ফন্ট সাইজ:
থিম:
আম পাতা জোড়া জোড়া

পর্ব 23

লেখক: মেহরিমা আফরিন

#আম_পাতা_জোড়া_জোড়া -২৩.[প্রথমাংশ]
লেখনীতে #মেহরিমা_আফরিন

ঘুম নিয়ে জ্যোতির কোনোদিন বিড়ম্বনা পোহাতে হয়নি। তার স্বভাবে অনেক ত্রুটি থাকলেও আলস্য ছিল না কোনোদিনই। হাতের কাজ সে সবসময়ই গুছিয়ে রাখত।

জ্যোতির দোষ কিংবা বদঅভ্যাস ছিলো শুধুমাত্র একটা জিনিসে। শখ। প্রায় সময় তার অনেক কিছুর শখ হতো। এই যেমন সেদিন একটা লাইটিং করা গ্যাসবেলুন দেখে তার খুব লোভ হলো। লোকটাকে জিজ্ঞেস করতেই দাম বলল,একশো বিশ টাকা।

সংসারের এই টানাপোড়েনে একশো বিশ টাকা অনেক বেশি। জ্যোতি জানত তার পকেটের অবস্থা শোচনীয়। এটাও জানত, আর আটদিন পরেই আব্বার ডায়ালাইসিসের ডেট। তাকে নিয়ে যেতে হবে হাসপাতালে। বাড়িতে বাজার ছিল সীমিত। জাবিরের জন্য ডিম কেনা হয়নি। জাবিবের আবার কিসব ভূত চেপেছে মাথায়। পেটানো শরীর বানাতে উঠে পড়ে লেগেছে ছেলেটা। সে নাকি ব্যয়াম করে শরীর পোক্ত করবে। তার জন্য তার চাই রোজ এক হালি ডিম। সংসারের এই সমস্ত চাহিদার কথা জ্যোতি জানত। জানত, নিম্ন মধ্যবিত্ত সংসারে এই গ্যাস বেলুনটা একটা বাহুল্যই বটে।

কিন্তু ঐ যে,স্বভাবটা খুব খারাপ ছিল তার। আগপাছ না ভেবেই সেদিন একশো বিশ টাকা খসিয়ে সে গ্যাস বেলুনটা কিনল। সেটা হাতে পাওয়ার পর তার মনে হলো, বেলুনের সাথে সে নিজেও উড়ছে আকাশে। কি আনন্দ! কি আনন্দ!

জ্যোতির স্বভাবই ছিল এমন। হুটহাট অপ্রয়োজনীয় জিনিসের শখ করে বসত। তারপর পকেটের কথা তেমন একটা না ভেবেই চট করে কিনে ফেলত সেটা। ঐ ছোট ছোট শখ যতোদিন না পূরণ হতো, ততদিন জ্যোতির দমবন্ধ লাগত সবকিছু।

অনার্স শেষ করার পর মাস্টার্স করার মতো প্রয়োজনীয় সময় পায়নি সে। মাস্টার্সের আগেই চাকরির পরীক্ষার জন্য আবেদন শুরু করল। পাশাপাশি টিউশনও করাত। সেই টাকা আর আব্বার পেনশনের টাকা দিয়ে সংসার চলত তাদের। মোট টাকার পরিমাণ বেশ ভালোই ছিল। শুধুমাত্র আব্বার ডায়ালাইসিসের খরচটা সব টাকা উধাও করে দিত। মাসের সতেরো আঠারো তারিখে গিয়েই জ্যোতি টের পেত, পকেট ফাঁকা। সেখানে অর্থের পরিমাণ সামান্য।

রোজ বিকেলে টিউশন পড়াতে যেত সে। মাসজুড়ে মোট তিনটা টিউশন। বেতন বারো হাজার টাকা। টিউশন শেষ করে ফেরার পথে জাবিরকে নিয়ে আসত খেলার মাঠ থেকে। জাবিবের আবার খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ জন্মেছে কয়েক মাস হলো। বিকেলের আলো নরম হতেই সে বেরিয়ে পড়ত কাঠের ব্যাট হাতে। কলোনির সামনের খোলা মাঠে ব্যাট ঘুরিয়ে লম্বা লম্বা ছক্কা হাঁকাতো ছেলেরা। জাবির এতো দক্ষ ছিল না। তবে আগ্রহ ছিল তুমুল। সেই মাঠে তার সবচেয়ে প্রিয় ছিল সীমান্ত হাবিব।

ওহহ, জ্যোতিও অবশ্য চিনত তাকে। সন্ধ্যার আগে জাবিরকে মাঠ থেকে আনতে গেলেই তার সাথে দেখা হতো।
ছেলেটার চেহারায় বেয়ারা ভাবটা স্পষ্ট। বাউন্ডুলে, উদাসীন আর উষ্কখুষ্ক একটা মুখ। চোখের দৃষ্টি চঞ্চল। তবে জ্যোতিকে দেখলে স্থির হতো কিছুটা। শরীর মন শান্ত করে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকত মেয়েটার দিকে।

জ্যোতি হয়ত বুঝত সেই দৃষ্টিটা। আবার হয়ত বুঝত না। তবে ছেলেটাকে উচ্ছৃঙ্খল মনে হয়নি কখনো। ভবঘুরে হলেও আচরণে কিংবা দৃষ্টিতে বেশ সংযত ভাব ছিল। জ্যোতির সাথে যতবারই কথা বলেছে, ততবারই নম্র হয়ে মাথা নামিয়ে আলাপ এগিয়েছে।

সেদিনও অবশ্য দেখা হয়েছিল তার সাথে। বিকেলের উত্তাপহীন রোদ তখন কমলা রং ধারণ করেছে। জ্যোতি মাঠের কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়াতেই দেখল সীমান্ত ব্যাট হাতে দাঁড়িয়ে আছে। ওভার শেষ হতে আর দুই বল বাকি। সে এই মাঠের পুরাতন এবং সবচেয়ে পাকা খেলোয়াড়দের একজন। তাকে আউট করা মুশকিল। ঘন্টাখানেক হলো সে ব্যাটিং করছে। কচি কচি ছোকরারা তার হাত থেকে ব্যাট কেড়ে নিতে উদগ্রীব হয়ে আছে। অথচ সে লম্বা তিনটে স্ট্যাম্প রক্ষা করে যাচ্ছে সুকৌশলে। তাকে হারাবে? হ্যাহ, এতো পটু এই এলাকায় আর কে আছে?

জ্যোতি গলা বাড়িয়ে ডাকল জাবিরকে।
"এ্যাই জাবির! তাড়াতাড়ি এসো। আযান দিয়ে দিবে একটু পরে।"

জাবির কোনো প্রতিবাদ ছাড়া একেবারে বাধ্য ছেলের মতো ব্যাট বল গুছিয়ে পাকা রাস্তার দিকে হাঁটতে শুরু করল। তার হাতের রগে ব্যথা হচ্ছিল খুব। এমনিতেও খেলায় মনোযোগ দিতে পারছে না। তাই মাঠে থাকা নিয়ে কোনো আগ্রহও ছিল না তার।

সীমান্ত ঘাড় বাঁকিয়ে শীতল চোখে তাকায় দু'জনের দিকে। কিছুদিন আগে অরুনার মাধ্যমে জ্যোতিকে সে একটা চিঠি দিয়েছিল। সেই চিঠির কোনো প্রতিউত্তর তো দূর, সেই চিঠির মর্মার্থ বুঝে তার মুখে যেই ন্যুনতম ভাবভঙ্গি প্রকাশ পাওয়ার কথা, সেটাও পেল না।

চিঠি দেওয়ার কাজটা সে ইচ্ছে করেই অরুকে দিয়ে করাতো। জাবিবের মুখ পাতলা। ওকে দিয়ে চিঠি পাঠালে সেটা এই মহল্লায় আর কারো অজানা থাকবে না। উল্টো রসিয়ে রসিয়ে আরো কাহিনি বাড়বে। সীমান্ত তাই এই গুরু দায়িত্ব অরুনাকেই দিয়েছিল। অরুনা কাজ করে নিঃশব্দে। যা হুকুম করা হয়, সেটাই মাথা নামিয়ে পালন করে।

সীমান্ত হাতের ব্যাট টা শব্দ করে মাঠের উপর ছুড়ে মারল। কপালে বাঁধা কালো রুমালটা খুলে এনে হাতে প্যাচাল। হাত দু'টো বুকের উপর ভাঁজ করে হেঁটে যেতে যেতে ঠান্ডা স্বরে বলল,"তোরা খেল। আমি একটু আসি।"

দীর্ঘসময় ধরে তাকে আউট করতে না পেরে বিষন্নতায় মুষড়ে পড়া কিশোর ছেলেদের দলটা তার মাঠ ছাড়ার ঘোষণায় আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল একপ্রকার। এর মধ্যে একজন ছুটে গিয়ে থাবা দিয়ে মাটি থেকে তার ব্যাটটা তুলে নিয়ে ক্রিজে দাঁড়িয়ে পড়ল।

সীমান্ত এগোল সামনে। জাবির কে নিয়ে জ্যোতি হাঁটতে শুরু করতেই পেছন থেকে মৃদু স্বরে বলল,"জ্যোতি। একটু শোনো।"

জ্যোতি থামল। ঘাড় ঘুরিয়ে হালকা গলায় বলল,"জি?"

সীমান্ত হেঁটে এসে তার পাশাপাশি দাঁড়াল। জানতে চাইল,"তোমাকে একটা চিঠি দিয়েছিলাম। তার কোনো জবাব দাও নি কেন?"

জ্যোতি কপাল কুঁচকাল। অবাক হয়ে বলল,"চিঠি?"

"হ্যাঁ।"

"আমি তো কোনো চিঠি পাই নাই।"

"কি? অরু তোমারে চিঠি দেয় নাই?"

"না।"

জ্যোতি নির্বিকার কণ্ঠে বলল। বলে আবার জাবিরের হাত ধরে সামনে এগিয়ে গেল। সীমান্ত তাজ্জব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল কতোক্ষণ। সে চিঠি পায়নি। অরুও তাকে চিঠি ফেরত দেয় নি। তাহলে চিঠিটা গেল কোথায়?

____

ইয়াজিদ খাটের উপর বসে বসে ঝিমুচ্ছিল। ঠান্ডায় গলা বসে গেছে। একটু পর পর হাঁচি দিচ্ছে আর নাক মুছছে। সকালে পরিকল্পনা ছিল বাইক নিয়ে কিছুক্ষণ টইটই করবে। কিন্তু সেই পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে মণির কারণে। মণি নাকি কাল তাকে নিয়ে খুব বাজে একটা স্বপ্ন দেখেছে। তাই আজ তার বাইক নিয়ে ঘুরাঘুরি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

ইয়াজিদও অবশ্য কোনো প্রকার জোরাজুরি করে নি। মণির আদেশ কিংবা হুকুমের উপর বরাবরই একটা আনুগত্য ছিল তার। শুধুমাত্র বিয়ে বাদে। ঐটাতে সে কারো মন্তব্যের ধার ধারেনি কখনো।

সুষ্মিতা এসে তার হাতের কাছে একটা কাপ রেখে গেল। কাপের ভেতর লাল রঙের তরল। আদা লেবুর চা। ইয়াজিদ মাথা তুলে বলল,"কে করল? মণি নাকি তুমি?"

"আমি।"

"তাহলে ভালো। মণি প্রচুর মসলা দেয়। আমার মাথা ঘুরায়।"

সুষ্মিতা ব্যস্ত হয়ে বললেন,"তাড়াতাড়ি খেয়ে নে। ঠান্ডা হয়ে গেলে কিন্তু কাজ হবে না।"

ইয়াজিদ কাপটা হাতে নিয়ে বলল,"ও ভাবি! ঘরে কোনো খাবার নাই?"

"আছে তো। বিস্কুট আছে, চানাচুর আছে, পুডিং আছে।ওহহ ফ্রিজে রোল সমুচা সব আছে। ভেজে দিব?"

"না, ভাজাভাজির দরকার নাই। আমেনা আপার মেয়েটারে দিয়া একটু চানাচুর পাঠাও। হুদাই বইসা থাকতে বিরক্ত লাগে।"

এমন সময় ঘরে ঢুকল আহিল। খুবই ব্যস্ত পায়ে। ঢুকেই গলা তুলে ডাকল,"চাচ্চু, এ্যাই চাচ্চু!"

ইয়াজিদ ঠেস দিয়ে বসল খাটের সাথে। ঠান্ডা স্বরে বলল,"কি চাই আবার?"

আহিল দুই হাতে থাকা টি শার্ট দু'টো দুই পাশে ধরে বলল," কোনটা সুন্দর বলো তো?"

সুষ্মিতা বললেন,"তুই কোথায় যাচ্ছিস আহিল? আজ না তোর ভার্সিটি বন্ধ?"

আহিল সেদিকে না তাকিয়েই বলল,"এমনিই বের হচ্ছি বন্ধুদের সাথে।"

"কোন বন্ধু?"

"আহ মা। যাও তো। বেশি বাড়াবাড়ি করো।"

"তোমার বাবা কিন্তু তোমার সাথে ক্ষেপে আছে। একে তো রেজাল্ট খারাপ, তার উপর কান্ড করেছ একটা। এখন আবার হুট করে বেরিয়ে যাচ্ছ বাড়ি থেকে।"

"উফফ! তুমি আবার সকাল সকাল এসব নিয়ে পড়েছ কেন?"

"পড়ছি কারণ তোমার বাবা আজ বাসায়। ঘুম থেকে উঠে যদি দেখে তুমি টই টই করে বেরিয়ে গেছ, তাহলে আবার রাগ হবে।"

"হোক রাগ। আমি কি বাচ্চা নাকি? বাবা অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করে। তাও শুধু আমার সাথে। আয়তির বেলায় সব মাফ।"

সুষ্মিতা জোর গলায় বললেন,"আয়তির রেজাল্ট তার পুরো ব্যাচের মধ্যে সবার সেরা। ওকে নিয়ে আমাদের বাড়াবাড়ি করার কিছু নেই।"

"হয়েছে। আর কেচ্ছা শুনতে চাই না। যাও তো। সকাল সকাল মাথা খারাপ করো না আমার।"

ইয়াজিদ মৃদু স্বরে ধমকে উঠল, চোখ পাকিয়ে বলল,"এ্যাই তুই সুষ্মি ভাবির সাথে এমন করে কথা বলছিস কেন? একদম এভাবে কথা বলবি না। আমার সামনে তো কখনোই না।"

সুষ্মিতা দম ফেললেন ছোট করে। সামনে যেতে যেতে বললেন,"ইয়াজিদ, ওকে বল তো একটু মানুষ হতে। ওর বাপ কিন্তু একদিন ধরবে ওকে। যেদিন ধরবে, সেদিন আর ছুটতে পারবে না। বেশি উড়িস না আহিল। ডানা ভাঙলে কিন্তু আর দৌড়াতেও পারবি না।"

সুষ্মিতা চলে গেলেন হনহনিয়ে। আহিল কোঁচকানো মুখ নিয়ে তাকিয়ে থাকল তার চলে যাওয়ার দিকে। ইয়াজিদ ঘাড় মালিশ করতে করতে বলল,"কিরে কেস কি? ভাবি এতো ক্ষেপেছে কেন? মেঝ ভাইজানও দেখলাম কেমন যেন গম্ভীর হয়ে আছে দুই দিন ধরে। হয়েছে টা কি?"

আহিল গা ছেড়ে বসল কাউচের উপর। মাথাটা মেঝের দিকে ঝুকিয়ে নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল,"ক্লাবে গিয়েছিলাম গত সোমবার।"

ইয়াজিদের চোখ কপালে উঠল। আঁতকে উঠে বলল,"কিহ! সত্যি?"

"হ্যাঁ। কিন্তু বিশ্বাস করো। উল্টা পাল্টা কিছু করি নি।"

"খুব বিশ্বাস করলাম।" ইয়াজিদ হতাশ হয়ে বলল,"তুইও নিনীতের মতো এসব উল্টাপাল্টা শুরু করেছিস?"

"না চাচ্চু। প্রমিজ। ঐরকম কিছু না। ঐরকম কিছু হলে বাবা আমাকে আস্ত রাখত?"

"ধরা পড়লি কেমন করে?"

"বাবার এক কলিগ দেখে ফেলেছে ক্লাবের বাইরে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে।"

"ক্লাবে গিয়েছিলি কেন? এসব বাড়াবাড়ি না করলে কি হয়?"

"বন্ধুর জন্মদিন ছিল। সবাই গিয়েছে।"

"তবুও। যুগ তো এতোটাও আধুনিক হয়নি যে মন চাইলেই ক্লাবে চলে যাবি।"

আহিল মাথা নাড়ল। নিচু স্বরে বলল,"ইয়াহ, আই এগ্রি।"

"মেঝ ভাইজান কি বলল?"

"বলেছে এরপরের বার এমন কিছুর প্রমাণ পেলে সোজা ঘর থেকে বের করে দিবে।"

"সাংঘাতিক!"

"হ্যাঁ সাংঘাতিক। বাবার সাথে এখন কোল্ড ওয়্যার চলছে আমার।"

"এই পরিস্থিতে আবার বাইরে যাচ্ছিস কেন?"

আহিল মাথা তুলল। কিঞ্চিৎ বিরক্ত হয়ে বলল,"তো কি করব চাচ্চু? আই অ্যাম আ গ্রোউন এডাল্ট। যথেষ্ট বড় হয়েছি আমি। বাবা আর মা আমাকে বাচ্চাদের মতো শাসন করে। দ্যাট ইজ টু মাচ।"

"আচ্ছা, এতো কাহিনি না বলে কোথায় যাচ্ছিস সেটা বল।"

"সামিরার সাথে যাচ্ছি, ক্যাজুয়াল ডেটে।"

ইয়াজিদ কপাল কুঁচকে বলল,"এটা কে? নতুন নাকি?"

"হ্যাঁ।"

"শালাহ! পেছনে তোমার রেড লাইট জ্বলতাসে। আর এদিকে তুমি আছ তোমার মৌজ মাস্তি নিয়া। সামিরা টামিরা নিয়া ঘুরো ভালো কথা। ধরা খাইলে কিন্তু জামিন নাই। এটা মনে রাইখো।"

"ধ্যাত! ব্যাড বাজ দিয়ো না চাচ্চু।"

"আচ্ছা দিব না। এই সামিরা করে কি?"

"কিছুই না। লাইভ প্রমোটার।"

"তুই কি ভালা জিনিস খুইজ্জা পাস না? কিসব উল্টা পাল্টা ধরোস। কোনোটাই তো বিয়া পর্যন্ত যাবে বইলা মনে হয় না।"

"বিয়ে? আমি বসে আছি ওকে বিয়ে করতে? শোনো চাচ্চু, ইটস জাস্ট আ সিচুয়েশনশিপ। একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। এরপর সামিরা সামিরার পথে। আর আমি আমার পথে।"

"ইসসস ছিহ!" ইয়াজিদ নাক ছিটকে বলল,"এ তো আরো ডেঞ্জারাস অবস্থা ভাই। ধন্যবাদ আমারে বিয়া করতে আরেক ধাপ নিরুৎসাহিত করার জন্য।"

আহিল কলার ঠিক করতে করতে বলল,"চাচ্চু দিস ইজ ভেরি কমন ইন দিস জেন। তোমার মাথা খাটানোর দরকার নেই। এমনিতেও তোমার বিয়ের বয়স চলে গেছে।"

"সত্যি বলছিস?"

"হ্যাঁ।"

"বুড়ো হয়ে গেছি?"

"অনেকটা।"

"যাক, বাঁচলাম।"

আহিল আবার বলল,"বলো না কোন টি শার্টটা বেশি ভালো মানাবে?"

ইয়াজিদ আঙুল তুলে একটা পছন্দ করল। গভীর স্বরে বলল,"চান্দু একটু সাবধানে,হ্যাঁ? তোমার বাপ কিন্তু ভালোর ভালো, চেতলে আবার সর্বনাশ। বেশি উইড়ো না। তোমার সিচুয়েশনশিপ একদম তোমার পেছনে....বাকিটা বুইঝা লও।"

আহিল বিরক্তমুখে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। গুরুজনদের এই যাবতীয় শাসন তার ইদানিং বিরক্ত লাগে। তার যথেষ্ট বয়স হয়েছে। হুটহাট তার বাইরে যাওয়া বন্ধ করার অধিকার কারোর নেই।

সেই সময়েও আহিলের মনে হতো জীবন খুব আনন্দ আর উপভোগের বস্তু। জীবনের সংজ্ঞা তার জন্য এমনই ছিল। তখনও আহিল জানত না জীবনের অর্থ কতো ব্যাপক, কারো কারো জন্য জীবন কতো সংগ্রামের।
তবে একসময় ঠিকই বুঝেছিল। বুঝেছিল, কারো জীবনের বিন্দুপরিমাণ ক্ষতি করার অধিকারও তার নেই। বুঝেছিল, রেন্ডম ডেট, সিচুয়েশনশিপ, আর উচ্ছৃঙ্খল চাল চলনের বাইরেও জীবনের আরো অনেক মর্ম আছে। সেই মর্ম গুলো আহিল জানত না। তাকে শিখিয়েছিল কেউ।

_____

ঠিক বিকাল চারটায় মণিষা সহস্রকে নিয়ে সংশপ্তকে এলো। আগেও দুইদিন এসেছে। এখানে আসার পর সে বসে থাকে সামনের অফিস রুমে। আর সহস্র যায় আবৃত্তি শিখতে, হাতের লিখা চর্চা করতে। মণিষা বসে বসে অপেক্ষা করে তার ছুটি হওয়ার।

আজও মণিষা ঠিক সময়ে ছেলে নিয়ে ভেতরে ঢুকল। সহস্র ভেতরের ঘরে চলে যাওয়ার পর সে গিয়ে একটা কাঠের বেঞ্চিতে বসল। পরনে তার হালকা গোলাপি শাড়ি। মাথায় একটা খোঁপা বাঁধা। লম্বা আঁচলের শেষভাগ সে তুলে রেখেছে অন্য পাশের কাঁধে।

ইয়াজিদ তখন অফিস রুমেই ছিল। ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে কিছু একটা ভাবছিল। ভদ্রমহিলা ভেতরে ঢুকতেই দুই চোখ খুলে গেল। তাকিয়ে দেখল, তিনি কয়েক হাত দূরের একটা বেঞ্চিতে মাথা নামিয়ে বসে আছেন। দেয়ালের দিকটায় চেপে বসেছেন। ইয়াজিদ মুহূর্ত গড়াতেই চোখ সরিয়ে নিল।

গতকাল সে ইচ্ছে করেই সেন্টারেই আসে নি। ভদ্রমহিলা আশেপাশে থাকলে তার অদ্ভুত লাগে। অদ্ভুত মানে খুব অন্যরকম। অকারণেই মন খারাপ হয়। অথচ মন খারাপ হওয়ার কোনো কারণ নেই।

ভদ্রমহিলা দেখতে ভালো। সেই ভালোটা ইয়াজিদেরও ভালো লাগত। এর বাইরে দুজনার আর কোনো সম্পর্ক ছিল না। সে কোনো কালেই ভদ্রমহিলাকে গিয়ে নিজের মনে কথা খুলে বলার ইচ্ছে পোষণ করেনি। করবেই বা কেন? বিয়ে নিয়ে তার মতামত এখনও সেই আগের মতোই আছে। কখনো না, কোনোদিন না, কোনো অবস্থাতেই না। বিয়ে সে করবে না। তবুও মিস মণিষাকে সহস্রের মা হিসেবে দেখার পর প্রথমবার তার বুকে যেই তুমুল আন্দোলন শুরু হয়েছিল, সেটার হেতু ইয়াজিদ বহুদিনেও খুঁজে পায় নি।

ইয়াজিদ উঠে দাঁড়াল চেয়ার থেকে। মণিষাকে সে যথাসাধ্য এড়িয়ে চলে। তার সামনে বসে থাকাটাও দমবন্ধ লাগে মাঝে মাঝে। সে উঠে গিয়ে ভেতরে এলো। ভেতরে মোট চারটা ক্লাসরুম। ইয়াজিদ একবার সহস্রর ক্লাসটায় উঁকি দিল।

সহস্র হাত দু'টো টেবিলের উপর রেখে কি যেন লিখছিল খাতায়। হাতের লিখার ক্লাস। রফিক সাহেব বাচ্চাদের বেঞ্চের সামনে গিয়ে গিয়ে তদারকি করছে, উপদেশ দিচ্ছে।

ইয়াজিদ স্থির চোখে তাকাল বাচ্চাটার দিকে। খুব নিরীহ একটা মুখ। রাগ উঠার মতো কিছু নেই। অথচ তাকে দেখলেই ইয়াজিদের মেজাজ খারাপ হয় তর তর করে। তার অস্তিত্বই অসহ্য মনে হয়। কি বিরক্তিকর!

সহস্র মাথা নামিয়ে মনোযোগ সহকারে লিখছিল খাতায়। হঠাৎ একটা হাট্টাগাট্টা বাচ্চা এসে তার পাশে দাঁড়াল। খানিকটা আদেশের সুরে বলল,"এ্যাই তুই পিছে যা।"

খুব মারমুখো কণ্ঠ। সহস্র মাথা তুলে অবাক হয়ে বলল,"আমি কেন পেছনে যাব?"

"কারণ এটা আমার সিট।"

"সিটে তো তোমার নাম নেই। আমি আগে এসেছি। আমি পেছনে যাব না।"

ছেলেটার চোখ বড় বড় হলো তার কথা শুনে। চোখ মুখ শক্ত করে আবার বলল,"কি বললি তুই?"

সহস্র আগের মতোই জবাব দেয়,"বলেছি আমি পেছনে যাব না। যে আগে এসেছে, সিট তার।"

ছেলেটা আরো কিছু বলত। তার আগেই শফিক সাহেব ধমক দিয়ে সরিয়ে দিলেন তাকে। বললেন,"তুষার তুমি অন্য সিটে গিয়ে বসো। রোজ রোজ এক সিটে বসতে হবে এমন কোনো কথা নেই।"

তুষার নামের রাগী, কিছুটা দাম্ভিক স্বভাবের ছেলেটা মুখ গোমড়া করে পেছনের সিটে গিয়ে বসল। তার আগে সহস্রকে এক ঝলক দেখে গেল ভালো মতো।

সহস্র আর ফিরেও তাকাল না তার দিকে। যেমন করে কলম ধরে বসেছিল, ওভাবেই বসে থাকল।
ইয়াজিদ হাসল। ঠোঁট বাকাল সামান্য। মুখ ভেঙচিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,"এহহ! একদম মায়ের মতো হয়েছে। আর কিছু থাকুক না থাকুক, ভাব একদম একশো তে একশো। দেখো, কেমন ভাব নিয়ে বসে আছে মা টার মতো। হ্যাহ, মিস মণিষার চোখের মণি। সব এসে জুটেছে আমার কপালে। টাকা দিয়ে সেন্টার চালিয়ে এখন আবার মনষার ছেলেকেও পড়াতে হচ্ছে। কপাল!"

ইয়াজিদ কিছুক্ষণ থেকে সরে এলো সেখান থেকে। আবার এসে বসল তার ইজিচেয়ারে।

তার এখানে পাড়ার ছেলেদের ঢোকার অনুমতি আছে। সে নিজেই দিয়েছিল সেই অনুমতি। বিকেলের অবসর সময়টাতে এদের সাথে কথা বলতে ভালো লাগতো তার। আজও রুমে এসে দেখল সামনের দুইটা পাশাপাশি বেঞ্চে ছেলেরা বসে আছে। কি নিয়ে যেন হাসাহাসি করছে, গল্পগুজব করছে।

ইয়াজিদ চেয়ারে বসে একবার তাদের দিকে তাকাল। তাদের ঠিক বিপরীত পাশের চেয়ারে মণিষা বসে আছে। মুখটা থমথমে। বিরক্তি ভাব টা খুব সূক্ষ্ম ভাবে চেপে রেখে গাম্ভীর্যের আড়ালে। এই ছেলে গুলোকে তার পছন্দ হচ্ছে না। আসার পরেই কেমন চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করেছে। তার উপর কয়েকজন আবার চোখ বাঁকা করে দেখছিল তাকে। মাথা নিচু করে বসেই মণিষা টের পাচ্ছিল সবকিছু।

ইয়াজিদ একবার ছেলেদের দেখল, আরেকবার দেখল মণিষাকে। তার মুখটা বরাবরের মতো শান্ত। কায়েস নামের একটা ছেলে আড়চোখে এক নাগাড়ে দেখছে তাকে। সেই গভীর দৃষ্টি ইয়াজিদের চোখ এড়াল না। সে উঠে দাঁড়াল চেয়ার ছেড়ে।

তাদের মধ্যে থেকে একজন বলল,"মামা, আপনে আজকে নদীর পাড়ে যাইবেন? চলেন, ঘুইরা আসি।"

"না, আমি কোথাও যাবো না।"ইয়াজিদ শক্ত মুখে বলল,"তোরা বের হ এখান থেকে। পরে আসিস।।আপাতত যা।"

ছেলেরা সব অবাক হলো তার কথায়। গোল গোল চোখে তাকাল তার দিকে। তাদের সাথে ইয়াজিদের সম্পর্ক স্নেহের। সে কখনো কঠিন ভাবে কিছু বলেনি তাদের। সংশপ্তকেই তাদের আড্ডা জমত। আজ হঠাৎ এতো রুক্ষ কেন হলো বোঝা গেল না।

জিসান নামে একজন উঠে দাঁড়াল, বলল,"মামা, কোনো সমস্যা হচ্ছে আপনার?"

"না কোনো সমস্যা না। তোরা আপাতত যা। বাচ্চাদের গার্ডিয়ান থাকা অবস্থায় হৈচৈ করিস না। ঘর ফাঁকা থাকলে তখন করিস।"

"কিন্তু আমরা তো সবসময় এমন করি।"

"আজ থেকে করবি না।"

খুব টনটনে আর মজবুত শোনাল ইয়াজিদের কণ্ঠ। ছেলেরা আর বসল না। বাধ্য, অনুগত ভঙ্গিতে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। মণিষা পুরোটা সময় মাথা নামিয়ে বসে ছিল। তারা বের হতেই কিছুটা স্বস্তি পেল। সহজ হয়ে বসল।

ইয়াজিদ চেয়ারে বসে একটা ম্যাগাজিন খুলল। সে পণ করেছে ঐ মহিলার দিকে সে কিছুতেই তাকাবে না। আনমনে পাতা উল্টাতে উল্টাতে সে যেন ভাবছিল কিছু একটা।
ছেলেরা তখন সেন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে আড্ডা দিচ্ছিল। ইয়াজিদ ঘরের দেয়ালে ঝুলানো আয়নায় তাকাতেই দেখল, বাইকের সাথে হেলান দিয়ে মৃদুস্বরে কথা বলছে সবাই। প্রায় বিকেলে তারা বাইক নিয়ে নদীর পাড়ে ঘুরতে যায়। আজও হয়ত যাবে। গিয়ে স্বচ্ছ জলে পা ভিজিয়ে খোশগল্প করবে।

কায়েস আবার কথার ফাঁকে একবার ঘাড় উঁচু করে ভেতরে তাকাল। ফ্যাল ফ্যাল চোখে দেখল, ভদ্রমহিলার গাল, ঘাড়, কাঁধ আর চিবুক। দুই চোখে তার রাজ্যের বিস্ময়। আয়নাতে তার সবটাই দেখছিল ইয়াজিদ।

সে উঠে দাঁড়াল হঠাৎ। এগিয়ে এসে কোনো কথা বলে আস্তে করে ঘরের সামনের পর্দাটা একটু টেনে দিল। এমনভাবে টানল যেন রাস্তায় দাঁড়িয়ে কায়েস আর ভেতরের কিছু দেখতে না পায়।

কায়েস হকচকিয়ে গেল। দরজার সামনে ইয়াজিদকে দেখতেই ধরা পড়া চোরের মতো ইতস্তত করতে লাগল। ইয়াজিদ কিছু বলল না। পর্দাটা টেনে দেওয়ার পর সে নিজেই তব্দা খেয়ে গেল। তারপর সেখানেই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল কিছুক্ষণ। অনুভব করলো, যা কিছু হচ্ছে, সবটা স্বাভাবিক না। শুধু মনে হলো, মিস মণিষাকে উঁকি ঝুকি মেরে কোনো ছেলে দেখবে, এই দৃশ্য সে চোখের সামনে সহ্য করতে পারবে না। কখনোই না।

চলবে-

[অর্ধেক লিখেছি। আগামীকাল আমার পরীক্ষা। পুরোটা লিখার জন্য অপেক্ষা করলে আরো তিন চারদিন দেরি হয়ে যেত। আপাতত এইটুকুই পড়ুন।]#আম_পাতা_জোড়া_জোড়া ২৩.[দ্বিতীয়াংশ]
লেখনীতে #মেহরিমা_আফরিন

আয়তি সন্ধ্যার আগে একবার ছাদে উঠেছিল। বিকেলে ভার্সিটি শেষ করে বাড়ি আসার পর থেকেই তার মাথা ধরে ছিল খুব। কিছুক্ষণ বালিশ চাপা দিয়ে শুয়ে থাকার পর তার মনে হলো, কেবল খিঁচ মেরে পড়ে থাকলেই শরীর ভালো হবে না। একটু হাঁটতে হবে, খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে প্রাণ ভরে শ্বাস নিতে হবে।

সে ধীর পায়ে হাঁটছিল ছাদের রেলিং ধরে। আবহাওয়া আজ অন্যদিনের তুলনায় কিছুটা স্বস্তিদায়ক। হঠাৎ কে যেন পেছন থেকে ডাকল তাকে। খুবই রুক্ষ কণ্ঠস্বর। আয়তি ঘুরে তাকাল তার দিকে।

সীমান্ত এসেছে ছাদে। মুখের ভাব অত্যন্ত কঠিন। শক্ত চোখে কিছুক্ষণ আয়তির দিকে তাকিয়ে ক্ষিপ্র পায়ে এগিয়ে এলো সামনে। কাছে এসেই কড়া গলায় বলল,"আয়তি তোমার সমস্যা কি?"

কপালের চামড়া একটুখানি কুঁচকে গেল আয়তির। সেভাবে তাকিয়েই জানতে চাইল,"কেন? কি হয়েছে?"

"তুমি অরুনার কাছ থেকে আমার চিঠি নিয়েছ কোন সাহসে?"

"তুমি অরুনাকে এসব ফালতু কাজে জড়িয়েছ কোন সাহসে?"

"ফালতু কাজ?" সীমান্ত দাঁত কিড়মিড় করে বলল,"আমার বোন অরুনা। ওকে দিয়ে আমি যা খুশি করামু। তুমি বলার কে?"

"আমি অবশ্যই বলার অধিকার রাখি। অরুনাকে পড়াশোনা করার জন্য কোচিংয়ে পাঠানো হয়। কবুতর হয়ে চিঠি বিলি করার জন্য না।"

"থাক, তোমারে আর জ্ঞান দিতে হইব না। তুমি এতো পড়াশোনা জানো। কিন্তু এডা জানো না যে চিঠি মানুষের পার্সোনাল জিনিস। সবকিছুতে নাক গলাইতে হয় না।"

শক্ত হয়ে দাঁড়াল আয়তি। তাচ্ছিল্য করে হাসলও সামান্য।
"তাই নাকি? নাক গলাতে হয় না? আমার চোখের সামনে তুমি বিসিএস ক্যাডার হয়ে যাচ্ছ, আর আমি নাক গলাবো না?"

সীমান্ত স্তব্ধ হয়ে গেল। ফ্যালফ্যাল চোখে কিছুক্ষণ বোকার মতো আয়তির দিকে তাকিয়ে সে সামলে নিল নিজেকে। দু'চোখের হতভম্ব ভাব কিছুটা কাটতেই ক্ষুদ্ধ স্বরে চেঁচিয়ে উঠে বলল,"আয়তিইই! তুমি আমার চিঠি পড়ছো?"

"হ্যাঁ পড়েছি।" ভীষণ শান্ত গলায় জবাব দিলো আয়তি। সীমান্ত আরেকদফা চিৎকার করে বলল,"কেন? কোন সাহসে?"

"আস্তে। আস্তে কথা বলো। আওয়াজ নামিয়ে কথা বলো। এটা ভদ্রলোকের বাড়ি। মহল্লার ক্রিকেট মাঠ না।"

"আমি ভদ্রলোকির গোষ্ঠী মারি। তুই কতো ভদ্র আমার চেনা হয়েছে। ভদ্রতা ভদ্রতা করে অন্য মানুষের চিঠি পড়িস। নির্লজ্জ কোথাকার!"

আয়তি ফোঁস করে উঠে বলল,"একদম গাল ফাটিয়ে দিব মুখে মুখে বেয়াদবি করলে, এমন বিশ্রী সুরে কথা বললে। তুই তোকারি করলে জিভ ছিঁড়ে ফেলব আমি তোমার।"

"ছিঁড়ে ফেল। আমি আর এসব শুইনা দমমু না। এ্যাই আয়তি। তোর জীবনে আমি বাম হাত ঢুকাই? তুই কেন আমার পিছে পইড়া থাকস?"

"ঢোকাও না তুমি বাম হাত? আমার ভার্সিটি ফ্রেন্ডকে ফেসবুকে মেসেজ পাঠিয়ে আমার ব্যাপারে জানতে চাও নি তুমি? আমি কখন ভার্সিটি যাই, আমার কোনো ছেলে বন্ধু আছে নাকি, আমি প্রেম করি নাকি, এসব জানতে চাও নি তুমি?"

সীমান্ত থতমত খেয়ে গেল। আমতা আমতা করে বলল,"ত...তো ঐডা তো আমি তোমার আসল চেহারা বাইর করার জন্য করি। তুমি বলসিলা তোমার কেউ নাই।"

"তো তুমি সারা জীবন সাধনা করে যাবে আমার কথা মিথ্যা প্রমাণ করার জন্য?"

"হ করমু। আচ্ছা যাও। আজকে থেক্কা আমি আর তোমার কোনো কিছুতে নাক গলামু না। তুমিও কথা দাও, তুমি আমারে আমার মতো ছাইড়া দিবা।"

বুকে হাত বাঁধলো আয়তি। অবিচল কণ্ঠে, বেশ শান্ত ভাবে বলল,"জ্যোতিকে যেই মিথ্যে কথাটা বলেছ, সেটা আমি অবশ্যই তাকে জানাব।"

"জ্যোতিকে জানাইবা মানে? ওরে আমি পছন্দ করি। তুমি কেন আমার সাথে নাইনসাফি করতেছ?"
আয়তি জবাব দিল না কোনো। তার নির্লিপ্ত ভাব দেখে সীমান্তর মাথার তালু জ্বলতে শুরু করল। হঠাৎ চিড়বিড়িয়ে উঠে অশান্ত মুখে বলল,"তোর মাথায় ঠাডা পড়ুক আয়তি। তুই জইল্লা যা।"

আয়তি কঠোর দৃষ্টিতে তাকাল তার দিকে। এরপর এক পা এগিয়ে এসে শব্দ করে এক চড় বাসাল তার গালে। পুরো ব্যাপারটাই ঘটল আচমকা, সীমান্ত কিছু বুঝে উঠার আগেই। সীমান্ত বোকার মতো গালে হাত চাপলো। তার মাথা ঘোরাচ্ছে রীতিমতো।

আয়তি এখনও আগের ভঙ্গিতেই দাঁড়ানো। রাগ, ঘেন্না আর অপমানে দুই চোখ ক্রমশ লাল হয়ে উঠল তার। সীমান্ত কয়েক মুহূর্তে নীরব থেকে তারপর তেঁতে উঠল। অসহ্য এক চিৎকার করে এগিয়ে এলো সামনে।
"আয়তির বাচ্চা!"

সে হাত তোলার আগেই আয়তি ওর দুই হাত চেপে ধরল শক্ত করে।
এক ধাক্কায় তাকে দূরে সরিয়ে প্রথমবারের মতো গলার আওয়াজ তুলে বলল,"খবরদার সীমান্ত! এই ভুল আর কখনো করবে না। তুমি আর আমায় ভাঙতে পারবে না।"

সীমান্ত সরোষ চোখে একের পর এক পলক ফেলে। আয়তির চোখের ভাষা তখন দুর্বোধ্য মনে হয় তার কাছে। আয়তি শ্বাস ছাড়ল ঘন ঘন। একটু ধাতস্থ হয়ে, সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে সীমান্তর হাতটা ছেড়ে দিয়ে বলল,"জ্যোতিকে ভালো লাগছে তো? ঠিক আছে। ভুল হয়েছে আমার। চিঠি কেড়ে নিয়ে খুব ভুল করেছি। ভবিষ্যতে আর এমনটা করব না। তবে আমার শর্ত আছে। শর্ত হলো, তুমি জ্যোতিকে যা কিছু করবে বলেছ চিঠিতে, ঐগুলো তুমি সত্যিই করে দেখাবে। তুমি পড়াশোনা করবে।"

সীমান্ত আড়চোখে তাকায় তার দিকে। হঠাৎ করে আয়তির কণ্ঠ পড়ে গেছে। চোখের দৃষ্টিটাও কেমন শূন্য দেখাচ্ছে। হুট করে মেয়েটার তেজ এতো কমে গেল কিভাবে?

সীমান্ত গাল থেকে হাত নামিয়ে মৃদুস্বরে বলল,"ঐডা করমু নে। তার আগে তুমি বলো, তুমি যে আমার গায়ে হাত তুললা, ঐডার কি বিচার হইব? তোমার শাস্তি কি?"

"আমার কোনো শাস্তি নাই। আমি কোনো অন্যায় করি নি। তুমি আমায় অভিশাপ দিচ্ছিলে।"

সীমান্ত চোখ তুলল। মেজাজ খারাপ করে বলল,"তুমি আমার কেউ না। তুমি আমার জীবনে মাতব্বরি করলে আমার মেজাজ খারাপ হয়। ভবিষ্যতে তুমি একশো হাত দূরে থাকবা আমার সবকিছু থেকা। তাইলেই আর অভিশাপ দিমু না।"

"তুই অভিশাপ দিলেই বা আমার কি?"
আয়তি কটমট করে জবাব দিল। ক্লান্ত চোখ দু'টো হঠাৎ করে জেদে টইটম্বুর করে বলল,"যা করেছি বেশ করেছি। একটা চড় আমি কমই দিয়েছি। তোকে আরো দুইটা চড় দেওয়া দরকার ছিল।"

"ওহহ আইচ্ছা। তুমি তুই তোকারি করলে ঠিক আছে তাই না? আর আমার বেলাতেই যতো দোষ।"

"হ্যাঁ, আমি করলে ঠিক আছে।"

আয়তি ঠেলে সরাল তাকে। যেতে যেতে চোখ পাকিয়ে বলল,"জ্যোতি বুদ্ধিমান মেয়ে। তোমায় গুনবে না। পড়তে বসো। তাহলে জ্যোতিকে না পেলেও কিছু একটা পেয়ে যাবে আশা করি।"

"ধন্যবাদ। তোমার মতো অসভ্যের আমারে নিয়ে ভাবতে হবে না। তুমি যাও। জাহান্নামের চৌরাস্তায় যাও তুমি।"

আয়তি হেঁটে যাচ্ছিল সামনে। পেছনে না তাকিয়েই জবাব দিল,"তুমি আগে গিয়ে জানাও আমাকে। তারপর ভেবে দেখছি।"

সে চলে গেল দপ দপ পায়ে। সীমান্ত যেতে পারল না। হাত দু'টো মুঠ করে ধরে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল ছাদের খসখসে মেঝেতে। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,"দাঁড়া আয়তি। অনেক সহ্য করছি তোর বাড়াবাড়ি। তোরে আর মাইয়া বইল্লা ছাড় দিমু না। এবার এমন শাস্তি দিমু যে এই জীবনে তুই আমার নাম মুখেও আনবি না।"

____

আজ বুধবার। পারমিতা ইবনাতের অফ ডে। অফ ডে তে পারমিতা অন ডে এর চাইতেও বেশি ব্যস্ত থাকে। প্রথমেই ঘুম থেকে উঠে দুই কাপ চা করে। এক কাপ তার, আরেকটা নাসির সাহেবের। তারপর বাগানের সামনের বেতের চেয়ার দু'টোতে বসে অনেকটা সময় দু'জন কথা বলে। কেমন কথা? ক্লিনিকের কথা, ব্যবসার কথা, রাজনীতির কথা, দু'জনের শখের কথা।

নাসির সাহেব রোজ সকালে তার অপেক্ষা করেন। গল্প যদিও পারমিতারই বেশি থাকে। নাসির কেবল নীরবে শোনেন তার কথা। কোনো এক জায়গায় গিয়ে মেয়েটার চঞ্চলতা তাকে মুগ্ধ করে। তাকে আল্লাহ কন্যা সন্তানের পিতা হওয়ার মতো সৌভাগ্য দেন নি। তবে ভাগ্যের জোরে মেহরোজ আর পারমিতার সাথে তার পরিচয়ের সুযোগ করে দিয়েছেন। যখনই এদের দেখেন, তখনই মনে হয়, কি চমৎকার জীবন তার!

পারমিতা বলল,"বাবা আপনি চায়ে চিনি কেন খাচ্ছেন? চিনি যতোটা সম্ভব এড়িয়ে চলাই ভালো।"

"জানি মা।"

"তবুও তো রোজ খান। তাও পুরো দেড় চামচ চিনি।"

"হাহাহা। অভ্যাস হয়ে গেছে।"

"অভ্যাস ছেড়ে দিতে হবে বাবা। সুস্থভাবে বেঁচে থাকার কাছে অভ্যাস খুব তুচ্ছ ব্যাপার।"

"তাও ঠিক।"

নাসির সাহেব কাপে চুমুক দেন। পারমিতা আবার বলল,"বাবা জানেন, একটা দুঃখের কথা?"

"কি কথা?"

"নিকিতা আর আগের মতো সব কথা অস্পষ্ট ভাবে বলে না। ইদানিং অনেক শব্দই ঠিকঠাক বলে।"

"বাহ, এটা তো ভালো।"

"নাহ।" পারমিতা মুখ শক্ত করে বলল," এটা মোটেও ভালো না। নিকিতা বড় হয়ে যাচ্ছে। ওর আধো স্বর হারিয়ে যাওয়ার মতো দুঃখের ব্যাপার আর কিছু হতে পারে না। আমি মানতেই পারছি না নিকি বড় হয়ে যাচ্ছে। ও আমার বাচ্চা। বড় কেন হবে?"

নাসির সাহেব হাসলেন।
"সবাই ই তো বড় হয় মা। নিকিতা বড় হবে। ওর শৈশব কাটবে, কৈশোর কাটবে। তুমি চোখের সামনে দেখবে নিকিতা কিভাবে তার জীবনের একটা একটা ধাপ পার করছে। এটা দারুণ না?"

পারমিতার দুই চোখ আর্দ্র হলো। একটা হাত বুকের উপর চেপে খুব দুঃখী গলায় বলল,"নিকুরও কৈশোর আসবে? বাচ্চা মেয়ে থেকে সত্যিকারের মেয়ে হয়ে যাবে আমার নিকি? নিবিও আর ফ্রক পরবে না?"

"হু।মেয়েরা তো এমনই।"

পারমিতা অন্যমনস্ক হয়ে বলল,"আমি কখনো আমার মেয়েদের কষ্ট পেতে দেব না।"

নাসির সাহেব আরেকবার কাপে চুমুক দিলেন। বাগানের ডালিয়া ফুলের গাছটার দিকে তাকিয়ে ছিলেন বলে তিনি দেখতে পেলেন না, পারমিতার দুইচোখ ভেজা।

পারমিতা আবারও একই রকম ভাবে জোর দিয়ে বলল,"আমার মতো অবুঝপনা আমি এই পৃথিবীর কোনো মেয়েকে করতে দিব না।"

_____

নিকিতা মজুমদার বর্তমানে আছে তার চাচ্চুর ঘরে। বিছানার যেটুকু জায়গায় রোদ পড়েছে, সেটুকুতে পায়ের উপর পা তুলে শুয়ে ছিল। মেহরোজ বলল,"কুইন এলিজাবেথ! আপনি এতো ভাবে আছেন কেন একটু বলুন? কি নিয়ে এতো দুঃশ্চিন্তা আপনার?"

নিকিতা তার দিকে তাকাল না। চোখ মেলে সিলিংটার দিকে তাকিয়ে ভাবুক হয়ে বলল,"একতা কতা ভাবি মাম্মা।"

"কি কথা?"

"চাচ্চু কালকি ইমথিহা কে ঝুতি বেধি দিসে।"

"হ্যাঁ।"

"পাপাই কখুনু আমান মাতায় বাধিনি।"

মেহরোজ ঠান্ডা স্বরে বলল,"এটা ভেবে তোমার কষ্ট হচ্ছে নাকি সোনা?"

নিকিতা তাকাল ওর দিকে। উঠে বসে দুইদিকে মাথা নেড়ে বলল,"না। পাপাই আমান চুল গুছিয়ে দেয় তু। হাত দিয়ে গুছিয়ে দেয়। আরাম!"

নিকিতা আরামের কথা ভেবেই চোখ বুজল।
"মাম্মা!"

"কি সোনা?"

"ঝুতি কিভাবি বাধি, পাপাইকে শিখিয়ে দিবে? পাপাই ঝুটি বাধতি পারে না।"

"তুমি কেমন করে জানো পারে না?"

"পারলে তু আমাকি বেধি দিত।"

মেহরোজ চুপ হয়ে গেল। নিকিতার কণ্ঠে প্রবল আত্মবিশ্বাস। মেহরোজ বলল,"মমা বেঁধে দিক? আমি বেঁধে দেই?"

"না।" নিকিতা প্রতিবাদ করে বলল,"পাপাই বাধবি। অন্য কেউ না।"

মেহরোজ আলতো করে হাত ছোঁয়াল তার মাথায়। মৃদু স্বরে বলল,"আচ্ছা, ঠিক আছে।"

নিকিতা উঠে বসল। ইমতিহার চুল গুলো একদম ছোট। চাচ্চু তবুও কয়েকটা চুল জড়ো করে একটা ঝুটি বেঁধেছে তার মাথায়। কতো সুন্দর লাগছে তাকে!

ইমতিহার পাপাই আছে। নিকুরও তো আছে। ওকে যদি ওর পাপাই চুল বেঁধে যায়, তাহলে নিকির পাপাই কেন দিবে না?

নিকিতা খাট থেকে নেমে সামনে হাঁটে। মেহরোজ অবাক হয়ে বলল,"যাচ্ছ কোথায়?"

"তুপ। ভাল্লাগে না।"

"আরে বাবা, বকা দিচ্ছ কেন?"

"উফফু। এতু কথা কেনু বলো মাম্মা? কাজ আছি আমান। টাটা।"

সে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। তারপর নিজের ঘরে গিয়ে একটা রাবার ব্যান্ড হাতে নিল। তারপর সোজা গেল নিনীতের ঘরে।

ঘরের দরজা তখন বন্ধ ছিল। নিকিতা গিয়ে দু'টো ধাক্কা দিল দরজায়।
"পাপাই পাপাই। একতু খুলো।"

দুই মিনিট পর নিনীত দরজা খুলল। মাথা নামিয়ে, চোখ পাকিয়ে বলল,"এ্যাই জংলী বাচ্চা! কি চাই তোমার? এতো জোরে কেউ দরজা ধাক্কায়?"

নিকিতা দুই হাত উপরে তুলল। ঠোঁট উল্টে বলল,"কোলে নাও।"

নিনীত ঝুকল। এক টানে কোলে তুলে চোখে চোখ রেখে শুধাল,"কি হয়েছে? চেহারা এমন সোমালিয়ার মানচিত্র হয়ে আছে কেন?"

নিকিতা মাথা রাখল ওর কাঁধে। মন খারাপ করে বলল,"কতুদিন তুমি আদর করো না আমাকি। ইমথিহার পাপাই উকে কতু আদর করে।"

"আমি তো ইমতিহার পাপাই না। আমি আমি।"

"তুমি কে? নিকুর পাপাই?"

"হুম। নিকিতা আর নিবেদিতার।"

"ছবসময় শুদু নিবি নিবি।"

"নিবি আমার না?"

"আন আমি কার?"

নিনীত হাসল সামান্য। আলতো করে মাথাটা নিকিতার কপালের সাথে ঠেকিয়ে বলল,"তুমিও আমার।"

চোখ দু'টো উজ্জ্বল হলো নিকিতার। দু'হাত মেলে নিনীতের চওড়া সিনা জড়িয়ে ধরে বলল,"জানু, ইমথিহা ছবসময় ওর পাপাইয়ের বুকে ঘুমায়। ছব পাপাইরা এমন কয়ে। সুদু তুমি করো না।"

"আমি খারাপ পাপাই।"

নিকিতা দুই দিকে মাথা নাড়ল। দুই হাতে নিনীতের গালের দুই পাশ আগলে ধরে বলল,"না, তুমি পিমস পাপাই। ইমথিহার পাপাই তু ওর চুল গুছিয়ে দেয় না, বকা দিয়ে আবার গালে তুমু দেয় না।"

নিনীত চোখ বড় বড় করে বলল,"তুমি এতো কিছু বোঝো নিকি? তুমি দেখছি খুব চালাক।"

নিকিতা জবাবে হাসল কেবল। জেদ করে, জোর দেখিয়ে বলল,"তুমিও আজকি আমাকি চুল বেধি দিবে। ওকে পাপাই?"

"ওকে ম্যাডাম।"
নিনীত বলল,"কিন্তু আমি এসব পারি না ভালো। চুল টুল ছিঁড়লে আমার কোনো দোষ নাই।"

"আচ্ছা।"

নিনীত ওকে খাটে বসাল। কপাল কুঁচকে বলল,"চুল বাঁধবো কি দিয়ে?"

নিকিতা হাতের মুঠ খুলল। হেয়ার ব্যান্ডটা নিনীতের হাতে ধরিয়ে ঘুরে বসে বলল,"এই নাও। বেধি দাও পাপাই। আমি ইমথিহাকে দেখাতি যাবু।"

নিনীত ওর চুলগুলোর দিকে তাকিয়ে বলল,"আমার ভালোবাসাও যে এতো গুরুত্বপূর্ণ কোনো বস্তু, সেটা বোঝার জন্যই বোধহয় আল্লাহ তোমাদের আমার জীবনে পাঠিয়েছেন। তবে আমার দুর্ভাগ্য, আমি তোমাদেরকে তোমাদের ভালোবাসার এক আনাও দিতে পারি নি, এখনো পারছি না।"

পারমিতা ঘরে ঢুকেই চমকে গেল। দেখল, আয়নার কাছে বসে নিনীত সাহেব তার কনিষ্ঠ কন্যার চুল বেঁধে দিচ্ছে। তার কোলের উপর একটা ফোন। সেটাতে টিউটোরিয়াল চলছে চুল বাঁধার। মেয়ে আবদার করেছিল একটা ঝুটির। কিন্তু পাপাই কেবল ঝুটিতেই সন্তুষ্ট হলো না। সে ভিডিও দেখে দেখে বেণী বাঁধা শিখছিল।

মাঝখানে সিঁথি। দুইপাশে পরিপাটি চুল। নিনীত আনাড়ি হাতে এক পাশের চুলে বেণী বাঁধছিল। কপাল কুঁচকে বলল,"নিকি! চুল টুল সব ছিঁড়ে গেলে কিন্তু আমাকে কিছু বলতে পারবে না।"

"না পাপাই। কিচ্ছু বলব না।"

"আচ্ছা। তাহলে ঠিক আছে।"

"উউউহ! পাপাই। ব্যতা কচছে তু।"

"ওহহ সরি। বুঝতে পারি নি। ম্যাগি নুডলস তো। বার বার শুধু প্যাঁচ খেয়ে যায়।"

"ছবসময় আমান চুলকি বকা দাও। নিবির চুল নুডুলস না?"

"না, নিবির চুল ঝরঝরে। কি সুন্দর!"

নিকিতা গাল ফুলিয়ে পেছনে তাকাল। অভিমানী স্বরে বলল,"আচ্ছা। ঠিক আছি।"

নিনীত শব্দ করে হাসে তার দুঃখ চাপা মুখটা দেখে। ঝুকে এসে ঠিক তার মাথার মাঝখানে চুমু খেয়ে বলে,"কিন্তু আমার ম্যাগি নুডলসও পছন্দ। মন চায় হাত বুলিয়ে বুলিয়ে গুছিয়ে দিতে। কি সুন্দর! নিকি, তুমি এতো সুন্দর কেন বলো তো?"

পারমিতা আর ভেতরে এলো না। নিজের উপস্থিতি টেরও পেতে দিল না। ধীর পায়ে পিছিয়ে গেল। কি দরকার ভেতরে ঢুকে এই মুহূর্তটা নষ্ট করার?

নিকিতা খুশি হয়ে বলল,"সুত্যি পাপাই? আমিও সুন্নর?"

"অবশ্যই। মানুষের উচিত টাকা দিয়ে তোমাকে দেখা।"

"সুত্যি?" চকচকে চোখে জানতে চাইল নিকিতা।

"হ্যাঁ। তোমার উপযুক্ত জায়গা হলো চিড়িয়াখানা।"

কথাটা বলেই নিনীত ফিক করে হেসে দিল। নিকিতা রসিকতাটা ঠিক বুঝল না। উঠে দাঁড়িয়ে খুশিতে পাপাইকে জড়িয়ে ধরে তার গালে চুমু খেতে খেতে বলল,"পাপাই। তুমি কতু ভালু। তুমাকি আমি কতু আদর করি। তুমি কতু ভালুবাসো আমাকি।"

নিনীত জবাবে কেবল হাসে। কোকড়া চুলগুলো পুনরায় গোছাতে গোছাতে বলে,"মাই প্লেজার, মাই প্লেজার। কেউ তো আমায় ভালোবাসে।"

____

সেই বুধবার খুব বৃষ্টি হলো। একদম দুপুর থেকে বিকেল অব্দি টানা বৃষ্টি। পারমিতা ছুটির দিনে গোসল শেষে বেরিয়েই আরেকদফা বৃষ্টিতে ভিজলো।
এবার অবশ্য মেয়েদেরও সাথে রাখল।

নিবেদিতা বলেছিল সে কোনোদিন আয়োজন করে বৃষ্টিতে ভিজেনি। বিপদে পড়ে এক দুই ফোঁটা জল গায়ে পড়েছে।

পারমিতা চমকে গেল তার কথা শুনে। একটা মেয়ে কখনো সাধ করে বৃষ্টিতে ভিজবে না? এটাও আবার হয় নাকি?

মেয়েদের শ্রাবণ, মেঘ আর বৃষ্টি এই তিনটে শব্দের সাথে পরিচয় করানো অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ছিল। পারমিতা সেদিন মেয়েদেরকে বৃষ্টি চেনালো, মেঘের গান শোনালো আর শ্রাবণের বাতাস গায়ে মাখাল। বাড়ির সামনের খোলা বাগানে কোনো কারণ ছাড়াই বিশ মিনিট টানা ভিজেছিল তারা।

নিবেদিতা এই প্রথম কারণ ছাড়া কাকভেজা হলো। ঝম ঝম করে নেমে আসা বৃষ্টিটা শুরুতে তার অদ্ভুত লাগলেও একটু পরে সয়ে গেল। মুহূর্ত গড়াতেই অন্যরকম ভালোলাগার জন্ম দিলো। উপরে গুড় গুড় করে মেঘ ডাকছে। বাতাসে ভেজা মাটির ঘ্রাণ। কেমন যেন থমথমে পরিবেশ। এর মধ্যে ঠান্ডা জল এসে ঝমঝমিয়ে ভিজিয়ে দিচ্ছে তার শরীর। নিবেদিতা খুশি হয়ে বলল,"পরী মা, তুমি কতো কিছু জানো! আমরা আরেকবার এমন বৃষ্টিতে ভিজবো, হ্যাঁ?"

"আচ্ছা ভিজব।"

নিকিতা তেমন মজা করে ভিজতে পারেনি। বৃষ্টির দাপটে চোখও খুলতে পারেনি। সে মিশেছিল মমার শরীরের সাথে। চোখ দু'টো ঢেকে বলল,"আল্লাহ রাগ হচ্ছে মমা। দেখু কতু শব্দু।"

পারমিতা হাসল। হাত বাড়িয়ে নিকিতার শরীরটা আরেকটু গভীরভাবে জড়িয়ে ধরে বলল,"না সোনা। আল্লাহ রাগ হচ্ছে না। আল্লাহ আমাদের সাথে রাগ হয়। তোমার সাথে না।"

নিকিতা মাথা নাড়ে। চোখ তুলে আবার আকাশ দেখে। নিবেদিতা আলতো হাতে আজলা ভরে জল জমায়। পারমিতা কড়া গলায় বলল,"শোনো, বাড়িতে গিয়ে সুন্দর মতো গোসল করবে আবার। মা একটা জুস বানিয়ে দিব, ঐটা খেয়ে সোজা ঘুম দিবে। দেখবে আর জ্বর উঠবে না।"

বাচ্চারা তার কথা শুনল। তাদের সত্যিই জ্বর এলো না। তবে তাদের পাপাই জ্বরে পড়ল হুট করে। সেদিন সে সাত দিন পর বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল। এমনিই হাঁটছিল শহরের রাস্তায়। কোনো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ছাড়া। এর মধ্যে ঝুম করে বৃষ্টি নামল। পাঁচ মিনিটেই পুরো শরীর ভিজে চুপসে গেল। এই ভেজা শরীর নিয়ে সে আরো ঘন্টাখানেক ঘুরে বেড়াল।

ফলাফল টের পেল রাতে। পুরো শরীর ক্লান্ত আর দুর্বল হলো জ্বরে। রাত দশটা নাগাদ নিনীতের মনে হলো, ওর শরীরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে।

সে আর ডাকেনি কাউকে। চার পাঁচটা হাঁচি দিয়ে চোখ মুখ খিঁচে শুয়েছিল খাটে। ড্রয়ারে ঔষধের পাতা আছে। রাতে যদি বেশি খারাপ লাগে, তাহলে সেখান থেকে দু'টো ঔষধ খেয়ে নিবে।

রাত তখন কয়টা নিনীত অনুমান করতে পারছিল না। জ্বরের সাথে মাথাটাও দ্বপ দ্বপ করছিল। খানিকটা অস্বস্তি নিয়ে সে পাশ ফিরল। তপ্ত নিঃশ্বাস ছেড়ে অস্ফুটস্বরে কি যেন বলল। তারপরই হাঁচি দিল একটা।

ঠিক তখনই কেউ পাশ থেকে বলল,"আলহামদুলিল্লাহ।"

নিনীত ভয় পেয়ে গেল। চট করে চোখ মেলতেই দেখল, পারমিতা তার পাশে বসে আছে। সে চোখে চোখ রাখতেই হেসে বলল,"আলহামদুলিল্লাহ বলুন। হাঁচি দিতে দিতে জ্বর সেরে যাবে।"

নিনীত অবাক হয়ে বলল,"আপনি? আপনি কখন এলেন?"

"এই তো। একটু আগে।"

"কেন?"

"আসলে এসেছিলাম আপনার সাথে একটা কথা বলতে। এরপর দেখি আপনি অসুস্থ। তাই ভাবলাম একটু পাশে বসি।"

"আপনার এতো দয়া দেখানোর কারণ কি?"

"আশ্চর্য! আমি বউ না আপনার? আমি দয়া দেখাব না তো কে দেখাবে? আপনার পাজরের হাড় আমি।"

খুব আত্মবিশ্বাস নিয়ে কথাটা বলল পারমিতা। নিনীত হাসল নিঃশব্দে। মাথার নিচের বালিশটা টেনে মুখের উপর চেপে বলল,"আগেও একবার বিয়ে হয়েছে আমার। আমার পাজরের এতো টুকরা?"

"ধ্যাত! ফালতু কথা বলবেন না।"

পারমিতা তার কপালে হাত রেখে তাপমাত্রা অনুমান করল।
"উমম, একটু মনে হয় কমেছে। যখন এসেছিলাম, তখন খুব বেশি ছিল।"

"হুম একটু কমেছে। আপনাকে দেখলে আমার প্রেশার লো হয়ে যায়।"

পারমিতা হাসতে হাসতে বলল,"তাই নাকি?"

"জি।"

"আসুন, জ্বরও নামিয়ে দেই।"

"ধন্যবাদ। আপনি এবার ঘরে যান।"

"নো ওয়ে। আমি আজ সারারাত এখানেই থাকব।"

"কি অদ্ভুত!"

পারমিতা একটা বই পড়ছিল। বইটা বন্ধ করে সে সাইড বক্সের উপর রাখল। তারপর আস্তে করে নিনীতের কপাল টিপে দিতে দিতে বলল,"আমি খুব অদ্ভুত। আপনি এখন ঘুমান।"

নিনীত থমকায়। অপলক চোখে কিছুক্ষণ ভদ্রমহিলার কোমল মুখের দিকে তাকায়। সিয়াশার সাথে প্রায় দশ বছরের দাম্পত্যে তার কি কখনো জ্বর হয়নি? একটু ক্লান্ত হয়নি শরীর? মনে হয়নি যে কেউ পাশে বসে একটু মাথায় হাত বুলিয়ে দিলে খুব শান্তি পেত?

নিনীত চোখ বুজে গভীর শ্বাস ছাড়ল। তার স্মৃতিতে এমন কিছুর অস্তিত্ব পাওয়া দুষ্কর। খুব কষ্টে একটা ঢোক গিলে নিনীত সামলে নিল নিজেকে। হাত দু'টো মুঠ করে ধরে পর পর শ্বাস টানল।

শেষ রাতে তার আবার ঘুম ভেঙেছিল। পারমিতা তখন আধশোয়া হয়ে ঘুমাচ্ছিল। হাতের বইটা এক পাশে পড়েছিল আধখোলা অবস্থায়। নিনীত কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে একটু উঠে বসল। প্রথমেই বইটা সরিয়ে জায়গা মতো রাখল। তারপর চাদরটা তুলে দিল তার গায়ে। আলতো করে কাঁধে ধাক্কা দিয়ে বলল,"পারমিতা!"

ঘুম ঘুম চোখে পারমিতা জবাব দেয়,"উ...কি?"

"এভাবে কেন ঘুমাচ্ছ? ঠিক মতো ঘুমায়। পিঠ ব্যথা হবে পরে।"

"উহহহ, থ্যাংক ইউ।"

পারমিতা ঘুমের ঘোরেই লম্বা হয়ে শুলো। তার দুই চোখ তখনও গভীর নিদ্রায় অসাড়।
নিনীতের ঘুমাতে আরেকটু সময় লাগল। সে হাত বাড়িয়ে বালিশের উপর ছড়িয়ে থাকা পারমিতার চুলের একাংশ মুঠোয় ধরল। এরপর ভোরের আযান কানে আসা পর্যন্ত সে এমন করেই শুয়েছিল। ছাড়ার আগে অবশ্য মসৃণ চুলগুলোতে দু'টো চুমু খেয়ে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিল তাকে।

চলবে-

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 23 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন