#আম_পাতা_জোড়া_জোড়া -০৯
লেখনীতে #মেহরিমা_আফরিন
নিনীত প্রথমে ভেবেছিল সে পুরোটা সন্ধ্যা ঘুমিয়েই কাটাবে। তারপর আবার কি ভেবে যেন উঠে গিয়ে গোসল সারলো, পরিপাটি হয়ে নিচে নামলো।
তাকে দেখার পরেই নিকিতা গলা ফাটিয়ে এক চিৎকার দিয়েছে। নিনীত জানতো এমনটাই হবে। ঐ বাচ্চা মেয়েটা কি এমন আনন্দ পায় তাকে ভালোবেসে, সে জানে না। বাচ্চারা মনস্তত্ব বোঝে না। তাদের কে যারা আদর দেয়, তারাও বিনিময়ে তাদের আদর দেয়। আর যারা তাদের অবহেলা করে, তাদের ওরা এড়িয়ে যায়, অপছন্দ করে। কিন্তু নিনীত এতো বেশি অপছন্দ করা স্বত্তেও নিকিতা তাকে ভালোবাসা বন্ধ করছে না। তিন বছরের একটা শিশুর মনস্তত্ব এতো পরিপক্ব হবে কেন?
সে নিচে নেমে কয়েকজনের সাথে কুশল বিনিময় করলো। এর মাঝে আড়চোখে যতো জোড়া চোখ তাকে আদ্যোপান্ত পরোখ করলো, তাদের সে সম্পূর্ণ এড়িয়ে গেল।
গলা শুকিয়ে আসছিলো। আয়তাকার কাঠের টেবিলের সামনে গিয়ে একটা শরবতের গ্লাস হাতে তুলতেই কে যেন দৌড়ে এলো তার কাছে। এসে তার পা জড়িয়ে ধরলো। হাঁটুর কাছে ছোট ছোট দু'টো হাতের অস্তিত্ব টের পেল নিনীত। নরম নরম দু'টো হাত শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছে তার পা। তুলতুলে মাথা ঠেকিয়েছে হাঁটুর পেছনের অংশে। হাতের চা আরেকটু গাঢ় করতেই তার গাল এসে চাপ খেল নিনীতের পায়ের সাথে। নিনীত তখনই তাকে চিনে ফেললো।
নিকিতা আনন্দে ফেটে পড়ে ডাকলো," পাপাই!"
নিনীত পেছন ঘুরলো। দেখলো চকচকে দুই চোখে নিকিতা তাকিয়ে আছে তার দিকে। নিকিতা মুগ্ধতা গোপন করতে পারে না। বাবাকে হঠাৎ এমন সাজানো গোছানো অবয়বে দেখে সে অভ্যস্ত না। আজ যখন দেখলো, তখন বিস্ময় আর আনন্দে তার দুই চোখ হাসতে লাগলো।
নিনীত পেছন ঘুরে মাথা নামিয়ে তাকালো তার দিকে।।কপাল কুঁচকে ভ্রু বাঁকিয়ে ইশারায় জানতে চাইলো,কি হয়েছে?
নিকিতা সাথে সাথে দুই হাত তুললো। উৎসাহী গলায় বলল,"কুনে নাউ। কুনে ওততে চাই।"
নিনীত চোখ বাঁকালো। অতি বিরক্ত মেজাজে একবার আশে পাশে তাকালো। পুরো বাড়ি মেহমানে ভরে আছে। জেবা তাকে অনুরোধ করেছেন, সে যেন কোনো তামাশা না করে।
নিনীত মায়ের কথা রাখলো। কোনো রকম তামাশা না করেই সে হালকা ঝুঁকে নিকিতাকে কোলে নিলো। নিকিতা বাবার কোলে উঠেই আত্মহারা হলো খুশিতে। খিলখিলিয়ে হেসে বাবার চওড়া বুকে কতোক্ষণ মুখ ঘঁষলো। দু'হাত নেড়ে নিনীতের ক্লিন সেভ মসৃণ গালে হাত রেখে বলল,"তুনি ততো সুন্দল। পাপাই! নিকিল পাপাই। তুনি কি পিমস? সিমডেলার পিমস?"
নিনীত শক্ত মুখে বলল,"না, আমি কোনো প্রিন্স না। আমি ডেমোন।"
"ডেনম?"
"ডেমোন। মানে দৈত্য। রাক্ষস। বাচ্চা মানুষ দেখলেই ঘাড়ে কামড় দেই।"
নিকিতা চোখ বড় বড় করে তাকালো তার দিকে। একটু অভিনয়ও করলো ভয় পাওয়ার।
"সুত্যি?"
"একদম। কামড় দিয়ে দেখাবো তোমাকে?"
"না। ভই কচ্চে।"
"তাহলে কোল থেকে নামো। গেট আউট।"
নিকিতা খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো। কোল থেকে নামলো না। উল্টো আরো শক্ত করে বাবার কাঁধ জড়িয়ে ধরলো।
"পাপাই! তুনি একতা দুত্তু পাপাই।"
"হুম। আমি অনেক দুষ্টু। তবুও তো মুক্তি পাচ্ছি না এসব জঞ্জাল থেকে।"
নিকিতা বাবার বুকে মাথা রাখলে। প্রশান্তিতে একটা শ্বাস ছাড়লো। নিনীত তাকে কোলে নিয়ে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে। নিকিতা বলল,"আমাতে এততু জুছ দিবে?"
নিনীত হাতের গ্লাসটা তার দিকে বাড়িয়ে দিলো। সে চুক চুক করে কয়েক চুমুক দিয়ে আরেকদফা মুগ্ধ হয়ে বাবার দিকে তাকালো। এরপর ঝাপিয়ে পড়ে অনেক গুলো চুমু খেল তার গালে।
"পাপাই! তুনি তাননা কচচো?"
"না, আমি কান্না করছি না। তুমি বেশি বেশি প্রশ্ন করছো।"
"তুমান চুক লান।"
নিনীত কপাল কুঁচকে বলল,"আমি গোসল করেছি, তাই আমার চোখ লাল।"
"আনি গুছল কললে তি আমান চুক লান হয়?"
"আমি জানি না তোমার চোখ লাল হয় নাকি। তুমি কি কথা বন্ধ করবে নিকিতা?"
"বপ?"
"হ্যাঁ, বপ। ফর গড সেক।"
নিকিতা সাথে সাথে ঠোঁটে আঙুল চাপলো। বাধ্য মেয়ের মতো মাথা রাখলো বাবার বুকে। নিনীত চোখ নামিয়ে তাকালো তার উস্কখুস্ক চুলের দিকে। নিবেদিতার চুল মসৃণ। একেবারে ঝলমলে। নিকিতার চুল আবার ম্যাগি নুডুলস। নিনীত ভ্রুকুটি করে বলল,"লাফিয়ে লাফিয়ে নিচে নেমেছো। মাথাটা একটু আঁচড়ে নামবে না?"
"মাতায় তি হইসে?"
"মাথা নুডুলসের বাটির মতো লাগছে।"
নিনীত তাকালো। দম ছাড়লো একটা। তারপর কাঁপা কাঁপা হাত তুলে নিকিতার মাথায় হাত রাখলো, বিন্যস্ত করলো তার এলোমেলো চুল। নিকিতার বিড়ালের মতো মিশে গেল তার সাথে। দু'চোখ বুজে ঘুম ঘুম গলায় বলল,"আনাম! ততো আনাম!"
দূর থেকে দাঁড়িয়ে পারমিতা দেখলো তাদের। তার দুই চোখে অনুভূতি এসে ভিড় করছিলো। চারপাশের সবকিছুকে তার যাদুর মতো মনে হচ্ছিল। একটা রূপকথার জগত। সেই জগতের প্রিন্স দাঁড়িয়ে আছে পারুর চোখের সামনে। প্রিন্সের একটা রসগোল্লার মতো মেয়ে আছে। যাকে প্রিন্স ভালোবাসে। ইশশ! কি সুন্দর!
তবে রাজপুত্রের যে আরেকটা মেয়েও ছিলো, সেটা সে জেনেছিল আরো কিছু সময় বাদে। চলুন সেই বর্ণনা টুকু আমরা পারমিতা ইবনাতের ডায়েরি থেকে পড়ে আসি।
*
আজ আমি আবার গিয়েছিলাম পূর্বাহ্ণ নামের সেই চোখ জুড়ানো বাড়িটিতে। বাড়িটা খুব সুন্দর। সাবেকি আমলের ছাপ আছে। সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে গেলেই পুরাতন গ্রামোফোনটা চোখে পড়ে। আসবাব পত্রগুলোও অনেক পুরাতন, বহু বছর আগের। বাড়ির ভেতরে একটা আভিজাত্য আছে। বংশপরম্পরায় ধনাঢ্য পরিবারগুলো সচরাচর এমনই হয়।
ঐ বাড়িতে আমি গিয়েছিলাম নিকিতা নামের একটি কন্যা শিশুর সাথে দেখা করতে। নিকিতা আমার কোলে উঠেছে, আমার বুকে মাথা রেখেছে। আমার মতো অধমের ভেতরে সে আরেকবার মা হওয়ার অনুভূতি জাগিয়েছে।
নিকিতার মা নেই। এই কথা জানার পর আমার বুকটা খুব ফাঁকা ফাঁকা লাগলো। জটিল মস্তিষ্ক নানারকম কল্পনায় বিভোর হচ্ছিল। নিকিতার জীবনে যেই শূন্যস্থান আছে, সেটা কি কোনো উপায়ে আমি পূরণ করতে পারি?
এরপর এলো সেই ম্যাজিকাল মোমেন্ট, যখন নিকিতার সুপার হ্যান্ডসাম পাপাইয়ের সাথে আমার দেখা হলো। নট গন্না লাই, হি ইজ আউট অফ দি বক্স। জাস্ট আউটস্ট্যান্ডিং। ভদ্রলোক ভীষণ চুজি। এতো চমৎকার কালার কম্বিনেশনের আউটফিট চ্যুজ করেছিলেন, যে আমি স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে ছিলাম তার দিকে। মেডিকেল সাইন্সের তত্ত্ব অনুযায়ী, পুরুষ মানুষদের সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় দেখায় ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশ বছরের সময়টাতে। আমার ধারণা নিনীত নামের ভদ্রলোক ঐ রেঞ্জের কোনো বয়সের মধ্যেই পড়েন। তাকে চমৎকার দেখাচ্ছিল। আমি টিনএজার নই। সাহিত্যিকও নই। শব্দের ইন্দ্রজালে আমি কারো রূপের বর্ণনা করতে পারি না। শুধু জেনে রাখবেন, নিনীত সাহেব খুবই চমৎকার ছিলেন দেখতে। তার চোখ দু'টো তীক্ষ্ণ, আচরণ গম্ভীর, উচ্চতা চোখে লাগার মতো, গায়ের রং উজ্জ্বল এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তিনি একজন বাবা। যে খুব যত্নে তার মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন।
রাতে খাওয়া শেষে আরেকটা চমক পেলাম। নিকিতা ওর বাবার একমাত্র সন্তান না। তার একটা বড় বোন আছে। নিবেদিতা নামের। ও চুপচাপ একটা পুতুলের মতো সোফার এক কোণায় বসেছিল। মিসেস মেহরোজ পরিচয় না করালে তাকে আমি খেয়ালই করতাম না ভালো মতো।
নিবেদিতা এতো সুন্দর! তার বয়স মাত্র দশ। সাধারণত বারো তেরো বছরের আগ পর্যন্ত মেয়েদের সৌন্দর্য তেমন বোঝা যায় না। কিন্তু নিবেদিতার ফেসিয়াল ফিচারস এতো বেশি শার্প যে তাকে এক ঝলক দেখেই আমি বুঝলাম, সে যখন বড় হয়ে পরিণত নারীর বয়সে পৌঁছাবে, তখন তাকে দেখাবে ভয়ানক সুন্দরী। ভয়ানক সুন্দরীদের জীবন তাদের রূপের মতোই ভয়ানক হয়। আমার মার হয়েছিল, আমারও হয়েছে। নিবেদিতার হবে নাকি জানি না। তবে আমি খাস দিলে আল্লাহর কাছে চাইবো, নিবেদিতা যেন সুখী হয় জীবনে।
ওহহ হ্যাঁ, নিবেদিতারও একটা দুঃখ ছিলো। সে চোখে দেখতে পেত না। পৃথিবীর রং রূপ হয়তো সে নিজের চোখে, নিজের মতো করে সাজাতো। যখন মানুষের পাঁচটি ইন্দ্রিয়ের একটি ইন্দ্রিয় অচল হয়, তখন তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সক্রিয় হতে থাকে। নিবেদিতারও বোধহয় অমন অলৌকিক কোনো ক্ষমতা আছে। যদিও সেটা জানার সুযোগ আমার হয়নি এখনও। কারণ সে খুব শান্ত স্বভাবের মেয়ে। আমি তার পারসোনাল স্পেস নষ্ট করতে চাই নি।
নিকিতা আর নিবেদিতা স্বভাবে একেবারে উল্টো। একজন হলো ডানা মেলে উড়ে চলা প্রজাপতির মতো। আর অন্যজন বরফ গলা নদীর মতো। তবে...আমার কিন্তু এই দুইজনকেই মনে ধরেছে খুব।
আমি বহুকাল ধরে লাইফ পার্টনার হিসেবে একজন সিঙ্গেল ফাদার পুরুষকে কামনা করে এসেছি। আজ পূর্বাহ্ণ নামের ঐ বাড়িটা আমাকে এমনই একজন পুরুষের সাথে পরিচয় করিয়েছে। কোনো সংকোচ কিংবা দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছাড়াই বলছি, নিনীত সাহেবকে আমার পছন্দ হয়েছে। কুমুর জন্য সুসংবাদ। আমি....আমি বোধহয় খুব শীগগির বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে যাচ্ছি, যদি নিনীত সাহেব আমায় সুনজরে আনেন, যদি নিনীত সাহেবের মর্জি হয়।
____
ইয়াজিদ চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুজে শুয়েছিল। বাইরে বেশ গরম। কমলা সূর্য ঝিকমিক করছে মাথার উপর। তার উপর আজ সকাল থেকে এসি কাজ করছে না। শুধু ফ্যান ঘুরছে সিলিংয়ের সাথে ঝুলে। গরমে ইয়াজিদের হাঁসফাঁস লাগতে লাগলো।
ভেতরে বাচ্চারা গান গাইছে। তাদের গানের টিচার তপন এসে সুর তাল শেখাচ্ছে তাদের।
তপন সুরেলা কণ্ঠে বলছে," সা!"
বাচ্চারা ততোটাই বেসুরো কণ্ঠে তাল মেলাচ্ছে,"সাআআ।"
"রে।"
"রেএএএ।"
"গা।"
"গাআআ।"
ইয়াজিদ কানের উপর হাত চেপে ঠোঁট বিড়বিড় করে দু'টো গালি দিলো।
একে তো গরম। তার উপরে এতো বিচ্ছিরি সংগীত তর্জমা। আর কোনো উপায় না পেয়ে সে চেয়ার থেকে উঠে বাইরে বেরিয়ে গেল।
দুপুর শেষ হয়ে বিকেল হয়ে যাচ্ছে। তবুও রোদের উত্তাপ কমে নি। ঠিক এই মুহূর্তে কি করা যায়, ইয়াজিদ ভেবে পেল না। চাইলে বাইক নিয়ে নদীর পার থেকে ঘুরে আসা যায়। কিন্তু যা গরম! ঘেমে অবস্থা খারাপ হয়ে যাবে।
এক কাপ চা খাওয়া যায়। চায়ের যাদুকরী গুণ আছে। গরমের দিনে খেলে শরীর ঠান্ডা হয়, শীতের দিনে খেলে শরীর গরম হয়। ইয়াজিদ এক কাপ চা খেল। তারপর কিছুক্ষণ সামনের ফাঁকা রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করলো। তারপর গিয়ে রাস্তার মোড় থেকে একটু দূরে একটা নিরিবিলি জায়গায় গিয়ে সিগারেট ধরালো। সিগারেট শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ পরে মূল রাস্তায় তাকিয়ে তার দুই চোখ স্থির হলো।
মোড়ে একটা সাদা রঙের গাড়ি এসে থেমেছে। কোনো ক্যাব হবে। সেখান থেকে একটা অল্প পরিচিত মুখের তরুণী বাইরে বেরিয়ে এলো। ইয়াজিদ এক দেখাতেই তাকে চিনে ফেলল। তার নাম পারমিতা। নামের সাথে আবার পেশাগত পদবীও আছে। ডাক্তার পারমিতা ইবনাত। কিছুদিন আগেই মেহরোজের পাঁচ ফলের অনুষ্ঠানে এসেছিল। আজ আবার কি কাজে এলেন, বোঝা যাচ্ছে না।
ইয়াজিদ তাকে দেখেও না দেখার ভান করলো। মহিলা মানুষ, আজাইরা কাপঝাপ। তবে ভদ্রমহিলার চোখ এড়ায়নি। তিনি গাড়ি থেকে নেমে পেছনে ফিরেই তাকে দেখলেন। দেখতেই চওড়া করে হাসলেন। হাত তুলে বেশ প্রাণবন্ত স্বরে বললেন," আরে! আপনি ইয়াজিদ ভাই না?"
পারমিতা চপল পায়ে এগিয়ে এলো। ইয়াজিদ ভ্রুকুটি করে তার দিকে তাকালো। রোদের আলো পারমিতার কোমল মুখে ঠিকরে পড়ছে। তাকে অন্যরকম লাগছে। কিন্তু ইয়াজিদ কপাল কোঁচকানো বন্ধ করতে পারলো না। এতো সাদা! ইসসস!
সে ছোট একটা শ্বাস ছাড়লো। ধীর কণ্ঠে বলল,"জি। আমিই ইয়াজিদ। তবে ভাই নাকি আঙ্কেল সেটা বুঝতে পারছি না। মণি যদি আপনার আন্টি হয়, তাহলে আমি আঙ্কেল।"
পারমিতা খিলখিলিয়ে হাসলো। ইয়াজিদ অবাক হয়ে বলল,"হাসছেন কেন?"
"আপনার কথা শুনে হাসলাম। আপনি তো খুব মজার মানুষ ইয়াজিদ ভাই।"
"জি, কিছুটা। আপনি বলুন, এখানে কি কাজ?"
"আমি আপনাদের বাড়িতেই যাচ্ছি।"
"তাই নাকি? ভালো তো।"
"নিকিতা কোথায়? ও আছে তো বাড়িতে?"
"থাকার তো কথা। তবে ভুল সময়ে এসেছেন। নিকি ঘুমায় এই সময়ে। তবুও যান। গিয়ে অপেক্ষা করুন। সন্ধ্যার আগে উঠে যাবে।"
পারমিতা মাথা নাড়লো। তাকে বেশ ফুরফরা দেখাচ্ছে। ইয়াজিদ কথা শেষ করার পরেও সে সামনে থেকে সরলো না। কি করবে বুঝতে না পেরে ইয়াজিদ কিছুক্ষণ মাথা চুলকালো। মহিলা কি আশা করছেন ইয়াজিদ তাকে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিবে? হেহ, উনি তাইলে ইয়াজিদরে চিনে নাই এখনো। ওসব সাদা চামড়ার সুন্দরী মেয়ে দেখলে আহিল গলতে পারে, ইয়াজিদ না।
"আমাকে কেমন লাগছে?"
মেয়েটা আচামকা প্রশ্ন করলো তাকে। ইয়াজিদ থতমত খেয়ে গেল। সোজা দাঁড়িয়ে বোকার মতো বলল,"জি?"
পারমিতা দুই কদম পেছালো। হাত দু'টো একসাথে করে দাঁড়িয়ে স্মিত হেসে তাকালো ইয়াজিদের দিকে। বলল,"আমি আজ আপনার মণির সাথে দেখা করতে যাবো। আমার এপিয়ারেন্স আজকের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বলুন আমায় কেমন লাগছে? ভদ্র? মার্জিত? শালীন?"
ইয়াজিদ সরল চোখে দেখলো তাকে।
"ভালোই লাগছে। মণির কাছে এতো সেজেগুজে যাচ্ছেন কেন? কোনো বিশেষ দরকার?"
"হু।" পারমিতা ঠোঁট চেপে হাসলো।
ইয়াজিদ কপালে ভাঁজ ফেলে বলল," বিয়ে শাদির কেস?"
"আরে! আপনি তো ভীষণ মেধাবী ইয়াজিদ ভাই।"
"তা একটু আছি।"
"এবার বলুন, আমাকে মা মা লাগছে তো?"
"হ। ঐটাও কিছুটা লাগছে।"
ইয়াজিদ চোখ দু'টো সরু করে সামান্য ঝুঁকে এসে বলল," আপনি মণির সাথে নিনীতের ব্যাপারে কথা বলতে চান?"
পারমিতা গাঢ় হেসে মাথা নাড়লো,"একদম।"
"আপনার রুচিরে লাল সালাম।"
"কি বললেন আপনি?"
ইয়াজিদ কাঁধ ঝাঁকালো।
"কে? আমি? কই কিছু বলি নাই তো।"
"আমার উনাকে খুব পছন্দ হয়েছে। উনার মেয়ে দু'টোকে আরো বেশি। ভদ্রলোক যেমন করে নিকিতার চুলগুলো ঠিক করে দিলেন মাথায় হাত বুলিয়ে। খুব আদর করেন, তাই না?"
ইয়াজিদ বিষম খেল। কাশি আটকে এক পলক তাকালো ভদ্রমহিলার দিকে। আদর করে! বলে কি এই মহিলা? আবার বলছে ভদ্রলোক। নিনীত কোন দিক দিয়ে ভদ্রলোক? মহিলার চোখে সমস্যা।
ইয়াজিদ আগ বাড়িয়ে কিছু বলল না। মণির সাথে যেহেতু কথা বলতে এসেছে, মণিই সামলাক তাকে।
"জি। ও খুব ভদ্রলোক। আপনি গিয়ে মণির সাথে কথা বলুন। মণি বাড়িতেই আছে।"
পারমিতা হাসলো। শাড়ির আঁচলটা ঠিক মতো কাঁধে তুলে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল বাড়ির দিকে। ইয়াজিদ কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে সিদ্ধান্ত নিলো, সেও আর সংশপ্তকে যাবে না আজ। সে যাবে বাড়িতে। মারাত্মক মশলাদার একটা ঘটনা ঘটবে মনে হচ্ছে। ভেরি ভেরি ইন্টারেস্টিং। আহিলকে ক্ষেপানো যাবে ইচ্ছে মতো। ইয়াজিদ আর দেরি করলো না। পারমিতার পিছু পিছু সেও বাড়ির পথ ধরলো।
____
প্যান্টের পকেটে হাত গুজে শিশ বাজাতে বাজাতে ইয়াজিদ করিডোর ধরে হাঁটছিলো। বাড়িতে ঢোকার পরে এসির হাওয়া গায়ে লাগতেই আরামে তার ঘুম এসে গেল। সে গুনগুনিয়ে পুরাতন দিনের একটা গান গাইছিল।
রাশেদা ঘর থেকে চেঁচিয়ে ডাকলেন তাকে,"ইয়াজিদ! এ্যাই ইয়াজিদ।"
ইয়াজিদ থামলো। যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, ঐখানে দাঁড়িয়েই ঘাড় উঁচু করে বলল,"কি হইসে?"
"তুই ঘরে আয়।"
"ঘরে আইলে কি টাকা দিবা?"
"না। লাথি দিমু ধইরা। আয়।"
ইয়াজিদ বিরক্ত মুখে ভেতরে ঢুকলো।
"কি কইবা তাড়াতাড়ি কও। আগেই বলি, পান টান আইন্না দিতে পারমু না। মাত্র ঘরে ঢুকছি।"
"পান আনতে হইতো না। আমার বড় পুতে কালকেই সব আইন্না রাখসে ঘরে।"
"ভালা তো। তাইলে বড় পুতরে ফালাইয়া আমারে ডাকো কেন?"
"তুই চুল কাটোস না কেন? কেমন বিশ্রি লাগে দেখতে!"
ইয়াজিদ চোখ কপালে তুলল। মাথার সামনের দিকের চুলগুলো মুঠ করে টেনে ধরে বলল,"এডা কিতা কইলা আম্মা। গত মাসেই চুল কাটসি। এট্টুক চুল আর কতো কাটমু?"
"এট্টুক চুল? তোরে কেমন লাগে দেখতে! পাগলের মতো চেহারা।"
"এজন্যই আসতে মন চায় না তোমার ঘরে।"
"আসিস না। তার আগে চুলটা কাইট্টা আয় যা।"
ইয়াজিদ মহা বিরক্ত হলো। ঠোঁট নেড়ে শব্দ করলো জোরে, "আম্মা! তুমি এতো জ্বালাও কেন আমারে? সারাক্ষণ আমারে নিয়াই পইড়া থাকো।"
রাশেদা রাগে গজ গজ করে বললেন,"জন্ম দিসি যে, এজন্য জ্বালাই। পেটে ধরসি, এজন্য সারাক্ষণ তোরে নিয়া পইড়া থাকি।"
"আচ্ছা হইসে। চেইত্তো না। কাটামু চুল। কালকেই কাটামু।"
রাশেদা ফোঁস ফোঁস শব্দ করে শ্বাস ফেললেন। ইয়াজিদ হেসে বলল,"আম্মা জানো, তোমার বড় নাতিনের কপাল খুলবো মনে হইতাসে। বাড়ির বাতাসে এখনই বিয়া বিয়া গন্ধ পাইতাছি।"
রাশেদা শান্ত হয়ে বললেন,"সবার কপাল খোলে। তোর কপালটা কবে খুলবো?"
ইয়াজিদ শব্দ করে হাসলো। ঝুঁকে এসে তর্জনী আঙুল দিয়ে নিজের কপাল দেখিয়ে বলল," আমার কপাল তো খোলাই। এই দেখো, কি পরিষ্কার! "
রাশেদা এক ছোঁ মেরে তার কান টেনে ধরলেন। মলে দিলেন আচ্ছা মতো। ইয়াজিদ হাসতে হাসতেই ব্যথাতুর স্বরে চেঁচালো,
"আরে আরে রাগ হও কেন? মজাই না করসি। আচ্ছা যাও। আমারও কপাল খুলবো। জলদিই খুলবো। এখন পাঁচশো টা টাকা দাও। চুল কাটামু। হাতে টাকা নাই।"
চলবে-
[আগামী দুই পর্বেই আশা করি গল্পের প্রথম বিয়ের আয়োজন হয়ে যাবে। আমি পরবর্তী পর্বেই দিতে চাইছিলাম, কিন্তু বড় হয়ে যাবে বিধায় পর্ব বাড়াতে হচ্ছে। ১১ তম পর্বে কিন্তু বিয়ে। মানে বিয়ে বিয়ে ভাব।ওকে?]