#আম_পাতা_জোড়া_জোড়া- ১৫
লেখনীতে #মেহরিমা_আফরিন
নিকিতা হাত বাড়িয়ে বলল,"আমাতেও লিপি দাউ। আমিও লিপি দিতে চাচ্ছিই।"
পারমিতা চোখ পাকালো,"তুমি না বেবি? বেবিরা লিপি দেয় না।"
"তেনো বেবিলা লিপি দেয় না?"
"বেবিদের ঠোঁট পঁচে যায় লিপি দিলে।"
"তুনি তো লিপি দিয়িছো। তুমান থুত পচি নাই?"
"না, আমি তো বেবি না।"
নিকিতা হাত পা ছুড়ে বলল,"কিলতু আমি দিতি চাই লিপি। পিইজ দাও। এততু দাও। এততু।"
"নো। নিবিকে দেখো। সে কি কান্নাকাটি করছে লিপির জন্য?"
নিকিতা নাক ফুলালো নিবেদিতার দিকে তাকিয়ে। মুখটাকে কুঁচকে ধরে বলল," উ কাননা কাতি না কললে আমান কি? আমান লিপি নাগবেই নাগবেই নাগবেই।"
নিকিতা দৌড়ে গিয়ে পারমিতাকে জড়িয়ে ধরলো। তার আঁচলে মুখ ঘঁষতে ঘঁষতে বলল,"এততু দাউ। নিকুর কি ছুন্দুম হতি ইচছা কয়ে না?"
"তুমি এমনিতেই সুন্দর নিকি। একদম পরীদের মতো।"
"আরেততু ছুন্দুম হতি চাই।"
পারমিতা কপাল চাপড়ালো।
"কতো কথা জানো তুমি নিকি।"
ভ্যানিটি ব্যাগ ঘেটে একটা লিপগ্লস বের করে পারমিতা তার ঠোঁটে সামান্য ছোঁয়ালো।
"কি? হয়েছে এখন? দেখি ঠোঁট এমন করো।"
পারমিতা দুই ঠোঁট একসাথে করে দেখালো। নিকিতা তাকে অনুকরণ করলো। তারপর হাত তুলে বলল,"আয়নাতে দেকাও। দেকি আমান লিপি কালাম হয়েছি নাকি?"
"ইশশ! তোমারও কি তোমার বাবার মতো ট্রাস্ট ইস্যু আছে নাকি নিকি? দাঁড়াও দেখাচ্ছি।"
পারমিতা হঠাৎ নিবেদিতার দিকে তাকিয়ে বলল," নিবি তুমি লিপগ্লস দিবে? আমার কাছে কিন্তু আছে।"
নিবেদিতা দুই দিকে মাথা নাড়লো,"আমি লিপবাম দিয়েছি।"
"গুড, ভেরি গুড। আমাকে একটা কথা বলো। তুমি এতো লক্ষ্মী! অথচ তোমার বোন হয়ে এই মেয়ে এতো দুষ্টু কেমন করে হলো?"
নিবেদিতা স্মিত হাসে তার কথা শুনে। পারমিতা তার দিকে নিজের হাত এগিয়ে দিয়ে বলল,"নাও নাও তাড়াতাড়ি হাত ধরো আমার। নিচে যেতে হবে। তোমার বাবা আবার মিনিটে মিনিটে মন পাল্টায়।"
নিবেদিতা আস্তে করে হাত বাড়িয়ে ধরলো তাকে। কতোদিন পর আজ সে রাতে বাড়ি থেকে বের হচ্ছে। এর আগে শেষ বোধহয় গিয়েছিল ইয়াজিদ দাদানের সাথে। ইয়াজিদ তার বাইকে সবাইকে চড়ায় তুমুল আনন্দের সাথে। শুধু নিবিকে নিয়ে তার ভয় হয়। নিনীত তুল তুল করে বড় করেছে এই মেয়েকে। ইয়াজিদ নিবেদিতার ছোট বেলার যতো স্মৃতি মনে করার চেষ্টা করে, ঐ সমস্ত স্মৃতিতে সে নিনীতকে খুঁজে পায়। নিবির চুল বাঁধা, ওকে খাওয়ানো, গোসল করানো, সব।
এক হাতে নিবেদিতা কে ধরে পারমিতা এক টানে নিকিকে কোলে তুলল। নিকিতার মুখ হাসিতে ভরা। আয়নাতে সে দেখেছে। তার ঠোঁট চিকচিক করছে। তার মানে মমা সত্যি সত্যি তাকে লিপি দিয়ে দিয়েছে।
___
নিনীত গাড়ির কাছেই দাঁড়িয়ে ছিলো। বাড়ির মূল দরজার সামনে এসে তাকে দেখামাত্র পারমিতা কয়েক সেকেন্ডের জন্য থমকালো। ফর্মাল শার্ট, স্ট্রেইট কাট প্যান্ট, গোছানো চুল আর পলিশড সু তে তাকে অদ্ভুত লাগছে। ঠিক সেই প্রথম দিনের মতো। পারমিতাকে সেই সৌন্দর্য অবলোকন করার জন্য দু মিনিট দাঁড়াতে হলো। আরো একবার স্বীকার করতে হলো, ভদ্রলোকের সৌন্দর্যের উপরও বিশেষ নজর আছে তার। ইশশ! কি লজ্জার কথা!
নিকিতা মুগ্ধ হয়ে সামনে তাকাল। চিৎকার করে হাত বাড়িয়ে বলল,"পাপাই! আমান পাপাই! নিকির পাপাই। কুনে কুনে। পাপাই।"
নিনীত দ্রুত গাড়িতে উঠে বসল। আগেই ভেবেছিল, তাকে দেখলেই নিকিতা পাগল হবে কোলে উঠতে। আর কিভাবে এই মেয়ের থেকে পিছা ছুটাবে নিনীত?
পারমিতা গাড়ির কাছে এসে বলল,"বলো কে কিভাবে বসবে?
তিনটা অপশন আছে। এক, আমি পাপাইয়ের সাথে, তোমরা দু'জন পেছনে।
দুই, আমরা তিনজনই পেছনে।
তিন, নিবি সামনে, আমি আর নিকি পেছনে।"
নিকি উদগ্রীব হয়ে বলল,"আমি ছামনে।"
"ওটা অপশনেই নাই। তুমি একা সামনে বসতে পারবে না।"
"তেনো?"
"কারণ তুমি বেবি।"
"নিবি তি বেবি না?"
"নিবি বড় বেবি।"
"আমি তাহনে পাপাইয়েম বুকে। পাপাইয়েম কাছে যেতে চাচ্ছি।'
"ওটার অপশনও নাই। পাপাই গাড়ি চালাবে।"
নিকিতা ঠোঁট ফুলালো।
"ছবছময় সুদু বুকা দাউ আমাতে।"
"বকা দেই নি। আচ্ছা আসো, তুমি মমার সাথে পেছনে বসো। নিবি সামনে বসুক।"
নিকিতা এক লাফে নিবেদিতার চুল টেনে ধরলো। চেঁচিয়ে বলল,"না। উকে যেতি দিবো না। পাপাই আমান। নিকুর পাপাই।"
নিবেদিতা হাসলো। আস্তে করে নিকিতার হাত থেকে নিজের চুল ছাড়িয়ে নিয়ে বলল,"আচ্ছা নিকি। তুমিই যেও পাপাইয়ের কাছে। আমি এখানেই আছি। সবাই বসো, তারপর আমি বসব।"
পারমিতা আশ্চর্য হলো মেয়েটাকে দেখে। এই মেয়েটা এতো বোঝে! এতো দারুণ!
নিবেদিতা তার কাছে এসে আস্তে করে বলল,"মা! তুমি কি চাও?"
"আমি চাই তোমার পাপাইয়ের সাথে বসে একটু ভাব করতে। তোমার পাপাই পাত্তা দিচ্ছে না আমাকে, সোনা। আমি একটু বন্ধুত্ব করতে চাই তার পাশে বসে।"
"আচ্ছা বসো।" নিবেদিতা মুচকি হাসলো,"কিন্তু পাপাই তো সহজে কারো সাথে বন্ধুত্ব করে না।"
"উহু। আমার সাথে করবে। যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে হলেও করবে।"
তারা তিনজন গাড়িতে উঠে বসল। পারমিতা বসলো নিনীতের পাশের সিটে।
"বাহ! এই আপনার বিবেক। বাচ্চা দু'টোকে পেছনে দিয়ে নিজে সামনে এসে বসেছেন।"
পারমিতা চওড়া হাসল। সিটবেল্ট বাঁধতে বাঁধতে গাঢ় স্বরে বলল,"জি। এটাই আমার বিবেক। বাচ্চাদের পেছনে রেখে আমি সামনে বসেছি। যেন এক্সিডেন্ট হলে আমি আগে মরি, বাচ্চারা নিরাপদে থাকে।"
"আপনি মরার মতো এক্সিডেন্ট হলে, ওটাতে বাচ্চারাও মরবে। প্রাইভেট কার দুর্ঘটনায় পড়লে সব একসাথেই মরে।"
"ধ্যাত! গাড়ি চালানো শুরু করার আগেই এক্সিডেন্টের আলাপ ধরেছেন। বিরক্তিকর।"
"আমি এক্সিডেন্টের প্রসঙ্গ আনিনি। আপনি এনেছেন।"
"ওমাগো! আমার ভুল হয়েছে। মাফ করেন। আমি ভেবেছিলাম পুরুষ মানুষ ঝগড়া জানে না। আপনি যে এতো বাচাল আমি জানতাম না।"
"আজ থেকে জেনে নিন।"
নিনীত দ্রুত এক কানে এয়ারবাড গুজল। ভদ্রমহিলা নাহয় বকবক থামাবে না। কানে হেডফোন গুজেই সে গিয়ার চেপে গাড়ি স্টার্ট দিলো।
গাড়ি চলতে শুরু করেছে ধীরে ধীরে। এখনো বাড়ির বড় গেইট পার হয়নি। নিনীত শীতল মেজাজে বসে আছে ড্রাইভিং সিটে।
পারমিতা চোখ বড় বড় করে তাকাল। নিনীত একহাতে স্টিয়ারিং ধরেছে। অন্য হাতটা নিশ্চলভাবে পড়ে আছে গিয়ারের উপর। এক হাতেই সে পুরো গাড়ির নিয়ন্ত্রণ সামলাচ্ছে। পারমিতা হা করে কয়েক পল তাকালো তার দিকে। নিনীতের কবজিতে একটা কালো বেল্টের ঘড়ি। পরনে এগশেল হোয়াইট ফর্মাল শার্ট। প্রথম একটা বোতাম খোলা। পারমিতা নিশ্চিত ঐ বোতামটা তাকে উত্ত্যক্ত করতেই খুলে রেখেছেন ভদ্রলোক। ফর্মাল শার্টটা কনুইয়ের একটু নিচ পর্যন্ত টানা। সে স্টিয়ারিং ঘোরাচ্ছে এক হাতেই।
পারমিতা জ্বলজ্বলে চোখে তার দিকে তাকিয়ে বলল,"আপনি সিঙ্গেল হ্যান্ডে ড্রাইভ করেন?"
নিনীত বিকার দেখালো না। নিরুদ্বেগ মুখে বলল,"জি।"
"কিভাবে করেন?"
"অনেক বছর ধরে চালাচ্ছি। অভ্যাস হয়ে গেছে।"
"আমিও সাত বছর যাবত চালাই। বাট আই কান্ট ডু।"
"দ্যাটস ইউর ফেইলিউর।"
মোড়ে এসেই নিনীত এক হাতে পুরো স্টিয়ারিংটা তিনবার স্পিন করিয়ে গাড়ি ঘোরালো। তার সুনিপুণ হাতের দক্ষতায় গাড়িটা চমৎকার ভাবে উঠে এলো মূল রাস্তায়। পারমিতা চাতকের মতো তাকিয়ে থাকলো তার হাতের দিকে। অবিরত ছুটে যাওয়া নিঃশ্বাসে লাগাম টেনে বিড়বিড় করল," ও মাই গড! হি ইজ ঠু হট ঠু রেজিস্ট।"
নিনীত কানে এয়ার বাডস গুজে রেখেছে। তার মনোযোগ সামনের রাস্তায়। পারমিতা ফ্যালফ্যাল চোখে গভীর দৃষ্টিতে দেখলো তাকে। একটা শুকনো ঢোক গিলে গলা ভেজালো একবার। কপালে তার অল্পখানি ঘাম জমেছে।
"নিনীত সাহেব। ইউ আর ড্রাইভিং মি ক্রেইজি, এজ ওয়েল এজ দি কার।"
____
আইসক্রিম পার্লারে গিয়েই নিকিতা পাঁচ রকমের আইসক্রিম স্কুপ নিয়ে বসলো। খেলো কতোখানি জানা নেই, তবে মুখ থেকে শুরু করে পুরো শরীর ভরিয়েছে ঠিকই। পারমিতা কপালে হাত চেপে বলল,"নিকুউ! এভাবে কেউ আইসক্রিম খায়?"
নিকিতা পিস্তাশিও ফ্লেভারের স্কুপে মুখ হা করে একটা কামড় বসালো। তার ঠোঁটের চারপাশ আইসক্রিম মেখে ভরে আছে।
নিবেদিতা নীরবে দাঁড়িয়ে আছে টেবিলের পাশে। নিকিতা ঠোঁটের পাশটা বাম হাতের তালুতে মুছে বলল,"পাপাই কুতায়? পাপাইতে আইসপিম দাউ।"
নিনীত শার্টের হাতা গুটালো। সরু চোখে একনজর তাকালো নিকিতার দিকে। পারমিতা বলল,"পাপাই পরে খাবে। নিবি আগে আইসক্রিম পছন্দ করুক। তারপর আমরা খাবো।"
নিকিতা ভ্রুকুটি করল। নিনীত এসে নিবেদিতার কাছাকাছি দাঁড়াতেই চোখ পাকিয়ে বলল,"তুনি উকে নিয়ে কুতায় যাবে?"
নিনীত আলতো করে হাত ধরলো নিবেদিতার। নামানো স্বরে বলল,"নিবেদিতা কে আইসক্রিম কিনে দিতে হবে না?"
"তুনি তেনো যাচ্ছু সাতে? উ কি ছুতু বেবি?"
নিনীত শ্বাস ছাড়ল। থমথমে গলায় বলল,"ওর ম্যানারস আছে। ভদ্রতা জানে। তোমার মতো ভেতরে ঢুকেই আইসক্রিম দেখে বাকি সব ভুলে যায় না। ইশশ! কি অবস্থা করেছে জামাটার! জংলি বাচ্চা একটা!"
নিকিতা গাল ফুলালো। হাত থেকে আইসক্রিম টা রেখে দিয়ে ঠোঁট উল্টে বলল,"ছারাদিন সুদু নিবির পুশংছা করো। উকে আদন করো। আমাতে ভুলি যাও। তুর। ভাননাগে না।"
পারমিতা হাসতে হাসতে তার পাশে গিয়ে বসল। তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,"আচ্ছা থাক। আমি আদর করছি নিকিকে। আসো। মমার বুকে আসো।"
নিকিতা তার গা ঘেঁষে বসল। মাঝে একবার লুকিয়ে নিনীতের দিকে তাকিয়ে বলল,"উ নিবির হাত তেনো ধয়েছে? নিবি কি হাততে পায়ে না?"
"পারে তো। কিন্তু বেবিরা তো বাবাদের হাত ধরতে পছন্দ করে।"
"আমিও ধততে চাই।"
নিনীত চোখ পাকিয়ে বলল,"চাইলে আগে আগে ঢুকে নাদানের মতো সব কিনে ফেলেছিস কেনো? আমি গাড়ি পার্ক করছিলাম। দুইটা মিনিট ধৈর্য হয়নি, না? আইসক্রিম দেখলেই মাথা ঠিক থাকে না, তাই না নিকি?"
নিনীত হেসে ফেলল। পারমিতার তখন তাকে পুরোদস্তুর সংসারী পুরুষ মনে হলো। যার কোনো দুঃখ নেই, রাগ নেই, বাচ্চাদের প্রতি যার কোনো বিতৃষ্ণা নেই।
নিবেদিতা আলতো করে বাবার হাত ধরেছে। খুশিতে ওর নিঃশ্বাস ভারি হচ্ছে। নিনীত বলল,"পছন্দের ফ্লেভার কি? স্ট্রবেরি?"
নিবেদিতা মাথা নাড়ল।
"হু, তুমি তো জানো।"
"জানতাম। আগে জানতাম। মাঝে দুই বছর কেটেছে। দুই বছরে আস্ত মানুষ বদলে যায়। আর সামান্য আইসক্রিমের ফ্লেভার বদলাতে পারে না?"
কথাটার গভীরতা নিবেদিতা মাপতে পারলো না। ভাবার্থই বুঝলো না ঠিক মতো। শুধু মাথা নেড়ে বলল,"বদলায় তো। কিন্তু আমার বদলায় নি।"
"আচ্ছা এসো। আমার সাথে এসো।"
নিবি হাঁটতে হাঁটতে ডাকলো,"পাপাই!"
"কি?"
"আমরা কি প্রায় সময় এভাবে আইসক্রিম খেতে আসবো?"
"না, আমার ইচ্ছে নেই।"
"পাপাই!"
"আবার কি?"
"আমার খুব ভালো লাগছে পাপাই।"
"কিন্তু আমার খুবই বিরক্ত লাগছে। মন চাইছে সব ফেলে বেরিয়ে যেতে।"
"পাপাই।"
"কি?"
"আই অ্যাম স্যরি।"
নিনীত থমকে গেল। অবাক হয়ে বলল,"স্যরি ফর হোয়াট?"
"আমি জানি না। আমরা দুই বোন তোমাকে দুঃখ দিয়েছি। তাই স্যরি।"
নিনীতের চোখের পাতা কেঁপে উঠল। কেমন একটা দমবন্ধ অনুভূতি হলো। ওর বলতে মন চাইল,"নো মাই সুইটহার্ট। তোমরা কখনো আমায় দুঃখ দাও নি। ডোন্ট বি স্যরি। তোমরা আমার ফুল। তোমরা কেমন করে দুঃখ দিবে আমায়?"
নিনীত দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। ছোট করে বলল,"ডোন্ট বি স্যরি। ইটস ওকে।"
কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে নিবেদিতার হাতে আইসক্রিমের কোণটা তুলে দেওয়া মাত্রই সবার প্রথমে নিনীতের চোখ গেল তার গলার কাছে। একটা জায়গায় সামান্য ক্ষত হয়ে আছে। দু চারদিন আগের ক্ষত। তার উপরে এখন পাতলা চামড়ার পরত দেখা যাচ্ছে।
নিনীত এক আঙুল তুলে হালকা করে জায়গাটা ধরে বলল,"এটা কি গলায়? কি হয়েছে?"
"কেটে গেছে।"
"কেমন করে?"
"ইরোজের খেলনা লেগে।"
নিনীত অস্থির হয়ে বলল,"এরপর এভাবেই উদাম রেখে দিলে?"
"না। ইশান চাচ্চু এন্টি সেপটিক দিয়ে পরিষ্কার করে দিয়েছে।"
"পরিষ্কার করে এভাবেই রেখে দিলো? ইশান কি নিজেকে ডাক্তার ভাবে?"
নিবেদিতা উত্তর দিলো না। চুপ করে মাথা নামিয়ে বাবার গা ঘেঁষে দাঁড়ালো। নিনীত পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে বলল,"আমার ওয়ালেটে একটা ওয়ান টাইম ব্যান্ডেজ আছে।"
খুব উদগ্রীব শোনালো তার কণ্ঠ। নিবেদিতা সেই কণ্ঠের গভীরতা বুঝল না। তার মনে হলো, পাপাই আবার রেগে যাচ্ছে তার সাথে। যদি দেখতে পেত, তবে দেখতো কি ভীষণ অস্থিরতায় নিনীত ব্যান্ডেজ লাগালো তার জখমে! সেদিকে একনজর তাকিয়ে চোখ সরু করে বলল,"ইরোজের খেলনা থেকে দূরে থাকবে। ইনফেকশন হলে কিন্তু পরে গলা কেটে ফেলে দিবে।"
"গলা কেটে ফেললে তো আমি মারা যাবো।"
"সেজন্যই তো ইরোজের খেলনা ধরবে না। এখন তাড়াতাড়ি আইসক্রিম খাও। সব গলে যাচ্ছে।"
নিবেদিতা আইসক্রিম খেতে খেতে বলল,"পাপাই তুমি খাবে না?"
"না।"
"আমার থেকে একটু খাও।"
"দরকার নেই। এসব বাচ্চাদের খাবার।"
"একটু খাও।"
"তোমরা দুই বোন কি আমার জীবন ধ্বংস করার পণ নিয়ে এসেছো?"
নিবেদিতা থেমে গেল। নিনীত ঠান্ডা স্বরে বলল,"কোথায় আইসক্রিম? দাও, আমার হাতে দাও।"
নিনীত অল্প খানিকটা খেল। তারপর আবার নিবেদিতার হাতে তুলে দিলো। একপাশ থেকে জড়িয়ে রাখলো তার কাঁধ। নিবেদিতা একেবারে মিশে গেল বাবার সাথে। পাপাইয়ের ঘ্রাণ! আহা কি মিষ্টি।
____
নিকিতা ঘুমিয়ে গেছে। আইসক্রিম শপ থেকে বের হওয়ার সময়ই নিনীত ওকে পারমিতার কাঁধে ঘুমন্ত অবস্থায় আবিষ্কার করল।
পারমিতা বলল,"আমার কোলে কোনো বাচ্চা ঘুমালে আমার নিজেকে মা মা মনে হয়।"
"তো এটা জেনে আমি কি করবো?"
"বললাম আরকি। সব কথায় এমন ত্যাড়ামো কেন করেন?"
নিনীত গাড়ির দরজা খুলল। পারমিতা সাবধানে নিকিতাকে কোলে নিয়ে বসলো পেছনের সিটে। তার পাশে নিবেদিতা।
নিনীত গিয়ে দ্রুত গাড়ি স্টার্ট দিলো। এতক্ষণ ধরে মানুষের গ্যাঞ্জামে বসে তার মাথা ঘোরাচ্ছে। বাড়িতে গিয়েই দরজা বন্ধ করে শান্তিতে বসে থাকবে কিছুক্ষণ।
গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার দু'মিনিটের মাথায় নিকিতার ঘুম ভেঙে গেল। হঠাৎ ঘুম ভাঙলে সে ভীষণ কান্নাকাটি করে। আজও ঘুম ভাঙতেই হাত পা ছেড়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। পারমিতা থতমত খেয়ে গেল। অবাক হয়ে বলল,"কি হয়েছে? এভাবে কাঁদছো কেন? এই যে মমা। নিকি,নিকি। শোনো আমার কথা।"
নিকি শুনলো না। দু হাত ছুড়ে চিৎকার করে কাঁদলো কিছুক্ষণ। পারমিতা বেদিশা হয়ে পড়লো তাকে থামাতে গিয়ে।
ক্যাচ ক্যাচ করে ব্রেক কষার শব্দ হলো। নিনীত গাড়ি থামিয়েছে। থামিয়েই পেছনে ফিরলো দ্রুত। হাত বাড়িয়ে বলল,"দিন, আমাকে দিন। আপনি পারবেন না।"
পারমিতা বোকার মতো তার হাতে তুলে দিলো নিকিতাকে।এমন হঠাৎ করে কেন মেয়েটা কাঁদছে সে জানে না। নিবেদিতা হালকা স্বরে বলল,"ঘুম ভাঙার পর ও অনেক কাঁদে। পাপাই আর মেহেরোজ মাম্মা ছাড়া আর কারো কাছে যেতে চায় না তখন।"
পারমিতা হতভম্ব হয়ে সামনে তাকালো। নিকিতা এখনো ঠোঁট ভাঙছে, গুঙিয়ে গুঙিয়ে কাঁদছে। কিন্তু যেই না নিনীত ওকে বুকের উপর ফেলে মাথায় রাখলো, গভীর স্বরে ডাকলো,"নিকিই! এই যে পাপাই!", অমনি তার কান্না থেমে গেল। ঠোঁট দু'টো ভিজিয়ে টলটলে চোখে বাবার দিকে তাকালো সে। নিনীত এক পলক মাথা নামিয়ে দেখল তাকে। স্টিয়ারিং থেকে হাত সরিয়ে দুই চোখ মুছে দিলো তার। পুনরায় গাড়ি স্টার্ট দিয়ে ভারিক্কি স্বরে বলল,"পাপাই আছি। কাঁদার কিছু হয়নি।"
নিকিতা মিশে গেল বাবার বুকের সাথে। মিও মিও করে বলল,"অনিক ভোই পাচ্ছি পাপাই। বুত আসবি। নিকিকে খেয়িই ফেলবি।"
"কিচ্ছু হবে না। ভূত আসবে না। খারাপ স্বপ্ন দেখেছ। পাপাই মেরে দিবো ভূতকে।"
"পাপাই।"
"কি?"
"ভোই কচ্চে। এততু আদন দাউ।"
নিনীত ভারি নিঃশ্বাস ছেড়ে মেয়ের দিকে তাকাল। মনোযোগ দিয়ে একনজর দেখলো তাকে। তারপর নিকিতার থুতনি উঁচু করে তুলে মাথা নামিয়ে আলতো চুমু খেল তার দুই গালে। আবার চোখ মুছিয়ে দিয়ে বলল,"শেষ! এবার সব ভয় শেষ।"
নিকিতা হাসলো। শক্ত করে বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলল,"তুনি তি এততা পিমস পাপাই?"
"না,আমি ডেমন। রাক্ষস আমি। বেশি কথা বললে খেয়ে ফেলবো এখন।"
নিকিতা ফিক করে হাসলো। দুই হাতে নিনীতের গাল ধরে বলল,"তুনিও দুষতু কচছো আমান সাতে? খেয়িই ফেলবে আমাকি?"
"হ্যাঁ, খেয়ে ফেলবো।"
নিকিতা মিছেমিছি ভয় পেল। বাবার বুকেই আশ্রয় খুঁজতে খুঁজতে বলল,"না না। খেয়িই ফেলো না। অনেত ভোই পাচচি আমি।"
নিনীত সামনের রাস্তায় তাকাল। মুখে তার মৃদু হাসির রেখা। নিকিতা তার বুকে গাল ঘঁষতে ঘঁষতে ছড়া আবৃত্তি করছে। নিনীত এক হাতে শক্ত করে চেপে ধরেছে তাকে। ঐ শরীরটার পুরো ভার নিনীতের হাতে। আচ্ছা, এদের পুরো জীবনটাও তো নিনীতের হাতেই, তাই না? গাড়িতে বসে হুট করেই কথাটা খেয়াল হলো নিনীতের।
নিকিতা হঠাৎ নিচে তাকিয়ে বলল," পাপাই! মছা। গানিতে মছা।"
"কিছু হবে না। মেরে ফেলবো মশা।"
মশাটা উড়ে উড়ে নিনীতের হাঁটুর উপর বসল। নিকিতা চোখ পাকিয়ে তাকাল। তেড়ে গিয়ে দুই হাতে ওটাকে হাঁটুর কাছ থেকে সরিয়ে দিয়ে বলল,"বপ! চলি যা একান তেকে। ও নিকুর পাপাই। কামুন দিবি না। কামুন দিলে মেরিই ফেলবো এতদম।"
নিনীত হেসে উঠল শব্দ করে। ঠোঁট নেড়ে বিড়বিড় করল,
"পাকনি কোথাকার!"
চলবে-
[ইয়াজিদ মণিষাকে আজও আনতে পারলাম না। একটা সামান্য আইসক্রিম পার্লারের অংশ এতো বড় হলো কিভাবে আমি নিজেও জানি না। রাগ হবেন না। গল্প টানতে আমার নিজেরই বিরক্ত লাগে।]