন বিংবিং কে দেখিয়ে দেখিয়ে একা একা খাবি। ছোঁচা কে একটুও দিবি না।

শায়েরী আড় চোখে মামনীকে দেখলো। চোখের পানি মুছে নাক টানতে টানতে বললো

--শুধু চকলেট আনলে হবে না। ফুচকা,ভেলপুরি আর মোমো ও আনতে বলবে কিন্তু।

রোজিনা বেগম হেসে ফেললেন। মেয়েটার গাল টেনে বললেন

--ঠিক আছে বলবো।

শায়েরী হেঁসে ফেললো। দু'হাতে জড়িয়ে ধরলো তার মামনীকে। রোজিনা বেগম আলগোছে আগলে নিলেন বাড়ির সবচেয়ে আদুরে কন্যাকে। ছোট থেকে মেয়েটাকে তিনি পেলেপুষে আদর দিয়ে বড় করেছেন। মেয়েটাও ঠিক আদুরে ছানার মতোই তার কাছে। যত আবদার সব মামনীর কাছে।

শায়েরী মামনীর বুক থেকে উঠে বললো

--এবার বলো ওই ছোঁচা কোথায়? কোন চিপায় গিয়ে লুকিয়েছে?

--সন্ধান দিলে কি করবি ওর সঙ্গে? বের করে দিবি বাড়ি থেকে।

--মোটেই না। বরং ছোঁচাকে দেখিয়ে দেখিয়ে সব খাবার একাই খেয়ে ফেলবো। এটাই ওই বজ্জাতের শা'স্তি।

রোজিনা বেগম হেসে দুপাশে মাথা নাড়ালেন। হাতের ইশারায় দাবিয়ার অবস্থান দেখিয়ে দিয়ে রুম থেকে চলে গেলেন। শায়েরী পা টিপে টিপে নিজে বড় টেডিবিয়ারের পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। নিঃশব্দে নিচু হয়ে ঘপাত করে দাবিয়ার ঘাড় ধরে নিজের সামনে আনলো।

দাবিয়া ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে আছে। হাত-পা একজায়গায় জড়ো করে মাথা নিচু করে রেখেছে। শায়েরী দাবিয়ার এমন ইনোসেন্ট ফেস দেখে মূহুর্তেই ছ্যাত করে উঠলো। খেক খেক করে বললো

--বজ্জাতের বাচ্চা দোষ করে আবার ইনোসেন্ট সাজা হচ্ছে। কি ভেবেছিস এমন মায়া মায়া চেহারা বানিয়ে রাখলে তোকে আমি মাফ করে দেবো? আজই তলপিতলপা গুছিয়ে তোকে বের করে দেব। তখন রাস্তায় রাস্তায় ঘুড়ে মেও মেও করিস।

অবলা প্রাণী নিজের মালিকের থেকে বকা খেয়ে মুখটা চুপসে ফেললো। মুখে লেগে থাকা চকলেট গুলো জিভ দিয়ে চেটে খেয়ে ক্ষীণ স্বরে ডাকলো

--মিউ মিউ

শায়েরী এক হাত কোমড়ে রেখে দাবিয়াকে নিয়ে বিছানার কাছে এগিয়ে গেলো। বিড়ালটাকে বিছানার উপর বসিয়ে রেখে মাঝারি সাইজের বেতটা বের করে আনলো। এক কোমড়ে রেখেই গম্ভীর স্বরে ডাকলো

--দাবিয়া

বোবা প্রাণী ফট করে মাথা তুললো। আদুরে চেহারা বানিয়ে জবাব দিলো

--মিউ মিউ

--আর কখনো চুরি করে কিছু খাবি?

--মিউ

--আমার কোনো জিনিস নষ্ট করবি?

--মিউ

--যেখানে সেখানে পটি করবি?

--মিউ

--আর একবার লিটার ব্যতীত অন্য জায়গায় তোর পটি দেখলে পাছায় কস্টেপ লাগিয়ে দেবো বুঝেছিস।

--মিউ

প্রতিবার দাবিয়ার মিউ মিউ শুনে শান্তি পেলো শায়েরী। পাশে বসে বললো

--ভেরী গুড। এভাবেই সবসময় আমার কথা শুনবি।

মালিক শান্ত হয়ে বুঝতে পেরে দাবিয়া ফট করে শায়েরীর কোলে উঠে ঘাপটি মে'রে বসে পড়লো। মাথা নাড়িয়ে আদর চাইলো। শায়েরী বেতটা পাশে রেখে বিড়ালের লম্বা লম্বা পশকে হাত বুলিয়ে দিলো। মুচকি হেসে বললো

--এভাবেই প্রতিবার ইনোসেন্ট সেজে আর ভালোবাসা আদায় করে বেঁচে যাস তুই। একটু বেশি ভালোবাসি বলে কিছু বলতেও পারি না। সেই তো মুখ ফুলিয়ে বসে থাকবি। পড়ে তোকে তোষামোদ করতে করতে আমার দম বেড়িয়ে যায়।

দাবিয়া আদুরে কন্ঠে স্বায় দিলো। আরো ঘাপটি মেরে ডেকে উঠলো

--মিউ মিউ

শায়েরী মুচকি হাসলো। ধপাস করে শুয়ে পড়লো বিছানায়। দাবিয়াকে বুকে রেখেই চোখ বুজলো। এই অবলা প্রাণীটাই তার শান্তি। একমাত্র বিশ্বস্ত বন্ধু। এটাকে জীবনে না পেলে শায়েরী বুঝতোই নিঃসঙ্গ জীবনের পূর্ণতা কাকে বলে?

********
বিছানায় শুয়ে আছে শায়ের। পায়ের ব্যাথা বেড়ে যাওয়ায় আজ আর ভার্সিটি মুখো হয়নি। আর গিয়েই বা কি করবে? সেই তো বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়া আর স্যার,স্টুডেন্টদের নাকানিচুবানি খাওয়ানো। এসব ব্যতীত আর কাজ কি?

শায়েরের কাছে আজকাল জীবনটা খুব বোরিং লাগে। কেমন পানসে পানসে। ঠিক লবণ ছাড়া তরকারির মতো। সব আছে কিন্তু স্বাদ নেই। শায়েরের এসব ভালো লাগে না। জীবনে শান্তিতে থাকতে হলেও একটু নতুনত্বের স্বাদ নেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু কোথায় মিলবে সেই শান্তির খনি?

শায়ের বিছানায় শুয়ে থেকেই ডাকলো রাহুলকে। গম্ভীর স্বরে বললো

--রাহুল কই তুই? যাদুর খনি নিয়াই তো। হুট করে ক্রেভিং উঠেছে। না খেলে শান্তি নেই।

ঠিক দু'মিনিটের মাথায় রাহুল এলো। শায়ের চোখ বন্ধ রেখে বললো

--এনেছিস যাদুর খনি? দ্রুত দে। অশান্তি অশান্তি লাগছে।

সেকেন্ড পাড় হলেও যখন রাহুল হুইস্কির বোতল এগিয়ে দিলো তখনই শান্ত মেজাজ চটে গেলো শায়েরের। ফট করে চোখ খুলে রাহুলের দিকে তাকিয়ে বললো

--হাত খালি কেনো তোর? যাদুর খনি কোথায়?

রাহুল  মাথা নিচু করে ফেললো। ধীর স্বরে বললো

--ভাই আজকে না খেলে হয় না। তোমার জ্বর তো এখনো কমে নি। সুস্থ হয়ে নাও আগে তারপর ওসব খেয়ো।

শায়ের রাহুলের দিকে অনুভূতি শূন্য চোখে তাকিয়ে থেকে উঠে বসলো। বুজে হাত গুজে গম্ভীর স্বরে বললো

--সামান্য জ্বর আমাকে কাবু করবে? এতোটা দূর্বল ভাবিস তুই আমায়?

সহসা মাথা নাড়ালো রাহুল। নাকোচ করে বললো

--না ভাই সেটা কখন বললাম। বলতে চাইছি ওসব ঝাঁঝালো পানি না খেয়ে বলো কি খেতে চাও আমি বানিয়ে দিচ্ছি।

শায়ের ফোঁস করে একটা শ্বাস ফেললো। রাহুলকে পাশে বসিয়ে বললো

--আমাকে নিয়ে অতো ভাবিস না রাহুল। মনে রাখবি জীবনে যতো মায়া কমাতে পারবি ততো সুখে থাকবি। শালার জিন্দেগীতে মায়া বেশি থাকলেই লস। শান্তিতে ঘুমানো ও যায় না।

রাহুল ব্যথিত চোখে শায়েরের দিকে তাকিয়ে রইলো। পাঁচ টা বছর হলো শায়েরের সঙ্গে থাকে সে। পাঁচ বছর আগে যদি এই মানুষটা তাকে বুকে আগলে না নিতো তাহলে কোথায় ঠাই হতো তার? ভেসে যাওয়া কচুরিপানার মতো কোথায় যেতে ভেসে?

রাহুল নিস্তেজ স্বরে বললো

--ভাই কিছু খাবা না। সকাল থেকে না খেয়ে আছো। এভাবে থাকলে চলবে?

শায়ের চোখ বুজেই তাচ্ছিল্যে হাসলো। দু'হাত পিছনে রেখে বিছানায় হেলাম দিলো। রাহুলের দিকে তাকিয়ে বললো

--অনেক দিন হলো ঝাল ঝলা কোনো ভর্তা খাওয়া হয় না। আজ একটু ভর্তা বানাতো রাহুল। বেশ ঝাল ঝাল করে বানাবি। দেখেই যেন খাওয়ার ইচ্ছে জাগে।

ঝটপট উঠে দাঁড়ালো রাহুল। আনন্দে তার চোখ দুটো হাসছে। উৎফুল্ল কন্ঠে বললো

--তুমি রেস্ট নাও ভাই। আমি সবকিছুর ব্যবস্থা করছি।

--তুই একা পারবি না। চল আমিও সাহায্য করছি।

--কিন্তু ভাই তোমার পায়ে তো ব্যাথা।

--আরে ওসব মামুলি ব্যাপার। বাদ দে তো।

শায়ের রাহুলকে বগলদাবা করে কিচেনের দিকে এগিয়ে গেল। বনানীর বিলাসবহুল এপার্টমেন্টে থাকে সে। মানুষের তুলনায় ফ্ল্যাটটা অনেল বড়। প্রয়োজনীয় সবকিছুই আছে এখানে। শায়ের ফ্রীজ খুলে ডিম,বেগুন,টমেটো,কাঁচা মরিচ সবকিছু বের করে রাখলো। রাহুল গ্যাসে পাতিল বসিয়ে তাতে গোটা চারেক বড়বড় আলু আর ডিম সেদ্ধ দিলো। বেগুন পিচ পিচ করে কেটে প্যানে ভেজে নিলো। দুজনে মিলে গল্প করতে করতে আলু ভর্তা,মরিচ ভর্তা,টমেটো ভর্তা,বেগুন ভর্তা আর ডিম ভর্তা করে ফেললো।

শায়ের আলাদা করে পেঁয়াজ মরিচ ভর্তা করার মাঝেই কলিং বেজে উঠলো। শায়ের ব্যাসিনে হাত ধুয়ে যেতে যেতে বললো

--সব টেবিলে এনে রেডি কর। আমি দেখে আসছি কে এলো।

রাহুল সম্মতি দিয়ে নিজের কাজে মন দিলো। শায়ের ধীর কদমে দরজার কাছে গিয়ে দরজা খুলে বাইরে দাড়ানো মানুষটাকে দেখে অবাক হলো। বিস্মিত কন্ঠে বললো

--তুমি এখানে?

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে 4 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন