ফন্ট সাইজ:
থিম:
আয় তবে সহচরী

14

লেখক: উম্মে_হাবিবা

ভার্সিটিতে প্রথমদিনের ক্লাসেই বেশ দেরী করে ফেলেছে মেহরিমা। হাঁপাতে হাঁপাতে মাত্র এসে দাঁড়ালো ক্লাসরুমের সামনে। ক্লাসের সবার মনোযোগ তখন বোর্ডে। মেহরিমা উঁকি দিয়ে ভেতরে দেখার চেষ্টা করলো। ফাইজাকে মাঝের বেঞ্চে বসে থাকতে দেখে একটু স্বস্তি পেলো বোধহয়। কাঁধের ব্যাগটা শক্ত করে ধরে রেখে ব্যস্ত স্বরে স্যারের উদ্দেশ্যে বললো

--মে আই কাম ইন স্যার?

বোর্ডে ইংরেজির গ্রামার বোঝাচ্ছিলেন এই ভার্সিটির সিনিয়র প্রফেসর হাজী মালেক উদ্দিন ভূঁইয়া। মেহরিমার ডাকে ঘাড় ফিরেয়ে তাকালেন তিনি। চোখের চশমা টা নাকের কাছে এনে তীক্ষ্ণ চোখে মেয়েটার আগা গোড়া পরখ করলেন। পিঠের পিছনে হাত বেঁধে গম্ভীর মুখে এগিয়ে এলেন মেহরিমার সামনে। সটান হয়ে দাড়িয়ে রাশভারি স্বরে বললেন

--কটা বাজে?

--জি স্যার?

--জিজ্ঞেস করেছি কটা বাজে?

মেহরিমা কিছুটা ভয় পেলো। শুষ্ক ঢোক গিলে বললো

--১০ টা ২৫।

--ক্লাস কখন শুরু হয় তোমার?

--আসলে স্যার..

--উত্তর দাও।

স্যারের ধমকে কেঁপে উঠলো মেয়েটা। ক্লাসের সবার নজর তখন তার দিকে। মেহরিমা বেশ অস্বস্তিতে পড়লো। নিচু স্বরে বললো

--১০ টা থেকে ক্লাস শুরু স্যার।

--দশটা থেকে শুরু হলে পঁচিশ মিনিট লেট কেনো? রাস্তায় বাদাম ভাজা বিক্রি করছিলে?

স্যারের কথা শেষ হতেই ক্লাসের বেশিরভাগ স্টুডেন্ট হেঁসে ফেললো। অপমানে চোখটা খিচে বন্ধ করলো মেহরিমা। প্রফেসর হাজী মালেক উদ্দিন ভূঁইয়া স্টুডেন্টূের হাসতে দেখে রা'গী চোখে তাদের দিকে ফিরলেন। ধমকে বললেন

--মাঠের মধ্যে কান ধরে দাড়িয়ে থাকার শখ জেগেছে কার কার? দ্রুত সামনে এসো আর বাধ্য স্টুডেন্টের মতো বেরিয়ে যাও।

সহসা চুপ করে গেলো সকলে। মাথা নিচু করে মন দিলো যার যার বইয়ে। প্রফেসর পুনরায় মেহরিমার দিকে তাকালো। মেয়েটাকে কাচুমাচু ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে প্রশ্ন করে ফের

--নাম কি তোমার?

--মেহরিমা

--আমার ক্লাসে আর দেরী করে আসবে?

--না স্যার।

--প্রমিস করছো তো। চুক্তি পত্রে সাইন করাবো কিন্তু।

--চুক্তিপত্র?

মেহরিমা অবাক হয়ে স্যারের দিকে তাকালো। ক্লাসে আসা যাওয়ার সঙ্গে চুক্তিপত্রের কি সম্পর্ক বুঝলো না সে? প্রফেসর হাজী মালেক উদ্দিন ভূঁইয়া চোখ মুখ কুচকে বললো

--এতো অবাক হওয়ার কিছু নেই। আমি কথায় নয় কাজে বিশ্বাসী। আজ প্রমিস করলেও তুমি যে পরবর্তী লেট করে আসবো না তার কি গ্যারান্টি আছে? এই জন্য আগে থেকেই চুক্তিবদ্ধ হয়ে নেওয়া ভালো। এতে তুমিও দায়বদ্ধ থেকে রেগুলার ক্লাসে আসবে। আর আমার দায়িত্ব ও সুন্দর ভাবে পালন করা হবে।

মেহরিমা বোঝার মতো মাথা দোলালো। মেকি হেসি বললো

--অবশ্যই স্যার। আপনার সিদ্ধান্তই মঞ্জুর। এবার কি ক্লাসে ঢুকতে পারি?

--এসো

প্রফেসর গম্ভীর স্বরে অনুমতি দিয়ে নিজের জায়গায় গেলেন। মেহরিমা পিছু পিছু এলো। ফাইজার ইশারা মতো ওর পাশে গিয়ে বসলো। মেহরিমা বসতেই ফাইজা ফিসফিস করে বললো

--এই পুষ্প এতো দেরী হলো কেনো তোর?

মেহরিমা ব্যাগ থেকে খাতা বের সামনে রাখলো। চাপা স্বরে বললো

--একটা বেয়াদবি, অসভ্য, খবিশ ছেলের জন্য দেরি হয়েছে। নয়তো আরো আগেই আসতে পারতাম।

ফাইজা মেহরিমার কথা বুঝলো না। কৌতুহলী হয়ে শুধালো

--কোন ছেলে? এই তুই আবার র‍্যাগিং এর স্বীকার হোস নি তো?

মেহরিমা রা'গে ফোসফাস করছে। যতবারই সকালের কথা মনে পড়ছে ততবারই গরম তেলের মতো ছ্যাত করে উঠছে সে। ইচ্ছে করছে বেয়াদব ছেলেটাকে আচ্ছা মতো সাবান ছাড়া ধুয়ে দিতে।

মেহরিমা ফাইজার দিকে তাকালো। ফিসফিস করে বলতে শুরু করলো একটু আগের ঘটনা...

অতিরিক্ত ভাড়ার জন্য রিক্সা না নিয়েই বেশ তাড়াহুড়ো করে ভার্সিটি এসেছে মেহরিমা। অনেকটা পথ হাঁটতে গিয়ে ক্লান্ত সে। তবুও ক্লাসে দেরি হয়ে যাচ্ছে দেখে এক প্রকার দৌড়াচ্ছে মেয়েটা। আশেপাশের কোনোদিকে তার খেয়াল নেই। সে যখন নিজের মতো চলতে ব্যস্ত তখনই পাশ থেকে আসা গম্ভীর কন্ঠ শুনে থেমে গেলো তার চলন্ত পা যুগল।

--আজকাল কার মেয়েদের মধ্যে দেখি কোনো সহবোধ শিক্ষা ও নেই। সিনিয়রের সামনে দিয়ে ড্যাং ড্যাং করে চলে যাচ্ছে অথচ সালাম দিচ্ছে না। কি বেয়াদবী ব্যবহার এদের। ছ্যাহ..!

মেহরিমা অচেনা অথচ পরিচিত কন্ঠ শুনে তড়িৎ পাশে ফিরে তাকালো। তার থেকে কিছুটা দূরে বাইকের উপর হেলান দিয়ে বসে আছে শায়ের। ঠোঁটের ভাজে গোজা সিগারেট। নিকোটিনের সেই ধোঁয়ায় উড়িয়ে দিচ্ছে আকাশে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেহরিমাতে নিবদ্ধ। ঠোঁটের কোণায় সূক্ষ্ম বাঁকা হাসি।

মেহরিমা শায়েরকে দেখে বিরক্ত হলো। মনে পড়ে গেলো আগের দিনের কথা। কিভাবে তাকে চ্যাপা শুঁটকি বলে অপমান করেছিলো? মেহরিমা শায়েরকে উপেক্ষা করে চলে যেতে নিলে তূরন্ত ওর সামনে দৌড়ে এসে দাঁড়ালো রাহুল। দু'হাত মেলে বেরিগেড বানিয়ে ছটফটে স্বরে বললো

--ভাইয়ের অনুমতি ব্যতীত আপনি এক পা ও সামনে এগোতে পারবেন না আপামনি। ভাইয়ের কড়া আদেশ আপনাকে সঙ্গে নিয়ে তার কাছে যেতে হবে।

মেহরিমা বিরক্ত হয়ে রাহুলের দিকে তাকালো। শান্ত স্বরে বললো

--দেখুন ভাইয়া আমি এমনিতেই অনেকটা দেরি করে ফেলেছি। প্লিজ আমাকে আর ঝামেলায় ফেলবেন না। সমানে থেকে সরুন।

--ভালো মেয়ের মতো ভাইয়ের কাছে না গেলে আপনি এমনিতেই ঝামেলায় পড়ে যাবেন আপা। অশান্তি না করে আমার সঙ্গে চলুন আপা নয়তো ভাই আমাকে উল্টো ঝুলিয়ে রাখবে।

মেহরিমা একবার আড়চোখে শায়েরের দিকে তাকালো। যার নজর এখনও তার দিকেই। শান্ত,পলকহীন। মেহরিমা কিছুটা অবাক হলো। মনের মধ্যে প্রশ্ন এলো লোকটা কি চোখের পলকও ফেলে নি?

মেহরিমা একবার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময় দেখলো। ঘড়ির কাটা ইতোমধ্যে দশটা পাড় হয়েছে। মেহরিমা কিছু ভাবলো। রাহুল তাড়া দিয়ে বললো

--দাঁড়িয়ে থাকবেন না আপা চলুন।

উপায় না পেয়ে মেহরিমা রাহুলের সঙ্গে এগিয়ে গেলো। ঠিক শায়েরের সামনে দাঁড়িয়ে চোখে চোখ রেখে শান্ত স্বরে বললো

--ডেকেছেন কেনো?

শায়েরের নজর মেহরিমার নির্ভিক চোখের দিকে। সেই চোখে না আছে কোনো ভয় আর না আছে অস্থিরতা। একদম স্থির আর শান্ত। মেয়েটার সাহস দেখে শায়ের মনে মনে বেশ আনন্দ পেলো। বাইকে হেলান দিয়ে বসে ঘাড় বাঁকিয়ে তীক্ষ্ণ চোখে মেয়েটাকে দেখলো। বোরকা পড়ায় মেহরিমার চোখ ব্যতীত চেহারা দেখা যাচ্ছে না। অথচ এই চোখ দুটোই ধারালো অস্ত্র ন্যায়। হালকা বাদামী কালো মিশেলের আঁখি যুগলের গভীরতা অনেক। কেমন রহস্যে ঘেরা সবকিছু।

--সঙয়ের মতো দাঁড়িয়ে না থেকে ডেকেছেন কেনো সেটা বলুন। নয়তো আমাকে যেতে দিন। ক্লাসের দেরি হচ্ছে আমার।

শায়ের বাঁকা হাসলো। শান্ত স্বরে বললো

--এতো তাড়া কিসের? একটা ক্লাস মিস গেলে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে না নিশ্চয়ই।

--আপনার কাছে ক্লাস গুরুত্বহীন হতে পারে তবে আমার কাছে একটা ক্লাসের গুরুত্ব অনেক। সুতরাং অহেতুক কারোর টাইম ওয়েস্ট করে নিজের নিচু মন মানসিকতার পরিচয় দেবেন না।

মেয়েটার এমন উত্তর আশা করে নি শায়ের। দুদিন দেখায় মেয়েটাকে সাদাসিধা মনে হলেও এই মূহুর্তে শায়েরের মনে হচ্ছে এই মেয়ে ভীষন চতুর। যতোটা শান্ত ব্যবহার দেখায় এই মেয়ে তেমন না।

শায়েরকে চুপ থাকতে দেখে মেহরিমা বেশ বিরক্ত হলো। লোকটা বিনা কারণে তাকে এখানে দাঁড় করিয়ে রেখেছে কেনো? কিছু বলছেও না, তাকে যেতেও দিচ্ছে না। মেহরিমা অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করলো না। শায়েরের দিকে কড়া চোখ তাকিয়ে পিছু ফিরে যেতে নিলে শায়ের মেহরিমার হিজাবের কোণা টেনে ধরলো। হাস্কিস্বরে বললো

--চ্যাপা শুঁটকির এতো ভাব মানায় না। সেই তো দু ইঞ্চি সাইজ। সামান্য হাওয়া দিলেই উড়ে যাবেন। অথচ আপনি আমাকে চোখ রাঙানি দিচ্ছেন। উমম ব্যাপার টা ইন্টারেস্টিং তো। আ'ম ইমপ্রেসড মিস চ্যাপা শুঁটকি।

শেষ কথাটা মেহরিমার দিকে কিছুটা ঝুঁকে ফিসফিস করে বললো শায়ের। অথচ ছ্যাত করে উঠলো মেহরিমা। শায়েরের দিকে ঘুরতে নিলে হিজাবে টান পড়লো। একবার নিজের হিজাব আরেকবার শায়েরের মিটিমিটি হাসি দেখে রা'গ তরতর করে বেড়ে গেলো তার। ঝাড়া দিয়ে নিজের হিজাবের কোণা ছাড়িয়ে নিয়ে কোমড়ে হাত রেখে আঙুল তুলে বললো

--আপনি তো ভারী অসভ্য। আগে আমি ভাবতাম আপনি একজন পেট মোটা হাতি,একটা খবিশ,খিটখিটে শেয়াল। আপনি একটা বেয়াদব স্টুপিড লোক। কিন্তু এখন তো দেখছি আপনি চরম অসভ্য ও। কোন সাহসে আপনি আমার হিজাব টেনে ধরলেন? নাক উঁচু পেট মোটা হাতি একটা। এতো সাহস আপনাকে কে দিয়েছে বলুন?

অতিরিক্ত রা'গে মেহরিমার পুরো শরীর কাঁপছে। চিকন সরু নাকটা ফুলে ফেঁপে উঠছে। হিজাবের জন্য দেখা না গেলেও শায়ের ঠিক বুঝলো মেয়েটার রা'গের পরিমান। না চাইতে শান্ত চোখে মেহরিমার এই রা'গ উপভোগ করলো শায়ের। এদিকে রাহুল মাথায় হাত দিয়ে একবার শায়ের তো একবার মেহরিমা দেখছে। ভীত নেত্রে শুষ্ক ঢোক গিলে বিরবির করে বললো

--গেলো রে গেলো। আপা মনির জীবন বরবাদ হওয়ার সময় শুরু হয়ে গেলো। ওরে আপা রা'গ দেখানোর মানুষ আর পেলেন না। খুঁজে খুজে আমার ভাইকেই রা'গ দেখাতে হলো আপনার?

শায়ের শান্ত,স্বাভাবিক। মেহরিমার কথার বিপরীতে একটা টু শব্দ ও করলো না। উল্টো পানির বোতল এগিয়ে দিয়ে বললো

--পানি খেয়ে নিন মিস চ্যাপা শুঁটকি। ঝগড়া করতে গিয়ে তো হাঁপিয়ে গেছেন। পানি খেয়ে এনার্জি কালেক্ট করুন। নিন ধরুন।

মেহরিমা রক্তিম চোখে শায়েরের দিকে তাকালো। পানির বোতল ছিনিয়ে নিয়ে ছিপি খুললো ঠিকিই কিন্তু নিজে খেলো না। উল্টো সমস্ত পানি ঢেলে দিলো শায়েরের মাথায় ঢেলে দিয়ে বোতলটা দূরে ফেলে দিয়ে বললো

--আপনার পানি দিয়ে আপনাকেই ঠান্ডা করে দিলাম। অতি উত্তেজনায় হাগা মাথায় উঠে পড়েছিলো তো। এবার নিশ্চিন্তে সিগারেট চিবিয়ে চিবিয়ে খান। তবুও সিনিয়র হয়ে জুনিয়রকে র‍্যাগিং দেওয়ার চেষ্টা কইরেন না। এতে আপনার সম্মান বাড়ে না বরং কষা হাগার মতো মাঝপথে আটকে থাকে।

মেহরিমার এমন দুঃসাহসিক কাজ দেখে রাহুল তৎক্ষণাৎ মাথা ঘুড়ে ঠাস করে নিচে পড়ে গেছে। কতো বড় কলিজা হলে শায়ের আনসারী নীড়ের মাথায় পানি ঢেলে আবার মুখে মুখে তর্ক করতে পারে জানা নেই রাহুলের। বেচারা অতি শকডে বাকশক্তি হারিয়ে নিথর হয়ে পড়ে আছে। এবার কেমন ঝড় উঠবে সেই আশঙ্কায় ছেলেটার শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা।

মেহরিমার এমন দুঃসাহসিক কাজেও কোনো হেলদোল দেখা গেলো না শায়েরের মধ্যে। বরং ছেলেটা ফিচেল হেঁসে নিঃশঙ্কোচে মেহরিমার হিজাবের ঝুলন্ত পায় হাতে নিয়ে নিজের ভেজা চুল গুলো মুছলো। হিজাবটা নিজের আঙুলে পেঁচাতে পেঁচাতে বললো

--আমার প্রতিপক্ষ হবেন আর এতোটুকু সাহস থাকবে না এটা তো হতেই পারে না ম্যাডাম। আপনার সাহস দেখে আমি অভিভূত। কংগ্রাচুলেশন আরও একবার আপনার উপর ইমপ্রেসড হলাম আমি। এবার থেকে আপনি রোজ নজরে নজরে থাকবেন আমার মিস চ্যাপা শুঁটকি।

শায়ের চোখ টিপে মেহরিমার হিজাব ছেড়ে দিলো। পুনরায় বাইকে হেলান দিয়ে বসে সিগারেটের টান দিয়ে হাওয়ায় ধোঁয়া ছেড়ে বললো

--ক্লাসে দেরি হচ্ছে আপনার দৌড়ান নয়তো পরবর্তী ভূঁইয়া স্যার আপনাকে ক্লাসে ঢুকতেই দিবে না।

মেহরিমা ক্লাসের কথা মাথায় রেখে শায়েরকে আর কিছু বলার সুযোগ পেলো না। রা'গী চোখে তাকিয়ে শুধু বললো

--রিডিকিউলাস টাস্কার।

মেহরিমার মুখে সম্পূর্ণ কথা শুনে না চাইতেও হেসে ফেললো ফাইজা।

--সিরিয়াসলি বইন যেখানে র‍্যাগিং এর স্বীকার হওয়ার কথা তোর সেখানে উল্টো তুই সিনিয়রের সঙ্গে ঝগড়া করে এসেছিস?

--ঝগড়া না করে কি করবো? ছেলেটা অতিরিক্ত বেয়াদব। কতো বড় সাহস হলে আমার হিজাব দিয়ে মাথা মুছে? আমি কি ওনার বউ লাগি যে এমন করবে উনি? খাইস্টা খবিশ ব্যাটা কোথাকার।

মেহরিমা রা'গের বশে কথাটা বললেও ফাইজা টিপ্পনী কেটে বললো

--বলা তো যায় তোর উনিই হয়তো একসময় তোর ওগো হয়ে গেলো।

--বাজে বকিস না ক্লাসে মন দে।

ফাইজা মিটিমিটি হেঁসে ক্লাসে মন দিলো। পরপর তিনটা ক্লাস শেষ করে মেহরিমা বাসার উদ্দেশ্যে ভার্সিটি থেকে বের হলো। সঙ্গে যুক্ত হলো ফাইজা ও। দুজনেই ফুটপাত ধরে হাঁটছে। হাঁটার ফাঁকে মেহরিমা বললো

--তোর কাজিন আজ এলো না কেনো?

--কে সেতু?

--হ্যা ওই মেয়েটাই।

--আর বলিস না। কাল মার্কেটে গিয়ে দাবিয়ারর জন্য লাইট ওয়ালা পুত পুত জুতা কিনছিলো। তাই আজকে নাকি সারাদিন দাবিয়াকে ওই জুতা পরিয়ে রিলস বানাবে আর ইনস্টাগ্রামে আপলোড করে ক্যাপশন লিখবে ট্রেন্ড ডান। ভাবতে পারছিস কেমন পাগল মেয়ে ওটা।

মেহরিমা কথাটা সম্পূর্ণ বোঝে নি। প্রশ্ন করলো

--দাবিয়া কে?

--সেতুর পুকি বেবি।

--বেবি মানে বাচ্চা। ওইটুকু মেয়ের বাচ্চা ও আছে?

আশ্চর্য হয়ে বিস্মিত কন্ঠে প্রশ্ন করলো মেহরিমা। ফাইজা মুখ চেপে হেঁসে বললো

--ওর বাচ্চা হতে যাবে কেনো? বিড়ালের বাচ্চা।

হাফ ছেড়ে বাচলো জেনো মেহরিমা। ফোস করে একটা শ্বাস ফেলে বললো

--তাই বল। আমার তো এখনই হার্ট এট্যাক হয়ে যাচ্ছিলো।

হাঁটতে হাটঁতে দুজনে একট গলির সামনে এসে দাঁড়লো। মেহরিমা ফাইজাকে বিদায় জানিয়ে বললো

--আজ আসি প্রমি। এখানে আমার একটা টিউশনি আছে ওটা শেষ করে তারপর বাসায় যাবো। তুই সাবধানে যাস।

--আচ্ছা কাল সময় মতো ক্লাসে চলে আছিস।

--আচ্ছা

--আল্লাহ হাফেজ।

--আল্লাহ হাফেজ।

ফাইজা চলে গেলে মেহরিমা দ্রুত সামনের বিল্ডিং এ চলে যায়। কাজ গুলো শেষ করে তাড়াতাড়ি তাকে বাসায় ফিরতে হবে।

*****************
আসরের পরে বাসায় ফিরে এলো মেহরিমা। গোসল করে মেজ বোনকে খাইয়ে এখন পুতুলকে নিয়ে বসে আছে। মেয়েটা আধো বুলিতে হাজারো প্রশ্ন করছে মেহরিমা। আর মেহরিমা ধৈর্য্য ধরে সব প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে।

শাহিদা নেওয়াজ গুটিগুটি পায়ে মেয়ের কাছে এসে বসলো। কিছুক্ষণ মেয়েটার হাস্যজ্জ্বল মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। মেহরিমা মাকে দেখে বললো

--কিছু বলবে আম্মু?

--তোর কি আর কোনো কাজ বাকি আছে মেহের?

--না আম্মু আজকের মতো ফ্রী। কিছু বলবা তুমি?

--না মানে আসলে..

--ভনিতা না করে বলো তো।

--আমার শরীরটা ভালো লাগছে না মেহের। রাতের রান্না টা একটু করবি মা।

মেহরিমা মায়ের দিকে ফিরে ব্যস্ত কন্ঠে বললো

--কি হয়েছে তোমার? আমাকে আগে বলো নি কেনো?

--তেমন কিছু না। মাথা ব্যাথা টা একটু বেড়েছে। আগুনের কাছে গেলে আরো বেশি ব্যাথা করছে। এ জন্যই তোকে বললাম রান্না করতে।

মেহরিমা পুতুলকে কোল থেকে নামিয়ে মায়ের কাছে এলো। মায়ের হাত ধরে বিছানায় শুয়ে দিয়ে বললো

--তুমি রেস্ট নাও। রান্না আমি দেখছি।

--তুই একা পারবি নাকি আমিও আসবো।

--সমস্যা নেই ম্যানেজ করে নিবো। তুমি রেস্ট নাও। খবরদার উঠবে না।

মা'কে এক প্রকার শাসিয়ে পুতুলকে সঙ্গে নিয়ে রান্না ঘরে চলে গেলো মেহরিমা। পুতুলকে কাঠের পিড়িতে বসিয়ে আদুরে স্বরে বললো

--আম্মু আপনি এখানে বসে মামের কাজ দেখুন। খবরদার উঠবেন না কিন্তু। উঠলেই উড়ন্ত পোকা আপনাকে কামড়াতে আসবে কিন্তু।

উড়ন্ত পোকার নাম শুনে ভয়ে চুপসে গেলো পুতুলের মুখটা। ঠোঁট উল্টে বললো

--উলুন্ত পুতাকে পিতিয়ে মেলে পেললেও আতবে মাম?

--হ্যা মা আসবে তো।

--তাওলে আল মালবো না। পুতু তুপ কলে বতে তাকবো।

--এইতো আমার লক্ষী মা।

মেহরিমা পুতুলকে বসিয়ে রেখে আটার প্যাকেট থেকে আটা নিয়ে রুটির জন্য ডো বানাতে লাগলো। পুতুল মনোযোগ দিয়ে মেহরিমার সব কাজ দেখছে। মেহরিমা যখন লেচি ঘুরিয়ে গোল করছে তখন পুতুল হাত তালি দিয়ে বললো

--লুতি গুলছে মাম লুতি গুলছে।

মেহরিমা পুতুলের কথায় মুচকি হাসলো। একে একে অনেকগুলো রুটি বানিয়ে ফেললো। শেষ রুটিতে হাত দেওয়ার আগে ঘর থেকে মায়ের ডাক ভেসে এলো

--ও মেহের একটু শুনে যা তো।

--আসছি মা।

মেহরিমা চলে গেলে পুতুল চুপচাপ বসে রইলো। একটু পর শাহিদা নেওয়াজ রান্নাঘরে এসে পুতুলের কান্ড দেখে আঁতকে উঠে বললো

--আল্লাহ এ আমি কি দেখছি?

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে 14 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন