ফন্ট সাইজ:
থিম:
আম পাতা জোড়া জোড়া

পর্ব 5

লেখক: মেহরিমা আফরিন

#আম_পাতা_জোড়া_জোড়া-০৫
লেখনীতে #মেহরিমা_আফরিন

সংশপ্তক নিয়ে ইয়াজিদের পরিকল্পনার চেয়েও তাশরিফের পরিকল্পনা ছিলো দুইগুন বেশি। স্কুল জীবন থেকে ইয়াজিদের সাথে তার সখ্যতা। এরপর থেকে সবকিছুতে একসাথে। একই এলাকায় বাড়ি হওয়াতে বন্ধুত্ব কেবল দিন দিন বেড়েই গেল।

গ্র্যাজুয়েশনে এসে তারা দু'জন সিদ্ধান্ত নিলো তারা কোনোদিন বিয়ে শাদি করবে না। মেয়ে মানুষের প্রতি তাদের আগ্রহ শূন্যের কোটায়। দিনভর টইটই করে ঘুরবে, টং দোকানে দাঁড়িয়ে চা সিগারেট ফুঁকবে আর রাতে বাইক নিয়ে শহরের অলি গলি চষে বেড়াবে।

কিন্তু এই সিদ্ধান্ত বেশিদিন বলবৎ থাকলো না। তাশরিফ ত্রিশের ঘরে পৌঁছাতেই বিয়ের জঞ্জালে জড়িয়ে পড়লো। তার মা একবার তাকে জোর করে নিয়ে গেল মেয়ে দেখাতে। বলল," মেয়ে দেখলেই কি আর বিয়ে হয়ে যায়? দেখতে সমস্যা কি?"
তাশরিফও এই কথায় বিশ্বাসী হয়ে মেয়ে দেখতে গেল। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে মেয়ে তার পছন্দ হয়ে গেল, একেবারে এক দেখাতেই। তারপর এক মাসের মধ্যে বিয়ে। ইয়াজিদ ঠিক মতো হতভম্বও হতে পারলো না।

তাশরিফ এখন সংসার নিয়ে সুখেই আছে। দুই বছর আগে একটা মেয়েও হয়েছে। ইয়াজিদ কে প্রায় সময়ই বিয়ের সুফল নিয়ে জ্ঞান ঝাড়ে। ইয়াজিদ ওসব কানে তুলে না। যতসব বাজে আলাপ। তুই নিয়ম ভেঙে, কথার বরখেলাপ করে বিয়ে করেছিস ভালো কথা। আরেকজনকে এমন উসকাস কেন? ইয়াজিদ করবে না বিয়ে। একেবারে ফুল এন্ড ফাইনাল।

সংশপ্তক নিয়ে তাশরিফের অনেক আগ্রহ। কোথায় কোন ক্যাসেট থাকবে, কোন তাকে কোন বই থাকবে, কিভাবে ঘর সাজানো হবে, সবকিছু সে ই ঠিক করেছে। ইয়াজিদ শুধু লিফটলেট বানিয়ে মানুষের কাছে সাপ্লাই দিয়েছে।

সংশপ্তকে গান হয়, কবিতা হয়, নাচ হয়, আবার নাত আর গজলও হয়। পহেলা বৈশাখে বাঙালিয়ানার চর্চা হয়, আর নবান্নের সময়ে ধান কাটা উপলক্ষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও হয়। ইয়াজিদ এই কমিটির সভাপতি। জীবনে একটা পদের খুব দরকার ছিলো তার। চারপাশে কেউ তাকে আগ বাড়িয়ে পদ দেওয়ার জন্য বসে ছিলো না। ইয়াজিদ তাই নিজেই মন মতো একটা পদ বানিয়ে নিয়েছে। সে সংশপ্তকের কালচারাল কমিটির সভাপতি।

সংশপ্তকে মায়েরা তাদের ছোট খাটো কচিকাচা দের নিয়ে আসতো। তাদের গানের ক্লাসে, নাচের ক্লাসে, আবৃত্তির ক্লাসে, কিংবা সুন্দর হাতের লিখার ক্লাসে ভর্তি করাতো। টিচার রা এসে বাচ্চাদের পড়াতো বিকেল বেলা। ইয়াজিদ সামনের রুমে বসে ক্যাসেটের ভলিউম কমিয়ে গান শুনতো।
খাঁটি বাঙালি গান। নজরুল গীতি। তার শুনতে ভালো লাগতো।

সংশপ্তকও আমাদের গল্পের খুব গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে ঢিলেভাবে নিবেন না। সংশপ্তক থেকেই রাশেদার সেই ছোট্ট ছেলে ইয়াজিদ জীবনের এক নতুন মোড় খুঁজে পাবে। আমাদের গল্পে সংশপ্তকের গুরুত্বও অপরিসীম।

_____

নাসির সাহেব ক্লান্ত স্বরে বললেন,"ও আমার নাতনি।আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি ওর হাতে এমন গুটি গুটি র‍্যাশের মতো হয়ে আছে। একটু পর পর কাঁদছে। কিন্তু গুছিয়ে কিছু বলতে পারছে না। কি করে এসব হলো বলুন তো?"

ভদ্রলোক বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে জানতে চাইলেন। তার চোখ মুখ মলিন হয়ে আছে বাচ্চাটার অসুস্থতার কথা ভেবে।পারমিতা সকাল থেকে বেশ কয়েকজন পেশেন্ট দেখে শেষ করেছে। এই পেশেন্টের সিরিয়াল নম্বর আঠারো। পেশেন্ট হলো এইটুকু একটা পুতুলের মতো বাচ্চা। তাকে নিয়ে এসেছে বৃদ্ধ এক ভদ্রলোক। হয়তো দাদা নানা কিছু একটা হবে। তবে কোলের বাচ্চাটাকে খুব চেনা চেনা লাগছে। পারমিতা তার হাতটা ধরে মনোযোগ সহকারে লাল লাল বৃত্তাকার গুটিগুলোর দিকে তাকালো। ফর্সা হাতে কেমন যে ছাপ ছাপ নকশা হয়ে আছে। সে একটু চেপে ধরতেই বাচ্চাটা ঠোঁট গোল করে তার দাদাভাইয়ের বুকে মুখ লুকিয়ে ব্যথাতুর স্বরে বলল,"উউউ! ব্যাতা।"

"আহা সোনা! একটু ব্যাথা হবে। দেখতে দাও আমাকে ভালো মতো।"

বাচ্চাটা অসহায় চোখে ঠোঁট উল্টে তার সাথে আসা বৃদ্ধ লোকটার দিকে তাকালো। লোকটা তার নরম মাথা বুকে চেপে আদর দিয়ে বললেন,"কিছু হবে না দাদাভাই। একটু ব্যথা হবে। তুমি সুস্থ হয়ে যাবে।"

"সুদু ব্যাতা আন ব্যাতা। সকানে ব্যাতা, লাতে ব্যাতা, সুবসমই ব্যাতা।"

"কিচ্ছু হবে না। সব ব্যাথা আল্লাহ দূর করে দিবে।"

"ককন দূল কববে?"

"এই তো। করে দিবে।"

"আন্নাহকে ফুন দাও।"

ভদ্রলোক হালকা শব্দে হেসে উঠলেন।

পারমিতা বলল,"ওর নাম কি?"

"নিকিতা মজুমদার।"

"ও কি আগেও আমার কাছে এসেছিল?"

"হ্যাঁ হ্যাঁ। আমার ছোট ছেলের বউ ওকে নিয়ে এসেছিল আপনার কাছে।"

পারমিতা মাথা নাড়লো। এই বাচ্চাটাকে তার চেনা চেনা লাগছে। তবে প্রতিদিন এতো এতো বাচ্চা আসে যে আলাদা করে আর কারো কথা মনে থাকে না। পারমিতা নরম চোখে তাকালো বাচ্চাটার দিকে।
নিকিতার দুই গাল টোল পড়ে দেবে আছে। বাচ্চাটা তাকে দেখে হেসে হেসে বলল,"তুমাল নাম তি?"

"আমার নাম? আমার নাম পারমিতা।"

"পানো নিতা?"

"নাহ। পারমিতা। দেখি তো বলতে পারো কিনা?"

"পানো নিতা।" আবার মিন মিন করে বিড়ালের মতো জবাব দিলো নিকিতা।

পারমিতা বলল,"আমার মনে হচ্ছে এটা এলার্জিক রিয়েকশান। কয়েকটা টেস্ট আছে। আগে টেস্টগুলো করাতে হবে। সেকেন্ড ফ্লোরে ইয়ামিন ভাই আছেন। উনাকে গিয়ে আমার কথা বলবেন ঠিক আছে?"

পারমিতা প্রেসক্রিপশনের কাগজটা নাসির সাহেবের দিকে বাড়িয়ে দিলো। নাসির সৌজন্য সূচক হেসে কাগজটা হাতে নিলেন। ভদ্রলোকের চেহারায় খুব অমায়িক একটা ভাব আছে।

তিনি উঠে যেতেই পারমিতা গলা তুলে বলল," নিয়াজ ভাই, নেক্সট পেশেন্ট কে ভেতরে পাঠান।"

নাসির সাহেব সুস্থভাবেই দরজা পর্যন্ত গেলেন। হঠাৎ তার কি হলো, তিনি দরজার কাছে যেতেই তার ভীষণ মাথা ঘুরাতে শুরু করলো। একেবারে মুহূর্তেই সব অন্ধকার হয়ে এলো। তিনি এলোমেলো কদমে একটুখানি পিছিয়ে গেলেন।

পারমিতা হাতের কলমটা রেখে উঠে দাঁড়ালো সাথে সাথে। সামনে এগোতে এগোতেই বেশ ব্যস্ত হয়ে বলল,"
"নিয়াজ ভাই! দ্রুত ভেতরে আসেন। ইমার্জেন্সি!'

নিয়াজ নামের শ্যামলা মতো দেখতে লোকটা ভেতরে ঢুকলো। নাসির সাহেব তখন দেয়াল ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। তার দুর্বল মস্তক নিচের দিকে নোয়ানো। পারমিতা এসে তার হাতটা ধরলো।
"আঙ্কেল! আপনি ঠিক আছেন?"

নাসির সাহেব মাথা নাড়লেন। নিয়াজ এক ঝলক তাকে দেখে বলল" ম্যাম! স্যুগার লেভেল কমে গেছে মনে হয়। কি করবো?"

পারমিতা কয়েক সেকেন্ড ভাবলো। নাসির সাহেব হাত তুলে বললেন," আমি পারবো যেতে। সমস্যা নাই। পার্কিংয়ে গাড়ি রাখা আছে।"

পারমিতা ঠান্ডা গলায় বলল,"পারবেন না। মাঝরাস্তায় আবার গড়িয়ে পড়বেন। সাথে আবার এইটুকু একটা বাচ্চা আছে। আপনি দাঁড়ান। আমি কাশেম ভাইকে একটা ফোন দেই। আপনি একটু রেস্ট করুন। আপনার বাড়ির কারো নম্বর দিন। নিয়াজ ফোন করে তাদের ডেকে আনবে। আপনি প্লিজ কথা শুনুন।"

নাসির সাহেবের মাথা তখনও ঘুরছিলো। তিনি দুর্বল গলায় বলল," আচ্ছা দিন। ফোন দিন একটা।"

_____

সেদিন একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটলো পারমিতার জীবনে। নাসির সাহেব কে প্রাথমিকভাবে একটা কেবিনে রেখে পারমিতা আবার এলো রোগী দেখতে। তবে এইবার আর সে একা এলো না। তার কোলে একটা তুলতুলে নরম পুতুলের মতো বাচ্চাকেও দেখা গেল।

ওর নাম নিকিতা। তার দাদুভাইকে একটা ইঞ্জেকশন দেওয়ার পরেই সে ভয়ে ভ্যাঁ করে কেঁদে দিলো। কেবিনের একটা নার্স তাকে গিয়ে কোলে নেওয়া চেষ্টা করতেই সে আরো শক্তভাবে তার দাদুভাইয়ের পাঞ্জাবি খাঁমচে ধরল। কান্নার ফাঁকেই শক্ত গলায় বলল,"ধববে না। মালবো কিনতু।"

নার্স মহিলাটা একটু জোরে টানতেই নিকিতা গলা ছেড়ে বিকট এক চিৎকার তুলে আরেকদফা কান্নায় ভেঙে পড়লো।
"আমি বিচাল দিবু। আন্নাকে আমি ছব বুলবো। ব্যাতা। সুদু ব্যতা।"

পারমিতা মহিলাটাকে থামিয়ে দিলো। এগিয়ে এসে একটা হাত নিকিতার ঝরঝরে খয়েরি চুলের উপর রেখে নরম গলায় শুধালো," আরে নিকিতা! কান্না কাটি কেন করছো বাবু? দেখো তোমার দাদু কতো অসুস্থ! এখন একটু নার্স আন্টির কাছে থাকো? তোমার দিদা চলে এলে তার কাছে চলে যেও কেমন?"

নিকিতা মাথা নাড়লো। নাক ফুলিয়ে অভিমানী চোখে পারমিতার দিকে তাকালো। ছোট্ট হাত দু'টো তুলে বলল," যাবো না ওর কুনে। তুমি কুনে নাউ।"

পারমিতা কয়েক মুহূর্তের জন্য একেবারে জমে গেল। নিকিতা হাত তুলে টলটলে চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। সে থমকানো গলায় বলল,"আমি? আমি কোলে নিবো?"

"হু। তুমাল বেবি লাই?"

পারমিতা হাসলো। একটানে নিকিতাকে কোলে নিয়ে বলল," আছে তো। এই যে। তুমিই আমার বেবি। তুমি আমার রসগোল্লা বেবি।"

"নসোগুন্না বেবি?"

"হু।"

নিয়াজ বলল,"ম্যাম! আপনি ওকে সাথে নিবেন?"

পারমিতা সামনে তাকিয়েই সোজা হাঁটতে হাঁটতে বলল,"হ্যাঁ।"

নিয়াজ আর কিছু বললো না। ম্যামের কিছু অদ্ভুত স্বভাব আছে। তার যখন যেটা ভালো লাগে, সে সেটাই করে। একবার বৃষ্টির দিনে সে একটা ছোট বিড়ালের বাচ্চা নিয়ে এলো ক্লিনিকে। নিয়াজকে ডেকে বলল," নিয়াজ ভাই! ওর শরীরটা একটু মুছিয়ে দিন তো। আমি আজ বাড়ি যাওয়ার সময় ওকে সাথে নিয়ে যাবো। তিন চারদিন পর আবার ছেড়ে দেবো জায়গা মতো।"

নিয়াজ বাচ্চাটাকে মুছিয়ে দিলো। ম্যাম এমনই ছিলো। ছোট ছোট বাচ্চাদের দুঃখ ম্যামকে খুব আঘাত করতো। কে জানে, হয়তো এমবিবিএস শেষ করার পর পেডিয়াট্রিশিয়ান হওয়ার সিদ্ধান্ত ম্যাম এই কারণেই নিয়েছিলেন।

পারমিতা সেদিন বাচ্চাটাকে কোলে নিয়েই একের পর এক পেশেন্ট দেখলো। কৃতিত্ব অবশ্য তার না। সবকিছু সম্ভব হয়েছে, তার কোলে থাকা খুব লক্ষ্মীমন্ত বাচ্চাটার কারণে। সে চেম্বারে ঢুকার পরে আর কোনো টু শব্দও করে নি। পারমিতা ঠোঁটের উপর এক আঙুল চেপে তাকে বলল,"এ্যাই রসগোল্লা! পুচু পুচু পুচু। এখন আমরা পেশেন্ট দেখবো। সুতরাং নো ডিস্টার্ব। তুমি আমাকে জ্বালাবে না ওকে?"

বাচ্চাটা বোধহয় বুঝলো তার কথা। সে নিজেও পারমিতাকে অনুসরণ করে একটা আঙুল চেপে ধরলো মুখের উপর। আঙুলের নিচ দিয়ে অস্পষ্ট করে বলল,"বপ হয়ে তাকবু?"

"হ্যাঁ।"

"তুনিও বপ।"

"আমি বপ হতে পারবো না।"

"তেনো?"

"তেনো না। কেন। আমি বপ হতে পারবো না কারণ আমার পেশেন্ট আছে।"

"পেনেন্ত কি?"

"রোগী।"

"পেনেন্ত তেনো লুগি?"

"উফফ! তুমি তো অনেক প্রশ্ন করো। বপ! আমার পেশেন্ট চলে এসেছে।"

এরপর একে একে প্রায় আটটা পেশেন্ট হ্যান্ডেল করলো পারমিতা। রোগ দেখলো, ঔষধ দিলো, বাচ্চাদের গার্ডিয়ানের সাথে কথা বললো।

তার মধ্যে থেকে একজন ভদ্রমহিলা তার কোলে থাকা বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে বললেন,"এটা আপনার বেবি?"

পারমিতাও তার দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকালো। বলল,"জি। ও আমার বেবি।"

"মাশাআল্লাহ। খুব কিউট। একেবারে মায়ের মতো।"

মহিলাটা বেরিয়ে যেতেই নিকিতা চোখ পিটপিট করে বলল,"আমি তুমাল বেবিই?"

"হ্যাঁ, অবশ্যই।"

"তুমিও এততা বেবি।"

"না আমি বেবি না। আমি হলাম পারমিতা।"

"পানোনিতা।"

"থাক। আর বলতে হবে না।"

এর কিছুক্ষণ পরেই এক ভদ্রমহিলা হন্তদন্ত হয়ে এলেন তার চেম্বারে। মাঝবয়সী এক মহিলা। বেশ কিছু চুলে পাঁক ধরা। চেহারায় বলিরেখা পড়ে গেছে অনেক আগেই। তিনি এসেই বড় বড় চোখ করে বললেন," আমার নিকি! আমার নাতনি!"

পারমিতা উঠে দাঁড়ালো। একগাল হেসে বলল,"আপনি ওর দিদা?"

ভদ্রমহিলা বিধ্বস্ত মুখে সামনে এলেন। পারমিতা বলল,"আপনার হাসবেন্ড কে দেখে এসেছেন?"

"জি। উনি এখন সুস্থ। আমার ছেলেও এসেছে সাথে।"

"আচ্ছা।"

"আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।" ভদ্রমহিলা বড় একটা শ্বাস টেনে পারমিতার দিকে তাকালেন। একটু হেসে বললেন,"আপনি একদম ঠিক কাজ করেছেন উনাকে কেবিনে ভর্তি করিয়ে। উনি একদম আমাদের কথা শোনে না। শরীর নিয়ে খুব হেলাফেলা করে।"

পারমিতা চুপচাপ তার কথা শুনলো। ভদ্রমহিলা তার কোলে থাকা বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে আরেকদফা লজ্জায় পড়লেন।
"ইশশ! আপনাকে খুব জ্বালিয়েছে তাই না? নিকি! এখুনি দিদুনের কোলে আসো।"

নিকিতা দুই দিকে মাথা নেড়ে পারমিতার দিকে তাকিয়ে বলল,"দানায় নাই। এততুও দানাই নাই। বলো, আমি তি তোমাতে দানাই?"

পারমিতা হাসলো। দুই দিকে মাথা নেড়ে বলল,"না না। ও একদমই জ্বালায়নি আমাকে। ও একটা লক্ষ্মী মেয়ে।"

নিকিতা আঙুল খেতে খেতে বলল,"নসোগুন্না।"

"হ্যাঁ হ্যাঁ, রসগোল্লা একটা।"

ভদ্রমহিলা তাকে কোলে নিলেন। গাঢ় স্বরে বললেন," নিকি! আন্টিকে বাই বলো।"

"বাই।"

"বলো, একদিন বাসায় আসতে।"

"এত্ দিন বাছায় আছু।"

"আচ্ছা সোনা। আসবো। তোমার বাসা কোথায়?"

বাচ্চাটা হাত তুলে তার দিদুনের দিকে তাকালো। ঠোঁট উল্টে প্রশ্ন করলো,"বাছা তুতায়?"

ভদ্রমহিলা চটজলদি বললেন," আরে আদাবর কলোনির একদম কাছেই। ওখান থেকে দুই গলি সামনে এলেই একটা লম্বা রাস্তা। রাস্তার শুরুতে একটা কালচারাল সেন্টার। সংশপ্তক নামের। ওটার ভেতর দিয়ে সামনে এগোলেই একটা বড় বাড়ি দেখতে পাবেন, একটু পুরাতন দিনের। পূর্বাহ্ণ নাম। আপনি এলে আমি জহিরকে পাঠাবো আপনাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য।"

"না না। এতো ব্যস্ত হওয়ার প্রয়োজন নেই। গেলে আমি নিজেই খুঁজে নিতে পারবো।"

সেদিন আরো কয়েকটা পেশেন্ট দেখার পর পারমিতা গেল তার পছন্দের একটা ক্যাফেতে। সেখানে গিয়ে কফি খেলো, পেস্ট্রি খেলো, রাতে খাওয়ার জন্য কিছু পার্সেলও নিলো।

তারপর রাতে কড়া লিকারের এক কাপ চা খেয়ে সে তার খয়েরি রঙের ডায়েরিটা খুলে বসলো। ডায়েরিটার প্রথম পাতায় একটা শিরোনাম আছে। Its me Paro.
এখানে পারুর সব গল্পেরা আসর জমায়, স্মৃতি হয়ে জমে থাকে। আজ পারু লিখলো-

আজ আমি সারা সকাল নিকিতা নামের একটা ছোট বাচ্চাকে কোলে নিয়ে পেশেন্ট হ্যান্ডেল করেছি। নিকি ইজ আ গার্ল অফ থ্রি। মাত্র তিন বছর বয়স তার। সে আমার বুকের সাথে মিশেছিল। আমি তার নাম দিয়েছিলাম রসগোল্লা।

আচ্ছা, নিকিতা কি কয়েক মুহূর্তের জন্য আমাকে তার মা ভেবেছিল?
ও কি ভেবেছিল জানি না, কিন্তু আমি ওকে আমার বাচ্চা ভেবে বুকে ধরেছিলাম। আচ্ছা, আমার বাচ্চাটা এখন কেমন আছে? ও কি ওর মায়ের উপর খুব রেগে আছে? ও যদি বেঁচে থাকতো, তাহলে কি ওর বয়সও নিকির মতোই হতো? না না। আরেকটু বেশি হতো।
নিকিতা! আমার দেখা সবচেয়ে মিষ্টি রসগোল্লা! কয়েক মুহূর্তের জন্য আমাকে মাতৃত্বের স্বাদ দেওয়ার জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ তোমাকে। তুমি জানো না, ঠিক তোমারই মতো মিষ্টি কেউ হয়তো আজ আমার ঘরেও থাকতো। আমি খুব খারাপ মেয়ে, খুব খারাপ মা। আমার দুঃখগুলো যদি তুমি কোনোদিন জানতে, তাহলে হয়তো সত্যিই একবার মা বলে ডাকতে আমাকে।

আমি কাল আবার যাবো তোমার সাথে দেখা করতে। তোমার মুখটা আমি ভুলতে পারছি না। তোমাকে কোলে নিয়ে আমি আবার বুকের সাথে ধরে রাখবো তোমায়। তোমার আসল মা কে ডেকে বলবো,"আপনি এতো সৌভাগ্যবতী কেন? আপনার যা আছে, তা আল্লাহ আমাকে কেন দিলো না? আল্লাহ কেন এতো বড় শাস্তি দিলো আমাকে?"

চলবে-

[ আমি রিচের জন্য অস্থির নই। কিন্তু আপনারা রেসপন্স কমিয়ে দিলে মনে হয়, হয়তো আর আগের মতো ভালো হচ্ছে না। যারা পড়ছেন, রিয়েক্ট অন্তত করবেন।]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 5 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন