ফন্ট সাইজ:
থিম:
আয় তবে সহচরী

8

লেখক: উম্মে_হাবিবা

গ্রীষ্মের কাঠফাটা রোদ্দুর। কোথাও একটু বাতাসের ছিটেফোঁটা নেই। তপ্ত দুপুরে মরুভূমির উত্তপ্ত বালুর মতোই খা খা করছে ধরিত্রী। চারিদিকে শুনশান নীরবতা। রাস্তার পাশে গাছের নিচে শুয়ে আছে একদল কুকুর। গরমে তাদের অবস্থা ও শোচনীয়। কেমন জিভ বের করে হাঁপাচ্ছে তারা।

উত্তপ্ত এই রোদের মধ্যে মীরকে সঙ্গে নিয়ে বাইক চালিয়ে গন্তব্যে ছুটছে শায়ের। পরনে সাদা গেঞ্জি আর নেভি ব্লু শার্টের দারুণ কম্বিনেশন তাঁর। শার্টের সব গুলো বোতাম খোলা। চোখে রোদ চশমা। হাওয়ার তালে অবাধ্য হয়ে ছুটছে চুলগুলো। গম্ভীর তার চেহারা। ধারালো ব্লেডের মতো চোয়ল। হাতে সিলভার রঙের চেইন ব্যাসলেট। গলায় ঝুলছে গিটার দেওয়া লকেট। কানে এয়ারপড। হয়তো কোনো গান শুনছে সে।

মীর বেশিক্ষণ চুপচাপ থাকতে পারে না। পেটের ভেতর গুরগুর শুরু হয়। অথচ যার সঙ্গে যাচ্ছে সেই লোক গত পনেরো মিনিট যাবত যন্ত্রণামানবের মতো বাইক চালাচ্ছে। না নিজে কিছু বলছে আর নাতো মীরকে কিছু বলতে দিচ্ছে। এই নিয়ে মীরের হায়-হুতাশের শেষ নেই। বেশ কয়েকবার কথা বলতে গিয়েও শায়েরের তীক্ষ্ণ চোখের দিকে তাকিয়ে আর টু শব্দ করতে পারি নি।

মীর আশেপাশে তাকিয়ে গলা খাকারি দিলো। নীচু স্বরে ডাকলো

--শায়ের

শায়ের নিরুত্তাপ। মীরের ডাক আদোও কান পর্যন্ত গিয়েছে কিনা সন্দেহ। মীর পুনরায় জিভে ঠোঁট ভিজিয়ে ডাকলো

--এই শায়ের শোন না।

শায়ের সামনে চোখ রেখেই গম্ভীর স্বরে উত্তর দিলো

--শুনছি

--আমরা কোথায় যাচ্ছি?

--গেলেই দেখতে পারবি।

--আগে থেকে বললে কি হয়? একটু বল না কই যাচ্ছি আমরা?

শায়ের চুপ। রাস্তার বাম পাশে মোড় নিয়ে বাইকের স্পিড বাড়ালো। হঠাৎ টানে ভরকে গেলো মীর। শায়েরের কাঁধ আঁকড়ে ধরে বললো

--মীরজাফরের বাচ্চা বিয়ের আগেই আমায় বিধবা বানাতে চাস? এতো জোড়ে কেউ বাইক চালায়।

--মীরজাফর আমি না তুই। কজ তোর নামের আগেই মীর দেওয়া।

থতমত খেলো মীর। মেয়েদের মতো শায়েরকে ভেংচি কেটে মুখ ভোতা করে বসে রইলো। কিছুক্ষণ পর গন্তব্যে পৌছানোর পর শায়ের শান্ত স্বরে বললো

--নাম।

--হু..?

--নামতে বলেছি।

--কেনো চলে এসেছি আমরা।

শায়ের চুপচাপ নেমে গেলো। নামলো মীরও। আশেপাশে তাকিয়ে জায়গা টা অচেনা লাগলো তার কাছে। কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলো

--এটা কোথায় এলাম আমরা?

শায়ের বাইক পার্কিং এ রেখে নিঃশব্দে সামনে আগালো। আবারও হতাশ হলো মীর। এই ছেলের আজ কি হয়েছে? কথা বলছে মেপে মেপে। চোখমুখ অস্বাভাবিক গম্ভীর। শায়েরের এমন শান্ত চেহারা দেখে মীরের মনে একটু খটকা লাগলো। দ্বিতীয় প্রশ্ন না করে ছুটলো পিছু পিছু।

**********
পুতুলকে গোসল করিয়ে এনে বিছানায় বসিয়ে নিজে গোসল করতে গেছে মেহরিমা। শুক্রবার হওয়ায় আজ তার ছুটি। পুতুল বিছানায় বসে প্লাস্টিকের পুতুল নিয়ে খেলছে। নিজের কুটু কুটু দাঁত দিয়ে ইতোমধ্যেই বউ পুতুলের মাথা ফুটো করে ফেলেছে সে। এই নিয়ে তার খুশির শেষ নেই। পুতুল টা কে কামড়ে সে মজা পেয়েছে। হাত তালি দিয়ে হাসছে খিল খিল করে।

শাহিদা নেওয়াজ তরকারির গামলা নিয়ে মাত্রই ঘরে ঢুকলো। ঘরের কোনায় গামলা টা রেখে এসে নিজের কাপড় বের করলো। মেহরিমা আসলে সে যাবে গোসলে। গরমে রান্না করতে গিয়ে ঘেমে নেয়ে একাকার। অনেকদিন পর আজ দুপুরে রান্না করেছে সে। কাল মেহরিমা যে বাজার এনেছিলো সেখান থেকেই ছোট মাছ চচ্চড়ি আর লাউ চিংড়ি করেছে। লাউ চিংড়ি মেহরিমার বরাবরই খুব প্রিয়। আগে যখন রান্না করতো তখন দু ভাইবোন মিলে কাড়াকাড়ি লাগাতো। মেহরিমা নিজে খেলেও ভাইয়ের প্লেট থেকে তার বিড়ালের মতো ছো মেরে নিয়ে মাছ খাওয়া চাই চায়। এই নিয়ে কতো সালিশ বিচার করতেন তিনি। সেসব এখন শুধুই স্মৃতি।

শাহিদা নেওয়াজ নাতনিকে একা একা হাসতে দেখে বিছানার কাছে এগিয়ে এলেন। হেঁসে কিছু বলবে তার আগেই প্লাস্টিকের পুতুলটার ভোচকানো চেহারা দেখে আঁতকে উঠলেন। হায় হায় করে বললেন

--ওরে মেহের দেখে যা। বিচ্ছুটা কি করেছে একবার দেখে যা।

পুতুল দাদির চেঁচানো শুনে হাসি থামিয়ে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। এরপর এমন ভাবে মুখ বাকালো যেন সামনের মানুষকে সে চেনেই না। মন দিলো নিজের খেলায়। পুতুলকে এমন মুখ বাঁকাতে দেখে চোখ বড় বড় হয়ে গেলো শাহিদা নেওয়াজের। পুতুলের কাছে তেড়ে গিয়ে বললো

--দু ইঞ্চি মরিচের সাহস দেখো। আমাকে মুখ বাঁকানো হচ্ছে।

পুতুল খেলছে নিজের মতো। নিজের সূঁচালো দাঁত দ্বারা আবারও পুতুলের মাথা কামড়াতে নিলে তড়িৎ ওটা কেড়ে নিলেন শাহিদা নেওয়াজ। খেক করে বললেন

--দুষ্টু মেয়ে, কাল তোমাকে এটা এনে দিয়েছে আর আজই তুমি তার অবস্থা বারোটা বাজিয়ে ছেড়েছো। আজ থেকে কোনো খেলনা আর দেবো না তোমায়।

হুট করে কি হলো বুজলো না পুতুল। একবার নিজের ফাঁকা হাত আরেকবার শাহিদা নেওয়াজের হাতে পুতুল দেখলো। অভিমানে চোখ দুটো এখনই কেমন ছলছলে হয়ে উঠেছে। ধবধবে ফর্সা মুখটা লাল টকটকে। আরেকটু টোকা দিলেই চোখ থেকে ঝরঝর করে অশ্রুকণা ঝরবে নিশ্চিত। পুতুল নাক টানলো। হাতের ভরে উঠে দাঁড়ালো। ছোট ছোট কদম ফেলে দাদির কাছে এসে ভেজা স্বরে বললো

--আমাল কেলনা দাও।

--দেব না।

--কেলনা দাও বুলচি।

শাহিদা নেওয়াজ দিলেন না। উল্টো খেলনা টা রেখে দিলেন নিজের জামা কাপড়ের ট্রাঙ্কে। চোখমুখ গম্ভীর করে তাকিয়ে আছে পুতুলের দিকে।

পুতুল ঠোঁট উল্টে কাঁদো কাঁদো চেহারায় দাদির দিকে তাকিয়ে থাকল। এরপর বিছানায় ধপ করে বসে হাত পা ছেড়িয়ে ভ্যা করে কেঁদে দিলো। মুহূর্তেই হেঁচকি উঠে গেলো তার। পুতুলের কান্নার শব্দে তরিঘরি করে ঘরে ঢুকলো। ব্যস্ত পায়ে এগিয়ে এসে পুতুলকে বুকে আগলে নিয়ে বললো

--আমার আম্মুর কি হয়েছে? লক্ষ্মী আম্মু এভাবে কাঁদছে কেনো?

উত্তর করলো শাহিদা নেওয়াজ। নালিশের স্বরে বললো

--এই বিচ্ছুকে আর কিছু কিনে দিবি না তুই। দুষ্টু মেয়ে কোনো কিছু যত্নে রাখে না।

পুতুল মেহরিমার বুকে মুখ লুকিয়ে কাঁদছে। ছোট্ট কায়া কেঁপে উঠছে তার। মেহরিমা পুতুলের পিঠে হাত বুলিয়ে দিলো। মায়ের দিকে তাকিয়ে বিরক্তির স্বরে বললো

--কি এমন অন্যায় করেছে পুতুল যার জন্য এমন নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছো তুমি?

--কি করেছে মানে? কি করে নি তাই বল?

--উফ আম্মু যা বলার সরাসরি বলো।

শাহিদা নেওয়াজ নিজের ট্রাঙ্ক থেকে প্লাস্টিকের পুতুলটা বের করে মেহরিমার সামনে ধরে বললো

--দেখ নতুন পুতুলের কি অবস্থা করেছে এই মেয়ে।

মেহরিমা দেখলো। অথচ ছ্যাত করে উঠলো পুতুল। মামের কাছের নিজের সম্পর্কে এই নালিশ সহ্য হলো না তার। মেহরিমার বুক থেকে মুখ তুলে কাঁদতে কাঁদতে বললো

--বু মিতা কতা বুলচে মাম। আমি কিচু কলি নি। ছুদু ইকতু কেলচিলাম।

--ওরে দুষ্টু মেয়ে আবার মিথ্যা কথা বলা হচ্ছে। তুমি কিছু না করলে পুতুলের মাথা এমন ইদুরের মতো কামড়েছে কে? আমি?

--তুমি পুচা বু। ছুদু পুতুকে বুকা দাও কেনু? পুতু কিচু কলে নি।

পুতুল মেহরিমার দিকে তাকিয়ে অভিযোগের স্বরে কাঁদতে কাঁদতে বললো

--মাম বু আমাতে মেলেচে। পাচায় থাচ থাচ মালিচে। বুকা দিচে। কেলনা কেলে নিচে। পুতু কত্ত পেয়েচি মাম। বু বালো না মাম। ছুদু বকে।

বলতে বলতে মেয়েটা আবারও ঠোঁট ফুলিয়ে কেঁদে ফেললো। মেহরিমা সহসা বুকে আগলে নিলো তাকে। আদরের বানী শুনিয়ে কান্না থামানোর চেষ্টা করলো। অথচ বিষ্ময়ে বোকার মতো ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো শাহিদা নেওয়াজ। এতো টুকু পুচকে তার বিরুদ্ধে তারই মেয়ের কাছে নালিশ ঠুকছে? শাহিদা নেওয়াজ পুনরায় কিছু বলবে তার আগেই মেহরিমা তাকে থামিয়ে বললো

--আম্মু কি হচ্ছে এসব? পুতুল না হয় ছোট তাই বলে কি তুমিও ছোট? খেলতে গিয়ে পুতুলটা কামড়েছে তাতে কি এমন হয়েছে শুনি?

--তুই আমার কথা...

--আপাতত কিছু শুনতে ইচ্ছে করছে না আম্মু। খেলনা টা দিয়ে তুমি গোসলে যাও। ক্ষুধা লেগেছে আমার।

শাহিদা নেওয়াজ ব্যর্থতার শ্বাস ফেলে খেলনা টা বিছানায় রাখলো। পুতুল মেহরিমার বুকে থেকে চোখ পিটপিট করে দাদিকে দেখছে। শাহিদা নেওয়াজ মেয়ের আড়ালে পুতুলকে চোখ রাঙানি দিলে সহসা কেঁদে উঠলো পুতুল। ফোপাঁতে ফোপাঁতে বললো

--বু আবালও চুক নাঙালি দিচে মাম। পুতু ভয় পায়।

--আম্মু তুমি যাবে।

শাহিদা নেওয়াজ ধুপধাপ পা ফেলে চলে গেলো। মেহরিমা পুতুলকে বুকে নিয়ে বিছানায় বসলো। খেলনা আবারও পুতুলের হাতে দিয়ে বললো

--এই নাও আম্মু তুমি খেলো। আর কেউ বকবে না তোমায়।

খুশি হলো পুতুল। দু'হাতে খেলনা আঁকড়ে ধরে গাল ভরে হাসলো। পুতুলের গায়ে চুমু দিয়ে বললো

--মাম পুতু বুউ কে তুমু দিচি।

--এটা যে বউ তোমাকে কে বললো মা?

পুতুল একবার চোখ তুলে তাকালো। ঠোঁট উল্টে খেলতে খেলতে বললো

--কুকু মা বলেচে।

--তুমি মেজ আপার কাছে গিয়েছিলে?

--হু

--কখন?

--চকালে গিয়েচি।

মেহরিমা একটু অবাক হলো। পুনরায় প্রশ্ন করলো

--মেজ আপা তোমায় বকে নি তো আম্মু?

খিলখিল করে হাসলো পুতুল। আদুরে স্বরে বললো

--কুকু মা আদল দিচে। কুকুকে ও কুলে দিচে। পুতু কুকু কে অনেক আদল কলেচি মাম।

পুতুল উঠে দাঁড়ালো। নিজের ছোট্ট হাতে মেহরিমার মুখে হাত রেখে বললো

--পুতু মামকে আদল দিতে তায়।

--তাই? কোথায় আদর দিতে চায়?

পুতুল মেহরিমার গালে চুমু দিলো। হেঁসে বললো

--একানে।

আরেক গালে চুমু দিয়ে বলে

--একানেও

মেহরিমা পুতুলকে বুকে আগলে নিলো। চোখের কোনে চিকচিক করছে জলে। তার মেজ আপা তো কাউকে তেমন সহ্য করতে পারে না। ধারে কাছে গেলেও মা'রতে নেয়। অথচ পুতুল কাছে গেলো কিছু বললো না? তাহলে কি তার মেজ আপা ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছে? আবারও আগের মতো স্বাভাবিক হয়ে যাবে বুঝি। মেহরিমা সূক্ষ্ম আশার আলো দেখতে পেলো। পুতুলকে বুকে নিয়ে বিরবির করে আওড়ালো

--মেজ আপাকে সুস্থ করে দাও আল্লাহ। আমার আপাকে আবারও আগের মতো স্বাভাবিক করে দাও।

*********
শায়েরের পিছু পিছু একটা প্রাইভেট হসপিটালের সামনে এসে দাঁড়ালো মীর। এই হসপিটাল টা লোকালয় থেকে বেশ দূরে। আশেপাশে গাছপালা দিয়ে ভরা। দুতলা ভবনে শেওলা পড়ে গেছে। পাশে একটা এম্বুলেন্স রাখা। উজ্জ্বল দুপুরেও কেমন গা ছমছমে ভাব এখানে। কোথাও কোনো লোক নেই। মানুষের কন্ঠের আওয়াজ নেই। চারিদিকে শুনশান নীরবতা। মীর ভয় পেলো। শায়েরের গা ঘেঁসে দাঁড়িয়ে বললো

--এখানে কেনো এলাম আমরা ভাই? চল ফিরি। আশপাশ দেখে তো সুবিধার লাগছে না। কেমন ভুতুড়ে ভুতুড়ে পরিবেশ।

শায়ের নাকমুখ কুচকে ফেললো। বিরক্ত নিয়ে বললো

--তুই আদেও মীর তো? নাকি কাশ্মীরে গিয়ে নিজের আসল সত্তাকে বিলিয়ে দিয়ে এসেছিস?

--কি বোঝাতে চাইছিস তুই?

--তুই যা বুঝেছিস তাই।

সহসা আঁতকে উঠে দুপা পিছিয়ে গেলো মীর। কাঁদো কাঁদো স্বরে বললো

--আমি ডজন খানিক প্রেম করতে পারি তবে আমার চরিত্র ফুলের মতো পবিত্র। আজ পর্যন্ত একটা মেয়ের হাত ছুঁয়ে দেখি নি। সেখানে তুই আমার ইজ্জত নিয়ে প্রশ্ন তুলিশ?

শায়ের বিরক্তির চরম পর্যায়ে চলে গেলো। মীরকে চোখ রাঙানি দিয়ে ওর হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে গেলো ভেতরে। মীর ভীতু স্বরে বললো

--এই ভুতের ভবনে এভাবে গরুর মতো টানতে টানতে আমায় কোথায় নিয়ে যাচ্ছিস তুই?

--ভুতেদের কাছে তোকে তুলে দিবো। ওরা তোর পোস্টমর্টাম করে রিসার্চ করবে।

--কিইইইইই!

--যা শুনলি তাই।

--এ ভাই আমাকে ছাড়। আমি বাড়ি যাবো। আমার নতুন একটা গার্লফেন্ড জুটেছে আধঘন্টা আগে। এখনও প্রেমটা ঠিকমতো জমে ওঠে নি তার আগেই তুই আমায় যমের দুয়ারে পাঠাতে চাস?

শায়ের মীরকে নিয়ে সোজা লিফ্টে উঠলো। গম্ভীর কন্ঠে বললো

--সবসময় তো মরা মানুষ পোস্টমর্টেম করা হয় আজকে জ্যান্ত মানুষকে নিয়ে রিসার্চ করবো। তুই কেঁদে সাগর বানিয়ে ফেললেও মুক্তি পাবি না।

লিফটের দরজা বন্ধ হয়ে গেলো। ভেতরে মীর চিৎকার করে বলছে

--ওরে আমার সুইটি রে তোমার সঙ্গে প্রেমটা আমার আর হলো না। আসল মীরজাফর আমাকে ফাঁসিয়ে দিলো গো। ওরে তানিয়া,মুনিয়া,সাদিয়া,রাইসা,মিলি আমাকে ক্ষমা করো গো। তোমাদের সাথে ব্রেকাপ করার সুযোগ টাও পেলান না।

*********
বিকালে পুতুলকে সঙ্গে নিয়ে বেড়িয়েছে মেহরিমা। আগের দিন সময়ের অভাবে পুতুলের জন্য জামা কিনতে পারে নি। আজকে ছুটি পেয়ে সুযোগ টা কাজে লাগালো। সারাক্ষণ ঘরবন্দী থাকা ছোট্ট প্রাণকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লো মার্কেটের উদ্দেশ্যে।

পুতুল আজকে মহাখুশি। মামের সঙ্গে কতোদিন পর ঘুরতে বের হলো। পুতুল আগে আগে নাচতে নাচতে হাঁটছে। পেছনে মেহরিমা মুগ্ধ চোখে মেয়েটার আনন্দ দেখছে প্রাণভরে। পুতুল রাস্তার পাশে একটা বিড়াল দেখে অবাক হলে। গালে হাত দিয়ে চোখমুখে বিস্ময়ের ছাপ নিয়ে বললো

--মাম দেকো কতু বলো বিলু।

একটু সামনে একটা গাড়ি দেখে বললো

--এতো বলো গালি।

--এতো গুনো পুল।

--এতো পানি।

--ওলে বাবা এতো গুনো পাতি।

পুতুলের এমন নাটুকে কথা শুনে হাসি পেলো মেহরিমার। তবুও মেয়েটার সঙ্গে তাল দিয়ে স্বায় দিলো সে। মামের থেকে আশানুরূপ প্রতিক্রিয়া পেয়ে খুশি হলো পুতুল। কৌতুহলের উৎসাহ বেড়ে গেলো হাজার গুন। ফলস্বরূপ পুরো রাস্তায় মেহরিমাকে প্রশ্ন করে করে পাগল করেছে সে। এটা কি,ওটা কি,এটা কেনো হলো,ওটা কেনো হলো এমন হাজারোও প্রশ্ন তার দুচোখ জুড়ে। মেহরিমা ধৈর্য্য নিয়ে মেয়েটার সব কথা শুনেছে। উত্তর দিয়েছে।

মার্কেটে এসে এতো মানুষ দেখে পুতুল একটু ঘাবড়ে গেলো। সহসা মেহরিমার হাত আঁকড়ে ধরে বললো

--মাম ভয়।

মেহরিমা পুতুলকে কোলে তুলে নিলো। গালে চুমু দিয়ে বুকে জড়িয়ে বললো

--মাম সঙ্গে আছি তো আম্মু তাহলে ভয় কিসের?

পুতুল চুপচাপ মেহরিমার বুকে পড়ে রইলো। ডাগর ডাগর চোখ ঘুরিয়ে দেখলো চারপাশ। হাঁটতে হাটঁতে হঠাৎ মেহরিমার নজর গিয়ে পড়লো দূরে ঝোলানো একটা নীল ড্রেসের দিকে। একদম সিন্ড্রেলিনা ড্রেস টাইপ। নীল রঙের জরজেট কাপড়,ফুলকো ঘের,আর সাদা চকচকা স্টোনের কাজে জলজল করেছে জামাটা। মেহরিমার চোখে হুট করে ভেসে উঠলো এই ড্রেস পরিহিত পুতুলকে। ছোট্ট প্রাণ তার জামাটা পড়ে দৌড়াচ্ছে, খেলছে,হাসছে। ঘুরে ঘুরে মেহরিমা দেখাচ্ছে। মেহরিমার মুখে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠলো। আনমনে বললো

--মাশা আল্লাহ আমার আম্মুকে তো সত্যিকারের ডিজনি প্রিন্সেস লাগছে।

--মাম তলো।

পুতুলের ডাকে চমকে উঠলো মেহের। এতোক্ষণ নিজের কল্পনায় বিভোর মেহের এক মূহুর্তের জন্য ভুলে বসেছিলো তার অবস্থান। মেহেরিমার চোখ হঠাৎ ঝপসা হয়ে উঠলো। সে জানে ওই জামা কেনার সামর্থ্য এখন তার নেই। তার জন্য করতে হবে প্রচুর সংগ্রাম আর পরিশ্রম। মেহরিমা জামাটার দিকে তাকিয়ে পুতুলকে শক্ত করে বুকে আগলে নিলো। ভেজা স্বরে ফিসফিস করে বললো

--একদিন এমন একটা ড্রেস মাম তোমাকে কিনে দিবো আম্মু। তোমাকে ডিজনিল্যান্ডের প্রিন্সেস সাজাবো। কথা দিচ্ছি।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে 8 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন