তুমি শুধুই আমার বউ
লেখিকা: Oyshe Chowdhury
পর্ব: ০৩
সকাল ৮টা।
খান বাড়ির ডাইনিং রুম।
সকালের নাশতার টেবিলে পরিবারের সবাই উপস্থিত। শুধু একজনের দেখা নেই। আর সেই একজন হলো বাড়ির নতুন বউ আইরা।
রাদিফ প্লেটে পরোটা নিয়ে বসে আছে। একবার সিঁড়ির দিকে তাকাচ্ছে, আরেকবার রুশোর দিকে।
রুশো নিজের ফোনে কিছু একটা দেখছিল।
রাদিফ হঠাৎ বলে উঠল,
— ভাইয়া!
রুশো ফোন থেকে চোখ না তুলেই বলল,
— কী?
— একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
— কর।
— তোর বিয়ে হয়েছে কয়দিন?
রুশো বিরক্ত হয়ে তাকাল।
— দুদিন।
— বাহ্! মাত্র দুদিনেই বাড়ির পরিবেশ এমন হয়ে গেছে, মনে হচ্ছে এখানে প্রতিদিন ঈদের পরদিন!
রুশো ভ্রু কুঁচকে বলল,
— কথাটা বুঝিয়ে বল।
রাদিফ পরোটায় কামড় দিয়ে বলল,
— আগে তুই একা রাগ করতি, এখন ভাবিও রাগ করে। আগে তুই একা চুপ থাকতি, এখন ভাবিও চুপ থাকে। আগে তুই একা কাউকে পাত্তা দিতি না, এখন ভাবিও তোকে পাত্তা দেয় না। কী সুন্দর মিল!
পাশ থেকে পরিবারের একজন হেসে ফেললেন।
রুশো ঠান্ডা গলায় বলল,
— তোর নাশতা শেষ?
— না।
— তাহলে মুখ বন্ধ রেখে খা।
রাদিফ নিজের মুখে হাত দিয়ে বলল,
— ঠিক আছে। আমি আর কথা বলব না।
কিন্তু মাত্র দশ সেকেন্ড পরেই আবার বলল,
— তবে ভাবি কোথায়?
রুশো এবার কোনো উত্তর দিল না।
অন্যদিকে, আইরার ঘর।
আইরা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াচ্ছে। আজ তার ঘুম থেকে উঠতে একটু দেরি হয়েছে। কিন্তু সে এতে মোটেও চিন্তিত নয়।
হঠাৎ ফোনে কল আসতেই সে রিসিভ করল।
— হ্যালো!
ওপাশ থেকে পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এল।
— কিরে, নতুন সংসার কেমন চলছে?
আইরা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— সংসার না, মনে হচ্ছে কারাগারে বন্দি হয়েছি।
— কেন? জামাই কী করে?
— জামাই না, একটা রাগী বাঘ। মুখ খুললেই গর্জন করে।
ওপাশ থেকে হাসির শব্দ এল।
— তাহলে তুই কী করিস?
— আমি তো মানুষ। বাঘের সঙ্গে কথা বলতে গেলে আমাকেও একটু গর্জন করতে হয়।
— হায় আল্লাহ! তোদের সংসার কত দিন টিকবে?
আইরা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
— আগে বাঘটা আমাকে সহ্য করতে শিখুক। তারপর দেখা যাবে।
কথা বলতে বলতে সে ঘর থেকে বেরিয়ে ডাইনিং রুমের দিকে রওনা হলো।
সকাল ৮টা ৩০ মিনিট।
আইরা ডাইনিং রুমে প্রবেশ করতেই রাদিফ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
— এই যে! আমাদের ঘুমকুমারী ভাবি এসে গেছেন!
আইরা চেয়ারে বসতে বসতে বলল,
— আপনার কি আর কোনো কাজ নেই?
— আছে তো। কিন্তু আপনাকে বিরক্ত করা আমার জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
— তাহলে আপনার জীবনটা বেশ দুঃখের।
— কেন?
— এত গুরুত্বপূর্ণ কাজের মধ্যে সময় নষ্ট করছেন!
রাদিফ বুকের ওপর হাত রেখে বলল,
— ভাবি, আপনার কথায় আমি আহত হয়েছি।
আইরা খাবার নিতে নিতে বলল,
— ব্যান্ডেজ লাগিয়ে দেব?
রাদিফ হেসে ফেলল।
ঠিক তখনই রুশো বলল,
— সকালে এত কথা বলার কী আছে?
আইরা তার দিকে তাকাল।
— আপনাকে তো কিছু বলিনি।
— আমাকে বলার দরকার নেই।
— তাহলে শুনছেন কেন?
রাদিফ এবার পানি খেতে গিয়ে কাশতে শুরু করল।
— ভাই, ভাবির সঙ্গে তর্কে জিততে হলে আগে থেকে প্রস্তুতি নিয়ে আসতে হবে!
রুশো কঠিন চোখে তাকাল।
— রাদিফ!
— জি, আমি চুপ!
সকাল ১০টা।
রুশো অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
আইরা আলমারির সামনে দাঁড়িয়ে নিজের পোশাক খুঁজছিল। হঠাৎ রুশোর একটি শার্ট তার হাতে চলে এল।
সে শার্টটা হাতে নিয়ে বলল,
— এই যে, আপনার শার্টটা এখানে কেন?
রুশো ঘুরে তাকাল।
— ওটা আমার।
— সেটা তো বুঝতেই পারছি। কিন্তু আমার কাপড়ের মধ্যে কীভাবে এল?
— আপনার কাপড়ের মধ্যে আসেনি। আপনার কাপড় আমার আলমারিতে রেখেছেন।
আইরা চোখ বড় করে বলল,
— আপনার আলমারি? এই ঘরে কি আমি ভাড়া থাকি?
রুশো বিরক্ত হয়ে বলল,
— আইরা, সকালে আমার মেজাজ খারাপ করবেন না।
আইরা শার্টটা যথাস্থানে রেখে বলল,
— আপনার মেজাজ তো সব সময়ই খারাপ থাকে। ভালো থাকলে চিনতে পারতাম না।
রুশো আর কোনো কথা না বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
দুপুর ১টা।
রাদিফের নতুন পরিকল্পনা।
সে নিজের ঘরে বসে একটা কাগজে কিছু লিখছে। পাশে বসে তার এক বন্ধু।
বন্ধু জিজ্ঞেস করল,
— কী লিখছিস?
রাদিফ গম্ভীর মুখে বলল,
— পারিবারিক শান্তি রক্ষার পরিকল্পনা।
— তুই আবার শান্তি রক্ষা করবি?
— হ্যাঁ। আমার ভাই আর ভাবির মধ্যে যে যুদ্ধ চলছে, সেটা থামানো দরকার।
বন্ধু হেসে বলল,
— কীভাবে?
রাদিফ কাগজটা সামনে ধরে বলল,
— প্রথমে দুজনকে একসঙ্গে বসাব। তারপর দুজনের হাতে চা দেব। তারপর বলব, একে অপরকে ভালোবাসতে হবে।
বন্ধু হেসে গড়িয়ে পড়ল।
— তোর মাথা ঠিক আছে?
রাদিফ গম্ভীরভাবে বলল,
— আমার মাথা একদম ঠিক। শুধু মাঝে মাঝে বুদ্ধি একটু ছুটি নেয়।
বিকেল ৫টা।
রুশো অফিস থেকে ফিরে ঘরে প্রবেশ করল।
ঘরে ঢুকেই দেখল, আইরা বিছানায় বসে একটা বই পড়ছে। তার পাশে চায়ের কাপ।
রুশো নিজের কোট খুলে রাখল।
আইরা বই থেকে চোখ না তুলেই বলল,
— চা খাবেন?
রুশো একটু অবাক হলো।
— কী?
— চা। খাবেন কি না?
— না।
আইরা আবার বইয়ের দিকে মন দিল।
কিছুক্ষণ পর রুশো নিজেই বলল,
— আপনি চা বানিয়েছেন?
আইরা এবার তাকাল।
— না, জাদু করে হাজির হয়েছে।
রুশো বিরক্ত হয়ে বলল,
— আপনার কথার ধরনটা পরিবর্তন করুন।
আইরা বই বন্ধ করে বলল,
— আপনি আগে নিজের কথার ধরন পরিবর্তন করুন।
দুজনের চোখাচোখি হলো।
রুশো কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বাথরুমে চলে গেল।
আইরা নিজের মনে বলল,
— কী অদ্ভুত মানুষ! চা খাবে না, আবার প্রশ্ন করবে চা বানিয়েছি কি না!
সন্ধ্যা ৭টা।
ড্রয়িংরুম।
পরিবারের সবাই বসে গল্প করছে। রাদিফ সোফায় বসে টেলিভিশনে একটা অনুষ্ঠান দেখছে।
আইরা এসে তার পাশে বসল।
রাদিফ বলল,
— ভাবি, একটা কথা বলি?
— বলুন।
— আপনার আর ভাইয়ার মধ্যে একটা প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত।
— কিসের?
— কে বেশি রাগ করতে পারে!
আইরা হেসে বলল,
— আপনার ভাই জিতবে।
রাদিফ অবাক হয়ে বলল,
— কেন?
— কারণ উনি রাগ করতে করতে বয়স পার করে ফেলেছেন। আমার এখনো অভিজ্ঞতা কম।
রাদিফ হাসতে হাসতে সোফায় হেলে পড়ল।
ঠিক তখনই রুশো ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করল।
— রাদিফ, তোর সঙ্গে কথা আছে।
রাদিফের হাসি বন্ধ।
— কী কথা, ভাই?
— আমার ঘরে আয়।
রাদিফ উঠে দাঁড়িয়ে আইরার কানে কানে বলল,
— ভাবি, যদি আজকে আমাকে আর না দেখেন, বুঝবেন ভাই আমাকে পৃথিবী থেকে বিদায় করে দিয়েছে।
আইরা হাসি চেপে বলল,
— আল্লাহ হাফেজ!
রাদিফ চোখ বড় করে বলল,
— আপনি আমার জন্য একটু কাঁদবেন না?
— চেষ্টা করব।
রাদিফ মাথা নেড়ে রুশোর পেছনে চলে গেল।
রাত ১০টা ৩০ মিনিট।
রুশো ঘরে ফিরে দেখল আইরা বিছানার একপাশে বসে ফোন চালাচ্ছে।
রুশো নিজের ফোনটা টেবিলে রেখে বলল,
— কাল আমার সঙ্গে বাইরে যেতে হবে।
আইরা ফোন থেকে চোখ তুলে তাকাল।
— কোথায়?
— একটা পারিবারিক অনুষ্ঠানে।
— আমি যাব না।
রুশো ভ্রু কুঁচকে বলল,
— কেন?
— ইচ্ছা করছে না।
— আপনাকে যেতে হবে।
আইরা এবার ফোনটা নামিয়ে রাখল।
— দেখুন, আপনি আপনার ইচ্ছামতো সবকিছু করতে পারেন না। আমারও নিজের ইচ্ছা আছে।
রুশো গম্ভীর গলায় বলল,
— আপনি আমার স্ত্রী। আমার পরিবারের অনুষ্ঠানে আপনার উপস্থিত থাকা উচিত।
আইরা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
— ঠিক আছে। যাব। তবে একটা শর্ত আছে।
— কী শর্ত?
— সেখানে গিয়ে আমাকে কারও সামনে অপমান করতে পারবেন না। আর আমার হয়ে কোনো সিদ্ধান্তও নিতে পারবেন না।
রুশো তার দিকে তাকিয়ে রইল।
— আমি কাউকে অপমান করি না।
আইরা মুচকি হেসে বলল,
— নিজের ব্যবহারটা একটু খেয়াল করবেন। তাহলে বুঝতে পারবেন।
রুশো বিরক্ত হয়ে লাইট বন্ধ করে দিল।
আইরা অন্ধকারে বিড়বিড় করে বলল,
— সারাদিন রাগ, রাতে রাগ, ঘুমের মধ্যেও মনে হয় রাগ করেন!
রুশো পাশ ফিরে বলল,
— শুনতে পাচ্ছি।
আইরা সঙ্গে সঙ্গে চুপ।
কয়েক সেকেন্ড পর আবার ফিসফিস করে বলল,
— কানে তো বেশ ভালোই শোনেন!
রুশো এবার আর উত্তর দিল না।
কিন্তু তার মুখের বিরক্তি দেখে বোঝা যাচ্ছিল, এই মেয়ের সঙ্গে একই ঘরে থাকা তার জন্য খুব সহজ হতে যাচ্ছে না।
আর আইরা?
সে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে, যত দিন এই বাড়িতে থাকবে, নিজের জেদ আর আত্মসম্মান কোনোটাই ছাড়বে না।
অন্যদিকে, রাদিফ নিজের ঘরে বসে নতুন একটা পরিকল্পনা করছে।
তার মাথায় এসেছে এমন এক বুদ্ধি, যেটা বাস্তবায়ন করতে পারলে রুশো আর আইরাকে একসঙ্গে বিপদে ফেলা যাবে।
কী সেই পরিকল্পনা?
সেটা জানতে হলে অপেক্ষা করতে হবে পরবর্তী পর্বের জন্য।
চলবে…
পাঠক-পাঠিকাদের উদ্দেশ্যে: রুশো আর আইরার ঝগড়া কেমন লাগছে? আর আমাদের দুষ্টু রাদিফের পরিকল্পনা কেমন হতে পারে, অনুমান করে মন্তব্যে জানাও। তোমাদের সুন্দর মন্তব্য আমাকে পরবর্তী পর্ব লেখার অনুপ্রেরণা দেয়। ❤️