হাজার ভোল্টের বিদ্যুৎ শকের মতো ঝটকা খেয়েছে রাহুল। বিহ্বল নেত্রে একবার শায়ের আরেকবার অপরিচিত মেয়েটাকে দেখছে সে। এই মেয়ের সঙ্গে শায়ের ভাইয়ের কি সম্পর্ক এই সমীকরণ মেলাতে ব্যর্থ বেচারা। সন্ধ্যা শায়েরকে দেখেই রাহুলকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে সামনে এসে দাঁড়ালো। প্রচন্ড খুশি নিয়ে জিজ্ঞেস করলো
--নীড় ভাইয়া তুমি এখানে? এটা কি তোমার ফ্ল্যাট?
সন্ধ্যাকে দেখে শায়ের নিজেও একটু অবাক হয়েছে। নিজের ভেতরে বিস্ময় ভাব রেখে স্বাভাবিক স্বরে বললো
--এটা আমারই ফ্ল্যাট বনু। কিন্তু তার আগে বল তুই এ সময়ে এখানে? তার উপর এমন বউ সাজে কেনো?
--সব বলছি তার আগে আমাকে ভেতরে যেতে দাও। দৌড়াতে দৌড়াতে প্রচন্ড টায়ার্ড আমি।
--ভেতরে আয়।
শায়ের সামনে থেকে সরে ভেতরে যাওয়ার জায়গা দিলো। সন্ধ্যা নিজের ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে খুশি মনে ঘরের ভেতরে গেলো। বাইরে তখনও রাহুল মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে। ফ্যাল ফ্যাল করে দেখছে সবকিছু। শায়ের রাহুলের দিকে ফিরে গম্ভীর স্বরে বললো
--তোকে কি ভিআইপি কার্ড দিয়ে আমন্ত্রণ জানাতে হবে?
চমকে উঠলো ছেলেটা। হাতের সদাই-পাতি গুলো শক্ত করে ধরে গুটিগুটি পায়ে ভেতরে ঢুকলো। শায়ের ফোঁস করে একটা শ্বাস ফেলে দরজা বন্ধ করলো। সন্ধ্যার পাশে গিয়ে বসলো। মেয়েটা তখন চঞ্চল চোখ জোড়া ঘুরিয়ে ফিরিয়ে চারিদিকে দেখছে। শায়ের পাশে বসতেই ছটফটে স্বরে বললো
--তুমি এই শহরে থাকো আগে জানলে আমাকে এতো কষ্ট করতে হতো না নীড় ভাইয়া। ঝামেলা ছাড়াই সেফলি বিয়ের আসর থেকে পালাতে পারতাম।
বিয়ের আসর থেকে পালানোর কথা শুনে ভ্রু যুগল কুঁচকে গেলো শায়েরের। কৌতুহলী স্বরে শুধালো
--বিয়ে থেকে পালিয়েছিস মানে?
সন্ধ্যা শায়েরের দিকে তাকালো। ততক্ষণে রাহুল ও চলে এসেছে ঘটনার গভীর সম্পর্কে জানতে। ছেলেটা সোফার এক কোনায় চুপচাপ বসে দু'জনের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছে। সন্ধ্যা ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বললো
--আর বলো না। আমার হি'টলার বাপ বাট'পারি করে আমাকে এক খ'বিশ লোকের সঙ্গে বিয়ে দিতে চাইছিলো। আমি কতোবার নিষেধ করলাম কিন্তু শুনলো না। নিজের ক্ষমতা চিরস্থায়ী ভাবে রাখার জন্য গুটি হিসেবে আমাকে ব্যবহার করতে চাইলো। কিন্তু আমি তো আমিই। নিজের সিদ্ধান্ত থেকে একচুল ও নড়তে রাজি নই। যখন দেখলাম কথায় কাজ হচ্ছে না তখন অন্য পরিকল্পনা করে ফেললাম। বাজান আমার নীরবতাকে সম্মতি মনে করে খুশি মনে বিয়ের কাজ আগাতে লাগলো। আর আমিও সুযোগ খুঁজতে লাগলাম পালানোর। কিন্তু বাড়ির কড়া সিকিউরিটির চোখ ফাঁকি দিয়ে পালানোর খুব একটা সুযোগ করতে পারি নি। অবশেষে কালকে অনেকটা রিস্ক নিয়ে বউয়ের সাজেই পালালাম। মাঝ পথে অবশ্য একবার ধরা পড়তে পড়তেও বেঁচে গেছিলাম।তবে সহি সালামতে পালাতে যে সক্ষম হয়েছি এই অনেক।
সন্ধ্যার সব কথা মনোযোগ দিয়ে শুনলো শায়ের। এদিকে রাহুল এটুকু মেয়ের এমন সাহসী কান্ডের কথা শুনে চোখ দুটো রসগোল্লার মতো বড় বড় করে ফেলেছে। নিজ মনেই বিরবির করে বললো
--বাপরে বা বাপ মেয়ে তো নয় যেন গিরগিটি।
--সবই বুঝলাম কিন্তু বিয়েটা কার সঙ্গে হচ্ছিলো?
--এমপির বখাটে,নেশাখোর,বেয়দাব,ইতর,অসভ্য ছেলে সাব্বির পাশা।
নাম টুকু উচ্চারণ করতে গিয়ে সন্ধ্যা নিজের চোখ মুখ কুচকে ফেললো। দেখে মনে হলো সে কারোর নাম নয় বরং নোংরা কোনো বস্তুর কথা বলেছে। শায়ের কিছুটা গম্ভীর কন্ঠে বললো
--এমন একটা ইউজলেস ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিতে তোর ভাই রাজি হয়ে গেলো?
--ভাইয়া তো এই বিয়ে সম্পর্কে কিছু জানে না। কিছুদিন আগেই বাবা ভাইয়াকে ব্যবসার কাজের বাহানা দিয়ে কানাডা পাঠিয়েছে। এরপর আমার থেকে আমার ফোনটাও কেড়ে নিছে। পুরোপুরি ঘরবন্দী রেখে এই বিয়ের আয়োজন করেছে।
শায়ের চুপচাপ শুনলো শুধু। কিছুক্ষণ পর গম্ভীর স্বরেই বললো
--আপাতত রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে ঘুমা। বাকি কথা কাল শুনবো।
--আচ্ছা
সন্ধ্যা শায়েরের দেখিয়ে দেওয়া ঘড়ে চলে গেলো। ড্রয়িং রুমে সোফায় বসে রইলো শুধু রাহুল আর শায়ের। রাহুল মনে মনে বেশ ঘাবড়ে আছে। কখন না জানি ভাই তাকে তুলে একটা আছাড় মা'রে। শায়ের কিছু না বলেই সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালো। ছলকে উঠলো রাহুলের বক্ষস্থল। ভয়ে ভয়ে শায়েরের দিকে তাকালে শুনতে পেলো রাশভারী কন্ঠের কিছু শব্দ
--আমার রুমে আয়। কথা আছে।
--জি..জি ভাই আসছি।
শায়ের বড় বড় কদম ফেলে চলে গেলো। পেছন পেছন গেলো রাহুল ও। ছেলেটা যতো প্রকার দোয়া জানতো সব মনে মনে আওড়ে নিজেকে সাহস দিতে লাগলো।
**************
অন্যদিনের তুলনায় আজকের সকাল টা একটু ভিন্ন। শান্তি নিবাসে একটু বেশিই ব্যস্ততা। রোজিনা বেগম বাড়ির সার্ভেন্টকে সাথে নিয়ে ডাইনিং টেবিলের উপর খাবার সাজিয়ে রাখছে। চোখ বুলিয়ে দেখছে সবকিছু ঠিক আছে কিনা। এমন সময় দোলা বেগম নামলেন সিঁড়ি দিয়ে। টেবিলের কাছে এসে জিজ্ঞেস করলো
--নাস্তা রেডি হয়ে গেছে আপা।
রোজিনা বেগম বরাবরই শান্তি প্রিয় মানুষ। স্বাভাবিক কন্ঠেই বললো
--হ্যা রে ছোটো সবকিছু রেডি। সবাই আসুক একসাথে খেতে দিবো।
--হুম। এই মিরা আমাকে এক কাপ কফি দিস তো।
শেষ কথাটা বাড়ির সার্ভেন্ট মিরার উদ্দেশ্যে বললো দোলা। মিরা সহসা একটা ভেংচি কাটলো। বিরবির করলো
--আইছেন আমার মহারাণী ফকির উদ্দিন। কেনো রে নিজের কাজ টা নিজ হাতে করলে কি হাত খইসা পড়বো? কই বড় খালাম্মায় তো এমন করেন না। কতো সুন্দার কইরা নিজ হাতে রান্না করেন। আমার লগে কতো মিষ্টি কইরা কথা কয়। অথচ এই বেডি কথায় কথায় ঝাড়ি মারে। আস্তো ঝগরুটে মহিলা কোন হান কার।
--কি রে মিরা আর কতক্ষণ লাগবে?
--আইতাছি ছোট খালাম্মা।
মিরা ব্যস্ত ভঙ্গিতে কফি বানাতে লাগলো। ছুটলো দোলাকে দিতে। ড্রয়িং রুমের সোফায় পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে দোলা। হাতে একটা ম্যাগাজিং এর কাগজ। দোলা কফি দিতেই হাতে নিলো। খোঁচা মে'রে বললো
--একেবারে কফির গাছ বানিয়ে এরপর আসতি। এতো দ্রুত দিলে হয়? আমি আরো ভাবলাম তোর জন্য স্পেশাল হেলিকপ্টার পাঠাবো।
--ক্ষমা করেন খালাম্মা। এমন ভুল আর হইতো না।
--সামনে থেকে সর। নাস্তা রেডি করে সবাইকে ডেকে আন।
--আইচ্ছা।
মিরা চুপচাপ চলে গেলো। টেবিলের কাছে গিয়ে নিজের মতো ফোঁস ফোঁস করে বললো
--আইছেন পেরাইমিনিস্টোর। কওনের আগে সব হাজির করোন লাগবো। হের কাছে আমি মানুষ না যন্তর। সবসময় খালি খোঁচা মারোন কথা।
রোজিনা বেগম পাশ থেকে শুনে শুধু হাসলো। প্লেটে খাবার সাজাতে সাজাতে বললো
--ও মিরু এতো রা'গিস না। তোর সুন্দর চোহারায় দা'গ পড়বে। পরে কিন্তু তোকে আর হিরোইনের মতো লাগবে না। হিরোইন থেকে সোজা রিনা খান হয়ে যাবি।
মিরা চমকে তাকালো রোজিনা বেগমের দিকে। নিজের গালে হাত রেখেই বললো
--সত্যই দা'গ পড়ছে নাকি খালাম্মা?
--এখনো পড়ে নি তবে বেশি রে'গে গেলে আর অন্যকে বকাবকি করলে দা'গের সঙ্গে মেসতা ও উঠবে। তখন কি তোকে দেখতে ভালো লাগবে বল?
মিরার চোখে মুখে অন্ধকার নেমে এলো। ফ্যাকশে স্বরে বললো
--আমি আর কাউরে বকাবকি করুম না খালাম্মা। তারপরও যেনো আমার চেহারায় দা'গ না পড়ে। আফনে তো জানেন হিরুইন হওয়ার কতো বড় স্বপন আমার। চেহারা ন'ষ্ট হইয়া গেলে আমারে কি আর হিরুইন বানাইবো? আফনে একটু দোয়া কইরা দেন খালাম্মা। আমি যেন খুব তাড়াতাড়ি হিরুইন হইবার পারি।
রোজিনা বেগম মুচকি হাসলো। মিরার গালে হাত রেখে আহ্লাদ করে বললো
--আমি দোয়া করি আমার মিরু সোনা যেন অনেক বড় হিরোইন হতে পারে। তার আগে পড়াশোনা টা ও যেন শেষ করতে পারে। অনেক বড় হ মিরু। আল্লাহ তোকে মানুষের মতো মানুষ বানাক।
মিরার চোখে মুখে হাসি ফুটলো। তূরন্ত জড়িয়ে ধরলো রোজিনা বেগমকে।
--আফনেরে এতো গুলান ভালোবাসা খালাম্মা। এই মিরা আফনেরে অনেক ভালা পায়।
--হয়েছে এখন গিয়ে সবাইলে ডেক আন তো।
--আইচ্ছা।
মিরা চলে গেলো সবাইকে ডাকতে। কিছুক্ষণ পর একে একে নেমে এলো সকলে। রোহান হাসপাতালের যাওয়ার জন্য তৈরি। শায়েরী নিজেও ভার্সিটি যাওয়ার জন্য রেডি হয়ে নেমেছে। কিছুক্ষণ পর ঘুমে ঢুলতে ঢুলতে চেয়ারে এসে বসলো মীর। হামি তুলে রোজিনা বেগমের উদ্দেশ্যে বললো
--খেতে দাও আম্মু। পেটে ইদুর দৌড়াচ্ছে।
সবাই খাওয়া রেখে মীরের দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকালো। সেই দৃষ্টিতে ভরকে গেলো ছেলেটা। শান্ত স্বরে বললো
--এভাবে দেখছো কেনো আমায়? চোহারার জেল্লা বেড়েছে নাকি?
--হুহ,যে না চেহারা তার আবার জেল্লা। হুতুম পেঁচার মতো লাগছে তোমায় মীর ভাইয়া।
শায়েরীর কথা শুনে মীর কটমট চোখে তাকালো ওর দিকে। পাশে বসায় বেশ সুবিধা হলো তার। চুলে টান মে'রে বললো
--বেয়াদব মেয়ে বড় ভাইয়ের সঙ্গে রসিকতা। সম্মান দে নয়তো শায়েরের কাছে তোর নামে মিথ্যা নালিশ করে মা'র খাওয়াবো কিন্তু।
--আহ মীর ভাই লাগছে আমার। চুল ছাড়ো।
--এসব কি ধরনের অসভ্যতামী মীর? যুগ কাটিয়ে বাড়ি ফিরে আবার বাড়ির মেয়ের গায়ে হাত তুলছো? এতোটা অধঃপতন হয়েছে তোমার? ছিঃ ছিঃ।
বাবার কথা যেন কানেই তুললো না মীর। শায়েরীর চুল ছেড়ে দিয়ে মন দিলো খাওয়াতে। রেজওয়ান আনসারী ছেলের থেকে উত্তর না পেয়ে অসহায় চোখে বাবার দিকে তাকালো। বশির আনসারী ইশারায় বললেন চুপ থাকতে। নিজেই তুললেন কথা।
--দাদু ভাইয়ের কাশ্মিরের ট্যুর কেমন হলো? আমাকে তো এবারের ট্যুরের গল্প শোনালে না।
--অনেক অনেক অনেক বেশি এনজয় করেছি দাদু। ব্রেকফাস্ট শেষ করে নি। তারপর তোমাকে সব গল্প শোনাবো।
--আচ্ছা শুনিয়ো।
--পড়াশোনার খবর কি তোর? ডিপার্টমেন্ট হেড ফোন করেছিলো। তুই,শায়ের কেউ নাকি ঠিকমতো ক্লাসে এটেন্ড করিস না। সারাক্ষণ আড্ডা,ট্যুর এসব নিয়ে পড়ে থাকলে চলবে? ক্যারিয়ারের চিন্তা ও তো করতে হবে।
রোহানের গম্ভীর স্বরে বলা কথা গুলো শুনে একটু মিইয়ে গেলো মীর। আড়চোখে তাকালো বাবার দিকে। যে তার দিকেই র'ক্ত চক্ষু নিয়ে তাকিয়ে আছে। মীর গলা খাকারি দিলো। নীচু স্বরে বললো
--পরীক্ষা আসতে এখনোও তো কয়মাস দেরি আছে ভাইয়া। গ্যাপগুলো ওই সময়ে পুসিয়ে নিবো।
--আর ক্লাস গুলো..
--কাল থেকেই রেগুলার ক্লাসে যাবো। সত্যি বলছি।
রোহান নীরবে মাথা দোলালো। মীর আড়চোখে ভাইকে দেখে ঢকঢক করে পানি খেলো। রোহানকে ছোট থেকেই বেশ ভয় পায় সে। ভয় পায় বলতে শ্রদ্ধা করতে। ছোট বেলা থেকে যে দায়িত্ব গুলো বাবার করার কথা ছিলো সেসব দায়িত্ব রোহান নিজে পালন করেছে। শায়ের,মীর দু'জনকেই আগলে বড় করেছে। মীরও ছোট থেকে ভাই ভক্ত। ভাই যা বলবে তাই ঠিক। বাকিসব তার কাছে তুচ্ছ।
--রেজওয়ান তোমার ছোট ভাইয়ের খবর কি? দেশে ফিরছে কবে?
--বাবা শায়েরীর আব্বু আর একসপ্তাহ পরই ফিরবে। সকালে ফোন করেছিলাম আমি।
বশির আনসারীর প্রশ্নে গদগদ হয়ে উত্তর করলো দোলা বেগম। বশির আনসারী চুপচাপ শুনলো। হাস্যজ্জ্বোল মানুষটার চেহারা এ যাত্রায় একটু গম্ভীর দেখালো।
রোহান খাওয়া শেষ করে উঠে দাঁড়ালো। শায়েরীর দিকে তাকিয়ে বললো
--পাঁচ মিনিটের মধ্যে বাইরে আসবি। অপেক্ষা করছি।
--আচ্ছা
শায়েরী ব্যস্ত হাতে খাওয়া শেষ করলো। ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে রোজিনা বেগমে জড়িয়ে ধরে যেতে যেতে বললো
--মামনি আসছি
--সাবধানে যাস। আর বাইরের খাবার একদম খাবি না।
--ঠিক আছে।
রোজিনা বেগম আর শায়েরীর কথা শুনে মুখ বাকালো দোলা বেগম৷ আস্তে করে বললো
--যত্তসব আদিক্ষেতা।
বশির আনসারী সূক্ষ্ণ হাসলো। সাবলীল কন্ঠে বললো
--ছেলে মেয়ে দুটোকে আদর,ভালোবাসা দিয়ে বড় করলে এইরকম আদিক্ষেতা তোমার সঙ্গে ও করতো ছোট বউমা। আফসোস তুমি সন্তানের জন্মদাত্রী হতে পেরেছো ঠিকই কিন্তু “মা” হতে পারো নি।
শ্বশুরের করা সূক্ষ্ণ অপমান বুঝতে সময় লাগলো না দোলা বেগমের। অপমানে মুখটা থমথমে হয়ে গেলো। চেয়েও কিছু বলতে পারলো না। বশির আনসারী নিজের মতো খেয়ে উঠে গেলেন। একে একে সবাই যার যার কাজে চলে গেলো। টেবিলে মাথা নিচু করে বসে রইলো শুধু দোলা বেগম। রা'গে, অপমানে তার পুরো শরীর কাঁপছে। চোখজোড়া হয়েছে র'ক্তিম। ফল কাঁ'টার ছুড়িটা হাতে নিয়ে হিসহিসিয়ে বললো
--এই অপমানের জবাব আমি দেবোই বাবা। যেমন করে চলার পথ থেকে সতীনের কা'টা সরিয়েছিলাম তেমন করেই সমস্ত জঞ্জাল সাফ করবো আমি। অথচ আপনি কিচ্ছুটি করতে পারবেন না। চোখের সামনে শুধু আপনজনের হাহা'কার দেখবেন আর গ'লা কা'টা মুরগীর মতো ছটফট করে তরপাতে থাকবেন।
*******************
ভার্সিটি থেকে সোজা টিউশনে এসেছে মেহরিমা। সারাদিনের অভুক্ত আর ক্লান্তিতে দূর্বল সে। চোখদুটো বুজে আসছে ঘুমে। চাইছে একটু বিশ্রাম নিতে। অথচ তার কোনো সুযোগ নেয়। জোড় করে হলেও নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টায় মরিয়া অষ্টাদশী।
মেহরিমা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে কলিং বেল চেপে অপেক্ষা করতে লাগলো দরজা খোলার। কিছুক্ষণ পর গম্ভীর মুখে দরজা খুললো এক মহিলা। মেহরিমাকে দেখে মুখের সেই গম্ভীরতা বাড়লো কয়েকগুন। মেহরিমা ক্লান্ত শরীরেও হাসার চেষ্টা করলো। সালাম দিলো বিনয়ী স্বরে। মহিলাটি সালামের উত্তর দিয়ে দরজার সামনে থেকে সরে গেলো। মেহরিমা চুপচাপ চলে গেলো ভেতরে। টেবিলে বসে অপেক্ষা করলো ছাত্রের। মিনিট খানিক পর অল্পবয়সী একটা ছেলে এলো। নাদুস নুদুস দেখতে ছেলেটা মেহরিমাকে দেখেই প্রশস্ত হাসলো। চেয়ারে বসে বললো
--কেমন আছেন মিস?
মেহরিমা মুচকি হাসলো। ছেলেটার ঝাঁকড়া চুল এলোমেলো করে বললো
--আলহামদুলিল্লাহ আমি ভালো আছি। গুড্ডু বাবু কেমন আছে?
--একদম ফাটাফাটি লেভেলের ভালো আছি মিস।
--সব পড়া ঠিক মতো করেছো তো?
--একদম
--আচ্ছা হোমওয়ার্ক গুলো বের করো।
ছেলেটা বাধ্য বাচ্চার মতো সব পড়া কমপ্লিট করলো। মেহরিমা সময় নিয়ে ওকে পড়ালো। শেষ সাবজেক্ট পড়ানোর সময় ছেলেটা হুট করেই বললো
--আপনাকে অনেক ক্লান্ত লাগছে মিস? আপনি কি অসুস্থ?
মেহরিমা মলিন হাসলো। সাবলীল কন্ঠে বললো
--তেমন কিছু নয়,ঠিক আছি আমি। তুমি আমাকে একটু পানি খাওয়াবে গুড্ডু?
--অবশ্যই। আপনি একটু অপেক্ষা করুন। আমি দু সেকেন্ডে যাবো আর তিন সেকেন্ডে ফিরে আসবো।
ছেলেটা দৌড়ে চলে গেলো। ফিরে এলো কিছুক্ষণ বাদেই। একহাতে পানির গ্লাস অন্যহাতে ছোট একটা পিরিচ। মেহরিমার সামনে রেখে হাসি মুখে বললো
--এই নিন মিস। এটুকু খেয়ে ক্লান্তি গুলো ভ্যানিস করে ফেলুন।
মেহরিমা কিছুটা অবাক হয়ে পিরিচে রাখা দুই টুকরো কেকের দিকে তাকালো। এতোদিন পড়াতে আসায় কখনো নাস্তা পায় নি সে। এতে অবশ্য তার আফসোস নেই। সে আসে, পড়ায় আবার চলে যায়। মাস শেষে তার প্রাপ্য টাকা পেলেই হলো। কিন্তু আজকে এই সামান্য নাস্তা দেখেই সে চমকেছে।
--কি হলো মিস খাচ্ছেন না কেনো? খেয়ে নিন।
মেহরিমা অসহায় চোখে ছেলেটার দিকে তাকালো। নিচু স্বরে বললো
--এসব আনতে গেলে কেনো গুড্ডু। শুধু পানি আনলেই তো হতো।
--বা রে শুধু মুখে কেউ পানি খায়। আমি তো দেখেছি আমাদের বাসায় গেস্ট আসলে মাম্মা তাদের অনেক নাস্তা দেয় তাহলে আপনাকে কেনো শুধু পানি দেবো? আপনি আমার মিস,আমার শিক্ষক। আপনার সম্মান তো আরো বেশি।
ছেলেটা সরল কন্ঠে কথা গুলো বলে ফেললো। মেহরিমা শুনলো শুধু। সে জানে গুড্ডুর মা এসব ভালো চোখে দেখবে না। তার কাছে উপর শ্রেণীর মানুষের কদর ছাড়া নিচু শ্রেনীর মানুষের কোনো স্থান নেই। এগুলো দেখলে নিশ্চয়ই বকবে ছেলেটাকে। মেহরিমা জিভে ঠোঁট ভেজালো। গুড্ডুকে পাশে বসিয়ে বললো
--আমি এসব কিছু খাবো না। তুমি রেখে এসো গুড্ডু। আমার শুধু পানি হলেই চলবে।
--আপনাকে খেতেই হবে মিস। আমি কোনো কথা শুনবো না।
ছেলেটা জোড় করেই মেহরিমাকে কেক খাইেয় দিলো। মেহরিমা একটু খেয়ে যেই না পানির গ্লাস হাতে নিতে যাবে তখনই মেয়েলী গম্ভীর আওয়াজ শুনে থেমে গেলো।
--নাস্তা খাওয়ার জন্য এক্সট্রা টাকা তোমার জন্য বরাদ্দ রাখা হয় না। নাস্তা খেতে চাইলে বলবা তোমার বেতন থেকে সেই খরচ কেটে রাখবো আমি।
তড়িৎ বসা থেকে দাড়িয়ে পড়লো মেহরিমা। পানির গ্লাসটা টেবিলে রেখেই ধীর স্বরে বললো
--মাফ করবেন আপু। নাস্তার কথা বলি নি আমি। আমি শুধু একটু পানি চেয়েছিলাম।
--আম্মু তুমি মিস কে এভাবে বলছো কেনো?
--তুমি ঘরে যাও ফাহাদ। তোমার মিসের সঙ্গে আমার কথা আছে।
মায়ের কড়া কন্ঠের উপর কথা বলার আর সাহস পেলো না ছেলেটা। আড় চোখে মেহরিমাকে দেখে চলে গেলো। ফাহাদের আম্মু মেহরিমার কাছে এগিয়ে এলো। মেহরিমার সামনে টাকা ধরে বললো
--তোমার এই মাসের স্যালারি।
মেহরিমা নিজের পারিশ্রমিক নিলো। মহিলাটি আবারও বললো
--কাল থেকে তোমার আর আসতে হবে না। ফাহাদের জন্য অন্য টিচার ঠিক করেছি আমি।
চারপাশে প্রচন্ড শব্দে বাজ পড়লে লাগে তার চেয়েও হাজারগুন বেশি চমকে উঠলো মেহরিমা। কথাটা শুনে মস্তিষ্ক যেন ফাঁকা হলো তার। হাসফাস করে বললো
--আমার অপরাধ আপু?
--তোমার কোনো অপরাধ নেই। তবে আমি চাইছিনা তোমার মতো ছোট শ্রেনীর মানুষের সংস্পর্শে আমার ছেলে যাক। তোমরা যতই শিক্ষিত হও ছোট তো ছোটলোকই তাই না বলো। আমি মা হয়ে নিজের সন্তানকে তো আর বিপথে যেতে দিতে পারি না।
মেহরিমা শান্ত চোখে মহিলার দিকে তাকিয়ে রইলো। অতঃপর সময় নিয়ে বললো
--আপনার ছেলেকে আপনি যার কাছে ইচ্ছে পড়াতেই পারেন তাই বলে আপনি কাউকে ছোট বলে অপমান করতে পারেন না আপু। আর কি বললেন আমি ছোট লোক? আপনি হয়তো জানেন না আমার বাবা একজন মেজর ছিলেন,ভাই ছিলেন ক্যাপ্টেন। সমুদ্রের একজন নাবিক। বিলাসিতা দেখে বড় হয়েছি আমি। সেই আমাকে আপনি ছোটলোক বলছেন? কিসের এতো বড়াই দেখান আপনি? সামান্য এই তিন রুমের ফ্ল্যাটের। অথচ আমার নিজেরই বিলাসবহুল দোতলা ডুপ্লেক্স বাড়ি রয়েছে। বাপের কোটি টাকার সম্পত্তি রয়েছে। আমি বড়াই দেখানো শুরু করলে আপনি নিতে পারবেন তো? অবশ্য আমার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলার সামান্য নখের যোগ্যতাও তো আপনার নেই।
--মেহরিমা মুখ সামলে কথা বলো। ভুলে যেও না তুমি আমার বাসায় দাঁড়িয়ে আছো।
মহিলাটি রা'গে ফোসফাস করছে। অথচ ফিচেল হাসলো মেহরিমা। নিজের ব্যাগটা হাতে নিয়ে বললো
--হয়তো সময়টা আমার খারাপ যাচ্ছে কিন্তু ভাগ্য আমার কখনোই খারাপ ছিলো না। জন্ম থেকেই যে মেয়ে সৌভাগ্যবতী তাকে সামান্য কথায় কিভাবে ভাঙবেন আপনি?
মহিলাটি কথা বলার মতো কিছু পেলো না। সে আগেই জানতো মেহরিমার পরিচয় সম্পর্কে। শুধু নিজেকে বড় করবে বলেই মেয়েটাকে ছোটলোক বলে অপমান করার চেষ্টা করছিলো। মেহরিমা দরজার কাছে চলে যেতে নিয়েও ফিরে তাকালো। শান্ত অথচ দৃঢ় কন্ঠে বললো
--আমি মেহরিমা আজ এখানে দাঁড়িয়ে প্রতিজ্ঞা করছি একদিন এই গোটা শহরকে আমার সফলতা দেখাবো আমি। আমার দারপ্রান্তে আপনার মতো হাজারোও অহংকারী মানুষকে মুখ থুবরে ফেলবো। আর সেদিনই হবে আমার সকল অপমানের যোগ্য জবাব।
***************
ব্যস্ত শহরের যানজট পেরিয়ে আপন মনে হাঁটছে মেহরিমা। দূর্বলতায় শরীর দুলে উঠলেও থামছে না সে। মাথায় হাজারো চিন্তা। এই টিউশনি থেকে প্রতি মাসে চার হাজার টাকা উপার্জন হতো তার। আর আজকে সেটাও হারালো। ভাগ্যে বুঝি এভাবেই তার পরীক্ষা নিতে চাচ্ছে?
মেহরিমার ভাবনার মাঝেই প্রচন্ড ঝংকার তুলে বেজে উঠলো তার মুঠোফোন টা। তপ্ত শ্বাস ফেলে ফোন রিসিভ করলো সে। ওপাশ থেকে ভেসে এলো শাহিদা নেওয়াজের ব্যস্ত স্বর
--মেহের রান্নার লবণ ফুরিয়ে গেছে। আসার সময় নিয়ে আছিস তো। সঙ্গে কিছু সবজিও আনিস।
--আনবো।
অতঃপর ফোনটা কেটে দিলো মেহরিমা। আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলো অনেকক্ষন। চোখদুটো র'ক্তিম। অথচ মেয়েটা আজ কাঁদলো না। বুক চিরে বেরিয়ে এলো দীর্ঘ এক শ্বাস। যার সঙ্গে মিশে আছে হাজারো না বলা কষ্ট,অপমান,অবহেলা আর ব্যর্থতা। মেহরিমা আকাশের দিকে তাকিয়ে ছোট করে আওড়ালো
--শক্তি দাও খোদা। মনোবল হারাতে দিও না।
**********************
কোলাহল পূর্ণ বাজারে মানুষের পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে মেহরিমা। মুদি দোকানের সামনে গিয়ে দোকানদারকে বললো
--চাচা এক প্যাকেট লবন আর হাফ কেজি মুড়ি দিয়েন তো।
--চাচা লিস্টের সবকিছু মিলিয়ে দিন তো।
পাশ থেকে পরিচিত কন্ঠ শুনে তাকালো মেয়েটা। তার পাশেই দাড়িয়ে আছে শায়ের। গলায় ঝুলছে হেডফোন। সেখানে আবার গিটার ঝুলানো একটা চেইন। মাথার চুলগুলোও এলোমেলো। পরনের প্যান্ট টাও জায়গায় জায়গায় ছেড়া। শার্টের সব গুলো বোতাম খুলে রাখা। ভেতরে গেঞ্জি পড়েছে বলে রক্ষে নয়তো এ ছেলের ফ্যাশানের যে অবস্থা তাতে উমদ গায়ে ঘুড়লেই বুঝি শান্তি পায়। শায়েরকে দেখেও মেহরিমা আজ টু শব্দ করলো না। যেমন নিঃশব্দে তাকিয়ে ছিলো তেমন ভাবেই চোখ সরিয়ে নিলো।
--লবণ কোনডা দিমু আপা? মোটা ডা নাকি চিকোন ডা।
--চিকুন টা দিন।
মেহরিমার আওয়াজ পেয়ে তড়িৎ পাশ ফিরলো শায়ের। মেহরিমাকে দেখে ফট করে বললো
--আপনি এখানে? নিশ্চয়ই আমাকে ফলো করছেন তাই না?
মেহরিমা নির্বিকার। কথা টা যেন শোনে নি। অথচ মেজাজ বিগড়ালো শায়েরের। মানুষের ইনগোর তার সহ্য হয় না। পুনরায় বললো
--মিস চ্যাপা শুটকি কথা বলছেন না কেনো?
--চাচা কতো হলো?
--ষাইট টেকা।
মেহরিমা টাকা দিয়ে জিনিসগুলো নিয়ে চলে গেলো। শায়ের অবাক হয়ে দেখলো মেয়েটাকে। আজ পর্যন্ত যতগুলো দিন এই মেয়ের সঙ্গে দেখা হয়েছে সবদিনই খুঁটি নাটি বিষয়ে ঝগড়া করেছে সে। সত্যি বলতে এই মেয়েটার সঙ্গে কারণে অকারণে ঝগড়া করতে শায়েরের ভালোই লাগে। যে শায়ের সবসময় মেয়েদের থেকে দারে থাকে সে শায়ের যেচে এই মেয়েকে খুঁচিয়ে ঝগড়া করে। কিন্তু আজকে তেমন কিছু হলো না কেনো? তার জানামতে এই মেয়ের এখন তার সঙ্গে পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া করার কথা। শায়ের নিজেও মেহরিমার পিছু ছুটলো। দোকানদার হাক ছেড়ে বললো
--ভাইজান আপনের সদাই লইবেন না?
--রেখে দিন। একটু পর এসে নিয়ে যাবো।
সবজির বাজারে ঘুরঘুর করছে শায়ের আর মেহরিমা। মেহরিমা যেদিকে যায় শায়েরও সেদিকে যায়। নানান কথা বলে মেয়েটাকে রাগানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু বিধি বাম এই মেয়ে তাকে তো পাত্তা দিচ্ছেই না উল্টো তাকে ইগনোর করছে। বিষয়টা একদমই পচ্ছন্দ হচ্ছে না শায়েরের। সকালেও তো একচোট ঝগড়া করলো তার সঙ্গে তাহলে এই টুকু সময়ে এমন অপরিচিত মানুষের মতোন বিহেভ করছে কেনো?
মেহরিমা বাজার নিয়ে বেরিয়ে এলো। আপাতত সে ফুটপাত ধরে হাঁটছে। শায়েরের এবার প্রচন্ড রা'গ হলো। দু সাইজের মেয়ে তাকে ভাব দেখাচ্ছে? বিষয়টা সম্মানে আঘাত আনলো তার। শায়ের বড় বড় কদম ফেলে মেহরিমার কাচে এগিয়ে গেলো। পেছন থেকে হাত টেনে ধরে বললো
--সমস্যা কি আপনার? কথা বলছেন না কেনো?
মেহরিমা শান্ত চোখে তাকালো। উত্তর দেওয়ায় প্রয়োজন বোধ করলো না। আলগোছে হাত টা ছাড়িয়ে নিতে বললো
--দেরি হচ্ছে আমার। হাত ছাড়ুন।
--আগে বলুন কথা বলছেন না কেনো? ভাব দেখাচ্ছেন আমায়?
--কৈফিয়ত দিতে বাধ্য নই।
--অবশ্যই বাধ্য আপনি। আমার কাছে কৈফিয়ত দিতে হাজারবার বাধ্য আপনি।
কিছুটা চেচিয়েই বললো শায়ের। বিপরীতে মেহরিমা নদীর জলের মতো শান্ত। অনুভূতি শূন্য চোখে তাকিয়ে থেকে বললো
--কিসের জন্য বাধ্য হবো আমি? কৈফিয়ত দেওয়ার মতো সম্পর্ক আমাদের? নাকি কৈফিয়ত চাওয়ার কোনো অধিকার আছে আপনার?
সামান্য একটা কথা অথচ শায়েরের বুকে অদ্ভুত কাঁপন ধরলো। অস্ফুট স্বরে বললো
--অধিকার..?
--কারণ ব্যতীত পরনারীর হাত ধরেছেন কেনো আপনি? এই বুজি আপনার পুরুষত্ব?
র'ক্তাভ চোখে তাকালো শায়ের। তাতে হাতের চাপ কিছুটা বাড়লো। মেহরিমা কিছু বললো না। শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো শুধু। শায়ের হিসহিসিয়ে বললো
--আপনি আমাকে ইন্ডাইরেক্টলি কাপুরুষ বলছেন?
--না সরাসরিই বলছি।
--আপনি..
--হাত ছাড়ুন।
শেষের দিকে মেহরিমার কন্ঠ টা একটু বেশি ভারী শোনালো। শায়ের ক্ষিপ্ত হয়ে মেহরিমার হাতটা ছুড়ে মা'রলো। পাশে রাখা ডাস্টবিনে একটা লাথি দিয়ে বললো
--ছ্যাহ বালের মেয়ে মানুষ। বালের ভাব দেখায়। বাল বলতে এখানে এসেছি আমি।
সারাদিনের ক্লান্তি,অসুস্থতা,ক্ষুধা,টেনশন সবকিছুর ভার সামলাতে ব্যর্থ হলো মেহরিমা। না চাইতেও কিছুটা টলে উঠলো সে। চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে এলো। দুপা পিছিয়ে পড়তে নিলো অনুভব করলো কেউ তাকে বুকে আগলে নিয়েছে। অতঃপর সবকিছু ছেলে গেলো আঁধারে। অচেতন হয়ে ঢলে পড়লো পুরুষালি বক্ষে। অস্পষ্ট স্বরে বিরবিরালো
--ছোঁবেন না আমায়। ছাড়ুন...
মেহরিমাকে অচেতন হতে দেখে না চাইতে অস্থির হলো কঠোর মানব। সে তো চলেই যাচ্ছিলো তবে কিসের টানে ফিরলো? তখন মেয়েটাকে স্পর্শ করায় বুঝেছিলো মেয়েটার শরীর মাত্রাতিরিক্ত গরম। সেই চিন্তায় কি তবে ফিরে এলো সে?
শায়ের মেহরিমার গালে আলতো চাপড় দিলো। ডাকলো অস্তির হয়ে
--মিস কি হয়েছে আপনার? এই মেয়ে চোখ খুলুন। মিস শুনছেন আমায়? তাকান প্লিজ। আমার ধৈর্য্যর পরীক্ষা নেবেন না মিস। অবাধ্যতা একদম পচ্ছন্দ নয় আমার। চোখ খুলুন।
অথচ অষ্টাদশীর কর্নে সে ডাক পৌঁছলো না। অবাধ্য হয়েই পড়ে রইলো শক্তপোক্ত হৃদয়ের কঠোর মানবের বুকে।