প্রনয়ের_শেষ_চিঠি
লেখিকা:Fahima
পর্ব:০২
প্রতিদিনের মতোই মেহরিন কলেজ যায় মাহিরা কে সাথে নিয়ে মাহিরার স্কুল পেরিয়েই মেহরিনের কলেজ তাই দু'জন একসাথেই যায় মাহিরা ক্লাস 4 এ পড়ে মেয়েটা দেখতে মাশাল্লাহ, চোখ গুলো ডাগর ডাগর, চুল গুলো সামনের দিকে বব কাট দেয়া,রঙটা একটু শ্যমলা তবে ছোট্র চেহারটায় অনেক মায়া, মেহরিনের সামনে এইচএসচি(HSC) পরিক্ষা সে একটু আধটু ভন্ড হলেও পড়ালেখায় টপে আছে সে ক্ষেত্রে একদমি ফাকিবাজি করে না এটা তার সবচাইতে ভালো একটা গুন। কলেজ ড্রেসের উপর সাদা রঙের হিজাব বাধা, হাতে একটা কালো বেল্টের ঘড়ি পেছন থেকে এক কাধ জুড়ে একটা সাদা এবং লেভেন্ডার কালারের মিশ্র রঙা কলেজ বেগ,,মাহিরার হাত ধরেই হাটতে লাগলো,হাটতে হাটতে মাহিরার স্কুল গেটের সামনে দাঁড়ায়, তারপর হাতে থাকা একটা টাকার নোট মাহিরাকে দিয়ে দেয় যেটা বড় আব্বু দিয়েছিলো মাহিরার জন্য এবং মেহরিনের জন্য,বাকি টাকা নিজের কাছে রাখলো,মুচকি হেসে মাহিরা কে বললো।
- শুন, ছুটি হলে একদম কোথাও যাবি না আমি আসবো নিতে,এখানেই থাকবি, হুম?
মাহিরা চোখে মুখে হাসি নিয়েই বললো
- ঠিক আছে ছোট আপু, তুমি তাড়াতাড়ি চলে এসো!
এই বলে হাত দিয়ে বাই বলে চলে যায় স্কুলের দিকে,মেহরিন একটু মুচকি হেসে তার কলেজের দিকে রওয়ানা দেয়।
যাওয়ার পথেই ইনায়ার সাথে দেখা, ইনায়া মেহরিনের বেস্ট ফ্রেন্ড আরো একজন আছে মিতু এই দুজনই তার বেস্ট ফ্রেন্ড বাকিদের সাথেও খুব ভালোই বন্ধুত্ব রয়েছে মেহরিনের, ইনায়া কে দেখেই হাত বাড়িয়ে হেন্ডশেক করে সালাম দেয়, ইনায়া সালামের উত্তর নিয়ে মুচকি হেসে কথা বলতে বলতে ক্যাম্পাসের ভেতরে চলে যায়,
মিতু আগে থেকেই তাদের জন্য বেঞ্চে জায়গা রেখেছিলো ওখানেই বসে পড়ে দুজন,তারপর সবাই মিলে কথা, কিছুদিন পরই মিতুর বার্থডে এজন্য স্পেশালি দুই বান্ধবি এবং অন্যদের দাওয়াত দেয়, কিন্তু মিতু জানে মেহরিনের বাবা একটু রুড় ওনি মেহরিন কে যেখানে সেখানে যাওয়ার পার মিশন দেন না এজন্য ওনাদের ম্যানেজ করা মেহরিনের পক্ষে একটু কষ্টকর। মিতু মেহরিনকে বলে
- মেহরিন, লাস্টবার তুই আমার বোনের বিয়েতেও যাসনি,কিন্তু এটা একটু স্পেশালী আমি কিন্তু তোকে দেখতে চাই,তুই যে করেই হোক আংকেল কে ম্যানেজ করবি,
মেহরিন মুখে হাসি নিয়েই বললো
- আরে চিল ব্র,আমি ঠিকই দেখবি তোর বার্থডে তে এডেন্ড করে পেলবো,এটা নিয়ে প্যারা নাই..
ইনায়া কিছুটা অবাক হয়েই বলল
- আরেহ! এটা কি আমাদের মেরিন জানু? না না আমার তো ঠিক লাগছে না,এই তুই প্লাস্টিক সার্জারি করেছিস নাকি দেখি তো? মেহরিনের নকল ভার্সন নাকি তুই?
মেহরিন মাছি তাড়ানোর মতো করে উত্তর দেয়।
- হাহ,তোরা সবসময় বেশি বুঝিস তাই,আমার বাবাকে তোদের একটু রুড মনে হয়,আমি বললে ঠিকই দিবে বাবা।
ইনায়া আর মিতু অবাক হয়ে দুজনে একসাথে বললো
- তাহলে জান্নাত আপুর বিয়েতে জাসনি কেনো?
- দেখ ওইখানে যাওয়ার জন্য আমি ওত জোর করি নাই আব্বুকে,তাছাড়া মিতুর বিয়ে হলে সেটা ভেবে দেখতাম..
ইনায়া খেক খেক করে হেসে উঠলো..তারপর বলে
-বইন তুই পারিস ও বটে,যাক দিলে তো ভালোই,
মিতু একটু সিরিয়াস টায়প হয়েই বললো
- দেখিস কিন্তু,না গেলে পরে তোর খবর আছে!!
- আরে যাবো যাবো,টেনশন করো না বন্ধু।
______________________________________________
বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলো,মেহরিন রুমে বসে ফোন স্ক্রল করছে মাইশা রুমে এসে মেহরিনের পাশ ঘেষে বসলো মেহরিনের দিকে তাকিয়েই বলে,
- পরশু নাকি ইভান ভাইয়া বাংলাদেশে আসবে।
মাইশার কথা শুনে মেহরিন থমথমে মুখে একবার মাইশার দিকে চায় কিছু একটা ভেবে আবার বলে উঠে,
- ওনি বিয়ে করবে নাকি? দেশে আসছে কেনো?
মাইশা ভাবুক ভঙিতে বলে,
- হয়তো করবে জানিনা,চিন্তা কর সেই ১০ বছর আগে গিয়েছিলো ইংল্যান্ড তখন আমরা কতটুক ছিলাম? তুই তো খুবি ছোট ছিলিস মাত্র ৮ বছর বয়সি আমার ১০ বছর ছিলো।আমার তো ভাইয়ার চেহারা ও মনে নেই।
- থাকলেও কি না থাকলেও কি, ইহান ভাইয়া তো দেশেই থাকে,কই কখনো তো আসে নাই আমাদের দেখতে..?
-হুম সেটাই, ইহান তো শুধু আমাদেরই যেতে বলে নিজে আসেনা। একবার মনে আছে তোর? ইহান আমাকে নিতে আসছিলো? তুই সহ আমার সাথে যাওয়ার বায়না ধরেছিলিস।কিন্তু তোর তখন পরিক্ষা ছিলো যার কারণে আব্বু আমাকেও যেতে দেয়নি,
মাইশার কথা শুনে মেহরিন হেসে ফেলে,হাসতে হাসতেই
বলে
-আহারে বেচারি,কান্না করিস নি তখন তুই..??
- এই আমি কি তোর মতো বাদর নাকি যে কান্না করবো??
- আমি বাদর হলে তুই বাদরের বড়বোন বড় বাদর
কথা বলতে বলতেই দরজায় কেউ নক করে, মেহরিন গিয়ে দরজা খুলেই সামনের ব্যক্তির দিকে তাকিয়েই নাটকীয় কন্ঠে বলে
- আরে আরে নবাব সাহেব যে,আসুন ভেতরে আসুন,
ফারাজ চোখ ছোট করে করে তাকায় মেহরিনের দিকে
মেহরিন মুখে হাসি নিয়েই বলেই
-আপনি তো আজকাল আকাশের তারার মতো হয়ে গেছেন কখনো দেখা যায় কখনো দেখা জায় না,
পেছন থেকে মাইশা বুঝতে পারলো ফারাজ কেই উদ্যেশ্য করে ফাজিল টা এসব বলছে, মাইশা বলে উঠে,
-এই ফাজিল, মুখ টা অফ কর না!ভাই তুই ভিতরে আয়,এই ফাজিলটার কথা কানে নিস না"
ফারাজ মেহরিন কে ভেঙছি কেটে মুখে একরাশ হাসি নিয়ে ভেতরে এগোয়!তারপর বলে,
- আরে মাইশা আপু এই মেয়ের কথা এমনিতেও আমার মাথার উপর দিয়ে যায়,কানে নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না,
মেহরিন অবাক হয়ে,চোখ ছোট ছোট করে বলে,
- এই বদমাইশ, কি বললি?
বলেই মেহরিন ফারাজের পাশে কি ফারাজের চুল টেনে ধরে।ফারাজ হাত দিয়ে চুল ছাড়িয়ে নিতে নিতে বলে -বইন তোর এই হাত আমার চুলে দিলে আমার চুল সব চিড়ে আমি টাক হয়ে যাবো,ছেড়ে দে মেরি মা,
মাইশা এদের কান্ড দেখে হাসবে না কাঁদবে বুঝলো না,
মেহরিন মুখ বাকিয়ে চুল ছেড়ে দেয়,মাইশার চোখ পড়ে ফারাজের হাতে থাকা প্যাকেটের দিকে তারপর বলে
-কিরে,এটাতে কি নিয়ে আসলি?
ফারাজ হাসি নিয়ে বলে,-আরে আপু তোমাদের জন্য একটা জিনিস নিয়ে আসলাম,এই বেডির জন্যই তো ভুলে গেছি..
ফারাজের হঠাৎ ই মনে পড়ে মেহরিন তার পাশ দিয়েই বসে আছে জিহবায় দাঁত চেপে একটু সাইড হয়ে বসে,ভাবছে উলটা পালটা কিছু বলে দিলো নাকি,মেহরিনের দিকে তাকিয়ে দেখলো,মেহরিন কটমট হয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে,ফারাজ মুখে হাসি দিয়েই বলে,
- এভাবে তাকিয়ে আছিস কেনো? চোখ দিয়ে খেয়ে পেলবি আমায়? এই নে এগুলো খা,আর আমার থেকে চোখ সরা..!
মাইশা হেসে ফেলল ফারাজের কথায়,মেহরিনের পিঠে আলতো থাপ্পড় দিয়ে বলে
- আরে মেহু একটু থাম বইন,আমি হাসতে পারছি না আর,
মেহরিন ও এবার হেসে ফেলে,ফারাজের সাথে মাইশা আর মেহরিনের সম্পর্ক টা অনেক বন্ধু সুলভ, কাজিন কম হলেও এই ৩ জনই বারি মাথায় তুলে বসে,তার মধ্যে কোনো অনুষ্ঠানে অন্যন্য কাজিন রা এক হলে তো কোনো কথাই নেই,মাহিরা ও কিন্তু কম যায় না, ওর হাসির খিটখিট শব্দ শুনে অন্যরা হাসি কন্ট্রোল করতে পারে না।
ফারাজ ফুচকার প্যাকেট টা ওদের দিয়ে রুমে চলে যেতে নিলে মেহরিন বলে
- কিরে কোথায় যাচ্ছিস? খাবি না?
- এটা মেয়েদের প্রিয়,আমি এসব খাই না ! তোরা খা,আর আমার একটু কাজ আছে।
মাইশা আর মেহরিন ফারাজকে ডেকে একসাথে বলে,
- ভাই, মাহিরাকে ডেকে দিস,
- ঠিক আছে..!
মেহরিন কিচেন থেকে প্লেট আর কাপ নিয়ে আসে ফুচকা গুলো সুন্দর করে সাজায়,কিছুক্ষন পর মাহিরা আসে ছোট ছোট পায়ে এসে রুমে দরজায় দাড়িয়ে থেকে বলে
- বড় আপু ছোট আপু,
মাইশা, মেহরিন দুজনই দরজার দিকে তাকায়,মেহরিন মুচকি হেসে বলে- আয় ভেতরে,
মাহিরা হাসি মুখে ভেতরে এসে বেডের উপরে উঠে বসে,
মাইশা ফুচকার মধ্যে টক দিতে দিতে মাহিরাকে বলে
- মাহি মনি তুমি টক কম খাবে,নাহলে তোমার পেট খারাপ করলে পরে,আমরা বড় আব্বুর বকা শুনবো..
মাহিরা ডাগর চোখ দিয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে, দাঁত দেখিয়ে হাসতে থাকে,হাসলে মেয়েটাকে কি মায়া লাগে শুধু তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছা করে,
মেহেরিন প্রথমে ছোট্ট একটা ফুচকা মাহিরার দিকে এগিয়ে দেয়, মাহিরা মুখে হাত দিয়ে রাখে আর বলে
- না না, প্রথমে বড় আপু খাবে,তারপর ছোট আপু,পরে আমি,
মেহরিন কপাল কুচকে তাকিয়ে বলে
- ওমা এ বলে কি, এতো ম্যানার্স কই শিখেছো,তুমি?
- হ্যাঁ, আমার আম্মু বলেছে, প্রথমে বড়রা খাবে পরে ছোটরা,
মাইশা হাসতে হাসতে বলে,
- আরে কে বলেছে আমরা বড়? আমরা তো এখনো ছোট, তুমিই তো বড়,এইযে আমরা তোমার মতো এত পাকা পাকা কথা বলতে পারিনা এখনো,বড় হলাম কবে?
এরপর ওরা কথা বলতে বলতে খাওয়ার পর্ব শেষ করে।
'সবাই রাতের খাবার শেষ করে যার যার রুমে চলে যায়,
মাইশা কিছুক্ষন ভার্সিটির পড়া পড়ছিলো,মেহরিন পড়া শেষ করে, বেডের সাথে হেলান দিয়েই মোবাইল দেখায় বেস্ত,মোবাইল দেখে আর মুচকি মুচকি হাসে,ফারাজ ডয়িং এ যাওয়ার সময় মেহরিনকে এভাবে হাসতে দেখে কপাল কুচকে তাকায়,এর হাসির কারণ কি? ফারাজ দরজায় টোকা দেয়,মেহরিন ব্রু কুচকে, তাকিয়ে দেখলো ফারাজ দাঁড়িয়ে আছে,ফারাজকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মেহরিন বলে,
- কিহ রে? কি খুজছিস?
- তুই এভাবে শাকচুন্নির মতো হাসতেছিস কেনো?
- এই বেয়াদপ কথা সাবধানে বল!
ফারাজ কিছুটা আতংকিত ভাব নিয়ে অভিনয় করে, গলা নামিয়ে আস্তে আস্তে বলে,
- কেন রে? বাসায় চোর ডুকেছে? সাবধানে কথা বলতে হবে? কি মুসিবত বাবা, এত রাতে চোর কিভাবে আসলো?
মেহরিন ফারাজের কথায় ভেঙছি কেটে বলে
- যা সরর,শয়তান,
বলেই মেহরিন হালকা চেচিয়ে উঠে,আপুউউ চোররর,
ফারাজ থতমত খেয়ে যায়, কি সাংগাতিক মেয়েরে ভাবা,নিজের বলা কথায় যখন নিজেকেই ফাঁসিয়ে দেয়,
- এইই বেয়াদপ, চুপ কর।
ততক্ষনে মাইশা পড়ার রুম থেকে বেরিয়ে আসে,চোখে মুখে বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে দেখে এদিক ওদিক,নাহ তো সব তো ঠিকই আছে চোর কোথায়? দরজার কাছে ফারাজকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে যা বুঝার বুঝলো..
মেহরিনকে বলে- এইই ফাজিল মাইয়া,কি সমস্যা তোর? আরেকটু হলে আমার জান বের হয়ে যেতো,কি ভয়টাই না পাইছি আমি,এমন চেচাচ্ছিলি কেনো?
মেহরিন বলে - আমি বলি নাই,ফারাজ বলছে বাসায় নাকি চোর ডুকেছে!
ফারাজ অবাক হয়ে চেয়ে আছে, মাইশা কে বলে
- আপু আসলে আমি এদিকটায় যাচ্ছিলাম,ও আমাকে সাবধানে থাকতো বললো তাই,ভাবলাম চোর ডুকেছে কিনা, ওকে বলতেই চেচিয়ে উঠলো!
' মাইশা কি বলবে বুঝলো না,দুইটাই ফাজিল কাকে কি বলবে,কিছুটা ধমকের সুরে বলে উঠে
- আরেকবার তোরা আমার পড়ার দিস্টার্ব করলে বড় আব্বুকে গিয়ে বলে দিবো,
বলেই হেটে পড়ার ঘরে চলে যায়,
ফারাজ আবারও মেহরিনের দিকে, তাকিয়ে বলে
- শাকচুন্নি
বলেই হাসি দিয়ে দোড দেয়,মেহরিন বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে থেকে বিড়বিড় করে"শালা বাদর"