--দাদু..
পেছন থেকে ভেসে আসা গম্ভীর কন্ঠের ডাকে শিহরিত হলো বশির আনসারী। থেমে গেল তার কথার বহর। তড়িৎ পিছু ফিরে শায়েরকে দেখে শিথিল হলো চোখ জোড়া। প্রায় চারদিন পর ছেলেটাকে দেখছে সে। সেই যে রা'গ করে ফোন কাটলো এরপর আর কথা হয়নি তাদের। সে ফোন দিলেও ছেলেটা ধরে নি। মাঝে মাঝে রাহুল ফোন রিসিভ করে বলতো--ভাই ব্যস্ত দাদু,ফ্রী হয়ে তোমার সঙ্গে কথা বলবে। অথচ ছেলেটার সেই ব্যস্ততা ফুরোলো না আর না তো কথা বললো বশির আনসারীর সঙ্গে।
--দাদু ডাকছি তোমায়। উত্তর দিচ্ছো না কেনো?
পুনরায় শায়েরের গম্ভীর কন্ঠ ভেসে এলে নিজ ভাবনা থেকে বের হয়ে এলো বশির আনসারী। শায়েরের উপস্থিতিতে মনে মনে প্রচন্ড খুশি হলেও অভিমান নিয়ে বললো
--বল্টু তাকে বলে দে কোনো ব্যস্ত মানুষ যেন আমার সঙ্গে কথা বলতে না আসে। বুড়ো হয়েছি এখন তো সবার বোঝা আমি। বোঝা ফুরোলে তবেই না মিলবে তাদের শান্তি।
বশির আনসারীর কথা গুলো চোখ ছোট ছোট করে শুনলো শায়ের। বল্টু নামের ছেলেটা ভরকে গিয়ে শায়েরের দিকে তাকিয়ে কিছু বলার আগেই শায়ের ছোট করে বললো
--সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে বল্টু। তুমি তোমার বাসায় যাও।
--কিন্তু ভাইজান দাদাজানে যদি রা'গ করে?
--কিছু বলবে না তুমি যাও।
বল্টুর মন মানলো না। নিশ্চিত হতে বশির আনসারীকে অনুরোধ করলো
--দাদাজান বাসায় যামু আমি? আসলে বাড়িতে বউ একা...
--চোখের সামনে থেকে দূর হ হতভাগা। আর এক সেকেন্ড ও তোকে আমার চোখের সামনে দেখলে অন্ধকার স্টোর রুমে আটকে রাখবো।
বল্টুর মুখটা চুপসে গেলেও শায়েরের ইশারা পেয়ে সামনে থেকে চলে গেলো। দোকানের সব কিছু গুছিয়ে বের হওয়ার সময় বশির আনসারী বললো
--ক্যাশ বাক্স থেকে কিছু টাকা নিয়ে যা হতভাগা। বাসায় ফেরার পথে নাতবউর জন্য কিছু খাবার আর সাজুগুজুর জিনিস কিনে নিয়ে যাবি। তোরা আজকাল কার যুগের ছেলেগুলো এতো আনরোমান্টিক ছ্যাহ। এই জন্যই তো তোদের বউ টিকতে চায় না। আবার কিছু মানুষের কপালে তো বউ জুটেও জোটে না। ছ্যাহ ছ্যাহ সমাজ দেখি দিন দিন রসাতলে যাচ্ছে।
শায়েরকে খোঁচা মে'রেই কথাগুলো বললো বশির আনসারী। আড়চোখে দেখতে ভুললো না নাতির মনোভাব। অথচ শায়ের ভাবলেশহীন। দাদুর কথা শুনেও যেন শুনলো না। চেয়ারে বসে নিজের মতো ফোন টেপায় ব্যস্ত রইলো। বশির আনসারী আলগোছে ব্যর্থতার শ্বাস ফেললো। তিনি বুঝে গেছেন বেঁচে থাকতে নাতিবউ দেখার সৌভাগ্য তার হবে না। আর সেখানে কিনা তিনি স্বপ্ন দেখছেন নাতির ঘরের পুতি দেখার।
বল্টু টাকা নিয়ে চলে যেতেই উঠে দাঁড়ালো শায়ের। কোনো কথা না বলে এসে বসলো বশির আনসারীর সামনে। আলগোছে দু'হাতে দাদুর কোমড় জড়িয়ে কোলে মাথা রেখে চোখ বুজলো ছেলেটা। চমকে উঠলো বশির আনসারী। শায়ের সহজে তার কোলে মাথা রাখে না। যখনই খুব বেশি মন খারাপ কিংবা একাকিত্ব অনুভব করে তখনই এমন নিঃশব্দে বশির আনসারীর কোলে মাথা রেখে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকে।
বশির আনসারী অভিমান ভুলে শায়েরের মাথায় হাত রাখেন। চুলে হাত বুলিয়ে দিয়ে নরম স্বরে প্রশ্ন করে
--আমার দাদু ভাইয়ের কি মন খারাপ?
--উঁহু, আমার তো মন নেই দাদু। ওরা বলে তো,তুমি কি ভুলে গেছো? যার মন নেই তার মন খারাপের ঝামেলাও নেই। এদিক দিয়ে আমি সুখী বুঝলে। মাথা টা ব্যাথা করছে একটু আদর দিয়ে দাও তো।
হাজার কষ্ট লুকিয়ে কতো অবলীলায় কথা টা বলে ফেললো শায়ের। কিন্তু চোখের কোণে পানি জমলো বশির আনসারীর। শায়েরের চুলে হাত বুলিয়েই বললো
--এভাবে বলতে নেই দাদু। প্রত্যেকটা মানুষই সুন্দর একটা পবিত্র মন নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। সময়ের পরিবর্তনে কেউ কেউ মনুষ্যত্ব হারিয়ে সেই মনকে কলুষিত করে ফেলে। কেউ আবার প্রচন্ড অভিমানে কঠোর ভাবে গড়ে তোলে নিজেকে। সবই সময়ের খেলা দাদু।
বশির আনসারী একটু থামলো। বাইরের থেকে তখন মাগরিবের আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে। গোধূলি রাঙা আকাশের বুক থেকে উড়ে যাচ্ছে পাখির ছোট দল। সেদিকে তাকিয়ে আনমনে বললো
--তোমার জীবনে একদিন একটা পরশ পাথরের দেখা মিলবে। যে পাথরের ছোঁয়ায় তোমার মনের সকল দুঃখ, কষ্ট, অভিমান বিলীন হয়ে পবিত্র পুষ্পের সন্ধান মিলবে। জীবন যে কত রঙীন সেই সুখ অনুভব করবে তুমি। সময় তোমাকে উত্তম কিছু উপহার দিবে। যেটা তুমি কল্পনা করছো মহান রব তার হাজার গুন সুখ তোমাকে দিবেন।
শায়ের মন দিয়ে দাদুর সব কথা শুনলো। মনের ভেতর প্রশ্ন জাগলো --কে সেই পরশ পাথর? কার ছোঁয়ায় বেঁচে থাকার স্বাদ ফিরে পাবে সে? এমনটা কি আদোও হবে? রব বুঝি তার ভাগ্যে এমন সুখ লিখবেন?
পরমুহূর্তেই কেউ তাচ্ছিল্যে করে বলে--কিসের আশা করিস তুই? ভালোবাসার? যেখানে জন্মদাত্রী মায়ের একফোঁটা দুধ তোর ভাগ্যে জুটলো না সেখানে সুখের আশা করিস তুই? শায়ের এতো বকা কবে হলি তুই? তুই তো এমন নোস। ভালোবাসার প্রতি একরাশ ঘৃণা জন্মেছে তোর ভুলে গেছিস সেই কথা?
নিজের মনের বাকবিতন্ডায় শায়েরের ঠোঁটে ফুটে উঠলো তাচ্ছিল্যের হাসি। চোখের পাতা বন্ধ করতেই ভেসে উঠলো ছেলেবেলার আবছা কিছু স্মৃতি। আবছা একটা মুখ। কানের কাছে সুর হয়ে ভাসলো সেই রিনরিনে হাসির আওয়াজ। গিটারের টুংটাং ধ্বনি। যুগল কন্ঠের সুর।
পুরনো স্মৃতি মনে পড়তে শায়ের একটু অস্থির হলো। শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো দাদুর কোমড়। অস্পষ্ট স্বরে বিরবির করলো
--কোথায় তুমি ফুল? কোথায় হারিয়ে গেলে তুমি? এক জীবনে আপন বলতে তোমায় বুজেছিলাম আমি। অথচ তুমিও আমায় ফাঁকি দিয়ে হারিয়ে গেলে? সবার মতো স্বার্থপর হলে? এমনটা করার কি খুব বেশি প্রয়োজন ছিলো,ফুল?
****************
পুতুলের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে শাহিদা নেওয়াজ। বিস্ময়ে চোখের পলক ফেলতেও ভুলেছেন হয়তো। ড্যাব ড্যাব করে দেখছেন বাচ্চা মেয়েটার কার্যকলাপ। একটু আগের পরিপাটি মেয়েটা মুহূর্তের মধ্যে কেমন অগোছালো হয়ে গেছে। চুলে,গায়ে,মুখে আটা দিয়ে মাখামাখি করেছে। শিলের উপর লেচি দিয়ে পাকাবুড়ির মতো রুটি বানানোর চেষ্টা করছে।
শাহিদা নেওয়াজ গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে এসে বসলেন পুতুলের পাশে। বিস্ময় নিয়ে প্রশ্ন করলেন
--দিদি ভাই কি করছেন আপনি?
--লুতি বানাত্তি।
--আপনি কষ্ট করে বানাচ্ছেন কেনো দিদি ভাই? মেহের তো বানিয়েছে।
--মাম সপ গুনো বানাতে পালে নি বু। তাল আগে গলে তলে গেতে।
--এসে তো বানাতোই। কিন্তু আপনি এসব করছেন কেনো?
পুতুল একপলক শাহিদা নেওয়াজের দিকে তাকালো। বেলান দিয়ে রুটি গোল করতে করতে উচ্ছাস নিয়ে বললো
--মাম কসতু কলে লুতি বানাবে কেনু? আমি বানিয়ে দিত্তি।
শাহিদা নেওয়াজ মাথায় হাত দিয়ে বসে রইলেন। মেহরিমাকে তিনি একটু ফার্মেসিতে পাঠিয়েছে। জেসমিনের রাতের ঔষধ গুলো সব শেষ। ওগুলোই আনতে বলেছে। মেহরিমা মানা করে গেলেও তিনি রান্না ঘরে এসেছেন বাকি রুটি গুলো বানানোর জন্য। কিন্তু এখানে এসে বড় রাধুনিকে কাজ করতে দেখে বাকশক্তি হারিয়েছেন তিনি।
পুতুল অনেক চেষ্টা করেও রুটি গোল করতে পারছে না। মামের মতো তার রুটি বড়ও হচ্ছে না। কেমন একজায়গায় স্থির হয়ে রয়েছে। এই নিয়ে মেয়েটা বেশ বিরক্ত। এক পর্যায়ে রে'গে গিয়ে বেলান দিয়ে বাড়ি মারলো লেচিতে। চেঁচিয়ে বললো
--পতা লুতি গুলছো না কেনু? মাম আসুক বিচাল দিবো আমি। চয়তান লুতি একতা।
হুট করে পুতুলের চিৎকারে ভরকে গেলো শাহিদা নেওয়াজ। ব্যস্ত কন্ঠে বললো
--কি হয়েছে দিদি ভাই? এমন করে চেচাচ্ছো কেনো?
পুতুল শাহিদা নেওয়াজের দিকে তাকিয়ে আঙুল দিয়ে শিলের উপর রাখা লেচি দেখিয়ে বিরক্ত নিয়ে বললো
--চয়তান লুতি গুলছে না বু। পুতুর চঙ্গে বেদুপি কলছে।
--এ্যা,কি করছে?
--বেদুপি কলছে।
--রুটি আবার বেয়াদবি করে কিভাবে? ওর কি মানুষের মতো হাত পা আছে?
--পতা লুতি গুলছে না। না গুলে পুতুর চঙ্গে বেদুপি কলছে।
শাহিদা নেওয়াজ করুন চোখে লেচির দিকে তাকিয়ে রইলো। আরেকবার তাকালো পুতুলের দিকে। বাচ্চা মেয়েটার চোখে মুখে উপচে পড়া বিরক্তি। রুটি কেনো ঘুরছে না এই নিয়ে তার সকল রা'গ। শাহিদা নেওয়াজ চিন্তায় পড়লেন। এই ভরসন্ধ্যা বেলা মেয়েটাকে গোসল করালে যদি ঠান্ডা লাগে? কিন্তু না করিয়েও বা যাবে কোথায়? এই মেয়ে তো আটা দিয়ে গোসল করেছে।
--আম্মু মেজ আপার ঔষধ এনেছি। আপাকে খাবার খাইয়ে সন্ধ্যার ঔষধ গুলো খাওয়াই দাও তো। এরপর রাতের গুলো আমি খাওয়াবো নে।
মেহরিমার ডাকে সম্বিত ফিরলো শাহিদা নেওয়াজের। রান্না ঘর থেকে চেচিয়ে ডাকলো
--ও মেহের এদিকে আয়। দেখে যা তোর আদরের মেয়ে কি কান্ড ঘটিয়েছে।
পুতুলের নাম শুনে হন্তদন্ত হয়ে রান্না ঘরে এলো মেহরিমা। অস্থির কন্ঠে শুধালো
--পুতুলের কি হয়েছে আম্মু? মেয়েটা ঠিক...
কথার মাঝে সামনে তাকাতেই চুপ হয়ে গেলো মেহরিমা। পলক ঝাপটে পুতুলের আগা গোড়া দেখলো। শাহিদা নেওয়াজ মেয়েকে দেখে নালিশের স্বরে বললো
--দেখ কি করেছে এই মেয়ে? আটা তো নষ্ট করেছেই উল্টো নিজেকে ও গোসল করিয়েছে। ফাজিল মেয়ের সবকিছুতে পাকামো। কিছু বল তুই ওকে। আহ্লাদ দিয়ে আর মাথায় তুলিশ না।
মেহরিমা মায়ের কথায় উত্তর না দিলেও পুতুল উঠে দাঁড়ালো। কোমড়ে হাত রেখে নাক ফুলিয়ে বললো
--কুতনি বু আবাল আমাল নামে মিত্তে মিত্তে নালিত কলছো? কুতায় আতা নস্তু কলেছি আমি?
--চারিদিকে আটা ফেলেছো, নিজের পুরো শরীরে আটা দিয়ে গোসল করেছো এটাকে নষ্ট করা বলে না তো কি বলে? দুষ্টু মেয়ে।
--একদুম মিত্তে বলবা না। আমি আতা নস্তু কলি নি। লুতি বানাতে গিয়ে একতু একতু আতা গায়ে নেগেছে।
--একদম কথা ঘোরাবে না তুমি। আমি নিজের চোখে সব দেখেছি।
--আম্মু মেজ আপাকে ঔষধ খাইয়ে দাও।
মেহরিমা গম্ভীর কন্ঠে কথা টা বললে চুপ করে যায় শাহিদা নেওয়াজ। মেয়ের হাত থেকে ঔষধ গুলো নিয়ে বলে
--দুষ্টু মেয়েকে কিছু বলবি না তুই?
--তুমি ভেতরে যাও। পুতুলকে আমি দেখছি।
--বেশি করে বকবি কিন্তু মেহের। একদম আহ্লাদ দিবি না।
মেহরিমা গম্ভীর চেহারায় পুতুলকে দেখছে। মামের এমন চেহারা পুতুলের মুখটা চুপসে গেলো ভয়ে। শাহিদা নেওয়াজ যাওয়ার আগে বললো
--তোমাকে এবার আড়াই ঝুলিয়ে পেটাবে আমার মেয়ে। তখন দেখবো এসব পাকা পাকা কথা কোথায় যায়? হুহ।
পুতুল কিছু বললো না। ভয়ার্ত চোখে দেখলো মেহরিমাকে। শাহিদা নেওয়াজ চলে যেতেই মেহরিমা পুতুলের কাছে এগিয়ে গেল। হাঁটু গেড়ে বসে মেয়েটাকে ভালো করে দেখে বললো
--আটা নষ্ট করেছো কেনো?
--নস্তু কলি নি মাম। লুতি বানাতে গিয়ে একতু একতু পলেছে।
--রুটি বানাতে কেউ বলেছে তোমায়?
--না
--তাহলে বানিয়েছো কেনো?
--তোমাল কস্তু হচ্চিলো দেকে আমি বানাত্তিলাম।
সব কথা গুলো পুতুল মাথা নিচু করে বললেও মেয়েটার এই সরল কথা মেহরিমার বুকে প্রশান্তি এনে দিলো। সারাদিনের সকল পরিশ্রম,ক্লান্তি যেন এক নিমেশে হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো। চোখের কোণের জমা হলো চিকচিক অশ্রু। মেহরিমার গলার স্বর নরম হয়ে এলো। পুতুলের গালে হাত রেখে বললো
--আমার কষ্ট হচ্ছিলো কিভাবে বুঝলে তুমি আম্মু?
পুতুল মাথা তুললো। মেহরিমার চোখের দিকে তাকিয়ে বললো
--তোমাল হাত নাল হয়ে গেচিলো। আগুনে চেকা নেগেছিলো। কস্তু হচ্চিলো তোমাল। আমি দেকেচি তো।
মেহরিমা ঠোঁট টিপে কান্না আটকানোর চেষ্টা করলো। অথচ কান্নারা দলা পাকিয়ে আটকে আসছে গলায়। না চাইতেও চোখ থেকে পানি পড়লো মেহরিমার। পুতুল দেখে অস্থির হয়ে বললো
--তি হয়েচে মাম? তুমি কানছু কেনু? পুতু তোমায় কস্তু দিয়েচি? আমি আল দুত্তুমি কলবো না মাম। তুমি তান্না তলো না। পুতু কস্তু পায় তো।
পুতুলের চোখ জোড়াও ছলছল করছে মামের কষ্ট সে সহ্য করতে পারলো না। মেহরিমা পুতুলকে বুকে আগলে নিলো। মাথার তালুতে চুমু একে বললো
--আমার একটু কষ্ট হচ্ছে না আম্মু। মাম একদম ঠিক আছি।
--তাউলে কানছু কেনু?
--সুখে কাঁদছি আম্মু। সংগ্রামী জীবনের এই এক টুকরো সুখ আমাকে কাঁদিয়ে ছাড়লো মা। সবাই মামকে স্বার্থে ব্যবহার করলেও একমাত্র তুমিই মামকে স্বার্থ ছাড়া ভালোবাসো। আমার যেই ব্যাথা আমার আপনজনের চোখে পড়ে না তুমি অবুঝ হয়ে সেই কষ্ট অনুভব করলে। এতো সুখ আমি কোথায় রাখবো বলতে পারো?
পুতুল শান্ত হয়ে মেহরিমার সব কথা শুনলো। ছোট করে বললো
--মামকে পুতু বালোপাতে তো। অনেক বালোপাতে।
--জানি তো আম্মু। পুতুল রাণী ছাড়া মামের আর কে আছে?
মেহরিমা পুতুলকে বুক থেকে তুললো। আদুরে গালে হাত রেখে বললো
--এখন যে পুতুল সোনাকে সুইট একটা হট শাওয়ার নিতে হবে। দেরি করলে কিন্তু ঠান্ডা লাগবে আম্মু।
--গোচুল কললে লুতি বানাবু ককুন?
--বাকিটা আমি সামলে নিচ্ছি। তুমি বু'র সঙ্গে গিয়ে গোসল করে এসো।
--না। বু সুদু থাচ থাচ মালে। আমি বুল সাতে দাবো না। তোমাল সাতে দাবো মাম।
মেহরিমা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো
--আচ্ছা আমার সঙ্গে যেও। এখন চলো বাকিটুকু শেষ করি।
মেহরিমা পুতুলকে পাশে বসিয়ে। বাকি রুটি বানাতে মন দিলো। মেহরিমার রুটি গোল হচ্ছে দেখে পুতুল হাত তালি দিয়ে বললো
--ইয়ে লুতি গুলছে।
মেহরিমার রুটি বানানোর মাঝে পুতুল দুষ্টুমি করে কিছুটা আটা মেহরিমার গালে লাগিয়ে দিলো। হাত তালি দিয়ে খিলখিল করে হাসলো। লাফাতে লাফাতে বললো
--মামকে চুন্দুল নাগছে। তি মজা।
মেহরিমা মেয়েটার পাগলামিতে হাসে। নিজেও পুতুলের নাকের ডগায় আটা মাখিয়ে দেয়। দুজনের খিলখিল হাসিতে ভরে ওঠে রান্না ঘর। দরজায় উঁকি দিয়ে শাহিদা নেওয়াজ মেয়ের এই খুশি দেখে মন ভরে। নিজের ঠোঁটে হাসি থাকলে চোখ থেকে অবলীলায় গড়িয়ে পড়ো এক ফোঁটা অশ্রু কণা।
**********
--রাহুল একটু শুনে যা তো।
--আসছি ভাই।
শায়েরের ডাকে রাহুল এলো মিনিট দুয়েক পর। বিছানায় বসে বললো
--তোমার কিছু লাগবে ভাই?
শায়ের মোবাইল স্ক্রিনে চোখ রেখেই বললো
--একটু দোকানে যা তো। চিঁড়া,দই আর কিছু খেজুর কিনে আন। সঙ্গে একটা নারকেল ও আনিস।
--রাতের বেলা এগুলো দিয়ে কি করবা ভাই?
--ইন্সটায় নিউ একটা খাবারের রেসিপি দেখেছি। সেটাই ট্রাই করবো বুঝলি।
শায়েরের কথা শুনে রাহুল হাসলো। টিপ্পনী কেটে বললো
--তোমাকে যে মেয়ে বিয়ে করবে তার কিন্তু রাজ কপাল ভাই।
শায়ের ফোন থেকে চোখ তুলে তাকালো। ভ্রু কুঁচকে বললো
--রাজ কপাল বলতে?
--এই যে ভাবীর কষ্ট করে রান্না করতে হবে না। উল্টো তুমিই তাকে নিউ নিউ রেসিপি রান্না করে খাওয়াবা। এটা রাজ কপাল নয় তো কি হুম?
শায়ের চোখ উল্টে পুনরায় ফোনে নজর দিলো। ভাব লেশ ভাবে বললো
--নিউ নিউ রেসিপি ট্রাই করা আমার শখ। তুই তো জানিস নিজের একটা রেস্টুরেন্ট বানানোর অনেক বড় স্বপ্ন আমার। সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য রান্না শিখছি। এখানে বউ নামক প্যারার কথা আসছে কেনো?
--ওই তো বুঝি বুঝি।
--বুঝে দেশ উদ্ধার করে ফেল তুই। তার আগে আমাকে জিনিস গুলো এনে দে। নয়তো দেখবি তোর উপর কেমন কাবাবের রেসিপি ট্রাই করি।
রাহুল হাসতে হাসতে চলে গেলো। তার সিক্স সেন্স আজকাল অদ্ভুত একটা বিষয়ে নাড়া দিচ্ছে। মন বলছে তার ভাই এবার সিঙ্গেল থেকে মিঙ্গেল হতে যাচ্ছে। বাকিটা সময় বলে দেবে।
**********
অন্ধকার রাস্তা দিয়ে প্রাণপনে ছুটছে এক মেয়ে। পরনে তার বিয়ের বেনারসী, ভারী ভারী জুয়েলারি। কাঁধে একটা মাঝারি সাইজের ব্যাগ ঝুলিয়ে সে ছুটছে অজানা গন্তব্যে। মাঝে দু একবার হোঁচট খেয়ে পড়লেও নিজেকে সামলে নিয়েছে। তার থেকে অনেকটা দূরেই আবছা আলোয় দেখা যাচ্ছে দুজন ছেলের অবয়ব। দেখেই বোঝা যাচ্ছে মেয়েটাকে তাড়া করছে তারা। অজ্ঞাত রমণী নিজেকে বাঁচাতে নির্জন গলির বামপাশের অন্ধকারে মিলিয়ে গেলো। দেওয়ালের সঙ্গে নিজেকে আড়াল করে মুখ চেপে রেখেছে নিজের। ভয়ে বুকটা ধরফর করছে তার। কাঁধের ব্যাগটা আঁকড়ে রেখে মনে মনে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইছে। লোক দুটো এসে মেয়েটাকে না পেয়ে কিছুক্ষণ অশ্লীল ভাষায় গালাগাল করলো। অতঃপর খিটখিটে মেজাজ নিয়ে চলে গেলো অন্যপথে। লোক দুটো চলে গেছে বুঝতে পেরে মেয়েটা আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো। আশপাশে ভালো করে নজর বুলিয়ে দৌড় দিলো লোকালয়ের দিকে। কিছুদূর যেতেই অন্ধকারে ভাঙা ইটের টুকরোর সঙ্গে হোঁচট খেয়ে পড়তে নিলে বলিষ্ঠ বুকে ধাক্কা খেলো। লোকটাকে সঙ্গে নিয়ে নিচে পড়তেই চোখটা খিচে বন্ধ করলো রমণী। শুনশান ফাঁকা রাস্তায় তখন শোনা গেলো অচেনা লোকটার ব্যাথাতুর আওয়াজ
--ও মা গো,,আমার ব্যক্তিগত সম্পদের দফারফা হয়ে গেলো।