ফন্ট সাইজ:
থিম:
আয় তবে সহচরী

28

লেখক: উম্মে_হাবিবা

ব্যস্তময় সকাল..

প্রতিদিনের মতো আজও নিজের জন্য বরাদ্দ কৃত সকল কাজ শেষ করে  রেস্টুরেন্টের কাজে যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছে মেহরিমা। পরনের বোরকা ঠিক করে মাথার হিজাব বাঁধার এক ফাঁকে পুতুলের ফিডারটা ও বানিয়ে ফেললো সে। পুতুল কে ঘুম থেকে উঠিয়ে যত্ন করে হাত মুখ ধুইয়ে দিয়ে ফিডারটা খেতে দিলো। পুতুল ও শান্ত মেয়ের মতো ঘুমে ঢুলুঢুলু হয়ে নিজের ছোট্ট দু হাতে ফিডারটা পেটের সঙ্গে ধরে চুক চুক আওয়াজ তুলে খাচ্ছে। মেহরিমা একবার আড়চোখে ছোট্ট প্রাণের ঘুমে ঢুলুঢুলু চেহারা দেখে ঠোঁট টিপে মিটিমিটি হাসলো। নেকাব টা ঠিক করে কাঁধের ব্যাগটা হাতে নিয়ে চুপিচুপি বসলো পুতুলের পাশে। গলা খাকারি দিয়ে মেয়েটার কানের কাছে ফিসফিস করে বললো

--আমার আম্মুর বুঝি এখনোও ঘুম ভাঙে নি? আরেকটু ঘুমাতে চায় কি পুতুল সোনা?

পুতুল ঘুমঘুম চোখে মেহরিমার দিকে তাকালো। ঠোঁট উল্টে আদুরে চেহারায় মাথা ঝাঁকিয়ে বললো

--আলেকতু গুমাবো মাম? চোকে কিচু দেকচি না। ইক্তু গুমালে তারপর দেকতে পাবো। গুমাই?

পুতুলের আদুরে কথাগুলো শুনে মেহরিমা মুচকি হাসলো। অতঃপর কন্ঠে সিরিয়াস ভাব এনে বললো

--কিন্তু আমি তো শুনেছিলাম আর্লি টু বেড এন্ড আর্লি টু রাইজ -এই নিয়ম মেনে চললে সে নাকি গুড গার্ল হয়। তবে কি পুতুল সোনা গুড গার্ল হতে চাই না? পঁচা মেয়ে হতে চাই?

মেহরিমার মুখে পঁচা মেয়ে কথাটা শুনেই পুতুল সোজা হয়ে বসলো। তার কাছে পঁচা মেয়ের সংজ্ঞা মানে সে ভালো না। কিন্তু পুতুল তার মামের কাছে সবসময় ভালো হয়ে থাকতে চায়। আদুরে লক্ষ্মী বাচ্চা হতে চাই। পঁচা মেয়ে হলে তো মাম তাকে আর ভালোবাসবে না। আদর করবে না। তখন পুতুল কি করবে? মামের আদর ছাড়া সে থাকবেই বা কিভাবে? পুতুলকে ভাবুক হতে দেখে মেহরিমা আলতো খোঁচা দিলো। মোলায়েম স্বরে শুধালো

--চুপ করে আছো কেনো আম্মু? মামের প্রশ্নের উত্তর দেবে না?

পুতুল দুধের ফিডারটা শক্ত করে বুকের সঙ্গে চেপে ধরলো। ইতোমধ্যে তার অভিমানী চোখ দুটো ছলছল হয়ে গেছে। সেভাবেই মেহরিমার দিকে তাকিয়ে কাঁদো কাঁদো স্বরে জিজ্ঞেস করলো

--পঁচা মেয়ে হলে তুমি আল পুতুকে বালোবাছবে না মাম?

মেহরিমা কিছুক্ষণ পুতুলের ছলছল চোখের দিকে তাকিয়ে রইলো। পুতুলের চোখ দুটো ভীষন সুন্দর। বড় বড় ভাসা ভাসা চোখের মণি টা অদ্ভুত রকমের মায়াবী। কিছুটা হ্যাজেল আর বাদামি মিশেলের। প্রথম দর্শনে পুরোপুরি হ্যাজেল লাগলেও ধীরে ধীরে বাদামী রঙটা বোঝা যায়। রোদের সংস্পর্শে আসলে বাদামি রঙটা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। তখন আরেক সৌন্দর্য ধারণ করে পুরো মুখশ্রী জুড়ে। ঘন কালো চুলের মাঝে টকটকে গোলাপি ফর্সা গায়ের রঙটা চাঁদের ন্যায় জ্বলজ্বল করে। মেহরিমা মাঝে মাঝে বিষ্ময় নিয়ে পুতুলের সৌন্দর্যের দিকে তাকিয়ে থাকে। এতোটা মায়াবী আর সুন্দর ও কোনো বাচ্চা হতে পারে? এই প্রশ্নটা বরাবরই তার মস্তিষ্কে ঘুরঘুর করে। পরক্ষণেই আবার মনে পড়ে যার বাবা মা এতো সুন্দর ছিলো তাদের অংশ অসীম সৌন্দর্যের অধিকারী হবে এটাই তো স্বাভাবিক। পুতুলের মায়াবী মুখটার দিকে তাকিয়ে থেকে মনে মনে মাশা আল্লাহ বলতে ভুললো না মেহরিমা। অথচ ধৈর্য্যহারা হলো ছোট্ট প্রাণ। মেহরিমাকে চুপ থাকতে দেখে পুনরায় তাগাদা দিলো

--বলো না মাম। তুমি আল পুতুকে বালোবাছবে না?

মেহরিমা নড়েচড়ে বসে গলা খাকারি দিলো। কন্ঠে অত্যাধিক সিরিয়াস ভাব এনে গম্ভীর গলায় বললো

--পঁচা মেয়েদের আমি কেনো কেউই ভালোবাসবে না। কারন পঁচা....

বাকিটুকু আর শেষ করতে পারলো না মেয়েটা। তার আগেই ঠোঁট উল্টে কেঁদে ফেললো ছোট্ট আদুরে প্রাণ। ফিডারটা পাশে রেখে স্বভাব সুলভ উবুর হয়ে বালিশে মুখ গুঁজে কাঁদতে লাগলো। পুরো ঘটনা এতো দ্রুত ঘটলো যে মেহরিমা নিজেও বোকার মতো ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো শুধু।

পুতুল কাঁদছে। অল্প সময়ের মধ্যেই হেঁচকি তুলে কাঁদছে সে। কান্নার তোপে ছোট্ট দেহ টা বার বার কেঁপে কেঁপে উঠছে। মেহরিমা হাত বাড়িয়ে কোলে নিতে গেলেও অভিমানী মেয়েটা একচুল পরিমাণ নড়লো না। শক্ত হয়ে বালিশে মুখ গুঁজে রইলো। নাতনির কান্নার আওয়াজ পেয়ে রান্না ঘর থেকে তরিঘরি করে দৌড়ে এলেন শাহিদা নেওয়াজ। কান্নারত নাতনির পাশে মেয়েকে চুপচাপ হাত গুটিয়ে বসে থাকতে দেখে অবাক না হয়ে পারলেন না। হাতের খুন্তিটা নিয়েই মেয়ের দিকে এগিয়ে গিয়ে হালকা ধমকে বললো

--আমার নাতনি কাঁদছে আর তুই এখানে চুপচাপ বসে আছিস? ওকে কোলে তুলেছিস না কেনো?

মায়ের ডাকে পাশ ফিরলো মেহরিমা। এতোক্ষণের চেপে রাখা হাসিটা না চাইতেও বেরিয়ে এলো। কিছুটা আওয়াজ তুলেই হাসলো মেয়েটা। সেই শব্দে কান্নার মাত্রা দ্বিগুণ হলো পুতুলের। অথচ ভ্যাবাচ্যাকা খেলেন শাহিদ নেওয়াজ। একবার হাসতে থাকা মেয়ে আরেকবার কান্না করা নাতনির দিকে তাকিয়ে বোকার ন্যায় প্রশ্ন করলো

--এই মেহের এভাবে কারণ ছাড়া হাসছিস কেনো?

--আম্মু পুতুল.. পুতুল

অষ্টাদশী রমণী হাসির তোপে ঠিকমতো কথাও বলতে পারলো না। দেওয়ালে হেলান দিয়ে পেট চেপে হেঁসে চলেছে সে। ছোট্ট পুতুল কান্নারত ফোলা ফোলা চোখে মামের এই হাসি দেখে আরো জোড়ে কেঁদে ফেললো। শোয়া থেকে উঠে দৌড়ে গিয়ে শাহিদা নেওয়াজের গলা দু হাতে জড়িয়ে ঘাড়ে মুখ গুঁজে ফোঁপাতে ফোপাঁতে ডাকলো

--বু..বু

শাহিদা নেওয়াজ একহাতে নাতনিকে আগলে নিলেন। পিঠে হাত বুলিয়ে বললেন

--এইতো দিদি ভাই। বু এখানে আছি তো। তুমি এভাবে কাঁদছো কেনো? মেহের তোমায় বকেছে?

সহসা দু পাশে মাথা নাড়িয়ে না বোঝালো পুতুল। শাহিদা নেওয়াজ মেয়ের দিকে তাকিয়ে ইশারায় হাসি থামাতে বলে পুনরায় প্রশ্ন করলেন

--তোমাকে মে'রেছে?

এবারেও নিঃশব্দে মাথা নাড়িয়ে না বোঝালো ছোট্ট প্রাণ। শাহিদা নেওয়াজ কিছুটা অস্থির হলেন। নাতনির কান্না থামাতে আদর করে জিজ্ঞেস করলেন

--তবে কাঁদছো কেনো? বু কে বলো।

--মা..ম বলেচে আমাকে নাকি আল বালোবাছবে না। আমাকে পুচা বলেচে বুউউউ!

শাহিদা নেওয়াজ আশ্চর্য চোখে মেহরিমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। অতঃপর অবিশ্বাস্য স্বরে বললেন

--সে কি! এমন সাংঘা'তিক পঁচা কথা মেহের তোমাকে বলেছে?

--বলেচে।

--কেনো বলেছে?

--আমি ইকতু গুমাতে চেইচি বলে এতা বলেচে। আমাকে পুচা পুতু ও বলেচে। মাম আমাকে কস্তু দিয়েচে। বু!

ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে গিয়ে পুতুলের অনেক কথায় বেঁধে যাচ্ছে। শাহিদা নেওয়াজ মন দিয়ে নাতনির সব কথা শুনলেন। এতোক্ষণে মেয়ের হাসির কারণ বুঝলেন তিনি। ফোঁস করে একটা শ্বাস ফেলে বললেন

--মেহের মজা করেছে। তুমি তো জানোই তোমার মাম তোমাকে কতো ভালোবাসে,কতো আদর করে। এমন ছোট্ট কথায় কেউ কাঁদে? ছিঃ মানুষে শুনলে তো তোমাকে শরম দিবে। বলবে পুতুল একটা ছিচকাদুনে পঁচা বাবু। তখন কি সেটা শুনতে ভালো লাগবে বলো।

পুতুল ধীরে ধীরে কাঁধ থেকে মাথা তুললো। ফর্সা মুখটা কান্নার তোপে লালচে আভা ধারণ করেছে। ডাগর ডাগর চোখ দুটোই জলে টইটম্বুর। শাহিদা নেওয়াজের দিকে তাকিয়ে অভিমানী স্বরে বললো

--মামকে ইকতু বকে দাও বু।

শাহিদা নেওয়াজ তাই করলেন। মেয়ের দিকে তাকিয়ে মেকি রা'গ নিয়ে শাসন করে বললেন

--মেহের আর কখনো যেন আমার বু কে কান্না করাতে না দেখি। যদি দেখেছি এমন রসিকতা আবারও করেছিস তখন কিন্তু খুন্তি দিয়ে পিটাবো তোকে।

--মাম কে মালবে না।

শাহিদা নেওয়াজের কথা শেষ হতেই তড়িৎ বললো পুতুল। শাহিদা নেওয়াজ পলক ঝাপটে বললো

--দোষ করলে মা'রবো না?

--না

--কেনো?

--মাললে মাম কস্তু পাবে। ব্যাতা পাবে। পলে কানবে। আল মাম কানলে পুতুও কান্না কলবে।

শাহিদা নেওয়াজ বোঝার মতো মাথা দুলিয়ে মেহরিমার দিকে তাকিয়ে বললো

--হুম বুঝলাম। আসলেই জটিল সমীকরণ।

মেহরিমা নিজেও খুশি খুশি মনে পুতুলের দিকে তাকিয়ে আছে। ছোট্ট প্রাণের এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসায় বুকের মাঝে তৈরি হওয়া শূন্যতা গুলো হাওয়ায় বিলীন হচ্ছে। মুগ্ধতায় ছেয়ে গেছে হৃদয় কানন।

--মাম কে বলো আমাকে আদল দিতে। না হলে কিন্তু পুতুর কস্তু কমবে না।

পুনরায় অভিমানী স্বরে কথাগুলো আওড়ালো পুতুল। মামের দিকে না তাকিয়ে শাহিদা নেওয়াজের গলা জড়িয়ে রেখে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে রাখলো। মেহরিমা মুচকি হেঁসে দু'হাতে কোলে তুলে নিলো পুতুলকে দুগালে চুমু দিয়ে বললো

--মাম খুব খুব সরি আম্মু। আর কক্ষনও এমন পঁচা কথা বলবো না। মাম কে মাফ করে দাও সোনা।

পুতুল আদুরে বাচ্চার মতো মেহরিমার বুকে পড়ে রইলো। চোখ দুটো বুঁজে বললো

--এবাল থেকে ছপসময় পুতুকে বেশি বেশি বালোবাছবে ঠিক আছে।

--আচ্ছা

--অনেক আদল দিবে।

--অনেক বেশি আদর দিবো।

--আল বকবে না।

--একটুও বকবো না।

--পতিদিন ললিপপ নিয়ে আতবে।

--কিন্তু ললিপপ খেলে তো দাঁতে পোকা লাগবে আম্মু।

--নাগবে না। মাম চুন্দুল কলে ব্লাছ করে দিবে তো।

মেহরিমা মুচকি আসলো। দু'হাতে ছোট্ট প্রাণকে বুকে আগলে বললো

--ঠিক আছে প্রিন্সেস। মাম তোমার সব কথা শুনবো।

--আত্তা

শাহিদা নেওয়াজ পাশে দাঁড়িয়ে দুজনের আহ্লাদী পনা মুগ্ধ চোখে দেখলেন। অনেকদিন পর নিজের মেয়েটাকে এভাবে হাসতে দেখে চোখের কোণে পানি জমলো তার। পরক্ষণেই সেদিন মুক্তার বলা কথা গুলো মনে পড়তেই মনের মধ্যে হালকা ভয়ের কম্পন সৃষ্টি হলো। তরিঘরি করে নিজের ফোনটা হাতে নিয়ে মেহরিমার চোখের আড়ালে বাহিরে চলে গেলেন তিনি। রান্নাঘরের পাশ ঘেঁসে দাঁড়িয়ে কাঙ্খিত নাম্বারে ডায়াল করে অপেক্ষা করলেন। রিসিভ হতেই ফিসফিস করে বললো

--ছোটো শুনছিস...

************************
বিড়ালের মতো রোহানের ঘরের সামনে ঘুরঘুর করছে শায়েরী। বারবার উঁকি ঝুঁকি মে'রে দেখছে লোকটাকে। রোহান প্রথম থেকে টের পেলেও কিছু বলে নি। ধৈর্য্য ধরে মেয়েটার কার্যকলাপ আড় চোখে পর্যবেক্ষণ করছে। আজকে রোহানের ছুটি। সপ্তাহে এই একদিনই নিজের দায়িত্ব থেকে কিছুটা ফুরসত মেলে তার। আর ঠিক সেদিনই নানান বাহানা করে ভার্সিটি যাওয়া থেকে বিরত থাকে শায়েরী। রোহান এসব বুঝলেও প্রকাশ করে না। মেয়েটার মনে তার প্রতি অনুভূতি জন্মানোর সময় দিচ্ছে শুধু। যেদিন বুঝবে শায়েরীর পুরোটা জুড়ে শুধু আর শুধু মাত্র তার রাজত্ব সেদিনই ঢাক ঢোল পিটিয়ে নিজের অর্ধাঙ্গিনী রূপে কবুল করবে তাকে। এতো বছরের জমানো সুপ্ত ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ও করবে সেদিন। এমনটাই পরিকল্পনা তার। ততদিন না হয় একটু অপেক্ষায় করলো।

রোহান নিজের ছোট্ট বুক শেল্ফ থেকে বই নিয়ে বিছানায় গিয়ে বসলো। বিছানার হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে মনোযোগ দিলো পড়ায়। ডাক্তারি পড়ার এই এক মহা জ্বালা। কয়েক বছর রাতদিন পড়ে ডাক্তারি সার্টিফিকেট অর্জন করার পরও পড়া থেকে মুক্তি নেই। যতদিন এই পেশায় নিয়োজিত থাকতে হবে ততদিন পর্যন্ত এই মোটা মোটা বই একপ্রকার গিলতে হবে তাকে।

শায়েরী ছুটির দিনেও রোহানকে পড়তে দেখে বিরক্তিতে নাকমুখ কুঁচকে ফেললো। পর্দা ধরে ঝুঁকে ফিসফিস করলো

--কি অদ্ভুত মানুষ মাইরি। ছুটির দিনে মানুষ এনজয় করে অথচ এই বেডা বইয়ে মুখ গুঁজে আছে। কি এতো ছাতার মাথা পড়ে আল্লাহ জানে। আমার তো বই দেখলেই গায়ে জ্বর ওঠে। উফফ কি সাংঘা'তিক বই পাগল নিরামিষ মানুষ।

নিজের মতো বলে ফোঁস করে একটা শ্বাস ফেললো মেয়েটা। আড় চোখে চমশা পরিহিত বই পড়ুয়া রোহানকে দেখে মুচকি হেঁসে বিরবির করলো

--তবে যেমনই হোক। লোকটা কিন্তু আমারই। এমন হ্যান্ডসাম,ড্যাশিং, হট চকলেট বয় সাত জনম তপস্যা করেও পেতাম আমি? না শায়েরী তোর ভাগ্য আছে বলতে হবে। এই খুশিতে মসজিদে পক্ষীওয়ালা দুই টাকা দান করে দিস।

নিজের কথায় নিজেই লজ্জায় লাল নীল হলো শায়েরী। পর্দা নিয়ে এক প্রকার দুলতে শুরু করলো। রোহান চশমার ফাঁকে মেয়েটার এই অদ্ভুত কার্যকলাপ দেখে ভ্রু কুঁচকালো। কিছু বলতে যাবে তার আগেই ধপ করে পড়ে যাওয়ার শব্দ। পরপরই ভেসে এলো মেয়েলি কন্ঠের ব্যাথাতুর আওয়াজ। চমকে উঠলো সে। বইটা পাশে রেখে তরিঘরি করে উঠে গিয়ে দাঁড়ালো শায়েরীর সামনে। মেয়েটা পর্দা নিয়ে অতিরিক্ত ঝুঁকে যাওয়ায় টাল সামলাতে না পেরে ঠাস করে পড়েছে। পর্দা তো ছিঁড়েছেই সেই সাথে মেয়েটাও বেশ ব্যাথা পেয়েছি।

রোহান ঠিক শায়েরীর সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। চমশা টা ঠিক বুকে হাত গুঁজে গম্ভীর স্বরে বললো

--শেষ..?

শায়েরী কথার সারমর্ম বোঝে নি। কোমড়ে এক হাত রেখে প্রশ্নাত্মক চোখে রোহানের দিকে তাকিয়ে শুধালো

--কি শেষ?

--বাঁদরের মতো লম্ফঝম্প করা শেষ নাকি আরেকটু করবি?

শায়েরী কিছুটা অপমান বোধ করলো। ঠোঁট উল্টে অভিমানী স্বরে বললো

--রোহান ভাই তুমি আমাকে এভাবে বলতে পারলে? আমি কি বাঁদর? বাঁদরে মতো অতো বড় লেজ আছে নাকি আমার?

--লেজ না থাকলেও বাঁদর জাতির নিউ ভার্সন তুই। নয়তো চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকেও এভাবে পর্দা নিয়ে ঝুলতিস না আর পড়ে কোমড় ও ভাঙতিস না।

ফাটা বেলুনের মতো চুপসে গেলো শায়েরীর মুখটা। সহসা মাথা নিচু করে ফেললো। রোহান ফোঁস করে একটা শ্বাস ফেলে নিজের হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বললো

--দেখি আমার হাত ধরে উঠে আয় তো।

শায়েরী একবার রোহানের হাতের দিকে তাকিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিলো। অভিমান নিয়ে বললো

--কারোর হেল্প লাগবে না আমার। আমি একাই উঠতে পারবো।

শায়েরী ভাব নিয়ে নিজের মতো উঠতে গিয়ে আবারও পড়ে গেলো। ব্যাথা পেলেও প্রকাশ করলো না। পরপর তিনবার ব্যর্থ হওয়ায় অসহায় চোখে রোহানের দিকে তাকালো। কাঁদো কাঁদো স্বরে বললো

--রোহান ভাই..

রোহান এতোক্ষণ মনোযোগ দিয়ে মেয়েটাকে দেখছিলো। কাঁদো কাঁদো স্বর শুনে ঠোঁট বাঁকিয়ে সূক্ষ্ম হাসলো। ঝট করেই শায়েরী কে কোলে তুলে নিয়ে বললো

--বাংলায় একটা প্রবাদ আছে জানিস,মোল্লার দৌঁড় মসজিদ পর্যন্ত। ঠিক তেমনই তোর দৌঁড় ও আমার কাছে এসেই সীমাবদ্ধ। বার বার এটা প্রমাণিত হওয়ার পরও কেনো জেদ করিস বল তো? সেই তো ঘুড়ে ফিরে আমি তেই সীমাবদ্ধ তুই।

শায়েরী মুখ বাঁকালো। হেয়ালি করে বললো

--আমাকে অপমান করছেন তো করুন। যেদিন আপনার থেকে দূরে হারিয়ে যাবো সেদিন বুঝবেন।

শায়েরীর কথাটা শ্রবনেন্দ্রীয় হতেই থেমে গেলো রোহানের পা। হুট করেই বুকের ভেতর ধক করে উঠলো তার। অতঃপর শুষ্ক এক ঢোক গিলে গম্ভীর স্বরে আওড়ালো

--সাত জনমের যেমন কোনো অস্তিত্ব নেই তেমন করেই দ্বিতীয় সূচনা তোর জন্য বারণ। অতএব এক জীবনে আমাতেই তোর ঠাই আমরণ।

****************************
কানে হেডফোন লাগিয়া হেলেদুলে সিঁড়ি দিয়ে নামছে মীর। মুখের এক্সপ্রেশন দেখেই বোঝা যাচ্ছে বেশ ফুরফুরে মেজাজে আছে সে। পকেটে দু'হাত গুঁজে চোখ বুঁজে গুনগুন করে গাইছে

~খিরকি থেকে সবাই উঁকি মারে
টিনা মিনা রা সব প্রেমে পড়ে
উফফ পারি না ন্না না না..
জিও মাম্মা মা মা....
পারি না হাহ..
জিও মাম্মা..
দেখো হিরো রেখে কার থেকে টিপস নিতে চায়....~

সিঁড়ির মাঝ পথে এসে দু'হাত মেলে একটু ঘুরলো মীর। অতঃপর শার্টে ঝোলানো সানগ্লাস টা চোখে পড়ে শার্টের কলার ঝাঁকিয়ে বেশ বেশ হিরো হিরো ভাব নিয়ে গলার স্বর কিছুটা মোটা করে গেয়ে উঠলো

~খোকা বাবু যায়
লাল জুতো পায়
বড় বড় দিদিরা সব...~

শেষের দিকে অদ্ভুত ভঙ্গিতে হাসলো ছেলেটা। হিপ হপ ডান্সের স্টেপ মিলিয়ে লাফিয়ে ঝাপিয়ে নামতে লাগলো সিঁড়ি থেকে। কিন্তু বিপত্তি বাঁধলো শেষ সিঁড়িতে এসে। হুট করেই মেয়েলি শরীরের সঙ্গে ধাক্কা লেগে হাতের ফোনটা ছিটকে পড়লো অদূরে। ধপ করে বসে পড়লো মেঝের শক্ত টাইলসে। চোখে ভাব সাব নিয়ে পড়া সানগ্লাস টা বেঁকে গেলো।  পুরো ঘটনায় বোকা বোনে গেলো সে। অথচ তার থেকেই যে একহাত দূরে একটি মেয়ে পড়ে গিয়ে ব্যাথায় কাতরাচ্ছে সেদিকে কোনো খেয়াল নেই।

ফাইজা নিজের কোমড়ে এক হাত ঝাঁঝালো মেজাজ নিয়ে মীরের দিকে তাকালো। সে ক্লাস বাদ দিয়ে এসেছিলো শায়েরীর সঙ্গে বিয়ের প্ল্যান করতে। কিন্তু এখানে এসে যে এই জলহস্তির সঙ্গে ধাক্কা লেগে অকালে নিজের কোমড়া টা হারাতে বসতে হবে তা কি সে জানতো? ফাইজার মেজাজ তরতর করে বেড়ো গেলো। এমনিতেই মীরকে সে সহ্য করতে পারে না। তার উপর ছেলেটাকে হেল্প না করে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে রাগের মাত্রা যেন দ্বিগুন বাড়লো। খেঁকিয়ে বললে

--এই মীরজাফর ভাই আপনি কানা নাকি? দিনে দুপুরে ধাক্কা মে'রে ফেলে দিলেন কেনো আমায়? 

ফাইজার ধমকে কেঁপে উঠলো মীর। নিজের ফোন থেকে নজর সরিয়ে ফাইজার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো

--ফিজু বাসায় এতোগুলো সোফা চেয়ার থাকতে তুই ফ্লোরে বসে আছিস কেনো?

অদ্ভুত চোখে তাকালো ফাইজা। কি বলছে এই লোক। সে কোনো ইচ্ছে করে ফ্লোরে বসে থাকবে? উল্টো তাকেই তে ধাক্কা মে'রে ফেলে দিলো। ফাইজা মীরের দিকে নজর রেখেই কটমট করে বললো

--আপনি জানেন না আমি কেনো নিচে বসে আছি?

--কি আশ্চর্য আমি কিভাবে জানবো?

--আপনি ই তো ধাক্কা মে'রে ফেলে দিলেন। এখন আবার না জানার নাটক করছেন? মীরজাফর ব্যাটা ছেলে। দিনে দুপুরে মীরজাফরী কাজ কাম ছিঃ।

নিজের থেকে ছোট বয়সী মেয়ের মুখ থেকে মীরজাফর নাম শুনে ক্ষেপে গেলো মীর। আঙুল উঁচিয়ে বললো

--ফ্রীজের বাচ্চা তোর এতো বড় সাহস আমাকে মীরজাফর বলিস।

--বেশ করেছি বলেছি। একশ বার বলবো। কি করবেন আপনি?

--তোকে তো আমি..

--আমাকে তো কি? কি করবেন আপনি? আপনার দম আমার জানা আছে। ফোর টুয়েন্টি ছ্যামড়া কোথাকার।

--আবার আমাকে ফোর টুয়েন্টি বলছিস? ফির ছে অপমান। দেখ ফ্রীজের বাচ্চা এর পরিনাম কিন্তু ভালো হবে না বলে দিচ্ছি।

--হ্যা বলছি। হাজার বলবো ফোর টুয়েন্টি, ফোর টুয়েন্টি, ফোর টুয়েন্টি। এবার করুন যা করার। খবিশ লোক।

দু'জনের কথা কাটাকাটির মাঝে রান্না ঘর থেকে দৌড়ে এলেন মীরা আর রজিনা বেগম। ফ্লোরে বসে দুজনকে এমন কোমড় বেঁধে ঝগড়া করতে দেখে আশ্চর্য না হয়ে পারলেন না। মীরা কৌতুহল সামলাতে না পেরে দৌড়ে এলো দুজনের কাছে। মাথায় হাত রেখে চেচিয়ে বললো

--হায় হায় একি সর্বোনাশে কান্ড। ছোট ভাইজান,ছোট আফামনি আফনেরা দুইজনে সোফা রাইখা ফ্লোরে বইসা কাইজ্জা করতাছেন ক্যান? আফনা গো দুই জনেরই কি গ্যাস্টিক মাথায় উইঠা গেছে?

মীরার কন্ঠ শুনে দুজনেই চুপ করে গেলো। পাশ ফিরে দূরে রজিনা বেগম মূর্তির ন্যায় দাড়িয়ে থাকতে দেখে একসঙ্গে হাক ছুড়লো

--আম্মু এই ফ্রীজের বাচ্চা আমাকে অপমান করেছে? পেত্নী টার বিচার করো কিন্তু।

--বড় মামী তোমার দাঁমড়া ছেলে দিনে দুপুরে আমাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়ে আমার অবলা কোমড়া টা কে  শহিদ করে ফেলেছে। আগে এর বিচার করো।

******************************
ফুটপাতের ছোট্ট চায়ের দোকানের কাঠের বেঞ্চে পাশাপাশি বসে আছে শায়ের আর মেহরিমা। পাশের ফার্মেসি থেকে কিনে আনা এন্টিসেফ্টিক তুলোয় মাখিয়ে আলতো হাতে মেহরিমার কে'টে যাওয়া স্থানে লাগিয়ে দিচ্ছে শায়ের। মাঝে মধ্যে ফু দিয়ে ব্যাথা নিরাময়ের ক্ষুদ্র চেষ্টা করছে। মেহরিমার সেদিক খেয়াল নেই। চিন্তিত চোখে বার বার রাস্তার ওপাশের রেস্টুরেন্টের দিকে তাকাচ্ছে সে। শায়ের নীরবে সবকিছুই লক্ষ্য করছে। সাদা ব্যান্ডেজ টা হাতে লাগিয়ে দেওয়ার ফাঁকে প্রশ্ন করলো

--আপনাকে এতো চিন্তিত লাগছে কেনো? কিছু ভাবছেন?

মেহরিমা রেস্টুরেন্ট থেকে নজর সরিয়ে নিজের হাতের দিকে তাকালো। কাটা স্থানে যত্ন নিয়ে বাঁধা সাদা ব্যান্ডেজের দিকে নজর রেখেই ফোঁস করে একটা শ্বাস ফেলে বললো

--আমার চাকরি টা বোধহয় আর টিকবে না।

--এমনটা মনে হওয়ার কারণ?

--রেস্টুরেন্টের মালিকের সঙ্গে ঝামেলা হয়েছে। চাকরি থাকবে না এটা মনে হওয়াই তো স্বাভাবিক।

শায়ের নির্বিকার। ব্যান্ডেজ বাঁধা শেষ করে সোজা হয়ে বসলো। মেহরিমার উদ্দেশ্যে বললো

--এতো মানুষ থাকতে আপনি ওই বুইড়ার সঙ্গে ঝগড়া করছিলেন কেনো? ঝগড়া করার ক্রেভিংস উঠলে আমাকে ফোন দিতেন। সাত সমুদ্র পাড় করে আমি নিজেই আসতাম আপনাকে সঙ্গ দিতে। তবুও ওই বুইড়াই কেনো মিস চ্যাপা শুঁটকি? হোয়াই?

মেহরিমা বিরক্তি চোখে তাকালো। বিতৃষ্ণা নিয়ে বললো

--আপনি কি ভেবেছেন? আমি ইচ্ছে করে ওনার সঙ্গে ঝগড়া করছিলাম?

--কষ্ট করে ভাবতে হবে কেনো? চোখের সামনেই তো সব দেখলাম। আপনি কেমন লাফিয়ে লাফিয়ে ঝগড়া করছিলেন। 

--সব সময় চোখের দেখা সঠিক হয় না। মাঝে মধ্যে চোখের দেখায়ও ভুল থাকে।

মেহরিমা গম্ভীর স্বরে প্রতিউত্তর করলেও শায়ের কেমন শান্ত চোখে তাকিয়ে রইলো। সময় নিয়ে শুধালো

--আপনি বলতে চাইছেন সব সময় চোখের দেখা সত্যি হয় না? নিজ চোখে দেখা কাহিনি ও ভুল হয়?

--অবশ্যই ভুল হয়। সত্যর আড়ালেও যেমন সত্য লুকিয়ে থাকে তেমনি সামনে ঘটমান ঘটনায় ও কিন্তু রয়ে যায়। এজন্য সবসময় চোখের দেখা বিশ্বাস করা ঠিক নয়। স্থান,কাল,পাত্র বিবেচনা করে এরপর মন্তব্য করতে হয় বুঝেছেন।

শায়ের উত্তর দিলো না। নীরবে মাথা নাড়িয়ে বোঝালো সে বুঝেছে। দু'জনের মধ্যেই কিছুক্ষণ নীরবতা চললো। শায়ের বললো

-- এবার বলুন তো ওনার সঙ্গে এভাবে ঝগড়া করছিলেন কেনো?

--আমি ঝগড়া করি নি ওনার অন্যায় টা ধরিয়ে দিচ্ছিলাম।

--কি এমন করেছেন উনি?

--অকারণে গরিবের উপর জু'লুম করছিলেন। এটা অন্যায়। সেটা ওনাকে মানতেই হবে।

শায়ের চুপচাপ শুনলো। সন্দিহান কন্ঠে শুধালো

--তাহলে আপনার হাত কা'টলো কিভাবে?

--ওনাকে বাঁচাতে গিয়ে।

মেহরিমা হাতের ইশারায় দূরের এক বয়স্ক লোককে দেখালো। যিনি তার আধ ভাঙা ছোট্ট দোকানটা মেরামত করতে ব্যস্ত। শায়েরের কাছে সমস্ত ঘটনা স্পষ্ট নয়। ফলস্বরূপ জানতে চাইলো

--কাহিনি ব্যাখা করুন তো।

মেহরিমা দীর্ঘ শ্বাস ফেললো। অতঃপর একে একে বলতে শুরু করলো সকালের ঘটে যাওয়া ঘটনা...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে 28 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন