ফন্ট সাইজ:
থিম:
আয় তবে সহচরী

26

লেখক: উম্মে_হাবিবা

রান্নাঘরের ঝনঝন আওয়াজ পেয়ে তরিঘরি করে ছুটে এলো সন্ধ্যা। আশেপাশে তাকিয়ে নজর পড়লো ফ্লোরে। ঝকঝক টাইলসের মেঝেতে তেল চুকচুকে ভাজা মাছ গুলো গড়াগড়ি খাচ্ছে। আর সেগুলোই ফুরফুরে মেজাজে বসে বসে খাচ্ছে সাদা কালো মিশ্রনের একটি হুলো বেড়াল। স্টিলের থালাটা ও তার থেকে একহাত দূরে উল্টে পড়ে আছে। বেড়ালকে মাছ খেতে দেখাই মাথায় হাত পড়লো সন্ধ্যার। চঞ্চল নয়নে খোঁজ করলো রাহুলের। কিন্তু সে বান্দার টিকিটার ও দেখা মিলছে না। রাহুলকে না পেয়ে নিরাশ হলো মেয়েটা। চঞ্চলা হরিণীর মতো ছুটে গেলো বেড়ালের কাছে। নিঃশব্দে মেঝেতে বসেই খপ করে ধরলো বেড়াল টা কে। খাওয়ার মাঝে বিঘ্ন ঘটায় বিরক্ত হলো বোবা প্রাণী। আওয়াজ তুললো তার স্বরে

--মিউউউ..মিউউউ

সহসা ধমকালো সন্ধ্যা। চোখ রাঙিয়ে বললো

--এই চুপপপ। চোর বিল্লুর আবার তেজি গলা। ফাজিল বেড়াল চুরি করে মাছ খাওয়া হচ্ছে। দাঁড়া আজ তোর মাছ খাওয়া বের করছি আমি। দুষ্টু বেড়াল প্রতিদিন চুরি করে খেতে না পারলে শান্তি হয় না তোর। ছোঁচা কোথাকার।

মাথার কাছে খামচে ধরায় ছটফটিয়ে উঠছে প্রাণীটি। বারবার চেষ্টা করছে ছাড়া পাওয়ার। কখনো কখনো তেজি মোটা স্বরে আওয়াজ তুলছে

--মেওওওওও...মেওওওও

উল্টে এসে নখের আঁচড়ে করতে চাইছে আত্মরক্ষা। কিন্তু তার চেষ্টায় এক বাতলি পানি ঢেলে সন্ধ্যা বেড়ালটাকে দু'হাতে জাপটে ধরলো। নিজের ঘর থেকে দড়ি এনে পটু হাতে সেকেন্ডের মাথায় বেঁধে ফেললো বিড়ালের হাত পা। নেইলকাটার এনে দক্ষ হাতে কেটে দিলো ধারালো নখ গুলো। প্রতিবারই ছটফটিয়ে উঠলো প্রাণীটি। কিন্তু দৈত্য সমতুল্য মনুষ্য জাতি থেকে মুক্তি পেলো না। নিজের কাজ শেষ করে প্রশস্ত হাসলো রমণী। বিড়ালটাকে সোফায় শুইয়ে রেখে উঠে দাঁড়ালো। কোমড়ে এক হাত রেখে আঙুল তুলে কিছুটা শাসানোর স্বরে বললো

--বেয়াদবের ছাও আর কখনো আমাকে খামচি দেওয়ার চেষ্টা করবি? দুই ইঞ্চির শরীর নিয়ে আমাকে তেজ দেখানোর সাহস করবি? চুন্না বেড়াল। রোজ রোজ এসে মাছ গুলো চুরি করে খেয়ে যাবি আবার মুখে করে প্রেমিকার জন্য নিয়েও যাবি। বিড়াল জাতি তবুও প্রেম দেখো সোনায় সোহাগা মাখোমাখো। প্রেমিকাকে খুশি করতে চুরি পর্যন্ত করছে। আজ আসুক তোর মালিক। জরিমানা সহ তাকে আটক করবো। এরপর বোঝাবো এই সন্ধ্যা কি জিনিস।

রা'গে ফোসফাস করছে সপ্তদশী। বিড়াল মাছ খেয়েছে এই নিয়ে তার কোনো মাথা ব্যাথা নেই। আসল রা'গ বিড়ালের প্রেম করা নিয়ে। সে মানুষ হয়ে এখনও একটা ছেলে পটাতে পারলো না অথচ এই বিলাই কিনা দু দুটো বউ সহ পরকীয়া ও করছে। ব্যাপরটা ভীষন ইগোতে লাগলো সন্ধ্যার। কটমট চাহনিতে ভস্ম করে দিতে চাইলো ছাড়া পাওয়ার জন্য ছটফট করতে থাকা হুলো বেড়ালকে। ধপ করে বসলো বিপরীত সোফাটায়। সেখান থেকেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ঝা'ঝড়া করে দিতে চাইলো অবলা বোবা প্রাণীকে।

মিনিট দশেক পর দরজার লক খোলার শব্দ হলো। রাহুল বাহিরের জুতা খুলে ঘরের জুতা পরে ঘরে প্রবেশ করলো। হাতের বাজারের ব্যাগটে সাইডে রেখে বিশাল সাইজের তরমুজ টা দু'হাতে আগলে নিয়ে চটপটে পায়ে ডাইনিং  টেবিলের কাছে এগিয়ে গেলো। তরমুজ টা টেবিলের উপর রেখে স্বস্তির শ্বাস ফেললো। বাজারের ব্যাগ থেকে প্রয়োজনীয় সামগ্রী গুলো একে একে বের করতে নিয়ে স্ফুর্ত স্বরে ডাকলো সন্ধ্যাকে

--মিস মামলা ওয়ালী দেখে যান আপনার জন্য কি এনেছি।

উত্তর এলো না ওপাশ থেকে। রাহুল পুনরায় বললো

--সন্ধ্যা কোথায় আপনি? ওই কিরে কিরে মধূ মধূ খাবেন না। দ্রুত আসুন। নয়তো সব কিন্তু আমি একাই জুস আর পুডিং বানিয়ে খেয়ে ফেলবো। তখন কিন্তু হাত পা ছড়িয়ে বায়না ধরলেও পাবেন না।

বেশ রসিকতার স্বরেই কথা টুকু বললো রাহুল। ঠোঁটে তার প্রানবন্ত মুচকি হাসি। সেকেন্ড পার না হতেই ড্রয়িং রুম থেকে ভেসে এলো সন্ধ্যার গমগমে গম্ভীর স্বর

--আমি এখানে। আপনার ওই কিরে কিরে মধূ মধূ রেখে এখানে আসুন। গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে।

অসময়ে সন্ধ্যার এমন গম্ভীর স্বর শুনে ঠোঁটের হাসি বিলীন হলো রাহুলের। ভ্রু দ্বয় কুঁচকে সন্দিহান চোখে তাকালো সোফার দিকে। যেখানে পায়ের উপর পা তুলে গম্ভীর বদনে বসে আছে মেয়েটা। রাহুলের মনে সংশয় জাগলো। মস্তিষ্ক হাতড়েও মন মতো কোনো উত্তর খুঁজে পেলো না। ভাবনায় পড়লো ছেলেটা। সে কি আবারও কোনো অঘটন ঘটিয়ে ফেললো? কিন্তু এমন কিছু করেছে বলে তো মনে পড়ছে না। আজ তো সারাদিনের সন্ধ্যার ধারে কাছে ঘেঁসে নি। তার সাজুগুজুর জিনিসে দুষ্টুমি করে কালি দেয় নি। তাকে সবসময় জ্বালাতন করার জন্য প্রতিশোধ হিসেবে বাথরুমের সুইচ অফ করে ভূতের ভয় ও দেখায় নি। তবে মেয়েটা এতো রে'গে আছে কেনো?

--কি হলো আসছেন না কেনো? আপনাকে আনার জন্য এখন সোনার পালকি ভাড়া করতে হবে আমার?

রাহুলের ভাবনার মাঝেই সন্ধ্যার বাজখাঁই কন্ঠের ধমকে কেঁপে উঠলো ছেলেটা। তরিঘরি করে মশলার ব্যাগ টেবিলের রেখেই হুড়মুড়িয়ে দৌড়ে এলো। ঠিক সন্ধ্যার সামনে এসে ব্রেক কষে হাঁপাতে হাঁপাতে বললো

--জি..জি বলুন কি হয়েছে?

ধারালো দৃষ্টিতে তাকালো সন্ধ্যা। চোখমুখ জুড়ে রা'গের আভা স্পষ্ট। থেকে থেকে সাপের মতো ফোঁস ফোস করছে। শ্যামলা মুখশ্রী জুড়ে লালচে আভা। এই বুঝি রাহুলের উপর তার লঙ্কা কান্ডো শুরু করলো। রমণী এমন ঝাঁঝালো রূপ দেখে ভয়ে শুষ্ক ঢোক গিললো ছেলেটা। মেকি হেঁসে বললো

--এনিথিং রং মিস মাম...ইয়ে মানে সন্ধ্যা আ..পু। আপনাকে কেমন জানি লাগছে? অতিরিক্ত মরিচ খেয়েছেন বুঝি? নয়তো কান থেকে এমন অদৃশ্য ধোঁয়া বের হচ্ছে কেনো?

তড়িৎ উঠে দাঁড়ালো মেয়েটা। আতঙ্কে দুপা পিছিয়ে গেলো রাহুল। ভয়ে চোখ দুটো খিঁচে বন্ধ করে ফেললো। আজকাল এই মেয়েকে তার ভীষণ ভ য় করে। কথাও বলে মেপে মেপে। অথচ হুটহাট রে'গে যায় রমণী। কারণ ছাড়ায় সাবান,সোডা বিহীন ধূয়ে দেয় রাহুলকে। হুমকি স্বরূপ ছুড়ে দেয় গোটা কয়েক মা'মলা। কথার পরতে বুঝিয়ে দেয় আমার কথা না শুনলে আজীবন জেলের চৌদ্দ শিকে আটকে রাখার ব্যবস্থা করবো।

রাহুলের নিজস্ব ভাবনার মাঝেই ভেসে এলো সন্ধ্যার বাজখাঁই ধমক। সপ্তদশী রমণী তেজী স্বরে আওড়ালো

--উজবুক নিরামিষ ব্যাটাছেলে। আপনার মতো বদল আমি জীবনে দেখি নি। আগে জানতাম সুন্দরী মেয়েদের বুদ্ধি থাকে হাঁটুতে অথচ এখন দেখছি সে কথা সম্পূর্ণ উল্টো। আসল কথা হলো ধলা পুরুষের বুদ্ধি থাকে পায়ের তলায়। আর মাথায় থাকে এক খাবলা গোবর। গবেট,রসকসহীন ছ্যাবলা মার্কা ব্যাটা। এই আপনি আদোও পুরুষ তো?

শেষ কথার ভারে তড়াক করে চোখ মেললো রাহুল। নিজের সাফাই গাওয়ার মতো তূরন্ত জবাব দিলো

--এসব আপনি কি বলছেন আপু? আমি মনে, প্রাণে,দেহে, মস্তিষ্কে, হাটা চলায়,চেহারায় ১০০% খাঁটি পুরুষ। এই চিরন্তন সত্যে কোনো ভুল নেই। দয়া করে আমাকে থার্ড জেন্ডার মনে করে ভুল করবেন না। শ্বাসপ্রণালিতে কিডনি লক হয়ে যাওয়ার ভয় জাগে। 

পুরো মুখশ্রী জুড়ে এক আকাশ সমান মলিনতা নিয়ে কাঁদো কাঁদো স্বরে কথাগুলো বললো রাহুল। অথচ নাক মুখ কুঁচকে মুখটাকে তিতকুটে বানিয়ে ফেললো সন্ধ্যা। গজগজ করতে করতে পুনরায় গিয়ে বসলো সোফাতে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে রাহুল এক দু পা করে সরে যেতে নিলে সহসা ডেকে উঠলো হুলো বিড়ালটা। ঘরের মধ্যে বিড়ালের আওয়াজ শুনে চমকে উঠলো রাহুল। তূরন্ত পিছু ফিরে সোফার মাঝে হাত পা বাঁধা অবস্থায় সাদা কালো বিড়ালটা দেখে বোকা বোনে গেলো। একবার বিড়াল আরেকবার সন্ধ্যার দিকে তাকিয়ে বিস্মিত স্বরে প্রশ্ন করলো

--অবলা প্রাণীকে এভাবে বেঁধে রেখেছে কে?

--আমি।

সেকেন্ডে জবাব দিলো সন্ধ্যা। ভ্যাবাচ্যাকা খেল রাহুল। পিটপিট করে তাকিয়ে পুনরায় শুধালো

--বেচারা দোষটা কি?

সন্ধ্যা একরাশ বিতৃষ্ণা নিয়ে আওড়ালো

--চুন্না বেড়াল রান্নাঘর থেকে ভাজা মাছ চুরি করে খেয়েছে। এই জন্য শা'স্তিস্বরূপ ওকে আটকে রেখেছি। জমেলা খালা আসলে জরিমানা নিয়ে তারপর মুক্ত করবো। এর আগে কোনো ছাড়াছাড়ি নেই।

ভরকে যাওয়া চেহারা নিয়ে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লো রাহুল। দুঃখী দুঃখী মুখ বানিয়ে অসহায় চোখে বিড়ালটার দিকে তাকিয়ে রইলো। বার কয়েক অনুনয়-বিনয় করলো সন্ধ্যার কাছে। অথচ অপারগ রমণী। নিজের সিধান্ত থেকে একচুল পরিমাণও সরলো না। আধাঘন্টা পর কলিংবেল বাজার আওয়াজ পেয়ে ঝড়ের গতিতে উঠে গেলো সন্ধ্যা। দরজা খুলে ওপাশে জমেলা খালাকে দেখে মিষ্টি করে হাসলো। কন্ঠে বিনম্র শ্রদ্ধা ঢেলে সালাম দিলো

--আসসালামু আলাইকুম খালা। ভালো আছেন তো?

হঠাৎ কান্ডে চমকে উঠলো ভদ্রমহিলা। সন্ধ্যার এখানে থাকার দুমাস পার হয়েছে। অথচ কখনো ওনাদের তেমন কথা হয়নি। পাশাপাশি থাকলেও কেউ কারোর বাসায় তেমন যাতায়াত করেনি। কিন্তু আজকে এই মেয়ের এমন ব্যবহারে হতবাক সে। ভদ্রমহিলা ধরে বেঁধে জোড় একটু হাসলেন। সন্ধ্যা তখনও হাসিহাসি মুখে তাকিয়ে আছে। পরিস্থিতি সামলাতে ছোট করে উত্তর দিলেন তিনি

--ওয়ালাইকুম আসসালাম। আমি ভালো আছি। তুমি ভালো আছো?

সন্ধ্যা বিরবির করলো

--একটু পর আর ভালো থাকবেন না।

পরমুহূর্তেই মিষ্টি হেঁসে বললো

--জি আমিও অনেক ভালো আছি। আপনাকে দেখে একটু বেশি ভালো আছি। খালা বাহিরে দাঁড়িয়ে আছেন কেনো? ভেতরে আসুন। আসুন আসুন। আমার হাতের স্পেশাল চা বানিয়ে খাওয়াবো আপনাকে। জলদি আসুন।

সন্ধ্যাকে সামনে থেকে সরে দাঁড়িয়ে ঘরে ঢোকার জায়গা করে দিলো। অপ্রস্তুত হলে ভদ্রমহিলা। কোনোরকমের আওড়ালেন

--এসবের কোনো দরকার নেই গো। আমি শুধু আমার হুলোর খবর জানতে এসেছি। ও কি তোমাদের বাসায় এসেছে?

সন্ধ্যা মিছেমিছি ভাবার অভিনয় করলো। চট করে বললো

--ওই সাদা কালো চুন্না বেড়ালটা? সবার বাসা থেকে চুরি করে মাছ খায়। আবার কিছু নিজের প্রেমিকার জন্যও নিয়ে যায় ওর কথা বলছেন? পাশের বাড়ির বাদামি বেড়ালটির সঙ্গে যার লুকোচুরি পর"কীয়া সেই বিড়ালের কথা জানতে চাইছেন?

হাসি হাসি মুখটায় ঝুপ করে আঁধার নেমে এলো জমেলা বেগমের। সন্ধ্যা নিষ্পাপ চেহারায় টেডি স্মাইল দিয়ে পুনরায় তাগাদা দিলো ঘরে আসার। দেনা মোনা করে ঘরে ঢুকলেন তিনি। সোফায় বসতে গিয়ে নিজের আদরের হুলোকে হাত পা বাঁধা অবস্থায় দেখে চিৎকার দিয়ে আহাজারি করলেন

--একি আমার হুলোকে এভাবে বেঁধে রেখেছো কেনো? খোলো খোলো এক্ষুনি খোলো।

ভাবলেশহীন সন্ধ্যা। উপায় না পেয়ে রাহুল নিজেই বিড়াল টাকে মুক্ত করে জমেলার হাতে দিলেন। ভদ্রমহিলা নিজের প্রাণপ্রিয় হুলোকে পেয়ে বুকে আগলে নিলেন। গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করলেন। সন্ধ্যাকে রে'গে কিছু বলতে গেলে থেমে গেলেন রাহুলের ইশারায়। কটমট দৃষ্টি নিয়েই সোফায় বসলেন।

*****************************
শায়েরের অসুস্থতার দোহায় দিয়ে ইমোশনাল ব্ল্যকমেইল করে তবেই ছেলেটাকে শান্তি নিবাসে আনতে সক্ষম হয়েছে বশির আনসারী। কড়া কন্ঠে বলেছে সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত এ বাসা ত্যাগ করলে চিরদিনের জন্য বশির আনসারী সংসার ত্যাগী হবেন। কাউকে কিছু না বলেই চলে যাবেন দূরে। দাদুর এমন কথার বিপরীতে শায়ের শুধু বিরক্তির শ্বাস ফেলতে পেরেছে। মনের বিরুদ্ধে গিয়ে থাকতে শুরু করেছে শান্তি নিবাসে।

শান্তি নিবাসে শায়েরের অবস্থান আজ একমাস তেরোদিন। অথচ এই এক মাসেই দোলা বেগমের হাড় মাংস জ্বালিয়ে ছেড়েছে সে। বাসার সবাইকে বাদ দিয়ে নিজের সকল কাজ করিয়েছে তাকে দিয়ে। খাবার দেওয়া থেকে শুরু করে কাপড় ধোঁয়া সবকিছু দোলা বেগম দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করেছে। শ্বশুরের ভয়ে কিছু বলতে পারে নি।

শায়ের নিজের ঘরে বসে ল্যাপটপে কাজ করছিলো। চোখমুখ অস্বাভাবিক গম্ভীর। দেখেই বোঝা যাচ্ছে মন মেজাজ খুব একটা ভালো নেই তার। তখনই রুমে এলো দোলা বেগম। শায়েরের কফির মগটা শব্দ করে রাখলো টেবিলের উপরে। কিছুটা চেচিয়েই বললো

--আমাকে কি তোমার চাকর পেয়েছো নীড়? সামান্য কফির জন্য ও আমাকে ডাকার কারণ কি?

ল্যাপটপে নজর রেখেই সূক্ষ্ম হাসলো শায়ের। খোঁচা মে'রে বললো

--আপনি তো দাসীই। আগে ছিলেন এই বাড়ির নাম বিহীন দাসী। এখন হয়েছেন বউ ট্যাগের দাসী। অন্যের বরকে যেমন ছলেবলে কৌশলে মেধা খাঁটিয়ে নিজের করেছেন তেমন করে না হয় শরীর খাঁটিয়ে একটু কাজও করলেন। আর যাই হোক ফ্রী ফ্রী তো আপনাকে বসে খাওয়ানো যায় না।

শায়েরের কথায় দোলা বেগমের মনে সূক্ষ্ম ভয়ের আভাস পেলো। আড়ালে শুষ্ক ঢোক গিললো সে। চিবিয়ে চিবিয়ে বললো

--আজকাল বেশ মুখ চলছে তোমার। এক্সিডেন্ট করেও জবানের তেজ কমেনি।

শায়ের এবার শব্দ করেই হেঁসে ফেললো। কফির মগটা হাতে নিয়ে আয়েশ করে তাতে চুমুক দিলো। বিছানার হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে তাচ্ছিল্য দৃষ্টিতে দেখলো দোলা বেগমকে। সময় নিয়ে বললো

--আপনার জন্য মাঝে মাঝে আমার খুব মায়া হয় জানেন।

--কি বলতে চাইছো?

--বলতে চাইছি এতো কষ্ট করে একেকটা প্ল্যান করলেন অথচ একটাতেও সফল হতে পারলেন না। হুট করেই নিজের এমন ব্যর্থতা দেখে সহ্য করতে পারছেন না বুঝি? আপনি চাইলেই আমি নিজে আপনাকে বেশ মশলাদার একটা প্ল্যান বলে দিতে পারি। গ্যারান্টি দিয়ে বলছি একটুও ফেইল যাবে না।

দোলা বেগম কিছুটা চমকে উঠলেও প্রকাশ করলো না। একইরকম রুক্ষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো শায়েরের দিকে। শায়ের নিরুত্তর। আয়েশ করে কফি খেতে ব্যস্ত। অথচ চোখের ভাষায় জেনো বুঝিয়ে দিচ্ছে দোলা বেগমের আসল অবস্থান।

--ছোট তোকে বায়েজিদ ডাকছে।

রজিনা বেগমের ডাকে নড়েচড়ে দাঁড়ালো দোলা বেগম। যাওয়ার আগে শায়েরের উদ্দেশ্যে হিসহিসিয়ে আওড়ালো

--তোমাকে আমি দেখে নেবো নীড়। সমস্ত অপমানের হিসেব কড়ায় গন্ডায় তুলবো।

শায়ের শুধু হাসলো। শান্ত স্বরে প্রতিউত্তর করলো

--আমি হিসেব নেওয়া শুরু করলে আপনি শ্বাস নিতে পারবেন তো মিসেস লো'ভী? মনে রাখবেন আমি একবার হিসেব নেওয়া শুরু করলে মৃ'ত্যু ছাড়া আপনাদের কিন্তু রেহাই মিলবে না। অতএব স্বামী স্ত্রী দুজনেই খুউউউব সাবধান।

********************************
আনমনে ক্লাসের মাঝ বেঞ্চ বরাবর বসে আছে মেহরিমা। তার পাশেই শায়েরী আর ফাইজা। দু'জনেই ফিসফিস করে কথা বলছে। কখনো বা হেঁসে উঠছে গা দুলিয়ে। ক্লাসে তখন ব্যবসায় সংগঠন সম্পর্কে বোঝাচ্ছে স্যার। সকল স্টুডেন্টের মনোযোগ সেদিকে। গুরুত্বপূর্ণ টপিক গুলো টুকে নিচ্ছে খাতায়। মাঝে মাঝে মেহরিমা ও সেগুলো লিখছে। ধরে বেঁধে মনোযোগ দেওয়ার সম্পূর্ণ চেষ্টা করছে। অথচ ব্যর্থ অষ্টাদশী। বারবার মানস্পটে ভেসে উঠছে পরিণীতা হাসিখুশি উজ্জ্বল মুখশ্রী। ভাইয়ের করা খুনসুটি আর বাবার আদুরে শাসন। হোয়াইট বোর্ডের দিকে নজর রেখেই মেহরিমা ডুব দিলো অতীতের ক্ষুদ্র এক স্মৃতিতে। পরিণীতা সঙ্গে তার প্রথম সাক্ষাৎ এর দিন ছিলো সেটি।

শ্রাবণের শেষের দিকে। একদিন স্কুল থেকে বাসায় ফেরার পথে ঝুম বৃষ্টির জন্য মাঝপথেই আটকে গেলো মেহরিমা। পাকামি করে ছাতাও আনে নি সে। ফলস্বরূপ মূহুর্তের মধ্যেই ভিজে জুবুথুবু কিশোরী। দু'পাশে ঝোলানো লম্বা বেনুনি থেকে চুইয়ে চুইয়ে পানি পড়ে সাদা ড্রেস ভিজে গায়ের সঙ্গে মিশে গেলো। দৌড়ে একটা দোকানে গিয়ে আশ্রয় নিলেও পাশের কিছু বখাটে ছেলেদের বিশ্রী নজরে অস্বস্তি জেঁকে ধরলো কিশোরী মনে। সারাক্ষণ সাহসিকতার সঙ্গে চা বাগানে মুক্ত পাখির মতো উড়ে বেড়ালো চঞ্চলা কিশোরী মেয়েটাও এক মূহুর্তের জন্য থমকে গেলো। ঝুম বর্ষার জন্য রাস্তা ঘাট তখন ফাঁকা। একা একটা মেয়ে এতোগুলা ছেলেদের মাঝে থেকে মনে মনে ভয় পেলেও প্রকাশ করলো না। গম্ভীর মুখে থমথমে চেহারায় সামনের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো। মেহরিমার এই নিরবতা দেখে পাশ থেকে একটি ছেলে টিটকারি মে'রে বললো

--কি গো সুন্দরী, একলা নি? আইমু নি একটু সঙ্গ দিতে?

--আরে, ললনা তো লজ্জায় কিতা কইবো, হেইডাই কইতে পারতেছে না।

--তাই নি জানেমান? আমরারে দেইখ্যা লজ্জা লাগের নি?

--লজ্জা করিও না সুন্দরী। লজ্জা ভাঙাইবার লাইগা তো আমরা আছিই। সামান্য একটু সহযোগিতা করলেই অইবো, মানাইয়া নিমু।

কথা গুলো বলার সময় ছেলেগুলো গা দুলিয়ে হেঁসে ফেললো। বখাটে ছেলেদের একের পর এক বিশ্রী শব্দে কান দুটো ঝা ঝা করে উঠলো মেহরিমার। নিজের সংযম আর ধরে রাখতে পারলো না। সহসা রুক্ষ স্বরে বললো

--থা/পড়ে দাঁতের মাড়ি খুলে ফেলবো। অ'সভ্য জা/নো/য়ারের দল,একা একটা মেয়েকে পেয়ে শরীরে কারেন্ট বেড়ে গেছে। এমন মা'র মা'রবো চৌদ্দদিন বিছানা থেকে উঠতে পারবি না।

সদ্য নবম শ্রেণীতে ওঠা কিশোরী মেয়েটা রা'গে ফোসফাস করছে। ছোট থেকেই তার বাবা,ভাই তাকে সাহসী হিসেবে গড়ে তুলেছে। বারবার বুঝিয়েছে মেয়েদের সবসময় নরম হতে নেই। জায়গা বুঝে মাঝে মাঝে কঠোর হওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে নিজের ইজ্জত, সম্মান রক্ষা করার ক্ষেত্রে কখনো পিছপা না হতে। হুট করেই শান্ত মেয়েটাকে এভাবে রা'গতে দেখে কিছুক্ষণের জন্য থমকে গিয়েছিলো ছেলেগুলো। পরমুহূর্তেই হেঁসে ফেললো খেক খেক করে। হাসতে হাসতে একজন আরেকজনের গায়ের উপর ঢোলে পড়লো। একজন বললো

--আরেহ চেতি গেছে। মামনী চেতি গেছে। তোরা সবাই ভয় পা রে। মামনী চেতি গেছে।

সিলেটে বরাবরই বৃষ্টির প্রবণতা একটু বেশি। পাহাড়ের গায়ে চায়ের বাগান গুলোতে ঢল নামে। সামান্য মেঘের গর্জনেও কেঁপে ওঠে এলাকা। সাধারণ মানুষ এই সময়ে বাসা থেকে খুব একটা বের হতে চায় না। আজকের সারাদিনের আবহাওয়া ঠিক থাকলেও বিকেল নাগাদ এই বৃষ্টি সহ্য হলো না মেহরিমার। সবসময় বৃষ্টি প্রেমী মেয়েটার মনে আজ বিতৃষ্ণা ধরলো। ছেলেগুলো তখনও একের পর এক বিশ্রী বাণী ছুড়ে দিচ্ছে তার দিকে। দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করছে মেহরিমা। একা হওয়ায় কিছু বলতেও পারছে না। নয়তো ফাঁকা রোডে এতোগুলো হৃষ্টপুষ্ট ছেলেদের সঙ্গে সে পেরে উঠবে না। মেহরিমা উঁকিঝুঁকি দিয়ে রাস্তার দিলে নজর রাখছে। খুব করে চাইেছ এই মূহুর্তে বাসার গাড়িটা চলে আসুক। নিশ্চয়ই বৃষ্টির জন্য আটকে গেছে। নয়তো এতোক্ষণে তো চলে আসার কথা।

একপর্যায়ে ছেলেগুলো মেহরিমার কাছেই চলে এলো। মেহরিমা ভেতরে ভেতরে কিছুটা ভয় পেলেও বুঝতে দিলো না। ব্যাগের ভেতরে রাখা ছোট চা/কুটাকে শক্ত করে হাতের মাঝে ধরে রাখলো। ছেলেগুলো বিশ্রী লোলুপ দৃষ্টিতে মেহরিমার দিকে হাত বাড়াতে নিলে সহসা পেছন থেকে ভেসে এলো নারীকণ্ঠের দাপুটে স্বর

--আর এক পাও ওর দিকে এগোলে বুলে'টের গু'লিতে একেকটার ম'স্তিষ্ক ঝা'ঝড়া করে ফেলবো আমি।

চমকে থমকে ছেলেগুলো সহসা পিছু ফিরলো। সাদা ওড়নার আড়ালে মুখ ঢাকা মেয়ের হাতে পিস্তল দেখে ভরকে গেলো। নিজেদের দিকে চোখাচোখি করে ভীত স্বরে আওড়ালো

--এই, আপনে কেডা? এইভাবে বন্দুক তুইলা রাইখছেন ক্যান? নামান, নামান! নাইলে যেকোনো সময় গু’লি বাইর অইয়া যাইতে পারে।

একপেশে হাসলো রমণী। ওড়না আড়ালে সেই হাসি দৃশ্যমান না হলেও চোখ দুটো আচমকায় তীক্ষ্ম হয়ে উঠলো। বিড়াল চোখদুটোর তীক্ষ্ণতায় ভরকালো সকলে। অপরিচিত রমণী পিস্তল টা আরেকটু শক্ত করে ধরে কন্ঠে কিছুটা কৌতুক মিশিয়ে বললো

--আমাকে চিনিস না তোরা? ছিঃ খুবই দুঃখ পেলাম। সিলেটিদের এতোটা অধঃপতন হয়েছে এটা তো আমার জানা ছিলো না।

ছেলেগুলোর মনে ভয়ের প্রকাশ ঘটলো। এভাবে একটা মেয়েকে নিজেদের দিকে বন্দুক তাক করতে দেখে কলিজা ছলাৎ ছলাৎ করে উঠছে। প্রচন্ড শীতলতার মধ্যেও ঘেমে যাচ্ছে। ভয়ে ভয়ে জড়োসরো হলে ছেলেগুলো। তোতলানো শব্দে বললো

--কে..কে আপনি?

মেহরিমা নিজেও ভ্রু কুঁচকে মেয়েটাকে দেখছে। বোঝার চেষ্টা করছে এই অপরিচিত মেয়েটা আসলে কে? ঝড়ের তান্ডব তখনও কমে নি। দমকা হাওয়ায় ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে দোকানের ছাওনির নিচে থেকেও ভিজে যাচ্ছে সকলে। বজ্রপাতের শব্দে দুলে উঠছে বসুন্ধরা। অপরিচিত মেয়েটা সেসময়ই অত্যন্ত গাম্ভীর্যের সঙ্গে উত্তর দিলো

--আমি পরিনীতা চৌধুরী। ওয়াইফ অব ক্যাপ্টেন মেহরাজ নেওয়াজ।

অপরিচিত মেয়ের মুখে নিজের ভাইয়ের নাম শুনে চমকে উঠলো মেহরিমা। হাত ফসকে চা/কুটা পড়ে গেলো নিচে। অস্ফুট স্বরে আওড়ালো

--ভাবী...?

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে 26 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন