মেহরিমার গম্ভীর কন্ঠ শুনে পুতুলের মুখটা চুপসে গেলো। মেহরিমা সহজে পুতুলকে বকে না,ভুল করলে আদর করে বোঝায়,সঠিক টা শিখিয়ে দেয়। অথচ আজ মেহেরিমা পুতুলের সঙ্গে গম্ভীর স্বরে কথা বলেছে এই বিষয়টা মানতে পারছে না সে। অভিমানী বালিকা ঠোঁট উল্টে কাঁদো কাঁদো চেহারায় তাকিয়ে রইলো তার মামের দিকে। নিঃশব্দে বোঝালো আমি অভিমান করেছি মাম,আমাকে আদর করো।
মেহরিমা সূক্ষ্ম চোখে পুতুলের মায়াময় ছোট্ট আদল খানি দেখলো। মেয়েটা যে অভিমান করেছে বেশ বুঝলো। মাথা নিচু করে ফোঁস করে একটা শ্বাস ফেললো সে। সংসারের চিন্তা, নিজের পড়াশোনার খরচ,মেজ আপার চিকিৎসার খরচ,নিজের আপন চাচার সঙ্গে সম্পত্তি নিয়ে ঝামেলা সবকিছুকে ঘিরে খুব চিন্তিত। আজ এই জন্যই প্রিন্সিপালের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলো সে। প্রিন্সিপাল মানুষটা ভালো হওয়ায় সেমিস্টারের ফী পরিশোধের জন্য কিছুদিন সময় পেয়েছে সে। নয়তো সবকিছু একসাথে সামলাতে গিয়ে মরো মরো দশা হতো তার।
মেহরিমা শান্ত ভঙ্গিতে পুতুলের কাছে এগিয়ে এলো। মেয়েটার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে আদর মিশিয়ে বললো
--আমার লক্ষী আম্মু এমন পঁচা কাজ করছে কেনো? সে কি জানে না পুতুল সোনাকে কেউ বকা দিলে মাম অনেক কষ্ট পায়।
পুতুল ওসব কথা শুনলো না। ভেজা স্বরে বললো
--তুমি আমাল মাম। পলিনীতা আমাল মা না। এতা মিত্তে তাই না মাম?
পুতুলের থেকে এমন কথা আশা করে মেহরিমা। ফলস্বরূপ অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে সে। একবার মায়ের দিকে তাকালে দেখলো সে নিজেই ইতস্তত করছে। কিছু হয়তো বুঝলো সে। পুতুলের মাথায় হাত বুলিয়ে বললো
--এসব তোমাকে কে বলেছে আম্মু?
--বু বলেচে তুমি আমাল মা না। পলিনীতা নাকি আমাল মা। তুমি নাকি আমায় ছেলে দুলে তলে দাবে?
ছোট্ট মেয়েটার ডাগর ডাগর চোখ দু'টোয় পানি জমেছে। ফর্সা চেহারায় ধারণ করেছে র'ক্তিম লাল বর্ণ। ছোট্ট সরু নাকটা ফুলে ফেঁপে উঠছে। আরেকটু আহ্লাদ পেলেই হয়তো কেঁদে ভাসাবে।
মেহরিমা পুতুলকে কোলে নিয়ে বিছানায় গিয়ে বসলো। মেয়েটাকে কোলে রেখেই বুকে চেপে ধরলো। আদুরে স্বরে বললো
--আমি আমার লক্ষ্মী মা কে ছেড়ে কোথায় যাবো? এমন আদুরে আম্মুর থেকে দূরে গেলে আমি বাঁচবো? একদম মরে যাবো যে।
--তাহলে বু বললো কেনু তুমি আমাল মা না?
মেহরিমা আড় চোখে মায়ের দিলে তাকালো। শাহিদা নেওয়াজ ফ্যাকাসে মুখে দাড়িয়ে আছে। মেহরিমা আড়ালে দীর্ঘ শ্বাস ফেললো। পুতুলকে বোঝাতে বললো
--আমি তোমার মা নই আম্মু এটা সত্যি কিন্তু আমি আমার লক্ষী মায়ের মাম। আমার লক্ষী মা যখন আমায় মাম বলে ডাকে তখন যে আমি কতো শান্তি পায় এটা তোমাকে বলে বোঝাতে পারবো না আম্মু। তাই আমাকে মা নয় মাম বলেই ডাকবে তুমি কেমন।
পুতুলের ছোট্ট মস্তিষ্কে এতোকিছু বোঝে নি। মেহরিমা তার মা নয় এটাই তাকে কষ্ট দিয়েছে। সহসা কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে পুতুল ঠোঁট ফুলিয়ে কেঁদে ফেললো। হঠাৎ কান্নায় ভরকে গেলো মেহেরিমা। পুতুলের মুখটা হাতের আজলায় নিয়ে অস্থির কন্ঠে বললো
--কি হয়েছে আম্মু কাঁদছো কেনো?
--তুমিই আমাল মা। তুমি আমাল সপ।
পুতুলের কান্না মেহরিমাকে অস্থির করে তুলছে। মেয়েটা দিকবিদিক ভুলে পুতুলকে বুকে আগলে নিয়ে বললো
--হ্যা মা আমিই তোমার মা,তোমার মাম। তবুও এভাবে কেঁদো না মা। মাম কষ্ট পাচ্ছি তো।
পুতুল দু'হাতে মেহরিমাকে জড়িয়ে ধরেছে। বুকে মুখ গুজে তখনোও ফুঁপিয়ে বলছে
--তুমি আমাল মা। আমাল মা তুমি। কোতাও দাবে না তুমি। কোতাও না।
****************
শায়েরীকে নিয়ে মার্কেটে এসেছে রোহান। সেদিন ব্যস্ততায় প্রয়োজনীয় সবকিছু কিনে দিতে পারে নি। জামাটা কিনে নিয়েই হসপিটালে ছুটেছিলো। তবে কথা দিয়েছিলো অন্যদিন এসে বাকিসব কিনে দেবে। শায়েরীও লক্ষী মেয়ের মতো সব কথা মেনে নিয়েছিলো। কোনো জেদ করেনি।
শায়েরী ঘুরে ঘুরে মার্কেটের নতুন কালেকশন গুলো দেখছে। কখনো কখনো রোহানকেও দেখাচ্ছে। রোহান ফোনে কথা বলার ফাঁকে ফাঁকে তার সঙ্গে স্বায় দিচ্ছে। এক হাতের মুঠোয় তখনও শায়েরীর ছোট্ট নরম হাতটা বন্দি। শায়েরী দেখেছে,আড়ালে লজ্জা ও পেয়েছে। তবে রোহানকে বুঝতে দেয়নি কিছু। সবাই জানে শায়েরী জেদি,বোকা,আবেগি একটা মেয়ে অথচ এটা কেউ জানে না অনুভূতি লুকানোর বিশেষ ক্ষমতা আছে মেয়েটার মধ্যে। বুকে পাহাড় সম যন্ত্রনা নিয়েই হেসে খেলে বেড়াতে পারে সে৷ আবার হৃদয়ে জমানো সুপ্ত অনুভূতি গুলোকেও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
হুট করেই একটা শাড়ির দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে পড়লো শায়েরী। দাঁড়ালো রোহান ও। মেয়েটাকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে দোকানের কাঁচ ভেদ করে একটা শাড়ির দিকে তাকিয়ে আছে। রোহানের ভ্রু কুচকে গেলো। মেয়েটা এতো মনোযোগ দিয়ে কি দেখছে? রোহান কানে ফোন রেখেই শায়েরীর দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকালো। মুহূর্তেই চোখের সামনে ধরা দিলো স্কাই ব্লু আর হোয়াইট এর কম্বিনেশনের জর্জেটের সুন্দর একটা শাড়ি। যার আঁচল সহ ছোট্ট ছোট্ট স্টোনের ডিজাইন।
রোহান একবার শাড়ি আর একবার শায়েরীর মুগ্ধ দৃষ্টি দেখলো। সে জানে স্কাই ব্লু রং টা শায়েরীর অনেক পচ্ছন্দের। এই রঙের কুৎসিত ডিজাইন ও তার কাছে অমূল্য। মেয়েটার একটাই কথা পচ্ছন্দের জিনিসের সবকিছুই সুন্দর। এতো বাছাবাছি করলে সেটা কি আর পচ্ছন্দের জিনিস থাকবে? রোহান ঠোঁট টিপে কিছু ভাবলো। ফোন কেটে শায়েরীর দিকে চেপে নিচু স্বরে বললো
--পচ্ছন্দ হয়েছে?
শায়েরী মুগ্ধ দৃষ্টি শাড়ির দিকে রেখেই বললো
--খুউউব।
রোহান মুচকি হাসলো। শায়েরীর হাত ধরে সামনে এগিয়ে যেতে যেতে বললো
--চল।
শায়েরী চমকে উঠলো। রোহানকে শাড়ির দোকানে যেতে দেখে ইতস্তত করে বললো
-- ইয়ে মানে রোহান ভাই ওদিকে কেনো যাচ্ছি?
--তোর শখ পূরণ করতে।
শায়েরী একটু অবাক হলো। তার এই ক্ষুদ্র জীবনে শাড়ি পড়ার সাহস সে সহজে করে না। একবার শখ করে পড়তে গিয়ে পড়ে হাত পায়ে বেশ ব্যাথা পেয়েছিলো। সেদিন রোহান অনেক বকেছিলো তাকে। ছাফ ছাফ জানিয়ে দিয়েছিলো আজ থেকে শাড়ি পড়া তোর জন্য নিষিদ্ধ। এরপর থেকে ইচ্ছে হলেও শায়েরী আর সাহস করে পড়ে নি। অথচ আজকে কিনা রোহান ভাই নিজেই শাড়ি কিনে দিতে চাইছে?
শায়েরী কিছু বলার আগেই ওরা দুজনে দোকানের ভেতর চলে গেলো। দোকানদারের কাছে গিয়ে রোহান শাড়ি দিতে বলে শায়েরীকে পাশে বসিয়ে নিজেও বসলো। শায়েরী তার চঞ্চল চোখ জোড়া ঘুড়িয়ে ফিরিয়ে সবকিছু দেখছে। এই দোকানে শুধুই শাড়ির কালেকশন। বিভিন্ন ডিজাইনের অসংখ্য শাড়ির একের পর এক স্তুপ করে সাজানো।
অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই সেলসম্যান শাড়িটা এনে ওদের সামনে রাখলো। রোহান কোনো কথা না বলে শাড়িটা হাতে নিলো। শায়েরীর চোখে তখনও কৌতুহল। রোহানের মনোভাব বোঝার চেষ্টা করছে। রোহান সরাসরি শান্ত দৃষ্টিতে শায়েরীর দিকে তাকালো। ধক করে উঠলো মেয়েটার বুকটা।
রোহানের চোখের দৃষ্টি শীতল। না আছে কোনো মুগ্ধতা আর না আছে কোনো অনুভূতি। অথচ এই চোখের গভীরতা অনেক। লুকানো বহুদিনের জমানো অবাধ্য অনুভূতি। শায়েরী ওই চোখের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারলো না। মাথা নিচু করে হাত কচলাতে কচলাতে হাসফাস করতে লাগলো। রোহান পলক বিহীন দেখছে মেয়েটাকে। অস্থির ভঙ্গিতে পলক ঝাপটানো,জিভে শুষ্ক অধর ভেজানো,কানের পাশে চুল গোজা সবকিছু দেখছে মন্ত্রমুগ্ধের মতো। এভাবে কয়েক সেকেন্ড অতিবাহিত হলো। অতঃপর নিঃশঙ্কোচে হাতের শাড়ির মেলে ধরলো শায়েরীর কাঁধে।
স্কাই ব্লু আর হোয়াইট এর কম্বিনেশনের এই শাড়িটায় অষ্টাদশী মেয়েটা একদম শুভ্র মেঘের মতো লাগছে। স্নিগ্ধ,শান্ত,পবিত্র। রোহানের চোখ আটকে গেলো শায়েরীতে। শাড়ি পড়লে মেয়েটাকে অপরূপা লাগে। একদম অপ্সরা। যেই রূপে থমকে যায় রোহানের মতো শক্তপোক্ত হৃদয়ের ব্যক্তিও। কঠিক আবরণে ঢাকা হৃদয় টা মূহুর্তেই দুর্বল হয়ে পড়ে।
রোহানের আজ অদ্ভুত একটা ইচ্ছে হলো। মেয়েটাকে ঘোমটা পড়া অবস্থায় কেমন লাগবে এটা দেখার স্বাদ জাগলো। কালবিলম্ব না করে নিজের ইচ্ছেকে প্রাধান্য দিলো সে। আলতো হাতে শায়েরীর মাথা শাড়ির আঁচল তুলে দিলো। তড়িৎ মাথা তুললো শায়েরী। জর্জেটের শাড়িটা অমনি পড়ে গেলো মাথা থেকে। বিরক্ত হলো রোহান। ধমকে বললো
--এতো নড়াচড়া করিস কেনো তুই? চুপচাপ শান্ত হয়ে বস।
কেঁপে উঠলো মেয়েটা। নিচু স্বরে বললো
--সবাই দেখছে রোহান ভাই?
--তাতে আমার কি?
--না মানে এভাবে...
--সেতু বেশি কথা বলিস তুই। লক্ষী বাচ্চার মতো বস নয়তো ড্রেনে ফেলে দিয়ে আসবো।
মেজাজ খারাপ হলো মেয়েটার। খেক করে বললো
--আমি মোটেও বাচ্চা নই রোহান ভাই। আঠারো বছর হয়েছে আমার। দেশের একজন প্রাপ্তবয়ষ্ক নাগরিক আমি।
ঠোঁট কামড়ে সূক্ষ্ম হাসলো রোহান। ধীর স্বরে বললো
--অনেক বড় হয়ে গেছিস তুই? সবকিছু সামলানোর মতো বড় হয়েছিস তো?
--অবশ্যই। সবকিছু সামলাতে পারবো আমি।
--স্বামী সামলাতে পারবি?
রোহানের কন্ঠ স্বাভাবিক অথচ জমে গেলো শায়েরী। লজ্জা আর বিষ্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে সে। মেয়েটা লজ্জায় মুখটা নিচু করে ফেললো। রোহান মুচকি হাসলো। গম্ভীর কন্ঠে বললো
--বেশি নড়াচড়া করিস না। আমাকে আমার কাজ করতে দে।
রোহনা পুনরায় আঁচল তুলে দিলো শায়েরীর মাথায়। মুগ্ধ চোখে দেখলো মেয়েটাকে। বিরবির করে বললো
--মাশা আল্লাহ আমার মেঘপরী।
শায়েরী শোনে নি সে কথা। চুপচাপ মাথা নিচু করে বসে আছে সে। রোহান শাড়িটা প্যাক করে দিতে বলে আরো কিছু শাড়ি দেখলো। বেছে বেছে হালকা রঙের পাঁচ টা শাড়ি নিলো শায়েরীর জন্য। জুয়েলার্সের দোকানে গিয়ে শাড়ির সাথে ম্যাচিং করে কাঁচের চুড়ি,ঝুমকো,পায়েল,অর্নামেন্টস সহ আরো কিছু প্রসাধনী নিলো। শায়েরী নির্বাক হয়ে বসে শুধু দেখছে সবকিছু। এসবে তার মন নেই। কানের কাছে সুর হয়ে বাজছে রোহানের কথাটা--স্বামী সামলাতে পারবি?
লজ্জায় নুয়ে পড়লো মেয়েটা। আড় চোখে রোহানকে দেখে নিয়ে মনে মনে বললো
--পারবো মানে খুব পারবো। তুমি আমায় বুকে আগলে রাখলে শুধু তোমাকে সামলানো কেনো তোমার জন্য জানটাও তো দিয়ে দিবো রোহান ভাই।
রোহান সবকিছু প্যাকেট করে নিয়ে শায়েরীর সামনে আসলো। একহাতে প্যাকেট অন্য হাতে শায়েরীর হাত ধরে বললো
--চল
ব্যস্ত রাস্তা দিয়ে হাঁটছে দুজন। শায়েরীর হাতে একটা ভুট্টা। অনেক বলে কয়ে রোহানকে রাজি করিয়ে কিনেছে সে। লোকটাকে দুবার সাধলেও খায় নি। উল্টো গম্ভীর কন্ঠে বলেছে
--এসব আনহেলদি খাবার খেয়ে একবার শুধু অসুস্থ হয়ে দেখ তুই তারপর দেখবি তোকে কি করি? সোজা গিয়ে তেঁতুল গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে রেখে আসবো। তাও মাঝরাতে।
শায়েরী সেই কথা শুনে ভেংচি কেটে ছিলো। আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলেছিলো
--কিছুই হবে না আমার। তোমার এসব ডাক্তারি বিদ্যা অন্য কাউকে দিও।
চারদিক থেকে আসরের আযানের ধ্বনি ভেসে আসছে। লোকজন ব্যস্ত পায়ে চলছে নিজেদের গন্তব্যে। রোহান এই ভির দেখে শায়েরীর হাত শক্ত করে আগলে ধরলো। যে পাশে ছেলেদের আনাগোনা বেশি সে পাশ থেকে ঘুরিয়ে অন্য পাশে আনলো। তার গাড়িটা এখানে নেই। সামনের গ্যারেজে রেখে এসেছে।
রোহান আশেপাশে তাকিয়ে ব্যস্ত কন্ঠে শায়েরীকে বললো
--সেতু আর কিছু লাগবে তোর?
মেয়েটা চোখ ঘুরিয়ে আশপাশ দেখছিলো। ছোট করে উত্তর দিলো
--হুম
--কি লাগবে বল এনে দিচ্ছি।
শায়েরী ঠোঁট টিপে ভাবতে বসলো। হঠাৎ মনে পড়লো ইনস্টাগ্রামে দেখা সেই ভিডিও টার কথা। একটা বিড়ালের পায়ের পুকি পুকি লাইট জ্বলা জুতা। দৌড়ালে কি সুন্দর লাগছিলো দেখতে। মুহূর্তেই ঝলমল করে উঠলো মেয়েটার মুখটা। রোহান হাত ঝাঁকিয়ে বললো
--দাবিয়ার জন্য লাইট জ্বলা জুতা কিনবো রোহান ভাই।
ভ্রু কুচকে গেলো রোহানের। কৌতুহল বশত জানতে চাইলো
--লাইট জ্বলা জুতা?
--হ্যা লাইট জ্বলা জুতা। পায়ে পড়িয়ে দেওয়ার পর দৌড়ালে ঝকমকে আলো জ্বলে। বিং বিং এর জন্য কিনবো। ইশশ পড়লে নিশ্চয়ই ওকে পুকি পুকি লাগবে।
রোহানের কপালের ভাজ শিথিল হলো। সে কিভাবে ভুলে গেলো এই মেয়ে আর ওর বিড়াল দু'টোই পাগল। পার্থক্য একটাই এটা বকবক করা মানুষ আর ওটা মেও মেও করা বোবা প্রানী।
রোহান সামনের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বললো
--তোর ওই স্টুপিড বিড়ালকে নিয়ে এতো রঙঢং এর কি আছে বুঝি না। যতসব পাগলে কারবার।
ভেংচি কাটলো শায়েরী। প্রতিবাদ করে বললো
--ওকে বিড়াল বলবে না। ওর একটা সুন্দর নাম আছে। দাবিয়া ওরফে বিং বিং। পুকি পুকি বেবি আমার।
--আশ্চর্য! বিড়াল কিভাবে মানুষের বেবি হয়?
--যেভাবে হওয়ার সেভাবে হয়।
--কিভাবে হয়?
--যেভাবে মানুষের বেবি হয়।
--মানুষের বেবি পেট থেকে হয় তোর ওই স্টুপিড বিড়ালও কি তোর পেট থেকে বের হয়েছে?
--হ্যা
চোখ ছোট ছোট করে তাকালো রোহান। শায়েরী অবুঝ চোখে তাকিয়ে আছে। রোহান ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বললো
--ব্রেইনলেস মাউস একটা।
রোহান বিরক্ত হয়ে কথাটা বললো। শায়েরী থতমত খেয়ে বললো
--তুমি আমাকে ইদুর বলে অপমান করলে রোহান ভাই?
রোহান সে কথার উত্তর দিলো না। মেয়েটার হাত ধরে চলতে লাগলো সামনে। শায়েরী কিছুক্ষণ বকবক করে রোহানের থেকে উত্তর না পেয়ে হতাশ হলো। অতঃপর হেলেদুলে চললো প্রিয় পুরুষের হাত ধরে। মনের মধ্যে তার ফুরফুরে হাওয়া বইছে। হাজারো প্রজাপতি ডানা মেলে উড়ছে। চারপাশের সবকিছুতে সুখ সুখ লাগছে। মনের মধ্যে কেউ চিৎকার করে বলছে--জীবন এতো রঙীন কেনো?
************************
পুতুলকে ঘুম পাড়িয়ে ঘরের টুকটাক কাজ করছে মেহরিমা। মেয়েটা কাঁদতে কাদতেই ঘুমিয়েছে। যতক্ষণ জেগে ছিলো মেহরিমাকে এক মূহুর্তের জন্য ও ছাড়ে নি। চুপটি করে বুকে মুখ গুজে ছিলো। মেহরিমা অসহায় চোখে শুধু পুতুল কে দেখেছে। আজ নাহয় সত্যি এড়িয়ে গেলো কিন্তু যখন পুতুল বড় হবে,সব সত্যি জানবে তখন কি হবে? মেহের কে কি ভুল বুঝবে আসল মা সম্পর্কে না জানানোর জন্য? মেয়েটাকে অনেক বেশি কষ্ট পাবে সেদিন? মেহরিমা আর ভাবতে পারলো না। চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়লো দু ফোঁটা অশ্রু। পুতুলের কপালে আলতো চুমু দিয়ে কাজে মন দিয়েছিলো।
--ও মেহের একটু শোন।
মায়ের ডাকে পিছু ফিরে তাকায় মেহরিমা। স্বাভাবিক কন্ঠে বলে
--বলো
--মুক্তা ফোন করেছে। তোর সঙ্গে কথা বলতে চায়।
মেহরিমার ব্যস্ত হাত থামলো। অতঃপর শান্ত স্বরে বললো
--এতোদিন পর আমার সঙ্গে কি কথা থাকতে পারে তোমার মেয়ের?
--এভাবে বলছিস কেনো? বড় বোন হয় তো তোর। তাছাড়া তুই ওর ছোট বোন,কত আদরের। তোর সঙ্গে কথা না বললে কার সঙ্গে বলবে?
মেহরিমা শুষ্ক হাসলো। তাচ্ছিল্যে করে বললো
--প্রয়োজন পড়লে বোন আর প্রয়োজন শেষ হলে চরিত্রহীন। তোমার বড় মেয়ের তুলনা হয় না আম্মু।
শাহিদা নেওয়াজের মুখে আধার নামলো। বড় মেয়ের সঙ্গে মেহরিমার সম্পর্কের অবনতি হয়েছে বছর খানেক আগের এক ভুল বোঝাবুঝি দিয়ে। পরে আসল সত্যি সামনে আসলে মুক্তা নিজের ভুল বুঝতে পেরেও ছোট বোনের কাছে ক্ষমা চায় নি। উল্টো আরো বাজে কথা বলে অপমান করেছিলো। সেই থেকে বড় বোনকে এড়িয়ে চলে মেহরিমা।
শাহিদা নেওয়াজ মেয়ের কাছে এগিয়ে এলো। কাঁধে হাত রেখে মোলায়েম স্বরে বললো
--বড় আপার উপর এখনও অভিমান করে আছিস?
--উহুম একদম না। অভিমান তাদের উপর করা যায় যারা সম্পর্কের সম্মান রাখে। অবিশ্বাসী ব্যক্তির উপর আর যায় হোক অভিমান করা সাজে না।
শাহিদা নেওয়াজের বুকটা ভার হয়ে গেলো। মেয়েদের মধ্যে এই সম্পর্ক মানতে পারেন না তিনি। কতো বার মেহরিমাকে বুঝিয়ে অথচ মেয়েটা নিরুত্তর।
--মা শুনতে পারছো?
মুক্তার ডাকে সম্বিত ফিরে শাহিদা নেওয়াজের। এতোক্ষণ ফোনটা হোল্ডে রেখে মেহেরের সঙ্গে কথা বলছিলো। একবার ফোন তো একবার মেহেরকে দেখে নিয়ে অনুনয় করে বললো
--মেহের মা আমার। একবার বোনের সঙ্গে কথা বলে দেখ। আর কতো কাল কথা নলা থাকবি?
--আম্মু যাও এখান থেকে। তোমার বড় মেয়ের সঙ্গে কথা বলতে ইন্টারেস্টেড নই আমি।
--মেহের আমি অনুরোধ করছি। মায়ের কথা ও কি রাখবি না?
মেহরিমা অনুভূতি শূন্য চোখে মায়ের দিকে তাকালো। অতঃপর অনিচ্ছা সত্বেও ফোনটা হাতে নিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বললো
--বলুন কি বলতে চান।
--ফোনে কথা বলার সময় আগে সালাম দিয়ে ভালো মন্দ জিজ্ঞেস করতে হয় অথচ তুই সোজা অন্য কথায় চলে গেলি? এই তোর সহবোধ শিক্ষা মেহের?
মেহরিমা মুচকি হাসলো। শান্ত অথচ নিরেট স্বরে বললো
--যার চরিত্রের ঠিক নেই তার কাছে আপনি সহবোধ আচরণ আশা করছেন? চাওয়া টা একটু বেশি এক্সপেন্সিভ হয়ে গেলো না।
মুক্তা কথাটা শুনে রে'গে গেলেও কিছু বললো না। হাসি মুখে বললো
--এখনো পুরনো কথা ধরে বসে আছিস? তখন রা'গের মাথায় কি বলতে কি বলে ফেলেছি ওসব মনে রাখলে হয় বোন?
--কি জন্য ফোন করেছেন সেটা বলুন। ব্যস্ত আমি।
--বোনের জন্য একটুও সময় নেই তোর কাছে? এতোই ব্যস্ত তুই?
--আমার আপনজনদের জন্য আমি ফ্রী থাকলেও যার তার সঙ্গে কথা বলার সময় আমার নেই।
--মেহের
--আওয়াজ নিচে মিসেস কাবির। আওয়াজ নিচে। আমাকে এখন আর দূর্বল ভাববেন না। ইট মারলে সোজা পাথর ছুঁড়ে মারার ক্ষমতা রাখি আমি।
মুক্তা দাঁতে দাঁত চেপে মেহরিমার সব কথা হজম করলো। আগে তার উদ্দেশ্যে সফল হোক তারপর এই মেয়েকে দেখে নিবে সে। মুক্তা হেঁসে হেঁসে বললো
--ওদিকে আর না যায় সোনা বনু। আমার না তোর কাছে একটা আবদার। প্লিজ আমাকে ফিরিয়ে দিস না।
মেহরিমা সোজা মায়ের দিকে তাকিয়ে হাসলো। যেই হাসিতে স্পষ্ট মিশে আছে তাচ্ছিল্যে। শাহিদা নেওয়াজ মাথা নিচু করে ফেললেন। কি বা বলবেন তিনি?
--বলুন কেমন আবদার জাগলো আপনার?
--বাবা তোর জন্য যেই ফান্ড রেখে গেছে সেই জমানো টাকা গুলো আমায় দে মেহের। তোর দুলাভাই নতুন একটা ব্যবসা শুরু করবে তাতে লাখ দশেকের টাকা প্রয়োজন। বাবা আর ভাই তো তোর আর পুতুলের নামে অনেক টাকা জমা রেখেছে ওখান থেকে আমায় কিছু দে।
মূহুর্তেই মেজাজ খারাপ হলো মেহরিমার। দাঁতে দাঁত চেপে বললো
--অন্যের জিনিসে নজর দেওয়ার স্বভাব আপনার আর গেলো না দেখছি। এতো লোভী কেনো আপনি? ছোট বোনের কাছে হাত পাততে লজ্জা করে না।
--বোনের কাছে চাইতে আবার লজ্জা কীসের?
--আপনার মধ্যে মনুষ্যত্ব নাই থাকতে পারে তবে আমার আছে। ওই টাকা আমি আপানকে দেবো না। ওগুলো আমাদের হক। আমাদের ভবিষ্যতের জন্য জমানো হয়েছে। আপনাকে দিয়ে পড়ে কি আমরা রাস্তায় বসবো?
--রাস্তায় বসবি কেনো? আমি আছি না। আমি থাকতে তোদের কোনো অসুবিধায় হবে না।
--নিজেদের নামে টাকা জমা আছে বলেই আজ বোন বলছেন। দুদিন পর সেটাও না থাকলে আপনি তো আমাদের পরিচয়ই দিবেন না। তাছাড়া আপনার থাকা বা না থাকায় কি যায় আসপ আমাদের? আমরা না খেয়ে থাকলেও তো আপনি উঁকি দিয়ে দেখেন না।
মুক্তা চুপচাপ শুনলো।
--এভাবে বলছিস কেনো? আমি কি তোদের খোঁজ খবর নেই না।
--হ্যা নেন। যখন আপনার প্রয়োজন পড়ে তখনই নেন। এর আগে তো আপনার ছায়া টাও দেখা যায় না।
--এমন করিস না মেহের। টাকা গুলো আমায় দে। তাছাড়া তুই তো ইনকাম করছিসই। খেয়ে পড়ে বাঁচতে তো খুব একটা অসুবিধা হবে না তোদের?
--রাজপ্রাসাদে এসির নিচে বসে খুব সহজেই কথা গুলো বলা যায়। একবার বাইরে বেরিয়ে দেখুন দুনিয়া কতো কঠিন।
মুক্তা ফোঁস করে একটা শ্বাস ফেলে বললো
--তুই,মা আর জেসমিন। তিনজনের কি এমন খরচ যে ওই টাকা না হলে তোর চলবে না?
--পুতুলকে আপনার মানুষ মনে হয় না? বাচ্চা হলেও ওর একটা ভবিষ্যত আছে।
--পরের বাচ্চার পিছনে এতো খরচ করে লাভ কি মেহের? বাপ মা দুজনেই তো মরেছে। তুই কেনো ওর দায়িত্ব নিতে যাবি? পুতুলকে কোনো বড়লোকদের কাছে দত্তক দিয়ে দে। তুই ও বাঁচিস মেয়েটাও সুন্দর জীবন পায়। শুধু শুধু উটকো ঝামেলা ঘাড়ে রেখে এতো পরিশ্রমের মানে আছে?
মেহরিমার শান্ত মেজাজ চটে গেলো। দাঁতে দাঁত চেপে কটমট করে বললো
--পরিশ্রম ও আমার,উপার্জন ও আমার। আমার উপার্জনের সেই অর্থ আমি খরচ করবো নাকি অপাত্রে বিলিয়ে দিবো সেই সিধান্ত ও একান্ত আমার। এর জন্য কোনো কৈফিয়ত তো আপনায় আমি দেব না মিসেস কবির।
মুক্তা কিছু বলবে তার আগেই মেহরিমা কাট কাট গলায় বললো
--আর একটা কথাও শুনতে চায় না আপনার কাছে। নির্লজ্জ, স্বার্থপর মহিলা একটা। আপনাকে আমার বড় বোন মানতেও ঘেন্না করছে। কিভাবে পারলেন আপন ভাইয়ের র'ক্ত কে ঝামেলা বলতে? বুক কাপে নি আপনার? ভাই বেঁচে থাকতে তো ঠিকই লোভীর মতো হাত পেতে সাহায্য নিতেন,এখন আপনার অবস্থার উন্নতি হয়েছে বলে দেমাক বেড়ে গেছে? নেক্সট টাইম যদি আর ফোন দিয়ে এসব বলেছেন তখন আর আপনাকে সম্মান দেখাবো না। সহজ ভাষায় বুঝিয়ে ছাড়বো আপনার অবস্থান।
মেহরিমা মায়ের হাতে ফোন ধরিয়ে দিয়ে ধুপধাপ পা ফেলে চলে গেলো। সেদিকে অসহায়ের মতো তাকিয়ে রইলো শাহিদা নেওয়াজ। ফোনের ওপাশ থেকে মুক্তা অকথ্য ভাষায় মেহরিমাকে গা'লি দিচ্ছে। শাহিদা নেওয়াজ শুনেও কিছু বললো না। চুপচাপ ফোনটা কেটে দিয়ে মুক্তার নম্বর ব্লক করে দিলো। বিছানায় ঘুমিয়ে থাকা এতিম পুতুল আর মেহরিমার অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মনে করে তার বুকটা হু হু করে উঠলো। ধপ করে বিছানায় বসে পড়ে বুজে আসা স্বরে বললো
--এ কেমন ভাগ্যে দিলে আল্লাহ? ছোট বাচ্চা টার উপর ও কি মায়া হলো না তোমার? কেনো ওকে এতিম করে দিলে? তুমি তো জানো এই কঠিন দুনিয়ায় এতিমের স্থান ঠিক কোথায়? তবুও কেনো অবুঝ মেয়েটাকে এমন কঠিন পরীক্ষায় ফেললে? মেহের কতোদিন পারবে ওই নর'পশুদের হাত থেকে এই নিষ্পাপ ফুলকে রক্ষা করতে?
শাহিদা নেওয়াজ কেঁদে ফেললো। আঁচলে মুখ চেপে ঘুমন্ত পুতুলের দিকে তাকিয়ে রইলো শুধু। যতোই নাতনির সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করুক না কেনো পুতুল যে তার প্রাণ। তার মানিকের শেষ স্মৃতি। একে দূরে রেখে কিভাবে বাঁচবেন তিনি?