ভার্সিটি থেকে প্রফেসরের কল পেয়ে অনিচ্ছা সত্বেও ভার্সিটি এসেছে শায়ের। আপাতত সে বসে আছে প্রিন্সিপালের রুমে। কিছুক্ষণ পর ভার্সিটির প্রিন্সিপাল দেলোয়ার হক দুলাল এলেন। নিজ চেয়ারে বসলেন আরাম করে। চমশা টা নাকের ডগায় নামিয়ে শায়েরের উদ্দেশ্যে বললেন
--ইয়াং ম্যান খবর কি তোমার? আজকাল সহজে দেখা পাওয়া যায় না। ভার্সিটিতে আসা হয়না বুঝি।
শায়ের মুচকি হাসলো। স্বাভাবিক কন্ঠে বললো
--যেদিন ইম্পোর্টেন্ট ক্লাস থাকে সেদিন আসা হয়। এছাড়া বেশির ভাগ সময় আড্ডাতেই ব্যস্ত থাকি স্যার।
দেলোয়ার হক হাসলেন। ড্রয়ার থেকে একটা কাগজ বের করতে করতে বললেন
--তোমরা এখন যুবক। শরীরের র'ক্ত ও বেশ টগবটে। তবে হুটহাট মেজাজ হারালে কিন্তু চলবে না। মনে রেখো ছাত্রজীবন কিন্তু এখনও বাকি আছে।
স্যারের কথার মানে বুঝতে অসুবিধে হলো না শায়েরের। কপালে হালকা স্লাইড করে বললো
--স্যার বোধহয় উচু পদের লোকদের উদ্দেশ্যে করে আমায় সর্তক করলেন। কি ব্যাপার আজকাল এমপিরাও দেখি স্কুলের ছাত্রদের মতো মারামারিতে জিততে না পেরে প্রিন্সিপালের কাছে বিচার দিচ্ছে। ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং তো!
দেলোয়ার হক হেঁসে ফেললো। চোখ টিপে বললো
--এরপর বেয়াদবি করলে হালকা পাতলা ডোজ দিও। হাত পা ভাঙার দরকার নেই। তবে হ্যা এমন জায়গায় কিক দিবা পরবর্তীতে ডক্টরকে দেখাতেও যেন সংকোচ বোধ করে।
শায়ের দু আঙুলে স্যালুট জানালো। দেলোয়ার হক হাতের কাগজটা শায়েরের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো
--চারদিন পর ফার্স্ট ইয়ারের নবীণ বরণ অনুষ্ঠান। আমি চায় প্রতিবারের মতো এবার ও তুমি তোমার গ্রুপের মেম্বারদের সঙ্গে নিয়ে সব দায়িত্ব সুন্দর ভাবে পালন করো।
শায়ের পেপারটা হাতে নিয়ে উল্টে পাল্টে দেখলো। হেয়ালি করে বললো
--এমপির ছেলেকে মাঠ থেকে আউট করে আমাকে দায়িত্ব দিলেন। পরে যদি আপনার হাওয়া টাইট হয়ে যায়?
--আমার হাওয়া টাইট করবে এতো সহজ? শুনো ছোকরা আমিও মরহুম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ছেলে। আমার হাওয়া টাইট করতে চাইলে আমি ওদেরই কষা করিয়ে ছাড়বো।
শায়ের নিঃশব্দে মাথা দোলালো। দেলোয়ার হক গলা খাকারি দিয়ে বললো
--নবীণ বরণের আয়োজন হিসেবে এবারে কি কি প্ল্যান করেছো?
--প্রতিবারে যা হয়। নাচ,গান,মঞ্চনাট্য,কবিতা আবৃতি,একক অভিনয় সহ প্রধান বক্তা,এমপি,চেয়ারম্যান এনাদের সবার বক্তব্য। এছাড়া আর নতুন কি বা হবে?
--বলেছিলাম তোমার গানের গলা তো অনেক ভালো। এবারের আয়োজনে তুমি একটা গান গেয়ো শায়ের।
শায়েরের শান্ত মুখটা একটু গম্ভীর হলো। নিরেট স্বরে বললো
--আমি গান গাওয়া ছেড়ে দিয়েছি স্যার। এটা সম্ভব নয়।
--শায়ের প্লিজ না করো না। আমি তোমায় রিকোয়েস্ট করছি। আমার রিকোয়েস্ট ও রাখবে না।
দেলোয়ার হক শায়ের হাত ধরে অনুরোধ করলো। অনেকবার রিকোয়েস্ট করলো। শায়ের স্যারের দিকে অনুভূতিশূন্য চোখে তাকিয়ে থেকে বললো
--গাইতে পারি। কিন্তু আমার একটা শর্ত আছে।
দেলোয়ার হক খুশি হলেন। বললেন হাসিমুখে
--বলো কি শর্ত? তোমার সব শর্তে রাজী।
--অনুষ্ঠানে কেউ জানবে না আমার গান গাওয়ার বিষয়। পুরো ভার্সিটিতে এটা আপনার সিক্রেট রাখতে হবে। যদি এই শর্ত মানতে পারেন তবেই গায়বো নয়তো সম্ভব হবে না স্যার।
দেলোয়ার হক একমুহূর্তের জন্য চুপ করে গেলেন। অতঃপর হাসিমুখে বললো
--তুমি যা বলবে।
--এখন তাহলে আসছি স্যার। প্রয়োজন হলে ডাকবেন।
--অবশ্যই।
শায়ের ধীর কদমে দরজার দিকে এগিয়ে গেলো। দরজা খুলে বেরোতে নিবে তখনই দেলোয়ার হকের গম্ভীর স্বরের ডাক শুনে থেমে গেলো। প্রশ্নাত্মক চোখে স্যারের দিকে তাকালে দেলোয়ার হক শান্ত স্বরে বললো
--পরবর্তীতে যে জা*নো*য়ার গুলো মেয়েদের অসম্মান করবে তাদের সহজে ছাড়বে না নীড়। প্রয়োজনে কে*টে পিস পিস করবে। এরপরের দায়িত্ব “ডি.কে” টিমের কতৃপক্ষের।
শায়ের নিঃশব্দে মাথা দোলালো। তার চোখেমুখে লেপ্টে আছে রহস্যের সূক্ষ্ম ছায়া। একই ছায়া খেলা করছে প্রফেসর দেলোয়ার হক দুলালের চোখে ও। দুজন মানব চোখে চোখে ইশারা করলো। দুজনের ঠোঁটেই অজান রহস্যের কুটিল হাসি। শায়ের ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি রেখেই চলে গেলো। প্রফেসর দেলোয়ার হক চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলেন। দৃষ্টি বন্ধ দরজার দিকে। একধ্যানে তাকিয়ে আছে সেথায়। একসময় হেঁসে উঠলো সে। একটু আগের শান্ত নির্মল হাসি নয় বরং তার চেয়েও গভীর আর রহস্যময় এই হাসি। দেলোয়ার হকের হাসির আওয়াজ বদ্ধ দেয়ালে বারি খেয়ে ঝংকার তুললো। ধীরে ধীরে কমে এলো শব্দ। নিঃশব্দ রুমে রয়ে গেলো প্রফেসর দেলোয়ার হক দুলালের ঠোঁটের অচেনা বাঁকা হাসি।
*******
--কিরে রাহুইল্লা,তোর বস কই? এখনো এলো না যে? ব্যাটা হি*টলার গেছে কই?
রাহুল কাগজের ঠোঙা থেকে কিছু বাদাম বের করে ছুলে হাতের তালুতে জমা করলো। এরপর একসাথে সব বাদাম মুখে পুড়ে আয়েশ করে চিবোতে চিবোতে বললো
--ভাই তো প্রিন্সিপালের রুমে গিয়েছে। তুমি টেনশন করো না তো। চলে আসবে।
বাইকের উপর আধশোয়া হয়ে বসে থাকা মীর চোখ বুজেই মাথা নাড়ালো। ছেলেটা এসে থেকে দীর্ঘ শ্বাস ফেলছে। চোখ মুখে লেপ্টে আছে আঁধার। ভাবখানা এমন দুনিয়ার সকল দুঃখ এসে তার সুশ্রী চেহারায় ভর করেছে।
রাহুল আড় চোখে বার কয়েক মীরকে পর্যবেক্ষণ করে জিজ্ঞেস করলো
--মীর ভাই কি হয়েছে তোমার? মন খারাপ কেনো? কেউ কিছু বলেছে?
মীর এক চোখে রাহুলকে দেখে পুনরায় চোখ বুজলো। হতাশার স্বরে বললো
--কি আর বলবো দুঃখের কথা। আমার সব শেষ হয়ে গেলো রে রাহুল। মনে হচ্ছে জান পাখি খাঁচা থেকে এখনই উড়াল দেবে।
রাহুল একটু অস্থির হলো। ব্যস্ত কন্ঠে বললো
--এমন কেনো মনে হচ্ছে ভাই?
--আমার জান,প্রাণ,কলিজা,ফুসফুস আমার টুনটুনির ছানা সোনিয়ার আজ অন্য বেডার সাথে বিয়ে হয়ে যাচ্ছে রে রাহুল। এই দুঃখ আমি কই থুইতাম।
হুট করেই মীর মুখে হাত চেপে মেকি কান্না জুড়ে দিলো। এদিকে রাহুল যতোটা সিরিয়াস হয়ে মীরকে প্রশ্ন করেছিলো এখন ঠিক ততোটাই শান্ত হয়ে বাদাম খেতে লাগলো। চোখমুখ একদম স্বাভাবিক। মীর যে মরা কান্না জুড়েছে এতে তার একটুও খারাপ লাগছে না। বরং এনজয় করছে।
রাহুল হাতের তালুতে বাদাম রেখে ফু দিয়ে খোসা গুলো হাওয়ায় উড়িয়ে দিলো। স্বাভাবিক কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো
--কয় নাম্বার টার বিয়ে হচ্ছে ভাই?
--চার নম্বর টার। এটা একটু বেশি প্রিটি আর সরল ছিলো রে।
--ওহ।
সহসা কান্না থাকিয়ে দিলো মীর। অবাক হয়ে চাইলো রাহুলের দিকে। ছেলেটাকে এমন স্বাভাবিক দেখে জিজ্ঞেস করলো
--আমি কাঁদছি আর তুই চুপচাপ বসে বাদাম গিলছিস? আমাকে স্বান্তনা দিবি না।
--ভাই বাদাম তো গেলা যায় না। চিবিয়ে খেতে হয়।
থতমত খেলো মীর। ধমকে বললো
--চুপ কর বেয়াদব। বড় ভাইয়ের মুখে মুখে কথা। আমাকে সান্ত্বনা দে।
রাহুল চোখ উল্টে মীরের দিকে তাকিয়ে বললো
--কি বলে সান্ত্বনা দেব ভাই?
--বল,ভাই তুমি মন খারাপ কইরো না। এরপরের জন আরো বেশি প্রিটি এবং ইনোসেন্ট হবে।
রাহুল তাই করলো। শান্ত স্বরে রিপিট করে বললো
--ভাই তুমি মন খারাপ কইরো না। এরপরের মুরগীটা আরো বেশি প্রিটি এবং ইনোসেন্ট হবে।
মীর মেকি মন খারাপ নিয়ে সান্ত্বনা শুনেছিলো। কিন্তু মানুষের স্থানে মুরগী নাম শুনে চোখ বড় বড় করে তাকালো। খেক করে বললো
--এই বেয়াদব মুরগী কাকে বললি তুই?
--কা কে আবার। তোমার পরের গফ কে। তারা তো মুরগী আর তুমি শেয়াল। শেয়াল যেমন শিকার ধরার আগে ওত পেতে থাকে তুমিও তেমন নতুন নতুন গফ বানানোর আগে তেল মারতে থাকো। পার্থক্য একটাই,শেয়াল প্রাণী আর তুমি মানুষ।
রাহুলের পুরো কথা শুনে ভ্যাবাচ্যাকা খেলো মীর। কটমট করে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে থেকে বললো
--আমাকে শেয়াল বলা। দাঁড়া তুই হতচ্ছাড়া আজ তোর হচ্ছে।
রাহুল তূরন্ত উঠে দাঁড়ালো। মীরকে এক চোখ টিপে হাসতে হাসতে দৌড় লাগালো। মীর নিজেও ছুটলো রাহুলের পিছু পিছু। দুজনের কিছুক্ষণ দৌড়াদৌড়ির পর রাহুল থেমে গেলো। মীর রাহুলের থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে হাঁপাচ্ছে। হাসতে হাসতে রাহুলের উদ্দেশ্যে বললো
--বেয়াদব আমাকে ঘোল খাইয়ে ছাড়লি।
--আমাকে আর মারার চেষ্টা করবে।
--না না মারবো না তবে..
--তবে...
মীর বাঁকা হেঁসে রাহুল কিছু বোঝার আগেই ছুটে এলো। রাহুলকে এক হাতে ধরে অন্যহাতে পাছায় বেশ কয়েকটা চাপড় মেরে বললো
--বেদ্দপ আমাকে শেয়াল বলা। পিটিয়ে আজ তোর ভন্ডামি ছুটাই দিবো।
--আরে ভাই এবার থামো। ছাল চামড়া সব উঠে যাবে তো।
মীর রাহুলকে ছেড়ে গাছের নিচে ধপ করে বসে পড়লো। রাহুল নিজেও পাশে বসলো। সে এখনো মিটিমিটি হাসছে। মীর ভাইকে চেতাতে তার ভালোই লাগে। একটু আধটু মা'র খেলেও মজা আছে।
***********
বাজারের ভীড় ঠেলে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে মেহরিমা। কিছুক্ষণ আগেই বেতন পেয়েছে সে। টুকটাক বাজার করে এরপর মার্কেটে যাবে। পুতুলের জন্য সুন্দর একটা ড্রেস কিনবে। এমনটা নিয়ত করেই এসেছে।
মেহরিমা প্রথমে সবজির বাজারে গেলো। আলু,পেয়াজ,রসুন,মরিচ,কিছু সবজি কিনলো। এরপর গেলো মাছের বাজারে। সাধ্যের মধ্যে কিছু ছোট মাছ আর কুচো চিংড়ি নিলো। আপাতত এগুলো দিয়ে এক সপ্তাহ চলবে।
মেহরিমা মুদি দোকানের সামনে এসে অপেক্ষা করতে লাগলো ভীড় কমার। এখান থেকে সে কম দামে চাল,ডাল,লবণ,তেল,হলুদ সহ মাসকাবারি বাজার করে। ভীড় কমে এলে মেহরিমা সামনে এগোলো। দোকানিকে উদ্দেশ্যে করে বললো
--সেলিম চাচা আমাকে পাঁচ কিলো চাল,হাফ কিলো ডাল,এক হালি ডিম,দুই প্যাকেট লবণ,হলুদ আর এক লিটার তেল দিন।
দোকানি সব কিছু প্রয়োজন মতো একে একে ব্যাগে গুছিয়ে দিলো। মেহরিমা টাকা দিয়ে খুচরো টাকা গুলো হাতের মুঠোয় রেখেই পথ চলতে লাগলো। একটু পরই সন্ধ্যা নামবে। তার আগে বাসায় যেতে হবে।
মেহরিমা আনমনা হয়ে পথ চলছিলো। বাকি দিন গুলো কীভাবে চলবে সেই হিসেব নিকেশ করে নিলো মনে মনে। আজ যে বাজার নিয়েছে তাতে টেনেটুনে সাত কি আটদিন যাবে। এরপর? এরপরের দিনগুলোতে কিভাবে চলবে তারা? মেহরিমা আহত চোখে আকাশের পানে তাকালো। বিরবির করে বললো
--পৃথিবী টা এতো কঠিন কেনো আল্লাহ? বেঁচে থাকাটা যেন একটা যুদ্ধ। অথচ ক্ষণিকের এই জীবনের সামান্য খেয়ে পড়ে বাঁচার লড়াইটা শ্বাসরুদ্ধকর। দু'টো অর্থ উপার্জনের পথটা কেনো সহজ হয় না? কেনো বার বার হোঁচট খেয়ে পড়তে হয়? যখনই ভাবি আজ বোধহয় একটু স্বস্তি মিলবে তখনই হাজারটা বাঁধা এসে চলন্ত পথে কাটা বিছিয়ে দেয়। মনুষ্যজাতির ক্ষেত্রে এ কেমন পরীক্ষা তোমার?
--আপা কিছু নেবেন? নেন না কিছু। সারাদিনে তেমন বিক্রি হয়নি। আপনে অন্তত কিছু নেন।
চিকন বাচ্চা কন্ঠের আওয়াজ পেয়ে পাশে তাকালো মেহরিমা। তার থেকে এক হাত দূরেই একটা বাচ্চা মেয়ে ছোট বাচ্চাদের খেলনা,কসমেটিক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মেহরিমা মেয়েটার কাছে এগিয়ে গেলো। হাতের বাজার গুলো সাইডে রেখে হাঁটু মুড়ে বসলো। মেয়েটার ছোট নরম হাতটা নিজের মুঠোয় নিয়ে শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করলো
--তোমার নাম কি? একা একা এখানে কি করছো? যদি হারিয়ে যাও তখন?
মেয়েটা মুখ চেপে হেঁসে ফেললো। মেহরিমা একটু অবাক হলো বটে। জিজ্ঞেস করলো
--তুমি হাসছো কেনো?
বাচ্চা মেয়েটা হেঁসে বললো
--হাসুম না তো কি করুম। আপনের কথা শুইনা খুব হাসি পাইতেছে আমার।
--হাসির কি বললাম আমি?
--ওই হারায় যামু কিনা এইডা শুইনা হাসি পাইছে আমার।
--ছোট একটা বাচ্চা তুমি। অভিভাবক ছাড়া এতো ভীড়ের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া তো স্বাভাবিক।
--ভীড়ের মধ্যে হারায় যাওয়ার ব্যামো বড়লোকের বাচ্চাদের আছে। আমগো মতো গরীবের বাচ্চারা সহজে হারায় না আপা। হারায় যাওয়েন ভয় করলে আমগো পেট চলবো কেমনে?
এতোটুকু একটা বাচ্চার মুখে এতো ভারী কথা আশা করে নি মেহরিমা। বাচ্চাটার বয়স কত হবে? বড় জোর আট কিংবা নয় বছর। মিষ্টি একটা চেহারা। ডাগর ডাগর চোখ,উজ্জ্বল মুখশ্রী যত্নে অভাবে মলিন হয়ে আছে। পরনে এলোমেলো মলিন পোশাক। চুলগুলো উষ্কখুষ্ক। অথচ মেয়েটার ওই চোখ দুটো কেমন হাসছে। জগতের কঠিন যাতা কলে এখনও বোধহয় পিষ্ট হয়নি সে। নাহলে পেটে ক্ষুধা নিয়ে এভাবে কেউ হাসতে পারে?
মেহেরিমা নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করলো
--তোমার নাম কি?
--শিউলি।
--ফুলের নাম। বাহ! খুব মিষ্টি নাম তো তোমার। এতো সুন্দর নাম কে রেখেছে?
--আম্মায় রাখছে আপা।
--তুমি পড়াশোনা করো না।
আবার হাসলো মেয়েটা। অথচ হাসতে হাসতেই জগতের সবচেয়ে কঠিন কথা বলে ফেললো
--পেটে যহন টান পড়ে শখ আহ্লাদ তহন বাপ বাপ কইরা পলায়।
মেহরিমার বুকের ভেতরটা হুট করেই ধক করে উঠলো। মানস্পটে ভেসে উঠলো ফেলে আসা দিনগুলো। অর্থের অভাবে কিভাবে নিজের সমস্ত শখ,ইচ্ছে, স্বপ্ন বির্সজন দিয়েছে সে। দুমুঠো ভাতের জোগার করতে গিয়ে অন্যের বাসায় চাকরের কাজ পর্যন্ত করতে হচ্ছে। অথচ একটা সময় তার সেবাযত্ন করার জন্য আলাদা লোক রাখা ছিলো। বলার আগেই মুখের সামনে খাবার হাজির হতো। ইচ্ছে হলে খেতো, ইচ্ছে না হলে ছুঁয়ে ও দেখতো না। এখন যে ড্রেস মাসের পর মাস জোড়াতালির দিয়ে ব্যবহার করছে আগে সেই ড্রেস একটু মলিন হলেই ফেলে দিতো। আশা যাওয়ার জন্য পার্সোনাল গাড়ি ছিলো আরো কতো সুযোগ সুবিধা। জগৎ সংসারের এই কঠিন মারপ্যাচ তখন তাকে স্পর্শ ও করতে পারে নি। পারবে কেমন করে? আগলে রাখার জন্য তখন তো দুজন মানুষ ছিলো। অথচ সময়ের ব্যবধানে আজ তারা দূরে,বহুদূরে। চাইলেও তাদের আর ছোঁয়া যাবে না,অনুভব করা যাবে না,আবদারের ঝুলি নিয়ে বসা হবে না। মন খারাপ হলে কাধে মাথা রাখার জন্য দাভাই আর আসবে না। মায়ের বকুনি খেয়ে নালিশ করার জন্য বাবাকে আর পাওয়া যাবে না।
মেহরিমার চোখের কোণে পানি জমলো। সামনের মেয়েটা চোখের এই তপ্ত নোনাজল দেখে বললো
--আপা এই শহরে কাঁইন্দা মইরা গেলেও কেউ খাওন দেয় না। লড়াই কইরা টাকা ইনকাম কইরা এরপর খাওন কেনোন যায়। আপনে কাইন্দেন না। সবসময় শুধু হাসবেন। ঠিক আমার মতো।
বলেই মেয়েটা আবার হাসলো। সেই সাথে হাসলো মেহরিমা ও। চোখের পানি মুছে মেয়েটার থেকে পুতুলের জন্য কিছু ক্লিপ,লেস ফিতা, আর ছোট্ট একটা প্লাস্টিকের পুতুল নিলো। বিনিময়ে দামের চেয়ে একটু বেশিই অর্থ দিলো। শিউলি নামের মেয়েটা টাকা টা হাতে নিয়ে হাসতে হাসতে চলে গেলো। কিছুদূর গিয়ে পিছু ফিরে বললো
--আপা পরের বার এইনে আইলে আমার লগে দেহা কইরেন। আমি সামনের ওই বস্তিতে থাকি।
মেহরিমা মাথা দোলালো। শিউলি মিষ্টি হেসে আবারও পথ চলতে লাগলো। সে পথে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো মেহরিমা। সত্যি বড়োই বিচিত্র আমাদের এই সমাজ। তার চেয়েও বিচিত্র সমাজের মানুষ গুলো। কেউ কোটি টাকা পেয়েও সন্তুষ্ট হয়না অথচ কেউ পাঁচ টাকার রুটি খেয়েও হেসে খেলে দিন পার করে। মেহরিমার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই মুচকি হাসির দেখা মিললো। বিরবির করে বললো
--বাঁচতে হলে হাসতে হবে। প্রচুর হাসতে হবে। বিষাক্ত এই সমাজের সামনে নিজেকে দূর্বল দেখালে চলবে না। রবের উপর ভরসা রেখে হেঁসে খেলে পরিশ্রম করে দিন পার করতে হবে।
আকাশের বুকে তখন গোধূলি লগ্নের কমলা আভা ছড়িয়েছে। পাখিরা দলে দলে ফিরছে তাদের নীড়ে। বাতাসে ছড়িয়েছে বেলী ফুলের মিষ্টি সুবাস। শীতল হাওয়া এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে দেহ। অবাধ্য হয়ে দুলছে পরনের কাপড়। আশেপাশে তখন মানুষের কোলাহল। দর দামের সূক্ষ্ম বাক বিতর্কের আওয়াজ। সিঙারার দোকানের গরম তেলের আওয়াজ আর গরম গরম জিলাপির সুগন্ধে মুখরিত চারপাশ।
মেহরিমা বাজারের ব্যাগ গুলো হাতে নিলো। আকাশের দিকে তাকিয়ে প্রাণ ভরে শ্বাস নিলো। ছোট একটা প্রাণের থেকেই আজ সে বড় শিক্ষা অর্জন করেছে। ইট পাথরের যান্ত্রিক শহরে বাঁচতে হলে হাসতে হবে। দুঃখ গুলোকে নিজের ভেতরে দাফন করে হাসিখুশি থাকতে হবে।