#আম_পাতা_জোড়া_জোড়া -২০
লেখনীতে #মেহরিমা_আফরিন
সূর্যের আলোটা চওড়া বারান্দা দিয়ে ঘরে আসছে। খাটের উপর হালকা আকাশী রঙের একটা চাদর বিছানো। তার ঠিক মাঝখানে একটা নরম ম্যাট। তার উপর পা দু'টো গুটিয়ে শুয়ে আছে ইমতিহা মজুমদার। তার শরীরে একটা নরম তোয়ালে প্যাঁচানো। এইমাত্র গোসল শেষ করে বেরিয়েছে সে। ছোট, ভেজা চুলগুলো লেপ্টে আছে মাথার সাথে। সূর্যের উষ্ণ আলোতে শরীর আরাম পেল না একদমই। সে উল্টো তীব্র বিরক্তিতে চোখ মুখ কুঁচকে নিল। হাত পা গুটিয়ে অন্য দিকে মুখ সরিয়ে নিল তৎক্ষনাৎ। ঠোঁট নেড়ে অস্ফুটস্বরে বলল,"উহহহ।"
ইশান তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে আছে মেয়ের দিকে। গভীর দৃষ্টি, আহ্লাদে ভরা দু'টো চোখ। এখন সময় দুপুর দুইটা পঁচিশ। একটু পরে সে আবার বেরিয়ে যাবে। আপাতত বাড়িতে এসেছে শুধুমাত্র ইমতিহার গোসলকার্য প্রত্যক্ষ দর্শন করবে বলে।
পিতৃত্বের অনুভূতি ইশানের জন্য এই প্রথম না। ইরোজ হওয়ার সময়ই সে প্রথমবার বাবা হয়েছে। তবে ইমতিহা হওয়ার পর সে অনুধাবন করল, বাবা হওয়া, আর কন্যা সন্তানের বাবা হওয়ার মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে।
ইমতিহা স্বভাবে অলস প্রকৃতির, আরাম প্রিয়। কান্নাকাটি করে শক্তি অপচয় করার মতো অহেতুক কাজ তাকে কমই করতে দেখেছে ইশান। তবে তার একটা পছন্দের কাজ ছিল। নতুন কোনো মুখ তার সামনে এসে অতি উৎসাহ নিয়ে বকবক করা শুরু করলেই সে ভীষণভাবে কপাল কুঁচকাত। কি বিজ্ঞ! কি বিচক্ষণ! হাহাহা।
গোসলের পর মেহরোজ বুকে পিঠে তেল মালিশ করত ইমতিহার। হাত পা গুলো টেনে ব্যায়াম করাতো। ব্যায়াম করতেও আলসেমি হতো তার। মাঝে মাঝে ব্যায়ামের ফাঁকেই ঘুমিয়ে যেত।
ইশান বড় বড় চোখে, গভীর মমতায় ঐ ছোট্ট শরীরটা দেখত। তার মনে হতো, নিকিতা আবার সেই ছোটবেলায় ফিরে গেছে।
সেদিনও ইশান গোসলের পর মেহরোজের কাছ থেকে বেবি অয়েলের টিউবটা নিয়ে মেয়ের কাছে বসল। গাঢ় হেসে বলল,"আম্মাজান! আপনি কেমন আছেন? দুপুরের রোদ কেমন লাগছে আপনার?"
ইমতিহা কপাল কুঁচকে মুখ ঘুরিয়ে নিল। ইশান বলল,"কি জ্বালা! আপনার দেখি কিছুই ভালো লাগছে না।"
মেহরোজ ইরোজ কে গোসল করিয়ে এনে তোয়ালে দিয়ে হাত পা মুছে দিচ্ছিল। ইরোজ বলল,"বাবা, ও আজকেও বুমি করেছে। আমার পিঠে। তুমি ওকে বকা দিবে না?"
ইশানের কণ্ঠ বেশ অসহায় শোনাল,"বকা কিভাবে দিবো বাবা? বকা দিলে তো মন খারাপ করে কান্না করবে। বেবিরা তো এতোকিছু বুঝে না। ওরা যাকে বেশি ভালোবাসে, তাদের গায়েই বমি করে।"
ইরোজ চকচকে চোখে বলল,"সত্যিই?"
"হ্যাঁ। বোনটা তোমাকে একটু বেশিই ভালোবাসে ইরোজ।"
মেহরোজ আলমারি থেকে ছেলের জামা কাপড় বের করল। সেগুলো ইরোজ কে পরাতে পরাতে বলল,"শোনো, তুমি কিন্তু যাওয়ার আগে পারমিতা আপুর বাবার সাথে দেখা করে যেও। উনি কিন্তু বাড়িতেই আছেন।"
"তাই নাকি? কখন এলো?"
"সকালে।"
"থাকবে কিছুদিন?"
"হ্যাঁ।"
"যাক ভালো। ভাবি উনাকে খুব মিস করে।"
মেহরোজ হেসে বলল,"আরেকটা খবর আছে।"
"কি?"
"নিনীত ভাই বলেছে, যতোদিন উনি বাড়িতে থাকবেন, নিবি আর নিকি যেন ভাইয়ার ঘরেই থাকে।"
ইশান চমকে উঠে বলল,"এটা তো আরো দারুণ ব্যাপার! নিকির রিয়েকশন কি? ও তো মনে হয় ডিগবাজি খাচ্ছে আনন্দে।"
ঠিক এমন সময় নিকিতা ঘরে ঢুকল। বুক উঁচিয়ে, ভীষণ আত্মবিশ্বাসের সাথে। তাকে দেখে মনে হলো, এই বাড়ির মালিকানায় সে বাদে আর কারো নাম নেই। ইশান তার টনটনে মুখটা দেখে কপালে হাত চেপে বলল,"ও মাই গড! প্রিন্সেস ডায়না এসেছেন আমার ঘরে। স্যালুট ম্যাডাম।"
নিকিতা থপ থপ পায়ে এগিয়ে এলো। বাতাসের দাপটে তার ফ্রক উড়ছে। কাছে এসেই হাসল সামান্য। ইশান বলল,"ইউর ম্যাজিস্ট্রি,ম্যাম।"
বলেই নিকিতার একটা হাত উপরে তুলে মাথা নামিয়ে একটা চুমু খেল হাতের পাতায়। নিকিতার দুই চোখ চকচক করে উঠল আনন্দে। দ্রুত খাটে উঠে সে তড়িঘড়ি করে বসল ইশানের কোলে। হাত দু'টো ছড়িয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল তাকে।
"চাচ্চু।"
"বলো সোনা।"
"তুনি আর আমাকি ভালুবাসু না।"
"হে আল্লাহ! কি বলো।"
"হু। তুনি আগে আমাকি বুকে নিয়ে ঘুমাতে। এখন ঘুমাও?'
"না।"
"তুনি শুধু ইমথিহা কেই ভালুবাসু।"
"না সোনা।" ইশান ওর গালে শব্দ করে চুমু খেয়ে বলল,"তোমাকেও তো অনেক ভালোবাসি সোনা।"
"সুত্যি?"
"হ্যাঁ।"
ইমতিহা আঙুল খাচ্ছে নিঃশব্দে। নিকিতা ঘাড় ঘুরিয়ে ওর দিকে ফিরে বলল,"ও একতা পুচা বাচ্চা। তাই না?"
"না মা। ও তো একটা বেবি। বেবিরা তো পঁচা হয় না।"
নিকিতা বিমর্ষ হয়ে বলল,"উকে আমার ভালু লাগে না।"
ইশান আস্তে আস্তে হাত বুলালো নিকিতার মাথায়। বলল,"ছোট বেবিদের যারা ভালোবাসে, বেবিরাও বড় হয়ে তাদের ভালোবাসে, তাদের কোলে যায়। তুমি যদি ওকে আদর করো, ও তাহলে সবসময় তোমাকে খুঁজবে, তোমার সাথে খেলতে চাইবে। তুমি চাও না ও তোমাকে ভালোবাসুক?"
"চাই তো।"
"তাহলে তোমারও ওকে ভালোবাসতে হবে ময়নাপাখি।"
"কিভাবি ভালুবাসবু?"
"এই যে একটু আদর করবে, পাশে বসে খেলবে, ঘুমানোর সময় ছড়া শোনাবে।"
"ছনা শুনবে?"
"শুনবে তো।"
"আমি একতা ছনা পারি।"
"বলো তাহলে।"
সেদিন গোসলের পর ইমতিহাকে ঘুম পাড়ালো তার বোন নিকিতা। সে তাকে একটা ছড়া শুনিয়ে ঘুম পাড়িয়েছে। চাচ্চু বলেছে, ইমতিহা কখনো এতো দ্রুত ঘুমায় না। শুধুমাত্র ইমতিহাকে নিকিতা ঘুম পাড়ালো বলেই সে আজ এতো আগে ঘুমিয়েছে। সাথে এটাও বলল,ইমতিহা নাকি বড় হয়ে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসবে নিকিতাকে। সেদিনই নিকিতা সব রাগ ভুলে গেল।
ইমতিহাকে ঘুম পাড়ানোর পর চাচ্চু যখন তাকে শক্ত করে বুকের সাথে চেপে অনেকগুলো আদর দিল, তখন নিকিতারও চোখ বুজে এলো আরামে। নিকিতা কেমন করে চাচ্চুকে বোঝাবে, পাপাইয়ের পর এই কোলটা তার কতো বেশি পছন্দের!
____
নিনীত বসে ছিল খাটের একপাশে। আপাতত ঘরে সে আর নিবেদিতা। নিকিতা গেছে ইশানের কাছে। ঐ ঘরে গেলে সে সহজে বের হয় না।
নিবেদিতা কোনো শব্দ না করে চুপচাপ ইজিচেয়ারে বসেছিল। চেয়ারটা হালকা হালকা দুলছিল। আজ সকালেই পাপাই নিকিকে পাঠিয়ে ওকে এই ঘরে এনেছে। এতোদিন পরে এই ঘরে ঢুকে নিবেদিতা সব ভুলে গেছে। ঢুকতেই একটা কাঠের টুলের সাথে ধাক্কা খেল।
ঠিক তখনই একটা গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো,"নিবি! সাবধানে হাঁটো। ডান দিক হয়ে হাঁটো।"
নিবেদিতা মাথা নাড়ল।
আস্তে করে হেঁটে ইজিচেয়ারে গিয়ে বসল। নিনীত খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছিল তাকে। হঠাৎ গম্ভীর হয়ে বলল,"নিবি! পায়ে কি হয়েছে?"
নিবেদিতা অবাক হলো। পায়ে কি হয়েছে, মনে পড়ছিল না। আদৌ পায়ে কিছু হয়েছে নাকি সেটাই মনে নেই।
"কি পাপাই?"
"ডান পায়ের বুড়ো আঙুল লাল হয়ে আছে। চুপচাপ বসো দেখি।"
নিনীত উঠে এসে হাঁটু গেড়ে বসল। হাত বাড়িয়ে নিবেদিতার পায়ের পাতা স্পর্শ করতেই সে লাফিয়ে উঠল। দ্রুত হাত বাড়িয়ে নিনীতের হাতটা সরিয়ে দিতে চাইল।
"পাপাই! পায়ে কেন ধরছ?"
নিনীত সরল না। হাতও সরাল না। শক্ত হয়ে বসে থেকেই মেয়ের দিকে তাকাল। গাঢ় স্বরে বলল,"পা ধরলে কিছু হয় না নিবেদিতা।"
নিবেদিতা মিন মিন করে বলল,"কিন্তু আরবি ম্যাডাম বলেছে, গুরুজনদের শরীরে পা লাগলে সালাম করতে হয়,পা সরিয়ে নিতে হয়।"
"সেটা অন্য প্রসঙ্গে বলেছে। পায়ে ব্যথা পেলে যে কেউ পা ধরতে পারে নিবেদিতা।"
"ওহহ।"
নিনীত বলল,"তুমি স্টিক ইউজ করো না তাই না?"
"মাঝে মাঝে করি।"
"সেজন্যই তো ব্যথা পাও।"
নিনীত দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,"স্টিক ব্যবহার করলে কেউ ছোট হয় না নিবেদিতা। চোখে দেখতে না পেলেও কারো জীবন ব্যর্থ হয়ে যায় না।"
নিবেদিতা ভেজা চোখ দু'টো সামলে নিয়ে মাথা নাড়ল।
"জি পাপাই।"
নিনীত আরো কিছু বলত। ও বলত,"অন্ধ হওয়া কোনো দোষ না সোনা। চোখে না দেখতে পারা কোনো অপরাধ না। পৃথিবীতে অনেক কুৎসিত ঘটনা ঘটে। যা আমরা দেখতে পাই বলে আফসোস করি। তোমাকে ঐ কুৎসিত ঘটনা গুলো দেখতে হবে না। তুমি নিজেকে ছোট ভাববে না কখনো। নিবেদিতা, পৃথিবীতে আমার জন্য সবচেয়ে কঠিন যদি কিছু হয়ে থাকে,সেটা হলো তোমাকে উপেক্ষা করা। এটা কি পিতা হিসেবে আমার ব্যর্থতা যে নিকিতার চেয়েও বেশি আমি তোমার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ি?"
নিনীত কিছুই বলল না। সোজা উঠে আবার আগের জায়গায় এসে বসল।
বসার পর মনে হলো, এভাবে উঠে যাওয়ার আসলে কোনো দরকার ছিল না। নিবেদিতা পায়ে ব্যথা পেয়েছে বলে এমন ব্যস্ত হওয়ার কিছু নেই। এই ব্যাপারটা মাঝেমধ্যেই তার সাথে ঘটে। বাচ্চাদের ব্যাপারে ভীষণ নির্বিকার হতে গিয়েও সে পুরোপুরি অবজ্ঞা করতে পারে না এদের। কেমন যেন লাগে। এরা সামনে এলে ভেতর থেকে খুব দুর্বল মনে হয় নিজেকে।
এর মধ্যে পারমিতা ঘরে এলো। এসে ব্যস্ত হয়ে বলল,"নিকিতা কোথায়?"
"ইশানের ঘরে।"
নিনীত আড়চোখে দেখল তাকে। পারমিতার চুলগুলো হালকা করে খোঁপায় বাঁধা। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। মুখটা বেশ স্বাভাবিক। হাসি কান্না কিছুই নেই।
পারমিতা দুই পা এগিয়ে এসে বলল,"একটু কথা বলতে পারি আপনার সাথে?"
"জি,অবশ্যই।"
"আপনার পাশে বসব।"
"শিওর।"
পারমিতা তার পাশে এসে বসল। বেশ কাছেই বসল। বসে নিনীতের হাঁটুর উপর হালকা করে হাত রেখে বলল,"নিনীত সাহেব! আপনি রাগ হয়েছেন?"
নিনীত অবাক হলো।
"রাগ কেন হবো?"
"বাবার আচরণে একটু আপসেট হয়েছেন বোধহয়।"
"ওহহ,ঐটা। জি, একটু হয়েছিলাম। আপসেট হইনি। রাগ হয়েছি সামান্য।"
"আপনার রাগ দূর করার জন্য আমি কি করতে পারি বলুন।"
"রাগ দূর করতে হবে না আর। এখন আর রেগে নেই আমি।"
"কেন?"
"ভেবে দেখলাম, আপনার বাবা ভুল কিছু করেনি। উনার জায়গায় আমি থাকলে বোধহয় এরচেয়ে আরো ভয়ংকর কিছু করতাম।"
"আপনি কেমন যেন মনমরা হয়ে আছেন।"
"না। আমার গলা বসে আছে।"
"বাবার পক্ষ থেকে আমি স্যরি।"
"ডোন্ট বি স্যরি। বললামই তো, বাবারা এমনই হয়। পৃথিবীর কোনো বাবাই তার মেয়েকে এমন জায়গায় সহ্য করতে পারবে না।"
"নিনীত সাহেব! আমি এই সংসারে ভালো আছি।"
নিনীত হাসল।
"ডাক্তার ম্যাডাম! বলুন, এই বাড়িতে ভালো আছেন। সংসারে ভালো আছেন, বলছেন কেন? সংসার তো হচ্ছে না।"
"ঐ আরকি।"
পারমিতা মোলায়েম দৃষ্টিতে তাকাল তার দিকে। নিনীত নির্বিকার মুখে বলল,"আমার মেয়েদের তো আমিই ঠিক মতো মর্যাদা দেই নি। আপনার বাবা কি দিবে?"
"আপনি হঠাৎ এমন অদ্ভুত করে কথা বলছেন কেন?"
"জানি না।"
"আমি কি আপনার দুই মেয়েকে কিছু সময়ের জন্য আমার বাবার কাছে নিতে পারি? বাবা ওদের সাথে পরিচয় হতে চাইছে।"
"আপনি জোর করেছেন পরিচয় হতে।"
"একদমই না। আমি আমার মেয়েদের গুণের বর্ণনা করেছি। আমি বলেছি, আমার দু'টো ফুল আছে। ওদের সাথে দেখা না করলে বাবা জানতেই পারবে না যে মানুষও কখনো রসগোল্লার মতো মিষ্টি হয়। ঠিক বলেছি না বলুন?"
নিনীত জবাব দিলো না। আড়চোখে একবার তাকাল পারমিতার দিকে।
পারমিতা আলতো করে তার একটা হাত ধরে বলল,"আমি ওদের নিয়ে যাই বাবার কাছে? বাবা ওদের খুব পছন্দ করবে বিশ্বাস করুন।"
নিনীত উত্তর দিতে গিয়ে গলায় একটা টান খেল। ভদ্রমহিলার সাধাসিধা মুখটা আজ খুব আপন মনে হলো। মনে হলো, উনি তো নিবেদিতা আর নিকিতার মা ই। কোনো আলাদা সম্পর্ক তো নেই।
পারমিতা ওদের দুইজনকে দুই হাতে ধরে শফি সাহেবের কাছে নিয়ে গেল। নিনীত দরজা পর্যন্ত হেঁটে এসে চৌকাঠ ধরে দাঁড়িয়ে দেখল তাদের। সেদিন প্রথমবার তার মনে হলো, পারমিতা আর তার মধ্যে বিশাল বিশাল কিছু পার্থক্য আছে।
পারমিতা প্রতিদানের আশা করে না। পারমিতা নিজের স্বার্থ নিয়ে ভাবে না। পারমিতা শোক দুঃখকে পাত্তা দেয় না।
নিনীত জানত, পারমিতার একটা দুঃখভরা সাগর ছিল। মাঝে মাঝে ভদ্রমহিলার দুই চোখ টইটম্বুর হতো জলে। সে কথা ঘোরাত, চোখ সরিয়ে নিত। কিন্তু চোখ ঘোরালেই কি দুঃখ হালকা হয়?
সেদিন অনেকটা সময় নিনীত দাঁড়িয়ে থাকল দরজা ধরে। গলার কাছটা টনটন করছিল। অজান্তেই ডাক্তার মিতা রং ছড়াচ্ছিল তার জীবনে। বিনিময়ে নিনীত ধূসর ধোঁয়া হয়ে সে রং গুলো হালকা করে দিচ্ছিল। আসলেই কি সংসার এমন হয়? সংসার কি কোনো চুক্তির উপর টিকে থাকতে পারে? রেজিস্ট্রি পেপারে সাইন করার পরেও কি কারো সম্পর্কের সমীকরণ এমন হতে পারে, যে একজন মরে গেলেও অন্যজনের কিছুই যায় আসবে না?
নিনীত ভাবল। ভাবতেই থাকল।
____
"আসসালামু আলাইকুম"
শফি সাহেব ভালো মতো চোখ খুললেন। তার সামনে দশ এগারো বছর বয়সী একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটির পরণে লম্বা ঢিলেঢালা ফ্রক। ঠোঁটে একটু হাসি। আর চোখ দু'টো বেশ শান্ত। তিনি প্রথম দেখাতেই চিনতে পারলেন তাকে।
ওর নাম নিবেদিতা। পারমিতা অনেকবার বলেছে তার কথা। মায়া ভরা একটা মুখ, চিরশান্ত দু'টো চোখ, পাতলা ঠোঁট, আর ফর্সা গাল। মেয়েটাকে প্রথম দেখাতেই চক্ষু শীতলকারী মনে হলো শফির। তিনি হেসে বললেন,"ওয়ালাইকুমুস সালাম নিবেদিতা। এসো, এখানে এসো।"
মেয়েটা বাধ্য মেয়ের মতো হেঁটে এলো। শফি সাহেব বললেন,"কেমন আছো তুমি?"
"আলহামদুলিল্লাহ ভালো। আপনি কেমন আছেন?"
"আমিও ভালো আছি।"
নিবেদিতা বলল,"আপনি কি এখানে থাকবেন আজ?"
"হু, থাকব তো।"
"তাহলে আমার ঘরে একবার আসবেন।"
"কেন? তোমার ঘরে কি আছে?"
"পিকু। আমার ময়নাপাখি। ওর সাথে আপনার পরিচয় করাব।"
শফি সাহেব উচ্চস্বরে হাসলেন।
"অবশ্যই অবশ্যই। একটু পরেই তোমার পিকুর সাথে দেখা করে আসব। তোমার ঘরে আর কি আছে নিবেদিতা?"
"আর তো কিছু নেই। মা শুধু পাখিই কিনে দিয়েছে।"
"তোমার আর কি কি পছন্দ শুনি।"
"আমার?" নিবেদিতা একটু লজ্জায় পড়ে বলল,"মা যেটা কিনে দেয়, ঐটাই আমার ভালো লাগে।"
"তাই? মা কে তুমি পছন্দ করো?"
"অনেক।"
"কি করে মা? ঘুম পাড়ায় রাতে?"
"হ্যাঁ, ঘুম পাড়ায়, চুল বেঁধে দেয়, আইসক্রিম খেতে নিয়ে যায়, ফুল এনে দেয়।"
শফি সাহেব চোখ ভরে দেখলেন তাকে। পারমিতা তো ভুল বলে নি। আসলেই তো দু'টো ফুল এসে ধরা দিয়েছে তার জীবনে।
পারমিতা ঘরে আসল নিকিতাকে কোলে নিয়ে। শফি বিমোহিত হয়ে বললেন,"তুমি কি দারুণ মা হয়েছো মিতা! তোমাকে আমি আর চিনতে পারছি না।"
নিকিতা ওর কোল থেকে নেমেই শফি সাহেবের গালের দু'পাশে হাত রাখল। চোখ চোখ রেখে বলল,"তুনি আমার নানা?"
"হ্যাঁ, আমি তোমার নানা।"
নিকিতা হাত বাড়াল। শফি তাকে কোলে তুলে বসালেন।
"নিকিতা! তুমি তো খুব সুন্দর দেখতে।"
লজ্জা পেল নিকিতা। মিন মিন গলায় বলল,"থানকু নানা। একতা চককেট দিও।"
"হাহাহা। আচ্ছা, দিব। একটা আদর দেই আপাতত?"
"হু। দাউ।"
শফি সাহেব বললেন,"আমি কিন্তু তোমার সাথে একটু রাগ হয়েছি নিকিতা।"
"কেনু?"
"আমি তোমার নানাভাই। অথচ তুমি একবারও ফোন দাও নি, আমার খোঁজ নাও নি। আমি খুব কষ্ট পেয়েছি।"
"তাই?"
"হ্যাঁ।"
"দাঁড়াউ। একতু দাঁড়াও।"
নিকিতা কোল থেকে নেমে ছুটল ঘরের বাইরে। পারমিতা স্বভাবসুলভ সাবধান করল তাকে। চেঁচিয়ে বলল,"সোনা আস্তে। পড়ে যাবে কিন্তু।"
__
শফি সাহেব বসে আছেন খাটে। তার পাশে নিবেদিতা। মেয়েটার কনিষ্ঠ আঙুল অল্প করে স্পর্শ করছে শফির হাতের পাতা। শফি সাহেব মুগ্ধ হয়ে দেখছেন তাকে। কি নির্মল দু'টো চোখ! তিনি কেমন করে বিশ্বাস করবেন, এই চোখে কোনো আলো নেই? নিকিতা গেছে কিছুক্ষণ হলো, এখনো আসে নি। পারমিতা খাটের কাছে দু'হাত জড়ো করে দাঁড়িয়ে আছে।
একটু পরে নিকিতা এলো ঘরে, দৌড়ে দৌড়ে। তার হাতে একটা ব্যাগ। ঐ ব্যাগের ভেতর শুধু খেলনা আর খেলনা। আমেনা খালা তার সব খেলনা গুছিয়ে রাখেন এই ব্যাগে। আরেকটা বাস্কেটও আছে। ওটা আপাতত খুঁজে পাচ্ছে না।
নিকিতা এসেই ব্যাগটা উপুড় করে ধরে সব খেলনা খাটে ফেলল। শফি সাহেব চমকালেন খুব।
"আরে আরে, করছো কি? হারিয়ে যাবে তো তোমার খেলনা।"
"তুপ!" নিকিতা আঙুল চাপলো ঠোঁটে।
"বেশি কতা বলবিন না।"
শফি সাহেব তার দেখাদেখি আঙুল চাপলেন মুখে।
"ঠিক আছে।"
নিকিতা খেলনা গুলো সামনে নিয়ে বসল। তার পর একে একে সবগুলো খেলনা শফি সাহেবের দিকে ঠেলে দিল।
শফি সাহেব অবাক হয়ে বললেন,"ওমা কেন? আমাকে কেন দিচ্ছ?"
নাগ কববে না। আমার ছব খেলনা তুমার। তুনি খেলো। নাও। ছব তোমার।"
পারমিতা হেসে বলল,"বলেছিলাম না বাবা? এই বাড়ি ম্যাজিকাল? এই দেখো, আমার ছোট মেয়ে তোমাকে ওয়েলকাম করছে খেলনা দিয়ে। ওর পছন্দের সব খেলনা তোমাকে দিয়ে দিচ্ছে। কারণ আমার মেয়ে জানে, খেলনার চেয়েও মানুষ বেশি দামি। তাই না সোনা?হাহাহা।"
____
ইয়াজিদ ঘরে এলো নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে, অনেকটা হেলে দুলে। কালো ট্রাউজারের একটা পকেটে তার হাত গোজা। বাতাসের ধাক্কায় বোতাম খোলা শার্ট দুই দিকে ছড়িয়ে যাচ্ছে। ভেতরে একটা কালো গেঞ্জি। হালকা ছাট দেওয়া চুলের একটা অংশ এখনো কপালের উপর পড়ে আছে।
ইয়াজিদ ব্যাক ব্রাশ করে চুলগুলো পেছনে ঠেলে দিল। সোজা দিয়ে রাশেদার ঘরে উঁকি দিয়ে বলল," আম্মা! হ্যালো, হাউ আর ইউ?"
রাশেদা আধশোয়া হয়ে চোখ বুজে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। তার পাশে আজমেরি বসা। রাশেদা চোখ বুজেই বললেন," আম্মা আম্মা করিস না। টাকাপয়সা লাগব ঐটা বল। নয়তো তোর জীবনে আম্মার দরকার নাই।"
"ইসসস আম্মা। এসব কেমন কথা? ইসসস। তোমারে আমি কতো চাই এটা তুমি জানো না?"
ইয়াজিদ হাসল। চট করে চোখ মেলে রাশেদা তার দিকে তাকালেন। ভ্রু জোড়া কুঁচকে নিয়ে বললেন,"তোর মতলব কি ইয়াজিদ?"
ইয়াজিদের মতলব পরিষ্কার বোঝা গেল না। সে আজমেরির দিকে তাকিয়ে গাঢ় হেসে বলল,"আজমেরি আপা, আপনি একটু বাগান থেকে বাতাস খাইয়া আসেন। আমি একটু কথা বলমু আম্মার সাথে।"
আজমেরি সাথে সাথে বেরিয়ে গেল। রাশেদার কপালের ভাঁজ আরো গাঢ় হলো। আগের মতোই তীক্ষ্ণ সুরে বললেন,"তুই আমারে জ্বালানের নতুন পায়তারা খুইজ্জা পাইছোস। তাই না?"
"না আম্মা। আমি তোমারে খুশি করতে আসছি। এই দেখো আমি চুল কাটছি।"
ইয়াজিদ লম্বা করে সামনের চুলগুলো টেনে দেখাল।
"দেখো আম্মা। আগে নাক পর্যন্ত নামত। এখন খালি কপাল পর্যন্ত নামে।"
"এদ্দুর কাটনের চেয়ে না কাটলে আরো ভালো হইত। পারলে কদম ছাট দিস। তোরে মানাইব।"
"কচু মানাইব আমারে। শোনো আম্মা, আমি একটা বিপদ ঘটায় আসছি।"
"কি করছস?"
"একটা মেয়েরে আমার খুব চোখে লাগছে।"
রাশেদার দুই চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল।
"কি কইলি? সত্যি?"
"হ। কিন্তু মণিরে বলি নাই। মাইয়া মানুষ নিয়া মণির সাথে কথা বলতে লজ্জা লাগে।"
"আমারে লজ্জা লাগে না?"
"না, তোমারে একটু কম লজ্জা পাই। শোনো না আম্মা।"
"কিহ?"
ইয়াজিদ লজ্জা পেল। ঘাড়ের পেছনটা চুলকে নত মুখে বলল,"মাইয়াডা পুরা ছবির মতো দেখতে আম্মা।"
"ভালা তো। ঘরে আইন্না ছবি বাঁন্ধায় রাখ।"
ইয়াজিদ হেসে ফেলল। রাশেদা বললেন,"করে কি তোর ছবির মতো মাইয়া?"
"টিচার। বাচ্চা কাচ্চা পড়ায়। আমার খুব ভাল্লাগছে আম্মা।"
"খোঁজ খবর নিসোছ?"
"ইসসস না। ভাল্লাগছে, তবে বিয়া করতে চাই না। বিয়া খুব ঝামেলার জিনিস।"
"তাইলে কি চাস?"
"একটু ঘরে আইন্না রাখতে চাই। মাঝে মাঝে একটু দেখমু, কথা বলমু, একসাথে হাঁটমু। এট্টুকই।"
আরেকদফা লজ্জা পেল ইয়াজিদ। মিস মণিষার প্রসঙ্গটা একান্তই ব্যক্তিগত তার কাছে। এই কথা তাশরিফকে বলা সম্ভব না। মেয়ে ঘটিত ব্যাপারে সে এতো অপমান করেছে তাশরিফকে! এই মুখ নিয়ে সে আর মেয়ে সম্পর্কিত কিছু বলতে পারবে না তাকে। আর বলা যায় নিনীতকে। কিন্তু নিনীত ওর কথা শুনলেই মুখ কুঁচকাবে, নাক তুলবে। ইয়াজিদের কি হয়েছে কে জানে,মিস মণিষার ব্যাপারে কেউ নাক কুঁচকাচ্ছে ভাবলেই তার রাগ উঠে।
রাশেদা দেখলেন তার ছোট ছেলেকে। কিছুটা লজ্জা, কিছুটা দ্বিধা নিয়ে সে বসে আছে তার পাশে। তিনি হাত বাড়িয়ে ডাকলেন ছেলেকে। বড় আদর আদর কণ্ঠে বললেন,"আয়, আম্মা আদর কইরা দেই তোরে।"
"আদর করলে কি হইব?"
"আদর করলে মাথা খুলব। ছবির মতো সুন্দর স্কুল মাস্টাররে কেমনে জীবনে রাখা যায়, ঐ বুদ্ধি পাইবি।"
"আম্মা, তুমি তো লজ্জা দেও খালি।"
"আয়, আম্মার কাছে আয়।"
ইয়াজিদ এলো। আস্তে করে রাশেদার বুকে শক্তপোক্ত মাথাটা সপে দিল। রাশেদা দুর্বল দু'টো হাতে ছেলেকে আগলে ধরলেন। ওর মসৃণ,ঘন চুলে হাত বুলাতে বুলাতে একটা চুমু খেলেন মাথায়।
"আব্বাজান! আমার ছোট আব্বাজান। তোমারে আম্মা কতো ভালোবাসি! তুমি আম্মার কথা শুনো না।"
"মিথ্যা কথা বইল্লেন না আম্মা। আপনে ভাইজানদের বেশি ভালোবাসেন।"
"না। সবাই জানে আমি তোমারে ভালোবাসি। তুমি আমার জান। তুমিই জানো না খালি।"
ইয়াজিদ উত্তর দিলো না। আজ সকাল থেকে বড়ো অস্থির হয়েছিল মনটা। এখন গিয়ে একটু ভালো লাগছে। সে মাথা নামিয়েই বলল,"আম্মা আমি কিন্তু তোমার জন্য পানও আনছি। একদম এক নাম্বার দোকান থেক্কা। খাইয়া জানাইবা কিন্তু।"
___
সদ্য পরিচিত নানাভাইকে বাচ্চা দু'জনের খুব ভালো লাগল। দাদাভাই তো ওদের কম আদর করত না। তবুও এই নতুন লোকটাকে তাদের কেন এতো ভালো লাগল, সেই উত্তর তারা স্পষ্ট জানে না।
এক সন্ধ্যায় এই নানাভাইয়ের সাথে নিকিতা আর নিবেদিতার খুব মিষ্টি একটা স্মৃতি জুড়ে গেল।
শফি সাহেব বিকেলে একটু বেরিয়েছিলেন। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরলেন হাতে একটা লোহার খাঁচা হাতে। খাঁচার ভেতর চারটা ধবধবে সাদা খরগোশ।
এসেই ডাকলেন দুই বোনকে।
"নিবেদিতা! নিকিতা! এসো তো তোমরা। দেখে যাও একটা জিনিস।"
নিবেদিতা তখন পড়ছিল তার হোম টিউটরের কাছে। আওয়াজ শুনতেই ছটফটিয়ে উঠল। আয়তি মাথা তুলে বলল,"নিচে যাবে নিবি? তোমার নানাভাই বোধহয় কিছু এনেছেন তোমার জন্য।"
সব বয়সী পুরুষদের প্রতি আয়তির একটা সন্দেহভাজন দৃষ্টি থাকে। শফির ক্ষেত্রে এমনটা ছিল না। দুই একটা ঘটনা দেখেই তার মনে হলো, বাচ্চা দু'টোর প্রতি ভালোবাসায় শফি সাহেবের কোনো অন্য মতলব নেই।
নাহ, একটা মতলব অবশ্য ছিল। তিনি তার মেয়েকে খুব ভালোবাসতেন। যখন তিনি উপলব্ধি করলেন,তার মেয়ের ভালো থাকা জুড়ে আছে এই দুইটি বাচ্চার সাথে, তখন তিনি নির্দ্বিধায় মেনে নিলেন তাদের।
আয়তি স্বভাবে অন্তর্মুখী। অনেক কথা বলতে গিয়েও শেষে গিলে নিয়েছে, নিজের ভেতর চেপে রেখেছে। নয়তো তার ইচ্ছা একদিন শফি সাহেবের সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করবে,"আপনার কষ্ট হয়নি যখন আপনি জেনেছেন, অন্তঃসারশূন্য একটা সংসারে আপনার মেয়ে তার পুরো জীবন ঢেলে দিয়েছে? আপনি কেন আপনার মেয়েকে সরিয়ে নিচ্ছেন না? অনুভূতি মরে গেছে, এমন মানুষের সাথে কি কখনো সংসার করতে আছে?"
সে যখন নিবেদিতাকে নিয়ে নিচে নামল, তখন দেখল শফি সাহেব দুই জোড়া খরগোশ হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। একজোড়া নিবেদিতার, অন্য জোড়া নিকিতার। তাদের নাকি বন্ধুর অভাব। শফির ধারণা, মানুষের চাইতে প্রাণীরাই বন্ধু হিসেবে অধিক বিশ্বাস যোগ্য।
নিবেদিতা খরগোশ দু'টোর একটিকে হাতে নিয়ে খুশিতে কান্না করে দিলো। শফি সাহেব তার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে ভীষণ কোমল স্বরে বললেন,"এই দেখো নানাভাই। তোমার ঘরে আরো দু'টো নতুন বন্ধু এসেছে।"
নিবেদিতা আস্তে করে হাত ছোঁয়াল খরগোশটার পিঠে। আঁতকে উঠে বলল,"ও এখন থেকে সবসময় আমার সাথে থাকবে?"
"অবশ্যই।"
"আমার সব কথা শুনবে?"
"অবশ্যই।"
নিবেদিতা আবার খুশিতে আত্মহারা হলো। খরগোশ রেখে শফি কে জড়িয়ে ধরে বলল,"থ্যাংক ইউ নানাভাই। আমি ওকে কখনো ব্যথা দিব না। ও অনেক আদর।"
"একদম। ঠিক তোমার মতো।"
নিকিতা তার জন্য আনা খরগোশ দু'টো দেখেই বিশাল এক চিৎকার করে উঠল। নিনীত আওয়াজ শুনে ধড়ফড় করে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। ও ভেবেছিল, হয়তো পড়ে গিয়ে ব্যথা পেয়েছে। কিন্তু সিঁড়ির কাছে আসতেই চমকে গেল।
নিকিতা খরগোশ দেখেনি আগে। এদের দেখেই তার মাথা ঘুরে গেল। চিৎকার করে দৌড়ে এসে একটা খরগোশ ধরতে চাইল। মাঝে আবার একটু ভয়ও পেল। শফি সাহেবের দিকে তাকিয়ে দোটানায় পড়ে বলল,"কামুড় দিবে না তু?"
"না না। ওরা ভালো। তোমাকে কামড় দিবে না।"
নিকিতা আস্তে করে শফির ভরসায় একটা খরগোশ কোলে তুলে নিল। নিনীত অবাক হয়ে দেখল, নিকিতা দুইহাতে একটা খরগোশ চেপে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। তার গালভর্তি হাসি। আনন্দে দুই চোখ তারার মতো জ্বলছে। নিনীতকে সিঁড়ির কাছে দেখতেই সে চেঁচিয়ে উঠল আনন্দে। হাতে ধরা খরগোশ টা তাকে দেখিয়ে বলল,"পাপাই! আমি একতা খরগুশ ধয়েছি। দেখু, ও কতো কিউত! পাপাই, হিহিহি। ও আমাকে তুমু দিচ্ছে। পাপাই, হিহিহি।"
নিনীত এগোতে পারল না। এমন করেই দাঁড়িয়ে থাকল কিছুক্ষণ। ঠিক ঐ জায়গায় দাঁড়িয়ে তার মনে হলো, বাবা হিসেবে সে একেবারে শূন্য। অ্যাডভোকেট শফি তাকে নতুন করে বাবা হওয়ার সংজ্ঞা শেখাল সেদিন।
_____
সেই রাতেই নিনীতের সাথে শফির কথা হয়েছিল একান্তে। শফি সাহেব চাচ্ছিলেন আলাদা করে কিছু কথা বলতে। নিনীত ভেবে পাচ্ছিল না উনাকে ঠিক কিভাবে মিথ্যা বলবে।
পারমিতাই সব শিখিয়েছে তাকে। বলেছে, সে যেন বলে তারা দু'জন পারস্পরিক আলোচনা করে নিজেদের পছন্দে বিয়ে করেছে। যেন বলে, তাদের সম্পর্ক স্বাভাবিক, সুস্থ, এবং আর দশজন দম্পতির মতোই।
নিনীত স্বাধীনচেতা মানুষ। বিয়ের সময় সে আগেই বলেছিল, পারিবারিক, সামাজিক এসব শব্দের কোনো লেনাদেনা নেই তাদের সম্পর্কের মধ্যে। চাইলেই শফি সাহেবকে সে সবটা খুলে বলতে পারত। বলতে পারত, এই বিয়ে আসলে একটা আই ওয়াশ। তবুও কেন যেন ইচ্ছে হয়নি।
সে ঠিক তাই বলেছে, যেটা পারমিতা তাকে শিখিয়ে পড়িয়ে দিয়েছে।
শফি এক পর্যায়ে চোখ মুছে বললেন,"জানো, আমি নিজের ক্যারিয়ার, নিজের পেশার পেছনে এমনভাবে ছুটেছি, যে আমি কোনোদিন আমার মেয়েটার দিকে তাকাতে পারি নি। ও শুধু মানুষ চাইত জানো? আমার খুব ভালো লাগছে যে পারমিতা তার জীবনে এতো এতো মানুষ পেয়েছে। কিন্তু সব মানুষ তো একান্ত কাছের হয় না। তুমি পারমিতার সবচেয়ে আপনজন। তুমি পারমিতার খেয়াল রেখো। ও বোকা, মনের দিক থেকে স্বচ্ছ। তুমি ওকে যত্নে রেখো নিনীত। ওর মনে কষ্ট দিও না। ও সেপারেশন দেখে বড় হয়েছে। যদি পারো, ওকে এই দুঃখ থেকে নিস্তার দিও।"
শফি সাহেব আবার চোখ মুছলেন। নিনীত বাইরে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তারপর ভাসা ভাসা চোখে ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে গাঢ় স্বরে বলল,"আমি তো পারমিতাকে কখনো ছাড়বো না,স্যার। শি ইজ মাই ওয়াইফ। ও সারাজীবন আমার সাথে থাকবে, আমার জীবনে থাকবে, এটাই কি স্বাভাবিক না?"
বলা বাহুল্য, এই কথা তাকে পারমিতা শিখিয়ে দেয়নি। এটা সে নিজ থেকেই বলল, ঠিক ঐ জায়গায় বসে তার মনে হলো, পারমিতাকে সে সারা জীবনের জন্যই গ্রহণ করেছে।
চলবে-
[আয়তি সীমান্ত, ইয়াজিদ মণিষা, সব আসবে একে একে। ধৈর্য ধৈর্য ধৈর্য।]