#আম_পাতা_জোড়া_জোড়া -২২
লেখনীতে #মেহরিমা_আফরিন
ইয়াজিদ পায়ের উপর পা তুলে বেশ শান্তিতে বসে ছিল। তাশরিফ এসেছে কিছুক্ষণ আগে। তার মুখটা বেশ প্রাণবন্ত। ইয়াজিদ কারণ জিজ্ঞেস করতেই বলল,আজ নাকি তার মেয়ে ইংরেজিতে অ্যাপল লিখতে পেরেছে।
শুনতে পেয়েই ইয়াজিদ কপাল কুঁচকাল। ইচ্ছে করেই নাক ছিটকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল তাশরিফের দিকে।
তাশরিফ শক্ত মুখে বলল," এ্যাই খবরদার! আমার মেয়েকে নিয়ে কপাল কুঁচকাবি না ভুলেও।"
"আরে বাবারে! খুব প্রেম তাই না? শালা তুই যদি বিয়েটা না করতি, নিজের কথা রাখতিস, তাহলে কি আজ আর বাচ্চা কাচ্চা কিছু হতো? শালাহ, মাইয়া মানুষ দেখলেই হুশ থাকে না, না? দেখতে গিয়াই পছন্দ কইরা আসছে। এমনই সুন্দর চরিত্র তার।"
তাশরিফ থমথমে মুখে বলল," কেন? দেখতে গিয়েই পছন্দ করা যায় না? এক দেখায় কি কাউকে ভালো লাগতে পারে না?"
ইয়াজিদ দুই দিকে মাথা দোলায়। অত্যন্ত আত্মগরিমার সাথে জবাব দেয়,"না, একদমই না। আমার তো কোনোদিন কাউকে এক দেখায় ভালো লাগে নি। এসব কাদের হয় জানিস?"
"কাদের?"
"যাদের চরিত্রে দোষ আছে, তাদের।"
তাশরিফ চুপ হয়ে গেল। জবাব দিল না কোনো। এই কথা সে এই নিয়ে অসংখ্য বার শুনে ফেলেছে। তার চরিত্রে সমস্যা। এজন্যই প্রথমবার মেয়ে দেখতে গিয়ে সে ব্যাচেলর থাকার পণ ভেঙে ফেলেছে। এক মাসেই বিয়ে করে সংসার বেঁধেছে। আসলে মনে মনে সে নারীদের প্রতি আকৃষ্ট ছিল। এজন্যই মেয়ে দেখে আর নিজেকে সামলাতে পারে নি। একেবারে যা তা!
এই তো,পাঁচ বছর যাবত তাশরিফ এই প্রহসন সহ্য করছে। দাঁতে দাঁত চেপে অপেক্ষা করছে একটি মূহুর্তের। যেই মুহূর্তে ইয়াজিদকে সে ঠিক ঐ একই জায়গায় দাঁড়াতে দেখবে। একটা মেয়ে, একজন নারী,যে হুট করে জীবনে আসবে, জীবনটাকে ভীষণ ভাবে বদলে দিবে। প্রথম দেখা, প্রথম প্রেম, সেই প্রেমের কি অনুভূতি, সেটা ইয়াজিদকে জানতেই হবে।
হালকা করে মাথা নাড়ে তাশরিফ। ইয়াজিদ এখনো অনর্গল তার চরিত্রের বিশ্লেষণ করে যাচ্ছে। সে শুনছে মুখ বুজে। হঠাৎ করে ঘরের দরজায় টোকা পড়ল। কে যেন এসে দাঁড়িয়েছে সেখানে। তাশরিফ মাথা ঘোরাল। শব্দের উৎস অনুসরণ করে ইয়াজিদ নিজেও চোখ সরাল সেদিকে।
চোখ ফেলতেই দৃষ্টি আটকে গেল। বড় বড় চোখে সে দেখল, ধূসর রঙের শাড়ি পরে একজন ভদ্রমহিলা দাঁড়িয়ে আছেন চৌকাঠে। তার মুখটা বেশ গম্ভীর। তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে ছিলেন দেয়ালের হলদে রংটার দিকে।
ইয়াজিদ এক লাফে উঠে দাঁড়াল। অবাক হয়ে বলল,"মিস মণিষা। আপনি?"
মণিষা এবার সোজাসুজি তাকাল তার দিকে। সে নিজেও অবাক হয়েছে ভীষণ। এই জায়গায় কেউ তাকে নাম ধরে ডাকবে, সে আশা করে নি। আশ্চর্য হয়ে ডান দিক ঘুরতেই ইয়াজিদের মুখটা চোখে পড়ল।
"আপনি?"
চশমার ফ্রেমটা আবার যত্ন সহকারে দুই চোখের মাঝামাঝি ঠেলে দিল মণিষা। নরম স্বরে বলল,"আসতে পারি ভেতরে?"
ইয়াজিদ মাথা নাড়ল। মণিষা ভেতরে ঢুকল। তার হাত ধরে ছোট ছোট পদক্ষেপে ভেতরে ঢুকল আরেকটা ছেলে। একটা ছোট বাচ্চা ছেলে। ইয়াজিদ চোখভর্তি বিস্ময় নিয়ে চেয়ে থাকল বাচ্চাটার দিকে।
মণিষা ভেতরে এসেই হাসল সামান্য।
"আপনি এখানে?"
"জ..জি। এটা আমারই কালচারাল সেন্টার। আমি এটার সভাপতি।"
ইয়াজিদ তার পাশে, তার হাত ধরে দাঁড়ান গোলগাল মুখের বাচ্চাটাকে দেখে বলল,"ও কে?"
ভ্রু দু'টো বেঁকে আছে তার। যেন বাচ্চাটার পরিচয় জানা খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মণিষা গভীর স্বরে, অত্যন্ত স্নেহময় কন্ঠে বলল,"ওর নাম সহস্র। আমার ছেলে।"
ইয়াজিদ বিস্ফারিত চোখে তাকাল। আবছা স্বরে কিঞ্চিৎ আর্তনাদ করে বলল,"কি? ছেলে?"
মণিষা ভড়কে গেল। ভদ্রলোকের হতভম্ব মুখটার দিকে তাকিয়ে মৃদুস্বরে বলল,"জি, ছেলে। আপনি ওকে চেনেন?"
ইয়াজিদ দ্রুত ডানে বায়ে মাথা নাড়ল। মুহূর্তেই স্বাভাবিক করে নিল নিজেকে। সহজ হেসে বলল,"না না। চিনি না। এইমাত্র চিনলাম। বাহ, খুব মিষ্টি তো দেখতে।"
মণিষা হাসল তার কথায়। মাথা নামিয়ে কোমল চোখে বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে অতি আন্তরিক কণ্ঠে বলল,"ওর নাম সহস্র। আমার ছেলে।"
শক্ত করে দাঁতের পাটি চেপে ধরল ইয়াজিদ। সে কি বয়রা? বার বার কেন তার কানের কাছে এসে বলছে,আমার ছেলে আমার ছেলে।
শুনতে পায় ইয়াজিদ। বুঝতে পারছে, এটা তার ছেলে।
রাগ, হতাশা, হৃদয়ের অশান্ত অবস্থা কোনো কিছুই প্রকাশ পেল না তার মুখে। ইয়াজিদ হাসল। দ্রুত মাথা নেড়ে বলল,"বসুন না। প্লিজ বসুন।"
মণিষা বসল। পাশের চেয়ারটা টেনে সহস্রকেও বসাল। তার কাঁধ থেকে ব্যাগটা সরাতে সরাতে বলল,"দাও, ব্যাগটা মাকে দাও।"
ইয়াজিদ শান্ত চোখে বোকার মতো তাকিয়ে থাকল তাদের দিকে। মন চাইছে পুরো শহরের সমস্ত বিলবোর্ডে বড় করে লিখে দিতে-"আমার নাম ইয়াজিদ শায়েরান সিরাজ। আমি একটা ভুদাই। আমি সব ফেলে বিয়াত্তা মহিলা পছন্দ করেছি। ছিহ!"
মণিষা চোখ বড় বড় করে বলল,"আপনি এখানকার সভাপতি। অথচ ইশি এই কথাটা কখনো বলে নি আমাকে।"
তাশরিফ বিচলিত হয়ে বলল,"আপনারা পূর্ব পরিচিত?"
মণিষা মাথা নাড়ল। আগের মতোই সহজ গলায় বলল,"জি, উনি ইশির বাবা। আর ইশি আমার স্টুডেন্ট। সেই হিসেবেই পরিচয়।"
তাশরিফের শরীরের তাল হারিয়ে যাচ্ছিল। ধড়াম করে নিচে পড়ে যাওয়ার আগেই সে টেবিলটা ধরে ফেলল। মুখে কিছু বলল না। কেবল বিস্ফারিত, হতবিহ্বল চোখে তাকাল ইয়াজিদের দিকে। তার ভাষাহীন মুখ দেখে একবার ঝেড়ে কাশল ইয়াজিদ। স্বর নামিয়ে বলল,"জি, ইশির মাধ্যমেই আমাদের পরিচয়।"
মণিষা সোজা হয়ে শান্ত মুখে বসে আছে। ইয়াজিদ একদফা তার থেকে চোখ লুকিয়ে তাশরিফকে কিছু একটা ইশারা করল। বলল, পরে সবটা বুঝিয়ে বলব। আপাতত চুপ থাক।
তাশরিফ আর কিছু বলল না। কেবল মাথা নেড়ে ঘাড়টা নামিয়ে ফেলল মেঝের দিকে।
ইয়াজিদ দু'হাত তুলে টেবিলের উপর রেখে হাসি মুখে জানতে চাইল,"মিস, কিভাবে সাহায্য করতে পারি আপনার?"
মণিষা বলল,"আমার কলিগ পারভীন আপার মাধ্যমে আপনাদের কালচারাল সেন্টারের খোঁজ পেয়েছি। পারভীন আপার মেয়েও এখানে ক্লাস করে। গান আর হাতের লিখার ক্লাস।"
"ওওও। আপনি কোন প্রয়োজনে এসেছেন?"
মণিষা মৃদুহেসে বলল,"আবৃত্তি আর হাতের লিখা।"
"ওহ আচ্ছা।"
মণিষা বলল,"আবৃত্তির ক্লাস কোন কোন দিন হয়?"
"বৃহস্পতি শুক্র শনি।"
"আর হাতের লিখা?"
"সোম মঙ্গল বুধ।"
"ওহ, আমার তো তাহলে ছয়দিনই আসতে হচ্ছে।"
একটু বিষন্ন দেখাল তার দুই চোখ। ঘরের কাজ সামলে, স্কুলে ক্লাস নিয়ে আবার সহস্রকে নিয়ে বিকেলের অবসর সময় গুলো এখানে ব্যয় করতে হবে ভেবে কপালে একটু চিন্তার ভাঁজ পড়ল।
নাহ, ভাবাভাবির কিছু নেই। সে ঠিক করেছে, বাজার সে রবিবার করবে। ঐদিনটাই তো ফাঁকা আছে কেবল।
ইয়াজিদ থমথমে মুখে সামনে তাকাল। দেখল, ভদ্রমহিলার পাণ্ডুর মুখ। যেন ছয়দিন এখানে আসতে হবে শুনে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে তার।
ইয়াজিদ আপন মনে স্বগোতক্তি করল।
"আসিস না ছয়দিন। একদিনও আসার দরকার নাই। সোজা উঠে চলে যা। এমনিতেও বিয়াত্তা মহিলা মানুষ দেখে আমার কোনো কাজ নাই। ফাজিল!"
সে কিছু বলল না। খচ করে পাশ থেকে একটা ফর্ম টেনে মাথা নামিয়ে বলল,"বলুন। নাম বলুন আপনার ছেলের।"
"সহস্র হায়দার।"
"মাদারস নেইম?"
"মণিষা সিদ্দিকা।"
"ফাদারস নেইম?"
মনিষা শ্বাস ফেলল ধীরে। আস্তে করে বলল,"সোহাইল হায়দার।"
ইয়াজিদ চোয়াল শক্ত রেখে নামটা লিখে। সোহাইল। কি অপরাধ করেছিল সে? কোন বাড়া ভাতে ছাই দিয়েছিল জনাব সোহাইলের? যে তার এতো সাধ করে পছন্দ করা একটা জিনিস চোখের পলকে কেড়ে নিল?
দীর্ঘশ্বাসে ভারি হতে থাকে তার বুক। ইয়াজিদ মাথা নামিয়ে শক্ত হয়ে বসে ফরম পূরণ করে। মণিষার সই নেয় জায়গা মতো।
বলে,"আজ থেকেই কি ক্লাস করবে?"
মণিষা পাশ ফিরে তাকাল ছেলের দিকে। হেসে বলল,"কি বাবা? আজকেই ক্লাস করবে?"
"একটু ভেতরে যেয়ে দেখে আসি মা?"
মণিষা বলল,"ও কি একটু ভেতরে যেতে পারবে?"
"হ্যাঁ অবশ্যই।"
মাথা নাড়ল ইয়াজিদ। উঠে দাঁড়িয়ে শার্টের হাতা গুটাতে গুটাতে বলল,"অবশ্যই। চলো আমার সাথে চলো। তোমাকে তোমার ক্লাস গুলো দেখিয়ে আনি।"
সে হেঁটে এগিয়ে গেল সামনের দিকে। একবার হাতও ধরল না সহস্রর। বাচ্চাদের প্রতি ওর স্নেহ যথেষ্ট গাঢ়। ও কখনো এমন উদাসীনতা দেখায় না। তাশরিফ অবাক হয়ে ডাকল,"ইয়াজিদ! ওকে সাথে নিয়ে যা। ও তো চেনে না কিছু।"
ইয়াজিদ থামল। কটমট চোখে ঘাড় বাঁকিয়ে তাকাল তাশরিফের দিকে। এরপর বরফের মতো ঠান্ডা স্বরে বলল,"আয়, তুই নিয়ে আয় ওকে।"
*
সংশপ্তকের ভেতরটাও সহস্রর খুব পছন্দ হয়েছে।পরিষ্কার ক্লাসরুম। দেয়ালের মাঝে অসংখ্য আর্টওয়ার্ক। বেঞ্চের উপর জলরঙের ছাপ, তুলির আঁচড়। বাতির রং হলদে কমলা। ক্লাসরুম হলেও স্কুলের ঘর গুলোর মতো আঁটসাঁট না। সে পিট পিট চোখে দেখছিল সবকিছু।
তাশরিফ গিয়ে কনুই দিয়ে খোঁচাল ইয়াজিদ কে। ইয়াজিদ বিরক্ত চোখে তাকাতেই প্রশ্ন ছুড়ল,"কিরে? এই মহিলা তোকে চেনে কেমন করে? আবার বলছে ইশির বাবা।"
"ইশির স্কুলে বাপ সেজে গেছিলাম। তাই চেনে।"
"সর্বনাশ!"
"কিসের সর্বনাশ?"
"এখন যদি জেনে যায়?"
"কচু জানবে। জানার কোনো উপায় নাই।"
"বেলী ভাবির যদি কোনোভাবে দেখা হয় তার সাথে?"
"ওর সাথে কি আমি হাঙ্গা বসমু যে বেলী ভাবির দেখা হবে? বালছাল কথা কইস না। মেজাজ এমনেই গরম। পারলে আমি এই পোলার এডমিশনই নিতাম না।"
"কেন?"
"আশ্চর্য! আরেক বেডার বাচ্চারে আমি কেন পড়ামু? অয় পড়াক ওর বাচ্চারে। আবৃত্তি শিখাক।"
তাশরিফ হাসল।
"সবসময় তো আরেক লোকের বাচ্চাকেই পড়াস।"
"প্যাঁচাল পারবি না তো। প্যাঁচাল ভাল্লাগে না।"
ইয়াজিদ বিক্ষিপ্ত চোখে চেয়ে থাকে বাচ্চাটার দিকে। কি সুন্দর চোখ, কি সুন্দর ঠোঁট, কি নিষ্পাপ চেহারা। অথচ এই বাচ্চাটাকে দেখে তার সব জ্বলে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে অ্যাডমিশন বাতিল করে ওর মায়ের হাত দু'টো ধরে মাথা নামিয়ে বলতে,"আপা, আপনে আপনার ছেলেরে অন্য জায়গায় ভর্তি করান। আমি প্রতিদিন আপনেরে এক বাচ্চার মা হিসেবে সহ্য করতে পারমু না। আমার কলিজায় লাগে।"
ইয়াজিদ অবশ্য বলল না শেষ পর্যন্ত কিছুই। উল্টো তাশরিফের কোঁচকানো মুখ, আর সন্দিহান দু'টো চোখ দেখে তাকে মেকি আহ্লাদ দেখাতে হলো সহস্রকে। তাশরিফ খুব চালাক। যেমন করে বার বার চোখ ঘুরিয়ে দেখছিল তাকে, ইয়াজিদের মনে হচ্ছিল, এখনই সে তার ভেতরটা পড়ে ফেলবে।
ইয়াজিদ গিয়ে হাত বুলালো সহস্রের মাথায়। সামনে যেতে যেতে বলল,"কাল থেকে কিন্তু সময় মতো আসবে, বাচ্চা। ঠিক আছে?"
সহস্র মাথা নাড়ল। হেসে বলল,"জি আঙ্কেল। মা আমাকে ঠিক সময়েই নিয়ে আসবে।"
ইয়াজিদের মুখটা কালো হলো আবার।
আঙ্কেল?
মিস মণিষার ছেলে তাকে আঙ্কেল ডাকছে। ইয়াজিদ দম ছাড়ল আনমনে।
হেঁটে যেতে যেতে বিড়বিড় করল,"তুই আঙ্কেল। তোর বাপ আঙ্কেল। আল্লাহ, তুমি এডা কি করলা আমার সাথে? এতো বড় পাপে আমারে না জড়াইলেও পারতা। নাহ, আমি আজকে তওবা করমু ঘরে গিয়া। এরপর যদি আর কোনোদিন মণিষা মিসরে দেখছি চোখ তুইল্লা, তয় আমি একটা হারামজাদা।"
___
দিনকাল বেশ ভালোই যাচ্ছিল নিকিতা মজুমদারের। সারাদিনে এতো এতো কাজ করতে হচ্ছিল যে রাতে ঘুমাতে গিয়ে পুরো দিনটাকেই ছোট মনে হতো তার। মনে হতো, চব্বিশ ঘন্টা খুবই কম সময়। নিকির আরেকটু সময়ের প্রয়োজন।
সে সকালে তাড়াতাড়ি উঠছে ইদানিং। মমা ক্লিনিকে যাওয়ার আগে তাকে চুমু দিয়ে তুলে দিয়ে যায়। কতোক্ষণ আবার বুকের সাথেও চেপে রাখে। পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে বলে,"আমার সোনা পাখি, আমার ময়নাপাখি। আমার টুকটুকি।"
নিকিতা সাথে সাথে মাথা নাড়ে। প্রতিবাদ করে বলে,"না না। আমি তুকতুকি না। আমান খরগুশ তুকতুকি।"
"ওহহহ, আচ্ছা। তোমার খরগোশ টুকটুকি। টুকটুকি ভালোবাসে তোমাকে?"
"এততু এততু। মমা!"
"কি?"
নিকিতা লজ্জা পেয়ে চোখ নামিয়ে বলল,"একতা আইসপিম এনো। পিইইজ?"
পারমিতা হাসল।
"একটা কেন? তিনটা আনব। নিকিতার একটা, নিবেদিতার একটা, আর ইরোজের একটা।"
"ইরুজ তু আইসপিম খায় না। ওর গলায় ব্যতা হবি তো।"
পারমিতা হাসল শব্দ করে।
"ইরোজেরই শুধু ব্যথা হয়, তাই না? আর তোমার কিছু হয় না।"
মমা চলে যাওয়ার পর নিকিতা যায় নিচে। গিয়ে কতোক্ষন দিদুনি আর দাদাভাইয়ের সাথে গল্প করে, তাদেরকে বাড়ির খবর জানায়, পাপাই তাকে কতোক্ষণ চোখের সামনে রাখে, কতোক্ষণ কথা বলে, সবকিছু জানায়।
তারপর যায় ইমিতাহার কাছে।
ইমতিহা!
নিকিতার জীবনের সবচেয়ে কৌতূহলের বস্তুটি। ও ভেবে পায় না, ঘুমানো কি করে কারো এতো প্রিয় হতে পারে?
এরপর সে যায় তার খরগোশদের কাছে। ঐ খরগোশ গুলো নিবেদিতার বারান্দাতেই থাকে। কি সুন্দর গোল গোল চোখ!
নিবেদিতা খুব কম সময় এদের কোলে নেয়। তার ভয় হয়। কোলে নিলেই যদি ফেলে দেয়?
তবে তাকে বেশির ভাগ সময়ই পাওয়া যায় বারান্দায়। খোলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিচু আওয়াজে কি যেন বলে। তার শ্রোতা হলো একটা ডানপিটে ময়না পাখি আর চারটা খরগোশ।
নিবেদিতা আজও খাঁচার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। আলতো করে দুইটা আঙুল খাঁচার লোহার শিকে রেখে গভীর স্বরে বলল,"পিকু! গুড মর্নিং। তুমি কেমন আছো?"
পিকু জবাব দেয় না। শুধু তাকায় তার দিকে। ঠোঁট নেড়ে কি যেন শব্দ করে।
নিবেদিতা বলল," আজ বোধহয় খুব রোদ উঠেছে তাই না? গরম গরম লাগছে। আচ্ছা পিকু! রোদ কেমন বলো তো?চোখের পাতায় রোদ পড়লেই ব্যথা ব্যথা হয়। রোদ কি খুব খারাপ?
কিন্তু আমার টিচার বলেছে, রোদ খারাপ না। রোদ না থাকলে পৃথিবীতে মানুষই থাকত না। আমি থাকতাম না, তুমি থাকতে না, আমরা কেউ থাকতাম না। রোদ মানে কি জানো? মানে হলো সূর্যের আলো। সূর্য কি জানো? সব শক্তির উৎস।
এ্যাই পিকু! শোনো না আমার কথা। তুমি আমার কথা না শুনলে কিন্তু রাতে আমি আর আসব না তোমার কাছে। এরপর সারারাত তুমি কাঁদবে।"
পিকু একটু করে শব্দ করল। নিবেদিতা নিজেই হাসল কিছুক্ষণ। হেসে বলল,"কি? তুমি ভয় পেয়েছ? ভাবছ সত্যিই আসব না? আরে আমি তো মিথ্যা কথা বলেছি। আসলে তো আসব।"
সে একটু থামল। পর পর নিঃশ্বাস ছেড়ে হাসি মুখে বলল," তুমি জানো, আমি কার মতো? আমি আমার পাপাইয়ের মতো। আমার পাপাইও খুব মিথ্যা কথা বলে। পাপাই বলে, পাপাই আমাকে একটুও ভালোবাসে না। কিন্তু পাপাই প্রতি সোমবার আমার ঘরে আসে। আমাকে দেখে যায়। তুমি অবাক হচ্ছো? ভাবছ অন্ধ হয়ে এতো কিছু জানি কেমন করে? আসলে পিকু, আল্লাহ তো তোমারও। আল্লাহ তো আমারও। আল্লাহ আমায় অন্ধ করেছে তো কি হয়েছে? বিনিময়ে আল্লাহ আমায় অনেক শক্তি দিয়েছে। আমি ঘ্রাণ চিনি মানুষের। আমার আশেপাশে আমার খুব কাছের কেউ থাকলে আমি সেটা টের পাই।
জানো পিকু, আমার পাপাইয়ের অনেক কষ্ট। পাপাই আমার সামনে বসে থাকে আর একটু পর পর চোখ মোছে, নাক টানে। পাপাইয়ের এতো কষ্ট কেন বলো তো? আমরা কষ্ট দিয়েছি তাকে? কি এমন কষ্ট দিলাম বলো তো?
পিকু, কথা দাও, একটা কথা তুমি কাউকে বলবে না।
আমি...আমি আসলে পরী মা কে খুব ভালোবাসি। কিন্তু পাপাইয়ের চেয়ে একটু কম। আচ্ছা যাও মিথ্যা বলব না। একটু বেশিই কম।
পরী মা ভালো, পরীর মতো ভালো। কিন্তু পাপাইয়ের গন্ধটা আর কোথাও নেই পিকু। আমি কি আর কোনোদিন পাপাইয়ের সাথে ঘুমাতে পারব না? পাপাই কি আর কোনোদিন আমাকে জোছনার গল্প বলবে না? চাঁদের গল্প শোনাবে না? বলবে না যে পৃথিবীর সব আলো মিশে আছে আমার নিবির চোখে? নিবির চোখ জোছনার রং জানে, দুঃখের রং জানে, বর্ষার রং জানে। পৃথিবীর মানুষ তো এতো রং জানে না। শুধু আমার নিবির চোখ জানে।
এ্যাই পিকু খবরদার! তুমি এই কথা মা কে বলবে না। মা খুব ভালো। মা আমাকে সবকিছু কিনে দেয়, আমার চুলে হাত বুলিয়ে দেয়, আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। আমি তো মা কেও ভালোবাসি। তুমি যদি মা কে কষ্ট দাও, তাহলে আমি আর কোনোদিন তোমার কাছে আসব না।
এটা সত্যি। আর কখনো আসব না।
জানো পিকু, মায়েরও না অনেক কষ্ট। আমার মাঝে মাঝে ঘুম ভেঙে যায়। তখন শুনি মা বাচ্চাদের মতো কাঁদে। কেন কাঁদে বলো তো? বড় মানুষদের এতো কষ্ট কেন? আমিও কি বড় হলে এভাবে কাঁদব?
আরে তোমাকে তো আরেকটা কথা বলা হয়নি। নানাভাই চলে যাওয়ার পর আমি আরো দুইবার পাপাইয়ের ঘরে গিয়েছিলাম। পাপাই কিছু বলে নি। হাত ধরে বেরও করে দেয় নি। শুধু চুপ হয়ে বসেছিল। পিকু, এ্যাই পিকু, বলো না। পাপাই কি আমাকে মাফ করে দিয়েছে? পাপাই কি আর বকা দিবে না আমাদের?
তুমি জানো, পাপাইয়ের উপর আমার খুব রাগ।
একবার নিকির অনেক শরীর খারাপ হলো। দিদুনি গেল পাপাইকে ডাকতে। পাপাই রেগে বলল,"ও মরে গেলেই বা আমার কি? ওর মা মরেছে, ওও মরুক। আমার তাতে কি?"
পাপাই কিভাবে এটা বলল পিকু? নিকিতা কোনোদিন পাপাইকে একটা চিমটিও কাটেনি। আমি অনেক রাগ হয়েছি পাপাইয়ের সাথে, অনেক কষ্ট পেয়েছি। নিকিতা অপমান, অবহেলা, তাড়িয়ে দেওয়া, এসব বুঝত না। বার বার পাপাইয়ের কাছে যেত। পাপাই কিভাবে বলল ও মরে যাক? এরপর আমিও ভেবেছি, পাপাইয়ের ঘরে আর যাব না কোনোদিন। আমি খুব বড় হয়ে যাচ্ছি জানো? নিকিতাকে কেউ সামান্য কিছু বললেও আমার হাত পা শক্ত হয়ে যায়, ঘুষি মারতে মন চায়। চোখ থাকলে বোধহয় আমি খুব জেদি হতাম পিকু। অবশ্য চোখ নেই বলেও যে দুঃখ আছে তা না। আমি দিনে একশোবার বলতে পারব, আমি অন্ধ আমি অন্ধ আমি অন্ধ। তাতে কার কি? আল্লাহ বানিয়েছে আমায় অন্ধ। নিশ্চয়ই চোখ থাকলে আমি এমন কিছু দেখে ফেলতাম, যেটা পরে গিয়ে কষ্ট দিত আমায়।
তাছাড়া আমার চোখের কি প্রয়োজন? পাপাইয়ের চোখ দিয়ে আমি ময়ূর দেখেছি, কাঁক চিনেছি, সমুদ্র দেখেছি, আকাশের গান শুনেছি। আর কি দরকার চোখের? আর আমার যদি চোখ থাকত, তবে কি পাপাই এতো ভালোবাসত আমায়? তুমি জানো একটা সিক্রেট? পাপাই কিন্তু এখনো কান্না করে আমার জন্য। পাপাইয়ের গন্ধ চিনি আমি, কান্নার শব্দও বুঝি।
আল্লাহ আমাকে এতো বুদ্ধি কেন দিল বলো তো? ইশি ফুপ্পি আর ইমি ফুপ্পিও তো কতো কিছু বুঝে না। আর আমি দশ মিনিট এক জায়গায় বসেই কতো কি বুঝে যাই! এতো বুদ্ধি আর ভালো লাগে না। বুদ্ধি কম হলে আদর বেশি পেতাম। ব্যথা পেয়ে চুপ করে বসে থাকতাম না। সবাইকে জড়ো করে কাঁদতাম কতোক্ষণ। কিন্তু আমি তো এমনটা চাই না। মানুষকে চিন্তায় ফেলতে ভালো লাগে না আমার।
আমি চাই শুধু পাপাইয়ের মনোযোগ। পাপাইয়ের মতো তো আর কেউ নাই পিকু। নিজে না ঘুমিয়ে সারারাত বসে পিঠে ব্যথা নিয়ে মেয়ের সেবা করবে, এমন কেউ তো আর নাই পৃথিবীতে। পিকু, এ্যাই পিকু! আমার খুব কান্না পাচ্ছে। তুমি কথা গুলো প্লিজ কাউকে বলবে না। ওরা শুনলে কষ্ট পাবে খুব। আমি চাই না কেউ কষ্ট পাক।
আর তুমি একটা দোয়া করো তো। দোয়া করো যেন, আল্লাহ আমার পাপাইয়ের সব কষ্ট দূর করে দেয়। পাপাই কি জানে না নিবেদিতা আর নিকিতা তাকে কতো ভালোবাসে?"
নিবেদিতা চোখ মুছল। খুব আস্তে, প্রায় নিঃশব্দে হাতটা সরিয়ে নিল খাঁচা থেকে। পিকু এখন ডাকছে। শব্দ করে কি যেন বলার চেষ্টা করছে। নিবেদিতা আঙুল তুলে বলল,"এ্যাই খবরদার! তুমি কিন্তু সবার আগে পাপাই ডাকবে। বলো তো পাপাই। পা পা ই। পাপাই।"
____
নিনীত ঘরে বসেছিল চুপচাপ। আজ কিছুদিন যাবত ঘরের দরজা সে খোলাই রাখে। মানে সন্ধ্যার সময়টাতে। সেই সময়ে নিকিতা আসে তার ঘরে। কতো কথাই শুনিয়ে দিয়ে যায়। সে শুধু মাথা নাড়ে। ভেতরে দোলুল্যমান স্বত্তাকে প্রশ্ন করে,"নিনীত! তুমি সত্যিই পারবে? সত্যিই এগোতে পারবে সব ভুলে?"
ভুলতে নিনীত পারে না। ভুলে যাওয়া সে কতো বড় নেয়ামত,সেটা মাঝেমধ্যেই টের পায়।
হ্যাঁ,ভেতরের প্রাচীরটা ধ্বসে গেছে সময়ে সময়ে। ঐটা আর সেই প্রথমদিনের মতো মজবুত নেই। এখন মেয়েদের দেখলে তার ঠোঁট হাসে, চোখ হাসে। তার আর অসহ্য লাগে না তাদের। মনেও হয় না যে তারা ধরলে তার শরীর পঁচে যাবে। সে সয়ে নিয়েছে। উহু, মেয়েদের না। দুঃখদের।
মেয়েদের তো সে....থাক, ঐসব কথা তোলা থাক। মেয়েদের কথা বেশি ভাবতে গেলেই তার চোখ ছলছল করে। আর নিজের কথা? আহা, কতোদিন হলো সেই কথাও ভাবেনি। বাড়ির ব্যবসাটা তার প্যাশন ছিল। নতুন নতুন ক্লায়েন্ট ডিল করা, মিটিং হ্যান্ডেল করা, ইনভেস্ট করা, গ্রাউন্ড লেভেলে গিয়ে সবকিছুর তদারকি করা, জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটা অংশ ছিল তার জন্য। নিজের জন্য, নিজের ভালো থাকার জন্য ঐ ব্যবসার দায়িত্ব নিয়েছিল সে। তার ভালো লাগা, প্যাশন, পরিশ্রম সবকিছু মিশে ছিল ঐ ব্যবসাতে। ঐটাও তো ছেড়ে দিল শেষ পর্যন্ত।
নিনীত ম্লান হাসে। ব্যবসা? গোটা জীবনই তো তছনছ করে দিয়েছে সে। আর নতুন করে কি শেষ হবে?
মেয়েদের ইদানিং তাড়িয়ে দেয় না সে। মেয়েরা আসে,বসে, কতো কথা বলে। সে মাথা নামিয়ে শোনে এসব। এখনো শক্ত হয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না সামনে গিয়ে কি করবে সে? সবটা স্বাভাবিক করে নেওয়া আর বাস্তবেই সেটা করে দেখানোর মধ্যে পার্থক্য আছে। দিনে দিনে গড়ে উঠা দ্বিধা, সংকোচ, বিতৃষ্ণার দেয়াল সে হুড়মুড় করে ভাঙতে পারবে না।
আর ডাক্তার পারমিতা? ঐ মহিলার পরিণতি কি? তাকে নিনীত কি হিসেবে গ্রহণ করবে? কেবল একটা চুক্তি হিসেবে? অথচ তার অন্তর জানে, এই ভদ্রমহিলা এর চেয়ে কিছুটা বেশি ডিজার্ভ করে।
সেদিন সন্ধ্যায় নিকিতা এলো তার ঘরে। পিছু পিছু নিবেদিতাকেও আনল। সে এসেছে তার খরগোশ নিয়ে। দুই হাতে দুইটা খরগোশ। নিবেদিতার হাত খালি।
নিনীত মাথা তুলে একবার তাদের দেখে আবার মাথা নামিয়ে নিল। নিকিতা মন খারাপ করে বলল,"পাপাই পাপাই দেখু না। উদের কান ছুতু হয়ে যাচ্ছি।"
"কি আজগুবি কথাবার্তা! কান কেন ছোট হবে?"
"দেখু। কান গুলো নিচে পড়ে যাচ্ছে।"
"ও ঘুমাবে নিকিতা। ওকে একটু ঘুমাতে দাও।"
"ঘুমাতে দিয়েছি তো পাপাই। রাতে তু ছবসময় ঘুমায়।"
"ওর দিনেও ঘুম পায়।"
"আমান তু পায় না।"
"তুমি তো খরগোশ না। দয়া করে তুমি ওকে খাঁচায় রেখে আসো। ও কিন্তু বিরক্ত হচ্ছে তোমার উপর।"
"বিনক'ত হলে তি হবে?"
"কামড় দিয়ে আঙুল আলাদা করে দিবে হাত থেকে।"
নিকিতা আঁতকে উঠল ভয়ে। তাড়াতাড়ি করে খরগোশ দু'টোকে নিনীতের কোলের উপর ছেড়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল তাকে। ভীত স্বরে বলল,"উহহহ, ভোই পাচছি তো। আর ধববো না।"
নিনীত হাসল। নিবেদিতা হাত দু'টো আড়াআড়ি রেখে শান্ত মুখে দাঁড়িয়ে ছিল তাদের সামনে। নিনীত একটু সরে বসল। গম্ভীর হয়ে বলল," বসো নিবেদিতা। দাঁড়িয়ে আছো কেন?"
নিবেদিতা বসল চুপচাপ। নিনীত তার কোলের উপর থাকা খরগোশটার পিঠে হাত বুলিয়ে বলল,"নিবি! তুমি খরগোশ কেমন চিনতে পারছো?"
"হু। একটু একটু চিনেছি।"
নিনীত একটা খরগোশ হাতে তুলে নিল। তারপর আলতো করে নিবেদিতার হাতটা খরগোশের পিঠে তুলে দিয়ে বলল,"খরগোশ হলো একদম সাদা। আর পরশগুলো কার্পেটের মতো। একদম তুলতুলে নরম।খরগোশের দু'টো সুন্দর সুন্দর কান আছে। চোখ আছে। ওরা বাদাম গাজর সবজি খুব পছন্দ করে। খুব নিরীহ আর আদর আদর প্রাণী। এই ধরো আমাদের নিকিতার মতো। খুব এডোরেবল।"
নিবেদিতা হাসল। আরেকটু বাবার গা ঘেঁষে বসে হেসে উঠে বলল,"চিনতে পারছি বাবা।"
"জানো, খোলা মাঠে কিন্তু খরগোশদের খুব সুন্দর দেখায়। ঘাসের সবুজ রং, আর এর ভেতরে সাদা রঙের খরগোশ। সাদা আমার প্রিয় রং।"
"আর আমার প্রিয় রং কালো।"
নিবেদিতা জোর গলায় বলল। নিনীত অপলক চোখে তার দিকে তাকিয়ে একটা ঢোক গিলে বলল,"কালোই জগতের আলো।"
এমন সময় পারমিতা এলো ঘরে।এইমাত্র সে ক্লিনিক থেকে বাড়ি ফিরেছে। তার হাত ভর্তি লিলি ফুল। ঘরে ঢুকেই সে বিস্মিত হলো প্রথমে।
"ওরে বাবারে! এ আমি কি দেখছি। নিনীত সাহেব তার মনের দরজা, থুক্কু ঘরের দরজা খুলে বসে আছে। আর সেই ঘরে তার দুই কন্যা এক্কা দোক্কা খেলছে। ইশশ, কি সৌভাগ্য আমার!
নিনীত সাহেব, আপনি তো অন্য গ্রহের মানুষ দেখছি। টক মিষ্টি ঝাল তেতো সবকিছুর ফ্লেভার আছে।"
নিনীত থমথমে চোখে তাকাল।
"কিসব বাজে কথা বলছেন! আমি আমার মতোই আছি।"
"তাই? মেয়েরা আজ আপনার ঘরে। অথচ আপনার এলার্জি শুরু হচ্ছে না এখনো। এদের দেখলে তো আবার আপনার গা চুলকায়।"
"বুঝেছি। আপনি ফালতু আলাপ পারতে এখানে এসেছেন।"
"একদমই না। আমি এসেছি আপনাদের লিলি দিতে।"
নিনীত তাকাল তার হাতের দিকে।
"লিলি? উপলক্ষ কি?"
"কোনো উপলক্ষ নেই। মানুষজন তাদের ভালোবাসার মানুষ কে লিলি দিচ্ছে। আমি ভাবলাম, আমিও আপনাদের দেই। এই যে, সবার জন্য লিলি।"
নিনীত কপাল কুঁচকে বলল,"সবাইটা কে কে?"
"সবাই মানে বাড়ির সবাই।"
"ও।"
পারমিতা একটা ফুল বের করে তার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,"এই নিন, এটা আপনার।"
নিনীত হাত বাড়িয়ে ফুলটা নিল। মৃদু স্বরে বলল,"ধন্যবাদ।"
নিকিতা আর নিবেদিতাও ফুল পেল। ইয়া বড় বড় দু'টো ফুল। নিকিতা ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,"আরো দুইতা দাও।"
"কেন?"
"আমার খরগুশের জননো।"
"এহহ!" পারমিতা চোখ পাকিয়ে বলল,"লিলির জোড়া নয়শো টাকা। তোমার খরগুশকে দিতে পারব না সোনা। আমার সব ভালোবাসা শুধু মানুষের জন্য।"
নিকিতা কপাল কুঁচকে তাকিয়ে থাকল তার দিকে। পারমিতা আয়নার কাছে গিয়ে কতোক্ষন নিজেকে দেখল, তারপর দেখল নিজের হাতে থাকা ফুল গুলো। এরপর ঝুঁকে এসে ঘ্রাণ নিল। তৃপ্ত স্বরে বলল,"ইশশ! কি সুন্দর!"
কিছুক্ষণ নিজেকে আয়নায় দেখে পেছন ঘুরে বলল,"যাই, সবাইকে গিয়ে দিয়ে আসি।"
নিকিতা বলল,"আমিও যেতে চাই।"
"আসো। মমার হাত ধরো।"
নিকিতা দৌড়ে গেল তার কাছে। পারমিতা ওকে নিয়ে দরজার কাছে যেতেই নিনীত হঠাৎ ব্যস্ত হয়ে বলল,"আপনার লিলি কোথায়?"
পারমিতা থামল। হাসি মুখে বলল," আমার জন্য কিনি নি।"
"কেন?"
"আমার জন্য তো গত মাসেই কিনেছিলাম। আমি আবার একটু নার্সিসিস্ট আছি।"
বলেই সে চটপট নিচে নেমে গেল। নিনীত শুধু হাসল তার চলে যাওয়ার পথ দেখ। মিথ্যা কথা, ডাহা মিথ্যা কথা। ভদ্রমহিলা নার্সিসিস্ট, এই কথা সে বেঁচে থাকতেও বিশ্বাস করবে না, মরে গেলেও না। নিনীত জানে, ঐ মানুষটার কাছে কি দারুণ একটা মন আছে!
নিবেদিতা বলল,"আচ্ছা পাপাই। লিলি দেখতে কেমন?"
"লিলি?"
নিনীত ভাবল সামান্য। তারপর চোখ নামিয়ে তাকাল নিজের হাতে থাকা হালকা নীল ফুলটার দিকে।
"উমমম, লিলি খুব সফ্ট ফ্লাওয়ার। অনেক রঙের হয়। রংগুলো সব হালকা। আমার হাতে যেটা আছে, ঐটার রং পাউডার ব্লু, আর তোমার হাতের টা বেবি ইয়েলো। দেখতে খুব স্নিগ্ধ। কিন্তু লিলিদের কপাল খারাপ, ওরা ডাক্তার পারমিতার হাতে পড়েছে।"
"কেন?"
"কারণ পারমিতার কাছে লিলিও ফেড আউট হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, ডাক্তার ইবনাত ঝলমল করে সব আলো টেনে নিচ্ছেন, আর লিলিরা বড্ড ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে তার আলোর কাছে। ডাক্তার মিতাই তো আলো, সত্যিকারের লিলি।"
নিবেদিতা লাজুক হাসল। হাতের ফুলটা বুকের কাছে ধরে নিনীতের বাহুতে গাল চেপে বলল,"পাপাই, পরী মা কি সত্যিই পরীদের মতো?"
"উমমম....হ্যাঁ, বলা যায়। পরীদের মতোই বোধহয়। লাইভলি লাইক লিলিস।"
নিবি বলল,"আমার মনে হয়, পরী মা প্রিন্সেসদের মতো।প্রিন্সেসরা সবাইকে ভালোবাসে। মাও সবাইকে ভালোবাসে। দেখো, মা সবার জন্য ফুল এনেছে। আমি জানি, মা আমেনা দাদুর জন্যও ফুল এনেছে। মা এতো ভালো কেন বলো তো পাপাই?"
নিনীত অন্যমনস্ক হয়ে গেল। ঘোরের মধ্যে বলল," জানি না সে কেন এমন। কোনো চাওয়া পাওয়ার চুক্তি বাদেই সে কেন এতো নিবেদিত সেটাও জানি না। শুধু জানি, সে জনে জনে লিলি বিলিয়ে যাচ্ছে। ডাজন্ট শি নৌউ দ্যাট, শি হারসেলফ ইজ আ লিলি?"
চলবে-
[রিচেক দিব পরে। এতো বড় কেন হয় জানি না। দুইটা অংশ বাদ দিয়েছি। ঐগুলো পরের পর্বে এড করে দিব। পড়ার পর মন্তব্য জানাবেন কিন্তু।]