ফন্ট সাইজ:
থিম:
আয় তবে সহচরী

24

লেখক: উম্মে_হাবিবা

                      “ এত দু তিন
                   বু নাচে তাদিন তাদিন
                       চাল পাঁচ চয়
                   বুউল উনেক ভয়

                      এত দু তিন
                   বুউল ওগায় দিম
                   ছাত নয় বালো
                  বু উনেক কালু”

ভাতের পাতিল নিয়ে ঘরে প্রবেশ করতেই পুতুলের এমন অদ্ভুত ছড়া শুনে থমকে গেলো শাহিদা নেওয়াজের চলন্ত পা যুগল। বোকার মতো ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো নিজের নাতনির দিকে। পুতুল তখন নিজের মতো খেলতে ব্যস্ত। কিছুদিন আগে মেহরিমার কিনে দেওয়া সেই প্লাস্টিকের বউ পুতুলটাকে টুকরো কাপড়ে সাহায্যে শাড়ি পড়ানোর চেষ্টা করছে। পুতুলটার মাথার কাছে দাঁত দিয়ে কামড়ে নষ্ট করে ফেললেও বাকিটা অক্ষত অবস্থায় রেখেছে সে। ঠোঁট চেপে বেশ মনযোগের সঙ্গে পুতুলটাকে কাপড়ে পেচিয়ে তবেই দম ফেললো মেয়েটা। প্রশস্ত হেঁসে নিজের ব্যবহৃত ছোট্ট ছোট্ট ক্লিপ,কালো রঙের একটা টিপ আর পাউডার দিয়ে পুতুলটাকে নিজের মতো সাজালো। পাতলা অধর জোড়া নেড়ে তখনও নিজের মতো বিরবির করে ছড়া কাটছে সে

“পাঁচ নয় বালো
মাম উনেক ভালো
তিন চয় নয়
খুকুমার জয়”

পুতুল বউ পুতুল টাকে নিজের মতো করে সাজিয়ে দু'হাতে সামনে উঁচু করে ধরলো। তীক্ষ্ণ চোখে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে দেখে মিষ্টি করে হাসলো। অতঃপর ফ্লোর থেকে উঠে বাইরে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতে নিলে পেছনে শাহিদা নেওয়াজকে দেখে থেমে গেলো। দাদীকে অমন মূর্তির মতো দাড়িয়ে থাকতে দেখে চোখ ছোট ছোট করে বললো

--ওকানে দালিয়ে আচো কেনো?

শাহিদা নেওয়াজ ক্লান্তির শ্বাস ফেলে ঘরে আসলো। ভাতের পাতিল নিচে রেখে নাতনির সামনে দাড়িয়ে গম্ভীর স্বরে শুধালো

--একটু আগে কি বলছিলি তুই?

--কি বলচিলাম?

--আমাকে নিয়ে কিসব যেন বলছিলি?

--কি বুলেচি তোমাকে? কিচুতো বলিনি। পুতু তো বউ সাজাচ্ছিলো। এই যে এই দেখো পুতুর নাল নাল বউ।

নিজের হাতের পুতুল টাকে দেখয়ি বললো পুতুল। শাহিদা নেওয়াজের চোখ জোড়া ছোট ছোট হয়ে গেলো। নাতনির দিকে ঝুঁকে বললো

--আবারও মিথ্যা কথা বলছিস?

সহসা দু'হাতে মুখ চেপে ধরলো পুতুল। চোখ দুটো বড় বড় করে আকাশ থেকে পড়ার ভান করে বললো

--আল্লাহ কিসব বুলচো বু। মিত্তে কতা আর আমি? অচম্বব বু। তুমি আমাকে মিত্তে মিত্তে দুষ দিতে পালো না বুলি। পুতু কখুনো মিত্তে বলে না। পুতু একতা নক্ষী মেয়ে। মাম বলে তো। তুমি চোনো না।

কোমড়ে হাত রেখে খুবই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথাটা বললো পুতুল। ভাবটা এমন তার মতো  দুধ দিয়ে ধোঁয়া তুলসি পাতা পৃথিবীতে আর একটাও নেই। গোল গাল ফর্সা মুখটা ইতোমধ্যে লাল টুকটুকে হয়ে গেছে। নাকের পাটা ফুলিয়ে শাহিদা নেওয়াজকে মেকি রা'গী রা'গী চোখে তাকিয়ে দেখছে।

নাতনির এমন গিরিগিটি রূপ দেখে ফোঁস করে একটা শ্বাস ফেললো শাহিদা নেওয়াজ। দু'পাশে মাথা নেড়ে ব্যর্থ স্বরে বললো

--তোর সঙ্গে পেরে ওঠা আমার কর্ম নয় রে বইন। তোকে সোজা করতে আমার মেহেরই যথেষ্ট। দাঁড়া আজ আসুক আমার মেয়ে তারপর দেখিস তোর পাকনা গিরি কিভাবে বের করি আমি।

দাদীর কথা গুলো যেন পাত্তায় দিলো না পুতুল। মাছি তাড়ানোর মতো হাত নেড়ে ভেংচি কাটলো। শাহিদা নেওয়াজ চোখ দুটো প্রসারিত করে বললো

--এই..এই তুই আমাকে ভেংচি কাটলি?

--হু কেতেছি,কি হয়েচে তাতে?

--কি হয়েছে মানে? দুই ইঞ্চি মুরগীর বাচ্চা আমাকে ভেংচি কাটিস। সাহস কতো তোর?

--আমাল উনেক সাহছ। থিক পাপার মতো। মাম বলে তো আমার পাপা কুমান্ডাল চিলো। উনেক সাহছী চিলো। ছাগরে তাকতো। ডিচুম ডিচুম কলে পঁচা নোক মে'রে বত্তা বানাতো।

শাহিদা নেওয়াজ চুপচাপ নাতনির কথা গুলো শুনলো। কে বলবে দুদিন পর এই মেয়ের তিনবছর হবে? এখনই তো ভাবটা এমন ধরে যেন সে পাঁচ-ছয় বছরের পাকনা বুড়ি। অথচ সাইজ দেখো,পুরো একটা হাঁসের বাচ্চা।

পুতুল দাদির থেকে কোনো প্রতিউত্তর না পেয়ে হাতের বউ পুতুল টাকে বুকে জড়িয়ে বাইরে যেতে নিলে পেছন থেকে শাহিদা নেওয়াজ মেয়েটার ঝুটি করা চুল টেনে ধরে। গমগমে স্বরে শুধায়

--তলপি তলপা গুছিয়ে কোথায় যাওয়া হচ্ছে শুনি?

চুলে টান পড়ায় কিছুটা ব্যাথা পেলো পুতুল। পিছু ফিরে দাদীর দিকে তাকিয়ে বললো

--দাদুল পঁচা বউ চুল ছালো আমাল।

--ছাড়বো না কি করবি?

--দাদুল কাচে বিচাল দিবো।

--কি বিচার দিবি?

--বলবো তুমাল পঁচা বউ আমাকে মেলে বত্তা বানিয়ে দিয়েচে। আমাল চুল টেনিচে। থাচ থাচ মেলে ব্যাতা দিয়েচে। মামকেও বুলে দিবো। তখন দেকবে কেমন বুকা খাও। হুহ..!

তিন বছরের এই নাতনির কাছে শাহিদা নেওয়াজ বরাবরই হেরে যান। এতোটুকু বয়সেই কেমন নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরায় তাকে। আরেকটু বড় হলে কি করবে আল্লাহ জানে।

শাহিদা নেওয়াজ পুতুলের হাত ধরে ঘরে আনলেন। দরজায় খিল দিয়ে ঘরের কাজে মন দিলেন। পুতুল কিছুক্ষণ গাল ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলে ও পরবর্তী গুটিগুটি পায়ে চলে গেলো জেসমিনের কাছে। আপাতত তার কাজ খুকুমার কাছে বু-র নামে নালিশ করা।

শাহিদা নেওয়াজ আড় চোখে নাতনির যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থেকে মুচকি হাসলো। বিরবির করলো

--ঝগ'ড়ুটের রাণী একটা।

মোবাইল ফোনের আওয়াজ পেয়ে শাহিদা নেওয়াজ কাজ থামিয়ে সেদিকে গেলো। ফোনটা হাতে নিয়ে অচেনা নাম্বার দেখে ভ্রু কুঁচকে ভাবতে লাগলো ধরবে কি ধরবে না। তার ভাবনার মাঝেই কলটা কেটে গেলো। সেকেন্ড কয়েক বাদে আবারও কল আসতে শাহিদা নেওয়াজ রিসিভ করে হ্যালো বলার আগেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো

--ছোট মেয়েকে চোখে চোখে রাখছো তো মা। বলা তো যায় না কখন কোন বিপদ ধেয়ে আসে।

ফোনের ওপাশ থেকে নিজের মেয়ের কন্ঠস্বর পেয়ে চমকে উঠলো শাহিদা নেওয়াজ। তরিঘরি করে ফোনটা কান থেকে নামিয়ে নম্বর দেখে পুনরায় কানে ধরলো। ওপাশ থেকে পুনরায় ভেসে এলো রমণীর স্বাভাবিক আওয়াজ

--আমাকে চিনতে পেরেছো তো মা। আমি..

--মুক্তা

*************************************
কড়া ঘুমের ইনজেকশনের পর অবশেষে চোখ মেলেছে শায়ের। শরীরের ব্যাথায় চোখ মুখ কুচকে ফেললেও কপালে হাত রেখে পিটপিট করে চোখ মেললো। আশে পাশে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলো আসলে সে কোথায় আছে।

তীব্র জীবাণুনাশকের কড়া ঝাঁঝালো গন্ধ। সাদা দেয়ালের একপাশে বড় জানালা, হালকা রঙের পর্দা। রুমের একপাশে রাখা সোফাসেট। মাথার ঠিক ওপরে দেয়ালে লাগানো ছোট্ট আলো, পাশে অক্সিজেনের আউটলেট, স্যালাইনের স্ট্যান্ড,বেডের মাথার পাশেই রাখা ছোট মনিটরে নিয়মিত ভেসে আসা হৃদস্পন্দনের বিপ বিপ আওয়াজ আর বেডের অন্য পাশে ছোট একটি টেবিলে ওষুধের প্যাকেট,ভাঁজ করে রাখা প্রেসক্রিপশন দেখে চট করে নিজের অবস্থান বুঝে ফেললো শায়ের। হসপিটালে আছে কথাটা মনে পড়তেই বিরক্তির মাত্রা তরতর করে বাড়লো তার। বাম হাত নাড়াতে নিলে ক্যানোলায় টান পড়ায় সেদিকে তাকালো। প্রতিদিনের মতো আজও স্যালাইন ঝুলানো দেখে ফোঁস করে একটা শ্বাস ফেললো। পর মূহুর্তেই চেচিয়ে বললো

--এসব বাল সাল আবারও কোন আবালে লাগাইছে আমার হাতে? এসব খোল এক্ষুনি খোল।

শায়েরের চেঁচানো শুনে বাইরে থেকে দৌড়ে এলো রাহুল। শায়েরকে বেডে বসে স্যালাইনের নল নিয়ে টানাটানি করতে দেখে আঁতকে উঠলো। তরিঘরি করে তার কাছে এসে হাতটা নিজের দিকে টেনে নিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বললো

--ভাই এসব কি পাগলামো করছো? স্যালাইনের নলে তো র'ক্তে উঠে গেছে। শান্ত হও।

রাহুল কে দেখেও শান্ত হতে পারলো না শায়ের। ধমকে বললো

--এসব বাল সাল আবারও লাইগাইছে কোন আবুলে?

শারেয়ের ধমক খেয়ে কেঁপে উঠলো রাহুল। মেকি হেঁসে বললো

--ইয়ে মানে আসলে ভাই তুমি তো অসুস্থ এই জন্যই..

--অসুস্থ বলে সারাক্ষণ এই বালডা হাতে লাগাই রাখতে হবে?

--তোমার শরীর দূর্বল তো তাই আর কি...

ছেলেটা নিচু স্বরে বললেও শায়ের শুনে ফেললো। খেক করে বললো

--কোন ছাগলে বলছে আমি দূর্বল? শায়ের এতো সহজে দূর্বল হয় না। তাকে দূর্বল করবে সেই বস্তু এখনোও পৃথিবীতে তৈরি হয়নি। বেয়াদবের বাচ্চা তুই আমার হাত ছাড়। এসব ঝামেলা খোল আমার হাত থেকে। খোল বলছি।

শায়েরের টানাটানিতে রাহুল শক্ত করে হাতটা ধরেও রাখতে পারছে না। কোনোমতে সামলে নিয়ে বারবার বলছে শান্ত হতে। ওদের চেঁচামেচিতে কেবিনে প্রবেশ করলো নার্স। শায়েরকে হাতের ক্যালোনা নিয়ে টানাটানি করতে দেখে বললো

--আরে আরে কি করছেন? ক্যানোলা নিয়ে অমন টানাটানি করছেন কেনো? থামুন।

নার্সটি শায়েরের কাছে এগিয়ে এসে হাত ধরতে নিলে তূরন্ত নিজের হাত সরিয়ে নিলো শায়ের। ধমকে বললো

--এই ম্যালেরিয়া দূরে সরুন। খবরদার যদি আমাকে ছোঁয়ার চেষ্টা করেছেন তো তখন দেখবেন আপনার কি অবস্থা করি আমি? আপনার ওই হাত দুটো এ'সি'ডে পু'ড়ি'য়ে পুরুষ মানুষ ছোঁয়ার শখ একদম জন্মের মতো ঘুচিয়ে দিবো। স্টুপিড মহিলা।

শায়েরের ধমকে যতটা না কেঁপে উঠেছে তার চেয়ে বেশি চমকে উঠেছে নিজের হাতের করুন পরিনতি শোনার পর। মারিয়া সহসা নিজের হাত দুটো পিছনে নিয়ে কাঁদো কাঁদো স্বরে বললো

--আমার হাত দুটো আপনার কি ক্ষ'তি করেছে স্যার? শুধু শুধু অবলাদের এমন শা'স্তি দিতে চাইছেন কেনো?

হসপিটালের চার দেওয়ালের কেবিনে বন্দি থেকে এমনিতেই শায়েরের মন মেজাজ খারাপ। শুধু মাত্র দাদুর জন্য বাধ্য হয়ে এখানে থাকছে সে। নয়তো তাকে আটকে রাখবে এমন সাহস কার আছে? মারিয়ার কথা শুনে শায়ের তার দিকে রা'গী চোখে তাকালো। ছলাৎ করে উঠলো রমণীর বক্ষস্থল। গুটিগুটি পায়ে রাহুলের পেছনে লুকাতে নিলে চট করে সরে গেলো সে। আত'ঙ্কিত স্বরে বললো

--কাছে আসবেন না আপু। মামলা ওয়ালী জানলে সত্যি সত্যিই আমার গায়ে এ'সি'ড ঢেলে দিবে। তখন আমার কি হবে বলুন? মেয়ে পটানোর আগেই ব্রেকআপ হয়ে যাবে।

মারিয়া অসহায় চোখে তাকালো রাহুলের দিকে। পরপর দেখলো শায়েরকে। লোকটা কেমন গম্ভীর হয়ে বসে আছে। মারিয়া মনে মনে ভেংচি কাটলো। মায়া মায়া চোখে দেখলো নিজের হাত দু'টোকে। শায়ের বললো

--অতো দেখে লাভ নেই। হাত বাঁচাতে চাইলে পুরুষ মানুষ ছোঁয়া থেকে নিজেকে সংযত রাখবেন। বেয়াদব মেয়েছেলে স্বামীর সম্পদ কিভাবে বিলিয়ে দিচ্ছে দেখো। ছ্যাহ..

মারিয়ার এবার ইচ্ছে করলো হাত পা ছড়িয়ে কাঁদতে। এমনিতেই শায়ের নামক আধপাগল মানুষকে সে যমের মতো ভয় পায়। সবসময় চেষ্টা করে একশো হাত দূরে থাকতে। তারপর ও কেমন কেমন করে যেন তার ডিউটি এই যমের দুয়ারেই পরে। আর এরপর শুরু হয় তার জান নিয়ে পালানোর সময়। মারিয়া ভয়ে শুষ্ক ঢোক গিলে বললো

--স্যার এটা তো আমার ডিউটি। পেশেন্টের হাত না ধরলে ইনজেকশন দিবো কেমন করে? হাতে ক্যানোলা লাগানো,সময়মতো মেডিসিন দেওয়া,প্রেসার চেক করা সবই আমাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে স্যার। না চাইতেও পুরুষ নামক পেশেন্ট গুলোকে আমার টাচ করাই লাগবে। কিচ্ছু করার নেই যে।

শায়েরের হয়তো উত্তর টা পচ্ছন্দ হলো। বিরক্ত নিয়ে বললো

--এতো কাহিনির চাকরি করতে কে বলেছিলো আপনাকে? আর কোনো জব খুঁজে পান নি?

--বাবা শখ করে নার্সিং পড়িয়েছিলো স্যার। এই জন্যই এই পেশায় ঢুকে পড়েছি।

শায়ের নিজের ফোনটা হাতে নিয়ে নিউজফিড স্ক্রোল করতে করতে বললো

--এরপর থেকে আমার কেবিনে আর আসবেন না। আপনি কেনো কোনো মেয়েই যেন না আসে। বোঝা গেলো।

শেষ কথায় মারিয়ার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তাক করলো শায়ের। মেয়েটা মেকি হেসে বললো

--অবশ্যই স্যার। প্রয়োজনে বাইরে সাইনবোর্ড লাগিয়ে দিবো “লেডিজ নট আ্যলাউড”।

মারিয়ার কান্ড দেখে রাহুল মুখে হাত চেপে মিটিমিটি হাসলো। শায়ের পুনরায় ফোনে দৃষ্টি রেখে গুরুগম্ভীর স্বরে বললো

--আপনার মহামান্য ডাক্তার স্যারকে ডেকে নিয়ে আসুন। গিয়ে বলুন আমি ডাকছি। এক্ষুনি এসে যেন দেখা দিয়ে যায়।

--জি স্যার।

মারিয়া একপ্রকার দৌড়েই কেবিন থেকে বেরিয়ে গেলো। রাহুল মিটিমিটি হেঁসে এসে বসলো শায়েরের পাশে। ফলের ঝুড়ি থেকে কমলার কোয়া শায়েরের হাতে দিয়ে বললো

--ভাই তুমি আসলেই একটা চীজ। কিভাবে মেয়েদের থেকে নিজেকে সেফ রাখো। ভবিষ্যত ভাবী আসলেই সৌভাগ্যবতী।

--শুনলাম সন্ধ্যার সঙ্গে দিনরাত ঝগড়া করিস। কথা টা কি সত্যি।

দপ করে রাহুলের হাসি নিভে গেলো। থতমত খেয়ে বললো

--এমন বাজে কথা কে বলেছে তোমায়?

--তারমানে ঝগড়া করিস না।

--মোটেই না। উল্টো মিস মামলা ওয়ালী দিনের মধ্যে ছত্রিশ বার আমাকে মামলার হুমকি দিয়ে তার সকল কাজ করিয়ে নেয়। ধরি বাজ মেয়ে কথায় কথায় মামলা ঠুকে দেওয়ার ভ'য় দেখায়।

শায়ের বাঁকা হাসলো। শান্ত স্বরে বললো

--দ্যাট গার্ল ইজ দ্য পারফেক্ট লাইফ পার্টনার ফর ইউ।

--কিছু বললে ভাই।

--না।

শায়ের আড়চোখে রাহুলের দিকে তাকিয়ে সূক্ষ্ম হাসলো। অতঃপর ফোনে মেসেজ টাইপ করলো

--প্রপোজের কাজ কতোদূর? এতো দিনেও একটা ছেলেকে পটাতে পারলি না।

তূরন্ত জবাব এলো অপর পাশ থেকে

--তোমার বেয়াদব ভাই একটু বেশিই লাজুক। কাছে গেলেই কেমন চিংড়ির মতো তিন লাফ দিয়ে দূরে সরে যায়। এমন করলে পটাবো কেমন করে তুমিই বলো।

শায়ের ঠোঁট টিপে হাসলো। লিখলো

--মানলাম ছেলেটা একটু বেশিই লাজুক। কোনোদিন ভয়ে মেয়েদের সঙ্গে কথা বলে নি। এজন্যই হয়তো তোকে তেমন পাত্তা দিচ্ছে না। তাই বলে তুই হাত পা গুটিয়ে বসে থাকবি? তোর থেকে এটা আশা করি নি বনু।

--তোমাকে কে বললো আমি হাত পা গুটিয়ে বসে আছি? খোঁজ নিয়ে দেখো তোমার লাজুল ভাইটি কেমন ভেতরে ভেতরে গলে শরবত হয়ে গেছে। ভাবের ঠ্যালায় প্রকাশ করছে না। তবে আমার নামও সুরাইয়া এমন ঘোল খাওয়াবো দৌড়ে এসে বলবে “জান প্লিজ বিয়ে মি। আদার ওয়াইজ আমি ডে'টে যাবো”।

ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে থেকেই কিছুটা শব্দ করে হেঁসে ফেললো শায়ের। রাহুল বোকার মতো তাকিয়ে থেকে বললো

--হাসছো কেনো ভাই?

শায়ের রাহুলের দিকে তাকিয়ে মুখটা আবার গম্ভীর করে ফেললো। নিরেট স্বরে বললো

--তোকে সব কথা বলতে হবে?

থতমত খেলো রাহুল। নিচু স্বরে

--না

--তাহলে যা করছিস তাতে মন দে।

ছেলেটা মন খারাপ করে ফল কাটায় মন দিলো। শায়ের আড় চোখে দেখে পুনরায় টাইপিং করলো

--ছেলেটা বড্ড একা বনু। ওকে কখনো কষ্ট দিস না। বাবা মা হারা এতিম ছেলেটাকে দেখে রাখিস। আমার অবর্তমানে ওর সকল দায়িত্ব তোর। আই হোপ ইউ্য'ল অলওয়েজ সারাউন্ড হার উইথ লাভ অ্যান্ড কেয়ার?

মেসেজটা পাঠিয়ে শায়ের অপেক্ষা করলো। সেকেন্ড কয়েক পর উত্তর এলো

--অফকোর্স ব্রো। তুম চিন্তা মাত কারো। সুরু ইজ হেয়ার,সো দেয়ার'জ নো ফেয়ার।

শায়ের মুচকি হাসলো। ফোনটা সাইডে রেখে চোখ বুজে বালিশে হেলান দিলো। রাহুলের দিকে না তাকিয়েই বুঝলো ছেলেটা গাল ফুলিয়ে আছে। অভিমানী চোখে বার-বার দেখছে শায়েরকে। কেনো জানি শায়েরের খুব হাসি পেলো। ছেলেটা নিজেকে যথা সম্ভব সংযত রেখে মুখটা গম্ভীর রাখার চেষ্টা করলো। ওভাবেই বললো

--আমাকে না দেখে কাজ কর। বেখেয়ালে হাত কা'টলে ডাবল খাৎনা করবো তোর।

************************************
সময়টা তখন মধ্যবিকেল। পূর্বের আকাশ জুড়ে আবছা কালো মেঘের ঘনঘটা। বৃষ্টি আসার সম্ভবনা না থাকলেও একেবারে অবহেলা করাও যায় না। দুপুর পর্যন্ত ধরিত্রী রৌদ্রময় উজ্জ্বল থাকলেও আবহাওয়া অফিসের তথ্য মতে নিউজে দেখানো হয়েছে--
“আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় দেশের আকাশ আংশিক মেঘলা থেকে মেঘাচ্ছন্ন থাকতে পারে। কোথাও কোথাও দমকা হাওয়াসহ বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। সার্বিকভাবে বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা প্রায় ৫০ শতাংশ। সেক্ষেত্রে কক্সবাজার,পার্বত্য অঞ্চল ও নদীর কেন্দ্রবর্তী এলাকায় সর্তক থাকার অনুরোধ করা হলো।”

নির্জন পার্কের কাঠের বেঞ্চে একা বসে আছে মেহরিমা। আনমনে তাকিয়ে আছে মেঘাচ্ছন্ন আকাশের দিকে। কিছুক্ষণ পরই হয়তো সূর্যদ্বয়ের দেখা মিলবে। আলোর সূক্ষ্ম রেখা বিলীন হয়ে পৃথিবী ছেয়ে যাবে আঁধারে। পাখিরা দলবেঁধে নীড়ে ফিরছে। পশ্চিমের কোণ ঘেঁসে একঝাঁক সাদা বক ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছে। মেহরিমা নিষ্প্রাণ চোখে সবকিছু দেখছে। দুদিনের ছোটাছুটির পর একটা রেস্টুরেন্টে ছোট একটা কাজ পেয়েছে সে। যে সময়টা বাসা বাড়ি আর স্টুডেন্ট পড়িয়ে পার করতো সে সময়টাতে এখন কাজ করে রেস্টুরেন্টে। বেতন আশানুরূপ না হলেও সংসার চলে যাওয়ার মতো অর্থ জোগার করতে সক্ষম হয়েছে সে। তবুও কোথাও একটা কিন্তু থেকে যাচ্ছে। সবকিছুর খরচ সামলানো এই অর্থ দ্বারা আদোও সম্ভব নয়? আবার নতুন টিউশনি পাওয়া কষ্টসাধ্য। বাজার খরচ আগের থেকে কমিয়ে আনলেও সেই ঘাটতি কিভাবে পূরণ করবে সেই চিন্তায় অস্থির রমণী।

মেহরিমা নিজের ভাবনায় এতোটাই বিভোর ছিলো যে ইতোমধ্যে তার পাশে একজন বসেছে সেদিকে তার কোনো খেয়ালই নেই। আগুন্তক মেহরিমার মনযোগ আকর্ষনের জন্য গলা খাকারি দিয়ে বললো

--হোলা মিস চ্যাপা শুঁটকি।

হঠাৎ পুরুষালি গম্ভীর স্বরে চমকে উঠলো অষ্টাদশী। তড়িৎ পাশে তাকিয়ে দেখলো কপালে ব্যান্ডেজ,হাতে ক্যানুলা আর হসপিটালের পোশাক পরিহিত শায়েরকে। শায়েরকে দেখে মেহরিমা বেশ অবাক হলো। আজ প্রায় আটদিন পর দু'জনের দেখা। সেই যে হসপিটাল থেকে শায়ের রে'গে মেগে বেরিয়ে গিয়েছিলো এরপর আর খোঁজ পায় নি তার। ভার্সিটির ক্যাম্পাস খুঁজেও দেখা মেলেনি। অথচ আজকে এই অবস্থায় দেখে বিস্মিত রমণী। শায়ের অবশ্য মেহরিমার দিকে বিশেষ খেয়াল দিলো। এলকোহলের বোতলে চুমুক দিয়ে গমগম স্বরে শুধালো

--এখানে একা একা কার জন্য অপেক্ষা করছেন? বয়ফ্রেন্ড আছে বুঝি?

নড়েচড়ে বসলো মেহরিমা। নিজের দৃষ্টি সামনে রেখে শান্ত স্বরে উত্তর দিলো

--বয়ফ্রেন্ড বিহীন বসে থাকা বারণ বুঝি?

শায়ের সূক্ষ্ণ হাসলো। বেঞ্চে হেলান দিয়ে বসে বললো

--বারণ নয় তবে আজকাল সব মেয়েরাই টাইম পাসের জন্য রিলেশন করে। এজন্যই জিজ্ঞেস করলাম।

তেছড়া নজরে তাকালো মেহরিমা। তাচ্ছিল্যে হেসে বললো

--ওসব থার্ডক্লাস মেয়েদের কাতারে পড়ি না আমি। ভালোবাসলে একজনকেই বাসবো নয়তো আজীবন সিঙ্গেল ঘুরবো তবুও কারোর সঙ্গে প্রতা'রণা করবো না।

শায়ের কেমন করে যেন হাসলো। আনমনে বললো

--অথচ আপনি ছোট থেকেই প্রতা'রণাতে পিএইচডি করে ফেলেছেন।

তূরন্ত শায়েরের দিকে তাকালো মেহরিমা। আশ্চর্য কন্ঠে বললো

--এক্সকিউজ মি। হোয়াট ডিড ইউ্য সে?

--নাথিং..

শায়েরের এমন হেয়ালি পনা ঠিক সহ্য হলো না মেহরিমার। একবার ভাবলো চলে যাবে। কিন্তু পরমুহূর্তেই শায়েরের এমন বিধস্ত রূপ দেখে নিজের মতামত পাল্টে ফেললো। যতই হোক লোকটা সেদিন তাকে বাঁচিয়েছিলো। অন্তত একটা ধন্যবাদ তার প্রাপ্য। মেহরিমা নিজেকে সামলে গলা খাকারি দিলো। শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করলো

--আপনার এই অবস্থা কেনো? হসপিটালের ড্রেস পড়ে বাইরে কি করছেন?

--কজ হসপিটাল থেকে পালিয়ে এসেছি। আপতত নিজেকে একটু সময় দেওয়ার জন্য এই জায়গা টায় বেস্ট মনে হয়েছে। অথচ এখানেও আপনি।

--হাত পায়ে এমন বেন্ডেজ কেনো? আপনি কি...

--এ'ক্সি'ডে'ন্ট করেছিলাম। মালবাহী ট্রাক অবশ্য আমাকে পি'ষে মে'রে ফেলতে চেয়েছিলো। কিন্তু পারে নি। হাহ! তাদের ব্যাড লাক..

শায়েরকে এমন স্বাভাবিক ভাবে এক্সি'ডেন্টের কথা বলতে দেখে অবাক না হয়ে পারলো না মেহরিমা। বিস্মিত স্বরে বললো

--আপনি এমন ভাবে বলছেন যেন এক্সি'ডেন্টে আপনার কাছে ভাত মাছের মতো।

--আমার জন্য সেরকমই।

--মানে

--অতো মানে খুঁজে কাজ নেই। চুপ থাকুন নয়তো চলে যান।

ধীরে ধীরে প্রকৃতি বৈরি হাওয়া ধারণ করছে। একটু আগের আবছা কালো মেঘ রূপ নিয়েছে ঘন কালো মেঘে। বইয়ে হালকা হাওয়া। মেহরিমা এতোক্ষণ খেয়াল না করলেও শায়েরের হাতে অদ্ভুত ডিজাইনের কাচের বোতল দেখে প্রশ্ন করলো

--এটা কি খাচ্ছেন আপনি? দেখে তো ভালো কিছু মনে হচ্ছে না।

শায়ের কাচের বোতলে ঝাঁঝালো তরলের দিকে তাকিয়ে একটু হাসলো। মাথা নিচু রেখেই বললো

--মেডিসিন খাচ্ছি।

--কিসের মেডিসিন?

শায়ের তীক্ষ্ণ চোখে  মেহরিমার দিকে তাকালো। ইতোমধ্যে তার চোখদুটো র'ক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে। শ্বাস ফেলছে কেমন ঘন ঘন। মেহরিমা শায়েরের ব্লু হ্যাজেল মিশেলের চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো

--কি হয়েছে আপনার? আপনাকে এমন বিষন্ন দেখাচ্ছে কেনো? অসুস্থ লাগছে? হসপিটালে নিয়ে যাবো আপনাকে?

শায়ের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে হিমশীতল কন্ঠে পাল্টা প্রশ্ন করলো

--এতো প্রশ্ন করছেন কেনো আপনি? অচেনা একজনকে এতো প্রশ্ন করার অধিকার কোথায় পেলেন..?

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে 24 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন