ফন্ট সাইজ:
থিম:
আয় তবে সহচরী

10

লেখক: উম্মে_হাবিবা

একটু আগে যতটা উচ্ছাস আর আনন্দ নিয়ে মেহরিমা পুতুলের সঙ্গে খুনসুটিতে মেতে ছিলো এখন তার চেয়েও অধিক কঠোরত্ব আর গম্ভীরতা প্রকাশ পেয়েছে সুশ্রী চেহারায়। তীক্ষ্ণ সূচালো দৃষ্টিতে দেখছে সামনের মানুষটাকে। শাহিদা নেওয়াজ মেয়ের পাশে এসে দাঁড়ালো। মেহরিমার হাতটা শক্ত করে ধরে রাখলো নিজের মুঠোয়। আগন্তুক কে বুঝিয়ে দিলো তার মেয়ে এখন আর একা নেই তার পাশে তার মা আছে।

সামনের মানুষটি মা মেয়ের এমন গম্ভীর চেহারা দেখে বিশ্রী হাসলো। পিছু ফিরে পানের পিক বাইরে ফেলে নিজের মাথার টুপিটা ঠিকঠাক করলো। শাহিদা নেওয়াজের দিকে তাকিয়ে আমোদিত স্বরে বললো

-- আসসালামু আলাইকুম ভাবিজান। নিজেদের রাজপ্রাসাদ ছেড়ে এই বস্তি এলাকায় ভালো আছেন তো? অবশ্য থাকারই কথা, র'ক্ত কথা বলে কি না।

আগন্তুকের কথা শুনে মুখটা বিকৃত করে ফেললো শাহিদা নেওয়াজ। উত্তর না দিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিলো। লোকটা বোধহয় এতে আরো মজা পেলো। দুঃখী দুঃখী ভাব করে বললো

--এটা কিন্তু ঠিক হলো না ভাবিজান। এই নিয়ে দ্বিতীয় বার আপনাকে সসম্মানে সালাম দিয়ে ভালো মন্দের খবর জানতে চাইলাম অথচ আপনি আমাকে গুরুতই দিলেন না। আমি বুঝি এতোটাই পর হয়ে গেলাম?

শাহিদা নেওয়াজ কে চুপ থাকতে দেখে খেক খেক করে হেঁসে উঠলো আগন্তুক। সেই হাসিতে মিশে আছে উপহাস আর বাজে ইঙ্গিতের ইশারা। আগন্তুক ভেবেই বসলো সে উত্তর পাবে না। নিজের মতো এগিয়ে এসে বিছানায় বসতে নিলে সহসা থেমে গেলো মেহরিমার কথায়

--শ্রদ্ধেয় চাচাজান বিছানায় আরাম করে বসতে পারবেন তো? শুনলাম পরকীয়া করতে গিয়ে ছোট মায়ের কাছে হাতে নাতে ধরা খেয়েছেন। আর তার শাস্তি হিসেবে ছোট মা আপনার পুরুষত্ব বিচ্ছিন্ন করে পশ্চাৎ তে আগুনের দারুণ কারুকাজ করেছে।

আসাদ নেওয়াজ বসতে গিয়েও বসতে পারলেন না। দু ফুটের মেয়ের মুখে নিজের সম্পর্কে অপমান মূলক কথা শুনে মুখটা থমথমে করে ফেললেন। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে তীক্ষ্ণ চোখে অবলোকন করলো সদ্য আঠারোতে পা দেওয়া অসীম সৌন্দর্যের অধিকারী অষ্টাদশী কন্যাকে। যার ঠোঁটে দৃশ্যমান তাচ্ছিল্যের মৃদু হাসি। মেয়েটার মুখের আদল একজনের সঙ্গে খুব মিল। বলা বাহুল্য এই মেয়ে যদি ছেলে হতো তবে তার জেরক্স কপি হয়ে দুনিয়ায় দাপিয়ে বেড়াত। যেমন ভাবে দাপিয়ে বেড়িয়েছিলো এই মেয়ের বাবা মেজর ইব্রাহিম নেওয়াজ।

--শ্রদ্ধেয় চাচাজানের জবান লক হয়ে গেলো কেনো? নিজের সম্পর্কে সত্য কথা শোনায় হাগা কষা হলো নাকি?

আসাদ নেওয়াজ একপেশে হাসলো। ধীর কদমে এগিয়ে এসে দাঁড়ালো মেহরিমার সামনে। মেয়েটার তীক্ষ্ণ, ভয়হীন চোখ জোড়ায় দৃষ্টি রেখে বললো

--একদম বাবার মতো হয়েছো দেখছি। কথা মাটিতে পড়তেই দাও না। তার আগেই তীর ছুড়ে ফালা ফালা করে ছাড়ো।

--বাবার আদরের রাজকন্যা আমি। বাবার অর্বতমানে তার রাজত্ব সামলাতে বাবার আদর্শই মেনে চলবো এটাই তো স্বাভাবিক।

আসাদ নেওয়াজ বোঝার মতো মাথা দোলালেন। মেহরিমার দিকে অল্প ঝুঁকে ফিসফিস করে বললো

--বাবার মতো হওয়া দোষের নয়। তবে খেয়াল রেখো বাবার মতো পরিনতি যেন তোমার না হয়। নয়তো অতি সাহস দেখাতে গিয়ে অকালেই নিজের আয়ুর হেফাজতে ব্যর্থ হবে তুমি।

মেহরিমার এসব কথা শুনে কিছুই এলো গেলো না। আর না তো নিজের চোখ জোড়া সরালো। বরং আগের থেকেই নির্ভিক আর দৃঢ় স্বরে বললো

--চাচার বোধহয় আজ সকালে হাগা হয়নি। কষা হয়ে হাগা মাথায় উঠে গেছি নাকি চাচা? নয়তো আপনার মতো মানুষের থেকে এমন ইউজলেস কথা আশা করি নি আমি।

আসাদ নেওয়াজ মেহরিমার কথার অর্থ বোঝে নি। ভ্রু কুচকে বললো

--কি বলতে চাইছো?

--বলতে চাইছি আপনার বলায় কিছুটা ভুল আছে। একদম বোকার মতোই কথা বলেছেন আপনি। যেখানে বান্দার চুল থেকে মাথা পর্যন্ত সবকিছুর হেফাজত স্বয়ং আল্লাহ নিজে করেন সেখানে আপনি ক্ষুদ্র মনুষ্য জাত হয়ে রুহের সময়সীমা বলছেন। ছিঃ চাচা ছিঃ আপনার মতো শেয়ালের থেকে এসব আশা করি নি আমি। ইশশ খুবই হতাশ হলাম।

মেহরিমা আফসোস করে মাথা নাড়ালো। অথচ মেজাজ চটে গেলো আসাদ নেওয়াজের। হিসহিসিয়ে বললো

--বড্ড সাহস বেড়েছে তোমার তাই না? দুদিনের মেয়ে হয়ে আমার সঙ্গে লড়তে এসেছো।

--সাহস আমার বরাবরই বেশি ছিলো চাচা। কেনো আপনি আগে খেয়াল করেন নি?

আসাদ নেওয়াজ রা'গতে গিয়েও রা'গলেন না। মাথা কাত করে অদ্ভুত নজরে তাকিয়ে রইলেন মেহরিমার দিকে। লোকটার ওই নোংরা নজর দেখে মেহরিমা শান্ত রইলেও অজানা আশঙ্কায় বুক কেঁপে উঠলো শাহিদা নেওয়াজের। তূরন্ত মেয়ের সামনে এসে দাঁড়িয়ে মেয়েকে আড়াল করে রাখলেন।

--খবরদার আসাদ আমার পবিত্র মেয়ের দিকে তোমার ওই কুৎসিত নোংরা নজর দেবে না। বুক থেকে কলিজা বের করে ছাড়বো আমি।

শাহিদা নেওয়াজ রা'গে কাঁপছে। চোখ দুটো রক্তিম। মানস্পটে ঝাপসা হয়ে ভেসে উঠছে পরিণীতার সেই বিভৎস র'ক্তাক্ত দেহটা। সদ্য মা হওয়া মেয়েটাকে কেমন জা*নো*য়ারের মতো খুবলে খেয়েছিলো শকুন গুলো। শাহিদা নেওয়াজ ওই ভয়ানক রাতের কথা কখনো ভুলতে পারবে না। যে রাতে পরপর চারটে লা*শের মুখোমুখি হতে হয়েছিলো তাকে। হারিয়েছিলো নিজের ভরসাস্থলকে,স্বামী-সন্তান হারিয়ে মৃতপ্রায় হলো তার সন্তান। সদ্য জন্মানো ছয়ঘন্টার শিশু জন্মদাত্রীকে ছোঁয়ার আগেই হারিয়ে ফেললো।

শাহিদা নেওয়াজ আর সইতে পারলো না। শক্ত করে খিচে বন্ধ করে ফেললো চোখ জোড়া। সে মনে করতে চায় না ওই রাতের কথা। ওই রাত,ওই ধ্বংস শুধু এবং শুধুমাত্র নিজের মধ্যে রাখতে চায়।

আসাদ নেওয়াজ শাহিদা নেওয়াজের হুমকিতে বেশ আনন্দ পেলো। কিছুক্ষণ চুপ থেকে হুট খেক খেক করে হেঁসে উঠলো। যে হাসির মানে মেহরিমা না বুঝলেও ভয়ে শিরদাঁড়া বেয়ে শীতল স্রোত বয়ে গেলো শাহিদা নেওয়াজের। মেয়েকে বুকে জড়িয়ে আতঙ্কিত চোখে দেখে গেলো সামনের মানুষটাকে।

আসাদ নেওয়াজকে দেখেই ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে মেহরিমাকে আঁকড়ে ধরে দাঁড়িয়েছিলো পুতুল। এই লোকটাকে দেখলেই তার ভয় করে। কেমন বিশ্রী ভাবে হাসে। ভয়ানক চোখে তাকায়। ছোট্ট প্রাণ এসব সইতে পারে না। মস্তিষ্কে বিরূপ প্রভাব ফেলে আতঙ্ক থেকে ভয়ের সৃষ্টি করে।

পুতুল মেহরিমাকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। চোখ বুজে কাপা কাপা স্বরে বললো

--মাম লাক্কোস আমাদেল কেয়ে পেলবে। আমাল বয় কলছে মাম। লাক্কোসকে তালিয়ে দাও মাম।

পুতুল ভয়ে কেঁদে ফেললো। মেহরিমা দ্রুত পুতুলকে বুকে আগলে নিয়ে বললো

--কোনো ভয় নেই আম্মু। এই দেখো মাম তোমার সঙ্গে আছি তো। একদম ভয় পেয়ো না তুমি সোনা। শান্ত হও।

পুতুল শুনলো না। ভয়ে মেহরিমার গলা আঁকড়ে ধরে কাঁধে মুখ গুজে ফুঁপিয়ে চললো। বিরবির করে বললো

--লাক্কোস বালো না। ওকে তালিয়ে দাও মাম। আমাদেল কেয়ে পেলবে।

মেহরিমা অস্থির হলো পুতুলের কান্নায়। মেয়েটা এভাবে কখনো কাঁদে না। আজ হঠাৎ কি হলো?

আসাদ নেওয়াজ পুতুলকে দেখে হাসি থামালো। এতোক্ষণ এই পুচকে কে খেয়াল করে নি সে। পুতুলকে দেখে হাসি মুখেই বললো

--ক্যাপ্টেন সাহেবের মেয়ে দেখি। বাহ! বেশ বড় হয়ে গেছে তো।

আসাদ নেওয়াজ পুতুলের দিকে হাত বাড়াতে নিলে সহসা ওনাকে দু'হাতে জোড়ে ধাক্কা দিলো শাহিদা নেওয়াজ। ফলস্বরূপ কয়েক পা পিছিয়ে গেলো সে। ক্রুর হাসি মুখে নিয়ে আসাদ নেওয়াজ ঘাড় কাত করে দেখে গেলেন শাহিদা নেওয়াজের ছটফটানি। শাহিদা নেওয়াজ মেহরিমার বুক থেকে নাতিকে ছো মে'রে নিজের বুকে নিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললো

--তোমাকে একবার নিষেধ করেছি আসাদ আমার মেয়ে,নাতনি কারোর দিকে তোমার ওই নোংরা হাত হাত বাড়াবে না। জানে মে'রে ফেলবো একদম।

--কি বলছেন ভাবিজান। আপনার মেয়ে, নাতনি ওরা সবাই তো আমারও মেয়ে নাতনি। র'ক্তের সম্পর্ক রয়েছে আমাদের। ওদেরকে আমি ছুয়ে দেখবো না।

--না ছোবে না। তোমার ওই বিষাক্ত নোংরা স্পর্শ আমি কখনোই লাগতে দেবো না আমার ফুলেদের গায়ে।

--তাই নাকি। এতো নিশ্চয়তা কিভাবে দিচ্ছেন আপনি ভাবিজান? ভুলে গেলেন নাকি পরিণীতার কথা?

শাহিদা নেওয়াজ শিওরে উঠলো। কপালে ইতোমধ্যে তার ঘামের দেখা মিলেছে। শ্বাস নিচ্ছে জোড়ে জোড়ে। যতই নিজেকে সাহসী দেখানোর চেষ্টা করুক না কেনো সেতো একটা মেয়ে। কিভাবে একজন পুরুষের সঙ্গে লড়বেন তিনি? কিভাবেই বা রক্ষা করবে তার ফুলেদের? যাদের কালো ছায়া থেকে বাঁচতে নিজেদের আলিশান বাড়ি ছেড়ে শহরের এই বস্তিতে এসে থাকছেন সেখানেও তাদের ছায়া পড়ে গেছে। এবার কি করবেন তিনি?

মেহরিমা চাচার মুখে নিজের ভাবীর কথা শুনে ভ্রু কুচকে ফেললো। সন্দিহান কন্ঠে বললো

--এরমধ্যে আমার ভাবীকে টানছেন কেনো আপনি?

আসাদ নেওয়াজ মেহরিমার দিকে তাকালো। গালে জিভ ঠেলে বললো

--কারণটা না হয় আমার সম্মানিয় ভাবিজানের কাছ থেকেই শুনে নিও।

--ছুটকি,আম্মু কোথায় তোমরা? শিগগির এসো আমার খোকা উঠে পড়েছে।

ভেতরের ঘর থেকে জেসমিনের কন্ঠ শুনে আসাদ নেওয়াজ সোজা হয়ে দাঁড়ালো। তাচ্ছিল্যের স্বরে বললো

--এই পাগলকে এখনোও নিজেদের কাছে রেখে দিয়েছেন কেনো ভাবি? কোনো পাগলা গারদে পাঠিয়ে দিতেন। শুধু শুধু একটা বোঝা বানিয়ে রেখেছেন।

--মুখ সামলে কথা বলুন মিস্টার আসাদ নেওয়াজ। আমার বোনকে একদম পাগল বলতে আসবেন না। বাবার ভাই হিসেবে যতোটা ভদ্রতা দেখিয়েছিলাম তার চেয়ে দ্বিগুণ অপমান ফেরত দিয়ে ছাড়বো কিন্তু।

মেহরিমা রা'গে কাঁপছে। তার বোনকে পাগল বললে তার মাথা ঠিক থাকে না। কেনো পাগল বলবে তার বোন কে? তার বোন কি পাগল? স্বামী সন্তান হারিয়ে অতিরিক্ত শকে নিজের মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছে। ঠিকঠাক চিকিৎসা চললে কয়দিন পরই সুস্থ হয়ে উঠবে। তবে কেনো সবাই তাকে পাগল বলবে?

আসাদ নেওয়াজ কিটকিটে হাসলো। হেয়ালি করে বললো

--পাগলকে দেখছি আজকাল পাগলও বলা যাবে না।

রক্তাভ চোখে তাকালো মেহরিমা। একটু আগের শান্ত মেয়েটা মুহূর্তেই কেমন অগ্নিরূপ ধারণ করলো। আসাদ নেওয়াজ মেয়েটার এমন রূপ দেখে ভেতরে ভেতরে ঘাবড়ে গেলেও প্রকাশ করলো না। চেহারা বিদ্রুপের হাসি রেখেই অপেক্ষা করলো পরবর্তী কথার।

মেহরিমা নিজের রা'গের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে। সে এখন কোনো ভাবেই চাইছে না অশান্তি করছে। কুকুর কা*মড় দিতেই পারে তাই বলে সেওকি কুকুরকে কা*মড়াবে? তাহলে তার আর কুকুরের মধ্যে কি পার্থক্য রইলো। মেহরিমা চোখ বুজে বার কয়েক জোড়ে জোড়ে শ্বাস নিলো। এই লোকের সঙ্গে কথা বলার বিন্দু মাত্র ইচ্ছে তার মধ্যে অবশিষ্ট নেই। এতোক্ষণ দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করলেও ধৈর্য্য হারিয়েছে এখন। মেহরিমা নিজেই নিজেকে স্বান্তনা দিলো। বিরবির করে বললো

--রিল্যাক্স মেহের রিল্যাক্স। এতো সহজে ধৈর্য্য হারালে চলবে না। এই লোককে পাল্টা জবাব দিতে হতে ঠান্ডা মাথায় কাজ করতে হবে। শান্ত হ তুই। কুল কুল।

মেহরিমা ঘাড় বাকিয়ে মায়ের দিকে তাকালো। পুতুল এখন আর কাঁদছে না। তবে ফুঁপিয়ে উঠছে মাঝে মাঝে। মেহরিমা মায়ের দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বললো

--পুতুলকে নিয়ে মেজ আপার কাছে যাও আম্মু। এনাকে আমি বিদায় দিচ্ছি।

--কিন্তু মেহের..

--তুমি যাও আম্মু।

--ছুটকি, আম্মু এখনোও আসছো না কেনো?

ঘর থেকে আবারও জেসমিনের আওয়াজ এলো। স্বর শুনেই বোঝা যাচ্ছে মেয়েটা যে বড্ড অধৈর্য্য হয়ে আছে।

--মেজ আপা ডাকছে আম্মু। এখানে দাঁড়িয়ে আর সময় নষ্ট করো না। ভেতরে যাও।

শাহিদা নেওয়াজ মেয়ের উপরে আর কথা বলতে পারলো না। আড় চোখে আসাদ নেওয়াজকে দেখে পুতুলকে বুকে জড়িয়ে পা বাড়ালো ভেতরে। মা যেতেই মেহরিমা আড়ালে শ্বাস ফেললো। আসাদ নেওয়াজের দিকে তাকিয়ে বললো

--তারপর চাচা কি যেন বলছিলেন? আমার বোন পাগল তাই তো?

আসাদ নেওয়াজ ভাবলেশহীন ভাবে বললো

--অবশ্যই। তুমি যতোই যুক্তি দেখাও সত্যি তো আর মিথ্যা হয়ে যাবে না।

মেহরিমা মাথা নাড়ালো। বুকে হাত গুজে শান্ত স্বরে বললো

--কথা সত্য। কিন্তু চাচা আমার বোন আপনার সঙ্গে কি কোনো পাগলামি করেছে যার জন্য আপনি তাকে সরাসরি পাগল বলে সম্মোধন করলেন।

--আমার সঙ্গে পাগলামি করতে যাবে কেনো? তোমাদের সঙ্গে করেছে ওগুলো কি আমি দেখি নি। ওসব দেখলে তো যে কেউই বলবে জেসমিন পাগল।

মেহরিমা সূক্ষ্ম হাসলো।

--আসল পাগল কাকে বলে জানেন চাচা? যারা রাস্তায় রাস্তায় ঘুড়ে বেড়ায়,মানুষকে ধরে ধরে মা'রে,পোশাক খুলে বস্ত্রহীন ঘোরে তাদের বলে পাগল। কিন্তু আমার আপু তো এসব কিছু করে না। তাহলে তাকে আপনি পাগল বললেন কেনো?

--তোমরা ধরে বেঁধে আটকে না রাখলে এতোদিনে এসবও করতো ও। মেজরের মেয়ে রাস্তায় রাস্তায় বস্ত্রহীন ঘুরতো।

কথাটুকু বলতে পেরে আসাদ নেওয়াজ যুদ্ধ জয় করার মতো আনন্দ পেলো। হাসলো ঠোঁট ছড়িয়ে। মেহরিমা সেই হাসির দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষন। অতঃপর শান্ত, সাবলীল কন্ঠে বললো

--মেজরের মেয়ে না হয় পাগল হয়ে বস্ত্রহীন ঘুরতো কিন্তু বিশিষ্ট সম্মানীয় চেয়ারম্যানের মেয়ে যে স্বামী রেখেও সজ্ঞানে পর পুরুষের সামনে কাপড় খুলে শরীর বিলিয়ে যৌ'বনের জ্বা'লা কমায় সেটাকে কি বলে চাচা? পাগলামি নাকি সেচ্ছায় বে*শ্যাগিরি?

ধপ করে মুখের হাসি বিলীন হলো আসাদ নেওয়াজের। চোখ দুটো প্রকট করে তুতলে বললো

--কি..কিসব বাজে কথা বলছো তু..তুমি? আমার মেয়ের নামে উল্টা পাল্টা কিছু বলবে না মেহের।

--কেনো চাচা শুনতে খারাপ লাগছে? কিন্তু আমি যে খবর পেলাম তিনদিন আগে নাকি এলাকার কালু চোরার সঙ্গে রাত কাটিয়েছে আপনার মেয়ে। আপনিই তো টাকা খাইয়ে লোকের মুখ বন্ধ করেছিলেন। এতো তাড়াতাড়ি ভুলে গেলেন বুঝি?

আসাদ নেওয়াজের গা থেকে ঘাম ছুটে গেলো। এতোটুকু একটা মেয়ে কথার জালে তাকে হারিয়ে দিচ্ছে বিষয়টা মেনে নিতে পারছে না সে। মেহরিমা চাচার অস্থিরতা দেখে মৃদু হাসলো। পুনরায় বললো

--এটা কোনো কথা হলো চাচা। নেওয়াজ বংশের একটা ক্লাস আছে তো। আপনার মেয়ের যদি এতোই প্রয়োজন হয় ভালো কোনো মালদার পার্টি খুঁজতো। চোরই কোনো? তাও আবার কালু চোরা। ইশশ লোকটাকে দেখলেই তো ভয় লাগে। কেমন তেল চিপচিপে শরীর,ভয়ানক চেহারা,গা থেকেও ভ্যাবসা গন্ধ সেখানে আপনার মেয়ে তার সঙ্গে রাত কাটালো কেমন করে? ছিঃ রুচিতে ও বাঁধে নি।

আসাদ নেওয়াজ আর সইতে পারলো না। ধমকে বললো

--বেয়াদব মেয়ে মুখ সামলাও তোমার। ভুলে যেও না আমি তোমার চাচা হই।

মেহরিমা থোরাই গুরুত্ব দিলো। উল্টো কয়েক পা এগিয়ে চাচার কানে ফিসফিস করে বললো

--এরপর থেকে মেয়েকে সুখী করতে জামাইয়ের পেছনে টাকা ঢালবেন। দেশের ঔষধে কাজ না হলে কলিকাতা হারবাল আনবেন তবুও মেয়েকে চোর ডাকাতের কাছে সপে দেবেন না চাচা। মনে রাখবেন বদনাম কিন্তু পুরো নেওয়াজদেরই হচ্ছে।

আসাদ নেওয়াজ কটমটে চোখে মেহরিমার দিকে তাকিয়ে ধুপধাপ পা ফেলে চলে গেলো। মেহরিমা ঠোঁট টিপে হাসলেও উঁচু স্বরে বললো

--ভালো থাকবেন চাচা। আপনার রুহের অগ্রীম মাগফিরাত কামনা করছি। আশা করছি শীগ্রই জাহান্নামের শ্রেষ্ঠ স্থানে জায়গা হবে আপনার।

আসাদ নেওয়াজ রা'গী চোখে মেহরিমার দিকে তাকিয়ে হিসহিসিয়ে বললো

--তোমাকে আমি দেখে নিবো।

--অবশ্যই দেখবেন। ভাতিজি হই তো আপনার। আপনার দেখার অধিকার আছে। তবে দূরে থেকে কিভাবে দেখবেন? ওয়েট আপনামে বরং আমার একটা ছবি দেয়। বড় ফ্রেমে বাধিয়ে রোজ ছয় বেলা না হয় নিয়ম করে আমায় দেখবেন।

--বেয়াদব মেয়ে একটা।

আসাদ নেওয়াজ দ্রুত চলে গেলেন। মেহরিমা শুধু হাসলো। অতঃপর বুক চিরে বেড়িয়ে এলো দীর্ঘ শ্বাস। এদের সঙ্গে সহজে পারবে না সে। বাবার শেষ স্মৃতি রক্ষা করতে তাকে অনেক লড়াই করতে হবে।

*******
দেখতে দেখতে পরবর্তী সময় গুলো চলে গেলো। আজ মেহরিমার ভার্সিটির প্রথম দিন। সকাল সকাল মেয়েটা বেড়িয়েছে। হাতের কাজ গুলো সেরে দ্রুতই চলে যাবে ভার্সিটিতে। এরপর যুক্ত হবে নবীন বরণ অনুষ্ঠানে। সেভাবেই ভেবেছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়....

নতুন ফুলেদের আমন্ত্রণের জন্য পুরো ভার্সিটি আজ সেজেছে নতুন রূপে। অডিটোরিয়ামের বিশাল হল রুম সাজানো হয়েছে সুন্দর করে। কোথাও কোনো খামতি নেই। দেলোয়ার হক দুলালের বেশ পচ্ছন্দ হয়েছে সাজানো। মনে মনে নিজেকে বাহবা ও দিয়েছে সঠিক মানুষকে দায়িত্ব দেওয়ার জন্য।

শায়ের আজ প্রচন্ড ব্যস্ত। নিজের টিমকে সাথে নিয়ে সকল কাজ দায়িত্ব সহকারে পালন করছে। কোথাও কোনো কার্পন্য নেই। মীর নিজেও আজ কাজ করছে তবে মাঝে মাঝে নতুন নতুন মেয়েদের সাথে ফ্লার্ট করতে ভুলছে না।

একসময় নবীণ বরণের অনুষ্ঠান শুরু হলো। প্রিন্সিপালের থেকে অনুমতি নিয়ে ভার্সিটির সিনিয়র স্টুডেন্ট মিলে আনুষ্ঠান পরিচালনা করলো। একে একে নাচ,গান,কবিতা আবৃত্তি,মঞ্চ নাটক,একক নাটক সবকিছু শেষ হলো। নতুন স্টুডেন্টদের ফুল দিয়ে স্বাগতম জানালো হলো।

পুরো অনুষ্ঠান যখন জাঁকজমকপূর্ণ তখনই হলরুমের সকল আলো নিভে গেলো। গাড়ো লাল কালো মিশেলের স্পট লাইট জ্বলে উঠলো স্টেজে। সেখানে গিটার হাতে নিয়ে দাঁড়িয়েছে বলিষ্ঠ দেহের এক যুবক। ছেলেটার মুখ দেখা যাচ্ছে না। আলো আধারির আড়ালে সে। স্টুডেন্টদের মধ্যে শুরু হলো কানা ঘুসা।

ছেলেটা গিটারের তারে টুংটাং আওয়াজ তুললো। মীর স্টেজের পাশে দাঁড়িয়ে রাহুলকে খোঁচা মে'রে বললো

--রাহুইল্লা স্টেজে কে উঠেছে রে?

রাহুল ফিসফিস করে বললো

--শায়ের ভাই

মীর যেন নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারলো না। চোখ বড় বড় করে বললো

--কি বলিস শায়ের?

--আস্তে চেঁচাও ভাই। সবাই শুনে ফেলবে।

মীর  আশেপাশে তাকিয়ে নিচু স্বরে বললো

--শায়ের আর গান কিভাবে সম্ভব?

--আমি তো জানি না ভাই।

--কিন্তু শায়ের তো গান...

ওদের ফিসফিসানির মধ্যে পুরুষালী গম্ভীর স্বর ভেসে এলো। মুহূর্তেই অডিটোরিয়ামে নেমে এলো নিশ্চুপতা। শায়ের গিটারের সুরের সঙ্গে মিলিয়ে গাইছে

     ~মন বলেছে তোর সাথে যাবো
      তোকে নিয়ে আজকে হারাবো..
    সোহাগের হাওয়ায়, মেঘেদের ডানায়
      এই মন বেখেয়ালে অন্তরালে
            স্বপ্ন রেখে যায়....

শায়েরের সুরেলা গম্ভীর কন্ঠের গানে পুরো অডিটোরিয়াম জুড়ে নেমে এলো নিস্তব্ধতা। প্রতিটা স্টুডেন্ট থেকে শুরু করে শিক্ষকরাও শুনলো মুগ্ধ হয়ে। গিটারের টুংটাং রসায়ন আর সুরের মূছর্ণায় আলোড়িত গোটা অডিটোরিয়াম।

        ~তোর শরীরে মন গভীরে
     ভেজে কুয়াশাতে আলতো ছোঁয়াতে~

    ~সোহাগের হাওয়ায় মেঘেদের ডানায়
        এই মন বেখেয়ালে অন্তরালে
                  স্বপ্ন রেখে যায়~

হুট করেই থেমে গেলো শায়েরের গান। ইচ্ছে করেই থেমেছে সে। এতোক্ষণ যাও একটু মুড ছিলো এখন সেটা বিলীন। ফলাফলস্বরূপ গানের মাঝ পথেই থেমে গিয়েছে।

--গান থেমে গেলো কেনো? পুরোটা শেষ করো।

অন্ধকার অডিটোরিয়ামে তখন ফিসফিসানির মাত্রা বেড়েছে। প্রত্যেকের মধ্যে কৌতুহল। কে গান গাইলো? মাঝ পথে থেমে গেলো কেনো? তার চেহারা দেখাচ্ছে না কেনো? এরকম হাজারো ও প্রশ্ন ভেসে এলো। শায়ের একপেশে বাঁকা হাসলো। এই সমাজের ভাষায় সে বেপরোয়া,বেয়াদব। আদবের ছিটেফোঁটা ও নেই তার মধ্যে। তাহলে সে কেনো আজ পুরো গান গেয়ে ভালো ছেলের পরিচয় দিবে? এসব কি তার চরিত্রের সঙ্গে যায়? উহুম একদম না। এজন্যই সবাইকে গোলকধাঁধায় ফেলে মাঝ পথেই থেমেছে তার সুর। এর বেশি সে আর গায়তে পারবে না। সম্ভবই না।

সবার কানাঘুষার মধ্যে শায়ের যখন স্টেজ থেকে নামতে নিবে তখনই অচেনা মেয়েলী সুর ভেসে এলো তার কানে।

   ~জোনাকির গানে আদরের টানে
           এই মন ছুয়ে থাকে
      ইচ্ছে আঁকে ওই সুখের তারায়~

অন্ধকারাচ্ছন্ন অডিটোরিয়ামের কোণ থেকে ভেসে আসা অচেনা মেয়েলী সুরের কন্ঠে গানের পরবর্তী লিরিক্স শুনে বহু আগেই থেমেছে শায়েরে চলন্ত পা যুগল। অজানা কারণে কেঁপে উঠেছে বুক,থমকেছে বেপরোয়া শায়েরের হৃৎস্পন্দন। তড়িৎ পিছু ফিরে অন্ধকারে খুঁজেছে সুরের মালিককে। অথচ সে ব্যর্থ। আলো আধারীর জাল ভেদ করে সেই সুরের অস্তিত্ব খুঁজে পায়নি সে। তবুও অস্থির চোখ জোড়া ঘুড়ে ফিরে খুজে চলেছে তাকে।

অডিটোরিয়াম জুড়ে তখন টান টান উত্তেজনা। আঁধারের মাঝে কোথা থেকে কে গাইছে বুঝতে পারছে না তারা। পুরোটাই কেমন রহস্যার বেড়াজালে বন্দি। হুট করেই একজন চেচিয়ে বললো

--ও হোওওও সিক্রেট কাপল সং। চালিয়ে যাও।

মেয়েটা থেমে গেলো। অপেক্ষা করলো শায়েরের পরবর্তী সুরের জন্য। শায়ের সামনে নজর রেখেই কলের পুতুলের মতো সামনে এগিয়ে এলো। গিটারের টুংটাং আওয়াজ তুলে সুর তুললো। সঙ্গ দিলো মেয়েটা। একসাথে গাইলো

      ~মন বলেছে তোর সাথে যাবো
     তোকে নিয়ে চল আজকে হারাবো
        উমমমম..উমমমম..ওওওও ~

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে 10 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন