ফন্ট সাইজ:
থিম:
আয় তবে সহচরী

20

লেখক: উম্মে_হাবিবা

হসপিটালের করিডোরের এক কোণায় বি'ধস্ত অবস্থায় বসে আছে বশির আনসারী। চোখ দুটো র'ক্তিম। হাস্যেজ্জ্বল মানুষটার মুখ জুড়ে আজ মলিনতার ছাপ। কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে বয়স যেন বেড়েছে দ্বিগুন। বিষন্ন চোখ জোড়া বারবার দেখছে অপারেশন রুমের বন্ধ দরজা টা। অপেক্ষা করছে ভালো সংবাদ শোনার জন্য।

মীর ধীর কদমে এসে বসলো বশির আনসারীর পাশের চেয়ারে। ওনার কাঁধে হাত রেখে নিচু স্বরে বললো

--একটু কিছু খেয়ে নাও দাদু। এমন করলে তো তুমিও অসুস্থ হয়ে পড়বে। তখন কাকে রেখে কাকে সামলাবো বলো তো?

বশির আনসারী ভেজা চোখে মীরের দিকে তাকালো। বুঁজে আসা স্বরে বললো

--আমার দাদু ভাই ওই রুমে। মৃ'ত্যুর সঙ্গে লড়ছে। কতক্ষণ হয়ে গেলো ওকে নিয়ে গেছে অথচ এখনও বের করছে না। এতো দেরি করছে কেনো মীর? ছেলেটাকে সুস্থ ভাবে না দেখা পর্যন্ত আমার যে গলা দিয়ে পানি টুকুও নামবে না ভাই। তুমি আমাকে জোড় করো না।

মীরের চোখ জোড়াও লাল হয়ে ফুলে গেছে। বোঝাই যাচ্ছে আড়ালে এই ছেলে কেঁদেছে বেশ। তবুও পরিস্থিতি সামলাতে নিজেকে কঠোর রাখছে। ভেতরে ভেতরে প্রিয় বন্ধু, প্রিয় ভাইয়ের চিন্তায় অস্থির হলেও কাউকে বুঝতে দিচ্ছে না। হসপিটালের সকল কাজ নিজে সামলাচ্ছে।

মীর অন্যপাশে ঘুরে চোখের কোণে জমা হওয়া অশ্রু টুকু মুছলো। বশির আনসারীর হাতে হাত রেখে শান্ত কন্ঠে বললো

--তুমি যদি এখন না খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ো তখন আমার কি হবে জানো? তোমার ওই নাক উঁচু নাতি আমাকে উল্টো করে ঝুলিয়ে পি'টাবে। বলবে তুই থাকতেও দাদু অসুস্থ হলো কিভাবে? খেয়াল রাখতে পারিস নি। তখন আমি কি বলবো তোমার ওই ঝগ*ড়ুটে নাতিকে? তুমি কি চাও তোমার ওই বডি বিল্ডার গম্ভীর নাতির কাছে মা'র খেয়ে আমার এই সুন্দর চেহারা ভচকে যাক? চেহারা পাল্টে গেলে তখন তো কোনো মেয়ে আমাকে পাত্তা দিবে না দাদু। জেনে শুনে কেনো নাতিবউ হারাতে চাইছো বাপু। টুকুস করে কিছু খেয়ে নাও তো।

বশির আনসারী মাথা নিচু করে রইলো। কিছু বললো না। মীর নিজেই বললো

--একটু অপেক্ষা করো আমি এক্ষুনি তোমার জন্য কিছু ফ্রুট সালাদ আনছি।

ছেলেটা দ্রুত পায়ে চলে গেলো। বশির আনসারী তখনও মাথানিচু করে বসে আছে। চোখ জোড়ায় টলমল করছে অশ্রু। বৃদ্ধ নিজ মনে বিরবির করলো

--কপাল পো'ড়া ছেলেটাকে আর কত ক'ষ্ট দিবা মাবুদ? ছোট থেকেই তো ক'ষ্ট পেয়ে আসছে। জন্মের পর সামান্য একফোঁটা দুধের জন্য কেঁদেছ,মায়ের উষ্ম স্পর্শের জন্য ছটফট করেছে। মা-বাবার ভালোবাসা ছাড়া বেড়ে উঠেছে। রাতের পর রাত ক্ষুধার য'ন্ত্রনায় কেঁদেছে। দুদিনের বাচ্চা ফর্মূলা দুধ খেতে না পেরে অসুস্থ হয়ে হসপিটালে ভর্তি হয়েছে। মায়ের কড়া শাসন, বাবার শাসন,অবহেলা,তুচ্ছ তাচ্ছিল্য ছাড়া কখনো সামান্য পরিমান মমতাও পায় নি। এক আমাকে আঁকড়ে ধরে বেড়ে উঠেছে। কেউ না জানলেও আমি জানি বাবা মায়ের সামান্য ভালোবাসা পাওয়ার জন্য কেমন করে ছটফট করেছে আমার নীড়। বালিশে মুখ গুঁজে গুমরে গুমরে কেঁদেছে। ওর সেই কান্নায় বুক ভারী হয়েছে আমার। অপরাধবোধ জেগেছে অন্তরে। হাজার চেষ্টা করেও আমার ছোট্ট নীড়ের হৃদয়ে জমা হওয়া শূন্যতা আমি পূর্ণ করতে পারি নি। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ছেলেটা নমনীয়তা হারিয়েছে। মানুষের সামনে নিজেকে বানিয়েছে ক'ঠোর। সবাই ওর ক'ঠোরতা,বেপরোয়া স্বভাব,উশৃং'খল জীবনের জন্য কটু কথা শোনালেও আমি জানি আমার নীড়ের মনে এখনও কোমলতা আছে,অন্যের দুঃখ দেখলে এখনও ছেলেটার অন্তর কাঁদে। শুধু প্রকাশ করে না। আল্লাহ গো আমার নীড় জেনে-বুঝে কখনো কারোর ক্ষ'তি করে নি। কাউকে ক'ষ্ট দেয়নি তবে সবসময় কেনো আমার দাদুভাই এমন ক'ষ্ট পায়? বিপদ কেনো ওর পিছু ছাড়ে না? আমার সোনা বাচ্চা টাকে আর ক'ষ্ট দিও না মাবুদ। আমার দাদুকে আমার বুকে ফিরিয়ে দাও। ফিরিয়ে দাও খোদা। ফিরিয়ে দাও।

বৃদ্ধ বশির আনসারী ঝরঝর করে নিজের চোখের পানি ছেড়ে দিলেন। রবের দরবারে শায়েরের জন্য দোয়া করলেন। ছেলেটাকে সুস্থ ভাবে তার কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার আকুতি করলেন। খুব করে চাইলেন তার নীড় তার কাছে ফিরে আসুক। ঠিক মতো ঔষধ না খাওয়ার জন্য তাকে বকুক। মন খারাপ হলে তার বুকে আশ্রয় নিক। তার শায়ের আবারও তার বুকে ফিরে আসুক।

********************************
পুরো ঘর জুড়ে অস্থির ভঙ্গিতে পায়চারি করছে রাহুল। সকাল থেকে শায়ের ফোন তুলছে না। মীর,রোহান,শায়েরী কাউকেই ফোনে পাচ্ছে না সপ। এমনকি বশির আনসারীর ফোনে কল দিয়েও কোনো সুরাহা মেলেনি ছেলেটার। সর্বোপরী কেউই তার ফোন তুলছে না। কারোর থেকে শায়েরের খবরও জানতে পারছে না। ইতোমধ্যে ছেলেটা তাদের গ্রুপের সকলের কাছে কল দিয়ে শায়েরের খোঁজ জানার চেষ্টা করেছে। কিন্তু ফলাফল শূন্য। এই নিয়ে ছেলেটার চিন্তার শেষ নেই। তার ভাই তো কখনো এমন করে না। তাকে না বলে কোথাও যায় না। কোথাও গেলে তাকে সঙ্গে নেয় নয়তো বলে যায় কোথায় যাচ্ছে অথচ আজ কোনো খোঁজই নেই। ভোরের দিকে শুধু একটা টেক্সট পেয়েছিলো এরপর থেকে আর সংযোগ পাওয়া যাচ্ছে না। যতবারই কন্ট্রাক করার চেষ্টা করেছে ততবারই ব্যর্থ হচ্ছে ছেলেটা।

চিন্তিত রাহুল দিশা না পেয়ে অবশেষে ফোন করলো রোজিনা বেগমের নাম্বারে। কিছুটা আশা নিয়ে অপেক্ষা করলো। কিন্তু তার আশাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ওনার ফোন টাও বাজতে বাজতে কেটে গেলো। পরপর বেশ কয়েকবার দিলো কিন্তু কেউ রিসিভ করলো না।

রাহুলের এখন নিজেকেই পা'গল পা'গল লাগছে। ফোনটা পাশে রেখে দু'হাতে মুখ ঢেকে ফেললো ছেলেটা। মনটা অস্থির অস্থির লাগছে। বিরবির করে আওড়ালো

--কোথায় তুমি ভাই? তোমার কোনো খোঁজ পাচ্ছি না কেনো? দ্রুত বাসায় ফিরে আসো ভাই। তোমাকে ছাড়া দম বন্ধ লাগছে আমার। ফিরে এসো ভাই। জলদি ফিরে এসো।

রাহুল কিছু একটা ভেবে উঠে দাঁড়ালো। পা বাড়ালো বাইরের দিকে। এখন এটাই লাস্ট অপশন। যদি কোনো তথ্য পাওয়া যায় শায়েরে সম্পর্কে।

সন্ধ্যার রুমের সামনে এসে দাঁড়ালো রাহুল। ইতস্ততা দিয়ে দুবার দরজায় টোকা দিলো। কিন্তু ভেতর থেকে কোনো সাড়া পেলো না। রাহুল আরো দুবার টোকা দিলো। অথচ সন্ধ্যার কোনো সাড়াশব্দ নেই। বিরক্ত হলো ছেলেটা। নিজ মনে আওড়ালে

--মিস মা'মলা ওয়ালীকে কাজের সময় কখনো পাওয়া যাবে না। আমড়া কাঠের ঢেকি একটা,আল্লাহ জানে আবার কোনো অঘটন ঘটানোর মতলব করছে?

বিরক্ত হয়ে রাহুল নিজেই দরজা খুললো। সন্ধ্যাকে ডাকতে যাবে তার আগেই সামনের দৃশ্য দেখে থমকে গেলো সে। হতবাক, হতবুদ্ধি,বাকরুদ্ধ হয়ে বোকার মতো ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো সামনের দিকে।

ফ্লোরে সাজুগুজুর সব মেকাপ প্রোডাক্ট নিয়ে বসে আছে সন্ধ্যা। কানে হেডফোন দেওয়া। হয়তো উচ্চ শব্দে গান শুনছে। মাঝে মাঝে গানের তালে দুলছে সে নিজেই। হাতের মাঝে একটা তেলাপোকা নিয়ে তার পাখায় যত্ন করে একে দিচ্ছে নেলপলিশের প্রলেপ। প্রথমে লাল এরপর কালো সাদার ফোঁটা ফোঁটা ডিজাইন। আইলাইনারের সাহায্যে তেলাপোকার পায়ে ছোট্ট ছোট্ট গোল আঁকছে। মাসকারা দিলো লম্বা দাড়িতে। কড়া লাল রঙা লিপস্টিক মাখালো তেলাপোকার মাথার কাছে। পুরো কাজ শেষ করে মেয়েটা বড় করে একটা শ্বাস ফেললো। তেলাপোকা টাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে সন্তুষ্টি হাসলো। গর্বিত স্বরে বললো

--পারফেক্ট। এই বার মনে হচ্ছে তুমি একটা প্রিটি পোকা। হায় কি সুন্দর লাগছে। পুরাই ফুলেছা বানু।

মেয়েটা তেলাপোকা টাকে ফ্লোরে ছেড়ে দিলো। অতিরিক্ত নেলপলিশের ভারে পোকাটা হেলেদুলে পড়তে নিলেও দাঁড়ালো না। মুক্তি পেতেই ছুট্টে পালালো। বেচারা পোকাটা যদি কথা বলতে পারতো তাহলে হয়তো সন্ধ্যার উদ্দেশ্যে বলতো

--ক্ষমা দে মা। জীবন থাকতে তোর সামনে আর আসব না। জনমের শিক্ষা হয়েছে আজ।

সন্ধ্যা ফ্লোর থেকে সবকিছু তুলে ড্রেসিং টেবিলের উপর রাখলো। কান থেকে হেডফোন খুলে ছুড়ে মা'রলো বিছানার উপর। ছেড়ে রাখা চুল গুলো হাত খোপা করতে করতে পিছু ফিরে দরজার সামনে রাহুলকে স্ট্যাচু হয়ে দাড়িয়ে থাকতে দেখে ভ্রু কুচকে ফেললো। বিছানার উপর রাখা কলমটা দিয়েই চুল বাঁধলো। রাহুলের সামনে দাঁড়িয়ে বুকে হাত গুঁজে বললো

--কি ব্যাপার মি. লু্ল্লু প্রাণী ওরফে ঝন্টু মিয়া। আমার রুমের সামনে এমন রোবটের মতো দাঁড়িয়ে আছেন কেনো? মতলব কি হুম?

রাহুল ত্যাছড়া নজরে তাকালো সন্ধ্যার দিকে। মেয়েটা একটু আগে তেলাপোকা ধরেছে এটা মনে পড়তেই নাক মুখ কুচকে ফেললো৷ ছিটকে সরে গেলো পেছনে। খেক করে বললো

--এই মেয়ে আপনি কি আদোও মানুষ?

--না আমি রা*ক্ষসী। আপনার ঘা'ড় মট'কে কলিজা ভাজা ভাজা করতে এসেছি। সুইট করে কাছে আসুন প্র্যাক্টিক্যালি করে দেখায়।

মুখটাকে বাংলার পাঁচের মতো করে ফেললো রাহুল। বিতৃষ্ণা নিয়ে বললো

--আগে ওয়াশরুমে দৌড়ান। এরপর গুনে গুনে সাতবার হ্যান্ডওয়াশ দিয়ে ঘসে ঘসে হাত ধুবেন। নয়তো আজকে রান্নাঘরে যাওয়া তো দূর এই ঘর থেকেও বের হতে দেবো না আপনাকে।

রাহুলকে এভাবে নাকমুখ সিটকাতে দেখে মজা পেলো সন্ধ্যা। পিলপিল পায়ে কিছুটা এগিয়ে গেলো রাহুলের দিকে। মাথাটা কিছুটা সামনে ঝুঁকিয়ে ফিসফিসিয়ে বললো

--আপনার দেখছি কঠিন সূচী বায়ুর রোগ আছে। এমন হলে তো চলবে না মি.। আপনাকে হতে হবে আমার মতো। লাইক সন্ধ্যা'স বিলাভড জাওজ। ইউ্য গট ইট।

--জাওজ মিনস..?

কিছুটা কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলো রাহুল। সন্ধ্যা গালে জিভ ঠেলে হাসলো। মাথাটা কিছুটা ডান দিকে হেলিয়ে অদ্ভুত নজরে দেখলো রাহুলকে এরপর ধীম স্বরে আওড়ালো

--জাওজ মিনস...

মাঝপথেই রাহুলের ফোনটা বেজে উঠলো। ছেলেটা ব্যস্ত চোখে স্ক্রিনে দেখলো। মীরের নম্বর দেখেই চোখ মুখ চকচক করে উঠলো। রিসিভ করে ছটফটে স্বরে বললো

--ভাই কই তুমি? এতোক্ষণ আমার ফোন রিসিভ করেছিলেনা কেনো? আর শায়ের ভাই কি তোমার সঙ্গে? সকাল থেকে ফোনে পাচ্ছি না যে।

ফোনের ওপাশ থেকে কিছু বললো মীর। ধীরে ধীরে ছেলেটার ঠোঁটের হাসি মিলিয়ে গেলো। চোখ মুখের রং পাল্টে হলো ফ্যাকাশে। রাহুল ফোন কানে নিয়েই ছুটলো দরজার দিকে। ঘর থেকে বাইকের চাবি নিয়ে একপ্রকার দৌড়ালো সদর দরজার দিকে। বাতাসের সঙ্গে শুধু ভেসে এলো রাহুলের ভারী স্বর

--একটুু অপেক্ষা করো ভাই আমি আসছি। কত র'ক্ত লাগবে আমার শরীর থেকে নিও। তবুও ভাইয়ের কিছু...

আর শুনতে পেলো না সন্ধ্যা। রাহুল তাকে ঘরে রেখেই দরজা লক করে চলে গেলো। পুরোটা সময় মেয়েটা শুধু কপাল কুচকে রাহুলের কান্ডকারখানা দেখতে লাগলো। অতঃপর ফিসফিস করে বললো

--জাওজ মিনস ইউ্য আর মাইন মি.হাফ রেডিও। বাট হোয়্যার ডিড ইউ্য রাশ অফ টু লাইক দ্যাট? হু নিডস ব্লাড? শায়ের ভাই..?

****************************************
অপরাধীর নজরে মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছে শাহিদা নেওয়াজ। কিছুক্ষণ আগেই এক প্রতিবেশীর থেকে শুনেছে মেহরিমা নাকি কাল সারারাত হসপিটালে ভর্তি ছিলো। কিন্তু মেহরিমার অতিরিক্ত জ্বর আর নিজ কাজে ব্যস্ত থাকায় তখন তিনি দেখা করতে যেতে পারেন নি। আর না তো পেরেছে শাহিদা নেওয়াজকে কোনো খোঁজ খবর দিতে। ফিরলেন এই একটু আগেই। আর এসেই সবার আগে খবর দিতে ছুটেছেন শাহিদা নেওয়াজকে।

প্রতিবেশীর মুখে উক্ত কথা শোনার পর থেকে অপরাধবোধে পু'ড়ছে শাহিদা। ছলছলে চোখে দখছে মেয়েটাকে। ভয়, চিন্তা, অস্থিরতা সেই সঙ্গে প্রতিবেশীদের খোঁচা মূলক কথা সবমিলিয়ে মিশ্র এক অনুভূতির সৃষ্টি হয়েছিলো তার। ফলস্বরূপ মেহরিমা বাসায় ফিরতে হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে মেয়েটাকে মে'রে বসেন তিনি। যা নয় তাই বলে ফেলেছিলো। অথচ এখন সেগুলো মনে পড়লেই হৃদয়ে র'ক্ত ক্ষরণ হচ্ছে তার। মেয়েকে অবিশ্বাস করার অপরাধে সে কখনোই নিজেকো ক্ষমা করতে পারবে না। সে তো জানে তার মেয়ে কেমন? তাদের জন্য কত কষ্ট করে? নিজে না খেয়ে তাদের খাওয়াই। এক কালের সাজগোছ আর বিলাসিতাগ গা ভাসানো মেয়েটা তার এখন নিজের যত্ন ও নেয় না। এতোটুকু বয়সে সংসারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। তাহলে সে কিভাবে তার অমন নিষ্পাপ মেয়েকে অবিশ্বাস করতে পারলো? একবারের জন্য ও মেয়েটার ক্লান্ত,মলিন চেহারা টা নজরে পড়লো না?

শাহিদা নেওয়াজ মেহরিমা দিকে আড়চোখে তাকালো। মেহরিমা পুতুলকে খাইয়ে দিচ্ছে। মুখটা অস্বাভাবিক শান্ত। তখন থেকে এই পর্যন্ত একটা কথাও বলে নি। কেমন চুপ হয়ে গেছে। শাহিদা নেওয়াজ কান্না আটকানোর চেষ্টা করলো। ডাকলো মেয়েকে

--ও মেহের

মেহরিমা শান্ত চোখে তাকালো শুধু। এরপর ছোট করে বললো

--ব্যাগে টাকা রাখা আছে বাড়িওয়ালা কে দিয়ে এসো।

এরপর আবারও মন দিলো পুতুলকে খাওয়ানোয়। মেয়ের নির্লিপ্ততা দেখে শাহিদা নেওয়াজ কান্না বাড়লো যেন। ভেজা স্বরে বললো

--মায়ের সঙ্গে কথা বলবি না?

--বলবো না কেনো? বলছি তো।

--প্রয়োজন ব্যতীত একটা কথাও বলছিস না। খুব বেশি কষ্ট পেয়েছিস কি? মা বুঝি বেশি কষ্ট দিয়ে ফেলেছে?

এ যাত্রায় মেহরিমা হাসলো। নিষ্প্রাণ তিক্ত হাসি। মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বললো

--শেষ পর্যন্ত তুমিও আমাকে অবিশ্বাস করলে আম্মু? তোমার বড় মেয়ের মতো আমার গায়ে চরিত্রহীনের ট্যাগ লাগিয়ে দিলে?

মেহরিমার এই শান্ত কথায় শাহিদা নেওয়াজের বুক কেঁপে উঠলো। তরিঘরি করে মেয়ের কাছে যেতে নিলে মেহরিমা উঠে দাঁড়ালো। পুতুলকে কোলে নিয়ে প্লেটে খাবার বেড়ে চলে গেলো জেসমিনের ঘরে।

জেসমিনের ঘরে এসে বুকের ভেতর জমা হওয়া দীর্ঘ শ্বাস ছাড়লো মেহরিমা। পুতুল কে কোল থেকে নামিয়ে দিলে মেয়েটা দৌড়ে সামনে গেলো। জেসমিনে গলা জড়িয়ে ডাকলো আদুরে স্বরে

--খুকু মা

জেসমিন মিষ্টি করে হাসলো। পুতুলকে দু'হাতে জড়িয়ে ধরে নিজের বুকের সঙ্গে মিশিয়ে নিলো। মাথার তালুতে একটা চুমু দিয়ে বললো

--পুতুল রাণী আজকে এতো দেরি করে আসলো কেনো খুকু মায়ের কাছে? সে কি আর খুকু মাকে ভালোবাসে না?

পুতুল ডাগর ডাগর চোখ জোড়া দিয়ে দেখলো জেসমিনের মুখটা। নিজের ছোট্ট দু'হাতে জেসমিনের গালে হাত রেখে ঠোঁট উল্টে নালিশ জানালো

--খুকু মা দানো তি হইচে?

--কি হয়েছে পুতুল রাণী?

--বু মামকে মেলিচে। এ কানে এই গানে। থাচ কলে মালিচে। মাম কত্তু পেয়িচে খুকু মা। মামকে আদল কলে দাও তো।

--কি বলছো পুতুল রাণী আমার ছুটকি কে মে'রেছে? কেনো মে'রেছে?

ঠোঁট উল্টালো পুতুল। জেসমিনের কোলে রাখা পুতুলকে তুলে নিলো। জেসমিনের মতো সে নিজেও পুতুলকে আদর করলো। খিলখিল করে হেঁসে বললো

--খুকু মা দেকো খুকুবাই হাসে। মিত্তি মিত্তি হাসে।

--কই দেখি দেখি খোকা সোনা তার বনুর কোলে গিয়ে কেমন আনন্দ করছে? আল্লাহ কত সুন্দর হাসছে। বোনকে পেয়ে খুশি হয়ে গেছে খোকা সোনা।

পুতুল নিজেই ব্যস্ত হয়ে পড়লো প্রাণহীন পুতুলকে নিয়ে। জেসমিনের দেখাদেখি সে নিজেও পুতুলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো। আদর করলো। বুকে জড়িয়ে ঘুম পাড়ালো। মিথ্যা মিথ্যা খাইয়ে দিলো। যেমন টা জেসমিন করে। ঠিক তেমন ভাবেই সব করলো। মেহরিমা নরম চোখে দেখলো দু'জনকে। কোথাও একটু ভালোলাগা কাজ করলো মেয়েটা অল্পবিস্তর হাসলো। খেলার মাঝে পুতুল মেহরিমার দিকে তাকালো। হাতের ইশারায় ডেকে বললো

--মাম ইকানে এচো। খুকুবাইকে আদল দাও। এচো এচো।

জেসমিন নিজেও তাকালো। বোনকে দেখে মিষ্টি করে হাসলো। একহাত বাড়িয়ে দিয়ে বললো

--ও ছুটকি দাঁড়িয়ে আছিস কেনো? আমার কাছে আয় দেখি একটু আদর করে দেয়।

মেহরিমা ছোট ছোট কদমে বোনের পাশে গিয়ে বসলো। আলগোছে মাথা রাখলো বোনের বুকে। জেসমিন জড়িয়ে ধরতে নিলে শে'কলে একটু টান পড়লো। বিরক্ত হলো সে। বললো নিচু স্বরে

--ছুটকি এটা খুলে দিবি কবে বল তো? অনেক ব্যাথা করে তো। তোকে আদর করা যায় না। তোর কাছে যাওয়া ও যায় না। এটা সবসময় আঁটকে দেয় আমাকে। এটা খুলে দে বোন। আপা তোকে বাখরখানি বর টফি খাওয়াবো।

মেহরিমা চোখ বুজে হাসলো। বোনকে জড়িয়ে ধরে বললো

--আমাকে কি এখনও ছোট ভাবিস আপা? আমি বড় হয়েছি। এখন আর বাখরখানি,টফির লো'ভ দেখিয়ে আমাকে দিয়ে কাজ করাতে পারবে না।

জেসমিন মুখ বাকালো। বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে বললো

--কচু বড় হয়েছিস তুই। সেই তো এখনও মন খারাপ হলে গাল ফুলিয়ে রাখিস। আমি জানি আমার ছুটকি এখনো সেই আগের মতোই আছে। আহ্লাদী, আদুরে আর বড্ড অভিমানী।

মেহরিমা শুনলো। চোখ বুঁজে পড়ে রইলো জেসমিনের বুকে। কিছুক্ষণ পর ভেজা স্বরে ডাকলো

--আপা

--হুম

--তোমার কাছেও কি মনে হয় আমি চরি*ত্রহীন?

জেসমিন ওসব জটিল প্রশ্ন বুঝলো না। সরল কন্ঠে উত্তর দিলো

--এসব বা'জে কথা কে বলেছে? আমার ছুটকির মতো লক্ষ্মী মেয়ে আর একটাও আছে নাকি?

--সবাই যে বলে।

--ওরা পা*গল। এজন্যই তো এমন ভুল ভাল কথা বলে। আমি তো জানি আমার ছুটকি পবিত্র। একদম নিষ্পাপ। সতেজ ফুলের মতো স্নিগ্ধ।

--আপা একটু আদর করে দাও তো। বুকে ব্যাথা করছে। খুব ব্যাথা করছে।

জেসমিন বরাবরই মেহরিমাকে একটু বেশি ভালোবাসে। বোনের ব্যাথার কথা শুনে তার চেহারা টাও মলিন হয়ে গেছে। বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে ছড়া কাটলো

                 ~দূর হয়ে যাক ক'ষ্ট
                    সেরে যাক ব্যাথা
                 পুষ্প রাণী আবারও
                 হেসে করুক খেলা।
                  গাল ফুলানি পরী
                বাখরখানি খাবা নি
               মিষ্টি করে না হাসিলে
              দেখিয়ে খাবো কুলফি
          ভ্যা ভ্যা করে কান্না করিলেও
              দিবো না কিচ্ছুটি
      আগে তুমি একটু খানি হাসি দিয়ে
              নাচো ঘুরি ঘুরি

বোনের এমন এলোমেলো ছড়া শুনে মেহরিমা মুচকি হাসলো। জেসমিন তখনও নিজের মতো ছড়া কেটে বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। বাদ যায় নি ছোট্ট পুতুল ও। থেকে থেকে মামের গালে চুমু খাচ্ছে। আদুরে স্বরে বলছে

--তুমু দিচি। মাম হাসো।

--আদল আদল। মাম হাসো।

মেহরিমা চোখ বুজে শুধু অনুভব করলো দুনিয়ার বুঝদার মানুষের থেকে এই অবুঝ প্রাণ দু'টোই তার সুখ। অন্ধকার জীবনের এক ফালি চাঁদের আলো। ঝলমলে রোদ্দুরের মিষ্টি রোদের হাতছানি। উত্তপ্ত গরমের এক পশলা বৃষ্টি কিংবা বসন্তের একটু দখিনা হাওয়া। এদের কে সঙ্গে নিয়ে বাকিটা জীবন হেঁসে খেলে, পরিশ্রম করে পাড় করে দিতে পারবে না সে? হুম খুব পারবে। চলার পথে কাঁ'টার স্তুপ থাকলে তাকে আটকাতে পারবে না। তার কাছে যে সুখের খনি আছে। তাকে আটকাবে কার সাধ্যি?

*******************
অপারেশন রুম থেকে বের করে শায়েরকে সরাসরি আইসিইউ তে নেওয়া হয়েছে। অপারেশন রুমে রোহান সহ আরো দুজন বড় বড় ডাক্তার ছিলেন। তাদের ভাষ্যমতে অতিরিক্ত র'ক্তক্ষ'রণের কারণে শায়েরের র'ক্তচাপ আশ'ঙ্কাজ'নক ভাবে কমে গেছে। জরুরি চিকিৎসার পরও অবস্থা স্থিতিশীল না হওয়ায় তাকে দ্রুত আইসিইউতে নেওয়া হয়েছে। র'ক্ত দেওয়ার পাশাপাশি চলছে বিশেষ ভাবে পর্যবেক্ষন। শরীরে কিছু কিছু জায়গায় অল্প স্বল্প ইনজুরি হলে ও তেমন গুরুতর নয়। হাতে পায়ে বেশ কিছু সেলাই লেগেছে। বিশেষ করে যেখানে যেখানে কাচ ভে'ঙে জ'খম হয়েছে।

শায়েরের এমন অবস্থার কথা শুনে তখনই জ্ঞান হারিয়েছে বশির আনসারী। জরুরি ভিত্তিতে তাকে স্যালাইন দেওয়া হয়েছে। ভাই অন্ত প্রাণ শায়েরীর অবস্থাও ভালো না। কাঁদতে কাঁদতে মেয়েটা অসুস্থ হয়ে পড়েছে। রোজিনা বেগম দাঁড়িয়েছে নামাজে। পরিবারের সকালের সুস্থতার দু'হাত তুলে চোখের পানি ফেলছে রবের দরবারে। রেজওয়ান আনসারী বসে আছে বাবার পাশে। শক্তপোক্ত হৃদয়ের মানুষটার চোখ জোড়াও আজ ভেজা। মীর,রাহুল একেবারে শান্ত হয়ে আছে। রাহুলের চোখ থেকে নিঃশব্দে পানি পড়লেও মীর একেবারে শান্ত। চেয়ারে বসে মাথানিচু করে আছে।

রোহান আইসিইউ থেকে বেরিয়ে সোজা মীরের পাশে এসে বসলো। ভাইয়ের কাঁধে হাত রেখে ডাকলো মোলায়েম স্বরে

--মীর

মীর মাথা তুললো। বড় ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে ভা'ঙা স্বরে বললো

--শায়ের সুস্থ হয়ে যাবে তো ভাইয়া? দ্রুতই সুস্থ হয়ে যাবে?

রোহান শান্ত চোখে ভাইকে দেখলো। আশ্বাস দিয়ে বললো

--আল্লাহর উপর ভরসা রাখ। ইন শাহ আল্লাহ সব ঠিক হয়ে যাবে।

--ইন শাহ আল্লাহ।

রোহান পুনরায় বললো

--নীড় তো তোর সঙ্গে ছিলো মীর। তাহলে এমন এক্সি*ডেন্ট হলো কেমন করে?

মীর মাথা নিচু করে ফেললো। চোখের পাতায় ভেসে উঠলো ভোরের ঘটনা গুলো..

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে 20 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন