ফন্ট সাইজ:
থিম:
আয় তবে সহচরী

19

লেখক: উম্মে_হাবিবা

বাইরে থেকে তখন ভেসে আসছে মেঘের ক্ষীণ গর্জন । শনশন করে বইছে হাওয়া। দূরের গাছের ডাল থেকে ডানা ঝাপটে উড়ে গেছে এক জোড়া বাদুড়। হুতুম পেঁচা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে আছে নিশাচরের মতো। রাস্তার পাশের কুকুর গুলোও ডাকছে সমস্বরে। নাইটগার্ডের বাঁশির শব্দ আর হসপিটালের ভূতুড়ে নিস্তব্ধতার মধ্যে মনিটারের বিপ বিপ আওয়াজে কিছুটা ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। অথচ এসব অনুভূতির ছিটেফোঁটা ও অনুভব করতে পারছে না অষ্টাদশী রমণী। বোকার মতো ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে সামনে দাঁড়ানো গম্ভীর পুরুষ টার দিকে। যার চেহারা জুড়ে বিরাজ করছে অস্বাভাবিক গম্ভীরতা। ধারালো চোয়াল। তীক্ষ্ণ চোখের চাহনী। হালকা নীল আর হ্যাজেল মিশেলের চোখের মণি জোড়ায় অদ্ভুত রহস্য। লম্বা চুলগুলো কপালের উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এলেমেলো ভাবে। নির্ঘুম রাতের ক্লান্তি কিংবা অবসন্নতা কোনো কিছুই বোঝার উপায় নেই। মেহরিমা পলক বিহীন তাকিয়ে আছে শায়েরের চোখের দিকে। মনোযোগ দিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে গম্ভীর পুরুষের সুশ্রী চেহারা টা। এর আগে যতবার শায়েরের সঙ্গে দেখা হয়েছে মেহরিমা অতোটা খেয়াল দিয়ে দেখে নি তাকে। বিশেষ করে চোখ। ওই অদ্ভুত চোখ দুটো কখনোই খেয়াল করে নি সে। অথচ আজ দেখছে। কেনো যেন দেখতে ভালো লাগছে।

মেহরিমার এই সামান্য মুগ্ধ দৃষ্টি দেখে শায়ের নড়েচড়ে দাঁড়ালো। ভ্রু কুচকে বোঝার চেষ্টা করলো রমণীর অভিব্যক্তি। মনে মনে কিছুটা আনন্দ পেলেও প্রকাশ করলো না। বরং আগের চেয়েও গম্ভীর কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো

--হোয়্যার ইজ ইয়োর সো-কল্ড হাজব্যান্ড?

--আপনার চোখ গুলো এমন ক্রি'মিনাল টাইপ কেনো? আপনি বুঝি জে'ল থেকে পালানো কোনো মিচকে চো'রা ছিলেন?

শায়েরের প্রশ্নের বিপরীতে ফট করেই কথাটা বলে ফেললো মেহরিমা। ঠোঁট টিপে আগ্রহী দৃষ্টিতে অপেক্ষা করলো প্রতিউত্তরের। মেয়েটার থেকে এমন কথা আশা করে নি শায়ের। ফলস্বরূপ বেকুব বোনে ফ্যাল ফ্যাল করে দেখছে মেয়েটাকে। তার যে সৌন্দর্য এই সৌন্দর্য দেখে মেয়েরা তার পিছনে সারাক্ষণ মৌমাছির মতো ঘুরঘুর করে। কথা বলার জন্য মুখিয়ে থাকে। অথচ এই মেয়ে কিনা তাকে চো'র বলে সম্মোধন করছে? আর সেও ভালো মানুষের মতো এসব কথা হজম করছে? শায়েরের নিজের কাছেই নিজেকে অবাক লাগলো। এদিকে ধৈর্য্যহীন মেহরিমা পুনরায় তাগাদা দিয়ে বললো

--কি হলো বলুন?

শায়ের আড়ালে দীর্ঘ শ্বাস ফেললো। নিরেট স্বরে বললো

--আমি জানতাম আপনি ঝ'গরুটে কিন্তু এখন তো দেখছি আপনার মাথায় ব্রেইন ই নেই। যাক ভালো হলো ব্রেইন ও নেই সঙ্গে ব্রেইন ক্যা*ন্সা*রের ভয় ও নেই। এদিক দিয়ে সেইফ আপনি।

ভেংচি কাটলো মেহরিমা। বুকে হাত গুঁজে বললো

--সত্যি কথা বলেছি দেখে গায়ে ফোসকা পড়েছে তো এজন্যই আমাকে ব্রেইনলেস বলে অপমান করতে চাইছেন? বুঝি বুঝি সবই বুঝি।

--হ্যা বুঝে দেশ দুনিয়া উল্টে ফেললেন একেবারে।

শায়ের চেয়ার টেনে পায়ে পা তুলে বসলো। পকেট থেকে সিগারেট বের করে ধরাতে নিলে মেহরিমা বাঁধ সেধে বললো

--হসপিটালের মধ্যে স্মোক করছেন কেনো? জানেন না এতে রোগীর অসুবিধা হয়।

শায়ের আশেপাশে তাকিয়ে রোগী খোঁজার চেষ্টা করলো। ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো

--এখানে রোগী কোথায় পেলেন আপনি? কই আমি তো কাউকে দেখছি না।

--আমাকে দেখে কি রোগী মনে হচ্ছে না আপনার?

--আপনি রোগী?

--তা নয় তো কি। দেখছেন না গায়ে হসপিটালের ড্রেস পড়া,হাতে ক্যানুলা। এসব দেখে আপনি রোগী রোগী ভাইব পাচ্ছেন না?

--দোন্না পাৎসা এ সেন্ৎসা চেরভেল্লো।

শায়ের বাঁকা চোখে তাকিয়ে মেহরিমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখে কথাটা বললো। অতঃপর কিছুই হয়নি এমন ভান করে সিগারেটে মন দিলো। নিকোটিনের ধোয়া উড়িয়ে দিলো কালো মেঘের আড়ালে। ইতোমধ্যে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ঝিরিঝিরি করে পড়ছে বারিধারা। হিমেল হাওয়া এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে দেহ। শীতল করছে মন প্রাণ।

বৃষ্টি দেখে মেহরিমা শায়েরের দিকে আর খেয়াল দিলো না। ফুরফুরে মেজাজে গিয়ে দাঁড়ালো জানলার কাছে। হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দিলো বৃষ্টি বিন্দু কণা। ঠোঁটে তার ঝলমলে হাসি। চেহারায় উজ্জ্বল আলোকরেখা। শেষ কবে এমন ভাবে হেঁসেছে জানা নেই রমণীর। তবে ভোর রাতের এই বৃষ্টি তার ভালো লাগছে। হুট করেই যেন চিন্তা গুলো হুটোপুটি করে পালিয়েছে। মনটা আজ আর ভারী ভারী লাগছে না। অদ্ভুত শূন্যতা ও কাজ করছে না। কোথাও গিয়ে সুখের দোলা তার মনে আনাচে-কানাচে উঁকি দিচ্ছে। অথচ অদ্ভুত এই অনুভূতির সূত্রের সমীকরণ মেলাতে ব্যর্থ রমণী।

শায়ের নিষ্প্রাণ চোখে মেহরিমাকে দেখছে। মেয়েটার হাসি,মুগ্ধ দৃষ্টির মায়া সবকিছু কেমন পরিচিত লাগছে। মানস্পটে ভাসছে চিরচেনা অবয়বের এক টুকরো স্মৃতি। এমনই এক বৃষ্টির দিন। চা বাগানের মাঝে বৃষ্টির জলে মেতে থাকা একাদশী বালিকা। নুপুরের রুমঝুম ক্ষীণ আওয়াজ আর মিষ্টি কন্ঠের সেই আবেদন

--এই যে একা একা দূরে দাঁড়িয়ে আছো কেনো? আসো এক সঙ্গে বৃষ্টি বিলাস করি।

এক মূহুর্তের জন্য শায়েরের মনে হলো তার ফুল তাকে ডাকছে। এইতো তার সামনেই আছে। বৃষ্টির সঙ্গে হেঁসে খেলে আনন্দে মেতে উঠছে। কখনো জলের ফোঁটায় ভিজিয়ে দিচ্ছে তাকে। জলন্ত সিগারেট হাতে রেখেই শায়ের কল্পনায় তার ফুলের সঙ্গে কথা বললো। মেয়েটাকে দেখলো দু'চোখ ভরে। আনমনে ডাকলো

--ফুল

পাশাপাশি থাকায় শায়েরের ধীর স্বরে বলা কথাটাও স্পষ্ট শুনেছে মেহরিমা। কেঁপে উঠেছে তার বক্ষস্থল। তড়িৎ শায়েরের দিকে তাকালে দেখলো ছেলেটা তার দিকেই নরম দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ওই দৃষ্টিতে মেহরিমার মতো ধৈর্য্যশীল মেয়েটাও কিছুটা দূর্বল হলো কী? অস্ফুটে স্বরে বললো

--বন্ধু.....

হাতে সিগারেটের ছ্যাকা লাগতেই নিজ ভাবনা  থেকে ছিটকে বেরিয়ে এলো শায়ের। জ্বলন্ত সিগারেটে অনুভূতিশূন্য চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো। সময় নিয়ে দেখলো ধীরে ধীরে পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া শলাকা। তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটলো তার ঠোঁটে। সিগারেট টা বাইরে ফেলে দিয়ে বিরবিরালো

--আসবে না। ফুল আর কখনোই আসবে না। সবার মতো ওই মেয়েটা ও স্বার্থপর হয়েছে। সারাজীবন পাশে থাকার ওয়াদা দিয়েও ওয়াদা ভ'ঙ্গ করেছে। শী ইজ এ ফাঁ'কিং লায়ার। লায়ার লায়ার লায়ার....

হঠাৎ করে শায়েরের এই পাগলামির মানে বুঝলো না মেহরিমা। অস্থির হয়ে শায়েরের কাছে আসতে নিলে ছেলেটা দুপা পিছিয়ে গেলো। কড়া স্বরে বললো

--আসবেন না। কাছে আসবেন না। দূরে থাকুন। একদমই কাছে আসার চেষ্টা করবেন না।

--কি হয়েছে আপনার? এমন করছেন কেনো?

--এতো প্রশ্ন করছেন কেনো? আমাকে প্রশ্ন করার অধিকার কোথায় পেয়েছেন আপনি?

থমকে গেলো মেহরিমা। মনে পড়লো বিকেলে তার বলা কথা গুলো। সে ও তো এমন ভাবেই শায়েরকে বলেছিলো। কিছুটা অপরাধবোধ কাজ করলো তার মনে। লোকটা তো তাকে সাহায্য করতেই এসেছিলো। আর সে কি না কড়া কথা শুনিয়ে অপমান করলো। আজ যদি লোকটা না থাকতো তাহলে কি হতো তার? কে সাহায্য করতো তাকে? কেউ কি আদোও আসতো নাকি অচেতন অবস্থায় অবহেলিত হয়ে ধুলোময় রাস্তায় পড়ে থাকতো? মেহরিমা জিভে ঠোঁট ভিজিয়ে শুষ্ক ঢোক গিললো। নিচু স্বরে বললো

--আসলে তখন ওভাবে....

মেয়েটার কোনো কথা শোনার প্রয়োজন বোধ করলো না শায়ের। আর না তো একবার ফিরে তাকালো তার দিকে। অস্থিরতায় তার পুরো শরীর কাঁপছে। শীতল পরিবেশেও ঘামছে দরদর করল। তখনও একই ভাবে বিরবির করছে --লায়ার,শী ইজ এ লায়ার। শায়ের রা'গে চেয়ারটায় একটা লাথি মা'রলো। ধুপধাপ পা ফেলে চলে গেলো বাইরে। যাওয়ার আগে উচ্চ শব্দে বন্ধ করলো দরজাটা। কেঁপে উঠলো অষ্টাদশী। আহত দৃষ্টি তে দেখে শুধু গেলো পাষাণ পুরুষের অবয়ব।

*******************
সকালে হসপিটাল থেকে সমস্ত ফর্মালিটি শেষ করে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলো মেহরিমা। বিল গুলো শায়েরই পরিশোধ করেছে। প্রেসক্রিপশনের ঔষধ গুলোও আগে থেকে কিনে তার ব্যাগে রেখে দিয়েছে। মেহরিমা ডক্টরের সঙ্গে কথা বলে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে এলো। ঘড়িতে তখন নয়টা বাইশ। যান্ত্রিক শহরে ইতোমধ্যে মানুষের আনাগোনা শুরু হয়েছে। ব্যস্ত হয়েছে কর্মে যাওয়ার জন্য। মেহরিমা শেষবারের মতো হসপিটালের দিকে তাকালো। সূক্ষ্ম আশা নিয়ে দেখলো আশপাশ। চঞ্চল নয়নে খুঁজলো কাউকে। না পেয়ে হতাশ হলো। বুক চিরে বেরিয়ে এলো চাপা দীর্ঘ শ্বাস।

দূর্বল শরীরে মেহরিমার হাটতে বেশ কষ্ট হচ্ছে। মোবাইলের চার্জ ও শেষ। বাসায় নিশ্চয়ই মা অনেক চিন্তা করছে। তাকে না পেয়ে পুতুল কি রাতে অনেক কান্না করেছিলো? খেয়েছিলো তো মেয়েটা? মেজ আপার ঔষধ গুলো সব ঠিকমতো খাওয়াতে পেরেছে তো আম্মু? নিজের অসুস্থতা ভুলে মেয়েটার মাথায় পরিবারের চিন্তা এসে ভীর করলো। ছটফট করলো দ্রুত বাসায় যাওয়ার জন্য।

হসপিটালের গেটের সামনে এসে দাঁড়ালো সে। এখান থেকে তার বাসা বেশ খানিকটা দূরে। কম করে হলেও একশো টাকার পথ। এই সময়ে রিক্স নিতে গেলেও একশো টাকার বেশি ভাড়া দিতে হবে। অমন চিপা গলির মফস্বলের এলাকায় এমনিতেও গাড়ি সহজে যেতে চায় না। মেয়েটা চিন্তায় পড়লো। ব্যাগ হাতরে খুঁজে পেলো ছেঁড়া পঞ্চাশ টাকার একটা নোট। আর কালকের দেওয়া টিউশনির টাকা। এই টাকা গুলো খরচ করতে পারবে না সে। বাসা ভাড়া দিতে হবে। এই টাকা দিয়েই পানির বিল,বিদ্যুৎ বিল সব পরিশোধ করতে হবে। সবকিছু যে আগে থেকেই হিসাব করা।

অনেক ভেবেও মেয়েটা কোনো উপায় পেলো না। বাধ্য হয়ে দূর্বল শরীরে হাঁটা শুরু করলো। সূর্য তখন মাথার উপর। উত্তপ্ত রোদে জ্বালিয়ে দিচ্ছে সবকিছু। ভোররাতে যে বৃষ্টি হলো তার কোনো অস্তিত্বই রইলো না। মেয়েটা গুটিগুটি পায়ে পথ চলতে লাগলো। মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে শরীরের দূর্বলতা কাটানোর চেষ্টা করলো। একটা দোকানের সামনে এসে একটু পানি খেয়ে বিশ্রাম নিলো। জ্বর টা বোধহয় আবারও আসছে। চোখ দুটো ও জ্বলছে তার। মেহরিমা নিজেকে খুব করে সামলানোর চেষ্টা করলো। জোড়ে জোড়ে শ্বাস নিয়ে সকল ক্লান্তি দূর করতে চাইলো। অথচ বোকা মেয়েটা পারলো না। ক্ষুধার্ত শরীরে অসুস্থতা জেঁকে ধরলো আষ্টেপৃষ্টে।

--সাহসী আপা আপনি এখানে? আর আমি আপনায় হারিকেন জ্বালিয়ে খুঁজে যাচ্ছি?

পুরুষালী আওয়াজ পেয়ে সামনে তাকালো মেহরিমা। তার থেকে কিছুটা দূরে রাহুলকে দেখে অবাক হলো। ছেলেটা এগিয়ে এলো কাছে। মিষ্টি করে হেঁসে বললো

--চলুন আপা আপনাকে এগিয়ে দিয়ে আসি।

চমকে উঠলো মেয়েটা। তরিঘরি করে বললো

--না না তার কোনো প্রয়োজন নেই ভাইয়া। আমি একাই যেতে পারবো।

--আপনি যেতে পারলেও আমাকে যে দায়িত্ব পালন করতেই হবে। নয়তো...

--নয়তো..?

থেমে গেলো ছেলেটা। মেকি হেঁসে বললো

--ওসব বাদ দিন। চলুন আমার সঙ্গে। মনের মধ্যে অস্বস্তি রাখবেন না। মনে করুন আমি আপনার ভাই। একই ভার্সিটি তেই পড়ি। একবার ভরসা করে দেখতেই পারেন।

মেহরিমার অস্বস্তি কমলো না। মাথা নিচু করে বললো

--সাহায্যের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ ভাইয়া। তবে আমি যেতে পারবো না। ক্ষমা করুন।

রাহুল ঠোঁট টিপে কিছু ভাবলো। অতঃপর নির্ধিদ্বায় বললো

--আচ্ছা আমার সঙ্গে যেতে হবে না। তবে একটা রিক্সা ঠিক করে দিলে তো যাবেন? প্লিজ এটাতে অন্তত না করবেন না। প্লিজ..!

মেহরিমার উত্তরের অপেক্ষা করলো না রাহুল। একটা রিক্সা ডেকে মেয়েটাকে জোড় করিয়েই উঠিয়ে দিলো। মেহরিমা নিষেধ করলেও শুনলো না। রিক্সা চালককে তাড়া দিলো যাওয়ার জন্য।

মেহরিমা দৃষ্টি সীমানার বাইরে যেতে রাহুল ফোন বের করলো। নির্দিষ্ট নাম্বারে ছোট করে টেক্সট দিয়ে বললো

--আপা কে সেইফলি রিক্সায় উঠিয়ে দিয়েছি ভাই। চিন্তা কইরো না বিশ্বস্ত লোককেই পাঠিয়েছি।

মেসেজেটা পাঠিয়ে মিটি মিটি হাসলো রাহুল। গুনগুন করে গান ধরলো

~দুনিয়াটা প্রেমেরই কারখানা
হাজার হাজার জ্বলে প্রেমো জ্বালা
যুগে যুগে চলে এই ভালোবাসা
সবাই বলে প্রেম সর্বনাশা~

হাসতে হাসতে হেলেদুলে বাইকের কাছে চলে গেলো রাহুল। মাথায় হেলমেট পড়তে পড়তে বললো

--ফাঁ*সছে রে ফাঁ*সছে। অবশেষে ভাই আমার প্রেমের জালে ফাঁ*সছে। হবু ভাবীর বউ হয়ে আসার দিন ঘনিয়ে আসছে।

**************************
ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে পাকিস্তানি সিরিয়াল দেখছে শায়েরী। কোলেই চুপটি করে শুয়ে আছে দাবিয়া। টেবিলের উপর একগাদা চিপস আর কোল্ড ড্রিংস নিয়ে বসেছে সে। মনোযোগ সব টিভিতে। আপাতত সেখানে নায়ক নায়কার বিচ্ছেদের সিন দেখানো হচ্ছে। জোড় করে নায়িকাকে বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে তার পরিবার। বেচারা নায়কেও মে'রে আধমরা বানিয়ে ফেলেছে। বলদ নায়ক সেসব মা'র বসে বসে খেয়েছে। এই নিয়েই মেয়েটার মেজাজ খারাপ। শায়েরী কোল্ড ড্রিংস খেতে গিয়ে নাকমুখ কুচকে ফেললো। টিভির দিকে তাকিয়ে অসন্তুষ্টি নিয়ে বিরবির করলো

--ধূর মুডটাই ন'ষ্ট হয়ে গেলো। ছাগল ব্যাডা তুই হলি নায়ক। তোকে হতে হবে প্রতিবাদী,অসীম সাহসী। আর শেষমেশ তুই হলি কি না ভীতু? ছ্যাহ ছ্যাহ জাহান্নামে যা তুই। অমন সুন্দরী রমণী তোর মতো ভেড়ার কপালে নেই। ইদুরের তিন নম্বর ছাও একটা। এমন ভীতু মন নিয়ে প্রেম করতে কে বলেছিলো রে তোকে? ওর থেকে তো এই নাক উঁচু গম্ভীর ভিলেনই পারফেক্ট। কেমন জোড় জবরদস্তি করে নিজের ভালোবাসাকে আপন করে নিচ্ছে।

--মানুষের প্রেম ভালোবাসাও এখন তোর থেকে পারমিশন নিয়ে করতে হবে নাকি?

--অবশ্যই নইলে...

কথা শেষ করতে পারলো না রমণী। তূরন্ত পাশ ফিরে রোহানকে দেখে ভয়ে হেঁচকি উঠে গেলো। রোহানের দৃষ্টি শায়েরীর কোলে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দাবিয়াকে দেখছে সে। শায়েরী রোহানের অমন দৃষ্টি দেখে দাবিয়াকে দু হাতে বুকে আগলে নিলো। মেকি হেঁসে বললো

--দাবিয়াকে শ্যাম্পু দিয়ে গোসল করিয়েছি তো রোহান ভাই। একটু ও নোংরা নেয় ওর গায়ে।

রোহান সেসব কথা কানে তুললো না। গাম্ভীর্যের সাথে বললো

--ভার্সিটি নেই তোর? এখনও ঘরে বসে কি করছিস তুই?

মূহুর্তেই জিভ কামড়ালো মেয়েটা। মাথা ব্যাথার ভান ধরে বললো

--মাথা টা প্রচন্ড ধরেছে রোহান ভাই। আল্লাহ উঠে দাঁড়াতেও পারছি না। কেমন গোল গোল করে ঘুরছে সব।

সরু চোখে মেয়েটাকে অবলোকন করলো রোহান। মেয়েটার অভিনয় দেখে ফোঁস করে শ্বাস ফেললো। বিতৃষ্ণা নিয়ে বললো

--ফাঁকি বাজি আর তুই দুজনেই একে অপরের মাসতুতো ভাই বোন। তবে অভিনয়ে এতো কাঁচা হলে তো সমস্যা সেতু। পরের বার ভালো করে প্র্যাকটিস করে আছিস। নয়তো মান সম্মান খোয়ানোর ভয় আছে।

--এভাবে বলছো কেনো রোহান ভাই। সত্যিই অসুস্থ লাগছে।

--তাহলে টিভির সামনে কি করিস? তোর তো এখন বিছানায় টান টান হয়ে শুয়ে থাকার কথা।

ভরকে গেলো মেয়েটা। আমতা আমতা করে বললো

--আসলে মানে...

--অজুহাত বাদ দিয়ে পড়তে বস। সামনেই সেমিস্টার। ফেল করলে সোজা মুচির সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দেবো।

ভেংচি কাটলো মেয়েটা। মনে মনে বললো

--হুহ যতসব ভাবের কথা। মুচির সঙ্গে বিয়ে দিবে। আগে দিয়ে নাও তারপর বইলো।

--কি ভাবছিস?

--কই কিছু না তো।

--শায়েরী আমার রুমে আয়।

দোলা বেগমের ডাকে নড়েচড়ে বসে শায়েরী। সচরাচর মা তাকে ডাকে না। খুব প্রয়োজন হলে তবেই ডাকে। আজ হঠাৎ ডাকছে কেনো? কোনো বিশেষ কারণ নয়তো। মেয়েটার ভাবনার মাঝে পুনরায় ভেসে এলো দোলা বেগমের খিটখিটে আওয়াজ

--শায়েরী ডেকেছি তোকে। আমি আসলে কিন্তু মা'র একটাও মাটিতে পড়বে না।

চমকে উঠলো মেয়েটা। দাবিয়াকে সোফায় রেখেই ছুটলো মায়ের ঘরে। রোহান মেয়েটার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। অতঃপর নজর দিলো দাবিয়ার দিকে। বিড়াল টাকে কোলে নিয়ে বাঁকা হেসে বললো

--চল বাপ আজ তোর সুন্নতে খাৎনা দিয়েই ছাড়বো। নইলে তোর শিক্ষা হবে না।

--মিউ মিউ

--যতই ডাক কোনো কাজ হবে না। ছেচড়া বিড়াল সেদিন মা'র খেয়েও লজ্জা হয়নি। ঘুরে ফিরে সেই আমার বউয়ের কোলে রাজত্ব চালাস তুই? আজ তোর হচ্ছে।

দাবিয়াকে কোলে নিয়েই উপরে চলে গেলো রোহান। অন্যদিকে বদ্ধ দরজার আড়ালে বোনা হলো সূক্ষ্ম পরিকল্পনা। যার ভুক্তভুগী হলো সরল মেয়েটা। কোনো কারণ ছাড়াই বিনা দোষে ব'লির পা'ঠা বানানোর নিখুঁত ছক তৈরি করলো তার জন্মদাত্রী নিজেই।

****************************************
ক্লান্ত শরীর নিয়ে মাত্রই বাড়ি ফিরলো মেহরিমা। বাইরে থেকে বার দুয়েক শাহিদা নেওয়াজকে ডাকলেও সাড়া পেলো না। অগত্যা নিজেই ব্যাগ রাখতে ঘরে এলো। বিছানায় তখন পুতুল বসে খেলছে। মেহরিমাকে দেখেই গালভরে হাসলো মেয়েটা। দৌড়ে গিয়ে কোলে উঠলো। মেহরিমার গালে চুমু দিয়ে বললো

--তুমি এতেতো মাম।

মেহরিমা নিজেও পুতুলকে শক্ত করে বুকে আগলে নিয়েছে অস্থির মনটা তাতেই কিছুটা শান্ত হয়েছে। পুতুলের গালে চুমু দিয়ে বললো

--এসেছি তো। তুমি মামকে মিস করছিলে?

--হুম উন্নেককক মিত কলেতি।

--রাতে খেয়েছিলে?

--খেয়েতি।

--এখন খেয়েছো?

--হু

--তোমার বু কোথায়?

--দানি না।

পুতুল মেহরিমার বুকে চুপটি করে পড়ে রইলো। একদিন পর মামকে কাছে পেয়ে আকাশের চাঁদ পাওয়ার মতো আনন্দ হচ্ছে তার। পুতুল মেহরিমার বুকে মাথা রেখেই বললো

--মাম দানো তি হইতে?

--কি হয়েছে আম্মু?

--বু কান্না কলিচে। পুতু ও কান্না কলিচি। খুকু মা ও কেদিচে। তবাই কেদেচি। কত্তু পেয়েচি।

মেহরিমার বুকটা ভার হলো এতেই। সে জানতো এমন কিছুই হবে। ফোঁস করে একটা শ্বাস ফেললো। পুতুলের মাথায় চুমু একে বললো

--আর কাঁদতে হবে না। মাম এসে গেছি তো সোনা।

--তুমি আল হালিয়ে দাবে না তো?

--কোথায় হারিয়ে যাবো আমি? পুতুল সোনা কে রেখে কি হারিয়ে যাওয়া যায় বলো?

পুতুল চুপ করে শুনলো। দু হাতে জড়িয়ে রাখলো মেহরিমার গলা। মেহরিমা পুতুলকে নিয়েই বিছানায় বসলো। হুট করেই কি সে দূর্বল হয়ে পড়ছে? এভাবে চললে তো হবে না। আজকে কাজে যেতে না পারলেও কাল থেকে তো যেতে হবে। এমন অসুস্থ হয়ে পড়লে কাজ করবে কেমন করে সে?

--মেহের।

মায়ের ডাকে মাথা তুললো মেহরিমা। শাহিদা নেওয়াজ মেয়ের দিকে গম্ভীর চোখে তাকিয়ে আছে। মেহরিমা মায়ের ওই দৃষ্টির মানে বুঝলো না। জানতে চাই ধীম স্বরে

--কিছু হয়েছে আম্মু?

শাহিদা নেওয়াজ উত্তর দিলো না। হুট করে এসেই মেয়ের গা'লে এক চ'ড় বসিয়ে দিলেন। চেচিয়ে বললেন

--সারা রাত ন*ষ্টামি করে এখন ফিরে এসেছিস কেনো তুই? যা বেরিয়ে যা এই ঘর থেকে। কোনো ন*ষ্টা মেয়ের মা আমি নই। কেনো ফিরে এসেছিস? ওর থেকে মরে যেতে পারিস নি। বেহায়া, নির্লজ্জ মেয়ে কোথাকার। সারারাত পর পুরুষের সঙ্গে কাটিয়ে এখন ন্যাকা সাজা হচ্ছে।

অসুস্থতা ও মেহরিমাকে এতোটা দূর্বল করতে পারে নি যতটা পেরেছে মায়ের বলা এই কথা গুলো।
শাহিদা নেওয়াজের এই কথা গুলোই ধারালো ছু'রির ন্যায় বিদ্ধ হয়েছে তার হৃদয়ে। হাজারো সূচের খোঁচায় ক্ষ"তবিক্ষত করেছে মন। র'ক্ত ক্ষরণ হচ্ছে হৃদয়ে। শক্ত মেয়েটার বুকটা আজ অস্বাভাবিক ভাবে ভাড় হয়েছে। কেঁপেছে বক্ষস্থল। অনুভূতিশূন্য চোখে দেখছে মাকে। ঢোক গিলতেও কষ্ট হচ্ছে মেয়েটার। মেহরিমা শূন্য চোখে তাকিয়ে দেখছে মায়ের রাগান্বিত মুখটা। অজান্তেই চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ছে পানি। অসুস্থতা, মানসিক আ*ঘাত আবারও দূর্বল করে তুলছে মেয়েটার স্নায়ুতন্ত্র। তবে মেহরিমা এখন আর অচেতন হতে পারলো না। পাথড় হয়ে বসে রইলো বিছানায়। পুতুল ভয়ে গুটিসুটি মেরে মেহরিমার বুকে মুখ লুকিয়েছে অনেক আগে। অষ্টাদশী মেয়েটা বলতে চাইলো অনেক কিছু। অথচ পারলো না। শব্দরাও বুঝি আজ ফুরিয়েছে? অবচেতন মনে অস্ফুটে স্বরে শুধু বললো

--আমি চরিত্র*হীন নই..!

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে 19 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন