ফন্ট সাইজ:
থিম:
তুমি শুধুই আমার বউ

পর্ব 11

লেখক: Oyshe Chowdhury

তুমি শুধুই আমার বউ

লেখিকা: Oyshe Chowdhury

পর্ব: ১১

সকাল আটটা।

বাড়ির ডাইনিং রুমে সকালের নাশতার আয়োজন চলছে। টেবিলের এক পাশে রুশো বসে ল্যাপটপে কিছু একটা দেখছে। সামনে রাখা কফির কাপটা বেশ কিছুক্ষণ ধরেই ঠান্ডা হয়ে আছে। অথচ সেদিকে তার কোনো খেয়াল নেই।

অন্যদিকে রাদিফের আজ সকাল থেকেই বেশ ফুরফুরে মেজাজ। সে এক হাতে টোস্ট আর অন্য হাতে জুসের গ্লাস নিয়ে বসে আছে। মুখে একের পর এক কথা।

— মা, আজকে নাশতায় কী আছে?

রুশোর মা মুচকি হেসে বললেন,

— তোর সামনে যা আছে, সেগুলো কি সাজিয়ে রাখার জন্য দিয়েছি?

— না মা। আমি আসলে জানতে চাচ্ছিলাম, এগুলোর বাইরে আর কিছু আছে কি না। মানুষের জীবনে বৈচিত্র্য থাকা দরকার।

রুশো ল্যাপটপ থেকে চোখ না তুলেই বলল,

— তোর জীবনে বৈচিত্র্যের অভাব নেই। এবার চুপচাপ খা।

রাদিফ ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে মুখ বাঁকাল।

— ভাইয়া, সকালে মানুষের সঙ্গে একটু ভালো ব্যবহার করতে হয়। সারাক্ষণ এমন মুখ করে থাকো কেন? মনে হয় কেউ তোমার কাছ থেকে কয়েক কোটি টাকা ধার নিয়ে পালিয়েছে।

— রাদিফ!

একটা ধমকেই রাদিফের মুখ বন্ধ হয়ে গেল। তবে বেশিক্ষণ নয়।

সে এবার আইরার দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল,

— ভাবী, দেখেছেন? আমার ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলার জন্য আলাদা সাহসের প্রয়োজন হয়।

আইরা তখন নিজের প্লেটে পরোটা নিচ্ছিল। রাদিফের কথা শুনে ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল।

— সাহস তো লাগবেই। তবে আপনার ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলার আগে মনে হয় একটা আবেদনপত্র জমা দিতে হয়।

রাদিফ হো হো করে হেসে উঠল।

— ভাবী! আপনি তো একেবারে মনের কথা বলে দিলেন!

রুশো এবার ল্যাপটপ বন্ধ করে দুজনের দিকে তাকাল।

— তোমাদের দুজনের নাশতা শেষ হয়েছে?

রাদিফ গম্ভীর মুখে উত্তর দিল,

— আমার প্রায় শেষ। তবে ভাবীর সঙ্গে একটা গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা বাকি আছে।

— কী আলোচনা?

— আপনি এত রাগ করেন কেন, সেই বিষয়ে গবেষণা।

আইরা এবার হাসি চাপতে পারল না।

রুশো চোখ সরু করে রাদিফের দিকে তাকাল।

— আমার রাগ নিয়ে গবেষণা করার আগে নিজের কাজগুলো ঠিক কর। গতকালের ফাইলটা এখনো আমার টেবিলে পড়ে আছে।

রাদিফের হাসিটা একটু কমে গেল।

— ফাইলটা আমি দেখে দেব, ভাইয়া। দুপুরের আগেই পেয়ে যাবে।

— দুপুরের আগে না। দশটার মধ্যে চাই।

— ঠিক আছে।

এবার রাদিফের গলায় আর কোনো হাসিঠাট্টা নেই। সে জানে, কাজের ব্যাপারে রুশো কোনো ছাড় দেয় না। ভাইয়ের ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলোর কিছু অংশ সে নিজেও সামলায়। তাই কখন কোথায় মজা করতে হবে আর কখন চুপ থাকতে হবে, সেটা তার অজানা নয়।

রুশো আবার ল্যাপটপ খুলে কাজে মন দিল।

আইরা পরোটা ছিঁড়তে ছিঁড়তে রাদিফের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,

— আপনার ভাইকে দেখলে মনে হয় ছোটবেলায় কখনো খেলাধুলা করেননি।

রাদিফ মুখে হাত দিয়ে হাসি আটকে বলল,

— করেছেন তো! তবে খেলাধুলার সময়ও মনে হয় প্রতিপক্ষকে হারানোর জন্য আলাদা পরিকল্পনা করতেন।

আইরা আবার হেসে ফেলল।

রুশো এবার সরাসরি তাকাল।

— আইরা, তোমার নাশতা শেষ?

আইরা ভ্রু কুঁচকে বলল,

— কেন? শেষ না হলে কি নাশতা কেড়ে নেবেন?

— আমি শুধু জিজ্ঞেস করেছি।

— তাহলে উত্তরটা হলো, শেষ হয়নি।

রুশো আর কথা বাড়াল না। তবে তার মুখের বিরক্তিটা স্পষ্ট।

রাদিফ চুপচাপ পানি খেল। ভাইয়ের সামনে আরেকটু কথা বললে আজ সত্যিই বিপদ হতে পারে।

নাশতা শেষে রুশো নিজের ঘরে চলে গেল। আজ তার অফিসে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মিটিং আছে। যাওয়ার আগে ফোনে কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলতে হবে।

আইরা ডাইনিং রুম থেকে নিজের ঘরে যাওয়ার সময় দেখল, রাদিফ সোফায় বসে ফোন দেখছে।

— কী ব্যাপার? আপনার তো দশটার মধ্যে ফাইল জমা দেওয়ার কথা। এখনো এখানে বসে আছেন কেন?

রাদিফ ফোন থেকে চোখ তুলে বলল,

— ভাবী, আপনি কি আমার খোঁজখবর নেওয়ার জন্য আলাদা দায়িত্ব পেয়েছেন?

— না। কিন্তু আপনার ভাই যদি আবার আমাকে এসে জিজ্ঞেস করেন, তার ভাই কোথায়, তখন আমি কী বলব?

— বলবেন, আপনার দেবর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যস্ত।

— ফোনে ভিডিও দেখাটাও গুরুত্বপূর্ণ কাজ?

রাদিফ সঙ্গে সঙ্গে ফোনটা উল্টে রাখল।

— আপনি কীভাবে বুঝলেন?

আইরা হেসে বলল,

— আপনার মুখ দেখেই।

রাদিফ এবার উঠে দাঁড়াল।

— আচ্ছা, চলুন। আপনাকে একটা জায়গা দেখাই।

— কোথায়?

— আমাদের বাড়ির লাইব্রেরি।

আইরা একটু অবাক হলো।

— আপনাদের বাড়িতে লাইব্রেরিও আছে?

— অবশ্যই আছে। শুধু আমার ভাইয়ের মতো গম্ভীর মানুষদের জন্য নয়, আপনার মতো জেদি মানুষদের জন্যও সেখানে বই রাখা হয়েছে।

— আমাকে জেদি বললেন?

— আমি কি মিথ্যা বলেছি?

আইরা চোখ বড় করে তাকাল।

— দাঁড়ান, আপনার ভাইকে ডেকে বলছি আপনি তার নামে কী কী বলছেন।

রাদিফ সঙ্গে সঙ্গে হাত তুলে বলল,

— না না! ভাবী, এত বড় অন্যায় করবেন না। দেবর-ভাবির সম্পর্কের মধ্যে এতটুকু স্বাধীনতা তো থাকতেই পারে!

দুজনের হাসির শব্দ করিডোর পর্যন্ত পৌঁছে গেল।

লাইব্রেরিটা বাড়ির দোতলার এক পাশে। বড় বড় কাঠের তাকজুড়ে নানা ধরনের বই সাজানো। একপাশে কয়েকটি আরামদায়ক চেয়ার, মাঝখানে লম্বা টেবিল। জানালার পাশে দাঁড়ালে বাগানটা দেখা যায়।

আইরা ঘরে ঢুকেই চারদিকে তাকাল।

— বাহ! জায়গাটা তো বেশ সুন্দর।

রাদিফ গর্বের সঙ্গে বলল,

— আমার বাবার খুব পছন্দের জায়গা। আগে প্রায়ই এখানে বসে বই পড়তেন।

আইরা একটা বইয়ের তাকের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

— আপনার বাবা এখনো এখানে আসেন?

— আসেন। তবে আগের মতো সময় পান না।

কথাটা বলার সময় রাদিফের গলায় সামান্য পরিবর্তন এল। বাবার কথা বলতে গিয়ে তার মুখের চঞ্চলতা একটু কমে গেল।

আইরা সেটা লক্ষ করল।

— আপনি কি বাবার সঙ্গে বেশি সময় কাটান?

রাদিফ একটা চেয়ার টেনে বসতে বসতে বলল,

— চেষ্টা করি। আমাদের দুজনেরই কাজ থাকে। তবে রাতে সবাই একসঙ্গে বসলে ভালো লাগে।

আইরা আর কিছু বলল না। একটা বই হাতে নিয়ে পাতা উল্টাতে লাগল।

হঠাৎ তার ফোন বেজে উঠল।

স্ক্রিনে ভেসে উঠল— মা।

আইরার হাত থেমে গেল।

কয়েক মুহূর্ত ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল সে। তারপর কলটা কেটে দিল।

রাদিফ প্রথমে কিছু জিজ্ঞেস করতে চেয়েও থেমে গেল। আইরার মুখের পরিবর্তন তার চোখ এড়ায়নি।

কিছুক্ষণ নীরবতার পর সে স্বাভাবিক গলায় বলল,

— ভাবী, ওই বইটা পড়বেন? চাইলে নিয়ে যেতে পারেন।

আইরা বইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,

— হ্যাঁ, দেখি।

রাদিফ বুঝতে পারল, সে এখন ওই বিষয়ে কথা বলতে চাইছে না। তাই আর কোনো প্রশ্ন করল না।

কিছুক্ষণ পর আইরা নিজেই বলল,

— বাড়ি থেকে ফোন এসেছিল।

রাদিফ তার দিকে তাকাল।

— ধরেননি?

— না।

— কথা বলতে ইচ্ছে করছে না?

আইরা বইটা বন্ধ করে টেবিলে রাখল।

— ইচ্ছে করলেই কি সবকিছু করা যায়, রাদিফ? কিছু কিছু মানুষের সঙ্গে কথা বলার আগে মনে হয়, কী বলব সেটাই খুঁজে পাওয়া যায় না।

রাদিফ এবার আর হাসল না।

— বুঝলাম।

আইরা হালকা হাসার চেষ্টা করল।

— আপনি আবার এত গম্ভীর হয়ে গেলেন কেন? আমি তো আপনাকে কোনো দুঃখের গল্প শোনাতে বসিনি।

রাদিফও হেসে ফেলল।

— আমি গম্ভীর হতে পারি না নাকি?

— পারেন। তবে আপনাকে গম্ভীর দেখলে আমার সন্দেহ হয়।

— কীসের সন্দেহ?

— নিশ্চয়ই কোনো দুষ্টুমি করার পরিকল্পনা করছেন।

রাদিফ বুকের ওপর হাত রেখে বলল,

— ভাবী, আমার চরিত্রের ওপর এমন অপবাদ!

আইরা হেসে উঠল।

তাদের কথার মধ্যে আবার স্বাভাবিকতা ফিরে এল।

অন্যদিকে রুশো নিজের ঘরে বসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফোনকল শেষ করছিল।

— আমি আগেই বলেছি, বিষয়টা আমার অনুমতি ছাড়া এগোবে না।

ওপাশ থেকে কিছু বলা হলো।

রুশোর কপাল কুঁচকে গেল।

— আমাকে একই কথা দ্বিতীয়বার বলতে বাধ্য করবেন না। যা বলেছি, সেটাই করবেন।

কল কেটে দিয়ে সে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল।

তারপর টেবিলের ওপর রাখা ফাইলটা খুলল। কয়েকটি কাগজ মনোযোগ দিয়ে দেখার পর ফোন তুলে রাদিফকে কল করল।

রাদিফ লাইব্রেরিতে বসে ছিল। ফোনের স্ক্রিনে ভাইয়ের নাম দেখে সে কল রিসিভ করল।

— জি, ভাইয়া।

— ফাইলটা কতদূর?

— প্রায় শেষ। আর কিছুক্ষণ লাগবে।

— দশটার মধ্যে চাই।

— ঠিক আছে। আমি নিয়ে আসছি।

— আর শোনো, আজ বিকেলের মিটিংয়ে তুমি আমার সঙ্গে থাকবে।

— আচ্ছা।

কথা শেষ হতেই রাদিফ ফোন রেখে দিল।

আইরা কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল,

— আপনার ভাই কি আপনাকে সবসময় এভাবে আদেশ করেন?

— করেন। কারণ উনি আমার বড় ভাই।

— তাই বলে একটু স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারেন না?

রাদিফ হেসে বলল,

— আমার ভাইয়ের কাছে স্বাভাবিকভাবে কথা বলার সংজ্ঞা একটু আলাদা।

আইরা মাথা নাড়ল।

— আপনাকে দেখে মনে হয় না আপনি কারও আদেশ মেনে চলেন।

— মেনে চলি তো! তবে নিজের মতো করে।

— এই জন্যই আপনার সঙ্গে আমার এত মিল।

— ভাবী, আমাদের মিলের কথা শুনলে ভাইয়া কিন্তু খুশি হবেন না।

আইরা মুচকি হেসে বলল,

— আপনার ভাইকে খুশি করার দায়িত্ব তো আমার নয়।

রাদিফ এবার একটু জোরে হেসে উঠল।

দুপুরের দিকে রুশো অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সাদা শার্টের হাতা গুটিয়ে ঘড়ি পরছিল সে। ঠিক তখনই আইরা ঘরে ঢুকল।

রুশো আয়নার দিকে তাকিয়েই বলল,

— কিছু বলবে?

আইরা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বলল,

— হ্যাঁ। আপনার লাইব্রেরি থেকে একটা বই নিয়েছি।

— আমাকে বলার কী আছে?

— আপনার বাড়ির জিনিস নিয়েছি। তাই জানালাম।

রুশো এবার আয়নার দিকে না তাকিয়ে সরাসরি তার দিকে ফিরল।

— তুমি চাইলে এই বাড়ির যেকোনো বই পড়তে পারো। তার জন্য আমাকে অনুমতি নিতে হবে না।

আইরা একটু থমকে গেল। এমন স্বাভাবিকভাবে কথাটা বলবে, সে ভাবেনি।

তবু মুখে সেটা প্রকাশ করল না।

— বাহ! আজকে তো বেশ ভালো কথা বলছেন।

রুশো ভ্রু কুঁচকে বলল,

— আমি কি সবসময় খারাপ কথা বলি?

— সেটা আপনি নিজেই ভালো জানেন।

— আইরা!

— কী হয়েছে? সত্যি কথাও বলা যাবে না?

রুশো দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই মেয়ের সঙ্গে কথা বলতে গেলেই কথার শেষ খুঁজে পাওয়া যায় না।

সে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,

— আমি অফিসে যাচ্ছি। দুপুরে খেয়ে নিও।

আইরা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,

— আমি কি ছোট বাচ্চা যে খাওয়ার কথা মনে করিয়ে দিতে হবে?

— তোমাকে দেখে মাঝে মাঝে সেটাই মনে হয়।

— তাহলে আপনার চোখ পরীক্ষা করানো দরকার।

রুশো এবার কিছু না বলে নিজের ফোনটা তুলে নিল।

দরজার কাছে গিয়ে আবার থামল।

— আর শোনো, বিকেলে কোথাও গেলে ড্রাইভারকে সঙ্গে নেবে।

আইরা সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন করল,

— কেন?

— কারণ আমি বলছি।

— আপনার কথায় তো আর পৃথিবী থেমে থাকবে না।

রুশো ঘুরে তাকাল। চোখে বিরক্তি স্পষ্ট।

— সব কথার উত্তর দিতে হবে?

আইরাও পিছিয়ে যাওয়ার মেয়ে নয়।

— আপনি সব কথায় আদেশ করবেন, আর আমি চুপচাপ শুনব, এমনটা ভাববেন না।

কয়েক মুহূর্ত দুজনের চোখাচোখি হলো।

শেষ পর্যন্ত রুশো আর কথা না বাড়িয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

আইরা মনে মনে বলল,

লোকটার রাগ একদিন না একদিন কমাতে হবে। নইলে এই বাড়িতে থাকা কঠিন হয়ে যাবে!

বিকেল সাড়ে পাঁচটা।

রুশো অফিস থেকে ফিরেই নিজের ঘরে না গিয়ে সরাসরি বাবার স্টাডি রুমে গেল। আজ কয়েকটি জরুরি বিষয় নিয়ে বাবার সঙ্গে তার আলোচনা করার কথা।

ঘরের ভেতরে তার বাবা বসে ছিলেন। রুশোকে দেখে বললেন,

— এসেছিস? বস।

রুশো সামনের চেয়ারে বসল।

— আপনি যে কাগজগুলো চেয়েছিলেন, সেগুলো এনেছি।

সে ফাইলটা বাবার দিকে এগিয়ে দিল।

তার বাবা কাগজগুলো দেখতে দেখতে বললেন,

— সবকিছু ঠিকঠাক আছে তো?

— আপাতত আছে। তবে একটা বিষয় নিয়ে আমার সন্দেহ হচ্ছে।

— কী বিষয়?

রুশো ফাইলের একটি পাতা দেখিয়ে বলল,

— এই লেনদেনটা স্বাভাবিক নয়। কয়েকটা হিসাব মিলছে না।

তার বাবা মনোযোগ দিয়ে কাগজটা দেখলেন।

— তাহলে ভালো করে খোঁজ নে। কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিশ্চিত হবি।

— আমি খোঁজ নিচ্ছি।

কথা শেষ হওয়ার আগেই দরজায় রাদিফের উপস্থিতি টের পাওয়া গেল।

— আসতে পারি?

রুশো তাকাল।

— এসো।

রাদিফ ঘরে ঢুকে বাবাকে সালাম দিল। তারপর ভাইয়ের পাশে বসে বলল,

— ফাইলটা তৈরি। তবে একটা কথা আছে।

রুশো তার দিকে তাকাল।

— কী?

রাদিফ এবার পুরোপুরি গম্ভীর।

— যাদের সঙ্গে গত সপ্তাহে কথা হয়েছিল, তাদের একজন আজ আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। তার কথাবার্তা আমার স্বাভাবিক লাগেনি।

রুশোর চোখের দৃষ্টি বদলে গেল।

— কী বলেছে?

— সরাসরি কিছু বলেনি। তবে আমাদের পরিকল্পনা সম্পর্কে এমন কিছু কথা বলেছে, যা তার জানার কথা নয়।

রুশো কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর শান্ত কিন্তু কঠিন গলায় বলল,

— বিষয়টা যাচাই না করে কাউকে কিছু বলবে না। আর আপাতত কোনো পদক্ষেপ নেবে না।

রাদিফ মাথা নাড়ল।

— ঠিক আছে।

বাবা দুজনের দিকে তাকিয়ে বললেন,

— সাবধানে কাজ করিস। নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ ঠিক রাখবি।

রুশো উঠে দাঁড়াল।

— আমি দেখছি।

ঘর থেকে বের হওয়ার সময় রাদিফও তার সঙ্গে বেরিয়ে এল। করিডোরে এসে নিচু গলায় বলল,

— ভাইয়া, আমার মনে হচ্ছে ব্যাপারটা একটু গভীর।

রুশো হাঁটতে হাঁটতেই বলল,

— মনে হওয়া আর প্রমাণ পাওয়া এক নয়। আগে প্রমাণ জোগাড় করো।

রাদিফ আর কোনো কথা বলল না।

এই মুহূর্তে তার মুখে সেই পরিচিত হাসি নেই। যে ছেলেটাকে কিছুক্ষণ আগেও আইরার সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা করতে দেখা যাচ্ছিল, সে এখন সম্পূর্ণ অন্য একজন।

রাতের খাবারের সময় সবাই একসঙ্গে টেবিলে বসেছে।

রাদিফ আজ বেশ চুপচাপ। খাবার খাচ্ছে, মাঝেমধ্যে মায়ের কথার উত্তর দিচ্ছে। আইরা কয়েকবার তার দিকে তাকাল।

অবশেষে সে বলেই ফেলল,

— কী ব্যাপার, আজ এত চুপচাপ কেন?

রাদিফ মাথা তুলে বলল,

— কিছু না ভাবী। একটু কাজের চাপ।

আইরা অবাক হওয়ার ভান করে বলল,

— আপনার মুখে কাজের চাপের কথা শুনতে নতুন লাগছে।

রাদিফ মুচকি হাসল।

— সবসময় কি আর আপনাকে বিরক্ত করব?

— সেটা তো আপনি নিজেই ভালো জানেন।

রুশো পাশ থেকে বলল,

— রাদিফ, খাওয়ার সময় খাও। কথা পরে বলবে।

রাদিফ চুপ করে গেল।

আইরা মনে মনে হাসল। একটু আগের চঞ্চল রাদিফকে যেন খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছে না।

খাওয়া শেষে সবাই উঠে গেলে আইরা রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছিল। রাদিফ তখন পেছন থেকে ডাকল,

— ভাবী!

আইরা ঘুরে তাকাল।

— কী?

— কালকে কিন্তু আপনাকে একটা জায়গায় নিয়ে যাব।

— কোথায়?

— সেটা এখন বলব না।

— তাহলে যাব না।

— আরে! এত তাড়াতাড়ি না বললে হয়?

আইরা হাসল।

— আগে জায়গার নাম বলুন। তারপর ভাবব।

রাদিফ নাটকীয় ভঙ্গিতে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

— আমার জীবনে এত অবিশ্বাসী ভাবী আর কেউ পায়নি।

আইরা হেসে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।

রাদিফও নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াল।

কিন্তু সিঁড়ির কাছে এসে সে একবার থেমে গেল। পকেট থেকে ফোন বের করে স্ক্রিনের দিকে তাকাল। কিছুক্ষণ আগে আসা অচেনা নম্বরের মেসেজটি এখনো সেখানে পড়ে আছে।

মেসেজে লেখা—

“আপনাদের বাড়ির সবাইকে নিয়ে এত নিশ্চিন্ত থাকবেন না।”

রাদিফের মুখের হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।

সে একবার ওপরের তলার দিকে তাকাল। তারপর ফোনটা পকেটে রেখে নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল।

এখনই কাউকে কিছু জানানো ঠিক হবে না। আগে বিষয়টা নিশ্চিত হতে হবে।

অন্যদিকে নিজের ঘরে আইরা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। বাইরে রাতের বাতাসে পর্দা নড়ছে। তার ফোনে আবার একটি কল এল।

এবারও বাড়ি থেকে।

আইরা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। কলটা ধরবে কি ধরবে না, সেই সিদ্ধান্ত নিতে নিতেই ফোনের শব্দ থেমে গেল।

সে ফোনটা বিছানায় রেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

এই বাড়িতে তার নতুন জীবন শুরু হয়েছে ঠিকই, কিন্তু পুরোনো জীবনের কিছু অভিমান এখনো পেছন ছাড়েনি।

আর পাশের ঘরে রুশো তখনও কাজের ফাইল নিয়ে বসে আছে। তার ধারণাও নেই, এই বাড়ির শান্ত পরিবেশের আড়ালে ধীরে ধীরে কিছু অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হতে শুরু করেছে।

চলবে…

প্রিয় পাঠক-পাঠিকারা,

আজকের পর্বটি কেমন লাগল, অবশ্যই জানাবেন। রুশো, আইরা ও রাদিফের এই নতুন পথচলায় আপনাদের ভালো লাগা, অভিমান কিংবা মতামত সুন্দর মন্তব্যের মাধ্যমে প্রকাশ করবেন। আপনাদের প্রতিটি মন্তব্য লেখার অনুপ্রেরণা বাড়িয়ে দেয়। তাই গল্পটি ভালো লাগলে একটি লাইক এবং সুন্দর একটি কমেন্ট করতে ভুলবেন না। ❤️

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 11 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন