ফন্ট সাইজ:
থিম:
আম পাতা জোড়া জোড়া

পর্ব 13

লেখক: মেহরিমা আফরিন

#আম_পাতা_জোড়া_জোড়া-১৩
লেখনীতে #মেহরিমা_আফরিন

পারমিতা দরজা খুলে ভেতরে এলো। সন্ধ্যা নেমেছে। চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসছে। বৃষ্টি হয়েছে বলে আবহাওয়াও বেশ শান্ত। ঘুমে চোখ বুজে আসছিল পারমিতার।

নিকিতার মাত্র ঘুম ভেঙেছে। ও চোখ ডলতে ডলতে উঠে বসলো। ঠোঁট ফুলিয়ে ডাকলো," মাম্মা! মাম্মা! চুকে ব্যতা কয়ে।"

পারমিতা হাসলো। ভেতরে এসেই এক টানে কোলে নিলো তাকে। জড়িয়ে ধরলো তার ছোট ছোট দু'টো হাত।
"চোখে ব্যথা করে? দেখি তো আর কোথায় কোথায় ব্যথা আছে?"

নিকিতা চমকালো। আওয়াজটা মেহরোজের না। ভালো মতো চোখ খুলে সামনে তাকাতেই পারমিতার মুখটা নজরে এলো তার।
"তুনি?"

"হ্যাঁ, আমি। বলো তো আমি কে?"

নিকিতা বলহীন স্বরে ঘুমের ঘোরে ঢুলে ঢুলে বিড়বিড় করল," ম মা।"

"এইতো। ভেরি গুড। আমি হলাম নিকির মমা।"

"তুনি তেনো আসছো?"

"ওমা! আমি এসেছি, তুমি খুশি হওনি?"

নিকিতা আবার মুখ তুললো। ছোট ছোট হাতে পারমিতার গাল ধরে বলল," তুশি হইচি তো। কিলতু তুনি তো ঘুমাবি না আমান সাতে।"

"অবশ্যই ঘুমাবো। আজ থেকে রোজ আমি তোমাদের সাথে ঘুমাবো।"

"সুত্যি?"

"একদম।"

"তেনো?"

"কেনো আবার কি?"

"তুমান পাপাই তুমাকে পিত্তি দিবে না?"

"না, আমার পাপাই পিট্টি দিবে না আমাকে।"

"তেনো? আমান পাপাই আমাতে কুতাউ যেতি দেয় না।"

"তুমি তো ছুত্তু বাবু। তাই তোমাকে যেতে দেয় না।"

"তুনি বোনো বাবু?"

"হ্যাঁ।"

"উউউ আচচা।"

"বাবারে! কতো কথা বলো তুমি নিকি! টায়ার্ড লাগে না?"

"নাগে তো। এততু এততু টায়াম লাগে।"

নিবেদিতা জানালার পাশে পেতে রাখা একটা বেতের মোড়ায় চুপচাপ বসেছিল। পারমিতার আওয়াজ পেতেই দরজার দিকে ঘুরে বসলো। অবাক হয়ে বলল," পারমিতা আন্টি! আপনি এসেছেন?"

পারমিতা সামনে এগোলো, নিকিতাকে কোলে নিয়েই। গাঢ় হেসে বলল,"আন্টি না। মমা। আমি এখন থেকে তোমাদের অফিশিয়াল মা। বুঝতে পেরেছো?"

নিবেদিতা দুই দিকে মাথা নাড়লো। বোকার মতো বলল," আরেকটু বুঝিয়ে বলুন।"

নিকিতা কপালে হাত চাপলো।
"উফফুউ। নিবি কিচচু বুজে না।" সে আঙুল তাক করে পারমিতাকে দেখালো।
"উ আমান মমা। একন তেকে নিকুর সাতে তাকবে, নিকুকে ঘুম পাড়িয়ে দিবে।"

নিবেদিতা উত্তর দিলো না। চুপচাপ মাথা নাড়লো। চঞ্চলতা নিকির স্বভাব। সে লাগাতার কথা বলতে ভালোবাসে। নিকিতা আবার বলল," মমা! তুনি কি নিবিকেউ ঘুম পাড়াবে?"

"হ্যাঁ, পাড়াবো তো। আমি তুমি আর নিবি, আমরা তিনজনই একসাথে থাকবো।"

নিকিতা কপাল ঠেকালো পারমিতার বুকে। আধো স্বরে বলল,"মাম্মা কুতায় তাকবে?"

"মাম্মা থাকবে মাম্মার ঘরে। ইরোজের সাথে।"

"আন তুনি আমাদেম সাতে?"

"হ্যাঁ।"

"তুনি তেনো আমাদেম সাতে?"

"আহা নিকু! তুমি এতো প্রশ্ন করো!"

"পুশনো কববো না?"

"না, বপ।"

নিকিতা ঠোঁটে আঙুল চাপলো। বিড়বিড় করে বলল,"তুনিও বপ।"

পারমিতা ওকে কোলে নিয়ে নিবেদিতার কাছে গেল। একটা হাত নিবেদিতার কাঁধে রেখে মোলায়েম স্বরে বলল,"তুমি কেমন আছো নিবেদিতা?"

"আলহামদুলিল্লাহ ভালো। আপনি কেমন আছেন?"

"আমি ভালো আছি। তোমাকে একটা খবর জানাতে চাই। কিন্তু তুমি খুশি হবে নাকি মন খারাপ করবে, ঠিক বুঝতে পারছি না।"

নিকিতা বলল,"তেনো বুজতে পাচছো না?"

"আহা! তুমি চুপ। বপ বলেছি না?"

নিকিতা নাক কুঁচকালো। নিবেদিতা মৃদু হেসে বলল," বলুন না।"

"আমি তোমার বাবাকে বিয়ে করেছি।"

"সত্যিই!" চমকে নিবেদিতার দুই চোখ প্রসারিত হলো। নিকিতা মাথা তুলে বলল,"তুমি তি কয়েছো আমান পাপাইয়ের সাতে?"

"আমি তোমার পাপাইকে বিয়ে করেছি।"

"বিয়ে তেনো কয়ে?"

"তুমি আবার কথা বলছো? বলেছি না তুমি বপ? কথা বলছি আমি নিবেদিতার সাথে।"

নিকিতা নাক ফুলালো। মন খারাপ করে অভিমানে হাত সরিয়ে নিলো পারমিতার গাল থেকে। ঠোঁট উল্টে বলল,"তুনি পুচা হয়ি যাচচো।আন কতা বনবো না।"

"বলো না। দু'টো মিনিট চুপ থাকো।"

নিবেদিতা ছোট ছোট কদমে সামনে এগিয়ে বলল,"সত্যিই পাপাইকে বিয়ে করেছো তুমি?"

"হ্যাঁ। তুমি খুশি হয়েছো?"

"অনেক। তুমি কি এখন আমাদের সাথেই থাকবে?"

"হ্যাঁ। আমি তোমাদের সাথেই থাকবো।"

"তুমি গল্পও করবে আমাদের সাথে?"

"হ্যাঁ, করবো । সন্ধ্যায় রোগী দেখা শেষ করে বাড়ি ফিরে আমি অনেক গল্প করবো তোমাদের সাথে।"

"তুমি কি তাহলে আমাদের মা হয়ে যাবে?"

কৌতূহল আর আনন্দে নিবেদিতার দুই চোখ ভরে উঠলো। পারমিতা হাসলো তাকে দেখে। নিকিতা চট করে মাথা তুলে বলল," উ ও তো অনেত পুশনো কচচে। তুনি উকে তেনো বকা দিচচো না। পিত্তি দাও উকে।"

"না, ওকে পিট্টি দিবো না। ও আমার মেয়ে। "

নিবেদিতা আলতো করে হাত বাড়িয়ে পারমিতার হাতটা ধরলো। পারমিতা দেখলো, তার ছোট ছোট চোখে জল জমেছে। ইশশ! এতো সুন্দর মেয়েটা কখনো আয়নায় নিজেকে দেখতে পারবে না। নিবেদিতা বলল,"আমি একটু তোমার হাত ধরি?"

"অবশ্যই। কেন না?" পারমিতা এক হাতে টেনে জড়িয়ে ধরলো তাকে।
"আমি চাই জীবনভর তুমি এমন করেই আমার হাত ধরে রাখো। "

___

রাত দু'টো বিশ। বাচ্চা দু'টো গুটিশুটি মেরে ঘুমিয়ে আছে বিছানায়। ওরা ক্লান্ত। একটা পর্যন্ত পারমিতার সাথে গল্প করে তারপর চোখ টানতে টানতে ঘুমিয়ে পড়েছে।

নিকি ঘুমিয়েছে মন খারাপ করে। কারণ সে তার সব কথা শেষ করতে পারেনি। আরো অনেক কথা, অনেক গল্প জমে আছে। পারমিতা ওর গালে শত শত চুমু খেয়ে বলেছে, ও এখন থেকে সারাজীবন তাদের সাথে থাকবে। নিকিতার গল্পগুলো আর হারিয়ে যাবে না। মমা রোজ ক্লিনিক থেকে ফিরে তার গল্প শুনবে।

বাচ্চারা ঘুমানোর পরেও পারমিতার ঘুম এলো না। অনেকটা সময় এপাশ ওপাশ করে শেষে গিয়ে সে উঠে বসলো।

ঘড়ির কাঁটা চলছে। খুব মৃদু আলোর ডিম লাইট জ্বলছে। বাম পাশে চওড়া বারান্দা, থাই গ্লাস দিয়ে ঘর থেকে আলাদা করা। ঘর নীরব। চারপাশে কোনো সাড়াশব্দ নেই।
পারমিতা খাটের সাথে হেলান দিয়ে বসে সিলিংয়ের দিকে তাকালো, তারপর তাকালো ঘরের হালকা সাদা রঙটার দিকে।

আপনা আপনি একটা হাত পেটের কাছে গিয়ে থামলো তার। পারমিতা ঘন ঘন নিঃশ্বাস ছেড়ে শান্ত হয়ে বসে রইলো অনেকটা সময়। পেটের উপর নিশ্চল হয়ে পড়ে থাকা তার হাতটা এখন অল্প অল্প কাঁপছে। পারমিতার দুই চোখ ভিজে উঠলো হঠাৎ।

পাশ থেকে মুঠোফোন টা হাতে নিয়ে সে একটা নম্বরে ফোন করলো। প্রথমবারে কেউ কলটা ধরলো না। দ্বিতীয় বারে গিয়ে রিসিভ হলো। অন্য পাশ থেকে কোলাহলের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। এসব ডিঙিয়েই একটা কোমল তবে ব্যস্ত কণ্ঠ কানে এলো পারমিতার। বেশ তাড়াহুড়ায় বলল,"মিতা! কেমন আছো তুমি মা? হাউ আর ইউ?"

পারমিতা তপ্তশ্বাস ছাড়লো। ধিমি স্বরে বলল,"ভালো, তুমি কেমন আছো?"

"আমিও ভালো। তুমি কোথায়? অ্যাপার্টমেন্টে?"

"না। আচ্ছা বাবা শোনো, তুমি কি বাড়িতে আছো? আমার খুব বাড়ি যেতে ইচ্ছে হচ্ছে। তোমাকে একটু দেখতে ইচ্ছে করছে।"

ওপাশ থেকে তাৎক্ষণিক জবাব এলো না। একটু পরে ভদ্রলোক ইতস্তত করে বললেন," না,মা। আমি তো বাড়িতে নেই।"

"কোথায় তুমি?"

"সিঙ্গাপুর।"

"ওহহ।" পারমিতা ছোট করে শ্বাস ফেললো।
অপরপ্রান্তের ভদ্রলোক প্রায় সাথে সাথেই বললেন,"তুমি আসবে নাকি? দেখা করতে চাও বাবার সাথে? টিকিট কাটাই ফ্লাইটের?"

"না বাবা। তার কোনো প্রয়োজন নেই।"

"তুমি কি আমার সাথে রাগ করলে?"

"না বাবা। আমি কারো সাথে রাগ হই না।"

"মা, আই অ্যাম স্যরি।"

"নো, ইউ শ্যুড নট,বাবা। তোমার কোনো দোষ নেই। ব্যস্ততা আছে তোমারও।"

"তোমার সাথে অনেকদিন দেখা হয় না।"

পারমিতা ফিচেল হাসলো।
"আমি বেঁচে আছি, টিকে আছি। এইটুকু খবর তো জানোই। আর দেখা করে কি হবে বলো? এর বেশি আর কিইবা জানার আছে তোমার?"

"তুমি এখনো আমার সাথে রাগ।"

"না, আমি রাগ দুঃখ সব কবর দিয়ে ফেলেছি। তুমি দেশে আসবে কবে?"

"নেক্সট মান্থ আই গেস।"

"আমি খুব বড় একটা কাজ করে ফেলেছি।"

"কি?"

"আমি বিয়ে করেছি।'

"হেয়াট!" ভদ্রলোক বেশ চমকে গেলেন। আশ্চর্য হয়ে বললেন,"সত্যি?"

"হ্যাঁ।"

"ওয়াও কনগ্র্যাচুলেশনস মাই ড'টার। জামাই কোথায়? দাও, অভিনন্দন জানাই।"

"সে আপাতত কাছে নেই। সকালে জানিয়ে দেবো অভিনন্দন।"

"ওকে। দ্যাটস গ্রেট। আই অ্যাম সো হ্যাপি ফর ইউ।"

"সবসময় ইংরেজি ঝাড়বে না বাবা। বিরক্ত লাগে। আমি তোমার ক্লায়েন্ট না। মেয়ে হই তোমার।'

ভদ্রলোক হো হো করে হেসে উঠলেন।
"ওকে ফাইন। আর ইংরেজি ঝাড়বো না।"

পারমিতা জেদ ধরে বলল,
"ওকে ফাইন না। বলো, আচ্ছা ঠিক আছে।"

"আচ্ছা, ঠিক আছে।"

"বাবা, তুমি জানতে চাইলে না কেন আমার হাসবেন্ড কি করে?"

"দ্যাটস ইউর পারসোনাল চয়েজ মা। তোমার সিদ্ধান্ত তুমি নিজেই নিতে পারো। তোমার হাসবেন্ডের প্রফেশন নিয়ে আমার কোনো হেডেক নেই। ইউ আর গ্রোউন এডাল্ট।"

"আবার ইংরেজি ঝাড়ছো। যাই হোক, বাবারা এমন হয় না। বাবারা বাচ্চাদের নিয়ে অনেক দুশ্চিন্তায় থাকে।"

"তাই নাকি?"

"হ্যাঁ। তুমি কেন জানতে চাইলে না ছেলেটা কেমন? কিভাবে তার সাথে আমার পরিচয় হলো?"

"আমি কেন জানতে চাইবো? ইউর লাইফ, ইউর ডিসিশন।"

"কিন্তু আমি তো আমার জীবনকে শুধুমাত্র আমার জীবন ভাবতে চাই না বাবা। আমি চাই তুমিও মাথা ঘামাও, একটু সময় দাও আমাকে।"

ভদ্রলোক দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। তার চারপাশের কোলাহল আরো বাড়ছে। কে যেন নাম ধরে ডাকছে তাকে।
"হেই শাফিই। হোয়াট আর ইয়ু ডুয়িন? কাম হিয়ার।"
একসেন্ট টা বাংলাদেশি না। পারমিতা ফোনের অপরপ্রান্ত থেকেই বুঝলো। শফি সাহেব কাচুমাচু হয়ে বললেন," আমায় ডাকছে।"

"ডাকুক। তুমি এখন আমার সাথে কথা বলবে। আমার ভালো লাগছে না।"

"মা, আমার ব্যস্ততা বোঝো।"

"বাবা, তুমি আমার দুঃখ বোঝো। আমার কেউ নেই বাবা। তুমি বোঝো একটু আমাকে।"

"আমি কাল ফোন দেই?"

"তুমি আর কাল ফোন দিবে না জানি। তুমি কখনো আর কলব্যাক করো না বাবা।"

"কাল দিবো প্রমিজ। তোমার কিছু লাগবে? টাকা পাঠাবো? বাবা টাকা পাঠিয়েছিলাম গত মাসে। রফিক বলল, তুমি নাকি গত ছয় মাস ধরে এক টাকাও তুলো নি একাউন্ট থেকে?"

"আমার টাকার প্রয়োজন নেই। আমার তোমাকে প্রয়োজন।"

শফি সাহেব উত্তর দিতে পারলেন না। বিপাকে পড়ে এদিক সেদিক তাকালেন। মিটিং টা তার জন্য জরুরি। মিতা কে কেমন করে বোঝাবেন?
তিনি আর উপায় না পেয়ে ছোট করে বললেন,"রাখি মা। কাল ফোন দিবো।"

তিনি কল কাটলেন। পারমিতা আর কান থেকে ফোন নামালো না। ধূসর সাদা রঙের দেয়ালটা দেখতে দেখতে তার রাত পার হয়ে গেল।

_____

নাসির সাহেব রাতে মাথাব্যথার ঔষধ খেয়ে ঘুমিয়ে ছিলেন। এমনিতেই ঋতু পরিবর্তন হচ্ছে। চারদিকে সর্দি কাশির উপদ্রপ। এর মধ্যে জেবা জানালেন,নিনীত নাকি পারমিতা নামের ঐ ডাক্তারের সাথে বিয়ে করেছে।

নাসির সাহেব এখনো পারমিতার সাথে কথা বলেন নি। ভেবেছিলেন আজ সুযোগ করে বলবেন।
তিনি ঘুম থেকে উঠে হাত মুখ ধুয়ে সবার প্রথমে বাগানে গেলেন। সকালে উঠেই বাগানে হাঁটা তার রোজকার অভ্যাস। এই হাওয়াটা ভালো। শান্ত, নীরব পরিবেশে হাঁটলে শরীর চাঙা থাকে।

নাসির সাহেব দশ মিনিট টানা হাঁটলেন। তারপর একটা বেতের চেয়ারে বসলেন।
তার সামনে নানারকম ফুলের গাছ। নিবেদিতার ফুল খুব পছন্দ। ওর জন্য নাসির সাহেব বেছে বেছে সুগন্ধি ফুলের চারা আনেন। নিবি ফুল চিনে ঘ্রাণ দিয়ে।

"আমি আসি?"

চঞ্চল মেয়েলি কণ্ঠটা বাগানের সামনে এসে দাঁড়ালো। অল্প করে উঁকি দিলো ভেতরে। নাসির সাহেব অবাক হয়ে চোখ তুলে দেখলেন, পারমিতা দাঁড়িয়ে আছে সামনে। তার হাতে একটা কাঠের ট্রে। তার উপর দু'টো কাপ সাজানো। নাসির সাহেব চমকে গিয়ে বললেন,"তুমি?"

"হ্যাঁ। আপনার জন্য চা এনেছি। আসবো?"

"অবশ্যই। এসো এসো।"

পারমিতা খালি পায়ে বাগানের ঘাসে পা রাখলো।।নাসির সাহেব সেদিকে তাকিয়ে বললেন," আরে তুমি খালি পায়ে এলে! পা কেটে যাবে তো।"

"সমস্যা নেই। আমার ঘাসের উপর খালি পায়ে হাঁটতেই ভালো লাগে।"

পারমিতা আরেকটা বেতের চেয়ার টেনে আনলো। একটা কাপ এগিয়ে দিলো নাসির সাহেবের দিকে, অন্য কাপটা নিজের হাতে রাখলো।

নাসির সাহেব চায়ের কাপে এক চুমুক দিয়ে বলল," কাল রাতে তুমি নিবেদিতা আর নিকিতার সাথে ছিলে?"

"জি।"

"নিনীতের সাথে তোমার আর কথা হয়েছে?"

"না হয়নি।"

নাসির সাহেব চুপ হয়ে গেলেন। তার উদাস চোখ দু'টো দেখে পারমিতা হেসে উঠে বলল," আঙ্কেল আমার সাথে নিনীত সাহেবের আগেই সব বোঝাপড়া হয়েছে। আপনি ওসব নিয়ে ভাববেন না।"

"অদ্ভুত! তুমি বউ হয়ে এসেছো বাড়িতে। সম্পর্কের একটা ব্যাপার আছে, দায়িত্ববোধের ব্যাপার আছে। ভাববো না কেমন করে?"

"আমি সব জেনেই এসেছি।"

"তবুও। তুমি তো এখন আমার মেয়ে পারমিতা।"

পারমিতা চট করে চোখ তুলল। ভীষণ আশ্চর্য হয়ে বলল,"কি বললেন আপনি?"

"কি বললাম?"

"আমি আপনার মেয়ে?"

"অবশ্যই। সম্পর্ক তো এমনটাই বলে।"
নাসির সাহেব ছোট করে শ্বাস ছাড়লেন,"আমার কোনো কন্যা সন্তান নেই। আমার পুত্রবধূরাই আমার কাছে সন্তানতূল্য। তুমিও তো মেহরোজের মতোই। তাই না?"

"জি।"

নাসির সাহেব গাঢ় স্বরে থেমে থেমে বললেন," পুত্রবধূ মারা গেলে ছেলের বাবা মা তার জন্য নতুন বউ খুঁজতে মরিয়া হয়ে উঠে। কিন্তু আমি আর জেবা কোনোদিন নিনীতের জন্য পাত্রী খুঁজি নি। আমাদের মনে হয়েছে সে সংসার করার যোগ্য না। এখনো তাকে আমাদের তেমনই মনে হয়। নিনীতের ব্যাপারে তুমি সবই জানো আশা করি। জেবা তোমায় সব বলেছে। আর নতুন করে বলছি না।"

"জি, আমি জানি।"

"তবুও কেন এমন বোকামি করলে? সংসার কি কোনো ছেলেখেলা? তোমার প্রথম সংসার এটাই। এমন একটা মানুষের সাথে কেউ নিজেকে জড়ায়? এতোটুকু বুদ্ধি তো তোমার থেকে আশা করাই যায়।"

পারমিতা ঠোঁট নেড়ে বিড়বিড় করল,"আমার উনাকে ভালো লেগেছে। উনার মধ্যে একটা অমায়িক ভাব আছে।"

নাসির সাহেব শুনতে পেলেন না তার কথা। তার চোখ দু'টোতে হতাশা আর মায়া একসাথে মিশে আছে।
তিনি একটা হাত পারমিতার মাথায় তুলে রাখলেন। তারপর ভীষণ কোমল স্বরে ভরসা দিলেন তাকে," থাক, যা হওয়ার হয়েছে। এখন তো তুমি আমাদের বাড়ির মানুষ। তোমার যেকোনো সমস্যা আমাদের বলবে, আমাকে বলবে। আমি তোমার বাবার মতো। প্রয়োজন পড়লে তুমি আমাকে বলো। তবুও ইতস্তত করো না। দোয়া করি তোমার জন্য।"

পারমিতা কিছু সময়ের জন্য থমকালো। তার মাথায় এখনো নাসির সাহেবের মাঝবয়সী, বয়সের ভারে কুঁচকে যাওয়া হাতটা রাখা। পারমিতা হাত তুলে ধরলো তাকে। তার হাতটা আরো শক্ত করে মাথায় চেপে বলল," আমি কি আজকে থেকে আপনাকে বাবা ডাকতে পারি?"

"অবশ্যই। আমি তো তোমার বাবাই মা।"

পারমিতা মাথা নামালো। নাসির সাহেব অবাক হয়ে দেখলেন, তার দুই চোখ থেকে টপ টপ করে পানি ঝরছে। নাসির সাহেব আলতো করে আবার হাত ছোঁয়ালেন মেয়েটার মাথায়। তিনি কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে পড়েছেন। পারমিতা কান্না গিলে বলল,"আমি আপনার মেয়ে?"

"অবশ্যই।"

"আর আপনি আমার বাবা।"

নাসির সাহেব স্তব্ধ হয়ে বসলেন। পারমিতার দুই চোখ, নরম গাল, সরু চিবুক তখনও ভাসছিলো নোনাজলে।

____

সকালের কমলা আলো চোখে পড়তেই নিনীত কপাল কুঁচকালো, সংকুচিত করলো চোখের পাতা। তার ঘরে ভারি পর্দা টাঙানো, পর্দা ভেদ করে আলো আসা সম্ভব না। তবুও এমন রোদের তেজ চোখে লাগছে কেন?

ঘরটাও কেমন গরম মনে হচ্ছে। তার ঘর সবসময় নীরব থাকে, কোনো সাড়াশব্দ হয় না। তবে নিনীত চোখ বুজেই আজ শব্দ পেল। কোনো এক যন্ত্র চলার শব্দ হচ্ছে, সোঁ সোঁ বাতাসের শব্দ। পাখির কিচির কিচির ডাকও শোনা যাচ্ছে। সে অনেকদিন পর ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে পাখির ডাক শুনছে। তার কাছে ঘুমটাকেই স্বপ্ন মনে হচ্ছে।

নিনীত পাশ ফিরলো। একটা হাত তুলে চোখের উপর রাখলো। তবুও আলোর ঝলকানি কমলো না। সূর্যের প্রথম সূর্যকিরণ তীর্যকভাবে এসে পড়লো দু'চোখের পাতায়।

নিনীত চোখের উপর থেকে হাত সরালো। বিরক্তিসূচক শব্দ করে চোখ মেললো সামনে। চোখের সামনে হলদে আলোটা তার সহ্য হচ্ছিল না। আস্তে আস্তে রোদের তেজ সয়ে নিয়ে চোখ মেলতেই দেখলো তার ঘরের জানালা খোলা। জানালার কাছে দু'টো পাখি এসে বসেছে। ভারি ভারি পর্দা দু'টো টান টান করে দুই পাশে চাপানো।

"আমার রুমের পর্দা কে সরিয়েছে?"
নিনীত এক চিৎকার দিয়ে উঠে বসলো। চোখ ডলতে ডলতে সামনে তাকাতেই সোঁ সোঁ আওয়াজের উৎস খুঁজে পেল। হেয়ার ড্রায়ারের শব্দ। সামনের দৃশ্যটুকু দেখে নিনীত হকচকিয়ে গেল রীতিমতো।

পারমিতা বসে আছে ড্রেসিং টেবিলের সামনে। তার পরণে একটা অফ হোয়াইট রঙের সিল্কের শাড়ি। ঝরঝরে পাতলা আঁচল মেঝেতে গড়াচ্ছে। আঁচলে সূক্ষ্ম রেশমি সুতার কাজ। তার চুল ভেজা। সে আয়নার সামনে বসে হেয়ার ড্রায়ারে চুল শুকাচ্ছে। উষ্ণ বাতাসে তার ঝরঝরে চুল উড়ছে। সকালের হলদে কমলা রোদ তীর্যক ভাবে ঠিকরে এসে তার শরীরে আল্পনার মতো রং ছড়াচ্ছে। আলোতে ঝলমল করছে তার গাঢ় বাদামি চুল। নিনীত হা করে বসে কয়েক পলক তাকালো তার দিকে।

একটু পরে মস্তিষ্ক সচল হলো। নিনীত গলা তুলে বলল,"আপনি? আমার ঘরে?"

পারমিতা পেছনে না ফিরেই চুল শুকাতে শুকাতে বলল,"জি। আমি। আপনার ঘরে।"

"হুয়াই?"

"কারণ আপনার মেয়েদের ঘরে এতো বড় ড্রেসিং টেবিল নাই। বাচ্চা মানুষের এইটুকু ড্রেসিং টেবিল। ঠিক মতো মেকআপ করতে পারছিলাম না, সাজগোজ করতে সমস্যা হয়।"

"এজন্য আমার ঘরে এসে সাজবেন?"

"অবশ্যই। সাজবো, প্লাস শাড়ি পরব।"

"কিহ! আমার সামনেই শাড়ি পরবেন?"

"না, আপনার সামনে কেন পরবো? আপনি তো ঘুমাবেন।"

"ঘুম তো ভাঙতেও পারে মানুষের।"

"ভাঙলে আর কি! বসে বসে মেয়ে দেখবেন। এতো যে মেয়ে মানুষ দেখার শখ সেটা তো আগে বুঝি নি।"

"আমার মেয়ে মানুষ দেখার শখ নেই।" নিনীত ভ্রুকুটি করে বলল,"আজও আপনি আমার ঘরে এসে শাড়ি পরেছেন?'

"না, আজ বাচ্চাদের ঘরেই পরেছি। আপনি এতো অধৈর্য কেন হচ্ছেন? আচ্ছা বাবা, কালকে থেকে আপনার ঘরেই পরবো।"

"ইয়ুউউ! না। কখনো না। আপনি...আপনি মায়ের রুমে গিয়ে শাড়ি পরবেন এখন থেকে। মেকআপও ওখানেই করবেন।"

"কেন? আপনার বউ হয়ে আমি আরেকজনের ঘরে কেন যাবো?"

"আমরা তো আর টিপিক্যাল স্বামী স্ত্রী না।"

"সেটাই। আমরা টিপিক্যাল স্বামী স্ত্রী না। আমরা প্র্যাকটিক্যাল। আপনার ঘরে এসে শাড়ি পরলে আর সাজগোজ করলেই যে আপনি আমার প্রেমে ডুবে মরবেন না, সেটা আমরা দু'জনেই জানি। তাই না?"

নিনীত চুপ হয়ে গেল। জানালার দিকে তাকিয়ে বলল," পর্দা কেন সরিয়েছেন?"

"হু, গুড কোয়েশচান। সকালের আলো আমার ভালো লাগে। আর আলো না থাকলে আমি সাজতেও পারবো না। আপনি নাকি লাইটের আলো সহ্য করতে পারেন না? তাই লাইট না দিয়ে জানালা খুলেছি। বুদ্ধিমতির কাজ করেছি না বলুন?"

"খুব বুদ্ধিমতির কাজ করেছেন। এবার দয়া করে বের হন।"

"হচ্ছি, দাঁড়ান। কাজল দিয়ে নেই। লিপস্টিক দেওয়া শেষ করি। তারপর বের হচ্ছি।"

পারমিতা গুন গুন করে চুল শুকাতে লাগলো। নিনীত নাক সিটকে বলল," রোগী দেখতে যান, নাকি চেহারা দেখাতে যান?"

পারমিতা এই প্রথম পেছন ফিরলো। তার সাজসজ্জা হীন সরল তবে ভীষণ লাবন্যময়ী মুখটা চোখে পড়তেই নিনীত থতমত খেয়ে গেল। ভদ্রমহিলার পূর্বপুরুষদের মধ্যে কেউ রাজবংশের লোক ছিলো নাকি? চেহারায় খুব স্পষ্ট এক ধরণের আভিজাত্য আছে।

পারমিতা আড়চোখে তার দিকে তাকালো। খিটখিটে স্বরে বলল,"চেহারা দেখাতে যাই। রোগী যদি চেহারা দেখেই উল্টো দৌড়ায়, তাহলে তো সমস্যা। তাই চেহারাটাও সুন্দর রাখতে হয়।"

"বাহ, কতো বুদ্ধি আপনার। এবার দয়া করে বের হন।"

"হবো। আপনি আগে ঘুম থেকে উঠুন। দিনের বেলা কেউ ঘুমায় না। উঠে নিকিতাকে তুলুন। ওদের সাথে গল্প করুন।"

"আপনার কাছে উপদেশ চেয়েছি আমি?"

"না।"

"তাহলে জ্ঞান ঝাড়ছেন কেন?"

"ওবাবা! আপনি তো অনেক কথা বলেন। বিয়ের আগে তো বোম মারলেও মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছিল না। এজন্যই তো বলি, নিকিতা এতো বক বক কোথা থেকে শিখেছে।"

নিনীত মাথার দুই পাশে হাত চেপে বলল,"দয়া করে আপনি ঘর থেকে বের হন। আর কখনো আমার ঘরে আসবেন না।"

"আপনার এতো সমস্যা হলে আপনি অন্য ঘরে যান। আমার প্রয়োজনে আমি একশোবার এই ঘরে আসবো।"

নিনীত চোখ বড় বড় করে বলল,"আপনি তো খুব বেয়াদব দেখছি।"

পারমিতা গায়ে মাখলো না তার কথা। সুন্দর করে চুল বেঁধে চোখের নিচে কাজল দিলো। নিনীত বলল," দয়া করে এখন বের হন। ঘুমে আমার চোখ টানছে।"

"আহা! কাজল দেওয়ার সময় কেউ কথা বলে? এতো বাচাল আপনি! নিকিতা আর আপনি একসাথে হলে মনে হয় না অন্য মানুষ আর কথা বলতে পারে। তাই না?"

নিনীত ঘাড় নেড়ে বলল," আমার আর আমার মেয়ের চেয়ে দ্বিগুণ কথা বলেন আপনি। এরপর থেকে রেকর্ড করে শোনাবো।"

পারমিতা কোনো মতে ঠোঁটে লিপস্টিক দিয়েই উঠে দাঁড়ালো। নিনীত চওড়া গলায় বলল,"ডাক্তার ম্যাডাম! পর্দা টেনে যান। চোখে আলো লাগছে।"

পারমিতা বড় বড় পায়ে করিডোরের দিকে এগিয়ে গেল।
সেখান থেকে চেঁচিয়ে জবাব দিলো,"আপনি উঠে পর্দা টানুন। আমার দেরি হচ্ছে।"

_____

আয়তি কোমরে হাত গুজে তীক্ষ্ণ চোখে সামনে তাকালো। রুক্ষ স্বরে এক প্রকার ধমকের সুরে বলল,"সীমান্ত! আমার এডমিট কার্ড কোথায়?"

সীমান্ত বসার ঘরের সোফায় পায়ের উপর পা তুলে শুয়ে গুন গুন করে সুর টানছিলো। আয়তি সরোষ চোখে তাকালো তার দিকে। সকাল থেকে পুরো ঘর তন্ন তন্ন করে খুঁজেও তার প্রবেশ পত্র পায়নি। দুই ঘন্টা পরে তার পরীক্ষা। যেকোনো ভাবে তাকে দুই ঘন্টার মধ্যে কাগজটা উদ্ধার করতে হবে। তার প্রাথমিক আর সবচেয়ে জোরালো সন্দেহ সীমান্তর উপরেই যাচ্ছে।

সীমান্ত গত কয়েকদিন ধরে সাপের মতো ফণা তুলে অপেক্ষা করছিলো তাকে ছোবল দেওয়ার। প্রবেশ পত্র লুকিয়ে আয়তিকে হয়রান করার কুট বুদ্ধি তার মাথা বাদে অন্য কোনো মাথা থেকে বের হতে পারে না।

সীমান্ত পা নাড়তে নাড়তে ঘাড় বাঁকিয়ে তাকালো তার দিকে। বাঁকা হেসে নিরুদ্বেগ ভঙ্গিতে বলল," ওমা। আমি কেমন করে জানবো তোমার এডমিট কার্ড কোথায়? তুমিই তো বলো, আমি অশিক্ষিত মানুষ। আমি এসব বুঝবো কেমন করে?"

আয়তির কপালে পর পর কয়েকটা ভাঁজ দেখা গেল। চোখ দু'টো প্রসারিত হলো। এক পা এগিয়ে এসে কটমট করে বলল,"এতোক্ষণ শুধু সন্দেহ হচ্ছিল। এবার আমি শিওর, এটা তোমারই কাজ। সীমান্ত! আমার প্রবেশপত্র দাও। আমার ওটা লাগবে।"

"আমি জানি না কিসু।"

"সীমান্ত! মজা করার সময় নেই। আমি জানি ওটা তোমার কাছে। আমার পরীক্ষার দেরি হচ্ছে। প্লিজ সীমান্ত।"

সীমান্ত কুটিল হাসলো।
"আমি জানি না তোমার জিনিস কই আছে। যত্ন কইরা রাখবা না?"

আয়তি ফুঁসে উঠলো রাগে। চোখ গরম করে বলল," তুমি জানো না তাই না? আল্লাহর নামে কসম খাও। খেয়ে বলো যে তুমি জানো না।"

সীমান্ত ক্রুর হাসলো। আরাম করে সোফার উপর হাত পা ছেড়ে বলল,"হ আমি জানি। কিন্তু আমি দিতাম না।"

আয়তি চেঁচিয়ে বলল,"কেন? কোন সাহসে তুমি দিবে না?"

"আমি তোমার ছয় মাস লস করামু।"

"কেন?"

"এমনিই। মনে খায়েশ জাগসে।"

"আমি এখনই বাবাকে ডাকছি। তোর খায়েশ ছোটাবো আমি।"

"উহু উহু, খবরদার। তুই তোকারি করবা না। তোমার প্রাণ ভোমরা কিন্তু আমার কাছে বন্দি। বেশি তেড়ি মেড়ি করলে ঐটারে কমোডে নিয়া ফ্ল্যাশ করমু।"

আয়তি অনেক কষ্টে বড় বড় দু'টো শ্বাস টেনে রাগ কমালো। নিজেকে শান্ত করে, কণ্ঠ যথাসম্ভব নমনীয় করে সীমান্তকে বলল," আচ্ছা ঠিক আছে। করবো না তেড়িবেড়ি। তুমি এখন আমার কাগজটা দাও।"

সীমান্ত এক লাফে উঠে বসলো। কান চওড়া করে বলল," কি কইলা তুমি? আবার কও। শুনতে পারি নাই।"

"কাগজটা আমাকে দাও, প্লিজ।"

"ওমাগো। তোমার গলা দিয়া তো মধু ঝরতাসে আয়তি। ব্যাপার কি?"

আয়তির ভেতরটা চেঁচিয়ে বলল,"কুত্তার বাচ্চা, আমার এডমিট কার্ড দে।"
অথচ বাইরে থেকে তাকে অভিনয় করতে হলো ভীষণ বিনয়ী, প্রচণ্ড শান্ত।

"হয়েছে এবার? দাও এখন।"

"দিমু। তার আগে তুমি কানে ধইরা উঠবস করো দশবার।"

আয়তি চেঁচিয়ে বলল,"কিইই?"

"এ্যাই! আওয়াজ নামাইয়া কথা কও।"

"বলবো না। তোকে আমি জেলে দিবো। ঐদিন ছাড় দিয়ে ভুল করেছি। শাস্তিটা কম হয়েছিল। এজন্য সাহস বেড়েছে।"

সীমান্ত নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে বলল," দাও। জেলে দাও, হাজতে দাও। যা খুশি করো। দরকার হয় জেল খাটমু। কিন্তু তোমারে পরীক্ষায় বসতে দিমু না। ছয় মাস নষ্ট করমু তোমার।"

"তুই একটা....."

আয়তি লম্বা শ্বাস টেনে লাগাম টানলো মুখে।

"কিতা আমি? কইয়া দেখ খালি। তোর প্রবেশ পত্র আমি একশোডা টুকরা করমু।"

আয়তি আবার শ্বাস ছাড়লো। দু'হাত মুঠ করে ঠোঁটের কাছে এসে থাকা শব্দদের নিয়ন্ত্রণে আনলো। এই প্রবেশপত্র তার দরকার। খুব বেশি দরকার। সীমান্ত বেপরোয়া। জেলে গেলে ওর কিচ্ছু হবে না। কিন্তু আয়তির একটা গোটা সেমিস্টার নষ্ট হবে।

"কি করতে হবে আমায়?"
বিধ্বস্ত গলায় প্রশ্ন করলো আয়তি।
তার নিরুপায়, সর্বশান্ত রূপ দেখে সীমান্তর ভেতরটা পুলকিত হলো। সে দাঁত কেলিয়ে বলল,"ইশশ আয়তি। একটু নম্র ভদ্র হইলে তোমারে কি সুন্দর লাগে! তুমি বুঝলা না।"

"কি করতে হবে বলো?"

"কান ধইরা উঠবস করো।"

আয়তি ঘড়ির কাঁটায় সময় দেখলো। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে হালকা স্বরে বলল," কয়বার?"

"দশবার। আর শোনো, প্রত্যেকবার উঠবস কইরা চিল্লাইয়া বলবা, সীমান্ত আমার বাপ লাগে। সীমান্তর পায়ের নখের সমান যোগ্যতাও আমার নাই।"

আয়তি কটমট চোখে তাকালো তার দিকে। রাগে, জেদে তার কান্না পাচ্ছে রীতিমতো।

সে কানে ধরে উঠবস করলো একবার। হালকা স্বরে বলল,"সীমান্ত আমার বাপ। ওর পায়ের নখের সমান যোগ্যতাও আমার নেই।"

সীমান্ত কান খাঁড়া করে বলল,"কিতা কইলা? আবার কও। শুনি না তো। জোরে কও। একটু রেকর্ড কইরা রাখি।"

আয়তি ফুঁসতে ফুঁসতে আবার উঠবস করলো। প্রত্যেকবারই গাঢ় স্বরে বলল,"সীমান্ত আমার বাপ। ওর পায়ের নখের সমান যোগ্যতাও আমার নেই।"

দশবার উঠসব শেষ হতেই সীমান্ত হাসতে হাসতে নিজের ঘরে গেল। খাটের তোশক উল্টে নিচ থেকে আয়তির প্রবেশ পত্র টা বের করে আনলো।

আয়তি দাঁড়িয়ে ছিলো দরজার কাছে। প্রবেশপত্র না পেয়ে সে সবার প্রথমে সীমান্তর ঘরেই গিয়েছিল। কিন্তু তার টেবিল আর আলমারি তন্ন তন্ন করে খুঁজেও সে কোনো কাগজ পায় নি।

সীমান্ত এসে এডমিট কার্ডটা তার দিকে বাড়িয়ে দিলো। আয়তি চোখ নামিয়ে তাকালো সেদিকে। ভ্রুকুটি করে বলল," কোথায় ছিলো এটা?"

"আমার ঘরেই ছিলো।"

"তোমার ঘরে কোথায় ছিলো।"

সীমান্ত রাগে গিরগির করে বলল," আমার জাইঙ্গার ভিতরে আছিলো। হইসে? খুশি হইসো?"

আয়তির পুরো মুখ সিটিয়ে গেল, ঘেন্নায় গা গুলালো। ছিটকে দুই কদম পিছিয়ে হাত দিয়ে মুখ ঢেকে বলল,"ইয়াক! ছিহ। আমি নেবো না এটা।"

"আইচ্ছা। নিও না। না নিলে আবার জাইঙ্গার ভেতর ঢুকামু। হাহ।"

আয়তির দুই চোখ ঘোলা হলো, প্রচণ্ড রাগে, এমন নিরুপায় হয়ে তার বুক ফেটে কান্না এলো। ঘেন্নায় পুরো শরীর জ্বলতে লাগলো। সে কাঁপা হাতে কাগজটা হাতে নিলো। হাতে নিয়েই নিঃশব্দে দুই ফোঁটা চোখের জল ফেলল।

সীমান্ত ঘাড় নাঁমিয়ে উঁকি মেরে দেখলো তার অসহায় মুখটা। তারপরই হো হো করে অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো। আয়তি চোখ মুছে বলল," আল্লাহ তোর বিচার করবে দেখিস। খচ্চর কোথাকার!"

চলবে-

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 13 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন