ফন্ট সাইজ:
থিম:
আম পাতা জোড়া জোড়া

পর্ব 25

লেখক: মেহরিমা আফরিন

#আম_পাতা_জোড়া_জোড়া-২৫
লেখনীতে #মেহরিমা_আফরিন

(রাতে রিচেক দিব)

নিনীত সাধারণ ঘর অন্ধকার রাখতেই পছন্দ করে। আজ নিজ থেকেই একটা বাতি জ্বালিয়ে দিল। বারান্দার থাই গ্লাসটাও সে বন্ধ রাখতে বেশি সাচ্ছন্দ্য বোধ করে। আজ সেটা খোলা। আলো বাতাস না এলে ঘরটা গুমোট মনে হবে খুব।

পারমিতা বসেছিল তার খাটে। চোখ দু'টো সামান্য ভেজা। নিনীত হতভম্ব হয়ে তাকে এখানে নিয়ে এসেছে। হুট করে সে কেঁদে ফেলবে, নিনীত ভাবেনি। মেয়েদের ঘুম তেমন গাঢ় না। বাচ্চারা জেগে যাবে, এই ভয়ে নিনীত তাকে এই ঘরে এনে বসিয়েছে।

পারমিতা পাথরের মতো বসল। নিনীত এক গ্লাস পানি এগিয়ে দিল। বলল,"নিন, পানি খান।"

রাত প্রায় শেষের দিকে। দূরের বড় কৃষ্ণচূড়ার গাছে বসে একটা পাখি ডাকছে। পারমিতা দুই ঢোক পানি খেয়ে গ্লাসটা ফিরিয়ে দিল। মাথা নামিয়ে ছোট করে বলল,"ধন্যবাদ।'

নিনীত সাইড টেবিলের উপর গ্লাস রেখে তার পাশে এসে বসল। বেশ হালকা স্বরে বলল,"পারমিতা, আপনার কি হয়েছে? আপনি ঠিক আছেন?"

"না, নেই।"

"কেন নেই?"

"আমার কিছুদিন ধরে মন খারাপ?"

"কারণ কি?"

পারমিতা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল,"সপ্তাহ খানেক আগে আমার সাথে প্রতীকের দেখা হয়েছে।"

"হু ইজ প্রতীক? ইউর এক্স?"

নিনীত ঝুঁকে এসে প্রশ্ন করল। পারমিতা অবাক হয়ে বলল,"হাউ ডিড ইউ নৌ দ্যাট?"

সামান্য হাসল সে। অগভীর স্বরে বলল,"জাস্ট গেসড। মিলে গেল নাকি?"

"জি।"

"ওয়াও। ফাইন। আপনার কাহিনি বলুন এবার। প্রাক্তনের সাথে দেখা হয়েছে এতোদিন পর। আপনার তো মন ভালো হওয়ার কথা।"

নিনীত হেসে হেসে প্রশ্ন করল। পারমিতা শান্ত চোখে তার দিকে তাকিয়ে থমথমে গলায় বলল,"হাসবেন না। মোকও করবেন না। এটা হাসির বিষয় না। প্রতীক আমার জীবনে কোনো কৌতুকের বস্তু না।"

"তাহলে কি?"

"কার্স। অভিশাপ। প্রতীক আমার ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন।"

"ওকে ফাইন। তাহলে লেট হিম গো।"

"না। বাদ দেওয়া যাবে না।উই নিড টু টক।" পারমিতা এ প্রথম সোজাসুজি নিনীতের দিকে তাকাল। নিনীত কপাল কুঁচকে বলল,"কি হয়েছে?"

পারমিতা তার হাতটা নিজের হাতে নিল। তারপর আস্তে করে টেনে এনে নিজের পেটের উপর চেপে ধরল। অসহ্য যন্ত্রণার ঠোঁট কামড়ে ধরে বলল,"নিনীত, শুনুন। আই...আই হ্যাভ আ পাস্ট।"

নিনীত হতভম্ব হয়ে গেল। ফ্যালফ্যাল চোখে একবার তার মুখের দিকে, আরেকবার তার পেটে চেপে ধরা হাতটার দিকে তাকিয়ে অবিশ্বাস্য গলায় বলল,"ইউ....ইউ কনসিভড পারমিতা?"

পারমিতা চোখ মুখ খিঁচে কাঁপা স্বরে বলল,"ই...ইয়েস। আই ডিড।"

নিনীত বড় বড় পলক ফেলে। বোকার মতো নিজের জায়গায় বসে কেবল পারমিতার শুকনো মুখটার দিকে তাকায়। পারমিতা শ্বাস আটকে বলল,"আমি অনেক অনেক ভুল করেছি অতীতে। প্লিজ ফরগিভ মি।"

"ইটস ওকে। শান্ত হোন। রিল্যাক্স।"
নিনীত ইতস্তত করতে করতে একটা হাত তুলে পারমিতার কাঁধে রাখল। আলতো মালিশ করে বলল,"আমি আপনাকে মাফ করার কেউ না ম্যাডাম। আপনি আপনার অতীতের কোনো কাজের জন্যই আমার কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য না ঠান্ডা হন একটু। প্রতীক কে নিয়ে আমরা পরে কথা বলব।"

"না, আজকেই।" পারমিতা জেদ করে বলল,"আপনি আমাকে ঘর থেকে বের করবেন না। আজ আমি এখানেই থাকব।"

নিনীত গম্ভীর মুখে বসে ছিল। পারমিতার কথা শুনেই হেসে উঠল হঠাৎ। কপালের উপর দুই আঙুল চেপে হাসি থামিয়ে বলল,"আচ্ছা ঠিক আছে। এখানেই থাকবেন। আমার কাছেই থাকবেন।"

"নাও গিভ মি আ সাইড হাগ। রাইট নাও।"

পারমিতা শক্ত গলায় আদেশ করল। নিনীত হাসতে হাসতে বলল,"ইউ আর টু মাচ।"

"যেটা বলেছি সেটা করুন।"

নিনীত হাসি থামাল। পারমিতার কাঁধের উপরে থাকা হাতটা প্রসারিত করে তাকে একপাশ থেকে জড়িয়ে ধরল। পারমিতা সামান্য গুটিয়ে গিয়ে বলল,"তার আগে বলুন, আমাকে জাজ করবেন না। কোনো কিছু নিয়েই না।"

"আশ্চর্য! কেন আপনাকে জাজ করব আমি? আমি নিজে ঠিক আছি? আমার পাস্ট কি খুব চকচকে? আমার তো প্রেজেন্টেই সমস্যা। আমি কে আপনাকে জাজ করার?"

পারমিতা বড় একটা শ্বাস ছাড়ল। তারপর বলল,"প্রতীক সম্পর্কে আমার ফুফাতো ভাই।"

"আচ্ছা। এরপর?"

পারমিতা নিজ থেকেই নিজেকে ছাড়িয়ে নিল পুরোপুরি। কেমন যেন দূরে সরে বসল কিছুটা। নিনীত দেখল, পারমিতার দুই চোখ আবার ঘোলাটে দেখাচ্ছে।কণ্ঠমণি কাঁপছে সামান্য। পারমিতা অতিশয় দুর্বল কণ্ঠে বলল,"নিনীত, আমি প্রাচুর্য আর আভিজাত্য, উভয়ের মধ্য দিয়েই বড় হয়েছি। কিন্তু একটা জিনিসের ঘাটতি ছিল আমার।
পিপল। আপনি জানেন না,মানুষও একটা সম্পদ। কারো কাছে অনেকগুলো মানুষ আছে। তার মানে সে অনেক ধনী। আমার কাছে কোনো মানুষ ছিল না। বড্ড অভাবে ছিলাম আমি। একটা মানুষের, একটা হাতের, একটু বন্ধুত্বের।
বাবা মায়ের অসুস্থ দাম্পত্য সম্পর্ক আর আপার ক্লাস ফ্যামিলির বিজি লাইফ দেখে বড় হয়েছি আমি। আমার বাবা আমার কোনো শখ, কোনো ইচ্ছে অপূর্ণ রাখেনি। তবে সবই ম্যাটারিয়ালিস্টিক। ইমোশনাল কোনো ডিমান্ড তিনি পূরণ করতে পারেন নি। আর মায়ের কথা তো বাদই দিলাম। সেই সময় প্রতীক ছিল আমার প্রথম বন্ধু, আমার প্রথম মানুষ, আমার সেই হাত। আমি প্রতীককে ভালোবাসতাম। আর প্রতীকও হয়তো আমাকে বাসতো।"

শেষ কথাটা বলতে গিয়ে পারমিতার কণ্ঠ ক্ষীণ হয়ে গেল। কিছুটা বিড়বিড় করে বলল,"কিন্তু ভালোবাসা তো কোনো ধ্রুবক না।"

নিনীত চোখ তুলে বলল,"এরপর? আপনারা রিলেশনশিপে ছিলেন?"

"হ্যাঁ ছিলাম। কিন্তু ঐটা যে রিলেশনশিপ সেটা আরো পরে বুঝেছি। বন্ধুত্বের ফাঁকেই প্রেম ভালোবাসা হয়ে গেল। আমরা বুঝতেও পারলাম না। তারপর থেকে প্রতীকই আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু, আমার সব দুঃখের শ্রোতা।"

পারমিতা একটু থেমে আবার বলল,"আমি তখন আমাদের উত্তরার বাড়িতে থাকতাম। ওখানেই প্রতীক এসে দেখা করত আমাদের সাথে। আমাদের পুলসাইডে বসে আড্ডা দিতাম, বাগানে হাঁটতাম। এরপর তো মা আর বাবার ডিভোর্স হয়ে গেল পারমানেন্টলি। তখন আমি শিফট হয়েছি বনানীতে। বাবার নিজস্ব ফ্ল্যাটে। বাবা তখন বিশাল বড় আইনজীবী। সাধারণ মানুষ বাদ দিয়ে তার মোয়াক্কেল তখন তুখোড় তুখোড় সব রাজনীতিবিদ। বাবা তাদের মামলা মোকদ্দমা সামলাতেন। শহরের সেরা আইনজীবীদের তালিকায় বাবার নাম ছিল বেশ উপরে। বাবা তখন প্যাশনেট তার উকালতি নিয়ে। ঐটাই বাবার জীবন। টাকার চেয়েও বেশি বাবা প্রয়োজন ছিল সাফল্যের। একেকটা কেস জেতার পর বাবা বিশ্বজয়ের আনন্দ পেত। জীবনের আনন্দ বলতে বাবা সেটাকেই বুঝতো। আমাদের বনানীর ফ্ল্যাটটা বাবা ভরিয়ে দিয়েছিল দামি দামি সব জিনিস দিয়ে। কলেজে উঠার পরেই আমাকে একটা গাড়ি উপহার দিল বাবা। আটাশি লক্ষ টাকার প্রাইভেট কার। ঐ গাড়িতে আমি তেমন চড়িনি। গাড়ির নেশা আমার ছিল না। আমার শুধু একজন মানুষের নেশা ছিল। প্রতীকেরই বেশি আগ্রহ ছিল গাড়িটার প্রতি। ওর খুব গাড়ির শখ। ঐ গাড়ির সব খুঁটিনাটি সে ই জানত। গাড়িও চালাত খুব ভালো। আমাদের বাড়িতে এলেই রাতে সে ঐ গাড়িটা নিয়ে বেরিয়ে যেত একা। গাড়ি নিয়ে বেরুলে তার কোনো সঙ্গ রাখতে মন চায় না।"

"আপনার গাড়ি প্রতীক চালাত? আবার আপনাকে সাথেও নিত না। স্ট্রেঞ্জ!"

"অনেকের হয় না শখ? একটু নিজের মতো থাকার। প্রতীক তো আমার তো একাকীত্বে ভুগতো না। ওর বাড়িতে পর্যাপ্ত মানুষ ছিল ওকে সঙ্গ দেওয়ার।"

"ডাক্তার ইবনাত, ফর ইয়োর কাইন্ড ইনফো, মানুষে মানুষেও তফাৎ আছে। আমরা যাকে ভালোবাসি, তাকে সবসময়ই আমরা নিজের কাছে রাখতে চাই। আপনার ফুফাতো ভাই তো অদ্ভুত। আপনাকে ছাড়াই ঘুরত। আপনি আরো অদ্ভুত। বিকজ ইউ ওয়্যার ওকে উইথ দ্যাট।"
নিনীত ঘাড় কাত করে বলল,"আমি হলে গাড়ির চাবি ছুড়ে ফেলতাম বাড়ির পেছনের জঞ্জালে। আমি খুব পজেসিভ, ম্যাডাম। আমি ইগনোরেন্স নিতে পারি না।"

"প্রতীক কি আমাকে ইগনোর করত?"

নিনীত ফিচেল হাসল।
"নাহ, প্রতীক আপনাকে বাড়িতে রেখে আপনার সম্মান করত। আপনাকে নিরাপদে রাখত।"

"হাসবেন না। হাসাহাসি বিরক্ত লাগে।"

"হাহাহা। হাসি বেরিয়ে যাচ্ছে। কি করব আমি? ইউ ডাম্ব।"

"এখনই ডাম্ব বলবেন না। পরের কথা এখনও বাকি আছে।"

"জি বলুন।"

"প্রতীক আমার বনানীর বাড়িতে প্রায়ই আসত। বাড়িতেও সবাই জানত, আমরা খুব ভালো বন্ধু। প্রতীক খুব অল্পতেই মুগ্ধ হতো জানেন? আমাদের বনানীর বাসায় একটা বাথটাব ছিল। বাবা ইম্পোর্ট করিয়েছিল চায়না থেকে। ঐ বাথটাব দেখেও প্রতীক মুগ্ধ হতো। বলত, বিয়ের পর সে এই বাড়িটাই নিবে।"

নিনীত আবার চোখ তুলল উপরে। পারমিতার শান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে অবজ্ঞায় কপাল কুঁচকে বলল,"ইউ ডাম্ব। এই ব্রেইন নিয়ে ডাক্তারি পড়েছেন কেমন করে? আমার নিবি আপনার চেয়ে বেশি বুদ্ধিমতি। নিকিও হবে ভবিষ্যতে।"

"ক্যান ইউ প্লিজ শাট আপ?" পারমিতা দুই হাত কানে চেপে বলল,"বলেছিলেন কোনো কথা বলবেন না, জাজ করবেন না। আপনি তো এখনই জাজ করা শুরু করেছেন।"

"জাজ করলাম কোথায়? অবাক হচ্ছি এটা ভেবে যে আপনি এতো বোকা। ঐ প্রতীক, আপনার মিডল ক্লাস মামাতো ভাই আপনার বাবার টাকা পয়সা দেখে পাগল হয়ে আপনার সাথে বন্ধুত্ব করেছে। অথচ আপনি সেটাকে ভালোবাসা বলছেন!"

পারমিতা মুখ শক্ত করে বলল,"শাট আপ। ঐটা ভালোবাসাই ছিল। ভালোবাসা বাদে কেউ কারো জন্য এতো করে না।"

"কচু করে। মাই গড! ইয়াজিদ তুই কোথায়? এই মেয়েকে এসে দুটো গালি দিয়ে যা।"

পারমিতা চোখ কটমট করে বলল,"আপনি কি আমার কথা শুনবেন? নাকি আমি উঠে চলে যাব এখান থেকে?"

নিনীত দ্রুত তার হাত চেপে ধরল। হাসি থামিয়ে চাপা স্বরে বলল,"না বসুন। আপনার কাহিনি বলুন। অনেকদিন পর মজার কাহিনি শুনছি। বলুন।"

"আমাদের ঐ ফ্ল্যাটে দুইজন হেল্পিং হ্যান্ড ছিল। ওরাই সব কাজ করত। প্রতীক বাড়িতে এলে আমি নিজেই রান্না করতাম তার জন্য। একদিন তার জন্য রান্না করতে গিয়ে আমার হাত পুড়ে গেল। প্রতীক এটা দেখে কিটবক্স থেকে বার্নোল এনে আমার হাতে লাগাল। আর.."

পারমিতা চুপ করে মাথা নামিয়ে নিল। বাকি কথাটা সম্পূর্ণ করতে পারল না। নিনীত মৃদু হেসে শুধাল,"আর কি? পোড়া জায়গায় একটা চুমু খেল?"

পারমিতা আশ্চর্য হয়ে বলল,"আপনি কেমন করে জানেন?"

"হাহাহা। আন্দাজ করলাম আরকি।"

"দ্যাট ওয়াজ দি ফার্স্ট টাইম, যখন কেউ আমার জন্য মায়া দেখিয়েছে, আমার যত্ন করেছে। প্রতীকের মতো আমাকে নিয়ে কেউ ভাবতো না।"

"সিরিয়াসলি মিতা? আপনার বাবা রীতিমতো রাজপ্রাসাদ বানিয়ে দিয়েছে আপনার জন্য। আপনার জীবনে কোনো কিছুর অভাব রাখেনি। আর আপনি বলছেন, প্রতীকের মতো কেউ আপনাকে নিয়ে ভাবতো না। আপনি এতো নাদান? প্রতীক আপনাকে স্বার্থের খাতিরে ভালোবাসত। আপনার বাবা আপনাকে আনকন্ডিশনালি ভালোবাসত। আপনি ভালোবাসাই চিনেন না।"

"মেইবি ইউ আর রাইট। আমি সত্যিই ভালোবাসা চিনি না।"
একটু হাসল পারমিতা। বলল,"সেই সময় আমার কাছে এইটুকুই অনেক ছিল। আমার ব্যথায় কেউ মলম লাগাচ্ছে, আঠারোর ঘরে গিয়ে এই অনুভূতিই অপার্থিব মনে হতো আমার।"

"দিস ইজ বেয়ার মিনিমাম পারমিতা। আপনি কি ভাবতেন, প্রতীকের জায়গায় অন্য কেউ হলে আপনার পোড়া জায়গায় সিগারেটের ছ্যাকা দিত? হাহাহা। সিলি গার্ল।"

"আই অ্যাম সিলি। নিনীত সাহেব, আপনি জানেন না আমি কতো ষ্টুপিড, ইমোশনাল ফুল।"

"এইতো জানছি। বুঝতেও পারছি।"

পারমিতা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। নিনীত আবার আস্তে করে ওর পেট হাত রেখে বলে, "আর ওর কাহিনি কি? আপনার লম্পট ফুফাতো ভাই আপনাকে মেন্টাল সাপোর্ট দিতে গিয়ে সব রকম সাপোর্ট দিয়ে দিল?"

কথা শেষ করেই হো হো করে হাসল নিনীত। পারমিতা কঠিন চোখে তাকাতেই হাসি থামাল। মাথা নেড়ে বলল,"ওকে মাই মিস্টেক। আর হাসব না। বলুন আপনি।"

পারমিতা নিঃশ্বাস সামলে ক্ষীণ স্বরে বলল,"ঐটা আমার অন্যায় ছিল। আমি জানি। ভালোবাসা আর ঐসবের মাঝে একটা গাঢ় সীমারেখা থাকে। মন চাইলেই ওটা পার করা যায় না। আমি পার করেছিলাম। আমি ভুল ছিলাম। আমি জানি। প্রতীকের সাথে আমার সম্পর্কে তখন আর ন্যায় অন্যায় বিচার বিবেচনাবোধ কিছুই ছিল না। আমরা শুধু ভালোবাসতাম দু'জনকে। হায়ার সেকেন্ডারি শেষ করার পর আমি ভাবছিলাম প্রাইভেট ভার্সিটিতে ভর্তি হবো। ঠিক সেই সময়ে গিয়ে আমি জানলাম, আমি প্রেগন্যান্ট। মা হতে যাচ্ছি আমি। আমার পাপ গিয়ে জমা হয়েছে একটা নিষ্পাপ শরীরে। ওর কোনো দোষ নেই। ও নির্দোষ।"

বলতে বলতে পারমিতার ঠোঁট ভাঙল। চোখ মুছতে মুছতে আবার বলল,"ওর কোনো দোষ নেই।"

"আমি জানি। আমাদের কারো কর্মফলের দায় আমাদের সন্তানের না। আমিও খুব দেরিতে উপলব্ধি করেছি এটা।"

পারমিতা বিরান স্বরে বলল,"আমি ব্যাপারটা বোঝার পর সবার প্রথমে প্রতীককে জানালাম। প্রতীকের সাথে তখন আমার সম্পর্ক কিছুটা খারাপ। সে ভার্সিটির শেষ পর্যায়ে গিয়ে খুব ভালো ভালো কিছু বন্ধু পেল। তাদের সাথেই ঘুরতো সারাদিন। আমার সাথে কথাও বলতো না তেমন। আগের মতো কোনো বন্ডিংই ছিল না আমাদের।"

"এরপর?"

"আমি তাকে সবটা খুলে বলার পর প্রতীক আমার সাথেই রাগ দেখাল। আমি নাকি ওকে শাস্তি দিতে এমনটা করেছি। যেন প্রতীকের জীবন তছনছ হয়ে যায়?"

"এমনটা কেন হবে?"

"প্রতীক বাবাকে খুব ভয় পেত। জানত, বাবা আমার বিষয়ে খুবই সিরিয়াস। যদি একবার জানতে পায়, প্রতীকের সাথে আমার সম্পর্ক আছে, তাহলে তুলকালাম বাঁধাবে। বাবা খুবই লিবারেল মানুষ। কিন্তু এসব ব্যাপারে বেশ কনজার্ভেটিভ। বাবা বিয়ের আগে এসব নোংরামি নিতে পারে না।"

পারমিতা একটু থেমে প্রায় অবশ কণ্ঠে আবার বলতে শুরু করল,"প্রতীক প্রথমদিন ব্যাপারটা জেনেই খুব বাজে ব্যবহার করল আমার সাথে। ব্যাপারটা তার জন্য যেমন অপ্রত্যাশিত, আমার জন্যও তাই। কিন্তু সে আমার দিকটা বুঝল না। আমার প্রথম হার্টব্রেক হলো যখন প্রতীক আমায় বিশ্রী ভাষায় গালাগালি করল এই বিষয় নিয়ে। দ্বিতীয় হার্টব্রেক হলো যখন সে আমার গায়ে হাত তুলল। ও আগে কখনো এমন করেনি আমার সাথে।"

"হাত তুলল গায়ে?" নিনীত অস্থির হয়ে বলল,"আর আপনি তখনও আপনার বাবাকে জানান নি?"

"না। বাবা এসব জানলে তো প্রতীকেরই বিপদ।"

"জাহান্নামে যাক আপনার প্রতীক।"

"আমি তো ওকে ভালোবাসতাম। জাহান্নামে কেমন করে যেতে দিতাম?"

নিনীত দুই হাতে মাথা চেপে বসল। বড় করে নিঃশ্বাস ছেড়ে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,"আচ্ছা ঠিক আছে। বলুন আপনি?"

পারমিতা ধরা গলায় বলল,"থার্ড হার্টব্রেক হলো তখন, যখন প্রতীক বলল,এবর্শন করে বাচ্চাটা নষ্ট করে ফেলতে।"

"কিহ? ইজ হি ইনসেইন?"

"জানি না। ওর শুধু ভয় হতো বাবাকে নিয়ে। বাবা জেনে গেলে ওকে মেরে ফেলবে, এই কথাই বলত বার বার।"

"মেরে ফেলাই উচিত।"

"আমি সেই সময় খুব গো ধরে বসলাম। এতো এতো পাপ করেছি। ঐ পাপের সামনে এই বাচ্চাটাকে বাঁচিয়ে রাখলে খুব বেশি অন্যায় কিছু হবে না। মানুষ এতে যা ভাবার ভাবুক। আল্লাহ তো সব জানে।
কিন্তু প্রতীক খুব পাগলামি শুরু করল। এই বাচ্চা ও চায় না। ওর জীবন শেষ হয়ে যাবে এই বাচ্চা রাখলে। আমি বললাম, তুমি যা খুশি করো। আমি এবর্শন করব না। বেশি বাড়াবাড়ি করলে আমি বাবাকে জানাব সব। প্রতীক তখন..." পারমিতা শ্বাস আটকে ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল,"ও তখন রাগে হিতাহিত হারিয়ে আমার পেটে এতো জোরে জোরে দুইটা লাথি মারল।"

পারমিতা আটকে রাখা শ্বাসটা ছেড়ে ডুকরে কেঁদে উঠল। দু'হাতে মুখ চেপে ধরে বলল,"হি জাস্ট কিলড মাই চাইল্ড।"

নিনীত সহসা খাঁমচে ধরল তার কাঁধ। উদগ্রীব হয়ে বলল,"হাউ ডিড ইউ সারভাইবড? আপনার বাসার হেল্পিং হ্যান্ডরা কোথায় ছিল তখন?"

"একজন ছুটিতে ছিল। আরেকজন ছিল বাজারে। প্রতীক যখন আমার পেটে আঘাত করল, আমি তখন তাল হারিয়ে ফ্লোরের উপর গিয়ে পড়লাম। দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে প্রচন্ড আঘাত পেয়েছি মাথায়।"
কপালের এক পাশ থেকে চুলগুলো সরিয়ে একটা পুরাতন ক্ষত দেখিয়ে পারমিতা বলল,"আমার মাথা ফেটে রক্ত বের হচ্ছিল রীতিমতো। প্রতীক আমায় ঐ অবস্থায় ফেলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। আমি কতোক্ষণ মেঝেতে বসে ভাবছিলাম, আমার কি করা উচিত। বাচ্চা ততক্ষণে শেষ। আমি নিজেই টের পাচ্ছি আমার ভেতরে সব লণ্ডভণ্ড হয়ে যাচ্ছে। শরীর ভেঙে পড়ছে। রক্তে আমাদের ফ্লোর ভেসে যাচ্ছে। আমি তাড়াতাড়ি মোসাম্মত খালাকে ফোন দিলাম। ফোন দিয়ে বললাম, আমার একটা বান্ধবি ফ্লোরে পড়ে মাথায় খুব ব্যথা পেয়েছে। আমি তাকে নিয়ে হাসপাতাল যাচ্ছি। ইচ্ছে করেই নিজের কথা বলিনি। কারণ আমি চাইছিলাম না বাবা এ ব্যাপারে কিছু জানুক।"

"কেন চান নি?ফর দ্যাট স্পাইনলেস বাস্টার্ড। হি ডিজার্ভ টু ডাই।"

পারমিতা মাথা নেড়ে বলল,"না। যখন আমি বুঝলাম, আমার পক্ষে আর ওকে বাঁচানো সম্ভব না, তখন আমি ঠিক করলাম, ওর ব্যাপারটা আমি আর কখনোই কাউকে জানাব না। আমি একাই উঠে দাঁড়ালাম। তবে চলতে পারছিলাম না।মনে হচ্ছিল এতো অমানুষিক যন্ত্রণা আমি সহ্যই করতে পারব না। প্রতীক কিছুক্ষণ পর ফিরে এলো। ওর ভেতর ভয় ঢুকে গেল, যদি আমার কিছু হয়? যদি কেউ আমায় এই অবস্থায় দেখে ফেলে? ও তখন আমায় একটা হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করাল। খুবই নিম্নমানের একটা ক্লিনিক। বিচ্ছিরি একটা কেবিন। সেখানেই একটা অপারেশন হলো আমার। জানি না কিসের অপারেশন। জীবনের অর্ধেক শক্তি ওখানেই ফুরিয়ে গেল। আসলে আমি মিথ্যা বলেছিলাম। প্রতীক শুধু লাথিই মারে নি। আমি যখন নিচে পড়ে গেলাম, ও তখন ইচ্ছে করে চাইছিল আমার বাচ্চাটা যেন নষ্ট হয়ে যায়। ও নিজেই টেবিলের উপর থেকে একটা বাটার নাইফ নিয়ে আমার....আমার...আ...."

পারমিতা হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। শ্বাস টানতে টানতে বলল,
"ডাক্তার আমার ভ্যাজাইনাল পার্টস দেখে আতঁকে উঠে বলল,আপনি কি নিজেই ইচ্ছে করে এবর্শন করতে চাইছিলেন? আমি তখন কিছু বলার মতো অবস্থাতেও নেই। আমার শরীর খিঁচুনি তুলতে তুলতে অবশ হয়ে যাচ্ছিল। ঐ নোংরা ক্লিনিকেই আমার অপারেশন হলো। বাচ্চাটা মারা গেল। আমি গভীর রাতে ঘন্টার পর ঘন্টা কেবিনের বিছানায় বসে পেটে হাত বুলালাম। ওর মৃত্যুটা খুব উপলব্ধি করেছি আমি। আমি বুঝতাম, ওর কতো যন্ত্রণা হয়েছে। মা ছিলাম তো তাই।"

"আর এই এতো বড় ঘটনা আপনি আপনার বাবাকে জানান নি?"

"না, জানাই নি। বাবাকে বলেছিলাম, ঘুরতে যাচ্ছি বন্ধুদের নিয়ে। বাবাও এতো মাথা ঘামায় নি। এরপর তো ধীরে ধীরে অসুস্থতা কেটে গেল। সুস্থ হলাম আমি। প্রতীক গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে তাদের জুনিয়র এক মেয়েকে বিয়ে করল। তারপর দু'জন চলে গেল অন্য দেশে। ওখানেই সংসার, বাচ্চা কাচ্চা সব।"

"দ্যাট রাস্কেল!" নিনীত দাঁতে দাঁত চেপে ফুসতে ফুসতে বলল,"আপনি একটা অপদার্থ। আমি হলে ঐ স্কাউনড্রেলকে মেরেই ফেলতাম।"

"মেরে ফেলে লাভ কি? প্রতীক মরলে কি আমার বাচ্চাটা ফিরে আসতো?"

নিনীত উঠে দাঁড়াল অস্থির হয়ে। বড় বড় পা ফেলে আলমারির কপাট খুলে দাঁড়াল। দ্বিতীয় ড্রয়ার থেকে একটা কালো রঙের রিভলভার বের করে ভালো মতো তাকাল সেটার দিকে। পারমিতা আঁতকে উঠে বসা থেকে উঠে দাঁড়াল। চমকে গিয়ে বলল,"এটা কি? এটা কোথা থেকে এলো আপনার কাছে?"

সে নিজেও দৌড়ে গেল তার কাছে। নিনীত বলল,"আমার নানাভাইয়ের এটা। নানাভাই সেনাবাহিনীতে কাজ করতেন। এটা উনার পার্সোনাল রিভলভার। লাইসেন্সড।"

"সাংঘাতিক! আপনি এসব নিয়ে ঘুরেন। কেন?"

নিনীত একপেশে হাসে। হাসতে হাসতেই বলে,"যেন প্রতীকের মতো বাস্টার্ডদের সামনে পেলেই গু//লি মেরে উড়িয়ে দিতে পারি।"

পারমিতা এক টানে তার হাত থেকে রিভলভার কেড়ে নিল। দুই দিকে মাথা নেড়ে বলল,"প্রতীকের টপিক এখানেই শেষ। ওটা নিয়ে আর টানাহেঁচড়ার দরকার নেই।"

"ওবাবা। প্রেমের দেখি শেষ নাই।" নিনীত ভ্রু কুঁচকে বলল,"আপনার প্রতীক এখন কোথায়? আপনাদের উত্তরার বাড়িতে?"

"হ্যাঁ।"

"চলুন তাহলে। কাল গিয়ে আপনার ফুফাতো ভাইকে একটা সালাম দিয়ে আসি।"

পারমিতা আরেক দফা চমকাল। হকচকিয়ে গিয়ে বলল,"আপনি যাবেন?"

"ইয়েস ম্যাডাম।"

"কেন? কি করবেন গিয়ে?"

"একটু সালাম দিয়ে মুখ দেখে আসব। হেডম দেখে আসব আপনার প্রতীকের।"

"কি মুশকিল। আপনাকে তো ভদ্র মানুষ ভেবেছিলাম।".

"আমি তো ভদ্রই। একটু দেখা সাক্ষাৎ করে কুশল বিনিময় করতে চাইছি। এটা কি অন্যায়?"

"সত্যি তো? শুধু দেখবেন, তাই তো?"

"এক্সাক্টলি। আমার আর এখন মারামারি করে হিরো সাজার বয়স নেই ডাক্তার ম্যাডাম।"

পারমিতা আশ্বস্ত হলো। নিনীত হাসতে হাসতে তার হাতটা ছেড়ে দিয়ে খাটে গিয়ে বসল। আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে বলল,"বাট আপনার গোল্ড ডিগার এক্স তার রেস্ট অফ দি লাইফ আমাকে মনে রাখবে, এইটুকু কথা দিতে পারি। প্রতীক, হ্যাহ, রাস্কেল বয়।"

চলবে-

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 25 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন