--এই আপা কে আপনি?
অপরিচিত লোকের মুখে আপা ডাক শুনে বিরক্ত হলো রমণী। ছোট করে বললো
--সন্ধ্যা
-- সন্ধ্যা মানে? এই মাঝরাতকে আপনার কাছে সন্ধ্যা মনে হয়? বলি চোখ কি পকেটে রেখে দিয়েছেন? আজব মেয়ে মানুষ!
সোডিয়ামের মৃদু হলদেটে আলোয় অপরিচিত লোকের মুখটা দেখার চেষ্টা করলো রমণী। শ্যামবর্ণের লোকটার গায়ের রং হলদে আলোয় একটু বেশি চাপা লাগছে। রমণী অনুভূতি শূন্য চোখে লোকটার চোখের দিকে তাকালো। সেই দৃষ্টিতে কিছুটা ভরকে গেলো সে। মৃদু ভয় নিয়ে আওড়ালো
--এই আপনি কে সত্যি করে বলুন তো? আবার বিয়ের বেনারসী পড়ে আছেন। রাতের বেলা অন্ধকার রাস্তায় এই পোশাকে? এই..এই আপনি আবার সে নয় তো?
অপরিচিত লোকটা ভয়ে দু কদম পেছনে সরে গেলো। বেনারসী পরিহিত রমণী ভ্রু কুঁচকে বললো
--কে?
--ওই যে সুন্দরী রমণীদের রূপ ধরে আসে আর জল্লাদী রূপ দেখিয়ে হার্ট ব্লক করে ঘাড় মট'কে দেয় আপনি সে তাই না? সত্যি করে বলুন নয়তো..
--নয়তো..?
--নয়তো..নয়তো...
লোকটা আশেপাশে তাকালো। হয়তো পালানোর পথ খুঁজছে। রমণী দীর্ঘ শ্বাস ফেললো। এক বিপদ থেকে বাঁচতে নতুন কোন ঝামেলায় ফেঁসে গেলো বোধগম্য হলো না। তবে নিজেকে হেফাজত করতে আপাতত এই অচেনা লোকটাকে ভরসা করতে ইচ্ছে করছে। কেনো করছে জানে না সে? শুধু মন বলছে -তোর রক্ষক এসে গেছে সন্ধ্যা। এবার আর কোনো ভয় নেই।
সন্ধ্যা নিজের ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিলো। উঁচু হিল পড়ায় পায়ে বেশ ব্যাথা করছে। জুতো জোড়া খুলে হাতে নিয়ে লোকটার কাছে এগিয়ে গেলো। স্বাভাবিক কন্ঠে বললো
--চলুন
--কোথায় চলবো?
--আপনার বাড়িতে।
বিস্ফোরিত চোখে তাকালো লোকটা। কি বলছে এই মেয়ে? তার বাড়ি যাবে মানে? সে কি একা থাকে নাকি? তাছাড়া অপরিচিত একটা মেয়েকে রাতবিরেতে সঙ্গে করে নিয়ে গেলে ভাই তাকে আস্তো রাখবে? পিছ পিছ করে কেটে য'মের দুয়ারে পাঠিয়ে দেবে না।
--তার আগে বলুন আপনার নাম কি? কি বলে ডাকবো আপনায়? সমেদ আলী নাকি ঝন্টু মিয়া।
পুনরায় মেয়েটার প্রশ্নে সম্বিত ফিরলো ছেলেটার। নিজের এমন বিদঘুটে নাম শুনে চোখ মুখে বিতৃষ্ণা এনে বললো
--ইউ্য ছিঃ এমন জঘন্য নাম আমার নয়। আমার নাম রাহুল, রাহুল মির্জা। ওসব ঝন্টু ফন্টু নয়।
--আচ্ছা। তো মিস্টার রাহুল সারারাত কি রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকার প্ল্যান করেছেন নাকি বাড়িঘরে ফেরার ইচ্ছে ও আছে?
--আমার বাড়ি ফেরা নিয়ে আপনাকে চিন্তা করতে কে বলেছে? আপনি আপনার পথ মাপুন আপা।
রাহুল রাস্তায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা জিনিসগুলোর দিকে তাকালো। দইয়ের হাঁড়ি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। চিঁড়ার পলিথিন ফেটে সব চিঁড়া গুলো ধুলোমাখা রাস্তায় গড়াগড়ি খাচ্ছে। নারকেল টা আস্ত থাকলেও সেটা গড়িয়ে গেছে অনেকটা দূরে। রাহুলের মায়া হলো বড্ড। আহারে কতো গুলো টাকা জলে গেলো। এখন আবার নতুন করে সব কিনতে হবে। রাহুল নারকেল টা কুড়িয়ে নিয়ে যেতে নিলে সন্ধ্যা ও তার পিছু নিলো। ভারী বেনারসী,গয়না সবকিছু সামলে চলতে একটু কষ্ট হলেও গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে চললো রাহুলের সাথে। রাহুল প্রথমে সন্ধ্যার অস্তিত্ব না বুঝলেও যখন বুঝলো ঝট করে পিছু ফিরলো। আশ্চর্য হয়ে বললো
--আপনি আমার পিছু নিয়েছেন কেনো?
--আপনার সঙ্গে যাবো বলে।
--আমার সঙ্গে যাবেন মানে? আপনার ঘরবাড়ি নেই।
--না নেই। আপাতত আপনার গন্তব্যে যেখানে আমার ডেসটিনেশন ও সেখানে।
সন্ধ্যা হাসি হাসি মুখে কথাটা বললেও ধক করে উঠলো রাহুলের বুক। তূরন্ত নাকচ করে বললো
--অসম্ভব,অপরিচিত মেয়ে মানুষকে আমার সঙ্গে নিতে পারবো না আমি। তাছাড়া ভাই দেখলে পিটিয়ে তক্তা বানিয়ে ফেলবে আমায়। আপনি আপা অন্য কোথাও যান তো। আমাকে আর ঝামেলায় জড়ায়েন না।
সন্ধ্যা সেসব কথা কানেই তুললো না। ভাবলেশহীন কন্ঠে বললো
--আমাকে সঙ্গে না নিলে আপনাকে আমি প্রতারণার কেসে ফাঁসিয়ে দেবো। তখন বুঝবেন চৌদ্দ শিকের মধ্যে আটকে থাকার মজা।
রাহুল চমকে উঠলো। ব্যস্ত পায়ে সন্ধ্যার কাছে এগিয়ে এসে বললো
--প্রতা'রণা মানে? কিসের প্রতা'রণা? আপনার সঙ্গে প্রতা'রণা করলাম কখন? মাত্রই তো দেখা হলো আমাদের।
--সত্যি আমরা জানি কিন্তু পুলিশ তো আর জানে না। আমি যখন পুলিশকে কেঁদে কুটে ইমোশলান ব্ল্যাকমেল করে বললো, দেখুন স্যার দেখুন পাঁচ বছর আমার সঙ্গে প্রেমের অভিনয় করে এখন বিয়ে করতে নাকচ করছে। আপনারাই এর বিচার করুন নয়তো আমি ফাঁ'স দিবো। ভালোবাসার এই প্রতা'রণা আমি সহ্য করতে পারবো না স্যার। তখন আপনার কি হবে হুম? প্রেমের প্রতা'রণার মাম'লায় সোজা চৌদ্দ শিকে ফেঁসে যাবেন তো।
মেয়েটার কথা শুনে চোয়াল ঝুলে পড়ার অবস্থা রাহুলের। যেখানে এই মেয়েকে দেখলোই মিনিট কয়েক হলো সেখানে পাঁচ বছরের সম্পর্ক তাও আবার প্রেমের। যে ছেলে জীবনে একটা মেয়ের সঙ্গে ভালো ভাবে দুটো কথা বলতে পারে নি সেখানে মিথ্যা প্রেমের মাম'লায় ফেঁসে যাবে সে? এমন কঠিন মিথ্যা কথা বলতে এই মেয়ের বুক কাঁপবে না? তার মতো ভোলা ভালা মাসুম বাচ্চা টাকে এভাবে ফাঁসিয়ে দেবে?
রাহুলকে ভাবনায় পড়তে দেখে মিটিমিটি হাসলো সন্ধ্যা। রাহুলের শার্টে ঝোলানো আধভাঙ্গা সানগ্লাস টা নিজের চোখে পড়ে ভাব নিয়ে বললো
--এখন ভেবে আর লাভ নেই। বাঁচতে চাইলে আমাকে সঙ্গে নিন নয়তো জে'লে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হোন।
দোটানায় পড়লো ছেলেটা। সন্ধ্যার দিকে কটমট করে তাকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বললো
--আসুন
রাহুলের সম্মতি পেয়ে মনে মনে নেচে উঠলো সন্ধ্যা। নিজের জুতো জোড়া রাহুলের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো
--আপনার জুতা খুলুন তো।
--আমার জুতা খুলবো কেনো?
--ভাঙা'চোরা রাস্তার মধ্যে খালি পায়ে হাঁটবো নাকি আমি? ধারা'লো কিছুর স্পর্শে আমার সুন্দর নরম পা যদি কে'টে যায় তখন কি হবে? শিগগির জুতা খুলুন নয়তো...
--বুঝেছি বুঝেছি প্রতা'রণার মাম'লায় ফাঁসিয়ে দেবেন তাই তো।
--অবশ্যই।
রাহুল ফোঁস করে একটা শ্বাস ফেললো। মনে মনে সন্ধ্যাকে বকলো বেশ করে। নিজের পায়ের জুতা খুলে সন্ধ্যার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো
--নিন মহারাণী জুতো জোড়া পড়ে আমাকে উদ্ধার করুন।
সন্ধ্যার হাসি প্রসারিত হলো। চটপটে ভঙ্গিতে জুতো জোড়া পড়ে হেলেদুলে সামনে যেতে যেতে বললো
--ফলো মি মিস্টার ঝন্টু মিয়া।
*****************************
হাতে অনেকগুলো চকলেট নিয়ে শায়েরীর রুমের দিকে এগিয়ে আসছিলো রোহান। মাঝ পথে দেখা হলো রোজিনা বেগমের সঙ্গে। ছেলেকে দেখে মিষ্টি করে হাসলেন তিনি। কাছে এগিয়ে এসে বললো
--কখন ফিরলি আব্বু?
--মাত্রই এসেছি আম্মু।
--হাসপাতালে আজকাল অনেক বেশি চাপ যাচ্ছে তোর। কিছুদিন হলো বেশ রাত করে ফিরছিস।
রোহান মুচকি হাসলো। মায়ের হাত ধরে বললো
--তেমন কিছু নয় আম্মু। একজন এমপির হার্ট সার্জারি করেছি তো ওনার দেখাশোনা করতেই সময় চলে যায়। এমপি মানুষ বোঝোই তো বিশেষ খাতির যত্ন না করলে হাসপাতালের দূর্নাম করে ছাড়বে।
রোজিনা বেগম নিজেও হাসলেন। বললেন স্বাভাবিক স্বরে
--তা যা বলেছিস। তবে রোগীর সেবা করতে গিয়ে নিজের কথা ভুলিস না যেন। সময় করে খাওয়া দাওয়া টা করিস। দিন দিন কেমন শুকিয়ে যাচ্ছিস এই খেয়াল আছে তোর?
শেষের দিকে রোজিনা বেগমের গলার স্বর কিছুটা বুজে এলো। মায়ের মন তো সারাক্ষণ সন্তানের চিন্তায় অস্থির থাকে। রোহান একহাতে মাকে জড়িয়ে ধরে বললো
--আমার সুইট আম্মু এতো টেনশন করো কেনো? আমি একদম ফিট আছি।
--হয়েছে আর স্বান্তনা দিতে হবে না। শায়েরীকে ডেকে নিচে আয়। আমি খাবার বাড়ছি।
--সেতু এখনও খায় নি?
--না। কতো করে বললাম খেয়ে নিতে শুনলো না মেয়েটা। বললো তোর সঙ্গে খাবে।
রোহান চুপচাপ মায়ের কথা শুনলো। নীরবে সম্মতি জানিয়ে বললো
--মীর কোথায় আম্মু? বাসায় ফেরে না নাকি নীড়ের সঙ্গে ওর ফ্ল্যাটে থাকে?
--ওটার কথা আর বলিস না। না আছে পড়াশোনার চিন্তা আর না আছে ভবিষ্যৎ এর কোনো টেনশন। সারাক্ষণ ভবঘুরে হয়ে ঘুরবে আর বন্ধুদের সঙ্গে এদিক ওদিক ট্যুর দেবে। এই ছেলেকে নিয়ে আমি আর পারি না।
--ছোটো মানুষ তো বাদ দাও। সময়ের সঙ্গে ঠিক হয়ে যাবে।
--তাই যেন হয়। তুই দেরি করিস না দ্রুত আসিস।
রোজিনা বেগম নিজের মতো বকতে বকতে চলে গেলেন। ভাবনায় পড়লো রোহান। ব্যস্ততার জন্য ভাইদের দিকে বিশেষ খেয়াল রাখতে পারছে না সে। নীড়ের সঙ্গে মাঝে মধ্যে হসপিটালে দেখা হলেও মীরের সঙ্গে দেখা হয় না অনেকদিন। কাল একবার দুটোকে একসাথে ডেকে পাঠাতে হবে।
রোহান শায়েরীর রুমের সামনে এসে দরজায় দু'টো টোকা দিলো। ওপাশ থেকে কোনো সাড়াশব্দ না আসায় আধখোলা দরজা টা পুরোপুরি খুলে রুমের মধ্যে উঁকি দিলো। বিছানার মাঝে দাবিয়া শুয়ে আছে। মেয়েটার ছায়াও দেখা যাচ্ছে না। রোহানের ভ্রুদ্বয়ের মাঝে ভাজ পড়লো। বড় বড় কদমে রুমে এসে ডাকলো শায়েরীকে। ওয়াশরুম থেকে উত্তর এলো তখনই। শায়েরী ব্যস্ত কন্ঠে বললো
--দু মিনিট অপেক্ষা করো রোহান ভাই,আসছি।
রোহান হাতের চকলেট গুলো নিয়ে বেডসাইড টেবিলে রেখে দিলো। দাবিয়া তখন চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে রোহানকে দেখছে। রোহান বিড়ালটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আশেপাশে ভালো করে নজর বুলালো। কারোর উপস্থিতি না দেখে গিয়ে বসলো দাবিয়ার পাশে। মাথায় আলতো হাত বুলিয়ে বললো
--দাবিয়া তুই যে আমার বড় সতীন এই সত্যি কি তুই জানিস?
দাবিয়া ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে থেকে ডেকে উঠলো মৃদু স্বরে
--মিউ
রোহান আফসোসের সুরে বললো
--আমার না হওয়া বাচ্চা বউটা দিনের মধ্যে তোকে যে কয়বার চুমু খায়,কোলে নিয়ে ঘুরে, আদর করে ওসব তো আমার হক। অথচ মাঝখানে তুই এসে আমার হক মে'রে দিচ্ছিস। এটা কি তুই ঠিক করছিস বাপ?
--মিউ
--ঠিক করছিস না জানিই তো। বাপের হক মে'রে দেওয়া কি ভালো কাজ? কিন্তু তুই প্রতিনিয়ত সেই কাজ করছিস। কঠিন অপরাধ করেছিস। এরজন্য অবশ্যই তোর শা'স্তি পাওয়া উচিত। উচিত কিনা বল?
--মিউ
রোহান জ্বলজ্বলে চোখে দাবিয়ার দিকে তাকালো। বাঁকা হেসে বললো
--বাপের কাছে শা'স্তি পাওয়ার জন্য প্রস্তুত তো বিং বিং?
অবলা বিড়াল রোহানের কথা ঠিক বুঝলো কিনা কে জানে? মুখটাকে ইনোসেন্ট বানিয়ে ডাকলো মৃদু স্বরে
--মিউ
রোহানের হাসি প্রসারিত হলো। কালবিলম্ব না করে ঠা'স ঠা'স করে দুটো থা'প্পড় মারলো দাবিয়ার মাথায়। আলতো ভাবে মারলেও লাফিয়ে উঠলো দাবিয়া। বোকার মতো কতক্ষণ তাকিয়ে থেকে ডাকলো
--মিউ মিউ
রোহান উঠে দাঁড়ালো। শার্টের কলার ঠিক করে দাবিয়ার দিকে আঙুল তুলে শাসিয়ে বললো
--আর কোনোদিন বাপের সম্পত্তিতে ভাগ বসানোর চেষ্টা করলে উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখবো তোকে। স্টুপিড বিড়াল ইনোসেন্ট মুখ বানিয়ে আমার না পাওয়া আদর গুলো সব আগে ভাগে ভোগ করছিস। কত বড় সাহস দেখেছো? পুঁচকে ছাও বাপকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘোড়ায়? এসব লুতোপুতো ঢং পরবর্তী দেখলে একদম সুন্নতে খাৎনা করে দিবো।
দাবিয়াকে মন মতো বকাঝকা করে তবেই শান্ত হলো রোহান। ফোঁস কে শ্বাস ফেলে একটা চকলেট দাবিয়ার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো
--এই নে তোর চকলেট। এটা খেয়ে মা'রের কথা ভুলে যাবি কেমন।
ফুরফুরে মন নিয়ে শিষ বাজাতে বাজাতে শায়েরীর রুম ত্যাগ করলো রোহান। এদিকে পুরো ঘটনা নিশ্চুপ দাড়িয়ে থেকে দেখলো শায়েরী। রোহান চলে যেতেই কলের পুতুলের মতো এগিয়ে এলো দাবিয়ার কাছে। শায়েরীকে দেখেই দাবিয়া মিউ মিউ করে ডেকে উঠলো। লাফিয়ে কোলে উঠলো। শায়েরী দাবিয়াকে কোলে নিয়ে আদর করলো। চোখ মুখ জুড়ে তার বিস্ময়। পলক ঝাপটে বিরবির করে আওড়ালো
--সামান্য বিড়াল নিয়েও এতো জেলাসী? এমন ছেলেমানুষী কি রোহান ভাইয়ের পার্সোনালিটির সঙ্গে যায়? বউ না হতেই এমন পসেসিভ আচরণ বউ হওয়ার পর কি করবেন উনি?
***********************
পানি দিয়ে রুটি ভিজিয়ে ভিজিয়ে পুতুলকে খাওয়াচ্ছে মেহরিমা। মেয়েটা খেতে না চাইলেও জোড় করে খাচ্ছে। কিছুটা খেয়ে মুখ ঘুরিয়ে ফেললো পুতুল। মেহরিমা পুতুলের গালে হাত রেখে বললো
--খাচ্ছো না কেনো আম্মু? পেট ভরে গেছে?
পুতুল ডাগর ডাগর চোখে তাকালো মেহরিমার দিকে। সরল স্বরে বললো
--চুকনু লুতি কেতে মুজা নাগে না মাম। গনায় আঁতকে তাকে।
মেহরিমার বুকের ভেতর টা মোচড় দিয়ে উঠলো বোধহয়। শুষ্ক ঢোক গিলে বললো
--ভিজিয়ে নরম করে দিচ্ছি তো আম্মু। তাও মজা লাগছে না?
--মুজা নাগে না মাম।
পুতুলের শুকনো মুখের দিকে তাকিয়ে ঢোক গিললো মেহরিমা। হাতের রুটির টুকরো টা প্লেটে রেখে পুতুলকে কোলে তুলে নিলো। মাথার তালুতে চুমু একে বললো
--তাহলে আমার আম্মু কি খেতে চায়?
--পুতু তুতু কেতে চায় মাম।
--দুধ তো সন্ধ্যায় একটু খেলে আম্মু। আবার ও খেতে চাও?
--হুম। তুতু উনেক মুজা। মিত্তি মিত্তি নাগে কেতে। লুতির মতুন তেতু নাগে না।
পুতুলের চোখমুখ জুড়ে উপচে পড়া খুশি। দুধের কথা শুনলেই তার ক্ষুধা বেড়ে যায়। মেহরিমা পুতুলের হাসি মুখ দেখে আর না করতে পারলো না। পুতুলকে কোলে নিয়েই ফিডারে দুধ গুলিয়ে মেয়েটার হাতে ধরিয়ে দিলো। ফিডার হাতে নিয়েই পুতুল খুশিতে লাফিয়ে উঠলো। খেতে খেতে বললো
--উমম তি মুজা। মিত্তি মিত্তি মুজা। মাম তাবে?
--না আম্মু তুমিই খাও।
--আত্তা
পুতুল খুশি খুশি মনে দুধ খেতে লাগলো। শাহিদা নেওয়াজ পাশ থেকে বললো
--এভাবে খাওয়ালে এক ডিব্বা দুধ কয়দিন যাবে?
মেহরিমা মায়ের দিকে তাকিয়ে আবারও চোখ ফিরিয়ে নিলো। প্লেটের শুকনো রুটি খেতো খেতে বললো
--যতোদিন যায় ততদিন খাবে।
--এরপর ফুরিয়ে গেলে কি করবি?
--আবারও কিনে আনবো।
--টাকা কই পাবি?
--সেই চিন্তা আমার আম্মু। টাকার চিন্তা করতে গিয়ে একটা বাচ্চাকে অভুক্ত রাখবো? এতোটা নির্দয় মনে করো আমাকে?
শেষ কথাটা মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো মেহরিমা। শাহিদা নেওয়াজ মেয়ের এমন দৃষ্টি দেখে কিছু ভরকে গেলেন। পাশে বসে বললেন
--এভাবে বলছিস কেনো? আমি তো তোর কথা চিন্তা করেই বলছিলাম।
--আমাকে নিয়ে এতো চিন্তা করতে হবে না। রিজিকের মালিক আল্লাহ। অতএব এতো চিন্তা করে লাভ নেই।
শাহিদা নেওয়াজ চুপ করে গেলেন। মেহরিমা মায়ের উশখুশ দেখে মলিন হাসলো। খেতে খেতে জিজ্ঞেস করলো
--কিছু বলতে চাও?
চমকে উঠলো শাহিদা নেওয়াজ। আমতা আমতা করে বললো
--না মানে ওই ব্যাংকের টাকার কথার ভাবছিলাম।
খাওয়া থেমে গেলো মেহরিমার। মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো
--হঠাৎ ব্যাংকের টাকার চিন্তা করছো কেনো?
--আসলে এখন ওই টাকাগুলো পেলে কতো ভালো হতো। তোর ও এতো কষ্ট করতে হতো না। তাছাড়া তোর বাবার পেনশনের টাকা গুলোও তো তোর একাউন্টে এসেই জমা হয়। তোর চাচা মাঝে ঝামেলা না করলে এতো কষ্ট করতে হতো না আমাদের। খেয়ে পড়ে ভালো ভাবেই দিন কাটতো তাই না রে।
মেহরিমা শান্ত চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকলো শুধু। না কিছু বললো আর নাতো কিছু জিজ্ঞেস করলো। শাহিদা নেওয়াজ পুনরায় বললো
--ও মেহের ব্যাংকের ঝামেলা কতো দূর রে? তোর তো আঠারো বছর হয়ে গেছে। এখন নিশ্চয়ই টাকা তুলতে পারবি? কোনো ঝামেলা হওয়ার কথা তো নয়।
মেহরিমার বুকটা এ যাত্রায় ভারী হলো। হুট করে ব্যাংকের টাকা নিয়ে মায়ের এই কৌতুহলের কারণ বুঝে গেলো। তবে আজ আর সত্যি বললো না মা'কে। ছোট করে বললো
--কাগজ পত্রের ঝামেলা শেষ হয়নি এখনোও। উকিল চাচ্চু বলেছে এখনও ছ'মাস মতো সময় লাগবে।
--কি বলিস এখনও ছ'মাস?
--হুম
--এতো দেরি হলে কি করে হবে?
শাহিদা নেওয়াজ চিন্তিত হয়ে চলে গেলো। মেহরিমা মায়ের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো এক দৃষ্টিতে। পুতুলকে বুকে জড়িয়ে আনমনে বললো
--এক মেয়ের সংসার বাঁচাতে গিয়ে অন্য মেয়ে গুলোর বেঁচে থাকার পথ অনিশ্চিত করতে চাও আম্মু? এতোই ফেলনা আমরা তোমার কাছে? বড় মেয়েকে সুখী করতে গিয়ে আমাদের কথা একবারও চিন্তা করলে না?
মেহরিমার চোখ বেয়ে নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়লো পানি। কান্না গুলো দলা পাকিয়ে আটলে রইলো বুকের মাঝে। বুকটা ভার হলেও প্রকাশ করতে পারলো না। রুটির প্লেটটা সরিয়ে রাখলো পাশে। এ খাবার আর গলা দিয়ে নামবে না তার। পুতুলকে বুকে আগলে নিয়েই লাইট অফ করে শুয়ে পড়লো সে। রাতটুকু পার হলেই শান্তি। এই অসহ্য দহন সহ্য করার মনোবল হারিয়ে ফেলছে সে। এভাবে চললে বাকি পথটা পাড়ি দিবে কি করে?
**************
রাহুলের জন্য অপেক্ষা করতে করতে বিরক্ত হয়ে যাচ্ছে শায়ের। ঘড়ির কাটায় বারো টা বাজতে চললো। অথচ এই ছেলের খোঁজ নেই। কখন আসবে আর কখন রেসিপি ট্রাই করবে সে? শায়ের ফোনটা হাতে তুলে নিলো। রাহুলকে ফোন দিবে এর মাঝেই বেজে উঠলো কলিং বেল। এক বার দু'বার করে বেজে চললো।
শায়ের ফোঁস করে একটা শ্বাস ফেললো। এতোক্ষণে আসার সময় হয়েছে এই ছেলের। ফোনটা বিছানায় রেখেই দরজার কাছে এগিয়ে গেলো সে। দরজা খুলে সামনে রাহুলকে মুর্তির মতো মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ধমকে বললো
--এতোক্ষণে আসার সময় হলো তোর? একে বারে রাত পার করে আসতি। ষোলোকলা পূর্ণ হতো।
রাহুল ধমক খেয়ে কেঁপে উঠলো। শায়ের সামনে থেকে সরে গিয়ে বললো
--দাঁড়িয়ে না থেকে ভেতরে ঢোক। রান্নায় দেরি হয়ে যাচ্ছে।
রাহুল নড়লো না। আর না তো মাথা উঁচু করলো। শায়েরের মেজাজ তরতর করে বেড়ে গেলো এতে। বিরক্তি নিয়ে বললো
--এভাবেই দাঁড়িয়ে থাকবি?
--নীড় ভাইয়া
রাহুলের পেছন থেকে মেয়েলি কন্ঠে নিজের নাম শুনে অবাক হলো শায়ের। তড়িৎ রাহুলের পিছনে তাকিয়ে দেখলো বিয়ের বেনারসী পরিহিত মেয়েটাকে। অসময়ে পরিচিত মুখ দেখে বিস্মিত হলো সে। অস্ফুটে স্বরে বললো
--বনু তুই...