--এতোক্ষণ কোথায় ছিলিস তুই?
নিজের রুমে ঢুকতেই পেছন থেকে ভেসে আসা মায়ের রাশভারি কন্ঠস্বরে থেমে গেলো শায়েরী চলন্ত পা যুগল। নিজ স্থানে দাঁড়িয়ে চোখ দুটো বুঁজে ক্লান্তির শ্বাস ফেললো রমণী। অতঃপর পিছু না ঘুরেই ক্লান্ত স্বরে উত্তর দিলো
--হসপিটালে ছিলাম।
--সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হসপিটালে কিসের জন্য ছিলিস তুই? ফ্রীতে নার্সের ডিউটি পালন করছিলি নাকি রোগীদের সেবা করে এক্সট্রা ভালো মানুষীর নাম কুড়োলি?
দোলা বেগম একটু থেমে পুনরায় বললো
--কল ধরিস নি কেনো আমার? আজকাল বেশ স্বাধীনতা দিয়ে ফেলছি নাকি তোকে?
বরাবরই মায়ের সঙ্গে কথা বলতে সংকোচ বোধ করে শায়েরী। এর কারণ অবশ্য সে জানে না। ছোট থেকেই মায়ের সঙ্গে তার সখ্যতা নেই বললেই চলে। যতোটুকু আদর,ভালোবাসা,স্নেহ, আবদার পেয়েছে সবই মামনীর কাছে। কখনো কখনো রোহান,মীর,দাদু অথবা ভাইয়ার কাছে সকল আবদার করে। নিজের সকল প্রয়োজন,সুবিধা-অসুবিধা এই মানুষগুলোই দেখে থাকেন। বাবার সঙ্গেও তেমন কথা হয়না তার। শায়েরী মাঝে মাঝে ভুলেই বসে সে আসলে কার সন্তান? বাবা মা থেকেও যেন না থাকার মতো। এ কেমন ভাগ্য তাদের দু ভাই বোনের?
শায়েরীকে চুপ থাকতে দেখে বিরক্ত হলো দোলা বেগম। মেয়ের কাছে এগিয়ে এসে শক্ত করে হাতের বাহু ধরে রাগান্বিত স্বরে বললো
--প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিস না কেনো? দিন দিন বেয়াদব হচ্ছিস?
শায়েরী ফোঁস করে একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেললো। স্থির স্বরে আওড়ালো
--ভাইয়ার কাছে ছিলাম আম্মু। তুমি তো জানোই ভাইয়া অসুস্থ।
--অসুস্থ। ম'রে তো আর যায় নি।
--মা..
দোলা বেগমের কথা শেষ হতেই কিছুটা চেচিয়ে উঠলো শায়েরী। তড়িৎ মায়ের দিকে ফিরে বিষ্মিত স্বরে প্রশ্ন করলো
--ভাইয়া তোমার নিজের ছেলে আম্মু। এক্সি'ডেন্টে গুরুতর আহত হয়ে হসপিটালে ভর্তি সে। এক প্রকার মৃ'ত্যুর সঙ্গে লড়াই করেই বেঁচে আছে। অথচ তুমি মা হয়ে কিনা তার মৃ'ত্যু কামনা করছো? নিজের সন্তানের মৃ'ত্যু কামনা করছো তুমি? কথাটা বলতে বুক কাঁপলো না তোমার?
মেয়ের কথায় যেন কোনো হেলদোল দেখা গেলো না দোলা বেগমের মধ্যে। আর না তো ছেলে অসুস্থ শুনে কোনো ব্যাকুলতা প্রকাশ পেলো মাতৃ হৃদয়ে। উল্টো নাক মুখ কুঁচকে বিরক্তির স্বরে বিরবির করলো
--বেয়াদব টার কৈ মাছের জান। ট্রাকের ধাক্কায় ও ম'রলো না। উল্টো বেঁচে ফিরে আমার বেঁচে থাকা হারাম করে দিলো। জা'নোয়ার একটা।
দোলা বেগমের পাশে থাকায় কিছুটা কথা শায়েরীর কানেও এসেছে। মেয়েটা অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে দেখছে নিজের জন্মদাত্রীকে। যে কিনা সন্তান মা-রা যায়নি বলে আফসোস করছে। আচ্ছা এমন মা ও হয় বুঝি? নিজের সন্তানের মৃ'ত্যু কামনা ও কোনো মা করতে পারে? মেয়েটার নরম মনে এই কথা সহ্য করতে পারলো না। ভাইকে সে নিজের জানের থেকেও বেশি ভালোবাসে। সেই ভাইকে নিয়েই এমন ভ'য়ঙ্কর কথা মস্তিষ্কে চাপ সৃষ্টি করলো। হিতাহিত জ্ঞান খুইয়ে শান্ত-শিষ্ট মেয়েটা প্রথম বারের মতো মায়ের হাতটা ঝটকা মেরে সরিয়ে দিলো। ফর্সা মুখশ্রী ধারণ করেছে রক্তিম বর্ণ। দোলা বেগম মেয়ের এই ব্যবহার চমকে উঠলো। রা'গান্বিত চোখে তাকালো মেয়ের দিকে। শায়েরীর আজ কি হলো কে জানে। মেয়েটা অত্যাধিক ক্রো'ধ নিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো
--তোমার মতো মা আল্লাহ কারোর ভাগ্যে না দিক। তুমি আসলেই মা হওয়ার যোগ্যতা রাখো না। ভাইয়া হসপিটালে মৃ'ত্যুর সঙ্গে লড়াই করছে আর তুমি..তুমি তার জন্মদাত্রী হয়ে মৃ'ত্যু কামনা করছো? একবারের জন্য তো দেখতেও গেলে না। ছেলেটা আদোও বেঁচে আছে নাকি ম'রে গেছে জানতেও চাওনি। সারাক্ষন তো ভাইয়াকে গালমন্দ করো,অভি'শাপ দাও,মাসে একবার বাসায় আসলেও কুকুরের মতো ব্যবহার করো।তোমার জন্য শুধুমাত্র তোমার জন্য আমার ভাইয়া নিজের বাড়ি ছেড়ে,পরিবার ছেড়ে একা একা থাকছে। কেনো আম্মু কেনো? সবসময় ভাইয়াই কেনো? কি ক্ষ'তি করেছে ভাইয়া তোমার? দোয়া নাই বা করলে অন্তত এমন কিছু বলো না যার জন্য আমার ভাইয়ার লাইফ রিস্ক হয়ে যায়।
অষ্টাদশী মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতে কথা ও বলতে পারছে না। চোখ থেকে অনবরত পানি পড়লেও অতিরিক্ত রা'গে পুরো শরীর কাপছে তার। দোলা বেগম মেয়ের এমন রূপ আশা করেন নি। ভদ্রমহিলা বিষ্ময়ে বাকশক্তি ও যেন হারিয়েছে।
শায়েরী চেঁচানোতে নিচ থেকে রোজিনা বেগম,মীরা এমনকি ছোট্ট স্নেহা ও চলে এসেছে। বাড়িতে আপাতত এই ক'জনই আছেন। বাকিরা হসপিটালের শায়েরের কাছে। ছোট্ট স্নেহা তার হাসিখুশি সেতু আপির এমন রা'গান্বিত মুখশ্রী দেখে ভয়ে রোজিনা বেগমকে জড়িয়ে ধরলো। ভীতু স্বরে বললো
--আম্মু দেখো সেতুপি কেমন যেন করছে? আমার ভয় করছে আম্মু। সেতুপি কে কান্না করতে নিষেধ করো। স্নেহু কষ্ট পাচ্ছে তো।
রোজিনা বেগম মেয়েকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। পাশ থেকে মীরা নিচু স্বরে আওড়ালো
--খালাম্মা ছোট আফামনির মাথার ফিউজ উইড়া গেছে মনে হয়। নয়তো ছোট খালাম্মার লগে এমন উঁচু গলায় কথা কওনের সাহস কারো আছে আফনেই কন? আমার মন কইতাছে ছোট আফামনিরে জ্বীনে ধরছে নয়তো আমগো এতো শান্ত,মিষ্টি স্বভাবের আফা এমনে চ্যাতছে কহনো?
মীরা ফিসফিস করে বলে সামনে তাকিয়ে বাকি কাহিনি দেখার জন্য অপেক্ষা করলো। রোজিনা বেগম স্নেহা কে সরিয়ে শায়েরীর কাছে এগিয়ে গেলো। অস্থির হয়ে শুধালো
--কি হয়েছে মা? মায়ের সঙ্গে এমন ব্যবহার করছিস কেনো? শান্ত হ।
শায়েরী উত্তর দিলো না। কেমন রক্তলাল চোখে তাকিয়ে রইলো মায়ের দিকে। দোলা বেগম শান্ত চোখে মেয়ের মুখশ্রী পরখ করে ঠান্ডা গলায় বললো
--শায়েরী তুই ভুলে যাচ্ছিস কার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছিস? আমার সঙ্গে এমন উঁচু গলায় কথা বলার সাহস কোথায় পেয়েছিস তুই?
অষ্টাদশী মেয়েটা আজ আর ভয় পেলো না। ভাইয়ের প্রতি দূর্বল মেয়েটার মনে র'ক্তক্ষরণ হচ্ছে। মায়ের থেকে উক্ত কথা রা'গে মাথার শিরা-উপশিরা দপদপ করছে। অনাকাঙ্ক্ষিত একটা ভয় জেঁকে বসেছে অন্তরে। শায়েরী হাত দিয়ে চোখের পানি মুছলো। ভাঙা তেজি স্বরে বললো
--উচিত কথা বলার জন্য সাহস নয় বরং মানুষের ব্যবহারই যথেষ্ট। আর আমাকে সেই সাহস দিয়েছো তুমি। আমাদের সঙ্গে যেমন ব্যবহার করেছো তেমনটাই তো ফেরত পাবে তুমি। এতে এতো অবাক হচ্ছো কেনো?
দোলা বেগমের রা'গের মাত্রা তরতর করে বাড়ছে। মেয়ের এই ব্যবহার তার সহ্যসীমানার বাইরে। অতিরিক্ত রা'গে চোখ দুটো লাল। শেষ বারের মতো মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলল
--শায়েরী লাস্ট ওয়ার্নিং দিচ্ছি। আমার সঙ্গে এভাবে গলা উচিয়ে কথা বলবি না।
--একশোবার বলবো। কি করবে তুমি?
--শায়েরী চুপ কর মা।
দোলা বেগমের দিকে ফিরে বললে
--ও ছোট বাচ্চা মেয়ে বোঝে নি, শান্ত হয়ে যা বোন।
রোজিনা বেগমের কথা পাত্তা দিলো না দোলা বেগম। মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললো
--আবারও বলছি থেমে যা শায়েরী। আমাকে আমার আসল রূপ দেখাতে বাধ্য করিস না।
--আর কোনো রূপ দেখানো বাকি রেখেছো তুমি? যে মা নিজের সন্তানের মৃ'ত্যু কামনা করতে পারে তার থেকে জ'ঘন্য মানুষ আদোও দুনিয়ায় আছে। আসলে ভাইয়া ঠিকই বলে তুমি আসলেই একজন সেলফিশ...
ঠা'স করে মেয়ের গালে এক চ'ড় বসিয়ে দিলেন দোলা বেগম। স্নেহা ভয়ে চিৎকার করে কেঁদে ফেললো। মীরা নিজেও হতভম্ব হয়ে দু'হাতে মুখ চেপে ধরেছে। রোজিনা বেগম তূরন্ত আগলে নিলো শায়েরীকে। বুকে আগলে নিয়ে দোলা বেগমের উদ্দেশ্যে বললো
--এটা কি করলি তুই? এতো বড় মেয়ের গায়ে হাত তুললি? মেয়েটাকে বুঝিয়ে বললো হতো না। সবসময় মা'রতে হবে কেনো?
দোলা বেগম কোনো প্রশ্নের উত্তর দিলো না। উল্টো ঝটকা মে'রে মেয়েকে নিজের দিকে ফিরিয়ে হিসহিসিয়ে আওড়ালো
--এই অপরাধের মাশুল তোকে দিতেই হবে শায়েরী। পেটের মেয়ে বলে ছাড় পাবি না। একচুল ও না।
দোলা বেগম চলে যেতেই রোজিনা বেগম মেয়েটাকে নিজের দিকে ফিরিয়ে গালে হাত রেখে ভেজা স্বরে বললো
--কি হয়েছে তোর? মায়ের সঙ্গে এমন ব্যবহার করলি কেনো? এই শিখিয়েছি তোকে? আমার মিষ্টি মা তো এমন নয়? তবে আজ কেনো এমন আচরণ করলো সে?
শায়েরী কেমন নিষ্প্রাণ চোখে রোজিনা বেগমের দিকে তাকালো। ফর্সা গালে পাঁচ আঙুলের ছাপ স্পষ্ট। মেয়েটা শুষ্ক ঢোক গিললো। জিভ ঠোঁট ভিজিয়ে চেষ্টা করলো বাক্য আওড়ানোর। অতঃপর কেমন ভঙ্গুর স্বরে শুধালো
--মামনি উনি আদোও আমাদের জন্মদাত্রী মা তো?
--শায়েরী..
রোজিনা বেগমের বুকটা ধক করে উঠলো। অস্থির হয়ে মেয়েটাকে আগলে নিতে গেলে শায়েরী দুকদম পিছিয়ে গেলো। দ্বিতীয় বাক্যব্যয় না করে দৌড়ে চলে গেলো নিজের রুমে। দরজা ভেতর থেকে লক করে ক্লান্তিতে ফ্লোরেই বসে পড়লো। দাবিয়া তখন রুমের মধ্যে বল নিয়ে খেলছিলো। শায়েরীকে দেখে স্বভাব সুলভ ব্যস্ত পায়ে দৌড়ে এলো। মেয়েটার গা ঘেঁষে লেজ নাড়িয়ে মিউ মিউ আওয়াজ তুললো। চোখের চাহনিতে বোঝালো --আম্মু আদর দাও।
শায়েরী ভেজা চোখে অবুজ প্রাণীটার দিকে তাকালো। ছোট্ট দাবিয়া নিজের মালিকের এমন বিষন্ন মুখশ্রী দেখে কি বুজলো কে জানে? কেমন অস্থির হয়ে আওয়াজ তুললো। আগের চেয়ে দ্বিগুণ মাত্রায় লেজ নাড়িয়ে মেয়েটার কোলে উঠতে চাইলো। শায়েরী কাঁপা হাতে বিড়াল টাকে কোলে তুলে নিলো। মাথায় হাত বুলিয়ে বিষন্ন স্বরে বললো
--দাবিয়া
ছোট্ট দাবিয়া শায়েরী বুকে নিজের মাথা ঘসলো। মায়ামায়া চোখে তাকিয়ে আওয়াজ তুললো
--মিউ
শায়েরী আলতো চুমু আকলো ওর মাথায়। বিড়াল টাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো নিজের বুকে। কান্না আটকানের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলো। অবাধ্য হয়ে টপটপ করে ঝড়লো অশ্রু কণা। অতঃপর নিজ মনে বিরবির করলো
--আমাদের ভাগ্যটা এমন নি'ষ্ঠুর কেনো হলো ভাইয়া? কেনো আমাদের বাবা মা থেকেও তাদের ভালোবাসা,স্নেহ আমাদের ভাগ্যে জুটলো না? কেনো তুমি আমাদের সঙ্গে থাকতে পারলে না? কেনোই বা নিজের জন্মদাত্রীর থেকে মিথ্যা অপবাদ পেয়ে বাড়ি ছাড়লে তুমি? খোদা কেনো তোমাকে এতো ক'ষ্ট দিচ্ছেন? কবে একটু সুখের দেখা মিলবে তোমার জীবনে? এই নি'ষ্ঠুর ভুবনে কেউ কি নেই যে তোমাকে আগলে রাখবে? যত্ন,ভালোবাসায় তোমার জীবনের সকল অপূর্ণতা দূর করে দেবে। এমন কেউ কি আসবে তোমার জীবনে? আল্লাহ কবে তোমাকে সত্যিকারের ভালোবাসার সঙ্গে পরিচয় করাবে? কবে?
সারাক্ষণ হাসি,খুনসুটি, দুষ্টুমিতে মেতে থাকা মেয়েটা আজ কাঁদছে। ভাইয়ের জন্য বোনের হৃদয় পু'ড়ছে। শূন্যতায় র'ক্ত ক্ষরণ হচ্ছে অন্তরে। চার দেওয়ালের মাঝে অষ্টাদশী মেয়েটার চাপা কান্না গুমোট আকার ধারণ করেছে। যার সাক্ষী হয়েছে চার দেওয়ালের মাঝে থাকা জড় বস্তুর আসবাবপত্র আর বোবা প্রাণী দাবিয়া।
******************
পরের সময় গুলো খুব দ্রুতই কেটে গেলো। শায়েরের হসপিটালে থাকার আজ পাঁচ দিন পূর্ণ হয়েছে। ছেলেটা আগের থেকে এখন একটু সুস্থ। বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে না পারলেও হাঁটতে খুব একটা সমস্যা হয়না। সারাক্ষণ অস্থির হয়ে থাকে হসপিটাল থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য। কিন্তু দাদুর কড়া আদেশ আর রোহানের লুকিয়ে দেওয়া ঘুমের ঔষধের কারণে এখনো পর্যন্ত কোনো সুরাহা করতে পারে নি। অগত্য উপায় না পেয়ে হসপিটালের কেবিনেই দমবন্ধ কর সময় পার করছে সে। কখনো না ছোট্ট বাচ্চার মতো গাল ফুলিয়ে রাখছে। কখনো আবার নার্স,ডক্টরের সঙ্গে বিনা কারণে রা'গারাগি করছে।
ঘুমের ইনজেকশনের জন্য শায়ের এখন ঘুমিয়ে আছে। বশির আনসারী পাঁচ দিন যাবৎ হসপিটালেই আছেন। সারাক্ষণ নাতির পাশে বসে থাকেন। রোহান,মীর হাজার বলেও তাকে বাড়ি পাঠাতে পারে নি৷ এমনকি শায়ের নিজেও না। অভিমানে শায়েরের সঙ্গে কথা বলা পর্যন্ত বন্ধ করেছেন। এই নিয়ে ছেলেটা সে কি রা'গ। মাঝে মাঝে কথা বলার জন্য খুঁচিয়ে ঝগড়া করলেও বশির আনসারী নিশ্চুপ ছিলেন। নিঃশব্দে নাতির দেখাশোনা করেছেন শুধু। শায়ের কথা বলতে এলে মুখ ফিরিয়ে ব্যস্ততা দেখিয়েছেন। অথচ নাতি ঘুমিয়ে গেলেই সযত্নে মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করেছেন। ক্ষ'ত স্থান গুলো নিজের হাতে ঔষধ লাগিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিয়েছেন।
রোহান শায়েরের কেবিনে প্রবেশ করে দাদুকে নিশ্চুপ বসে থাকতে এগিয়ে এলো৷ পাশ থেকে চেয়ার টেনে বসে দাদুর কাঁধে হাত রেখে বললো
--দাদাই খাবে না?
বশির আনসারী ছলছল চোখে বড় নাতির দিকে তাকালো। নিচু স্বরে বললো
--পরে..
--পরে নয় এখনই খাবে তুমি। মেডিসিনের সময় হয়ে গেছে তোমার। নিজের প্রতি আর অবহেলা করো না দাদাই। নীড় ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে যাচ্ছে তো। ডক্টর বলেছে শারিরীক দুর্বলতা কেটে গেলেই ওকে বাসায় নিয়ে যেতে পারবো। কয়দিন বেড রেস্ট নিলে একদম ফিট হয়ে যাবে।
বশির আনসারী মন দিয়ে সব কথা শুনলো। নীরবে মাথা নাড়িয়ে স্বায় জানালো। রোহান দাদুর হাত ধরে বললো
--এখন চলো খেয়ে নেবে।
রোহান দাদুর হাত ধরে নিয়ে গেলো কেবিনের বাইরে। নিজের হাতে যত্ন করে খাইয়ে দিলো। খাবার খেয়ে বশির আনসারী চুপচাপ সোফায় বসে আছেন। গম্ভীর হয়ে কিছু ভাবছেন। রোহান আসতেই শান্ত স্বরে প্রশ্ন করলেন
--তোমার অকৃতজ্ঞ, স্বার্থপর ছোট চাচা দেশে ফিরিছেন কবে জানো?
হঠাৎ প্রশ্নে কিছুটা ভরকে গেলো রোহান। পরমুহূর্তেই ভ্রু কুচকে প্রশ্ন করলো
--চাচ্চু দেশে ফিরিছে? কবে ফিরলো?
বশির আনসারী শান্ত চোখে নাতির দিকে তাকিয়ে প্রতিউত্তর করলো
--পাঁচ দিন আগে।
চমকে উঠলো ছেলেটা। ব্যস্ত স্বরে বললো
--তাহলে বাড়িতে আসে নি কেনো?
--সেটা তোমার চাচায় ভালো জানেন।
রোহানের কপালে চিন্তার সূক্ষ্ণ রেখা ফুটে উঠলো। ঠোঁট কামড়ে ভাবলো কিছু। তূরন্ত দাদুর দিকে তাকিয়ে আনমনে বললো
--তাহলে কি শায়েরের এক্সিডে'ন্টের সঙ্গে...
সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালো বশির আনসারী। জানালার কাছে এগিয়ে ধীর পায়ে। ব্যস্ত শহরের দিকে তাকিয়ে হিম শীতল কন্ঠে আওড়ালো
--আমি নিশ্চিত নই। তবে আমার সন্দেহ যদি সত্যি হয় এর মাশুল দিতে হবে তাকে। সন্তান বলে বার বার ছাড় দেবো না। শায়ের আমার কাছে আমানত। ওর বিষয়ে সামান্যতম ছাড় ও আমি দিবো না। তোমার ছোট চাচার করা প্রতিটা অন্যায়ের শা'স্তি আমি নিজে দেবো। আর অবশ্যই সেটা নিজের নিয়মে।
ঠান্ডা স্বভাবের বশির আনসারীর চোয়াল ধীরে শক্ত হয়ে উঠলো। শান্ত মুখশ্রীতে ভর করলো হিং'স্রতা। রোহান নিজের দাদুর দিকে শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো কিয়ৎক্ষন। অতঃপর নিজের ফোনটা বের করে কাউকে মেসেজ পাঠালো
--বায়েজিদ আনসারী গত পাঁচ দিন কোথায় ছিলো? কার সঙ্গে ছিলো? কি করেছে? এর সমস্ত ইনফরমেশন চায় আমার। যত দ্রুত সম্ভব আপনার ফোর্সের সাহায্য তথ্য গুলো কালেক্ট করুন। ইট'স আর্জেন্ট।
********************
রান্নাঘরে বাসন ধোঁয়ার কাজ করছে মেহরিমা। সকালের নাস্তার পর এখন প্রস্তুতি নিচ্ছে দুপুরের রান্নার আয়োজনের। তবে আজকে কাজে এসে মনের মধ্যে অদ্ভুত অস্থিরতা কাজ করছে তার। বার বার উঁকি দিয়ে দেখছে ড্রয়িং রুমে কাজে ব্যস্ত থাকা লুবনা বেগমকে। ভদ্রমহিলা কাগজের কার্টুনে ঘরের টুকটাক আসবাবপত্র গুছিয়ে রাখছে৷ মেহরিমা কয়েকবার এরকারণ জিজ্ঞেস করতে গিয়ে করে নি। চুপচাপ নিজের মতো কাজ করে গেছে।
কিছুক্ষণ পর রান্নাঘরে লুবনা বেগম এলো। মেহরিমাকে ব্যস্ত হাতে রান্না করতে দেখে নরম স্বরে ডাকলো
--মেহের
চমকে পিছু ফিরলো মেহরিমা। তড়িৎ পিছু ফিরে লুবনা বেগমকে দেখে বললো
--আপনার কিছু লাগবে আন্টি? চা খাবেন? দিবো?
লুবনা বেগম মমতা ভরা দৃষ্টিতে মেয়েটাকে দেখলো। এতো অল্প বয়সে মেয়েটার এই পরিশ্রম তার মাতৃ হৃদয়ে আ'ঘাত করে। বড্ড মায়া হয় মেয়েটার উপর৷ আবার আফসোস ও করেন। বিলাসবহুল পরিবেশে বড় হওয়া মেয়েটা আজ কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে? লুবনা বেগম ফোঁস করে একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেললো। মেহরিমা তখনও উত্তরের আশায় তাকিয়ে আছে। লুবনা বেগম হাতে গুঁজে রাখা টাকা গুলো মেহরিমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো
--তোমার এই মাসের বেতন। সঙ্গে এক্সট্রা কিছু টাকা দিয়েছি।
ভ্রু কুঁচকে গেলো মেয়েটার। একবার টাকা গুলোর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো
--এখনো তো মাস শেষ হয়নি আন্টি? এতো তাড়াতাড়ি বেতন দিয়ে দিচ্ছেন কেনো? আবার এক্সট্রা ও দিচ্ছেন? কেনো?
লুবনা বেগম নিজের মনে কথা গুলো গুছিয়ে নিলেন। মেহরিমার হাতে টাকাগুলো দিয়ে বললো
--তোমার আঙ্কেলের খুলনায় ট্রান্সফার হয়েছে৷ আজকে বিকালে আমরা ঢাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছি। কাল থেকে তোমাকে আর কাজে আসতে হবে না মেহের।
বুকের ভেতর ধক করে উঠলো মেহরিমার। হাতে ধরে রাখা টাকা গুলো দূর্বলতায় পড়ে গেলো নিচে। অবিশ্বাস্য চোখে তাকালো লুবনা বেগমের দিকে। আনমনে আওড়ালে
--চলে যাবেন?