--ওরে মা গো। এ আমার কি হলো গো। আমার শরীরের সব র'ক্ত চুষে নিয়েছে গো। এখন আমায় আর কেউ ভালোবাসবে না গো। আমার পুকি পুকি জিএফ গুলোর কি হবে গো।
বিছানায় শুয়ে শুয়ে তখন থেকে বিলাপ করছে মীর। ইতিমধ্যে এক বক্স টিস্যু নাকের পানি মুছতে মুছতে শেষ করেছে সে। কখনো আবার নিজের বা হাত ধরে কাঁদছে ফ্যাচ ফ্যাচ করে।
রাহুল আড় চোখে মীরের এমন বিলাপ আর কান্নাকাটি দেখেও নিশ্চুপ রইলো। কখনো হাসছে মিটিমিটি। মুখের সামনে মিছে মিছে একটা বই রেখে হাসি আড়ালের ক্ষুদ্র প্রয়াশ চালাচ্ছে সে। পাছে যদি মীর টের পেয়ে যায় তাহলে তার হালুয়া টাইট করে করে ছাড়বে।
রাহুলের মিটিমিটি হাসার মধ্যে আবারও ভেসে এলো মীরে হাহাকার করা বিলাপ
--মীর জাফরের বাচ্চা, দিনেদুপুরে আমার সঙ্গে বাট'পারি কি করে করলো গো?
--ভাই মীর তো তোমার নাম। নিজেই নিজেকে গালমন্দ করছো?
রাহুল ইনোসেন্ট ফেস বানিয়ে বললো। অথচ খ্যাক করে উঠলো মীর। কটমট করে বললো
--বেদ্দপের বাচ্চা চুপ কর। নইলে তোকে আমি...
--আমাকে কি করবা ভাই?
--তোমার পুক্কিতে কেরোসিন ঢেলে কারেন্ট শক দিবো।
রাহুল মেকি হাসলো। কাজের বাহানা দিয়ে দ্রুত চলে গেলো রুম থেকে। মীর কিছুক্ষণ কটমট চোখে তাকিয়ে পুনরায় নিজের আহাজারিতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। আজকে আর এই দুঃখ কমবে না। কি করে কমবে? তার সুন্দর শরীর থেকে বজ্জাত শায়ের দুই ব্যাগ র'ক্ত ভ্যাম্পায়ারের মতো চুষে নিলো যে। এতো খানিক র'ক্তের ঘাটতি এবার সে কিভাবে মেটাবে? এখনই তো দাঁড়াতে গেলে মাথা গোল গোল করছে। তাহলে কাল নতুন পুকি জিএফের সঙ্গে ডেটে যাবে কেমন করে? আহারে তার প্রেমটা হওয়ার আগেই কেমন নাই নাই হয়ে গেলো। এমন ফ্যাকাশে রূপ দেখলে মেয়ে কি আর তাকে পাত্তা দিবে? ভাব দেখিয়ে চলে যাবে না? মীর দুঃখ কষ্টে ভ্যা ভ্যা করে কেঁদে ফেললো। সাতদিন নিয়ম করে কাঁদলে ও এই দুঃখ শেষ হবে না তার।
*******
শায়েরী রুমে বসে উপন্যাসের বই পড়ছিলো। বইটার নাম "পীরে কামিল"। আজকাল ফেসবুক জনপ্রিয় গল্প/উপন্যাসের জন্য। বেশির ভাগ স্টুডেন্টই উপন্যাসের পোকা। সেটা ভালো হোক কিংবা খারাপ এসব দেখার বিষয় তাদের নেই। টিন*এজার বয়সের সঙ্গে ফ্যান্টাসি টাইপ কিছু পেলেই অন্ধের মতো গিলতে থাকে। ডার্ক রোমান্স,সাইকো,ফোর্স লাভ,টক্সিক এগুলোই তাদের প্রিয়র তালিকায় সবার আগে। বুঝুক আর না বুঝুক নায়ক জোড় করে চুমু খাচ্ছে মানেই সে মহাপুরুষ। তার মতো টপ লাভার কাল্পনিক দুনিয়ায় আর দুটো নেই।
টিন*এজার বয়সের মধ্যে শায়েরী এখন না পড়লেও অল্প বয়স থেকে উপন্যাসে প্রবল আগ্রহ থাকায় মেয়েটা সাং*ঘাতিক উপন্যাস প্রেমী। বলা বাহুল্য একাডেমিক বইয়ের থেকে এসব ফ্যান্টাসি বইয়ের স্তুপে তার পড়ার টেবিল পরিপূর্ণ। যখনই নতুন কোনো বই পাবলিশ হয়েছে সবার আগে হইহই করে কিনে এনেছে শায়েরী। পীরে কামিল উপন্যাস টাও এক বান্ধবীর থেকে সালারের বর্ণনা শুনে কিনেছে। ১৫০+ আই-কিউ অধিকারী সালারকে মেয়েটা ফ্যান্টাসি ক্রাশ বানিয়ে ফেলেছে। অথচ বই পড়ার পর এখন তার মাথা ঘুরছে। তিন ভাগের এক ভাগও শেষ হয়নি। অথচ সালারের মতো ঐতিহাসিক এক্সপেরিমেন্ট করার প্রবল আগ্রহ জেগেছে তার মধ্যেও। ভাবছে নতুন কিছু ট্রাই করতে।
শায়েরী ধপ করে বইটা বন্ধ করলো। ভাবতে বসলো গভীর ভাবনায়। পাশেই দাবিয়া হাত পা ছড়িয়ে ঘুমাচ্ছে। আপাতত দিন দুনিয়া সম্পর্কে তার ধ্যান নেই। পেটে ক্ষুধার টের না পাওয়া অবধি ব*ম মে'রে ও তাকে ওঠানো যাবে না।
শায়েরী ঠোঁট উল্টে ফেললো। সালার যেসব এক্সপেরিমেন্ট করেছে ওসব করার শখ তার নাই। জীবনে এখনও অনেক কিছু করা বাকি। বিয়ে হলো না,বাচ্চা হলো না,জামাইয়ের মাথা খাওয়া হলো না তার আগেই এসব ভুজুংভাজুং এক্সপেরিমেন্ট করে সে মরতে চাই না। শায়েরী মন খারাপ হলো। হতাশ হয়ে বললো
--আহারে এখন যদি আমার ও সালার বেবির মতো ১৫০+ আই-কিউ থাকতো তাহলে কতো ভালো হতো। বেবির মতো আমিও নতুন-নতুন এক্সপেরিমেন্ট করতে পারতাম।
মেয়েটার বুক চিরে বেরিয়ে এলো দীর্ঘ শ্বাস। ইশশ কল্পনার মতো কেনো সবকিছু হয় না? বাস্তব জীবন কেনো এতো দুঃখের? শায়েরী ফোঁস করে একটা শ্বাস ফেললো। দু'বার হাত দিয়ে ঝাঁকাল দাবিয়াকে। বিরস কন্ঠে বললো
--বিং বিং ওঠ ভন্ডামি করার সময় হয়েছে।
দাবিয়া দুবার মোচড়া মুচড়ি করলো। ঘুম ঘুম নিভু চোখে তাকিলো শায়েরীর দিকে। ছোট করে ডাকলো
--মিউ
এরপর শায়েরীকে পাত্তা না দিয়ে উল্টো ফিরে আরাম করে শুলো। ভাব টা এমন শায়েরী কে? আপাতত ঘুম ব্যতীত সে কাউকে চেনে না। শায়েরী আবারও ফোঁস করে একটা শ্বাস ফেললো। হাফ ইঞ্চির বিড়াল তাকে ভাব দেখাচ্ছে? দুধ,মিষ্টি খাইয়ে অলস পালছে সে। দিন দিন খাচ্ছে আর বেলুনের ফুলছে। অর্কমার ঢেকি কোনো কাজের না।
শায়েরী দাবিয়াকে ভেংচি কাটলো। উঠে দাঁড়ালো বিছানা থেকে। আপাতত ভাবছে কি করে একটু সময় কাটানো যায়। দুদিন পর তার ভার্সিটির নবীণ বরণ অনুষ্ঠান। সেখানে কি পড়ে যাবে সে...
কথাটা মনে পড়তেই আঁতকে উঠলো মেয়েটা। চোখ বড় বড় করে বললো
--দুদিন পর নবীণ বরণ আর আমি এখনও কোনো ড্রেস কিনলাম না? এখন কি পড়ে যাব আমি?
মেয়েটা চিন্তায় হাসফাস করলো। দাঁত দিয়ে নখ কেটে পায়চারি করতে করতে ভাবলো কি করবে? মায়ের কাছে কিছু চাওয়ার সাহস তার নেই। যা প্রয়োজন হয় মামুনিকে বলবে নয়তো রোহান ভাই। মাঝে মাঝে শায়েরকেও বলে। কিন্তু এখন তো ভাইয়া বাড়ি নেই। রোহান ভাই কি ফিরিছে?
শায়েরী দ্রুত ঘর ছেড়ে বের হলো। যে করেই হোক রোহান ভাইকে রাজি করতেই হবে। নইলে তার নবীণ বরণ পুরো মাটি।
*****
রোহানের রুমে এসে উঁকি ঝুঁকি দিচ্ছে শায়েরী। খরগোশের মতো মাথা টা ঢুকিয়ে দেখার চেষ্টা করছে রোহান আদেও হসপিটাল থেকে ফিরেছে নাকি ফেরেনি।
শায়েরী উঁকি ঝুঁকি দেওয়ার মধ্যে রুম থেকে ভেসে এলো গম্ভীর কন্ঠ।
--সেতু চোরের মতো উঁকি ঝুঁকি না দিয়ে রুমে আয়।
শায়েরী তটস্থ হলো। রোহানের কন্ঠস্বর আজ একটু বেশিই গম্ভীর শোনাচ্ছে। হসপিটালে কোনো সমস্যা হয়নি তো। শায়েরী ভয়ে ভয়ে ঢুকলো রুমে। পিলপিল পায়ে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ালো রোহানের পেছনে। রোহান হয়তো মাত্রই শাওয়ার নিয়েছে। চুল থেকে টপটপ করে পড়ছে ক্ষুদ্র পানিকণা। মোছেওনি ঠিক মতো।
শায়েরী আই ঢাই করলো। নিজের মধ্যে কথা সাজিয়ে নিলো। রোহান পিছু না ফিরেই বললো
--কিছু বলবি সেতু?
শায়েরী চিন্তা ফেলে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। ধীর স্বরে বলে
--তুমি কি ফ্রী আছো ভাইয়া?
--হুম আছি।
--কতোটুকু ফ্রী আছো? বেশি নাকি অল্প?
--বেশিও না অল্প ও না মাঝামাঝি। এখন বল কি বলতে এসেছিস।
শায়েরী ছোট করে ও বললো। শপিং তার কাছে ইমোশনের জায়গা। সেখানে ধরা বাঁধা সময় হলে তার পোষায় না। মার্কেট ঘুরে বেছে বেছে জামা কেনাই তার শখ। অথচ রোহান ভাইয়ের নাকি সময় নেই। তাহলে কিছু হলো?
শায়েরী মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। রোহান শায়েরীর থেকে আশানুরূপ উত্তর না পেয়ে ভ্রু কুচকে পিছু ফিরলো। পকেটে হাত গুঁজে বললো
--কিছু না বলে এমন সঙের মতো দাঁড়িয়ে থাকলে চলবে? আমি তো আর জ্যোতিষি নই যে দৈব শক্তি দিয়ে তোর মন পড়বো।
শায়েরী ফোঁস করে শ্বাস ফেললো। মাথা নিচু রেখে বললো
--আমি যা বলতে এসেছি তাতে তোমার মাঝামাঝি সময় দিয়ে হবে না। বেশি সময়ের প্রয়োজন।
রোহানের ভ্রু জোড়ায় ভাজ পড়লো। ঠোঁট কামড়ে মেয়েটার ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। নিজের মতো হিসেব করলো। অতঃপর শান্ত স্বরে বললো
--তোর না দুদিন পর ভার্সিটির নবীণ বরণ অনুষ্ঠান। ড্রেস কিনেছিস তার জন্য?
মূহুর্তেই চকচক করে উঠলো শায়েরীর চোখ জোড়া। পলক ঝাপটে বললো
--তুমি কিভাবে বুঝলে? আমি তো এখনও বলিনি।
রোহান ফিচেল হাসলো। সামান্য চোরা হাসি। সাবলীল কন্ঠে বললো
--তুই সংক্রান্ত সবকিছুই যে আমার নখদর্পনে সেতু। এই ধ্রুবসত্য তুই ভুলে গেলি কেমন করে?
শায়েরী অতো শতো বোঝে নি। রোহান ভাই তার মনের খবর বুঝেছে এতেই তার খুশি আকাশচুম্বী। শায়েরী খুশিতে গদগদ হলো। তূরন্ত রোহানের হাত ধরে দুলে দুলে বললো
--ও রোহান ভাই সময় করে আমাকে কাল মার্কেটে নিয়ে যাবে প্লিজ। তোমার বেশি সময় নষ্ট করবো না। এই সামান্য একটু খানি সময় খরচ করবো।
মেয়েটা আঙুলের মাপে দেখলাে। অথচ রোহানের নজর তার হাতের দিকে। যেখানে প্রচন্ড অধিকার নিয়ে রাজ করছে শায়েরী। রোহান একপাশে মুখ নিয়ে মুচকি হাসলো। গম্ভীর কন্ঠে বললো
--না নিয়ে গেলে কি করবি?
--ভ্যা ভ্যা করে কেঁদে ফেলবো।
রোহানের হাসি পেল। অথচ গম্ভীর স্বরে বললো
--কাঁদলেও সুরাহা মিলবে না। কারণ আমি তোকে নিয়ে যাবো না।
ধপ করে শায়েরীর হাসি হাসি মুখটা চুপসে গেলো। মুখটা কাঁদো কাঁদো করে বললো
--একটু নিয়ে গেলে কি হয়?
--অনেক কিছু হয়। তাছাড়া কাল আমার ওটি আছে যেতে পারবো না।
--তাহলে পরশু দিন।
--সম্ভব নয়,হসপিটালে মিটিং আছে।
শায়েরীর মুখটা চুপসে গেলো। চোখ জোড়া ইতোমধ্যে পানিতে থৈ থৈ করছে। আরেকটু হলেই কেঁদে ফেলবে সে। রোহান মনোযোগ দিয়ে মেয়েটার মায়াবী মুখটা দেখলো। ফুলকো ফুলকো গাল,কাজল কালো চোখ,বোকা বোকা পলক ঝাপটানো সবকিছু দেখলো মন ভরে।
শায়েরী নাক টানছে। ডাগর ডাগর চোখের পলক ঝাপটে বললো
--রোহান ভাই নিয়ে চলো না তোমাকে আমার ফ্রেবরেট চকলেট দিবো।
--আমাকে তোর মতো বাচ্চা মনে করিস নাকি?
শায়েরী ঠোঁট উল্টে ফেললো। কিভাবে মানাবে সেই চিন্তায় অস্থির রমণী। রোহান আড়ালে ঠোঁট টিপে হাসলো একটু। পরপর সামনে এগোতে নিয়ে বললো
--চল
--কোথায়?
--যেখানে যাওয়ার জন্য বায়না ধরলি।
শায়েরী কিছুটা হতবাক হলো। একটু আগে বললো যাবে না এখন আবার বলছে চল। শায়েরী জিভে ঠোঁট ভেজালো। ছটফটে কন্ঠে বললো
--এখনই নিয়ে যাবে রোহান ভাই?
--হুম
--সত্যি
--না মিথ্যা
শায়েরী চমৎকার হাসলো। রোহান শায়েরীর কপালে আলতো টোকা দিয়ে বললো
--তুই যে ভীষন বোকা সেতু। এই সত্যি কি তুই জানিস?
--মোটেও বোকা নই আমি। ভার্সিটিতে উঠে গেছি তো। তাহলে তো হিসেব মতো বড় হয়েছি আমি। আমাকে বোকা বলবে না ভাইয়া।
রোহান আড়ালে দীর্ঘ শ্বাস ফেললো। চুপচাপ বের হলো রুম থেকে। রোহানের দেখাদেখি শায়েরীও চললো হেলেদুলে। মেয়েটার মনে হাজারও প্রজাপতি উড়ছে। এই রাতের বেলা ও যে রোহান ভাই ওকে নিয়ে মার্কেটে যাচ্ছে এটাই তো অনেক।
******
নিজের রুমে বসে ল্যাপটপে কাজ করছিলো শায়ের। পাশেই ধোঁয়া ওঠা কফি। থেকে থেকে চুমুক দিচ্ছে সেথায়। কাজ করতে গিয়ে কখনো বা ভ্রু জোড়া কুচকে যাচ্ছে। বোঝায় যাচ্ছে চরম বিরক্ত সে।
কাজের মাঝে হঠাৎ শায়ের ফোন বেজে উঠলো। শায়ের বাম হাতে ফোন রিসিভ করে কানে চেপে গম্ভীর কন্ঠে বললো
--হ্যালো
--আমাকে তো কারোর মনে পড়ে না।
ফোনের ওপাশে নিজের দাদুর নিস্তেজ স্বর শুনে শায়েরের ব্যস্ত হাত থেমে গেলো। ঠোঁট চেপে ফোনটা কান থেকে নামিয়ে নম্বর দেখে আবারও কানে গুজলো। ওপাশ থেকে বশির আনসারী অভিমান নিয়ে বলছে
--আমাকে কেউ ভালো ও বাসে না। বাসবে কেনো বুড়ো হয়ে গেছি তো। দাম কমে গেছে।
শায়ের মিটিমিটি হাসলো। ল্যাপটপ পাশে রেখে উঠে গেলো বিছানা থেকে। জানালার কাছে দাঁড়িয়ে পকেটে হাত গুজে শান্ত স্বরে বললো
--কথা সত্য।
বশির আনসারী থতমত খেলেন। বিষ্ময় নিয়ে বললো
--আমাকে তুই ভালোবাসিস না শায়ের?
--কই না তো। তোমাকে ভালোবাসতে যাবো কেনো? আমি তো ভালোবাসি আমার সুইটহার্টকে।
--খবরদার আমার বউকে টানবি না বলছি।
--তোমার বউকে কে টানলো? আমি তো টেনেছি আমার সুইটহার্টকে।
বশির আনসারী ফোঁস করে শ্বাস ফেললো। অনুনয় করে বললো
--এ বাড়িতে আসবি না দাদু ভাই?
--সময় হলে যাবো।
--কবে সময় হবে তোর? আমি মরলে তবে আসিস।
--দাদু..
শায়েরের উঁচু কন্ঠে বশির আনসারী জিভ কাটলেন। ভুল জায়গায় ভুল কথা বলে ফেলেছেন বুঝতে পেরে সহসা কথা পাল্টে বললো
--শোন না শায়ের তোর জন্য একটা জিনিস কিনিছে দেখবি না।
--প্রয়োজন নেই।
শায়েরের কন্ঠ গম্ভীর। আগের মতো দুষ্টুমি নেই তাতে। বুঝতে পেরে বশির আনসারী ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বললো
--আ'ম সরি দাদুভাই। মুখ ফসকে বলে ফেলেছি। রা'গ করিস না প্লিজ।
--আমার রা'গে কি যায় আসে দাদু। যার মধ্যে অনুভূতির ছিটেফোঁটা ও নেই তার সঙ্গে এসব শব্দ মানায় না।
বেশির আনসারী অসহায় বোধ করলো। স্পষ্ট বুঝলো নাতির অভিমান। শায়ের পুনরায় বললো
--অনেক রাত হয়েছে দাদু ঘুমিয়ে পড়ো রাখছি।
বশির আনসারীকে কিছু বলতে না দিয়েই খট করে ফোন কেটে দিলো শায়ের। ফোট ঢিল মে'রে ছুড়লো বিছানায়। পকেটে দু'হাত গুজে গম্ভীর বদনে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো আধারে। অন্ধকারে স্পষ্ট বোঝা না গেলেও রাস্তার হলদে আলোয় তখন দৃশ্যমান হলো তার লাল লাল চোখ জোড়া।
*****
মেহরিমা পুতুলকে নিয়ে ফ্লোরে বসেছে। পুতুলের চুলগুলো ঘাড় ছাড়িয়েছে। স্লিকি নরম চুল গুলোয় এখন ঝুটি বাঁধা যায়। মেহরিমা সেই কাজই করছে। দুপাশে সিঁথি করে মেহরিমার চুল গুলো ভাগ করে নিলো। চিরুনি দিয়ে আঁচড়ে ছোট্ট বিনুনি করলো। অল্প চুল রেখে রাবার ব্যান্ড পেঁচিয়ে দিলো। একই ভাবে করলো ওপর পাশে ও। পুরোটা সময় লক্ষী মেয়ের মতো বসে ছিলো পুতুল। মামের কাছে থাকলে সে ভদ্র বাচ্চা। সামান্য দুষ্টুমিও করে না।
মেহরিমা পুতুলের চুল বাঁধা শেষ করে মুচকি হাসলো। বিনুনিতে হাত বুলিয়ে বললো
--মাশা আল্লাহ আমার আম্মুকে তো পুরোই প্রিন্সেসের মতো লাগছে।
পুতুল খিলখিলিয়ে হাসলো। মাথা নাড়িয়ে বললো
--পুতুকে পিনতেতের মতো নাগছে মাম।
--হ্যা মা লাগছে তো। কিউট কিউট প্রিন্সেস লাগছে।
পুতুল মুখে হাত চেপে হাসলো। পরপর উঠে গেলো বসা থেকে। দৌড়ে গিয়ে ছোট্ট আয়না টা নিয়ে এসে মেহরিমার হাতে দিয়ে বললো
--মাম এত্তু দলো তো। দিকি পুতুকে কেমুন লাগছে?
পুতুলের ঢং দেখে মেহরিমা মিটি মিটি হাসলো। দু'হাতে আয়না ধরে বললো
--দেখো দেখো। শিগগির দেখো তো আম্মু।
পুতুল আয়নার দিকে তাকালো। ডাগর ডাগর চোখ ঝাপটে নিজেকে দেখলো কিছুক্ষণ। এরপর চোখ বড় বড় করে গালে হাত দিয়ে অবাক কন্ঠে
--ওলে বাবা পুতুকে কি তুন্দুল নাগছে। একদম পলী।
পুনরায় বললো
--পুতুকে একদুম মিত্তি মিত্তি পলী নাগছে মাম।
--লাগছেই তো। আমার আম্মু তো পরীই। মিষ্টি মিষ্টি আদুরে পরী।
পুতুল হাসলো। হুট করেই ঝপাৎ করে মেহরিমার বুকে ঢলে পড়লো। আদুরে স্বরে বললো
--একতু আদল দাও তো মাম। সক্তি নেই। মাতা গুলছে।
মেহরিমা প্রথমে ভরকে গেলেও ভ্রু কুচকে ফেললো। বললো গম্ভীর স্বরে
--আদর দিলে শক্তি চলে আসবে।
পুতুল ঘনঘন মাথা নাড়িয়ে বললে
--হুম
--এসব তোমাকে কে শিখিয়েছে?
--কেউ চেখায় নি তো। আমি চিকেচি।
--তুমি কোথা থেকে শিখলে?
--ইমনি ইমনি চিকেচি। একুন আদল দাও।
--দিবো না আদর৷ একদিন আদর না দিলে কি হয় হুম।
পুতুল মেহরিমার বুকে হেলে পড়লো। কপালে হাত রেখে নিভু নিভু আওয়াজে বললো
--মাম সপ সুক্তি চুলে গেনো। আদল দাও তালাতালি।
মেহরিমা পুতুলের নাটক দেখে অবাক না হয়ে পাড়লো না। মেকি গম্ভীরতা নিয়ে বললো
--ওরে দুষ্টু মেয়ে। মামকে ঘোল খাওয়ানো শিখে ফেলেছো?
--মাম দাও না আদল। বেতি না ইকতু দাও।
ঠোট উল্টে নিষ্পাপ চাহনি নিয়ে তাকালো পুতুল। মেহরিমা পুতুলকে দেখলো চোখ ছোট ছোট করে।
--মাম...
মেহরিমা হেঁসে ফেললো। পুতুলের গালে চুমু দিয়ে বললো
--শক্তি ফিরিছে তো?
--একুনো সপ আতে নি। আলো দাও।
মেহেরিমা একে একে গাল,চোখ,নাক, কপালে চুমু দিলো। ভ্রু নাচিয়ে বললো
--হয়েছে?
--না আলেকতু।
--তবে রে...
--মেহের দেখ কে এসেছেন।
মায়ের কথায় পিছু ফিরলো মেহরিমা। স্বাভাবিক কন্ঠে বললো
--কে এসেছে আম্মু?
শাহিদা নেওয়াজ থমথমে মুখে সামনে থেকে সরে দাড়ালেন। পেছন থেকে বেরিয়ে এলে পরিচিত তবে অপ্রত্যাশিত মুখ। মেহেরিমা আগন্তুক কে দেখে অবাক হলো। বিস্মিত কন্ঠে থেমে থেমে বললো
--আ..আপনি...?