জ্বর নিয়েও বাসা বাড়ির কাজে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে মেহরিমা। ইতোমধ্যে সকাল ছয়টা পেরিয়েছে। ভোর রাতের দিকে পুতুল ঘুম থেকে উঠে যাওয়ায় এতোটা দেরি হলো মেয়েটার। আদুরে মেয়েটাকে মন ভোলানি নানান কথা বলে তবেই ঘুম পাড়াতে সক্ষম হয়েছে সে।
শাহিদা নেওয়াজ বার বার মেয়ের কাছে এসে ফিরে যাচ্ছেন। কাল থেকে মেহরিমা তার মায়ের সঙ্গে প্রয়োজন ব্যতীত একটা কথা ও বলে নি। শাহিদা নেওয়াজ যেচে মেয়ের কাছে গেলেও এড়িয়ে গেছে মেহরিমা। ব্যস্ততা দেখিয়েছে কাজের। এখনও তাই করলো। বোরকা পড়ে নিজের ব্যাগটা গুছিয়ে পুতুলের কপালে আলতো চুমু একে চলে যেতে নিলে পেছন থেকে ডেকে উঠলো শাহিদা নেওয়াজ
--ও মেহের এখনোও আমার উপর রে'গে আছিস?
মেহরিমা নিরুত্তর। পায়ের জুতার ফিতা বেঁধে শেষ বারের মতো নিজের ব্যাগটা দেখে নিলো। মেয়েকে এমন চুপ থাকতে দেখে শাহিদা নেওয়াজের বুকটা হু হু করে উঠলো। অপরাধবোধ ডাল ঝাপটানো লতার মতো তরতর করে বেরে গেলো। দু কদম এগিয়ে এসে মেহরিমা হাত ধরে করুন স্বরে বললো
--মেহের সোনা মেয়ে আমার। মায়ের উপর আর অভিমান করে থাকিস না মা। আমি তোর কাছে ক্ষমা চাইছি। এবারের মতো আমাকে ক্ষমা করে দে মা।
মেহরিমা আলগোছে মায়ের হাতটা সরিয়ে দিলো। ক্লান্ত চোখে তাকিয়ে দেখলো মায়ের ফ্যাকাশে মুখশ্রী। মায়ের ছলছল চোখ জোড়া দেখে বুকের কোথাও চিন চিন ব্যাথা করলো তার। মানস্পটে ভেসে উঠলো বাবার র'ক্তাক্ত ক্ষ'ত'বি'ক্ষ'ত দেহ। কানে বাজলো শেষবার বাবার বলা কথা।
--আমার অবর্তমানে তোমার আম্মুকে দেখে রাখবে পুষ্প। চন্দ্রার চোখ থেকে অকারণে পানি পড়তে দেবে না। আমার অনুপস্থিতিতে ভে'ঙে পড়বে না মা, শ'ক্ত হাতে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে আমাদের সাজানো সংসার আগলে রাখবে। জীবনের যে পরিস্থিতিতেই পড়ো না কেনো কখনো নিজের মনোবল হারাবে না। মনে রাখবে আব্বু সবসময় তোমার সঙ্গে আছি।
বাবার বলা কথা গুলো মনে পড়তেই মেহরিমার চোখ জোড়া ভিজে উঠলো। মায়ের দিকে তাকিয়ে ভেজা স্বরে জিজ্ঞেস করলো
--আম্মু আমি তোমার খেয়াল ঠিক ভাবে রাখতে পারছি তো? আমার প্রতি তোমার কোনো অভিযোগ নেই তো?
শাহিদা নেওয়াজের বুকটা ধক করে উঠলো। দ্রুত মেয়ের হাত দুটো শক্ত করে ধরে বললো
--আমার তোর প্রতি কোনো অভিযোগ নেই মেহেট। তুই তো আমার মেয়ে আমার মা। মায়েরা কি কখনো তার সন্তানদের অযত্নে রাখতে পারে? তুই আমাকে অনেক ভালো রেখেছিস।
মেহরিমার বুক টা তবুও শান্ত হলো না। পুনরায় বললো
--আমি জানি,তোমাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব ঠিক ভাবে পালন করতে পারছি না আমি। দু বেলা খাবারের জোগান দিতেই ব্যর্থ হচ্ছি। থাকার জায়গা টা পর্যন্ত ভালো দেখে রাখতে পারি নি। থাকা,খাওয়া এমনি পোশাকের ক'ষ্ট ও দিচ্ছি তোমাদের। তোমাদের এমন টানাপোড়েনের জীবন আমার জন্যই হয়েছে। দিনশেষে এই ব্যর্থতা আমাকে অস্থির করে তোলে। মাঝে মাঝে মনে হয় বাবাকে দেওয়া কথা গুলো হয়তো রাখতে পারছি না। তোমাকে ভালো রাখতে পারছি না। পুতুলকে সুস্থ স্বাভাবিক পরিবেশে বড় করতে পারছি না। মেজো আপাকেও ভালো রাখতে ব্যর্থ হচ্ছি আমি। চোখের সামনে উন্নত চিকিৎসার অভাবে আমার ভালো বোনটা অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে। অথচ আমি কিচ্ছু করতে পারছি না। আজ যদি একটা ভালো স্যালারির চাকরি করতাম তাহলে হয়তো এতো কষ্ট তোমাদের পেতে হতো না আম্মু। তিন বেলা পেট ভরে খেয়ে, পড়ে চলতে পারতে।
শেষের কথা গুলো বলতে গিয়ে মেহরিমার গলা টা ভার হয়ে এলো। চোখের কোণে জমলো পানি। শাহিদা নেওয়াজ মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। পিঠে হাত বুলিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বললেন
--এসব কথা বলিস না মা। তুই আমাদের অনেক সুখে রেখেছিস। কে বলেছে তুই আমাদের ভালো রাখতে পারিস নি? আমরা অনেক ভালো আছি মা। যেখানে তুই আমাদের আগলে রাখছিস সেখানে আমরা খারাপ থাকবো কেমন করে? এতো চিন্তা করিস না মেহের। নিজের দিকেও এবার একটু খেয়াল দে। হাঁড়ভা'ঙা খাটুনি না খেটে যতোটা প্রয়োজন ততটুকু পরিশ্রমই কর মা। রিজিকের মালিক আল্লাহ। উনিই একটা ব্যবস্থা করে দেবেন। তবুও নিজেকে আর এভাবে ক'ষ্ট দিস না মা।
মেয়েকে বুকে নিয়েই শাহিদা নেওয়াজ কাঁদছে। যতই মেয়েকে বকুক না কেনো এই মেয়েটা যে তার প্রাণ। শেষ বয়সে এক টুকরো নরম আলোর সুখ হয়ে তার কোলে এসেছিলো মেহরিমা। মেয়ে হওয়ায় মেজর সাহেব সে কি খুশি। জন্মের পর সর্বপ্রথম বাবার কোলেই উঠেছিলো মেয়েটা। শাহিদা নেওয়াজের চোখের সামনে এখনও সেই দৃশ্য গুলো ভাসে। মেয়েকে বুকে নিয়ে কেঁদেছিলো তার মেজর সাহেব। সবাইকে ডেকে ডেকে বলেছিলো তার ঘরে চাঁদ এসেছে। আল্লাহ তাকে সুখের চাঁদ দিয়েছে। শাহিদা নেওয়াজ মুগ্ধ চোখো শুধু স্বামীর পাগলামি গুলো দেখেছিলো। আর আজ সেই ছোট্ট মেহরিমা তার দায়িত্ব নিয়েছে। এই বয়সেই গোটা একটা সংসার সামলাচ্ছে। যে বয়সে অন্য মেয়েরা বায়না করে সে বয়সে মেহের অন্যের বায়না পূরণ করছে। ভাইয়ের অবর্তমানে তার সন্তানকে নিজের সন্তানের মতো বড় করছে। ছোট বোন হয়ে বড় বোনের পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে বলবে এটাই তার সেই ছোট্ট মেহের। যে মেয়েটা আগে বায়না করতো,কথায় কথায় গাল ফুলাতো,জেদ দেখাতো, চঞ্চল হরিণীর মতো এদিক সেদিক ছুটে বেড়াত,অবুঝের মতো রা'গ করতো সেই মেয়েটাই আজ পরিশ্রমী,দায়িত্বশীল,বুঝদার হয়ে উঠেছে। সময়ের তালে নিজের সকল চঞ্চলতাকে নিয়ন্ত্রণ করে হয়েছে স্থির,শান্ত আর ধৈর্য্যশীল। তিনটে প্রাণকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য করছে সংগ্রাম। নিজের অধিকার বুঝে নিতে হয়েছে কঠোর। শাহিদা নেওয়াজ মাঝে মাঝে খুবই অবাক হন। বিষ্ময় নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেন তার আদরের আহ্লাদী মেয়েকে। খুব করে চান মেয়েটা আবারও আগের মতো তার কাছে এসে আবদার করুক। কিন্তু ভাগ্যে বরাবরই নি'ষ্ঠুর তার বেলায়। নয়তো বেঁচে থাকতে নিজের স্বামী,সন্তান আর মেয়ের ভরা সংসারের বি'নাশ দেখেন তিনি।
শাহিদা নেওয়াজ চোখের পানি মুছে মেহরিমা দু গালে হাত রাখলো। কিছুটা ভরসা দিয়েই বললো
--চিন্তা করিস না। আমাদের এই দুর্দিন বেশি দিন থাকবে না। খুব শীগ্রই আমরা সুখের দেখা পাবো ইন শাহ আল্লাহ।
মেহরিমা ঠোঁট টিপে নিজের কান্না আটকানোর চেষ্টা করলো। ধীর স্বরে বললো
--ইন শাহ আল্লাহ।
*************************
দরজা খোলার আওয়াজ পেয়ে রুম থেকে তরিঘরি করে বেরিয়ে এলো সন্ধ্যা। ঘড়ির কাটা তখন দশটার ঘরে। সবেই মুখে একটা হানি মাস্ক দিয়ে বসে রিলস দেখছিলো সে। বার বার রাহুলকে ফোন করার পরও যখন ছেলেটাকে ফোনে পেলো না তখন কিছুটা চিন্তায় পড়েছিলো সে। অনেক রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিলো। কিন্তু রাহুল ফেরে নি। এদিকে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ থাকায় সে নিজেও যেতে পারছিলো না। আর না পারছিলো কোনো খোঁজ খবর নিতে।
ক্লান্ত দেহ নিয়ে মাত্র ঘরে ঢুকলো রাহুল। চোখ মুখের অবস্থা বেহাল। দেখে মনে হচ্ছে সারারাত ঘুমাইনি সে। একদিনেই চোখের নিচে কেমন কালি জমেছে। ফর্সা মুখটা মলিন,ফ্যাকাশে। প্রথমদিন রাস্তার হলদে আলোয় ছেলেটাকে শ্যামলা লাগলেও পরবর্তীতে সন্ধ্যা উপলব্ধি করেছে ছেলেটা মারাত্মক সুন্দর। যাকে বলে বারাবাড়ি রকমের সুন্দর আর ফর্সা। প্রথম প্রথম সন্ধ্যার এই রূপ দেখে হিং'সা হতো। সে মেয়ে হয়েও এমন শ্যামলা অথচ এই ব্যাটা এমন সুন্দর কেনো? ছেলেদের তো এতো সুন্দর হতে নেই। সুন্দর হবে মেয়েরা। অথচ প্রকৃতি সেই নিয়ম পাল্টে ফেললো। সৌন্দর্যের খেতাবে মেয়েদের থেকে ছেলেদের এগিয়ে রাখলো। বিশেষ করে সন্ধ্যাকে শ্যামলা বানিয়ে বারাবাড়ি রকমের অপরাধ করেছে প্রকৃতি। তাকে একটু সুন্দর বানালে কি এমন ক্ষ'তি হতো?
সন্ধ্যা তীক্ষ্ম চোখে রাহুলের আগা গোড়া পরখ করলো। সবসময় পরিপাটি হয়ে থাকা ছেলেটা আজ কেমন অগোছালো হয়ে আছে। ইস্ত্রি করা শার্টটাও কোঁচকানো। জেল দিয়ে পরিপাটি করে রাখ চুল গুলো অবহেলা,অযত্নে কপালে পড়ে আছে। সবসময়ের মতো ফর্সা মুখের আদলে আজ আর হাসি নেই। চোখ দুটো ফোলা ফোলা। আচ্ছা লোকটা কি কেঁদেছে? হুট করেই এই অযাচিত প্রশ্ন উঁকি দিলো সন্ধ্যার মনে। মেয়েটা ঠোঁট টিপে সন্দিহান চোখে দেখলো রাহুলকে।
দরজা লক করে সবেই ঘরের দিকে পা বাড়িয়েছিলো রাহুল। তখনই ভেসে এলো সন্ধ্যার শান্ত স্বর
--মি. এলাচি ডিড ইউ্য ক্রাই?
সহসা থেমে গেলো রাহুলের চলন্ত পা যুগল। পিছু না ফিরেই শান্ত স্বরে প্রশ্ন করলো
--এমন টা মনে হওয়ার কারণ?
--যদি বলি আপনি নিজেই।
সন্ধ্যার দিকে তাকালো রাহুল। নীরব থেকে বুঝতে চাইলো সন্ধ্যার বলা বাক্যের মানে। সন্ধ্যা নিজেই বললো
--আপনার ফোলা ফোলা র'ক্তিম চোখ আর ভঙ্গুর স্বরই বলে দিচ্ছে দুঃখের গভীরতা ঠিক কতোখানি।
নিষ্প্রাণ চোখে তাকিয়ে রইলো রাহুল। কিছু বলার মতো উত্তর খুঁজে পেলো। সন্ধ্যা দু পা এগিয়ে এলো। নিজেই বললো
--ওসব রাখুন আগে বলুন কাল সারাদিন, সারা রাত কোথায় ছিলেন আপনি? তার উপর ফোনটাও ধরছিলেন না। দরজা টাও বাইরে থেকে লক করে রেখে গিয়েছিলেন। এতোটা কেয়ারলেস কেনো আপনি? বাসায় যে একটা মেয়েও আছে সেটা ভুলে খেয়ে ফেলেছিলেন?
ফোঁস করে একটা শ্বাস ফেললো রাহুল। নিস্তেজ স্বরে বললো
-- অনুমতি পেলে ঘরে যেতাম মিস। আপাতত একটু বিশ্রাম নিতে চাই। পরে না আপনার সকল প্রশ্নের উত্তর দিবো।
ভ্রু কুচকে গেলো সন্ধ্যার। তিরিক্ষ স্বরে বললো
-- আপনার ঘর, আপনার ইচ্ছে। মন চাইলে যাবেন নয়তো নাচবেন। তার জন্য এমন ঘটা করে অনুমতি নেওয়ার কি প্রয়োজন?
রাহুল আর দাঁড়ালো না। চুপচাপ চলে গেলো রুমে। সন্ধ্যা নিজ স্থানে দাঁড়িয়ে থেকে কিছু ভাবলো। অতঃপর পা বাড়ালো রুমের দিকে।
সময় নিয়ে ফ্রেশ হলো রাহুল। একেবারে গোসল করে রুমে এলো। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখলো। টাওয়াল দিয়ে ভেজা চুল মুছে ফোন টা তুলে নিলো হাতে। ডায়াল করলো মীরের নাম্বারে। কিছুক্ষণ পরই অপর পাশ থেকে রিসিভ হলো। রাহুল অস্থির হয়ে প্রশ্ন করলো
--ভাইয়ের জ্ঞান ফিরেছে মীর ভাই?
মীর হয়তো এই প্রশ্নের অপেক্ষায় ছিলো। উত্তর দিলো শান্ত কন্ঠে
--ফিরেছে। ডক্টর চেকাপ করে গেলো। আপাতত ঘুমাচ্ছে।
-- কালকের মতো কোনো সমস্যা হয়নি তো? ভাই সুস্থ আছে?
--একদম ঠিক আছে রাহুল চিন্তা করিস না। নীড় খুব শীগ্রই বাসায় ফিরে যাবে। তাছাড়া তুই তো ওকে চিনিসই। একটু সুস্থ হলেই হসপিটাল থেকে যাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে উঠবে। আপাতত ঘাড়ত্যাড়া ব্যাটাকে আটকে রাখার জন্য ঘুমের ইনজেকশনই শেষ ভরসা।
স্বস্তির শ্বাস ফেললো রাহুল। ওপাশ থেকে মীর পুনরায় বললো
--কিছু খেয়েছিস তুই?
--না ভাই।
--সে কি, এখনো খাস নি কেনো?
--কাল তো বাসায় ছিলাম না এজন্য রান্না ও করা হয়নি। দেখি ফ্রীজে ফ্রোজেন খাবার আছে নাকি। আপাতত ওগুলো দিয়েই কিছু একটা বানিয়ে নিবো।
--রাহুল এবার কিন্তু মা'র খাবি। কালকে র'ক্ত দিয়েছিস তুই। কতো করে সাধলাম কিছু খাওয়ার জন্য অথচ তুই খেলি না। আবার এখন বলছিস ফ্রোজেন খাবার খাবি? বেয়াদব নিজের দিকে খেয়াল দে। যতো প্রকার হেলদি খাবার আছে সব খাবি। বাকি খাবার আর ফল কাউকে দিয়ে পাঠাচ্ছি আমি।
রাহুল মুচকি হাসলো। অকপটে বললো
--তুমি নিজেও তো কিছু খাওনি ভাই। নিজের দিকে কি খেয়াল দেবে না?
ছ্যাত করে উঠলো মীর। খেঁকিয়ে বললো
--এমন এক চ'টকানা মা'রবো তিনদিন শুনতে পাবি না। আমি কি তোর মতো র'ক্ত দিয়েছি? যথেষ্ট ফিট আছি আমি। তুই নিজের কথা ভাব। খেয়ে দেয়ে শরীরের র'ক্তের ঘাটতি পূরণ কর। নয়তো তোর হি'টলার ভাইকে তো চিনিসই। সে তার নিজ স্টাইলে তোকে সোজা করে দেবে। তখন বুঝবি মীরের কথা বাসি হলেও সত্যি হয়।
হেঁসে ফেললো রাহুল। শান্ত স্বরে বললো
--আচ্ছা বুঝবো।
--হুম। এখন রাখছি। পরে কথা বলবো।
--ঠিক আছে ভাই।
রাহুল ফোন রেখে পিছু ফিরলো। বিছানার দিকে নজর যেতেই চমকে উঠলো। বোকার মতো ফ্যাল ফ্যাল করে দেখলো শুধু। বিছানার উপর ট্রেতে করে সাজিয়ে রাখা অনেক গুলো খাবার। রাহুল বড় বড় কদম ফেলে এগিয়ে গেলো। চোখ ঘুরিয়ে দেখলো সব কিছু। চিকেন স্যুপ,ফ্রুট কার্স্টাড,ওটস,দুধ,ফলের রস,দুটো সেদ্ধ ডিম সবকিছু আলাদা আলাদা করে সুন্দর করে সাজানো। এতো খাবার একসাথে দেখে অবাক হলো ছেলেটা। তার চেয়ে অবাক হলো রঙিন কাগজে লেখা ছোট্ট চিরকুট দেখে। রাহুল ফোনটা পাশে রেখে বিছানায় বসলো। হাত বাড়িয়ে চিরকুট টা হাতে নিয়ে ভাজ খুলে দেখলো সেখানে ছোট করে লেখা
“এই যে শুনুন মি. ফ্যাচফ্যাচানি ওয়ালা সব গুলো খাবার খেয়ে নিজের আসল ফর্মে ফিরে আসুন তো। আপনাকে স্যাড ভাইবে ঠিক মানাচ্ছে না। বোকা সোকা নাদুসনুদুস টাইপে আপনি বেশি প্রিটি। আমাকে খুঁজে লাভ নেই। সেজেগুজে হসপিটালে যাচ্ছি জামাই খুঁজতে। সিঙ্গেল জীবনের শান্তি ঠিক সহ্য হচ্ছে না। খুব করে চাইছি এবার জীবনে একটা অশান্তির গোডাউন ডাউনলোড হোক। ঠিক আপনার মতো বুঝলেন।
ইতি
আপনার মামলা ওয়ালী ”
পুরো চিঠি কয়েকবার পড়লে রাহুল। আনমনেই ঠোঁটের কোণের দেখা মিললো সূক্ষ্ম হাসির। ছেলেটা আপনমনেই আওড়ালো
--মাই সুইট লিটল ট্রাবল। অনলি মাইন।
***************************
--রোহান ভাই আসবো?
নিজের চেম্বারে বসে শায়েরের রিপোর্ট দেখছিলো রোহান। দরজার কাছে রিনরিনে মেয়েলি স্বরে আওয়াজ পেয়ে মাথা তুলে তাকালো। শায়েরীকে এই সময়ে এখানে দেখে একটু অবাক হলো। হাতের ফাইল গুলো টেবিলের উপর রেখে বললো
--তুই এ সময়ে এখানে? বাসায় যাস নি?
শায়েরী ভেতরে এলো। হাতে তার মাঝারি সাইজের ব্যাগ। চেয়ার টেনে বসে বললো
--গিয়েছিলাম তো।
--তাহলে আবার আসলি কেনো? রেস্ট নিতিস।
শায়েরী ব্যাগ থেকে খাবারের বক্স বের করে টেবিলের উপর রাখলো। চেয়ার থেকে উঠে গিয়ে রোহানের জন্য একটা প্লেট আর পানি নিয়ে আসলো। প্লেটে খাবার বাড়তে বাড়তে বললো
--আপনার জন্য খাবার নিয়ে এলাম। আপনি তো কাল থেকে তেমন কিছু খান নি। সারাক্ষণ দৌড়া দৌড়ি করেছেন। ক্লান্ত হয়ে গেছেন নিশ্চয়ই?
রোহান শান্ত চোখে মেয়েটার কাজকর্ম দেখছিলো। শায়েরীর কথা শুনে নড়েচড়ে বসলো। নিচু স্বরে শুধালো
--আমার দিকে খেয়াল ও রাখছিস?
--ওমা খেয়াল রাখবো না। আপনি তো আমার আপন মানুষ। আপন মানুষের খেয়াল রাখবো না তো কার খেয়াল রাখবো?
অকপটে কথাটা বলে ফেললো শায়েরী।অথচ বুকের ভেতর অদ্ভুত কাঁপন অনুভব করলো রোহান। শান্ত চোখে দেখলো মেয়েটার মুখের মিষ্টি হাসি। অস্ফুট স্বরে বললো
--আপন মানুষ..
শায়েরী প্লেটে খাবার নিয়ে রোহানের কাছে এগিয়ে এলো। দ্বিধা ছাড়াই বললো
--আপনাকে খাইয়ে দিবো রোহান ভাই?
চমকে উঠলো ছেলেটা। অসময়ে অপ্রত্যাশিত কিছু শুনলে যেমন মানুষের মস্তিষ্ক কাজ করে না তেমন করে তার মস্তিষ্ক ও কাজ করলো না। বোকার মতো তাকিয়ে রইলো শায়েরীর দিকে। মেয়েটা পুনরায় বললো
--বলুন
নড়েচড়ে বসলো রোহান। কিছুটা গুরুগম্ভীর স্বরে বললো
--আজ হঠাৎ এতো মধুর ব্যবহার কেনো? মতলব কি?
প্রশস্ত হাসলো মেয়েটা। ভাত মাখিয়ে রোহানের মুখের সামনে ধরে ইশারা করলো খাবার মুখে নিতে। বাধ্য বাচ্চার মতো রোহান খাবার টুকু মুখে নিলো। শায়েরী বললো
--কাল থেকে আপনি কতো পরিশ্রম করছেন। আমার ভাইয়াকে সুস্থ করার জন্য কতো দৌড় ঝাপ করলেন। সারারাত জেগে ভাইয়ার ট্রিটমেন্ট করলেন। এর বিনিময়ে বোন হিসেবে তো আমার দায়িত্ব আপনারও কিছুটা খেয়াল রাখা। আপনাকে সুস্থ রাখা। নয়তো পরবর্তীতে আমার ভাইয়ের ট্রিটমেন্ট কে করবে বলুন? এজ এ সিস্টার আমার কর্তব্য ভাইয়ার প্রোপার খেয়াল রাখা। এজন্যই আপনাকে খাইয়ে,সেবাযত্ন করে ফিট করতে এসেছি। এছাড়া অন্য কোনো কারণ নেই।
যতোটা ফুরফুরে মন নিয়ে খাবার খাচ্ছিলো রোহান এখন তার থেকেও বেশি বিস্মিত হলো সে। অবাক হয়ে সামনের রমণীর দিকে তাকিয়ে থেকে বললো
--তার মানে নিজেদের স্বার্থের জন্য আমার খেয়াল রাখছিস তুই?
শায়েরী ঠোঁট টিপে মিটিমিটি হাসলো। ইনোসেন্ট ফেস বানিয়ে মাথা নাড়িয়ে বললো
--সেরকমই..
--তাহলে যে একটু আগে বললি আমি তোর আপন মানুষ সেটা?
--আপন মানুষই তো। দাদু,চাচ্চু,মামনি,মীর ভাই,স্নেহা,ভাইয়া,মা,পাপা,আপনি সবাই তো আমার আপনজন। তাহলে ভুল বলেছি কোথায়?
--সবাই আর আমি এক?
--অবশ্যই। আপনি আলাদা হতে যাবেন কেনো?
চট করে মেজাজ বিগড়ে গেলো রোহানের। শায়েরীকে ধমকে বললো
--এক্ষুনি আমার চেম্বার থেকে বেরিয়ে যা সেতু। এক্ষুনি মানে এক্ষুনি।
--সে কি এখনই চলে গেলে কিভাবে হবে? আপনার সেবা যত্ন করবো না।
--তোর সেবা যত্নের মা'কে লাল সালাম। আমার চোখের সামনে থেকে দূর হ তুই।
শায়েরী ইচ্ছে করছে হেঁসে গড়াগড়ি খেতে অথচ মেয়েটা একদম শান্ত হয়ে আছে। মিটিমিটি হেঁসে কিছুটা গাল ফুলিয়ে বললো
--লাল সালাম আমি নিবো না। স্কাই ব্লু কালারের সালাম দিন। তাহলেই গ্রহন করবো নয়তো ঝুলিয়ে রাখবো।
--সেতু তুই যাবি।
রোহানের থেকে ধমক খেয়েও হাসলো মেয়েটা। বেসিনে হাত ধুয়ে এসে নিজের ব্যাগটা গোছালো। রোহান তখনও রা'গে ফোসফাস করছে। শায়েরী দেখলো। মনে মনে বেশ মজাও পেলো। রোহানের দিকে কিছুটা ঝুঁকে ফিসফিস করে বললো
--রোহান ভাই সময় থাকতে মনের কথা প্রকাশ করতে শিখুন। নয়তো দেখা যাবে দিনশেষে অপেক্ষারা ফুরিয়ে আপনায় ফাঁকি দিয়ে অন্যত্র বাসা বেঁধেছে। তখন কিন্তু আফসোস করেও সুরাহা মিলবে না ডাক্তার বাবু।
শায়েরীর এমন প্যাচানো কথা বুঝলো না রোহান। হুট করেই অশান্ত হলো হৃদয়। প্রশান্তক চোখে তাকিয়ে রইলো রমণীর দিকে। অথচ নির্বিকার রমণী। কেমন নিশ্চিন্তে হাসছে সে। শায়েরী নিজের ব্যাগ নিয়ে রুমের বাইরে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালো। বাতাসে তখন ভাসলো তার গুনগুন স্বরে গাওয়া দুটো লাইন
“তুমি দিন থাকিতে দ্বীনের সাধন
কেনো করলে না?
সময় গেলে সাধন হবে না”