তুমি শুধুই আমার বউ
লেখিকা: Oyshe Chowdhury
পর্ব: ০৪
সকাল ৯টা।
খান বাড়ির ডাইনিং রুমে বসে নাশতা করছে সবাই। রুশো নিজের ফোনে অফিসের কিছু কাজ দেখছে। তার পাশে বসে রাদিফ পরোটা খেতে খেতে অনবরত কথা বলে যাচ্ছে।
— মা, একটা কথা বলি?
রুশোর মা মুচকি হেসে বললেন,
— বল।
— আমাদের বাড়িতে নতুন বউ আসার পর থেকে আমার জীবনটা অনেক সুন্দর হয়ে গেছে।
রুশো ফোন থেকে চোখ না তুলেই বলল,
— তোর জীবন এত সুন্দর হলে বিয়ে করে ফেল।
রাদিফ মুখ বাঁকিয়ে বলল,
— আরে ভাই, বিয়ে করব কেন? আমার তো ভাবি আছেন। বিনা পয়সায় আড্ডা দেওয়ার মানুষ পেয়ে গেছি।
ঠিক তখনই আইরা সিঁড়ি দিয়ে নামল।
রাদিফ তাকে দেখেই চেয়ার ছেড়ে দাঁড়াল।
— এই যে আমার প্রিয় ভাবি! আসুন, আসুন। আপনার অপেক্ষায় আমরা না খেয়ে বসে আছি।
আইরা চেয়ারে বসতে বসতে বলল,
— আপনার অপেক্ষায় কেউ না খেয়ে বসে থাকলে আমাকে আগে জানাবেন। আমি সময়মতো পালিয়ে যাব।
রাদিফ হেসে উঠল।
— ভাবি, আপনি দিন দিন আমার মতো হয়ে যাচ্ছেন।
আইরা খাবার নিতে নিতে বলল,
— সাবধান! আপনার মতো হয়ে গেলে এই বাড়ির মানুষ আমাকে সহ্য করতে পারবে না।
রুশো এবার ফোন থেকে মুখ তুলল।
— তোমাদের সকালবেলা শুরু হয়েছে?
রাদিফ মুচকি হেসে বলল,
— ভাই, তুই চাইলে আমাদের আড্ডায় যোগ দিতে পারিস।
— আমার এত সময় নেই।
আইরা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— সময় নেই, নাকি মেজাজ নেই?
রাদিফ মুখে হাত দিয়ে হাসি আটকাল।
রুশো একবার আইরার দিকে তাকিয়ে আবার নিজের কাজে মন দিল।
সকাল ১১টা।
রুশো অফিসে চলে গেছে।
আইরা নিজের ঘরে বসে ফোন চালাচ্ছিল। এমন সময় দরজা ঠেলে রাদিফ প্রবেশ করল।
— ভাবি!
আইরা চমকে তাকাল।
— আরে! দরজায় নক করতে জানেন না?
রাদিফ মাথা চুলকে বলল,
— জানি তো। কিন্তু আপনার ঘরে আসতে নক করার কী দরকার? আপনি তো আমার ভাবি!
আইরা ভ্রু কুঁচকে বলল,
— এই যুক্তি দিয়ে একদিন আপনার মাথায় বালিশ ছুড়ে মারব।
রাদিফ সঙ্গে সঙ্গে বিছানায় বসে পড়ল।
— মারবেন। তবে নরম বালিশ দিয়ে মারবেন। আমার মাথাটা একটু দামি।
আইরা হেসে ফেলল।
রাদিফ এবার পকেট থেকে একটা চকলেট বের করে তার দিকে বাড়িয়ে দিল।
— নেন, ভাবি। আপনার জন্য এনেছি।
আইরা চকলেটটা হাতে নিয়ে বলল,
— বাহ্! এত ভালোবাসা কেন?
— কারণ আপনি আমার ভাইয়ের বউ। ভাইকে জ্বালানোর জন্য আপনাকে সুস্থ রাখা জরুরি।
আইরা চকলেটের প্যাকেট খুলতে খুলতে বলল,
— আপনি একটা আস্ত শয়তান!
— ধন্যবাদ। এই প্রশংসাটা আমি অনেক কষ্টে অর্জন করেছি।
দুজনেই হেসে উঠল।
এরপর শুরু হলো তাদের আড্ডা।
কখনো রুশোর ছোটবেলার গল্প, কখনো রাদিফের স্কুলের দুষ্টুমি, কখনো আবার বাড়ির অন্য সদস্যদের নিয়ে মজার আলোচনা।
আইরা হঠাৎ জিজ্ঞেস করল,
— আচ্ছা, আপনার ভাই ছোটবেলায়ও এত রাগী ছিল?
রাদিফ চোখ বড় করে বলল,
— ভাবি, ছোটবেলায় ভাইয়ের রাগ আরও ভয়ংকর ছিল।
— কেন?
— একবার আমি তার প্রিয় খেলনা গাড়ি ভেঙে ফেলেছিলাম। তারপর ভাই আমাকে এমনভাবে তাকিয়ে দেখেছিল যে আমি তিন দিন তার সামনে যাইনি।
আইরা হেসে বলল,
— আপনি গাড়ি ভেঙেছিলেন কেন?
— খেলনা গাড়ি ছিল। আমি ভেবেছিলাম ভেতরে মানুষ আছে কি না পরীক্ষা করব।
আইরা হাসতে হাসতে বলল,
— তারপর?
— তারপর বুঝেছি, গাড়ির ভেতরে মানুষ না থাকলেও ভাইয়ের ভেতরে একটা আস্ত দানব থাকে।
আইরা এবার জোরে হেসে উঠল।
ঠিক তখনই রাদিফের ফোন বেজে উঠল।
স্ক্রিনে রুশোর নাম।
রাদিফ ফোন রিসিভ করল।
— জি, বস!
ওপাশ থেকে রুশোর গম্ভীর কণ্ঠ,
— কোথায় তুই?
— ভাবির ঘরে।
— কেন?
— ভাবির সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ মিটিং করছি।
— কীসের মিটিং?
রাদিফ আইরার দিকে তাকিয়ে বলল,
— ভাই, সংসার পরিচালনা বিষয়ক।
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর রুশো বলল,
— অফিসে আয়।
রাদিফ মুখ বাঁকাল।
— এখনই?
— হ্যাঁ।
— ভাই, আমি তো বাড়িতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছি।
— রাদিফ!
— আচ্ছা, আসছি।
ফোন কেটে রাদিফ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
আইরা বলল,
— কী হলো?
রাদিফ নাটকীয়ভাবে বলল,
— আমার সুখ ভাইয়ের সহ্য হয় না, ভাবি!
দুপুর ১টা।
রুশোর অফিস।
রাদিফ অফিসে পৌঁছে ভাইয়ের কেবিনে ঢুকল।
রুশো ফাইল দেখতে দেখতে বলল,
— এতক্ষণ কোথায় ছিলি?
— বাড়িতে।
— কী করছিলি?
— বললাম তো, ভাবির সঙ্গে মিটিং।
রুশো ফাইল থেকে চোখ তুলে তাকাল।
— সারাদিন ভাবির ঘরে বসে থাকবি?
রাদিফ চেয়ারে বসে বলল,
— কেন? ভাবির সঙ্গে কথা বললে সমস্যা কী?
— কোনো সমস্যা নেই। তবে নিজের কাজকর্মও আছে।
রাদিফ একটু চুপ করে থেকে মুচকি হাসল।
— ভাই, একটা কথা বলব?
— বল।
— তুই কি জেলাস?
রুশো ভ্রু কুঁচকে বলল,
— কীসের?
— আমি ভাবির সঙ্গে বেশি সময় কাটাচ্ছি বলে।
রুশো ফাইলটা বন্ধ করল।
— তোর মাথা খারাপ হয়েছে?
রাদিফ এবার হাসি আটকে বলল,
— তাহলে একটা কাজ কর। তুইও ভাবির সঙ্গে গল্প কর। আমি আর মাঝখানে আসব না।
— রাদিফ!
— আচ্ছা, আচ্ছা! বুঝেছি। তোর বউয়ের সঙ্গে কথা বলার অনুমতি নিতে হবে।
রুশো এবার চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
— তোর কি কাজ নেই?
রাদিফ সঙ্গে সঙ্গে উঠে গেল।
— আছে ভাই, আছে। তবে তোর মেজাজের ওপর গবেষণা করার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ আর নেই।
বিকেল ৪টা।
খান বাড়ির ছাদ।
আইরা ছাদে বসে আকাশ দেখছিল। কিছুক্ষণ পর রাদিফ এসে তার পাশে বসল।
— ভাবি!
আইরা তাকিয়ে বলল,
— কী হলো? অফিস থেকে পালিয়ে এসেছেন?
রাদিফ অবাক হয়ে বলল,
— আপনি কীভাবে বুঝলেন?
— আপনার চেহারায় লেখা আছে।
রাদিফ হেসে বলল,
— আসলে ভাইয়ের কাছে বেশিক্ষণ থাকলে আমার স্বাধীনতা বিপন্ন হয়।
আইরা মুচকি হেসে বলল,
— আপনার ভাইয়ের রাগ একটু বেশি।
— একটু? ভাবি, আপনি তো এখনো কিছুই দেখেননি!
আইরা হেসে ফেলল।
রাদিফ এবার নিজের ফোন বের করে বলল,
— ভাবি, একটা ছবি তুলি?
— তুলুন।
দুজন পাশাপাশি বসে ছবি তুলল।
রাদিফ ছবিটা দেখে বলল,
— অসাধারণ! আমাদের জুটি একদম পারফেক্ট।
আইরা বলল,
— আপনি আর আমি?
— হ্যাঁ। দেবর-ভাবি জুটি!
ঠিক তখনই ছাদের দরজায় রুশো এসে দাঁড়াল।
তার চোখ প্রথমে রাদিফের দিকে, তারপর আইরার দিকে গেল।
— রাদিফ!
রাদিফ ঘুরে তাকাল।
— জি, ভাই?
— তুই এখানে কী করছিস?
— আকাশ দেখছি।
— আকাশ দেখার জন্য ছাদে আসতে হয়?
রাদিফ আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
— না, তবে ছাদে এসে আকাশ দেখলে আকাশটা একটু বড় লাগে।
আইরা মুখ চেপে হাসছে।
রুশো গম্ভীর গলায় বলল,
— নিচে আয়।
রাদিফ উঠে দাঁড়াল।
— ভাই, একটু দাঁড়া। ভাবির সঙ্গে একটা ছবি তুলেছি, দেখবি?
রুশো অনিচ্ছা সত্ত্বেও ফোনের দিকে তাকাল।
ছবিতে আইরা হাসছে, রাদিফও হাসছে।
রুশোর মুখ আরও গম্ভীর হয়ে গেল।
— এসব ছবি তোলার কী দরকার?
রাদিফ অবাক হয়ে বলল,
— কেন? ছবি তুলতে কি এখন থেকে তোর অনুমতি লাগবে?
রুশো কঠিন গলায় বলল,
— আমি সেটা বলিনি।
আইরা এবার মুচকি হেসে বলল,
— আপনি চাইলে আপনার সঙ্গেও একটা ছবি তুলতে পারি। তবে হাসতে হবে।
রুশো সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— আমার ছবি তোলার শখ নেই।
আইরা মাথা নেড়ে বলল,
— বুঝেছি। হাসলে আপনার ব্যক্তিত্ব নষ্ট হয়ে যাবে।
রাদিফ আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
— ভাবি! আপনি একদম ঠিক বলেছেন!
রুশো দুজনের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
— তোমরা দুজন মিলে আমাকে পাগল করে দেবে।
কথাটা বলে সে নিচে চলে গেল।
রাদিফ আইরার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
— ভাবি, ভাই কিন্তু আজকে একটু বেশিই জ্বলছে।
আইরা হেসে বলল,
— আপনার ভাইয়ের সমস্যা কী, সেটা উনিই ভালো জানেন।
সন্ধ্যা ৭টা।
ড্রয়িংরুমে সবাই বসে আছে।
রুশো সোফায় বসে ল্যাপটপে কাজ করছে। আইরা আর রাদিফ অন্য সোফায় বসে গল্প করছে।
রাদিফ হঠাৎ বলল,
— ভাবি, একটা গান শোনাব?
আইরা আগ্রহ নিয়ে বলল,
— শোনান।
রাদিফ গলা খাঁকারি দিয়ে গাইতে শুরু করল—
— আমার ভাইয়ের রাগের বাজারে, নতুন বউয়ের জেদের হাঁড়ি, দুজন মিলে সংসার করে, আমি শুধু খাই ঝাড়ি!
আইরা হেসে কুটিকুটি।
রুশো ল্যাপটপ বন্ধ করে বলল,
— রাদিফ!
রাদিফ গান থামিয়ে বলল,
— জি, ভাই?
— তোর গান বন্ধ কর।
— কেন? ভালো লাগছে না?
— না।
আইরা পাশ থেকে বলল,
— আমার তো ভালো লাগছে।
রাদিফ সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— দেখেছিস ভাই? অন্তত একজন আমার প্রতিভার মূল্যায়ন করে।
রুশো আইরার দিকে তাকাল।
— আপনার এত হাসির কী আছে?
আইরা হাসতে হাসতেই বলল,
— আপনার ভাইয়ের গানটা আপনার চরিত্রের সঙ্গে বেশ মানিয়েছে।
রাদিফ আবার গাইতে শুরু করল।
রুশো এবার উঠে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।
রাদিফ পেছন থেকে চেঁচিয়ে বলল,
— ভাই! রাগ করে চলে যাস না! গানটা কিন্তু এখনো শেষ হয়নি!
রাত ১১টা।
রুশো ঘরে ঢুকে দেখল আইরা বিছানায় বসে ফোনে কিছু একটা দেখছে। তাকে দেখে আইরা ফোনটা নামিয়ে রাখল।
রুশো কাপড় বদলাতে বদলাতে বলল,
— সারাদিন রাদিফের সঙ্গে কী এত কথা থাকে?
আইরা অবাক হয়ে তাকাল।
— কেন?
— এমনি জিজ্ঞেস করলাম।
আইরা মুচকি হেসে বলল,
— আপনি কি রাদিফের ওপর রাগ করছেন?
— না।
— তাহলে?
— কিছু না।
আইরা এবার একটু কাছে এগিয়ে এসে বলল,
— একটা কথা বলি?
— বলুন।
— আপনি আমাকে পছন্দ করেন না, সেটা আমি বুঝি। কিন্তু আপনার ভাইয়ের সঙ্গে কথা বললে আপনার এত সমস্যা কেন?
রুশো তার দিকে তাকাল।
কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বলল,
— আমার কোনো সমস্যা নেই।
আইরা হাসল।
— তাহলে ভালো। কাল থেকে আরও বেশি আড্ডা দেব।
রুশো চোখ সরু করল।
— আপনার যা ইচ্ছা করুন।
আইরা আবার নিজের জায়গায় ফিরে গেল।
কিন্তু রুশোর মনের মধ্যে কথাটা ঘুরতে থাকল।
সে নিজেও বুঝতে পারছে না, আইরা আর রাদিফের হাসাহাসি দেখলে তার এত বিরক্ত লাগে কেন।
মেয়েটাকে সে এখনো ভালোবাসে না। বিয়েটাও তার ইচ্ছায় হয়নি।
তবুও আইরাকে অন্য কারও সঙ্গে এত হাসিখুশি দেখলে তার ভেতরটা কেমন যেন হয়ে যায়।
আর আইরা?
সে তো রুশোর মনের এই অদ্ভুত পরিবর্তনের কিছুই বুঝতে পারছে না।
বরং মনে মনে নতুন একটা পরিকল্পনা করছে।
রুশো খানকে একটু বেশি জ্বালানো দরকার!
চলবে…
পাঠক-পাঠিকাদের উদ্দেশ্যে: রুশোর এই অদ্ভুত বিরক্তি কি শুধুই রাগ, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো অনুভূতি লুকিয়ে আছে? আর রাদিফ-আইরার দেবর-ভাবির জুটি কেমন লাগছে? সুন্দর মন্তব্য করে জানাবে। তোমাদের মন্তব্যই লেখার অনুপ্রেরণা। ❤️