(নোট:- গল্পে ব্যবহৃত হোটেল/বার লাউঞ্জ সব নাম কাল্পনিক। বাস্তবের সঙ্গে এর কোনো মিল নেই)
গুলশান বনানীর বিলাসবহুল পাঁচ তারকার হোটেল “দ্য ক্রিস্টাল ক্রাউন”। বনানীর মধ্যে সবচেয়ে নামি দামি হোটেল এটি। ভিআইপি রুম,রেস্টুরেন্ট,শপিং মল,গেমিং এরিয়া সহ রয়েছে বিভিন্ন সেক্টরের লাউঞ্জ এরিয়া। দেশ বিদেশের মিশ্র সংস্কৃতির দেখা মেলে এখানে। হোটেলের সাত তলার পুরো ফ্লোর জুড়ে ভিআইপি লাউঞ্জ এরিয়া। সাধারণ মানুষের আসা যাওয়া এখানে তেমন নেই। বড়লোকের বখে যাওয়া উশৃংখল ছেলে-মেয়েদের বেহায়াপনা নয়তো বড় কোনো ব্যবসায়িক ডিলের আলোচনা এখানে হয়। কখনো কখনো রাজনৈতিক নেতাদের ও দেখা মেলে।
সাত তলার পুরোটা জুড়ে লাউঞ্জ এরিয়া হলেও সেখানে রয়েছে আলাদা আলাদা সেক্টর। তারই একটা অংশ “ব্লু অর্কিড”। সময়টা তখন ভোর চারটা। চারপাশ আলো আঁধারিতে নিমজ্জিত। সাধারণ মানুষ এই সময় ঘুমিয়ে থাকলেও হোটেলের হলের পরিবেশ সম্পূর্ন আলাদা। বারের ভেতরটা নীলচে-ধূসর আলোয় ডুবে আছে। ছাদের মৃদু আলো আর কাউন্টারের পেছনে সাজানো কাঁচের বোতলগুলো মিলেমিশে পুরো জায়গাটাকে এক অদ্ভুত রহস্যময় আবহ দিয়েছে। মিউজিকের উচ্চ শব্দ, যুবক-যুবতীর বেহায়াপনা, ম*দের ঝাঁঝালো ঘ্রাণ। সিগারেটের বি*ষাক্ত ধোঁয়া আর লাস্যময়ী সুন্দরী রমণীদের লতানো নরম দেহের নাচের তালে পুরো হল রুম আচ্ছাদিত। বর্তমান যুবসমাজের এক তৃতীয়াংশ ছেলে মেয়েই এখানে নিজেদের মতো লাইফ লিড করছে। বাবা মায়ের অসর্তকা,অতিরিক্ত স্বাধীনতা আর অবাধ চলাচলের জন্য দিন দিন তারা যে আঁধারে তলিয়ে যাচ্ছে এতে তাদের কোনো খেয়াল নেই। চাকচিক্যময় পরিবেশ দেখে এটাকে তারা স্বর্গীয় জীবন ভেবে উপভোগ করতে ব্যস্ত।
সবাই যেখানে নাচ,গান আনন্দে ব্যস্ত সেখানে বাম পাশের কোনার টেবিলে নিজের মতো সময় পার কারছে বলিষ্ঠ দেহের সুদর্শন এক যুবক। জিম করা বডি,ধারালো চোয়াল,তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দেখে অনেক মেয়েই বহু আগে গলেছে তার উপর। নানা ভাবে চেষ্টা করেছে পুরুষর সান্নিধ্যে পাওয়ার। অথচ বেপরোয়া পুরুষ মাতাল অবস্থায় ও কাউকে নিজের কাছে ঘেঁসতে দিচ্ছে না। নিজের সেফটি হিসেবে টেবিলের উপর রেখে দিয়েছে চকচকে ধারালো একটা ছু'রি। যখনই কোনো মেয়ে তার কাছে ঘেঁসতে নিচ্ছে তখনই ছু*রি দেখিয়ে নীরবে শাসাচ্ছে তাকে। এভাবেই চলছে তার সময়।
হলের দরজা খুলে রমণীদের ভীর ঠেলে ব্যস্ত পায়ে পুরুষটার দিকে এগিয়ে আসছে আরেকজন পুরুষ। সোজা এসে বসেছে তার সামনে। গ্লাসে এলকোহলের ঝাঁঝালো তরল ঢেলে নিয়ে তার মধ্যে কিছু বরফ কুচি মিশিয়ে ফুরফুরে মেজাজে খেলো সে। টেবিলের উপর মাথা দিয়ে রাখা পুরুষটাকে উদ্দেশ্যে করে বললো
--কি রে ব্যাটা সাভার রেখে বনানীতে কি করছিস তুই? তোর জন্য হুদাই পাঁচশ টাকার তেল খরচ করে এখানে আসতে হলো আমার। যাওয়ার সময় গুনে গুনে দু হাজার টাকা দিবি কিন্তু।
সামনের পুরুষ নিরুত্তর। আপনমনে এলকোহলের ঝাঁঝালো তরল গলাধঃকরণ করতে ব্যস্ত সে। কখনো আবার আপনমনে উড়িয়ে দিচ্ছে নিকোটিনের ধোঁয়া। মীর নিজের মতো খেতে ব্যস্ত। ওয়েটার ডেকে ইতোমধ্যে নিজের জন্য কয়েক প্রকার স্ন্যাক্স,চিজ পাস্তা,চিলি চিকেন,চিকেন ফ্রাই অর্ডার করে ফেলেছে সে। মীর পুনরায় শায়েরের উদ্দেশ্যে বললো
--ভাই সকাল হয়ে যাচ্ছে। বাসায় যাবি কখন?
শায়ের মাথা তুললো। নেশায় চোখ বুঁজে আসছে তার। চোখদুটো র'ক্তিম লাল। টেবিলের উপর থেকে পানির বোতল নিয়ে নিজের মুখে পানির ঝাপটা দিলো। পানির ঝাপটায় কপালের উপর পরে থাকা এলেমেলো চুল গুলো ভিজে গেলো কিছুটা। শার্টের কলার সহ গেঞ্জির বুক পর্যন্ত ভিজলো এতে। শায়ের নিজের মনোযোগ ধরে রাখতে বার দুয়েক জোড়ে মাথা ঝাঁকালো। নিভু নিভু চোখে মীরের দিকে তাকিয়ে বললো
--বাসা? কার বাসায় যাবো?
শায়েরের এমন অগোছালো, বি'ধস্ত চেহারা দেখে অনেক আগেই খাওয়া থেমে গেছে মীরের। অবাক হয়ে দেখছে নিজের ভাইরূপী বন্ধুকে। শায়েরের প্রশ্নে সম্বিত ফিরলো ওর। অস্থির হয়ে বললো
--এ কি অবস্থা তোর? তোকে এমন বিধ*স্ত দেখাচ্ছে কেনো?
শায়ের উত্তর না দিয়ে শুধু হাসলো। পুনরায় এলকোহলের ঝাঁঝালো তরল খেতে গেলে আটকালো মীর। বাঁধা দিয়ে বললো
--থাম এবার আর কতো খাবি? নিজেকে একবারও আয়নায় দেখেছিস তুই? এমন করলে তুই তো ম'রে যাবি ভাই।
শায়ের আলগোছে মীরের হাত সরিয়ে দিলো। দু চুমুক খেয়ে হাসতে হাসতে বললো
--আমি কি বেঁচে আছি মীর? তোর আমাকে জীবিত মনে হয়?
--জীবিত মনে হয় মানে কি? তুই কি ম*রে গেছিস নাকি? দেখ নীড় একদম বাজে কথা বলবি না।
মীরকে রা'গতে দেখে দু'হাত তুলে সারেন্ডার করলো শায়ের। জড়ানো স্বরে বললো
--ওকে ওকে বলছি না। শান্ত হ ভাই। এতো হাইপার হলে চলবে?
মীর ফোঁস করে একটা শ্বাস ফেললো। অসহায় কন্ঠে বললো
--কতোটা খেয়েছিস এলকোহল? তোকে তো কখনো এমন দেখায় না। আজ কেমন যেন লাগছে তোকে? সত্যি করে বল কতোটা খেয়েছিস?
শায়ের বাম হাত তুলে টেবিলের নিচে দেখালো। মীর ইশারা অনুযায়ী তাকালো সেদিকে। টেবিলের নিচে ফ্লোরে পরপর তিনটা ম*দের খালি বোতল পরে আছে। আঁতকে উঠলো মীর। চেঁচিয়ে বললো
--এতোগুলো?
ঝট করে শায়েরের দিকে তাকালো মীর। অস্থির হয়ে বললো
--এতো খেয়েছিস কেনো? এই বেয়াদব ম'রে যেতে চাস?
--চাই তো খুব করে চাই। তাছাড়া আমি কি বেঁচে আছি নাকি। যারা বেঁচে থাকে তারা হাসতে পারে কিন্তু আমি..আমি তো হাসতে পারি না। শেষ কবে হেঁসেছিলাম সেটাও ভুলে গেছি। তাহলে তুই বল আমি জীবিত নাকি মৃ*ত?
মীরের নিজেকে অসহায় লাগলো। শায়ের ব্যস্ত নিকোটিনের ধোঁয়া উড়াতে। কিছুক্ষণ পর হুট করে প্রশ্ন করলো
--জাফলং ট্যুরের কথা মনে আছে তোর?
নড়েচড়ে বসলো মীর। শায়েরের চোখকে ফাঁকি দিয়ে আলগোছে এলকোহলের গ্লাস সরিয়ে ফেললো। ম*দের বোতলে হাত দিয়ে বললো
--সাত বছর আগের কথা জিজ্ঞেস করছিস?
--হুম
--সব মনে নেই তবে কিছু কিছু মনে আছে। কেনো বলতো?
শায়েরের চোখ দুটো বুজে আসছে। নেশায় বুদ হয়েছে মস্তিষ্ক। ছেলেটা একহাতে নিজের মাথা চেপে ধরলো। চোখ বুজেই বললো
--ফুলকে মনে রেখেছিস?
মীর প্রথমে বুঝলো না। স্মৃতির পাতা হাতরে আবছা একটা মুখ ভেসে উঠলো। দু ঝুঁটির একটা ফর্সা মেয়ে,ডাগর ডাগর আঁখি, বাচ্চা বাচ্চা একটা চেহারা। কিন্তু কথার কি ঝাঁঝ। ভাবে মাটিতে পা পড়ে না। মীর আপনমনে বললো
--মিস ভাব ওয়ালীর কথা বলছিস? ওই যে আমাদের দেখলেই চুল উরিয়ে ভাব দেখাতো। ভেংচি কা'টতো। কোমড় বেঁধে ঝ'গড়া করতো ওই দেড় ফুট মেয়ের কথা বলছিস?
তূরন্ত মীরের দিকে তাকালো শায়ের। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তাক করে গুরুত্বগম্ভীর স্বরে বললো
--ভাব ওয়ালী? ফুল ওর নাম। পবিত্র সতেজ ফুল। একদম আজেবাজে নামে ডাকবি না ও কে।
মীর ভেংচি কাটলো। লেগ পিচে কামড় দিতে দিতে বললো
--ফুল না ছাই। ওই মেয়ে তোর সঙ্গেই মিষ্টি ভাষী ছিলো। কিন্তু আমাকে দেখলেই ছ্যাত করে উঠতো। আল্লাহ জানে লিলিপুট মাইয়ার কোন পাকা ধানে মই দিয়েছিলাম আমি। যতদিন ছিলাম দেড়ফুট মেয়ের ভাব দেখতে দেখতেই দিন পার হয়েছে। উফফ মেয়ের কি তেজ। তাকালেই যেন ঝলসে দেবে।
শায়ের গম্ভীর মুখে শুনলো সবকিছু। বুকে হাত গুঁজে বসে রইলো চুপ। মীর সন্দিহান চোখে তার দিকে তাকালো। খেতে খেতে বললো
--এতো বছর পর ওই মেয়ে কোথা থেকে টপকালো? তুই তো বলেছিলি মেয়েটাকে আর মনে রাখবি না তাহলে?
--ভুলতেই তো চাই কিন্তু ভাগ্যে আমার সহায় কোনোদিনই হলো না। যত ভোলার চেষ্টা করছি তত যেন আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রাখছে আমায়।
শেষের দিকে শায়েরের কন্ঠস্বর কিছুটা ভঙ্গুর শোনালো। মীর সোজা হয়ে বসলো। নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করলো
--তুই কি ওকে ভালোবেসে ফেলেছিস ভাই?
--নো। আই জাস্ট হেইট হার।
--ভালো কথা।
ওদের দু'জনের আড্ডার মাঝে হুট করেই কোথা থেকে আরেকজন ছেলে চলে এলো। মীরের পাশ ঘেঁসে বসে দ্বিধা ছাড়াই চিকেন তুলে নিলো নিজের হাতে। শায়েরকে দেখে টিপ্পনী কে'টে বললো
--কি রে ভাই একা একা বসে আছিস যে। মেয়ে পটানোর যোগ্যতা নেই বুঝি?
শায়ের শান্ত চোখে তাকিয়ে থেকে উত্তর দিলো
--হাজারটা মেয়ের সঙ্গে ডেট করাকে যদি যোগ্যতা বলে তবে অমন ইউজলেস যোগ্যতার কোনো প্রয়োজন নেই আমার। তাছাড়া শায়ের মেয়েদের পিছু ঘোরে না উল্টো মেয়েরাই আমার পিছু মৌমাছির মতো ভনভন করে। আর এটাকেই বলে আসল পুরুষত্ব। তোর মতো বস্তির মেয়েদের ধরে ধরে বিছানায় নেওয়ার মতো কাপুরুষ আমি নই।
শায়েরের সূক্ষ্ম অপমানে মুখটা থমথমে হয়ে গেলো ছাব্বিরের। কটমট করে বললো
--মন্ত্রীর ছেলেকে কাপুরুষ বলছিস? কলিজা দেখি খুব বড় হয়েছে তোর।
শায়ের সূক্ষ্ম হাসলো। টেবিলে ভর দিয়ে ঝুঁকে ফিসফিস করে বললো
--আমি পুরোটায় একটা কলিজা। বিশ্বাস না হলে চেক করে দেখ।
এদিকে রাহুল বসে বসে ফুঁসছে। মন্ত্রীর ছেলে বলে কিছু বলতে পারছে না। নয়তো তার লেগ পিচ খাওয়ার শোধ মেপে মেপে তুলতো।
--মাতালের মতো টলছিস অথচ তোর ভাবের কথা শেষ হচ্ছে না।
--জেন্টেলম্যানদের ভাব কখনো শেষ হয় না। তারা ম*রার সময় ও ভাব নিয়ে ম*রার যোগ্যতা রাখে। অবশ্য তোর মতো ছাগলের বাচ্চা এসব বুঝবে না।
রা'গে, অপমানে মুখটা লাল হয়ে গেছে ছাব্বিরের। সে এসেছিলো নিজের মতো এনজয় করতে। কিন্তু এখানে এসে শায়েরকে দেখে চলে এলো জ্বালাতে। ভাবলো মাতাল অবস্থায় নিশ্চয়ই কিছু বলতে পারবে না। অথচ এই ছেলে দিব্যি তাকে অপমান করে যাচ্ছে। ছাব্বিরের রা'গে কেরোসিন ঢেলে দিতে মীর খোঁচা মে'রে বললো
--শুনলাম তোমার বউ নাকি বিয়ের আসর থেকে পালিয়েছে? এতো টাকা-পয়সা,নাম প্রতিপত্তি দিয়ে কি হলো। শেষ পর্যন্ত নিজের বউটাকে ও আটকে রাখতে পারলে না। ছ্যাহ ছ্যাহ পুরুষ জাতির নাক কে'টে দিলে একেবারে।
তড়াক করে মীরের দিকে তাকালো ছাব্বির। দাঁতে দাঁত চেপে বললো
--এসব কথা কে বলেছে তোমায়?
মীর খেকখেক করে হাসলো। হেলেদুলে বললো
--নিউজফিড জুড়ে এই সংবাদ আর তুমি জিজ্ঞেস করছো কোথা থেকে জানলাম? বলি ভায়া অনলাইন প্লাল্টফর্ম ব্যবহার করো তো নাকি এখনও কলিযুগে পড়ে আছো।
ছাব্বির উত্তর দেওয়ার মতো কিছু পেলো না। চুপচাপ বসে রইলো। শায়ের টেবিলের ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ালো। মীরের উদ্দেশ্যে বললো
--মীর বাসায় চল।
--হ্যা চল। এসব মশা-মাছির কাছে বসে থেকে লাভ নেই।
মীর এসে শায়েরকে ধরতে নিলে বাঁধা দিলো সে। হাত উঁচিয়ে বললো
--ধরতে হবে না। আমি একাই যেতে পারবো।
--একা যেতে পারবি মানে? নেশায় রীতিমতো টলছিস তুই ভাই। যখন তখন পড়ে যাবি। আয় আমি হেল্প করছি।
--বলেছি তো পারবো। একদম আলগা পিরিত দেখাতে আসবি না।
শায়েরের গম্ভীর কন্ঠে বলা কথা শুনে মীর আর সাহস পেলো না। চুপচাপ চললো শায়েরের পিছু পিছু। সবে সবে ভোর হয়েছে তখন। শায়ের নিজেই নিজের বাইকে উঠলো। মীর বাঁধা দিলেও শুনলো না। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে মীর ওর বাইকে উঠতে নিলে তার আগেই প্রচন্ড স্পিডে বাইক চালিয়ে চলে গেলো শায়ের। নিভু নিভু চোখে রাস্তাঘাট ঠিক মতো দেখতে পেলো না। অথচ চোখের সামনে ভেসে উঠলো মেহরিমার ছলছল চোখ জোড়া। শায়ের বিরক্ত হলো। মাথা ঝাঁকিয়ে দূর করতে চাইলো মনের অযাচিত ভাবনাকে। ভোরের বৃষ্টিতে রাস্তাঘাট সব পিচ্ছিল। নিয়ন্ত্রণ ছাড়া গাড়ি চালানো সম্ভব নয়। শায়ের দুবার পড়তে নিয়েও নিজেকে সামলেছে। পেছন থেকে মীর অনবরত ডেকে যাচ্ছে। বারবার বলছে থেমে যেতে। কিন্তু শায়ের থামছে না। বারবার মেহরিমা ছবি ভেসে ওঠায় জিদে বাইকের স্পিড বাড়াচ্ছে। কোনো ভাবেই এই মেয়েকে সে মনে করতে চায় না। মেহরিমার স্বচ্ছ পবিত্র চোখদুটোর দিলে তাকালেই বুকের মাঝে চিনচিন ব্যাথা করে তার। অতীতের ফেলে আসা আপন মানুষটার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলে মেয়েটাকে।
রাস্তার বিপরীত পাশ থেকে তখন প্রচন্ড গতিবেগে ধেয়ে আসছে একটা মালবাহী ট্রাক। শায়েরের সেদিকে মন নেয়। নিজ ভাবনায় ব্যস্ত সে। ট্রাকটা কাছ আসতেই হেডলাইটের তীব্র আলো এসে তার চোখে পড়লো। চোখ দুটো খিঁচে বন্ধ করলো সে। হাত থেকে ছুটে গেলো বাইকের নিয়ন্ত্রণ। চোখের পলকেই ট্রাকের সঙ্গে ধাক্কা লেগে ছিটকে পড়লো পিচের রাস্তায়। বাইকের নিচে চাপা পড়লো সে। মাথার পেছন থেকে গলগল করে গরিয়ে পড়লো র'ক্ত।
শায়েরের মনে হলো পৃথিবী যেন আঁধারে তলিয়ে যাচ্ছে। আর সেই আঁধারেই মিশে যাচ্ছে মিষ্টি একটা মেয়ে। শায়ের হাত বাড়িয়ে মেয়েটাকে ধরতে চাইলো। খিলখিল করে হাসলো সে। মিষ্টি হেঁসে বললো
--বন্ধু পারলে ছুঁয়ে দেখাও আমায়।
শায়ের খুব করে চেষ্টা করলো অবাধ্য মেয়েটাকে ধরতে। কিন্তু পারলো না। পুরো শরীর জুড়ে বি'ষ ব্যাথায় হার মানলো সে। চোখদুটো বুঁজে ফেলার আগে অস্পষ্ট স্বরে বললো
--ফুল আমাকে ফেলে যেও না..
অতঃপর সবকিছু ছেঁয়ে গেলো আঁধারে। নিথর হয়ে রাস্তায় পড়ে রইলো শায়েরের ক্ষ'ত'বি'ক্ষত র'ক্তাক্ত দেহ। মীর এলো কিছুক্ষণ পরেই। শায়েরকে রাস্তায় র'ক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে গগন কাপিয়ে চিৎকার করলো
--শায়ের ভাই আমার....
পুরো কথা শেষ করেই ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেললো মীর। মাথা ঝুঁকিয়ে দুহাতে মুখ ঢেকে থেমে থেম বললো
--সব আমার দোষ ভা..ইয়া। আমার বেখেয়ালির জন্য শায়েরের এই অবস্থা। তখন যদি ও..কে ওভাবে আ..সতে না দিতাম তাহলে এমনটা হতো না ভাইয়া। সব আমার দোষ। দোষী আমি। আমাকে শা'স্তি দাও ভাইয়া। আমাকে শা'স্তি দাও।
রোহান স্থির হয়ে বসে ভাইয়ের কান্না দেখলো। এতোক্ষণ পর মীর নিজের খোলস থেকে বেরিয়ে এসেছে। মনের জমানো কষ্ট গুলো কান্নার সঙ্গে উগলে দিচ্ছে। সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কোনো ভাষা তার কাছে নেই। কারণ আইসিইউ ভেতরে যে বেপরোয়া, খামখেয়ালি ছেলেটা শুয়ে আছে সে তো তারও কলিজার অংশ। যে ভাইকে সে নিজের হাতে বড় করেছে,আঙুল ধরে হাঁটা শিখিয়েছে, খেতে না চাইলে আদর করে খাইয়েছে সে ভাইয়ের নিথর দেহ দেখে তার নিজেরই হৃদয়ে যে র'ক্ত ক্ষ'রণ হচ্ছে, যে য'ন্ত্রনা হচ্ছে সেসব অনুভূতি কাকে বোঝবাে সে? সবাই তো কেঁদে নিজেদের মনের কষ্ট উগলে দিচ্ছে কিন্তু সে, তার তো সেই ক্ষমতা নেই। চাপা কষ্ট বুকে রেখেই যে প্রতিটা সেকেন্ড পার হচ্ছে তার। কখন তার আদরের ভাইটা চোখ খুলবে সেই আশায় অপেক্ষার প্রহর গুনছে।
রোহানের চোখের কোণে অশ্রু কণা জমা হলো। আলগোছে সেই পানি মুছে ফেললো সে। মীরের কাঁধে হাত রাখলে ছেলেটা হুমরি খেয়ে ঝাপিয়ে পড়লো রোহানের বুকে। বর্ ভাইয়ের বুকে মুখ লুকিয়ে বিরবির করলো
--আমার ভাইকে সুস্থ করে দাও ভাইয়া। নীড়কে সুস্থ করে দাও। আজ সারাদিনেও বেয়াদব টা আমাকে বকে নি। এসব আমার সহ্য হচ্ছে না ভাইয়া। ওকে উঠতে বলো। উঠে আমায় বকতে বলো,শাসন করতে বলো। তবুও যেন এভাবে চোখ বুঁজে পড়ে থেকে আমাকে না পো'ড়ায় ভাইয়া। বেয়াদব টা তো জানে ওর শূন্যতা সইতে পারি না আমি। তবুও কেনো এভাবে শা'স্তি দিচ্ছে? পা'ষাণ ছেলেটাকে উঠতে বলো ভাইয়া। উঠতে বলো।
মীরের চোখের পানিতে রোহানের সাদা এপ্রোন ভিজে একাকার। ভাইয়ের কাঁপা শরীর টাকে দু'হাতে আগলে রেখেছে সে। নিঃশব্দে ভরসা দিয়ে বোঝাচ্ছে- কাঁদিস না আমি আছি। শায়েরের কিচ্ছু হবে না। আমি হতে দেবো না। দূর থেকে রাহুল সবকিছু শুনলো,দেখলো। দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছে সে। চোখ দুটো র'ক্তিম লাল। চোখ অনবরত পানি পড়ছে। কতক্ষণ ধরে এভাবে কাঁদছে ছেলেটা কে জানে। মনে মনে শুধু দোয়া করছে শায়েরের সুস্থতার। তার ভাই সুস্থ হলেই তার শান্তি। যতক্ষণ না পর্যন্ত তার ভাই চোখ খুলবে তার শান্তি নেই।
রোহান মীরের কাঁধে হাত রেখে আশ্বাস দিয়ে বললো
--এভাবে ভে'ঙে পড়িস না ভাই। আমি আছি তো। শায়েরের কিচ্ছু হতে দেবো। ভরসা আছে তো ভাইয়ার উপর?
মীর শক্ত করে ভাইয়ের হাত ধরে বললো
--আছে ভাইয়া। তুমি ছাড়া ভরসা করার মতো কে আছে আমার?
রোহান নিষ্প্রাণ হাসলো। তখনই হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো হসপিটালের নার্স মারিয়া। রোহানের উদ্দেশ্যে বললো
--স্যার পেশেন্টের খিঁ*চুনি উঠেছে। দ্রুত চলুন। ডক্টর হোসেন আপনাকে ডাকছে।
নার্সের থেকে উক্ত কথা শুনে তড়িৎ আইসিইউর উদ্দেশ্যে ছুটলো রোহান। অথচ স্তব্ধ হয়ে বসে রইলো মীর। তার কানে একটা কথায় বাজছে
--স্যার পেশেন্টের খিঁ'চুনি উঠেছে।