দিনের আলো বিলীন হয়ে ধীরে ধীরে ধরণীর বুকে ধরা দিচ্ছে অমানিশা। পাশের মসজিদ থেকে ভেসে আসছে মাগরিবের আযানের সুমধুর ধ্বনি। পশ্চিম আকাশে গুরগুর করে ডাকছে কালো মেঘ। দূর হতে দেখা মিলছে বিদ্যুতের সূক্ষ্ম ঝলকানি। দমকা হাওয়ায় ফুরফুরে শীতলতা। গাছের পাতা হাওয়ার তালে উড়ছে এদিক ওদিক। এমন বৈরি হাওয়ার মাঝেই নির্জন পার্কের কাঠের বেঞ্চে বসে আছে দুজন মানব-মানবী। শায়ের মাথা ঝুঁকিয়ে এলকোহলের ঝাঁঝালো তরল নাড়াচাড়া করলেও মেহরিমার নজর কালো মেঘেতে। অন্ধকারাচ্ছন্ন প্রকৃতির মাঝেই রমণী খুঁজে চলেছে না বলা অসংখ্য প্রশ্নের উত্তর। মাঝে মাঝে আড়চোখে দেখছে শায়েরের শান্ত মুখশ্রী। রমণীর মনে হাজারোও প্রশ্ন। গম্ভীর পুরুষের ওই ব্লু, হ্যাজেল মিশেলের চোখ জোড়া না চাইতেও বার বার তাকে নিয়ে যাচ্ছে অতীতে। মানস্পটে ভেসে উঠছে আবছা কিছু স্মৃতি। স্মৃতির পাতা হাতরে খুঁজে চলেছে ক্ষনিকের দেখা হওয়া প্রিয় একটি মুখশ্রী। যার কাছ থেকে প্রথম রপ্ত করেছিলো সংগীতের সূর। অপরিপক্ক হাতের টুংটাং আওয়াজে শিখেছিলো গিটারের তাল। সুরের অপার্থিব মূচ্ছর্নায় হারিয়েছিলো অন্য দুনিয়ায়। সময়ের স্রোতে সেই মুখশ্রী মস্তিষ্ক থেকে বিলীন হলেও স্মৃতি গুলো এখনও অমর। কঠিন বাস্তবতার আড়ালে সামান্য ফুরসত পেলেই মেহরিমা হারিয়ে যায় সেই স্মৃতিতে। কল্পনায় হাতরে খুঁজে তাকে।
টুপটাপ বৃষ্টির ছোঁয়ায় নিজ ভাবনা থেকে ছিটকে বেরিয়ে এলো রমণী। চমকে থমকে আশেপাশে তাকিয়ে নিজেকে ধাতস্থ করলো। বার কয়েক ঘন ঘন মাথা নাড়িয়ে নিজ মস্তিষ্কে বিচরণ করা অযাচিত ভাবনা গুলোকে দূর করতে চাইলো। শায়ের তখনও নির্বিকার বসে। ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছে কাচের বোতলের ঝাঁঝালো তরল। মেহরিমা বার কয়েক জোরে জোরে শ্বাস নিলো। অতঃপর নিজ মনে কথা সাজিয়ে ধীর স্বরে ডাকলো
--শুনছেন।
শায়ের তাকালো না। উত্তর ও দিলো না। কেমন মূর্তির ন্যায় বসে রইলো। মেহরিমা পুনরায় ডাকলো
--এই যে শুনছেন।
শায়েরের এমন নির্বাক ব্যবহারে ভেতরে ভেতরে বেশ চটে গেলো রমণী। নিজের মেজাজকে যথাসম্ভব শান্ত রেখে জিভে ঠোঁট ভেজালো। আপাতত তার কিছু প্রশ্নের উত্তর চায়। সেগুলো পেলেই পরবর্তীতে সিধান্ত নেবে সে। অতঃপর অত্যাধিক নরম স্বরে ডাকলো
--মিস্টার ব্যান্ডেজ ওয়ালা শুনছেন।
ডাকটা কর্ণগোচর হতেই অদ্ভুত নজরে তাকালো শায়ের। চোখ দুটো ছোট ছোট করে শুধালো
--হোয়াট ডিড ইউ্য সে?
--আপনাকে ডেকেছি।
--কি নামে ডাকলেন?
--“শুনছেন” বলে ডেকেছি।
--তার আগে কি বলে ডেকেছেন?
লোকটার গুরুগম্ভীর আওয়াজে কিছুটা ভরকায় রমণী। ভেতরের অস্থিরতা চেপে রেখে স্ফুর্ত স্বরে আওড়ায়
--ব্যান্ডেজ ওয়ালা।
বিরক্তিতে চোখ মুখ কুচকে ফেললো শায়ের। আগেও চেয়েও গুরুগম্ভীর স্বরে বললো
--আমার একটা নির্দিষ্ট নাম আছে। খবরদার আমাকে এসব উল্টা পাল্টা নামে সম্বোধন করবেন না।
সহসা মুখ বাঁকালো অষ্টাদশী। বিরবির করে আওড়ালো
--নিজে যখন আমাকে চ্যাপা শুঁটকি বলে ডাকে তখন কিছু হয় না। আর আমি বললেই দোষ। হুহ! এজন্যই বলে “নিজের বেলায় বেলতুলি পরের বেলায় কাঁ'টার খুলি”।
নিজের ভেতরের চোটপাট মনোভাবকে চেপে রেখে মেয়েটা পুনরায় মেকি হেঁসে বললো
--আপনার নাম তো জানি না। তাহলে ডাকবো কেমন করে? মিষ্টি করে নামটা বলে দিন তো। এরপর থেকে না হয় সেই নাম ধরেই আপনাকে স্বসম্মানের সঙ্গে মহাশয় যোগ করিয়া সম্বোধন করিবো জনাব ডট ডট ডট।
হুট করেই মেহরিমার এমন ভালো ব্যবহার ঠিক হজম হলো না শায়েরের। আড় চোখে মেয়েটার চোখদুটো সূক্ষ্ম নজরে অবলোকন করলো। ক্যানোলা লাগানো হাত দ্বারাই নিজের কপালে স্লাইড করতে করতে ঠোঁট কাঁমড়ে ফিচেল হাসলো। হেয়ালি করে বললো
--আমার নাম যেনে কি করবেন আপনি?
ফাটা বেলুনের মতো মেহরিমার হাসি হাসি মুখটা চুপসে গেলো। লোকটার অযথা কথা বাড়ানোয় বিরক্ত হলো খানিক। দাঁতে দাঁত চেপে শান্ত জবাবে বললো
--আমার দরকার আছে।
--কি দরকার?
--সব দরকার বলে দিলে নিজস্ব সিক্রেট থাকলো কি?
--নাম জানার সঙ্গে গোপনীয়তার কি সম্পর্ক?
--আপনাকে বলতে বাধ্য নই। আপনি আপনার নাম টা বলুন তো মশাই। আমি বাসায় যাবো। দেরি হয়ে যাচ্ছে আমার।
তড়িৎ মেহরিমার দিকে এগিয়ে এলো শায়ের। বেঞ্চের দু'পাশে দু'হাতের ভর রেখে রমণীর চোখের দিকে তাকিয়ে হাস্কিস্বরে বললো
--আমার কাছেই আমার নাম জানতে চাইছেন অথচ আমাকেই বলছেন কারণ বলতে বাধ্য নন। ব্যাপারটা একটু বেশিই সেনসিটিভ হয়ে গেলো না মিস মেহরিমা।
হঠাৎ করে শায়েরের এগিয়ে আসায় বক্ষস্থল ছলকে উঠেছে রমণীর। সর্বদা নিজেকে সাহসী জাহির করা মেয়েটা কেমন ভীত হরিণীর মতো পলক ঝাপটে ঝাপটে দেখছে শায়েরের কাঁ'টাছেড়া,ব্যান্ডেজে মোড়ানো গম্ভীর মুখশ্রী। ইচ্ছে করছে কয়েক স্তরে মোড়ানো কপালের ওই ব্যান্ডেজটায় একটু ছুঁয়ে দিতে। আচ্ছা লোকটা কি একটু বেশিই ব্যাথা পেয়েছে? হুট করেই মন গহীনে উদয় হওয়া উক্ত প্রশ্নে নড়েচড়ে বসলো রমণী। আড়ালে শুষ্ক ঢোক গিলে পুনরায় শান্ত দৃষ্টিতে অবলোকন করলো শায়েরকে। ব্লু,হ্যাজেল মিশেলের ওই চোখ জোড়ায় দৃষ্টি রেখেই কেমন আনমনে প্রশ্ন ছুড়লো
--এতোটা ক্ষ'ত হওয়ার পরেও আপনি এমন শান্ত কি করে? ব্যাথার অনুভূতি হারিয়েছেন বুঝি?
শায়ের শুষ্ক হাসলো। সহসা প্রতিউত্তরে বললো
--বহু বছর আগে অনাঙ্ক্ষিত প্রিয় একজন আমার মন খারাপের সঙ্গী হতো,রোজ সময় করে আমার বুকে জমা হওয়া সকল ব্যাথার গল্প শুনতো। নিজ উদ্যোগে সেই ব্যাথা উপশমের জরিবুটির ব্যবস্তা করতো। অতঃপর হঠাৎ একদিন দমকা হাওয়ার ভিরে সেই প্রেয়সী হারিয়ে গেলো। সঙ্গে করে নিয়ে গেলো আমার সকল অনুভূতি। ফলস্বরূপ এখন আমি অনুভূতিশূন্য।
শায়েরের ফিসফিসিয়ে বলা কথা গুলো শুনে হঠাৎ বক্ষস্থলে ঝড়ো হাওয়ার তান্ডব শুরু হলো মেহরিমার। তড়িৎ চোখজোড়া সরিয়ে ফেললো রমণী। অস্থির ভঙ্গিতে আশেপাশে তাকিয়ে নিজেকে শান্ত করতে চাইলো। কিন্তু বিধিবাম। মেহরিমার অস্থিরতাকে বাড়িয়ে দিতে আগাম সর্তক বার্তা ছাড়ায় ঝুমঝুম করে নেমে এলো বারিধারা। মূহুর্তেই ভিজিয়ে দিলো তাদের। বৃষ্টির ফোঁটা শরীরে স্পর্শ করতেই কেঁপে উঠলো রমণী। হড়বড়িয়ে চাইলো শায়েরের দিকে। সে পুরুষ নির্বিকার। হেলদোল বিহীন নিষ্পলক তাকিয়ে আছে মেহরিমাতে। পুনরায় কেঁপে ওঠে মেয়েটা। নিজের কাঁধ ব্যাগটা বুকে জড়িয়ে ব্যস্ত স্বরে আওড়ায়
--সরুন। যেতে হবে আমায়। রাত হয়ে যাচ্ছে।
শায়ের সরলো না। উল্টো দৃঢ় স্বরে বললো
--সামান্য দেরি হলে বুঝি খুব ক্ষ'তি হয়ে যাবে?
--বৃষ্টি পড়ছে সেদিকে খেয়াল আছে আপনার? কপালের ব্যান্ডেজ,হাতের ক্যানোলা ভিজে গেছে। বেশিক্ষণ এভাবে থাকলে ইনফেকশন হয়ে যাবে।
--হলে হবে। কি বা যায় আসে তাতে?
সহসা চোখ দুটো বুঁজে ফেললো রমণী। ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বললো
--আপনাকে স্বাভাবিক লাগছে না মিস্টার..
--শায়ের,, আমার নাম শায়ের। আপনি চাইলে নীড় বলেও ডাকতে পারেন। নয়তো আনসারী সাহেব।
“আনসারী সাহেব” নামটা মস্তিষ্কের প্রতিটি নিউরণে আন্দোলন চালালো রমণীর। ভীষন পরিচিত লাগলেও প্রশয় দিলো না সে। বরং কিছুটা রূঢ়স্বরে বললো
--দেখুন মিস্টার শায়ের আপনার নিজেকে নিয়ে কোনো চিন্তা না থাকলেও আমার আছে। প্লিজ সামনে থেকে সরুন আর আমাকে যেতে দিন।
--আনসারী সাহেব বলে ডাকতে ভয় পাচ্ছেন?
সামনে থেকে না সরে উল্টো প্রশ্ন করলো শায়ের। ভরকে গেলো রমণী। হঠাৎ করেই ধরা পড়ার ভয় জেঁকে বসলো অন্তরে। কিছুটা গম্ভীর স্বরে বললো
--ভয় পাবো কেনো?
শায়ের ঠোঁট উল্টালো। কেমন বাচ্চাদের মতো করে বললো
--পাচ্ছেন না কেনো? আমি চাই আপনি একটু ভয় পান। ভীষন ভীষন ভয় পান। আপনার এই অতিরিক্ত সাহসী ভাবটা আমার ঠিক সহ্য হয় না মেহরিমা। আমার জন্য হলেও আপনি একটু ভয় পাবেন? প্লিজ একটু ভয় পেয়ে দেখান মেহরিমা। আপনি একটু ভয় পেলে আমি ভীষণ খুশি হবো।
সবসময় গুরুগম্ভীর হয়ে থাকা শায়েরের মুখে এহেন কথা শুনে বোকা বোনে গেলো মেয়েটা। তড়িৎ লোকটার দিকে তাকালো। লালচে বর্ণের ঘোলাটে চোখজোড়ার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে বুঝে গেলো আসল কাহিনি। নাকমুখ কুচকে ফেললো রমণী। বিতৃষ্ণা নিয়ে বললো
--নেশা চড়ে গেছে আপনার? এজন্যই তো এমন ভুলভাল বকছেন। যাইহোক আপাতত সামনে থেকে সরুন নয়তো এই ঝুম বৃষ্টিতে দু'জনেরই নিউমোনিয়া হবে।
বৃষ্টির পানিতে ভিজে জুবুথুবু দু'জনেই। শায়ের মুখ তুলে আকাশের দিকে তাকালো। কয়েক সেকেন্ড চোখ বুঁজে অনুভব করলো বৃষ্টির ঝুমঝুম ধ্বনি। মেঘের গুরগুর আওয়াজ,বিদ্যুতের ঝলকানি,দমকা হাওয়া,ঝিরিঝিরি বৃষ্টি আর সোডিয়ামের হলদে আলোয় মূহুর্তটাকে রোমাঞ্চকর মনে হলেও এই মূহুর্তে মেহরিমার কাছে এটি বি"ষা"ক্ত উল্কার ন্যায়। বুকের মাঝে আন্দোলন করা ভোঁতা অনুভূতির জন্য বিরক্তির মাত্রা বেড়েছে তার। খুব করে চাইলো এই পুরুষের থেকে পালাতে। কিন্তু পাষাণ পুরুষ সে কথা শুনলে তো। শায়ের হুট করেই দু'পাশে মাথা ঝাকালো। চুলের সকল পানি ছিটকে গেলো বাইরে। কিছুটা গিয়ে পড়লো মেহরিমার চোখ মুখে ও। ত্রস্ত কেঁপে উঠলো অষ্টাদশীর হৃৎপিণ্ড। ধুকপুক ধুকপুক আওয়াজ তুললো প্রচন্ড বেগে। সেই আওয়াজে ভরকায় রমণী। চটক কাটার ন্যায় ত্রস্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ শায়েরের দিকে। যে মানব আগে থেকেই নজরে রেখেছে তাকে। ধক করে ওঠে রমণীর বক্ষস্থল। জিভে ঠোঁট ভিজিয়ে জিজ্ঞেস করলো
--চোখের দিকে এভাবে তাকিয়ে আছেন কেনো?
শায়ের শান্ত অথচ মাদকীয় স্বরে প্রতিউত্তর করলো
--হারিয়ে যাওয়া অনুভূতির সন্ধান করছি।
অবুঝের ন্যায় ফের প্রশ্ন করলো রমণী
--হারিয়ে যাওয়া অনুভূতি?
--হুম
দুজনের মধ্যে কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা নেমে এলো। শায়েরের চোখে দৃষ্টি রেখে মেহরিমা বললো
--অনুভূতি পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেছেন নাকি এখনও কিছুটা অবশিষ্ট আছে?
জিভে গাল ঠেলে শব্দহীন হাসলো ছেলেটা। ধীরস্বরে আওড়ালো
--যার বিলীন হবার ভয় নেই তার জন্য অবশিষ্ট শব্দটা স্রেফ মূল্যহীন নয় কি?
বক্ষস্থলের অদ্ভুত আন্দোলনে কেঁপে ওঠে মেয়েটা। অজানা অনুভূতির টানে সাহস করে শুধায়
--অনুভূতি পুনরায় ফিরে এলে তাকে গ্রহন করবেন নাকি ভুল বুঝে দূরে সরিয়ে দেবেন?
শায়ের মেহরিমার দিকে নিষ্প্রাণ চোখে তাকালো। বাদামি চোখজোড়ায় খুব গোপনে খুঁজে চললো লুকিয়ে রাখা অনুভূতিদের। উত্তর পেয়ে হয়তো হাসলো কিছুটা। প্রচন্ড বৃষ্টির তোপে সেই হাসি মেয়েটার দৃষ্টির আড়ালে রয়ে গেলো। মেহরিমা কিছুটা আশা নিয়ে শায়েরের দিকে তাকিয়ে রইলো। বাদামি চোখজোড়ায় অদ্ভুত কাঁপন। বৃষ্টির ছোঁয়া,মেঘের গর্জন আর বৈরি হাওয়ায় বিলিয়ে দিতো চাইলো অন্তঃপুরে জমিয়ে রাখা না বলা প্রতিটি শব্দ। শায়ের অমানিশার মাঝেও মেয়েটার সেই তৃষ্ণার্থ নয়ন জোড়ার ভাষা হয়তো বুঝলো। অতঃপর খুব গোপনে ফিসফিসিয়ে মাদকীয় স্বরে সুর তুললো
~যদি একটি বারও পারতো
সব চিন্তা ভুলে আসতে
আমি সব হারাতাম তাকে পেতে হায়
কবে পায়ের শেকল খুলবে
আর প্রেমের পর্দা উড়বে
আমি চেয়ে থাকি সেই দিনের সীমানায়~