ফন্ট সাইজ:
থিম:
আয় তবে সহচরী

5

লেখক: উম্মে_হাবিবা

দরজার বাইরে দাঁড়ানো মানুষটাকে দেখে শায়ের একদিকে যেমন অবাক তেমনি মনে মনে কিছুটা খুশি ও হয়েছে। নিজের ভেতরের সূক্ষ্ম ভালো লাগাকে প্রকাশ না করে শায়ের গম্ভীর কন্ঠে বললো

--হঠাৎ এখানে এলে যে? তোমার আদরের ভাই জানে এই খবর?

--বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখবে বলে শপথ করেছো?

শায়েরের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে গুরুগম্ভীর স্বরে পাল্টা প্রশ্ন করলেন রেজওয়ান আনসারী। ভদ্রলোককে দেখে বেশ ক্লান্ত মনে হচ্ছে। গায়ের কালো ব্লেজার টাও এলোমেলো। চুল গুলো উষ্কখুষ্ক। ক্লান্ত মুখশ্রীতে ঘামের ক্ষুদ্র কণা চিকচিক করছে। শায়ের সূক্ষ্ম নজরে নিজের বড় আব্বুর অবস্থা অবলোকন করলো। সামনে থেকে সরে গিয়ে ভেতরে ঢোকার জায়গা করে দিলো।

রেজওয়ান আনসারী ধীর কদমে চুপচাপ ভেতরে গিয়ে সোফায় বসলেন। হাতের ব্রিফকেস আর ছোট লাগেজটা পাশে রেখে ব্লেজার খুলে পাশে রাখলেন। গলার টাই ঢিলে করে শায়েরের উদ্দেশ্যে বললো

--এসির পাওয়ার টা বাড়াও। টাকা পয়সার তো অভাব নেই। এরপরও এই গরমে এমন কিপ্টেমি করছো কেনো?

শায়ের বড় আব্বুর কথা শুনেও কিছু বললো না। এসির পাওয়ার বাড়িয়ে খুড়িয়ে খুড়িয়ে রান্না ঘরে গেলো। নিজের হাতে কাঁচা আমের শরবত বানিয়ে রাহুলকে দিয়ে পাঠিয়ে দিলো।

রাহুল রেজওয়ান আনসারীকে বরাবরই ভয় পায়। কারণ ছাড়াই ভদ্রলোকের সামনে গেলে তার হাঁটু কাঁপা শুরু হয়ে যায়। এমন নয় যে রেজওয়ান আনসারী রাহুলকে কখনো বকা দিয়েছে কিংবা বাজে ব্যবহার করেছে।তারপরও রাহুলের এই ভয়ের কারণ অজানাই।

রাহুল রেজওয়ান আনসারীর কাছে এসে নিচু স্বরে সালাম দিয়ে বললো

--আঙ্কেল আপনার জন্য শরবত আনছি। খেয়ে নিন দেখবেন ভালো লাগবে।

রেজওয়ান আনসারী শান্ত চোখে রাহুলের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে গ্লাসটা হাতে নিলো। এক চুমুক খেয়ে বললো

--পড়াশোনার কি অবস্থা তোমার? শুধু কি আড্ডায় দাও নাকি পড়াশোনা ও কিছু করো।

--পড়াশোনা ভালোয় চলছে আঙ্কেল।

--এবার যেন কোন ক্লাসে তুমি?

--থার্ড ইয়ারে পড়ছি আঙ্কেল।

--ভালো। মন দিয়ে পড়াশোনা করবে। আবার আমাদের গুনধর পুত্রের মতো ফাঁকিবাজ হইয়ো না। তাহলে কিন্তু বিপদ।

রাহুল একটু অস্বস্তিতে পড়লো। দেনা মোনা করে বললো

--ভাই তো অনেক ব্রিলিয়ান্ট আঙ্কেল।

--শুধু ব্রিলিয়ান্ট হয়ে লাভ কি যদি কাজেই না লাগায়।

--কিন্তু ভাই তো..

--রাহুল খাবার রেডি কর। ক্ষুধা লেগেছে আমার।

পেছন থেকে শায়েরের গম্ভীর স্বর শুনে চুপ করে গেলো রাহুল। আর কোনো বাক্যব্যয় না করে চুপচাপ চলে গেলো। শায়ের রেজওয়ান আনসারীর সামনের সোফায় বসলো। গমগমে স্বরে বললো

--হঠাৎ এখানে আসার কারণ কি?

--তোমাকে দেখতে এলাম।

--আমাকে নতুন করে দেখার তো কিছু নেই। এমন তো নয় যে আমার চেহারা পাল্টা গেছে। এরজন্য ঘটা করে দেখতে এসেছো।

রেজওয়ান আনসারী পুনরায় শরবতে চুমুক দিলেন। শান্ত স্বরে বললেন

--তোমার চেহারা না পাল্টালেও তুমি যে দিন দিন পাল্টে যাচ্ছো এতে তো কোনো ভুল নেই মাই বয়।

নিজের চাচ্চুর কথা শুনে শায়ের একটু তাচ্ছিল্যে হাসলো। দু আঙুল দিয়ে কপালে স্লাইড করে বললো

--আসল কথায় আসো। কোন প্রয়োজনে এসেছো?

--আশ্চর্য! নিজেদের ছেলের কাছে প্রয়োজন ব্যতীত কি আসা বারণ?

শায়ের মুচকি হাসলো। ঝুঁকে এসে চাচ্চুর উদ্দেশ্যে ফিসফিস করে বললো

--তুমি আর তোমার ভাই যে প্রয়োজন ছাড়া কুটো টাও নেড়ে দেখো না এটা আমার চেয়ে ভালো আর কে জানে বড় আব্বু।

শায়েরের শান্ত কন্ঠের কথাগুলো শুনে কিছুটা কেশে উঠলো রেজওয়ান আনসারী। ভনিতা না করে বললো

--কিছু পেপারে তোমার সিগনেচার প্রয়োজন। নতুন একটা প্রজেক্টের কাজ পেয়েছি। কাজ টা ভালোভাবে শেষ করতে পারলে কোম্পানি বেশ ভালো প্রফিট পাবে আশা করছি।

শায়ের শুধু ঠোঁট কামড়ে বাঁকা হাসলো। নিরেট স্বরে বললো

--কিসের পেপার বের করে জলদি ঝামেলা শেষ করো। রোজ রোজ তোমাদের এই নাটক ঠিক হজম হয় না আমার।

রেজওয়ান আনসারী শরবত টুকু শেষ করলেন। সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে গা ঝাড়া ভাব নিয়ে বললো

--আপাতত খেয়ে দেয়ে একটু ঘুমাতে চায়। ব্যবসা বানিজ্যের হিসাব পড়ে করবো। কি রান্না হয়েছে আজ তোমার বাসায়?

কথা বলতে বলতে রেজওয়ান আনসারী নিজেই টেবিলের দিকে এগিয়ে গেলেন। বিভিন্ন প্রকার ভর্তা আইটেম দেখে বললো

--আরে বাহ! বেশ মজার খাবার রান্না করেছো তো। অনেক দিন হলো ভর্তা খাওয়া হয় না। আজ বেশ জমিয়ে খাওয়া যাবে।

রেজওয়ান আনসারী চেয়ার টেনে বসে নিজেই প্লেটে ভাত বেরে নিলো। অল্প একটু মরিচ ভর্তা দিয়ে ভাত মাখিয়ে খেয়ে তৃপ্তি নিয়ে বললো

--অনেক মজা হয়েছে তো। কে বানিয়েছে এটা?

রাহুল একবার শায়েরের দিকে তাকিয়ে ভয়ে ভয়ে বললো

--আ..আমি আঙ্কেল।

রেজওয়ান আনসারী মুচকি হাসলেন। শায়েরকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে ডাক দিয়ে বললেন

--তুমি বসে আছো কেনো? আসো আসো খেয়ে নাও। সব আমি খেয়ে নিলে পরে কিন্তু আফসোস করবে।

শায়ের রেজওয়ান আনসারীর রসিকতায় নিজেও হাসলো। টেবিলে বসে রাহুলকে ও বসতে বললো। তিনজনের মনোযোগই খাবারে। শায়ের খাওয়ার মাঝে হঠাৎ করেই বললো

--শুনলাম তোমার বড় ছেলের নাকি বিয়ে দিবে? এই কথা কতোটুকু সত্যি বড় আব্বু?

রেজওয়ান আনসারী খেতে খেতে জবাব দিলেন

--কার বিয়ে? রায়হানের? কথাটা আংশিক সত্য হলেও পুরোপুরি নয়। কথাবার্তা চলছে। আমাদের কোম্পানির শেয়ার হোল্ডারের একমাত্র মেয়ে জেরিন। মির্জা ফখরুলই প্রথমে এই প্রস্তাব এনেছিলো। আমি এখনো সম্মতি দেয় নি। বলছি বাসায় গিয়ে সবার সঙ্গে কথা বলে জানাবো।

শায়ের চুপচাপ শুনলো শুধু। রেজওয়ান আনসারী পুনরায় বললো

--তবে এই বিয়েটা হলে খুব একটা খারাপ হয় না। চিন্তা করে দেখালাম মির্জা ফখরুলের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক করলে আমাদেরই লাভ। কোম্পানির শেয়ারে এর প্রভাব পড়বে।

শায়ের এবারেও কিছু বললো না। শেষ লোকমা মুখে তুলে উঠে যেতে যেতে বললো

--আজকাল নিজের সন্তানকেও বিজনেসের ডিল হিসেবে ব্যবহার করছো। বিষয়টা মন্দ নয় তবে সম্পর্ক জোড়ার আগে নিজের ছেলের মনের খবর একটু জেনে নিও। নয়তো দেখে যাবে দিনশেষে পাশার গুটি উল্টো তোমাদের দিকে ঘুরতে শুরু করেছে।

শায়েরের এমন কথার মানে বুঝলেন না ভদ্রলোক। খাওয়া থামিয়ে সন্দিহান কন্ঠে বললো

--তুমি বলতে চাইছো রায়হানের অন্য কাউকে পচ্ছন্দ আছে?

শায়ের নির্লিপ্ত। ঠোঁট উল্টে বললো

--তোমাদের রাজপ্রাসাদের বাইরে থেকে ভেতরের খবর সম্পর্কে আমি কিছুটা হলেও অবগত। আর তোমরা সামনে থেকে দেখেও কিচ্ছু টের পাও না। তোমাদের মতো বিচক্ষণ মানুষদের থেকে এটা আশা করা যায় না বড় আব্বু।

--অতো ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে না বলে সরাসরি বলো।

--আমি বলবো কেনো? তুমি না বাবা। বাবা হিসেবে তোমার তো দায়িত্ব সন্তানের মনের খবর সম্পর্কে জানা। অবশ্য যদি ছোট ভাইয়ের পথে হাটতে চাও তাহলে তোমার সন্তান না হলেও চলবে।

শায়ের উত্তরের অপেক্ষা না করে নিজের মতো চলে গেলো। পেছনে ফেলে গেলো চিন্তিত রেজওয়ান আনসারীকে। ভদ্রলোক কিছুটা ভাবনায় পড়েছে। শায়ের আদতে কিসের ইঙ্গিত দিলো সে সম্পর্কে অবগত নয় সে। খাওয়া রেখে চুপচাপ বসে রইলেন। রাহুল চিন্তিত রেজওয়ান আনসারীকে দেখে নিচু স্বরে ডেকে বললো

--আঙ্কেল খেয়ে নি। খাবার ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।

রেজওয়ান আনসারী কিছুটা চমকে উঠলেও পরিস্থিতি সামলে নিলো। পুনরায় খেতে খেতে শায়েরের বলা কথা গুলো নিয়েই ভাবলো। কার কথা বললো শায়ের? কাকে ইঙ্গিত করলো? তাদের ঘরের কেউ? ঘরের মেয়ে বলতে তো শায়েরী আর স্নেহা। সেখানে স্নেহা তার নিজের মেয়ে। তাহলে কি শায়েরী?

নিজ ভাবনায় নিজেই চমকে উঠলো রেজওয়ান আনসারী। দুপাশে মাথা নাড়িয়ে বিরবির করে বললো

--অসম্ভব! শায়েরী,রায়হান ভাইবোন। তাছাড়া শায়েরীর থেকে রায়হান বয়সে কতো বড়। ওদের দুজনের সম্পর্ক? অসম্ভব, হতেই পারে না।

******
গত আধঘন্টা ধরে পুতুলকে খাওয়ানোর চেষ্টা করছে শাহিদা নেওয়াজ। কিন্তু নাছোড়বান্দা মেয়ের একই জেদ মাম না খাইয়ে দিলে সে খাবে না। শাহিদা নেওয়াজ হাজার মন ভুলানো কথা বলেও নাতিকে মানাতে পারে নি। শেষে হাল ছেড়ে দিয়ে বললো

--পুতুল, আমার লক্ষী দিদিভাই। একটু খেয়ে নাও। তোমার মাম এসে পড়বে। তখন পেট ভরে খেয়ো। এখন অল্প একটু খেয়ে নাও।

পুতুল একটা ঝুনঝুনি নিয়ে খেলছিলো। শাহিদা নেওয়াজের কথায় ঠোঁট ফুলিয়ে বললো

--মাম তাতে তাবো। মাম তই?

--তোমার মাম টিউশনিতে গেছে দাদু। আসতে দেরি হবে। ততোক্ষণ কি তুমি না খেয়ে থাকবে? একটু খাও।

--না মাম আতবে।

শাহিদা নেওয়াজ এবার কিছুটা রে'গে গেলেন। ভাতের লোকমা পুনরায় প্লেটে রেখে পুতুলকে ধমকে বললো

--পাজি মেয়ে। সারাক্ষণ শুধু মাম মাম আর মাম। কেনো আমরা বুঝি কেউ না? আমাদের কাছে থাকা যায় না? সব সময় আমার মেয়ের সাথে আঠার মতো লেগে থাকতে হবে কেনো? আমার মেয়েটাকে একটু রেহায় দেওয়া যায় না?

শাহিদা নেওয়াজের থেকে ধমক খেয়ে ঠোঁট ফুলিয়ে কেঁদে ফেললো পুতুল। হাতের ঝুনঝুনি টা ছুঁড়ে ফেলে বিছানায় উবুর হয়ে শুয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো। শাহিদা নেওয়াজ পড়লেন বিপাকে। এবার এই মেয়েকে কিভাবে সামলাবে?

হাত ধুয়ে এসে পুতুলকে কোলে নিয়ে কান্না থামানোর চেষ্টা করতে গেলে পুতুল ওনার হাত ঝাড়া দিয়ে ফেলো দিলো। পুনরায় নিজের ছোট্ট দু হাত দিয়ে মুখ ঢেকে কাঁদতে কাদতে বললো

--পুচা পুচা,বুলো বিতি পুচা। মামকে সপ বুলে দিব।

শাহিদা নেওয়াজ পুতুলের আদো আদো কথা বুঝতে না পারলেও মেয়েটার জেদ দেখে অবাক হলো। একদম বাবার মতো জেদ হয়েছে এই মেয়ের। দেখতে যেমন বাবার ফটোকপি, তেমনি রা'গ, জেদ,কোমলতা সব কিছু বাবার থেকেই কপি করেছে। এ যেন আস্ত একটা মানুষের জেরক্স কপি। 

শাহিদা নেওয়াজের চোখের পাতায় ছোট্ট সেহরানের প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠলো। সেহরানও ছোট বেলায় এমন জেদ দেখাতো। রা'গ হলে,কষ্ট পেলে এমন উবুড় হয়ে কাঁদত। শাহিদা নেওয়াজের চোখের কোনে পানি জমলো। পুতুলের সঙ্গে নিজেও কেঁদে ফেললো। ঝাঝ নিয়ে বললো

--কাঁদো,যতো ইচ্ছে কাঁদো। রা'গ জেদ দেখানোর জন্য সবাই তো শুধু আমাকেই পেয়েছে। সরকারি আলু কিনা আমি। যে যেভাবে পারবে রা'গ, জেদ দেখিয়ে চলে যাবে। একটা তো ফাঁকি দিয়ে বেঁচে গেছে কিন্তু আমার হাড় মাংস জ্বালানোর জন্য রেখে গেছে তারই অংশকে। আমাকে এভাবে নাকানিচুবানি খেতে দেখে উপরে বসে নিশ্চয় খুব মজা পাচ্ছে? পাবেই তো, আমি কে তাদের?

শাহিদা নেওয়াজ পুতুলের দিকে এগিয়ে গিয়ে পুনরায় বললো

--এই যে দুই ইঞ্চির মরিচ। মন খুলে কাঁদো। কেঁদে কেঁদে সাগর বানিয়ে ফেলো। আগে বাপ জ্বালাতো এবার তুমি জ্বালাও। বাপ বেটিতে মিলে জ্বালিয়ে আমাকে ভেজে ফেলো। তবে যদি তোমাদের জীবনের ষোলোকলা পূর্ণ হয়।

পুতুলের ওসবে মন। সে ব্যস্ত ফুঁপিয়ে কাঁদতে। ছোট্ট শরীরটা থেকে থেকে কেঁপে উঠছে। শাহিদা নেওয়াজের মায়া হলো। যতই হোক নিজের সন্তানের র'ক্ত তো। অবহেলা করবে কিভাবে?

************
পার্কের ফাঁকা বেঞ্চে চুপচাপ মাথা নিচু করে বসে আছে মেহরিমা। গোধূলি লগ্নের এই সময়ে আকাশে আজ কমলা আভা নেই। নেই কোনো নীলচে শুভ্র মেঘ। তার জায়গায় দখল করেছে এক রাশ কালো মেঘ। কালো মেঘে ছেয়ে আছে পুরো আকাশ। চারপাশে কেমন গুমোট কালো অন্ধকার। বৃষ্টি এলো বলে।

জৈষ্ঠ্যের শেষ সময় এখন। মাঝে মাঝে ধরণী কাঁপিয়ে বর্ষনের দেখা মেলে। কখনো বা ঝিরিঝিরি বৃষ্টি ঝড়ের রূপ ধারণ করে। প্রবল বর্ষণে ভাসিয়ে নেয় চারপাশ। বর্ষনের শীতলতা উত্তপ্ত পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে দেয় একপশলা স্নিগ্ধ কোমলতা,কখনো বা সেই কোমলতা রূপ নেয় কঠোরত্বে। 

মেহরিমা শান্ত দৃষ্টিতে দূরের কৃষ্ণচূড়া গাছটার দিকে আনমনে তাকিয়ে আছে। মাথায় হাজারো চিন্তা। বাসা থেকে বের হওয়ার সময় মা বলেছিলো ঘরে বাজার সদাই কিছু নেই। চাল ও ফুরিয়ে গেছে। থাকার মধ্যে অল্প একটু আটা আছে। সেটাও টেনেটুনে একবেলা হবে। এদিকে মাস শেষের দিকে। বাড়িওয়ালার ভাড়া দিতে হবে। রান্নার জন্য জ্বালানি কিনতে হবে। বিদ্যুৎ বিল,পানির বিল,দোকান বাকি, মা-আপার ঔষধ,বাবুর দুধ সহ প্রয়োজনীয় সবকিছু মিলিয়ে প্রায় হাজার খানেক টাকার প্রয়োজন। অথচ মেহরিমার কাছে অবশিষ্ট আছে ছয় হাজার টাকা। এতে প্রয়োজনের একাংশও মিটবে না তাহলে বাকি টাকার ব্যবস্থা কোথা থেকে করবে সে?

সংসারের টানাপোড়নে পৃষ্ট মেহরিমা নিজের ভেতরের দূর্বলতা আর ধরে রাখতে পারলো না। বুকের ভেতর অসহ্য ব্যাথা হচ্ছে। মেহরিমা মুখে হাত চেপে হুহু করে কেঁদে উঠলো। অস্পষ্ট স্বরে মুখ থেকে বেরিয়ে এলো দুটো শব্দ

--আব্বু, দাভাই...

মেহরিমার এই গুমোট কান্নায় ভারী হয়ে উঠলো চারপাশ। নিস্তব্ধত পার্কে হুট করেই দমকা হাওয়ার দেখা দিলো। গাছের পাতা হাওয়ায় তালে উড়ে গেলো এদিক থেকে ওদিকে। টুপটাপ করে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়লো। মূহুর্তেই ঝিরিঝিরি বৃষ্টি রূপ নিলো ভারী বর্ষণে। উত্তপ্ত ভ্যাবসা গরমের মধ্যে এই বৃষ্টি শীতলতা বয়ে আনলেও তার ছিটেফোঁটা কোমলতা স্পর্শ করতে পারলো না অষ্টাদশীকে। বরং বৃষ্টির ছোঁয়ায় কান্নার বেগ বাড়লো। এতোদিন ধরে ভেতরে জমা হওয়া সকল কষ্ট,ব্যর্থতা,হতাশা সবকিছু উগলে বেরিয়ে এলো।

বৃষ্টির পানিতে মেহরিমা ভিজে একাকার। গায়ের কালোরঙা বোরকা টাও চুপসে গেছে। নেকাব ভিজে নাকের সঙ্গে আঁটকে আসছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে অষ্টাদশীর। মেহরিমা একটানে নেকাবটা খুলে ফেললো। দৃশ্যমান হলো সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ এক মায়াবী চেহারা।

অষ্টাদশী রমণী কিছুতেই নিজের অস্থিরতা কমাতে পারলো না। একটু চিৎকার করে কাঁদতে পারলে বোধহয় শান্তি পেতো মেয়েটা। অষ্টাদশী আজ আর নিজেকে আটকালো না। নিস্তব্ধ ফাকা পার্কের মধ্যে ধপ করে বসে পড়লো রাস্তায়। দু'হাতে নিজের মাথা চেপে ধরে গগন কাঁপিয়ে চিৎকার করলো। বৃষ্টির ঝুমঝুম আওয়াজ, মেঘের গর্জনের কাছে মেহরিমার এই আর্তনাদ খুবই ক্ষীণ শোনালো। প্রকৃতিও বোধহয় আজ মেহরিমা অসহায়ত্বের সুযোগ নিচ্ছে।

মেহরিমা মাথা নিচু করে কাঁদছে। সুশ্রী মুখমন্ডল ইতোমধ্যে রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে। ডাগর ডাগর আঁখি যুগল জলে টইটম্বুর। ঘন পাপড়ি থেকে চুইয়ে চুইয়ে পানি পড়ছে। এভাবে কতো সময় গেলো বোঝা গেলো না।

বৃষ্টি তখনও চলমান। মেহরিমার থেকে একহাত দূরে একজোড়া কালো চকচকে জুতা পড়ে দাড়িয়েছে একজন। নিজের হাতের ছাতাটা বাড়িয়ে দিয়েছে অষ্টাদশীর দিকে। ফলস্বরূপ বৃষ্টির ফোঁটা মেহরিমার শরীর স্পর্শ করতে ব্যর্থ হলো। নিজের সামনে কাউকে দাড়াতে দেখে অষ্টাদশী কিছুটা ভরকে গেছে। তড়িৎ মাথা তুলে তাকালে সামনের মানুষটিকে দেখে সে অবাক হলো। অথচ আগুন্তকঃ স্বাভাবিক। নিজের পকেট থেকে রুমালটা বের করে মেহরিমার দিকে এগিয়ে দিয়ে শান্ত অথচ গম্ভীর স্বরে বললো

--চোখের পানি মুছে নাও। তোমায় আগেই সর্তক করেছিলাম এই শহরে টিকতে হলে দূর্বল হলে চলবে না। মনকে শক্ত করে লড়াই করে বাঁচতে হবে। অথচ তুমি কেঁদে তোমার সেই দূর্বলতায় প্রকাশ করলে। বড্ড ভুল করে ফেলেছো তুমি মেয়ে। অনেক বড় অন্যায় করেছো...!

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে 5 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন