ফন্ট সাইজ:
থিম:
আম পাতা জোড়া জোড়া

পর্ব 8

লেখক: মেহরিমা আফরিন

#আম_পাতা_জোড়া_জোড়া-০৮
মেহরিমা আফরিন

ইশানের আজ বাড়ি ফিরতে দেরি হলো কিছুটা। সে কাজ করে একটা এক্সপোর্ট কোম্পানিতে। এক্সিকিউটিভ অফিসারের চাকরি। বেশ ভালো বেতন। চাকরির ব্যস্ততায় তার মাঝে মাঝে বাড়ি ফিরতে দেরি হয়।

মেহরোজ আগে প্রায়ই রাতে জেগে থাকতো তার জন্য। এখন অবশ্য জাগে না। ইশানই বারণ করেছে। কি দরকার খামোখা ঘুম নষ্ট করে জেগে থাকার? ইরোজ আর নিকিতাকে তো প্রায় সারাদিনই তার সামলাতে হয়। এর উপর সে আবার দ্বিতীয়বার কনসিভ করেছে। ইশান হালকা হেসে তার মাথায় হাত রেখে বলল,"তোমার ঘুম পেলে ঘুমিয়ে যেও। আমার জন্য জাগতে হবে না কষ্ট করে।"

মেহরোজ প্রথমে তার আদেশ-অনুরোধ কোনোটাই শুনতো না। কিন্তু গর্ভাবস্থার সময়কাল বাড়তেই তার ক্লান্তি বাড়া শুরু হলো। তখন সে চাইলেও আর জেগে থাকতে পারতো না। প্রচুর দুর্বল লাগতো শরীর। দেখা যেত ইশান ঘরে আসার আগেই সে বাচ্চা দু'টোকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়তো।

আজও ইশান দেরিতে ফিরলো। এই তো, রাত সাড়ে এগারোটা নাগাদ। ইয়াজিদ বাদে আর কেউ এতো সময় পর্যন্ত বাইরে থাকে না। বাড়ি আসার পরেই ইশান বড় করে দু'টো শ্বাস ছাড়লো। এক্সপোর্ট কোম্পানিতে তার এই চাকরি নেওয়াটা নাসির সাহেব খুব একটা পছন্দ করেন নি শুরুতে। তাদের পারিবারিক ব্যবসা আছে। একটা সময় নিনীতই ঐ ব্যবসা সামলাতো। সিয়াশা মারা যাওয়ার পর সে ছিটকে গেল সবকিছু থেকে। নাসির সাহেব তখন চাইলেন, ইশান এসে ব্যবসার হাল ধরুক। কিন্তু ইশানের আগ্রহ ছিলো না বাড়ির ব্যবসা নিয়ে। সে চাইছিলো নিজের পড়াশোনা দিয়ে কোনো কর্পোরেট জবে ঢোকার। সে ঐদিকেই মনোযোগী ছিলো।
নাসির সাহেব পরে অবশ্য মেনে নিলেন সবটা। বাড়ির মূল ব্যবসা এখনো তারা তিন ভাই মিলেই দেখছে। ইয়াজিদেরও ব্যবসার প্রতি কোনো মনোযোগ নেই। সে ব্যবসার দায়িত্বই নিতে চায় না। ভাইজানদের থেকে মন মতো টাকা হাতিয়ে নেওয়া বাদে তার আর কোনো আলাদা ক্যারিয়ার পরিকল্পনা নেই।

ইশান বাড়ি ফিরতেই দেখলো, বাড়ির পরিবেশ একেবারে নীরব। দোতালার করিডোরে যেই হ্যাজাক বাতির মতো কমলা আলো জ্বলে, সেই আলোটাও নিভানো। সবাই বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছে।

ইশান পা টিপে টিপে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলো। করিডোরে হাঁটলোও নিঃশব্দে। তারপর খুব ধীরে দরজা খুলে ঘরের ভেতরে উঁকি দিলো।

মেহরোজ ঘুমাচ্ছে একপাশ হয়ে। মাথার চুলগুলো এলোমেলো। মুখে সারাদিনের ক্লান্তির ছাপ। একটা হাত বাড়িয়ে সে ইরোজ আর নিকিতাকে ধরে রেখেছে।

নিকিতা ওর দিদুনকে খুব পছন্দ করে। তবে রাতে ঘুমানোর সময় মেহরোজের জন্য ছটফট করে খুব। মুখে যদিও কিছু গুছিয়ে বলতে পারতো না, তবে ইশান বুঝতো, মনে মনে সে মেহরোজ কেই মা ভাবতো। ইরোজের মা, তারও মা। ইশান কোনদিন ওর ভুল ভাঙাতে উদ্যোত হয়নি। বাচ্চা একটা মেয়ে। তার মা নেই, মারা গেছে। এতো কঠিন কথা জেনে সে কি করবে? যতোদিন ওর বুঝ না হয়, ততদিন ও এটাই জানুক যে মেহরোজ ওর মা।

ইশান হাত মুখ ধুয়ে কাপড় পাল্টে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। তার প্রচণ্ড খিদে পেয়েছে। প্রথমে ভেবেছিল না খেয়েই ঘুমাবে। এরপর মনে হলো এতো খিদে নিয়ে সে গোটা একটা রাত পার করতে পারবে না।

খাওয়ার ঘরে বাতি জ্বলছে। কিন্তু টেবিল ফাঁকা। কোনো প্লেট বাটি কিছুই নেই। খুব বিপাকে পড়লো ইশান। এখন খাবার খুঁজবে কোথায়?

অরুণার ঘরের বাতি জ্বলছে। তার রাত জেগে পড়াশোনা করার স্বভাব। ইশান গিয়ে তার দরজার কাছে দাঁড়িয়ে একটা শ্বাস ছাড়লো। আওয়াজ নামিয়ে ডাকলো,"অরু! অরু! জেগে আছিস?"

দু মিনিটের মাথায় অরুণা দরজা খুললো। তার গায়ের উপর একটা বড় সুতির ওড়না চাপানো। দরজার বাইরে ইশানকে দেখেই আরেক দফা সচেষ্ট হলো। মৃদু স্বরে বলল,"জি, জেগে আছি।"

অরুণা পড়া গুছিয়েছে মাত্র। একটু পরেই ঘুমাতে যেত। দরজার বাইরে ইশানের আওয়াজ শুনে খুব অপ্রস্তুত বোধ করলো। সে চেষ্টা করে বাড়ির মানুষদের এড়িয়ে যেতে। বিশেষ করে ইশান কে। ইশানের সাথে দুই মিনিট কথা হলেই তার নিজেকে অপরাধী মনে হয়। অরুণা ওড়নার এক মাথা আঙুলে প্যাঁচিয়ে ইশানের দিকে তাকালো।

ইশান বোকা বোকা স্বরে বলল,"অরু! টেবিল একদম ফাঁকা। খাবার পাবো কোথায় বলতে পারিস? আমার খুব খিদে পেয়েছে।"

অরুণা ভারি নিঃশ্বাস ছাড়লো। হাত মুখ ধোয়ার পরেও ইশান কে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে। অরুণা দ্রুত তার থেকে চোখ সরালো। গলার কাছে যেই তীব্র যন্ত্রণা দলা পাকাচ্ছিল, সে সেটাকে প্রশ্রয় দিলো না। আরো দু'টো নিঃশ্বাস ছেড়ে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,"আপনি বসুন। আমি খাবার বেড়ে দিচ্ছি।"

"এই না না। তুই পড়ছিস পড়। আমাকে শুধু বল কোথায় আছে। ফ্রিজে? কতোক্ষণ ওভেনে দিবো সেটাও বল।"

অরুণা ওড়না সামলে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ালো। যেতে যেতে ঠান্ডা স্বরে বলল,"আপনি বসুন। আমি খাবার গরম করে দিচ্ছি।"

ইশান এক লোকমা মুখে তুলেই অনুতপ্ত চোখে অরুণার দিকে তাকালো।

"অরু! তোর পড়ার ডিস্টার্ব করলাম তাই না?"

"না। আমার পড়া শেষ। ঘুমাতাম একটু পরেই।"

"ওও। তাহলে ঘুমের ডিস্টার্ব করলাম। স্যরি। আসলে অনেক খিদে পিয়েছিল।"

"সমস্যা নেই। আমি রাতে জেগেই থাকি ।"

ইশান আরো কয়েক লোকমা মুখে তুললো। অরু তার থেকে চোখ সরিয়ে এলোমেলো ভাবে দেয়ালের সাদা রংটার দিকে তাকালো। তার ভীষণ দুর্বল লাগছে নিজেকে। ইচ্ছে করছে, দ্রুত কোনো এক বাহানায় এখান থেকে কেটে পড়তে। কিন্তু এমন উদ্ভট আচরণ করলে কি সে ইশানের কাছে ধরা পড়ে যাবে? এমন হলে খুব লজ্জায় পড়বে অরুণা। সে দ্বিচারিতা না। অন্য নারীর বরের দিকে নজর দেওয়া চরিত্রহীনাও না।

ইশান মুখ তুলে বলল,"অরু! তুই খেয়েছিস তো?"

"হুম। খেয়েছি।"

"মেহরোজ? ও খেয়েছে?"

অরুনা মাথা নাড়লো। আস্তে করে বলল,"খেয়েছে।"

"জানিস, ইরোজের কিন্তু প্রায় সব দাঁত উঠে গেছে। আমার ছেলেটা বড় হয়ে যাচ্ছে।"

ইশান হাসলো। পিতৃত্বের আনন্দে উজ্জ্বল হলো তার মুখ। অরুণা দেয়ালের ম্যাদাটে রং থেকে চোখ সরিয়ে তার জ্বলজ্বলে মুখটার দিকে তাকালো।

ইশান খাচ্ছে বেশ সাচ্ছন্দ্যে। খাওয়ার ফাঁকে দু'টো কথা বলছে নিজ থেকে। আগে যখন ভার্সিটি থেকে ফিরে এসে সে খেতে বসতো, তখন বাড়ির বেশিরভাগ মানুষই দুপুরের খাবার শেষ করে একচোট ঘুমে ডুবে থাকতো।অরুণাই তাকে খাবার বেড়ে দিতো। সে ঠিক এমন করেই এক একটা লোকমা তুলতো। ইশানের ঐ দিন গুলো মনে পড়ে নাকি কে জানে? সে হয়তো ভুলে গেছে। কিন্তু অরুণা ভুলতে পারে না। মাঝে মাঝেই সে দিন গুলো মনে পড়ে। যেই দিনগুলোতে অরুণা করুণা করাকে ভাবতো ভালোবাসা। এখন অবশ্য সে বড় হয়েছে। দয়া দেখানো আর ভালোবাসার পার্থক্য সে জানে।

ইশান খাওয়া শেষ করে নিজেই নিজের প্লেট ধুলো।অরুণা ব্যস্ত হয়ে বলল,"আমাকে দিন। আমি ধুয়ে দেই।"

ইশান দিলো না। ভ্রু কুঁচকে বলল,"ওমা, তোকে কেন দিবো? এইটুকু আমি নিজেই করতে পারি। তুই গিয়ে ঘুমা। তোর ঘুমের সময় নষ্ট করেছি আমি।।তার জন্য স্যরি।

অরু চুপচাপ এক কোণায় দাঁড়ালো। প্লেট ধুয়ে ইশান ধীর পায়ে এগোলো তার ঘরের দিকে। পেছনে রেখে গেল অরুণার চির অসহায় দৃষ্টি। আক্ষেপে বুক ভারি হলো তার। অরুণার মনে হলো, তার মতো অপদার্থ এই শহরে আর দু'টো নেই।

_____

আজ মেহরোজের পাঁচ ফলের অনুষ্ঠান। যদিও এটা তেমন পালন করার মতো কোনো বিশেষ উপলক্ষ না, কিন্তু বেশ কিছুদিন ধরেই বাড়িতে মেহমান খাওয়ানো হচ্ছে না। তেমন ভালো মন্দ রান্নাও হচ্ছে না। জেবা তাই ঠিক করলেন, মেহরোজের গর্ভাবস্থার পঞ্চম মাসে পদার্পণ উপলক্ষে তিনি সব আত্মীয় স্বজনদের দাওয়াত করে খাওয়াবেন।

এই রাত্রিকালীন ভোজে তিনি পেডিয়াট্রিশিয়ান পারমিতা ইবনাতকেও নিমন্ত্রণ জানালেন। পারমিতা ফোনে জানালো, সে অবশ্যই আসবে। তবুও জেবা সকালে আরো একবার তার নম্বরে ফোন করে তাকে স্মরণ করিয়ে দিলেন। সাথে কিছুটা লজ্জিত হয়ে বললেন," আমি আপনাকে সরাসরি গিয়ে দাওয়াত দিতে পারি নি।।তাই দুঃখিত। আসলে বাড়িতে এতো কাজের চাপ যে কোনোভাবেই আপনার ক্লিনিকে যেতে পারছি না।"

পারমিতা ওসব আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে তেমন ভাবে না। সে বেশ উৎফুল্ল মনে বলেছে, আজ তার ব্যস্ততা কম। সে বিকেলে রোগী দেখা শেষ করে অবশ্যই আসবে।

সন্ধ্যার আলো কমতে শুরু করার পরেই বাড়ির রসাই ঘরে রান্নার তোড়জোড় বাড়লো। জেবা শাড়ির আঁচল কোমরে পেঁচিয়ে ব্যস্ত গিন্নি হয়ে ছুটছেন এদিক সেদিক। সুষ্মিতা খাবার ঘরের টেবিল গোছাচ্ছে,নতুন ম্যাট বিছিয়ে দিচ্ছে। বেলী ব্যস্ত পোলাও নিয়ে। আজ পোলাও আর ভর্তার দায়িত্ব সে নিয়েছে। পোলাও ঝরঝরে হতেই হবে। বেলীর সমস্ত মনোযোগ আপাতত সেদিকে।

জেবা কাজের ফাঁকে একবার নিনীতের ঘরে গেলেন। ঢুকেই বড় অসহায় গলায় বললেন,"বাবা! আজ তো বাড়িতে মেহমান আসবে।।আসলেই তো তোমার সাথে দেখা করতে চাইবে। আজ একটু পরিপাটি হয়ে নিচে এসো কেমন?"

নিনীত পাতলা চাদর মুড়িয়ে শুয়েছিল। ঠান্ডা কাশিতে তার নাজেহাল অবস্থা। জেবার কথা শুনতেই সে নাক কুঁচকে বলল," আবার নিচে কেন নামবো? আমার শরীর ভালো না।"

জেবা দম ফেললেন। ধৈর্য নিয়ে বললেন,"বাবা, আমি তো তোমায় কাজ করতে বলি নি। বলেছি শুধু মার্জিত ভাবে নিচে নেমে মেহমানদের সাথে দেখা করতে।"

"আচ্ছা করবো। তার আগে বলো, ঐ মেয়েটা আমাকে জ্বালাবে না তো?"

জেবা অবাক হয়ে বললেন,"কোন মেয়েটা?"

"ঐ যে। নিকিতা আরকি।"

"ও তোমার মেয়ে নিনীত।"

"আমি জানি । প্রতিদিন দশবার করে এক কথা বলতে হবে না।"

"তাহলে এমন করে বলো কেন?"

নিনীত ধিমি স্বরে বলল,"ও খুব জ্বালায় আমাকে।"

জেবা ব্যথিত হলেন। করুণ গলায় বললেন,"বাচ্চা একটা মেয়ে কে এমন করে বলতে পারলি? সারাটা দিন তোর কথা বলে। পাপাই পাপাই করে আমাদের বিরক্ত করে দেয়। তোকে একটু ধরার জন্য, একটু দেখার জন্য কতোবার তোর ঘরের কাছে আসে। একটুও মায়া লাগে না নিনীত?"

নিনীত কানের উপর বালিশ চেপে ধরলো। গাঢ় স্বরে বলল,"যাও মা। এসব কথা ভাল্লাগে না।"

জেবা আর কথা বাড়ালেন না। দুঃখভরা মন নিয়েই তিনি বেরিয়ে পড়লেন ঘর থেকে। এখন ইয়াজিদ সাহেবের খোঁজ নিতে হবে। মহাশয় ইদানিং দিব্যি সুখে দিন কাটাচ্ছেন।

নতুন বাইক পাওয়ার পর প্রথম এক মাস ইয়াজিদ মাটিতে পা রাখতে পারলো না। খুশির চোটে রীতিমতো উড়ছিলো আকাশে। এই এক মাস তাকে খুব সহজে বাড়িতে দেখা গেল না। দিন রাত সে কেবল ঐ বাইক নিয়েই পড়ে থাকলো। নাসির সাহেব তার অবস্থা দেখে আশ্চর্য হয়ে বললেন," এ আবার কি অদ্ভুত কাণ্ড! টাকা দিয়ে তো পাগলকে আরো উস্কে দিলাম দেখছি।"

একমাস ভরপুর উড়াউড়ি করার পর স্রষ্টা আপনা আপনি ইয়াজিদের পাখা একটু ছাটাই করে দিলেন। বড় রাস্তার মোড়ে একটা এক্সিডেন্ট করে ইয়াজিদ বাম হাতের এক হাড় ভেঙে দশ দিনের বেডরেস্টে পড়লো। কি বিশ্রী অবস্থা! দশদিন ঘরবন্দী জীবন। ইয়াজিদ প্রথম তিনদিনেই ত্যক্ত হয়ে উঠলো।

জেবা ফুঁসতে ফুঁসতে বললেন," তোর বাইকের চাবি আলমারিতে লোকাবো আমি। আর বাইক ধরবি না একমাস। তোকে যে আম্মা গালি দেয়, একদম ঠিকই দেয় অসভ্য, ইতর!"

ইয়াজিদ ওসব কানে তুললো না। সে অপেক্ষা করছিলো অসহনীয় দশ দিবসের শেষ হওয়ার। দশ দিন পর সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে বাইক দিয়ে শো শো করে ঘুরতো, সংশপ্তকে গিয়ে খাঁদের কিনারায় চলে যাওয়া বাংলা সাহিত্যকে প্রবল শক্তিতে টেনে তুলতো। বাংলা সাহিত্য কৃতজ্ঞতা ভরা চোখে তাকিয়ে থাকতো তার দিকে। ভাগ্যিস ইয়াজিদ জন্মেছিল! নয়তো এই পঁচে যাওয়া সাহিত্যকে পুনরুদ্ধার করতো কে?

হাত ভাঙার দশম দিনে বাড়িতে একটা দাওয়াতের আয়োজন করা হলো। ইয়াজিদ রীতিমতো তড়াপাচ্ছিল বাইরে যাবে বলে। কিন্তু জেবার কড়াকড়ি নির্দেশে সে আর বেরোতে পারলো না। এমনিতেও বাড়ির লোকজন ক্ষেপে আছে তার উপর। রাশেদা তো নাম শুনলেই এক নাগাড়ে গালমন্দ করতে থাকে। ইয়াজিদের আর নতুন করে ঝামেলা পাকাতে ইচ্ছে হলো না।

সন্ধ্যার দিকে এক কাপ চা খাওয়ার উদ্দেশ্যে সে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। তার পরণে একটা টিশার্ট। টিশার্টের উপর একটা বোতাম খোলা চেকের শার্ট। হাতা আবার কনুই পর্যন্ত গুটানো। ইয়াজিদ ঘাড় মালিশ করতে করতে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।

সে চা খাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই বাড়িতে মেহমান আসতে শুরু করলো। জেবার তখন চরম ব্যস্ততা। ইয়াজিদ টি টেবিলের সামনে চেয়ার টেনে বসে উদ্দেশ্যহীন চোখে দেখছিলো তাদের।

ডাক্তার পারমিতা এলো সাড়ে সাতটা নাগাদ। জেবা ই দরজা থেকে তাকে আপ্যায়ন করে ঘরে নিয়ে এলেন। তার পরনে একটা হালকা লেভেন্ডার শাড়ি। গায়ে কিংবা হাতে এপ্রোন নেই। সবকিছু গাড়িতে রেখে এসেছে। জেবা বললেন,"আপনার গাড়ি এনেছেন?"

"না আমার না। গাড়িটা আমার বাবার। আমি প্রয়োজন পড়লে ব্যবহার করি।"

"ড্রাইভার আছে গাড়িতে? উনাকেও আসতে বলুন।"

না ড্রাইভার নেই। আমি নিজেই ড্রাইভ করি।"

জেবা আরেকদফা মুগ্ধ হলেন। চোখ ঘুরিয়ে সতর্কভাবে একবার টি টেবিলের উপর বসে থাকা কুঁচকানো মুখের ছেলেটার দিকে তাকালেন।
কি সুন্দর লাগবে দু'জনকে!

জেবা তাকে এক জায়গায় বসিয়ে ইয়াজিদের কাছে গেলেন। ইয়াজিদ তখনও আগের মতোই বসে আছে। জেবা গিয়ে খুব সাবধানে আঙুল তুলে পারমিতাকে দেখালেন। বেশ উৎসাহী মুখে বললেন,"ইয়াজিদ! ঐ মেয়েটাকে দেখছিস?"

ইয়াজিদ ঘাড় উঁচু করলো। চোখ সরু করে বলল,"হ, দেখলাম।"

"ওর নাম পারমিতা। ও পেশায় ডাক্তার।"

ইয়াজিদ দেখলো। অতঃপর অত্যন্ত ঠান্ডা গলায় বলল,"কিন্তু আমার তো কোনো অসুখ নাই। ইনারে দেইখা কি করমু?"

জেবা দাঁত কটমট করে বললেন,"অসুখ হলেই দেখতে হবে? ইনি কিন্তু এখনো বিয়ে করেন নি।"

ইয়াজিদ ভ্রু বাঁকালো।
"বুঝতে পারসি এবার। আবার সেই হাঙ্গা শাদির কেস।"

"তো কি হয়েছে? তুই কথা দিয়েছিস বিয়ে করবি।"

"তাই বইলা কি এমন ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার বিয়া করমু? বিয়ার পর পিডা খাওনের ধান্দা। কোনো ডাক্তার আমারে কি বুইঝা বিয়া করবো মণি? আমার আছে ডা কি?"

জেবা বললেন,"আগে কথা তো বলে দেখ।"

"পারতাম না। এই মেয়ে প্রচুর সাদা। এতো সাদা মেয়ে মানুষ আমার ঘেন্না লাগে। ফার্মের মুরগির চামড়ার মতো গায়ের রং। ইসসস! থু!"

জেবা চোখ পাঁকালেন। ক্ষেপাটে সুরে বললেন,"মেয়েটা ভারি মিষ্টি দেখতে! পরীর মতো চেহারা।"

"তো এতো পরীর মতো লাগলে তোমার বড় পোলার লগে সেটিং করায় দাও। তোমার বড় পোলা পাগলা কুত্তা হইয়া থাকে সারাদিন। ডাক্তার আইন্না পাগলের চিকিৎসা করাও। আমারে টানো কেন সবকিছুতে?"

"বা রে! আমি বুঝি এতো খারাপ? আমার ছেলের সাথে ঐ মেয়ের বিয়ে দিলে আল্লাহর কাছে কি জবাব দিবো? মেয়েটার জীবন নষ্ট হয়ে যাবে।"

ইয়াজিদ ঠোঁট উল্টে বলল,"আমার লগে বিয়া করাইলে নষ্টই হইবো। মাইয়া কানবো আর তোমারে গালি দিবো। তাই এসব ঘটকালি ছাইড়া রান্নাঘরে যাও। গিয়া দেখো খানা কি কি হইসে।"

_____

পারমিতা আলতো, নরম চোখে বাচ্চাটার দিকে তাকালো। ওর নাম নিকিতা। এই মাত্রই সে জানতে পেরেছে, নিকিতার মা নেই। ভদ্রমহিলা বছর দুই আগে রোড এক্সিডেন্টে মারা গেছে। জানার পর পারমিতার এতো যন্ত্রণা হলো! এইটুকু একটা বাচ্চার মা নেই। আহারে!

আজ এখানে আসার পর অনেকটা সময় সে একাই বসেছিল। কিছুক্ষণ পর একটা ছেলে এলো। বেশ হাসি খুশি চেহারার। এসেই বলল," আসসালামু আলাইকুম!"

পারমিতা চোখ তুলে তাকালো তার দিকে। ছেলেটা একটু দ্বিধা নিয়ে দেখছে তাকে। হয়তো পরিচয় চিনতে হিমশিম খাচ্ছে। পারমিতা বলল,"মিসেস জেবা আপনার কি হয়?"

"বড় চাচি।"

"আমি মিসেস জেবার গেস্ট।"

"ওহহহ আচ্ছা। ওয়েলকাম ওয়েলকাম। আমার নাম আদিয়াত আহিল।"

পারমিতা হাসলো। ধীর কণ্ঠে বলল,"আমার নাম পারমিতা ইবনাত।"

ছেলেটা চওড়া হেসে বলল,"আপনার কিছু লাগবে? ড্রিংকস পানি এনিথিং?"

"নো।" পারমিতা উৎসুক চোখে সামনে তাকিয়ে বলল,"দয়া করে আপনার ভাইয়ের মেয়ে নিকিতাকে এনে দিন। আমার ওকে লাগবে আপাতত।"

আহিল এক দৌড়ে গিয়ে উপরের ঘর থেকে নিকিতাকে নামিয়ে আনলো। নিকিতা শুরুতে তাকে চিনলো না। সে হাত বাড়াতেই বড় বড় চোখ করে তার দিকে তাকিয়ে আবার আহিলের গলা জড়িয়ে ধরলো।

"না না। ওর কুনে যাবু না।"

"কেন? ও তো তোমার আন্টি। যাও।"

পারমিতা এগিয়ে এলো। নিকিতার আতংকিত মুখটা দেখে কিঞ্চিৎ মনঃক্ষুন্ন হয়ে বলল,"নিকিতা! আমার নাম পারমিতা। তুমি আমায় চিনতে পারো নি?"

নিকিতা আহিলের বুকে মুখ লুকিয়েই চোরা চোখে তাকালো তার দিকে। ঠোঁট উল্টে মিন মিন করে বলল,"না। তুনি কে?"

আহিল দেখলো, ভদ্রমহিলার সমস্ত মুখ জ্যোতিহীন হয়ে গেছে নিকিতার জবাব পেয়ে। একটা বাচ্চা তাকে ভুলে গেল বলেই তার এতো মন খারাপ হলো? অদ্ভুত! পারমিতা অভিমানী গলায় বলল,"তুমি মিথ্যা বলছো। তুমি আমাকে চিনো। আমি পারমিতা। তুমি আমার রসগোল্লা।"

নিকিতা হঠাৎ মাথা তুলল। চকচকে চোখে পারমিতার দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলো,"নসোগুন্না?"

"হ্যাঁ। নসোগুন্না। কিন্তু তুমি আমাকে ভুলে গেছো। আমার এজন্য কান্না পাচ্ছে।"

"তান্না কয়ে না। তান্না করা ভানু না।"

মেহরোজ নিচে নামতেই নিকিতা তার কাছে যেতে চাইলো। মেহরোজ কোমরে হাত গুজে বলল," না রে সোনা। পেট ফুলে ঢোল হয়ে যাচ্ছে। আমি কোলে নিতে পারবো না আর। বেবি হোক। বেবি হওয়ার পর আবার কোলে নিবো।"

নিকিতা মনঃক্ষুন্ন হলো। ঠোঁট উল্টে চোখ দু'টো আর্দ্র করে মেহরোজের দিকে তাকালো। পারমিতা ওর টলটলে চোখ দু'টোর দিকে তাকিয়ে বুক ভরা আশা নিয়ে আবার তার দিকে হাত বাড়ালো।

"নিকিতা! আমার কোলে আসবে? একটু আসো। একটু আদর করি।"

নিকিতা এবার গেল তার কোলে। কোলে উঠে পারমিতার কোমল বুকে আলতো করে মাথা রাখতেই পারমিতার দুই চোখ জ্বলতে শুরু করলো। তাদের আশেপাশে আর কেউ নেই। মেহরোজ একটা সোফায় বসেছে। আহিল কি একটা কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।

পারমিতা ঐ ছোট্ট বাচ্চাটাকে কোলে নিয়েই প্রাণপণ চেষ্টা করে গেল নিজের কান্না আটকানোর। নিকি তার বুকে মাথা রেখেছে। পারমিতার যুগ যুগ ধরে ফাঁকা হয়ে থাকা বুকে এই প্রথম কেউ মাথা রেখেছে। মাতৃত্বের তৃষ্ণায় পারুর ছটফট করতে থাকা হৃদয় একটুখানি জলের খোঁজ পেল। জলের নাম নিকিতা। ঐ জলেই বহু বছরের পিয়াসী পারমিতা গলা ভেজালো, তেষ্টা মেটালো।

নিকিতা তার গলা জড়িয়ে বলল,"তুনি কান্না কনু তেনো?"

"কারণ আমার অনেক দুঃখ। তোমার কোনো দুঃখ নেই।"

"না। দুক্কু নাই।"

"তাহলে আমাকে আদর করো।"

নিকিতা মাথা তুলে তার গালে চুমু খেল একটা। সাথে সাথে পারমিতার ডান চোখ থেকে টপ করে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো। সে সাথে সাথে চোরের মতো সেটা মুছে নিলো।

এরপর মেহরোজের সাথে কথা হয়ে সে জানতে পারলো, নিকিতার আসলে মা নেই। মেহরোজ ওর চাচি। শোনার পর তার বুকটা এতো খালি খালি লাগলো। এইটুকু বাচ্চা মা ছাড়াই বড় হচ্ছে। পারমিতার ফুঁপিয়ে কেঁদে বলতে মন চাইলো,"এই বাচ্চাটা আমাকে দিয়ে দিন। আমি আমার যতো উপার্জন আছে, সব দিয়ে দিবো। আমি খুব একা। এই বাচ্চাটা অন্তত আমায় দিন।"

আহিল একটু দূরে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ চোখে দেখছিলো তাকে। এই ভদ্রমহিলার পরিচয় এতোক্ষণে সে জেনেছে। জানার পরে একদফা নাক কুঁচকেছে। বড় চাচি একে ইয়াজিদ চাচ্চুর জন্য দেখছে। কি একটা অবস্থা! তার চোখে কি আহিল পড়ে নি?

আহিল ফোঁস করে উঠে এই আলাপ তুলতেই ইয়াজিদ তার ঘাড়ের নিচে আলতো করে চড় মেরে বলল,"শালা! আমার বয়স দেখেছিস? ঐ মেয়ের বয়স ত্রিশ। আমার লগে তাও যায়। তুই শালা চব্বিশ বছর বয়সে ত্রিশ বছরের মাইয়া বিয়া করবি?"

"হ্যাঁ, করমু। উনার চেহারা দেখলে মনে হয় উনার বয়স ত্রিশ। কি ফিট! কি পারফেক্ট!"

"খুব পারফেক্ট! ধলা মুরগি।পোল্ট্রি মুরগির মতো চামড়া। তোরে এর পাশে চাকরের মতো লাগবো।"

আহিল গর্জে উঠে বলল,"চাচ্চু! এটা কিন্তু বাড়াবাড়ি। আমি এতোও খারাপ না।"

"হ, তুমি খুব ভালা। শোন, এই মহিলা যদি এই বাড়িতেই বিয়া করে, তাহলে সবচেয়ে সেরা অপশন হইলাম আমি।
কিতা? এমনে চাইয়া লাভ নাই। আমিই। ইশান, নিনীত আগেই বাদ। সীমান্ত বাচ্চা মানুষ। আর আসি তুই আর আমি। আমার টেকা পয়সা না থাকলেও চরিত্র আছে। তোর টেকা পয়সাও নাই, আবার ঐডাও নাই। তাইলে বল, কে জিতলো? আমি নি?"

"খুব। তা মুখ ফুটে বলো, যে ভাল্লাগসে!"

"ইসসস! কস্মিনকালেও না। তুই খালি মহিলার চেহারাই দেখছস। যোগ্যতা দেখোস নাই। এরে ঘরে তোলার মতোন যোগ্যতা এই পুরা মহল্লার কোনো বেডার নাই। হাতের পার্সটা দেখছস কতো দামি? তোরে আমারে তিনবার বেঁচলেও এই দাম উঠতো না। শালা!"

পারমিতা নিকিতাকে কোলে নিয়ে বসেছিল। টুকটাক গল্প করছিলো তার সাথে। হঠাৎ নিকিতা সিঁড়ির দিকে তাকিয়েই হাত পা ছড়িয়ে চেঁচিয়ে উঠলো আনন্দে। তার দুই চোখ আলোকবাতির মতো জ্বলছে। দু'হাত তুলে সে এখনই উদ্যোত হচ্ছে কোলে উঠার জন্য। তার গোল গোল গাল দু'টো লাল হয়ে খুশির ঝিলিকে।

সে একপ্রকার লাফিয়ে পড়তে চাইলো পারমিতার কোল থেকে। চিৎকার করে বলল,"পাপাই। আমান পাপাই। নিকুর পাপাই।"

পারমিতা শক্ত করে চেপে ধরলো তাকে। তার হঠাৎ অস্থিরতা দেখেই তার দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকালো সিঁড়ির দিকে।

সিঁড়ির মাথায় এক ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছেন। পরনে সফ্ট মার্বেল ব্লু ফর্মাল শার্ট। হাতা গুটানো কনুই অব্দি। শার্টের প্রথম দুই বোতাম খোলা। চুল গুলো হালকা ভেজা। কিছুক্ষণ আগেই গোসল সেরেছে বোধহয়। মুখে একটা চাকচিক্য ভাব আছে। চোখ দু'টো বেশ তীক্ষ্ণ। গলার মাঝামাঝি উঁচু হয়ে দেখা যাচ্ছে সুঁচালো এক কণ্ঠমণি। ফর্মাল শার্টটা টাক ইন করা কোমরের ভাঁজে। পরনের প্যান্টের রং পার্ল হোয়াইট।

নিকিতার গলার আওয়াজ শুনেই সে তাকালো তার দিকে। বড্ড নির্লিপ্ত দৃষ্টি। ঠিক সেই সময় পারমিতার সাথে একদফা চোখাচোখি হলো তার। সে তেমন গুরত্ব দিলো না। তুমুল অনাগ্রহের সাথেই চোখ সরিয়ে নিলো।

তবে পারমিতা চোখ সরাতে পারে নি। তার দৃষ্টি আটকে গিয়েছিল লোকটার এক ঝলক দেখেই। ব্রিথটেকিং এপিয়ারেন্স! পারমিতা মুগ্ধ হলো। তড়িৎগতিতে ছুটতে লাগলো হৃদপিণ্ড। নিনীত ভেজা চুলে একবার হাত বুলিয়েই একে একে সিঁড়ির ধাপ পার করে নিচে নামতে লাগলো। নিকিতাও টসটসে চোখে প্রবল ভালোবাসা নিয়ে তাকিয়ে ছিলো তার পাপাইয়ের দিকে। পাপাই কি কোনো প্রিন্স? ঐ যে, সিমডেনা গল্পের ঐ প্রিন্সটা?

পারমিতা মৃদু হাসলো। বিস্ময়াভিভূত চোখ জোড়া তার উপর রেখেই বিড়বিড় করে বলল," মাই গড! হি ইজ ড্যাম হট।"

চলবে-

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 8 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন