ফন্ট সাইজ:
থিম:
আম পাতা জোড়া জোড়া

পর্ব 7

লেখক: মেহরিমা আফরিন

#আম_পাতা_জোড়া_জোড়া -০৭
লেখনীতে #মেহরিমা_আফরিন

আয়তি বুকে হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। চৌকস,ধাঁরালো চোখে চোখ রেখেছে সীমান্তর শূন্য দৃষ্টি আর দুঃশ্চিন্তায় কপচাতে থাকা হাত দু'টোর দিকে। আজ চতুর্থদিন। প্রমাণ যোগাড় করার জন্য সীমান্তকে দেওয়া তিনদিন সময় ফুরিয়ে এসেছে। আজ সীমান্ত প্রমাণ দেখাবে তাকে। নয়তো যে কথা হয়েছে, সেটা পালন করবে নিঃশব্দে।

আয়তি বলল,"প্রমাণ দাও। প্রমাণ দাও আমি ভার্সিটিতে গিয়ে বয়স্ক লোক নিয়ে ঘুরি।"

সীমান্ত অলক্ষ্যে কপালের ঘাম মুছলো। ক্যালো করেছে।ডাইনি টা ঠিক তাকে ধরেছে। জানতো, এমনটাই হবে। ইয়াজিদ মামা ঘুমায় এখনো। আপাতত তাকে বাঁচানোর মতো কেউ আশে পাশে নেই।

সীমান্ত ভেতরের ভয় আর অস্থিরতা টুকু গোপন করে গেল। তেজি গলায় তুমুল আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল,"হ দেখাইতেছি। কথা কি হাওয়ায় বলি নাকি আমি? আমার কাছেও প্রমাণ আছে। দাঁড়া।"

"দাঁড়া না, বলো দাঁড়াও। আমি তোমার বন্ধু নই। চাকরও নই। তুই তোকারি করবে না।"

সীমান্ত কপাল কুঁচকালো। রাক্ষসী একটা। মন চায় ঠাসিয়ে চড় মারতে। কিন্তু সে নিরুপায়। এই মেয়েকে চড় মারলে আর রক্ষে নেই। জায়গায় চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে তাকে। সীমান্ত মাথা নেড়ে বলল,"আচ্ছা করমু না।"

সে আস্তে করে ফোন হাতে নিয়ে গ্যালারি থেকে একটা ছবি বের করে দেখালো আয়তিকে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে আয়তির পাশে একটা চুল দাড়ি পাঁকা ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছেন হাসি মুখে। ভদ্রলোকের বয়স কম করে হলেও পঞ্চাশ।

সীমান্ত তাচ্ছিল্য করে বলল,"এই দেখো। এই যে প্রমাণ। হইসে? শান্ত হইসে কলিজা?"

আয়তি ছোবল মেরে তার হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিলো। দুই দাঁতের পাটি একসাথে রগড়াতে রগড়াতে বলল,"বজ্জাত কোথাকার! তুই এআই দিয়ে আমার নকল ছবি বানিয়েছিস! তোর নামে আমি সাইবার বুলিংয়ের মামলা করবো।"

সীমান্ত চোখ পাকিয়ে বলল,"এখন তুই তোকারি টা কেডা শুরু করলো?"

"তোর বাপের নাম ভুলাবো আমি দাঁড়া। কতো বড় সাহস তোর! আমার ছবি ব্যবহার করে নকল ইমেজ বানাস। তাই না? দাঁড়া, তোকে যদি আমি গরাদের ভেতর না পাঠিয়েছি!"

"হ। তুমি কইলেই হইলো। এটা আসল ছবি। ধরা পইড়া নকল নকল করো। আবার আমারে ডর দেখাও।"

আয়তি রক্তচক্ষু মেলে তাকালো তার দিকে। চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,"অশিক্ষিত কোথাকার! মূর্খ। কোন ছাগলকে দিয়ে এটা বানিয়েছিস? লোগো টাও তো সরায়নি জেমিনির। ছিহ্। দাঁড়া। তোর আমি আজকে বারোটা বাজাবো।"

সীমান্ত এবার ঘাবড়ে গেল সত্যি সত্যি। আয়তির লক্ষণ ভালো না। যেমন করে থানা পুলিশের কথা বলছে বার বার, যদি সত্যিই ডেকে বসে? তার কোনো বিশ্বাস নেই। করেও ফেলতে পারে।

এই ছবি সে বানিয়েছিল সুবহান কে দিয়ে। সুবহান বলেছিল ধরা পড়ার কোনো চান্সই নাই। এখন মন চাইছে চটকে চটকে সুবহানের সব দাঁত ফেলে দিতে। কি একটা ঘোরতর বিপদে সে ফেলে গেল সীমান্তকে! ইশশ! ডাইনিটা এখনো শান্ত হচ্ছে না কেন?

সীমান্ত এগিয়ে এলো। ঘাড় চুলকে বলল,"স্যরি। ভুল হইসে আমার। মাফ করো আমারে।"

আয়তি সরোষ চোখে তার দিকে তাকালো।
"মাফ করবো মানে? তোমার আস্পর্ধা দেখে আমি অবাক হচ্ছি। তোমাকে অনেক ছাড় দিয়েছি অতীতে। আর না। এবার যা কথা হবে, থানায় বসে হবে।"

সীমান্ত দ্রুত দুই দিকে মাথা নাড়লো। দিশেহারা হয়ে বলল,"না না, এই কাম কইরো না। আমি থানা পুলিশ খুব ডরাই। ভুল হইসে। আর কোনোদিন তোমার নামে উল্টা পাল্টা কথা কমু না। চড় দাও দরকার হইলে।তাও থানা পুলিশ কইরো না। আজ বিকালে আমার খুব বড়সড় একটা ম্যাচ আসে। থানায় গেলে আমার দল ঘোর বিপদে পড়বো।"

আয়তির দুই চোখ আগের মতোই কঠিন। সীমান্ত গড়গড় করে সবটা বলে একটু দম ছাড়লো। তারপর কানে ধরে বলল,"নেও, কানেও ধরসি। এবার সব মিটমাট করো। এক ঘরে থাকি আমরা। কাইজ্জা কীর্তন ভাল্লাগে না।"

আয়তি সাথে সাথে সংশোধন করলো তার কথা।
"এক ঘরে থাকি না আমরা। এক বাড়িতে থাকি।"

"ঐ এক ই।"

"না। এক ই না।"

সীমান্ত হাঁফ ছাড়লো। বিড়বিড় করে বলল,"ডাইনির ঘরের ডাইনি।"

আয়তি আবার বুকে হাত বেঁধে শান্ত গলায় বলল,"আমি কিন্তু এখনো তোমাকে মাফ করি নি।"

"করো নাই?"

"না। তবে করতে পারি। যদি তুমি আমার কথা শোনো।"

"তুমি ছাদ থেক্কা লাফ দিতে বললে,ঐডাও করমু। কিন্তু পুলিশ ডাইকো না। বিকালে আমার খেলা আছে।"

"ছাদ থেকে লাফ দিতে হবে না। তুমি গিয়ে একটা বড় আর্টপেপার আনো। এনে গোটা গোটা অক্ষরে লিখো, আমি একটা হতচ্ছাড়া। শরীরে যদি চামড়া থাকে, আর ভেতরে যদি সামান্যতম লজ্জাও থাকে আমার, তাহলে জীবনে আর কোনোদিন আমি আয়তির সাথে মুখ লাগাতে যাবো না।
যাও এখনি লিখে আনো এটা।"

"লিকখা কি করমু?"

"লিখে একটা টুল টেনে কাগজটা বুকের উপর ধরে দরজার কাছে বসে থাকবে। সকালে নাস্তা করে যতোজন লোক বাড়ি থেকে বের হবে, সবাই তোমার হাতের লিখাটা পড়বে।"

সীমান্তর চোয়াল কাঁপতে শুরু করলো রাগে। মন চাইলো, পায়ের জুতাটা খুলে আয়তির মুখ বরাবর ছুড়ে মারতে। ফকিন্নির ঘরের ফকিন্নি! সীমান্ত দুই হাত মুঠ করে অনেক কষ্টে রাগটুকু গিলে নিলো। আয়তি বলল,"দেরি করবে না। এখনি কাগজ আনো যাও।"

গজরাতে গজরাতে সীমান্ত নিজের ঘরের ভেতর গেল। তার পুরো শরীর পোড়াচ্ছে ভীষণ। দুই দাঁতের পাটি এক করে সে নিজে নিজে বলল,"শালা হাতি যখন গাতায় পড়ে, চামচিকাও লাথি মারে। ফকিন্নি কোনখানের! তোরে যদি আমি শিক্ষা না দিসি, তাইলে আমার নামও সীমান্ত না। দাঁড়া, এমন ধরা ধরমু তোরে, কাইন্দাও কূল পাইতি না হারামজাদি।"

সীমান্ত কাগজ আর কলম নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। মিঠে রোদের সেই সকালটা সীমান্তর জীবনে এক দুঃস্বপ্ন হয়ে থেকে গেল। সে পারলে তার স্মৃতি থেকে ঐ সকালটা একেবারে মুছে ফেলতো। সেদিন সারা সকাল সে ঐ কাগজটা নিয়ে বাড়ির সদর দরজার সামনে টুল পেতে বসেছিল। তার সামনে দাঁড়িয়ে তাকে পাহারা দিচ্ছিলো আয়তি। সীমান্ত অপমানে মাটির সাথে মিশে যাচ্ছিল। রাগের চোটে তার ভেতরে এক নতুন সীমান্তর জন্ম হলো। যেই সীমান্ত শুধু চায়, আয়তির ধর থেকে বিচ্ছিন্ন গোল মাথা। আজ তার সময় খারাপ। কিন্তু একদিন তারও সময় ঘুরবে। তখন কিন্তু সে আয়তিকে এইটুকু শাস্তি দিয়ে পার পেতে দিবে না। এমন শাস্তি দিবে, যে আয়তির চোখের পানি নাকের পানি এক হয়ে যাবে কাঁদতে কাঁদতে। সীমান্ত হাবিব বড়ো খারাপ মানুষ!

_____

ইয়াজিদ আড়মোড়া ভেঙে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালো। এখন সময় সকাল নয়টা আটান্ন। এইমাত্র বাড়ি থেকে বেরিয়ে সে সংশপ্তকে এসে পৌঁছেছে। বের হওয়ার আগে জেবা জোর করে তার মুখে এক স্লাইস রোস্টেড ব্রেড পুরে দিয়েছে। ইয়াজিদ বিরক্ত মুখে সেটা চিবুতে চিবুতে বলল,"এতো আলগা পিরিত দেখাইয়ো না তো। বাইকের জন্য বলতেসি কবে থেক্কা। তোমার জামাই রে একটু তেল তুল ও তো মারতে পারো। মারো না তো। আমার এই ভাঙ্গা বাইক নিয়া ঘুরতে হয়।"

জেবা মন খারাপ করে বললেন,"তোর ভাইজান তো দৌড়ের উপর থাকে সারাদিন। সেদিন নিকিকে নিয়ে হাসপাতালে গিয়ে মাথা ঘুরিয়ে পড়লেন। আমি এই অবস্থায় কেমন করে চাইবো বল?"

"ধুর।" ইয়াজিদ ত্যক্ত স্বরে বলল,"তোমার জামাই দুই হাতে টাকা কামায়। অথচ খরচা করে না। কিপটা কোনখানের! আমি রাতে ঘরে আসমু না। তুমি তোমার জামাইরে রাজি করাইবা। তারপর আসমু ঘরে।"

জেবা আকাশ থেকে পড়লেন তার কথা শুনে
"হায় আল্লাহ! আমি কেমনে তোর ভাইরে রাজি করামু? উনি এমনেই ক্ষেপা তোর উপর। গত পরশু আম্মার ঘরে গিয়া এসব কি বলছস?"

"আমি এতো কিসু জানি না। তুমি রাজি করাইবা। এইডাই হইলো কথা।"

ইয়াজিদ পকেট থেকে বাইকের চাবি বের করে সেটা ঘোরাতে ঘোরাতে বেরিয়ে পড়লো বাড়ি থেকে। জেবা বললেন," রাতে সরিষা দিয়ে ইলিশ করবো। তাড়াতাড়ি বাড়ি আসবি।"

ইয়াজিদ হাসলো।
"স্বপ্ন দেখো। আমারে বাইক না দিলে আমি আর রাতে আসতাম না বাড়িতে। এসব ইলিশ ফিলিশ দিয়া তুমি আমার বাইকের চাহিদা দূর করবা? মণি! আমার কিন্তু বাইক লাগবেই। আর কিছু জানি না আমি।"

বাড়ি থেকে বেরিয়ে সে তার পুরাতন মডেলের বাইকে উঠলো। বাইকটাকে এখন দেখলেই তার অসহ্য লাগে। ছেলেপেলেরা কতো আধুনিক আর উন্নত মডেলের বাইক ইউজ করে এখন! আর তার বাইকটা কতো সাদামাটা, কতো ম্যাদাটে! জোরে টেনে নিলে ভুম ভুম শব্দও হয় না। নতুন মডেলের বাইকগুলোর সাইলেন্সর থেকে ভুড়ুম ভুড়ুম শব্দ হয়। বিকট শব্দ। মনে হয় রেসিংয়ের বাইক ছুটছে। ইয়াজিদের ঠিক এমনই একটা বাইক লাগবে।

সংশপ্তকে গিয়ে সে আগে বাইকটা একপাশে চাপিয়ে রাখলো। তারপর কাঠের দরজায় ঝুলানো লোহার বড় তালাটা খুলে ভেতরে এলো। ভেতরে সবকিছু সাজানো। রাতে তাশরিফ এসেছিল বোধহয়। সে আবার জিনিসপত্রের খুব যত্ন করে।

ইয়াজিদ কিছুক্ষণ সেখানে থেকে সামনের টং দোকানে গিয়ে এক কাপ চা খেল। এরপর একটা সিগারেট ধরালো। সিগারেটটা মাঝপথে থাকা অবস্থায় এক ভদ্রমিহলা তার সাথে একটা ছোট বাচ্চাকে নিয়ে সংশপ্তকের ভেতরে ঢুকলেন।

অর্ধ খাওয়া সিগারেট টা এক ঢিলে রাস্তায় ছুড়ে মারলো ইয়াজিদ। সাথে সাথে দোকান থেকে একটা চুইংগাম কিনে মুখে পুরলো। শার্টের তুলে রাখা কলার টেনে নামিয়ে অনুমানে একবার চুল ঠিক করলো। তারপর খুব ধীর পায়ে হেঁটে ভেতরে ঢুকলো। তার ঠোঁটের ভাঁজে এক টুকরো মেকি হাসি। এখন থেকে খাঁটি বাংলায় শুদ্ধ করে কথা বলতে হবে। শুদ্ধ ভাষা হলো সংস্কৃতি চর্চার প্রথম ধাপ। সংস্কৃতির সাথে যুক্ত মানুষজন খুব সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলে।

"আসসালামু আলাইকুম।"

ভদ্রমহিলা ঘুরে তাকালেন। তার পাশের চেয়ারে তার মেয়ে বসেছে। মেয়েটা বয়সে নিবেদিতার সমান।
ইয়াজিদ চেয়ার টেনে বসলো। মহিলা চপল গলায় বললেন," ওয়ালাইকুমুস সালাম। আপনি নিশ্চয়ই ইয়াজিদ ভাই।"

"জি। আমিই।"

"আমি তাশরিফের শালির ননাস। আমার নাম ফাতিহা।"

"ওহহহ আচ্ছা। কেমন আছেন আপনি?"

"জি। আলহামদুলিল্লাহ ভালো।"

ইয়াজিদ কোঁচকানো চোখে তার দিকে তাকালো। ভদ্রমহিলা গরমে হাঁসফাঁস করছেন। মাথার উপর ফ্যান ঘুরছে। তবুও ঘামছেন। তার সাথের বাচ্চাটা অতি বিচ্ছিরি মুখ করে ইয়াজিদের দিকে তাকিয়ে আছে, যেন এই মুহূর্তে ইয়াজিদ তাকে একটি চড় মেরেছে।

"আচ্ছা, আপনারা কি এখানে বাচ্চাদের গান নাচ শেখান?" ভদ্রমহিলা গদ গদ হয়ে জানতে চাইলো।

ইয়াজিদ হালকা স্বরে বলল,"জি।"

"আমার বাচ্চাটাকেও শেখাবেন?"

"অবশ্যই শেখাবো। কেন শেখাবো না?"

"আমার বাচ্চাটা খুব অসামাজিক। বাড়িতে মেহমান এলেও কারো সাথে মিশে না। এক ঘরে গিয়ে পড়ে থাকে। মোবাইলে গেমস খেলে। ওর বাবা ওকে নিয়ে খুব চিন্তিত। তাশরিফ ভাই বললেন, বাচ্চা কাচ্চাদের বাংলা সংস্কৃতি, গান, আবৃত্তি এসবের সাথে পরিচয় করালে তারা আর ঘরকুণো হবে না। সবার সাথে মিশবে, সামাজিক হবে। এটা কি সত্যি?"

"জি। সত্যি।"

ইয়াজিদ আবার কপাল কুঁচকালো। ভদ্রমহিলার অতিরিক্ত বকবকের স্বভাব। বিরক্তির পারদ আকাশ ছুঁয়ে যাচ্ছে ইয়াজিদের। মহিলা মানুষ এতো কথা কেমনে বলে?

ফাতিহা বললেন,"আমি চাই আমার মেয়ে আত্মীয় স্বজন বাড়িতে এলে ওদের সাথে মিশবে। দু'টো ছড়া আবৃত্তি করে শোনাবে। কবিতা শিখবে। বই পড়বে। আপনারা কি ওকে এমন বানাতে পারবেন?"

ইয়াজিদের বলতে মন চাইলো," এদিকে আমরা মানুষ বানাই না আফা। মানুষ বানানো আমাদের হাতে নাই। আপনে অন্য জায়গায় যান।"
কিন্তু ভদ্রতার খাতিরে তাকে চুপ থাকতে হলো। চুপ থেকে নিজের মেজাজটা ঠান্ডা রেখে বলতে হলো,"আসলে আপা, আমাদের সংঘটন টা হলো সাহিত্য চর্চার সংঘটন। এখানে এসে সে কবিতা শিখবে, গান শিখবে, সবচেয়ে বড় কথা- অনেক রকম মানুষের সাথে পরিচিত হবে।
এতো রকম মানুষের সাথে পরিচিত হলে এমনিতেই ভাষার দক্ষতা বাড়বে, বন্ধুত্ব করা শিখবে, সামাজিকতা আসবে আচরণে। সেই হিসেবে আপনি যা যা আশা করছেন, সেটা হওয়া অসম্ভব কিছু না।"

ভদ্রমহিলা সন্তুষ্ট হলেন তার জবাবে। ঠোঁট নেড়ে বললেন,"জি, ইনশাআল্লাহ।"

গানা বাজনার জায়গায় ইনশাআল্লাহ! ইয়াজিদের নিজেরই অপমান লাগলো। আল্লাহ নিশ্চয়ই ক্ষুদ্ধ চোখে তাকিয়ে আছেন তার দিকে। কতো বড় বদমাইশ বানিয়ে পাঠিয়েছেন পৃথিবীতে! ইয়াজিদ একদফা শ্বাস ছেড়ে বলল,"জি। আপনি সময় মতো নিয়ে আসবেন ওকে।"

ফাতিহা নামের ভদ্রমহিলা হাসলেন গাল ভরে।
"তা ইয়াজিদ ভাই! কতো টাকা দিবো আপনাকে? তাশরিফ ভাই বলেছিল ভর্তি করানোর জন্য কিছু টাকা দিতে হয় শুরুতেই।"

"দিন। আপনার যতো দিতে ইচ্ছে হয় ততোই দিন। আমাদের কোনো বাঁধাধরা ফি নেই।"

মহিলা ব্যাগ হাতড়ে একটা নতুন হাজার টাকার নোট বের করলেন। হাসিমুখে সেটা সামনে এগিয়ে দিয়ে বললেন,"এই নিন। আর আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। আপনাদের ইনিশিয়েটিভ খুব সুন্দর। আমার ভালো লেগেছে। আল্লাহ আপনাদের উপর আরো বরকত দিক।"

আবার! ইয়াজিদ রাগ দমাতে নিজের হাত মুঠ করে ধরলো। ভদ্রমহিলা তার হাতে টাকা ধরিয়ে তার মেয়েকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। তার ধর্মীয় শিক্ষা নিয়ে ইয়াজিদের সন্দেহ হতে লাগলো। তিনি বেরিয়ে যাওয়ার পরেই ইয়াজিদ দুই হাত তুলে উপরে তাকিয়ে বলল,"আল্লাহ! এই নাদানরে তুমি মাফ করো। সাথে আমারেও মাফ করো। কথা দিলাম, বড়ো হইলে ভালা হইয়া যামু। আর এসব করতাম না।"

_____

ইয়াজিদের মুখ লটকানো। কটমট চোখে সে তাকিয়ে আছে জেবার শুকনো মুখের দিকে। জেবা একটু আগে ফোন করে তাকে বলেছে বাড়ি আসতে। কি নাকি সুখবর আছে। বাড়ি আসার পর শুনলো সুখবর এমন কিছুই না। তার বোনের মেয়ের বাচ্চা হয়েছে। ইয়াজিদ চেঁচিয়ে বলল,"তোমার বোনের মেয়ের বাচ্চা হইলে আমার কি?"

"ওমা! এটা একটা সুখের খবর না?"

"তোমার জন্য সুখের। আমার জন্য না।" ইয়াজিদ জেদ ধরে বলল,"তুমি ইচ্ছা কইরা এসব বইল্লা আমারে ঘরে আনসো। কিন্তু যতো যা ই করো, আমার বাইক লাগবেই। আর কিসু জানি না আমি।"

জেবা মাথা চাপড়ে বললেন," আমি কোথা থেকে বাইক আনবো? টাকা আছে আমার কাছে?"

"ভাইজানরে বলো। লাইন করো।"

"আচ্ছা বলবো। তুই এখন এদিকে আয়। মাথায় তেল দিয়া দেই। আয়।"

ইয়াজিদ নাক সিটকালো।
"ইসসসস! তেল।"

জেবা তার কথা গায়ে মাখলেন না। ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারের সামনে থেকে তেলের শিশি এনে তিনি নিজেই ইয়াজিদের মাথায় ভরে ভরে তেল ঢাললেন। চুল টেনে মাথা মালিশ করে দিলেন। ইয়াজিদ আরামে চোখ বুজে বলল," মণি! পারো খালি আমার সাথেই। নিনীত আর ইশানরে তো এমন করো না। খালি আমার সাথে এমন জুলুম করো। আচ্ছা থাক, মন খারাপ কইরো না। করো জুলুম। তোমার জুলুমও আমি অনেক ভালা পাই।"

____

বেলী গরম তেলে পেয়াজ ছাড়তে ছাড়তে বললেন," বড় ভাবি! আপনার মনে হয় না ইয়াজিদকে আপনি একটু বেশিই লাই দেন?"

জেবা প্রথমবার কথাটা না শোনার ভান করলো। পরের বার একটু মিনমিন করে বলল,"ঐ আরকি, বাচ্চা ছেলে।"

"আল্লাহর ওয়াস্তে বাচ্চা ছেলে বাচ্চা ছেলে বলবেন না। ওর বয়স দেখেছেন? আপনি, মেঝ ভাবি আর ওর বড় ভাইজানরা সবাই মিলে ওকে নষ্ট করছেন। ও টাকার মর্ম বোঝে না, জীবনকে গুরুত্ব দিতে জানে না।"

বেলী তপ্তশ্বাস ছাড়লেন। মুখে তার স্বভাবসুলভ কাঠিন্য ঠাসা। একটা লম্বা সময় পর্যন্ত শিক্ষকতা করেছেন তিনি। পরে সন্তান না হওয়ার দুঃখ, নিঃসঙ্গ জীবন তাকে কিছুটা ছন্নছাড়া করে দিয়েছিল। ইমি পেটে আসার পর বেলী তার চাকরিটাই ছেড়ে দিলো। চাকরি ছাড়লেও স্বভাব থেকে ঐ শাসনের ব্যাপারটা যায় নি। ইয়াজিদকে সে ছোট থেকেই পড়াতো। সে তার অতি অবাধ্য স্টুডেন্ট। এখনো অবাধ্য হয়েই দিব্যি তার চোখের সামনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বেলী চাইলেও তাকে জব্দ করতে পারে না। তার ভাইজানরা তাকে জব্দ হতে দেয় না।

____

ইয়াজিদ শেষ পর্যন্ত সফল হয়েছে। তিনদিন একটানা বড় ভাইজানের পেছনে ঘোরার পর বড় ভাইজান তাকে নতুন বাইক কিনে দিতে রাজি হয়েছে। তবে শর্ত হলো, এক বছরের মধ্যে ইয়াজিদকে বিয়ে করতে হবে। এই শর্তে ইয়াজিদ একবাক্যে রাজি হয়েছে। বলেছে, এক বছর কেন, সে পারলে ছয় মাসে বিয়ে করবে। দরকার হয় ভাইজানকে ডাবল খুশি করার দুইটা বিয়ে করবে। তবুও তার বাইক চাই।

তাকে বাইক কিনে দেওয়া হলো। নাসির সাহেব বাইকের জন্য প্রয়োজনীয় এগারো লক্ষ টাকার চেকে সই করে সেটা ইয়াজিদের হাতে তুলে দিতেই ইয়াজিদ জাপ্টে জড়িয়ে ধরলো তাকে। খুশিতে আটখান হয়ে চেঁচিয়ে বলল,"বড় ভাইজান! ইউ আর দি বেস্ট। তুমি হইলা পৃথিবীর সবচেয়ে দয়াবান মানুষ। বুঝসো?"

নাসির সাহেব কানে তুললেন না তার কথা। ঠান্ডা স্বরে বললেন,"তেলবাজি করতে হবে না ইয়াজিদ। টাকা পেয়ে গেছ। এখন গিয়ে নতুন হুন্ডা কিনে মনের সাধ মেটাও। কিন্তু কথাটা যেন মাথায় থাকে।"

ইয়াজিদ মাথা নাড়লো। হাত তুলে বলল,"ওকে বস। কথার নড়চড় হবে না কোনো।"

______

বেলী গম্ভীর মুখে বসে আছেন মেয়েদের ঘরে। এরা দু'জন মুখ লটকে সাদা কাগজে কলম ঘঁষছে। বেলী এদের অংক করাতে বসেছেন।

মেয়েদের পড়াশোনা নিয়ে বেলী যথেষ্ট সচেতন। মেয়েরা পড়বে, জানবে, শিখবে, এমনটাই তো উচিত। কিন্তু মেয়েদের আবার পড়াশোনার প্রতি অনুরাগ নেই। এদের সব মনোযোগ হলো তাদের ছোট চাচা ইয়াজিদকে ঘিরে। ছোট চাচা এদের রোল মডেল। ছোট চাচা যেদিন চামচে খাবে, সেদিন ওরাও চামচে খাবে। ছোট চাচা যেদিন হাত দিয়ে মেখে খাবে, এরাও সেদিন হাত দিয়ে মাখবে। চাচা যদি বলে পড়াশোনা ভালো, তাহলে এরা পড়বে। চাচা যদি বলে গান গাওয়া ভালো, তাহলেও এরা অতি বেসুরো গলায় গানের নামে চিৎকার করতে থাকবে। বেলী খুবই চিন্তিত এদের নিয়ে।

এই যেমন আজ এদের চাচা বাইক কিনেছে। ঐ বাইকে চড়ার জন্য তাদের আত্মা ছটফট করছে। কিন্তু বেলী তাদের বাইরে যেতে দিচ্ছেন না। চাচ্চু একটু পরেই বাইক নিয়ে আসবে। ঐ নতুন বাইকটা তারা দেখতে পাবে না সবার প্রথমে। ইশশশ!

বেলী বললেন," ইমি! দেখি তোমার খাতা দেখি। বলো তো আংশিক ভগ্নাংশের কাজ করতে হলে প্রথমেই আমাদের কি করতে হয়?"

ইমি মুখ লটকে বলল," জানি না।"

"কেন জানো না?"

"কেন জানি না এটাও জানি না।"

"তুমি আমার সাথে বেয়াদবি করছো ইমি।"

ইশি চট করে মাথা তুলল। নাক ফুলিয়ে বলল,"আর তুমি আমাদের সাথে সবসময় যা করো, ঐটা কি?"

বেলী ঠাস করে এক চড় বসালেন ছোট মেয়ের গালে। চড় খেয়ে ইশি কাঁদতে কাঁদতে বইয়ের পাতা উল্টালো।

ইয়াজিদ বাইক নিয়ে বাড়ি ফিরলো ঠিক বিকেলের দিকে। সূর্যের লালচে কমলা আলো, শহরতলীর নীরব পরিবেশ ভেদ করে তুমুল শব্দ তুলে তার বাইকটা বাড়ির মূল গেইটের সামনে এসে থামলো।
সে বাইক থেকে নেমেই সদর দরজার দিকে এগোলো। চিৎকার করে হাঁক ছাড়লো," ইমি ইশি! তোরা কোথায়? জলদি নিচে নাম। দুই মিনিটে। দেখ কি ঝাক্কাস জিনিস কিনে এনেছি।"

বেলীর তখন চোখ লেগে এসেছিল। তিনি ঘুমাচ্ছিলেন নিশ্চিন্তে। ইমি ইশি পা টিপে টিপে মায়ের ঘর ডিঙিয়ে নিচে নেমে এলো। আনন্দ আর উল্লাসে তাদের দুই চোখ জ্বলজ্বল করছে।

ইয়াজিদ আবার তাদের দেখেই মুচকি হাসলো। সামনে হাত বাড়িয়ে বলল,"দেখ! কি জিনিস কিনে এনেছি।"

ছোট ছোট মেয়ে দু'টো আনন্দে আত্মহারা হলো। উৎসুক চোখে সামনে তাকিয়ে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলল," দারুণ হয়েছে চাচ্চু। একদম বেস্ট।"

"আয়। তোদের মা উঠার আগে ঝটপট একটা রাইড দিয়ে আসি।"

মেয়ে দু'টো সারিবদ্ধ ভাবে ছুটলো তার পিছু। বাগানে তখন অরুণা হাঁটছিলো নিকিতাকে কোলে নিয়ে। নিকিতা দুপুর থেকে জেগে আছে। তার চোখে ঘুম নেই। ওদের তিন জন কে বের হতে দেখে সেও তড়াক করে জেগে উঠলো। দু'চোখে যেই ঘুম ঘুম ভাব আসছিলো, মুহূর্তেই সেটা ঝেড়ে ফেলে বড় গলায় ডাকলো ইয়াজিদ কে।

"চামচুউউউ। কুনেএএএ নাউ।"

ইয়াজিদ থামলো। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকে দেখতেই চওড়া হাসলো। এগিয়ে এসে তাকে কোলে তুলে বলল,"কিরে গুচুপুচু? তুই ঘুমাস নি এখনো?"

"বিলু কততে চাই। বিলু কততে নিয়ে যাউ।"

"বেরু করবি? আচ্ছা আয়।"

ইয়াজিদ ওকে কোলে তুলে হাঁটছিলো।
"কি? ভালো লাগে?"

"হু। নককী চামচুউউ।"

"আরে বাবা! আমি লক্ষ্মী! সোনারে, আমি তোর চাচ্চু না, দাদা হই দাদা। বল তো দাদা।"

"দানা।"

ইয়াজিদ হতাশ হলো,"থাক, চাচ্চুই ডাকতে থাক।"

ইয়াজিদ গিয়ে বাইকে বসলো। তার পেছনে ইমি আর ইশি। তার বুকের উপর নিকিতা। ইয়াজিদ হেলমেট দু'টো ইমি আর ইশির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,"নে এটা পর। আমি মরলে সমস্যা নাই। কিন্তু তোরা মরলে তোর মা আমাকে সহ কবর দিয়ে দিবে। নেহ, তোরাই পর।"

নিকিতা ঠোঁট উল্টে বলল,"আমান হেমমেত তুতায়?"

"তোর হেলমেট নাই।" ইয়াজিদ চোখ বাঁকিয়ে তার দিকে তাকালো,"আমার বুকই তোর হেলমেট।"

ইয়াজিদ বাইক স্টার্ট দিলো। সাইলেন্সারে শব্দ তুলে তেজি গতিতে বাইক ছুটলো প্রশস্ত রাস্তা ধরে। নিকিতা হঠাৎ বাতাসের দাপটে তড়িঘড়ি করে মুখ লুকালো ইয়াজিদের বুকে। নরম নাকটা ইয়াজিদের বুকে ঘঁষতে ঘঁসতে বলল,"ভই কচ্চে। বাতাছ, সুদু বাতাছ। চামচুউউউ। বাতাছ ভই দেকাচ্চে।"

"কিচ্ছু হবে না। ধরে রাখো শক্ত করে।"

ইয়াজিদ বাইক ছোটাচ্ছে মাঝারি থেকে কিছুটা দ্রুত গতিতে। ইমি আর ইশি আনন্দে হৈচৈ করছে পেছনে বসে। নিকি বিড়ালের বাচ্চার মতো লুকিয়ে আছে ইয়াজিদের বুকের মাঝে। ইয়াজিদ বলল," নিকিরে! কেমন লাগছে এখন?"

নিকি মুখ তুলল না। ঐরকম লেপ্টে থেকেই গাল ভরে হেসে বলল,"ভালু। অনিক ভালু। এত্ দিন পাপাই কেও নিবা। আমি, তুনি আন পাপাই। উকিহ?"

ইয়াজিদ হাসতে হাসতে ঠোঁট বাঁকালো।
"হায়রে পাপাইয়ের পাকনী রে!"

চলবে-

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 7 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন