ফন্ট সাইজ:
থিম:
আম পাতা জোড়া জোড়া

পর্ব 26

লেখক: মেহরিমা আফরিন

#আম_পাতা_জোড়া_জোড়া-২৬
লেখনীতে #মেহরিমা_আফরিন

পারমিতা শাড়ির আঁচলে পিন গুজতে গুজতে আয়নায় তাকাল। আয়নায় নিনীতের প্রতিবিম্ব দেখা যাচ্ছে। সে ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে খাটে বসে আছে। পারমিতা বলল,'আপনি সত্যি বলছেন? সত্যি আজ আপনি ঐ বাড়িতে যাবেন?"

নিনীত মাথা না তুলেই জবাব দিল,"হু। সত্যিই যাব। এনি প্রবলেম?"

"না, প্রবলেম না। কিন্তু আমি ঐ ব্যাপারটা ঘাটাতে চাই না আর।"

"কেন? আপনার সো কল্ড এক্সকে এখনো ভালোবাসেন আপনি?"

পারমিতা অবাক হয়ে পেছনে তাকাল। তীব্র প্রতিবাদের সুরে বলল,"নো, নেভার। আমি ওকে আমার সামনে সহ্য করতে পারি না।"

"সহ্য করতে হবে না। অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে রাখবেন।"

পারমিতা কোনো রকমে দুই হাতে চুল প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে বলল,"ভাববেন না আমি দয়া করে প্রতীককে ছেড়ে দিয়েছি। দয়া করিনি। আসলে নিজেই মানুষের চোখা নজর থেকে বাঁচতে চেয়েছি। বাচ্চাই যখন আর রইল না, তখন আর দশ লোকের সামনে চরিত্রহীনা হয়ে লাভ কি? এর চেয়ে মানুষ এটাই জানুক, যে আমার জীবনে আপনিই প্রথম, আপনিই শেষ।"

নিনীত মৃদু হাসল তার কথায়। নামানো স্বরে বলল,"আমিই শেষ? আপনি নিশ্চিত?"

পারমিতা দৃঢ় গলায় বলল,"জি, আমি নিশ্চিত।"

"বাহ বেশ তো।"

"আপনি আমার সুইটহার্ট।"

নিনীত হো হো করে হেসে উঠল।
"কিসব যা তা।"

"যা তা না। সত্যি কথা। আমি বারো বছরে এই প্রথম কাউকে আমার অতীতের কথা শুনিয়েছি। আমার ডায়েরি আর আপনি বাদে কেউ জানে না এই কথা। আমার খুবই শান্তি লাগছে নিনীত সাহেব। আরেকটু শান্তি লাগত, যদি আপনি আমায় আরেকবার জড়িয়ে ধরতেন।"

নিনীত উত্তর দিল না। বাঁকা চোখে একবার পারমিতার দিকে তাকিয়ে আবার মেঝের দিকে তাকাল। পায়ের আঙুল দিয়ে মোটিফের কাজ করা কার্পেটটা খোঁচাতে খোঁচাতে বলল,"আপনি তো মহা ঝামেলা দেখছি।"

"একটু ঝামেলাই বোধহয়।"

"ঝামেলা করুন। একেবারে চুপ হবেন না তবুও। আপনাকে হৈচৈ করা অবস্থাতেই বেশি মানায়।"

"বলছেন?"

"হু।"

নিকিতা ঘুম ভাঙার পরেই পাশ ফিরে দেখল, পারমিতা নেই। চট করে উঠে এসে সে দরজা দিয়ে বের হলো। দু'চোখ কচলাতে কচলাতে নিনীতের ঘরে এসে দাঁড়াল। ঘুম ঘুম গলায় বলল,"মমা! উঠি চলি এসেছ কেন? ভই পাচ্ছিলাম তু।"

পারমিতা এগিয়ে এসে বলল,"স্যরি সোনা।"
বলেই একবার মাথায় হাত বুলাল। হাত বাড়িয়ে সামান্য ঝুঁকে এসে বলল,"আসো, কোলে আসো।"

নিনীত বলল,"আপনার দেরি হচ্ছে। আপনি যান। ওকে আমি রাখছি।"

পারমিতা ঘুরে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলল,"আপনি রাখবেন?"

"হু। অসম্ভব কিছু? রাখতে পারব না বলছেন?"

"নাহ। পাপাইয়ের কাছে নিকিতা সারাজীবন থাকতে পারবে। আমি জানি।"

নিনীত জবাব দিল না। তবে উত্তর টা তার মন মতো হলো। গর্বে বুকের পাটা টান টান হলো তার। সে বড় বড় পায়ে এগিয়ে গেল নিকিতার কাছে। গিয়েই এক টানে কোলে তুলল তাকে।

নিকিতা এবার ভালো করে চোখ মেলল। চোখের সামনে সেই পরিচিত অবয়বটা দেখেই খুশিতে আত্মহারা হয়ে বলল,"পাপাই! গুড মুরনিং।"

"গুড মর্নিং।" নিনীত আলতো হাতে মেয়ের কপালের উপর থেকে চুল গুলো সরিয়ে দিল। নিকিতা চোখ পাকিয়ে তাকাল তার দিকে। নিনীত হেসে উঠে বলল,"মাথাভর্তি ম্যাগি নুডলস। ছিহ।"

সযত্নে কোকড়া চুলগুলো কানের পেছনে গুজে দিল সে। নিকিতা দু'হাতের ভর ছেড়ে বাবার কাঁধে মাথা রেখে বিড়বিড় করে বলল,"ছুদু বকা দাও পাপাই। আমান চুল কি এতু খানাপ?"

"না। তোমার চুল খুবই সুন্দর। রাজকন্যাদের এমন চুল হয়।"

"নাজকননা কি? পিমসেস?"

"ইয়েস, প্রিন্সেস।"

পারমিতা ড্রেসিং টেবিলের উপর থেকে ভ্যানিটি ব্যাগটা তুলতে তুলতে বলল,"আচ্ছা আপনারা থাকুন। আমি আসি। আর আপনি...আপনি সত্যিই যাচ্ছেন আজ উত্তরা?"

"আমাকে আপনার জোকার মনে হয়?"

"না, তা না।"

"আমি যখন বলেছি যাব,তার মানে অবশ্যই যাব।"

বেশ গম্ভীর মুখে জবাব দিল নিনীত। পারমিতা আর দাঁড়াল না। মাথা নামিয়ে দ্রুত বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।

নিকিতা তখনও বাবার কাঁধে মাথা রেখে শুয়ে আছে। ঘুমের ঘোর এখনো পুরোপুরি কাটেনি। চোখ বুজেই সদ্য শেখা একটা ছড়া আবৃত্তি করছিল বিড়বিড় করে।

নিনীত ওর মাথায় একটা হাত রেখে বলল,"মা, নিবেদিতা কি করে?"

"গুমায়।"

"কোন পাশে ঘুমায়? ডান পাশে না বাম পাশে?"

প্রশ্ন করার পর নিনীত নিজেই ভড়কে গেল। নিকিতা ডান বাম চিনে না।

নিকিতা বিড়বিড় করে বলল,"জানালাম পাশে হয়ে গুমায়।"

"জানালার দিকে?"

"হু।"

"আচ্ছা।"
নিনীত বলল,"ঘুম এখনো শেষ হয়নি নিকি?"

"না," নিকিতা বাবার বুকে মুখ গুজতে গুজতে বলল,"এততু বাকি পাপাই।"

"আচ্ছা ঘুমাও।

"পাপাই।"

"কি?"

"আদন কনো এততু।"

"আর কতো আদর? সারাদিনই তো আদর, আদর, আদর।"

"তুমু তো দিচ্ছ না।"

"হাহাহা। আচ্ছা দিলাম চুমু।"

নিনীত মুখ নামিয়ে পর পর কয়েকটা চুমু খেল। মাথায়, কপালে, গালে, চোখের পাতায়। নিকিতা এবার পুরোপুরি চোখ খুলে বাবার দিকে তাকাল। দুই হাতে নিনীতের গালের দুই পাশ চেপে ধরে বলল,"তুমি কতু ভালু। তুমি একতা পিমস পাপাই।"

"হয়েছে। এবার বলো,কি করবে? নাস্তা করবে? নাকি ওয়াশরুমে যাবে?"

"যাবু। পাপাই!"

"কি?"

"আমান খরগুশের নতুন দাঁত উঠিছে।"

"তাই? খরগোশেরও নতুন দাঁত উঠে?"

"হু। সুত্যি। বিচছাস করো না?"

"আচ্ছা। করলাম বিশ্বাস।" নিনীত নিজ থেকে জানতে চাইল,"তোমার খরগোশরা কেমন আছে?"

"কুনতা? জুনজুনি, তুকতুকি, বুনবুনি নাকি ছুনছুনি?"

"ওবাবা। এতো নাম ওদের! বলো, সবার টাই বলো।"

নিকিতা একে একে সবার খবর জানায়। হাত নেড়ে, গোটা গোটা অক্ষরে, বাবার গলা জড়িয়ে ধরে। নিনীত গভীর চোখে তাকিয়ে থাকে মেয়েটার দিকে। গলার কাছটা ধরে আসে কেমন যেন। এরপর নিজ থেকেই একটা চুমু খায় গালে। খুব কোমল, আর্দ্র একটা চুমু। তারপর আলতো করে কপাল ঠেকায় নিকিতার গালে। জড়ানো স্বরে ধীরে ধীরে বলে,"আই অ্যাম সো স্যরি নিকিতা। ইউ আর আ পিটি সোল। আই ডিড ইনজাস্টিজ টু ইউ। তোমার সাথে পাপাই অনেক অন্যায় করেছি।"

নিকিতা বুঝল না তার কথা। শুধু দেখল, পাপাইয়ের মলিন হয়ে ওঠা অনুতপ্ত মুখটা। তারপরই দ্রুত কপালে চুমু খেতে খেতে বলল,"তান্না কয়ে না পাপাই। তান্না কচছো কেন? তুমাকে কুক দিব, আইসপিম দিব, খেলনা দিব, ছব দিব। তান্না কয়ে না।"

নিকিতা ছোট ছোট হাতে মাথার চুল টেনে দিল তার। তাকে ঘুম পাড়ানোর জন্য একটা ছড়াও আবৃত্তি করে শোনাল। নিনীত শান্ত হলো না। উল্টো যতোবার তার মুখটা দেখছিল, ততবার দুই চোখ ভিজে উঠল আনন্দে।

গত রাতে পারমিতা কথার প্রসঙ্গে বলেছিল, আমার সবচেয়ে বড় প্রায়ঃশ্চিত্ত কি নিয়ে হয় জানেন? আমার সবচেয়ে বড় শাস্তি কি জানেন? আমার বাচ্চাটা। ও বেঁচে থাকলে হয়তো আমার গল্পটা অন্যরকম হতো। হয়তো পাপের বোঝা কম হতো কিছুটা। হয়তো আমি এতো বেশি পুড়তাম না। আমার অপরাধে একটা নিষ্পাপ, নিষ্কলুষ প্রাণ ঝরে গেল, এই অনুতাপ জীবন ভর বয়ে নেওয়া আমার কাছে পিঠের উপর আস্ত পাহাড় বয়ে নেওয়ার মতো। ধরুন, আপনার কাছ থেকে কেউ নিবেদিতা আর নিকিতাকে কেড়ে নিল? কেমন লাগবে আপনার? আমারও ঠিক এমনই লাগে।

ঠিক সেই মুহূর্তে নিনীতের মনে হলো, খচ করে কোনো খঞ্জর তার বুকের বা পাশে বিঁধে গেছে। কি আশ্চর্য! এতো ঘৃণা, এতো অবজ্ঞা, এতো তাচ্ছিল্য। এই দুই বছরে ঠিক কবে মেয়ে দু'টোকে বুকে জড়িয়ে আদর দিয়েছিল সে? তবুও যখন পারমিতা এদের কেড়ে নেওয়ার কথা বলল, তখন এতো গায়ে লাগল কেন তার?

নিনীত শক্ত হাতে মেয়েটাকে চেপে ধরে বুকের সাথে। নিকিতার ছড়া আবৃত্তি তখন শেষের দিকে। নিনীত ঘর জুড়ে পায়চারি করতে করতে বারান্দার থাই গ্লাস দিয়ে বাইরে তাকাল। সকালের আলো ধীরে ধীরে ঘরের মেঝেতে এসে পড়ছে। নিনীত মজুমদার তার কনিষ্ঠ কন্যাকে বুকের সাথে চেপে অন্যমনস্ক স্বরে গুনগুন করে-

আলো আমার আলো ওগো, আলো ভূবন ভরা
আলো নয়ন ধোওয়া আমার আলো হৃদয় হরা ।
____

সিরাজ গ্রুপের ঐ চাকরিটা যে শেষ পর্যন্ত জ্যোতির হবে, সে নিজেই আশা করে নি। ভেবেছিল, টিউশন করেই সামনের কয়টা মাস চলতে হবে।

কিন্তু এর মাঝেই কাগজ এলো, চাকরিটা তার হয়ে গেছে। চাকরি পাকা হওয়ার পর জ্যোতি আস্ত এক বিকেল নিজেকে উৎসর্গ করল। তার যা করতে মন চায়, যা করতে ভালো লাগে, যা যা পছন্দ সবকিছুই করল। চাকরি হয়েছে তার। এই সুসংবাদ তো উদযাপন করার মতোই।

এক প্যাকেট হাওয়াই মিঠাই, এক জোড়া অক্সিডাইজ ঝুমকা, এক ডজন রেশমী চুড়ি আর এক বক্স ক্লে, যা কিছুর শখ ছিল তার,সবই কিনল একদিনে। ফেরার পরে বাবা আর জাবিরের জন্য নাস্তা আনল। সাথে বাবার দুই পাতা ঔষধ আর জাবিরের জন্য দিস্তা কাগজও কিনল মনে করে।

আজ চাকরিতে তার প্রথমদিন। সে খুশি। আবার কিছুটা ভীত। ভয়ের কারণ একটাই। মেঝ স্যার। খালিদ নামের ঐ রাগী লোকটা। মেঝ স্যার সবসময় নাকের ডগা উঁচিয়ে চলেন। স্বভাবেও খুঁতখুঁতে আছেন কিছুটা। কথা বলেন মেপে মেপে। প্রত্যেক বাক্যে আবার রাগী রাগী ভাব থাকে একটা। জ্যোতির সব ভয় তাকে নিয়েই।

আজও সবার প্রথমে মেঝ স্যারের সাথেই দেখা হলো তার। খালিদ তড়িঘড়ি করে বের হচ্ছিলেন অফিস থেকে। জ্যোতি তখন মাত্র মূল দরজা পেরিয়ে সাদা টাইলস বিছানো মেঝেতে পা ফেলেছে। খালিদ সামনে আসতেই থমকে দাঁড়াল। তারপর দ্রুত দুই কদম পিছিয়ে গেল।

খালিদ সাহেব চোখ তুললেন। জ্যোতিকে দেখা মাত্র কপাল কুঁচকে নিলেন। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলে জানতে চাইলেন,"নাম যেন কি?"

"জ...জ্যোতি?"

"একবারে নাম বলতে পারো না? নাম বলতেও এমন ধাক্কা খেতে হয়?"

কাট কাট কণ্ঠ। জ্যোতি দ্রুত মাথা নাড়ল। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে নিজেকে স্থির রেখে বলল,"স্যরি স্যার। আর হবে না।"

"আজ চাকরিতে প্রথম দিন?"

"জি।"

"ডেস্ক নাম্বার ফোর্টি টু। গিয়ে বসে পড়ুন। ফাইল রাখা আছে। কাজ শুরু করে দিন।"

জ্যোতি দম ছাড়ল। বিনীত স্বরে বলল,"জি স্যার, যাচ্ছি।"

খালিদ আগের মতোই ব্যস্ত পায়ে বেরিয়ে গেলেন। জ্যোতি আশে পাশে তাকিয়ে চপল পায়ে ছুটল নিজের ডেস্কের দিকে। মেঝ স্যারের টনটনে মেজাজ। আজকের দিন টা অন্তত তার থেকে বেঁচে থাকতে চায় জ্যোতি।

দুই মিনিটের মধ্যে নিজের টেবিল খুঁজে নিল সে। তার পাশের চেয়ারে তখন মাঝবয়সী একজন ভদ্রমহিলা বসে কাজ করছিলেন। জ্যোতি সামনে যেতেই হাসলেন সামান্য। ডেস্কটপের স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে সোজা তাকাল তার দিকে।

"নতুন জয়েন করেছ তাই না?"

"জি। আজই প্রথম।"

"বসো। আমার নাম অনামিকা। কোনো সাহায্য লাগলে বলো।"

জ্যোতি গাল ভরে হাসল। চেয়ার টানতে টানতে মিষ্টি সুরে বলল,"জি অবশ্যই। থ্যাংক ইউ।"

জ্যোতি ব্যস্ত হাতে ফাইল খুলে পাতা উল্টাচ্ছিল। কিছুটা ঘাবড়ে ছিল সে। এসি রুমে বসেও কপালের কাছটা ভিজে উঠছিল সামান্য। জ্যোতি বড় করে নিঃশ্বাস ছাড়ল। নিজেই শান্ত করল নিজেকে। রিল্যাক্স। তুমি পারবে জ্যোতি। অবশ্যই পারবে।

প্রায় মিনিট দশেক পরে জনাব খালিদকে আবার দেখা গেল ভেতরে আসতে। এবার তিনি একা নন। তার পাশে আরেকটা অল্প বয়সী ছেলে মাথা নামিয়ে, হাত দু'টো গুটিয়ে নিয়ে, অপরাধীর মতো হেঁটে যাচ্ছিল। ছেলেটার চোখে মুখে অসহায় ভাব। পরাজিত সেনাপতির মতো ঘাড়ের উপরের অংশ নুয়ে পড়ছিল মেঝের দিকে। অসহায়ত্বের পাশাপাশি খানিকটা জেদও প্রকাশ পেল দুই চোখে। মনে হলো, খালিদ সাহেবের উপর তার এক জনমের রাগ জমা। অথচ সে নিরুপায়। তার হাতে কিছুই নেই।

অনামিকা পাশ থেকে বলল,"আহিল ওর নাম। স্যারের ছেলে।"

"ছেলে?"

"হ্যাঁ।"

"ও, আমি ভেবেছিলাম স্টাফ।"

"এমনই। স্যার এসব ব্যাপারে খুব স্ট্রিক্ট। আহিলকেও স্টাফদের মতোই ট্রিট করে। বিশেষ কোনো অনার শো করে না।"

"ও।"

জ্যোতি মাথা নাড়ল। সেটাই আদিয়াত মজুমদার অর্থাৎ আহিলের সাথে তার প্রথম সাক্ষাৎ। যেদিন আহিল সপ্তমবারের মতো বাবার জোরাজুরিতে কোম্পানির অফিসে এসেছিল কাজ শিখবে বলে।

এক ক্লাব নাইট যে আহিলের জীবন এমন বিচ্ছিরি ভাবে বদলে দিতে পারে, সেটা সে কোনোদিনই ভাবেনি। এরপর থেকে বাবা কেবল শাসন, হুকুম আর ধমকের উপরেই রেখেছে তাকে। সাথে জুটেছে কোম্পানির এসব কাজ। বাবা বদ্ধপরিকর, স্নাতক শেষ করার পর আহিলকে ব্যবসার কাজে নিয়োগ দিবেন।

সেদিনও আহিল অফিসে এসেছিল এক প্রকার বাধ্য হয়ে। কাচুমাচু মুখে, মাথা নামিয়ে হাঁটছিল লম্বা করিডোর ধরে। বড় বড় কামরা পার করে এগিয়ে যাচ্ছিল বাবার থাই গ্লাস দিয়ে ঘেরা প্রাইভেট রুমটার দিকে।

গলার কাছে দম আটকে ছিল তার। হাঁটার গতি মন্থর হলো কিছু সময়ের জন্য। খালিদ সাহেব থামলেন। পেছনে ফিরে রুক্ষ স্বরে ধমকে উঠলেন,"কি সমস্যা? এমন কচ্ছপের মতো হাঁটছ কেন? দ্রুত হাঁটো।"

আহিল ধড়ফড়িয়ে উঠল। নীরব কক্ষে হঠাৎ এমন ভারিক্কি শব্দে জ্যোতি নিজেও চমকে উঠল। কাঁপা হাতটা দ্রুত চেপে ধরল বুকের সাথে। আহিল মাথা নেড়ে বলল,"জি বাবা। হাঁটছি।"
তারপরই বাধ্য ছেলের মতো হেঁটে ভেতরে ঢুকে গেল। জ্যোতি গোল গোল চোখে চেয়ে থাকল তার চলে যাওয়ার দিকে। আহারে বেচারা! কেমন করে ঐ ঘরে থাকবে? তাও আবার ঐ লোকের সাথে?

অনামিকা বললেন,"খালিদ স্যারের থেকে সাবধানে থাকবে। একবার কোনো ভুল চোখে পড়লে যতোদিন না সেটা পুরোপুরি ঠিক করাবেন, ততদিন অব্দি অন্য কাজ করতে দিবেন না।
স্যার ভালো। তবে মেজাজ কড়া। আহিলকে যা ধমকায়! কয়েকদিন কাজ করলেই বুঝবে এখানকার অবস্থা।"

জ্যোতি মাথা নাড়ল। নিজের চেয়েও বেশি তার দুঃশ্চিন্তা হলো আহিল নামের ঐ ছেলেটার জন্য। আহা, একলা ঘরে না জানি কেমন করে আছে ঐ লোকটার সাথে। হয়তো এতোক্ষণে ধমকে ধমকে কিমা বানিয়ে দিয়েছে তার। আহারে! বেচারা।

_______

মণিষা হাত ঘড়িতে সময় দেখল। ছুটি হতে আরো দশ মিনিটের মতো বাকি। আপাতত এখানে সে বাদে আর কেউ নেই। ইয়াজিদ সাহেবের সাথে আজ সারাদিনেও দেখা হয়নি তার। মনে মনে তাকে খুঁজছিল মণিষা। ভদ্রলোককে একটা কথা জানাতে হবে তার।

আজ দেবব্রত চৌধুরীর গানের ক্লাস ছিল। ভদ্রলোক গান গাইছিলেন হারমোনিয়ামে।
"আনন্দধারা বহিছে ভুবনে,
দিনরজনী কত অমৃতরস উথলি যায় অনন্ত গগনে ॥"

মণিষা ঠেস দিল দেয়ালের সাথে। ক্লান্ত শ্বাস ছেড়ে একবার বাইরে তাকাল। রোদ এখনো আগের মতোই আছে। বাতাসে একটা ভ্যাপসা গরম। গতকাল সে আলসেমি করে বাজার করেনি। আজ করতেই হবে। মণিষা মনে মনে ফর্দ বানাল একটা।

ছুটির পাঁচ মিনিট আগে ইয়াজিদ এলো ভেতরে। বাইরে তখন ছেলেপেলেদের শোরগোল। তারা সবাই বাইক নিয়ে গিয়েছিল নদীর ঘাটে। সেখানে কিছুক্ষণ থেকে আবার ফিরে এসেছে।

অন্য সময় ছেলেরা সহ ভেতরে এসে বসত। আজ আর ইয়াজিদ আসতে দিল না। মোবাইল বের করে আগেই সময় দেখে নিয়েছিল সে। এই সময়ে মিস মণিষা থাকেন ভেতরে। তিনি থাকাকালীন ইয়াজিদ অন্য ছেলেদের ভেতরে আসতে দেয় না। কেন দেয় না, সেটা জানতে চাইবেন না। কারণটা ব্যক্তিগত। ইয়াজিদ এই প্রশ্নের উত্তর কাউকে দিতে বাধ্য না।

আজও সে একাই ভেতরে এলো। এসে আড়চোখে একবার ভদ্রমহিলার দিকে তাকাল। তারপর আবার চাবি দিয়ে ড্রয়ার খুলে দুইটা পাঁচশো টাকার নোট বের করল।

সে বেরিয়ে যাওয়ার আগেই মণিষা উঠে দাঁড়াল। দুই কদম এগিয়ে এসে গলা তুলে ডাকল তাকে।
"জি একটু শুনুন।"

ইয়াজিদ থামল। পেছন ফিরে বলল,"কি?"

মণিষা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পরিষ্কার কণ্ঠে বলল,"একটা কথা বলার ছিল।"

"কি?"

"আমি সামনের সপ্তাহ আসতে পারব না। আমার ট্রেইনিং আছে একটা। সহস্রকেও আনতে পারব না। কারণ আমি না থাকলে ওকে আনা নেওয়া করা সম্ভব না। ব্যাপারটা আপনাকে জানানো উচিত মনে হলো।"

ইয়াজিদের মন চাইল উত্তর দিতে,"আপনি আর কখনোই আসবেন না। এতে আমার আরো বেশি উপকার হবে।"

তবুও ভদ্রতা আর পেশাদারিত্বের খাতিরে সে ঠান্ডা স্বরে বলল,"সাত দিন একটানা না আসলে তো সমস্যা। এক কাজ করুন না। আপনি না পারলে আপনার হাসবেন্ড কে বলুন। উনি না হয় এই সাতদিন সহস্রকে আনা নেওয়া করলো।"

মণিষা চুপ হয়ে তার কথা শোনে। সে থামতেও অভ্যাস মতো একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। তার থমথমে মুখের দিকে তাকিয়ে ইয়াজিদ ভড়কে গেল কিছুটা। তাড়াহুড়ো করে বলল,"না না। আপনার যদি কোনো সমস্যা থাকে, তবে বাদ দিন।"

"একটা কথা শুনুন।"
মণিষা চোখ উপরে তুলে ভরাট গলায় বলল,"আপনি আর কখনও আমার হাসবেন্ডের প্রসঙ্গ টেনে কোনো কথা বলবেন না।"

ইয়াজিদ যন্ত্রের মতো মাথা নাড়ে। ঠোঁট নেড়ে ধিমি স্বরে জবাব দেয়,"জি আচ্ছা।"

মণিষা আরেক পা এগোলো। অতিশয় শীতল কণ্ঠে নির্দ্বিধায় বলল,"আমি আমার হাসবেন্ডের সাথে থাকি না। আমাদের ডিভোর্স হয়েছে দু বছর আগে।"

ইয়াজিদ তড়িৎ গতিতে চোখ তুলে তাকাল। ফ্যালফ্যাল চোখে মণিষার শীতল মুখটার দিকে তাকিয়ে বুঝতে চাইল ব্যাপারটা। তারপর ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হলো। ওর হতবাক, বিস্মিত মুখটায় হাসি ফুটল কিছু সময়ের জন্য। দুই ঠোঁট সামান্য প্রসারিত করে ইয়াজিদ উপলব্ধি করল তার কথার অর্থ। তারপরই আর হাসি থামল না।

অনেক কষ্টে মাথা নামিয়ে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে আনে সে। হাসি থামিয়ে গম্ভীর হওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালায়। তবুও প্রচ্ছন্ন ভালোলাগায় ভেতরটা ফুলতে থাকে। ইয়াজিদ হাসি আটকে স্বাভাবিক গলায় বলে,"ওহহ আই অ্যাম স্যরি।"

"না, স্যরি বলার কিছু নেই। আপনি তো জানতেন না। আমি তাই জানিয়ে দিলাম। আপনি ভবিষ্যতে আমার হাসবেন্ডের প্রসঙ্গ তুলে কোনো কথা বলবেন না দয়া করে।"

ইয়াজিদ ঠোঁট দু'টো প্রসারিত করল। হেসে উঠে বলল,"না না। কখনোই না। আর কখনো ঐ জাতীয় কথা মুখেও আনব না।"

মণিষা অদ্ভুত চোখে তাকাল তার দিকে। লোকটা এমন মিটি মিটি হাসছে কেন?
ইয়াজিদ মাথা নামিয়ে দু'বার শ্বাস ছাড়ল। হাসা অনুচিত। কারো বিবাহ বিচ্ছেদ কোনো হাসির বিষয় না। কিন্তু ইয়াজিদের মন চাইছে কলোনির রাস্তায় ঢোল পিটিয়ে নাচতে। কি আনন্দ! কি আনন্দ!

একটু পরে সহস্র বের হলো ভেতর থেকে। মণিষা ওকে আসতে দেখেই এগিয়ে গেল। পিঠ থেকে ব্যাগ সরিয়ে নিজের হাতে নিল। অন্য হাতে ছেলের হাতের কবজি চেপে ধরে বলল,"চলো বাবা। রিকশা খুঁজতে হবে।"

সহস্র মাথা নাড়ে। মায়ের হাতটা চেপে ধরে শক্ত করে। ইয়াজিদ মুগ্ধ হয়ে দেখে তাদের। চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দেয় দু'জনকে।

মণিষা অবুঝ চোখে একপলক তাকাল। তারপর আবার স্বাভাবিক হয়ে বলল,"জি ধন্যবাদ।"

ইয়াজিদ গাল ভরে হাসে।
"জি। আবার আসবেন। ট্রেইনিংয়ের জন্য অনেক অনেক শুভকামনা।"

কপাল কুঁচকে অদ্ভুত চোখে মণিষা ফিরে তাকাল তার দিকে। লোকটা এমন হাসছে কেন বার বার? দ্রুত সামনে তাকিয়ে হাঁটতে শুরু করল সে। ভদ্রতা স্বরূপ ছোট করে বলল,"থ্যাংক ইউ।"

ইয়াজিদ হাসি থামায় না। মণিষা দৃষ্টি সীমা ছাড়িয়ে সামনে চলে যেতেই সুর টেনে লম্বা করে বলে,"ওয়েএএএএলকাম, মিস মণিইইইইষা। ভালো থাকবেন, সুখে থাকবেন, আর অবশ্যই একা থাকবেন। প্রাক্তন কে ব্লক করে দিন সবজায়গা থেকে। ফেসবুক থেকে, হৃদয় থেকে, এবং বাধ্যতামূলকভাবে, জীবন থেকে।"

সেদিন ইয়াজিদ আরো পাঁচশো টাকা বাড়িয়ে মোট পনেরশো টাকার মিষ্টি কিনে খাওয়াল ছেলেদের। কোনো উপলক্ষ নেই। এমনিতেই। অথচ উদযাপনের হেতু শুধুমাত্র সে একাই জানত।

ইয়াজিদ নিজে নিজেই হাসল কিছুক্ষণ। সিরার উপর ভাসতে থাকা রসগোল্লা থেকে একটি রসগোল্লা তুলে মুখে পুরতে পুরতে ভাবল, জীবন তাকে ঠিক কোথায় এনে দাঁড় করিয়েছে। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে নিরীহ, নিষ্কলুষ, সাদাসিধে এক ভদ্রমহিলার বিবাহ বিচ্ছেদও তাকে আনন্দ দিল।

মিষ্টি খাওয়ার পর্ব শেষে ইয়াজিদ হাত পা ছেড়ে গা এলিয়ে চেয়ারের উপর বসল। মাথা উঁচু করে উপরে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বলল,"আল্লাহ, তোমার উপর আমার বিশ্বাস ছিল। জানতাম, একটা যাদু দেখাইবাই। এটাও জানি, ঐ মনসার ডিভোর্স কেন হইসে। কারণ তুমি চাও মনসা আমার সংসার করুক। অন্য কারো না। তবে যাই বলো, আমার কিন্তু সহস্ররে একটু কম ভালো লাগছে। সারাদিন ম্যা ম্যা করে ভেড়ার মতো। তয় ব্যাপার না। এমনিতেও নিনীত, ইশান সব আমারে ছাড়ায় গেছে। একেক জনের দুইটা কইরা ছাও। আমি এখন নতুন বিয়ে কইরা ওদের ধরতে পারমু না। আমার জন্য রেডিমেড বাচ্চাই ঠিক আছে।
আম্মাগো, তোমার দোয়া তো কবুল হইয়া গেল। মরার আগে তুমি আমার বউও দেখবা, আবার বাচ্চাও। কি কপাল তোমার। হাহাহা।"

____

আয়তি ক্যাবের ভাড়া মিটিয়ে পা ফেলল সামনে। এখন সময় বিকেল চারটা পঞ্চাশ। এই সময় মহল্লার রাস্তা একটু নীরব থাকে। ছেলেরা সব মাঠে গিয়ে খেলে। নয়তো মধ্যাহ্ন ভোজ শেষ করে পাখার বাতাসে ঘুমায়।

নির্জন রাস্তা। দোকানপাট সব বন্ধ। একটু দূরে প্রতাপ সাহেবের মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। আয়তি হাঁটছিল দ্রুত পায়ে। একা রাস্তা তার খুব ভয় লাগে।

হঠাৎ দু'টো ছেলে এসে থামল তার সামনে। মুখে মাস্ত, চোখ দু'টো ধাঁরাল। পরনে পুরাতন ময়লা শার্ট। আদাবরের ভেতরে যে পুরাতন কলোনি আছে, সেটার বাসিন্দা হবে হয়ত।

আয়তি চমকে উঠে সামনে তাকাল। ছেলে দু'টো তীক্ষ্ণ চোখে দেখছে তাকে। ভাবভঙ্গি সুবিধার না। আয়তি ঘাবড়ে গেল ভীষণ। ভয়টা আর চোখে মুখে প্রকাশ করল না। হাতে থাকা ব্যাগটা খাঁমচে ধরে শক্ত মুখে বলল,"কি সমস্যা? কি চাই?"

ছেলে দু'জন কোনো কথা না বাড়িয়ে সামনে এগোয়। আয়তি অতর্কিত হয়ে পিছিয়ে গেল দ্রুত। খ্যাট খ্যাটে গলায় বললো," কি চাই? পথ ছাড়। আমি কিন্তু এখন চিৎকার করব। আআআ..."

ছেলে দু'জন ঝড়ের গতিতে তার মুখ চেপে ধরল। একজন ধরল আয়তির হাত। আয়তি নিজের আসন্ন বিপদ উপলব্ধি করে সর্বশক্তি দিয়ে হাত পা ছুড়ল।
তার কারাতের স্কিল, হাতের জোর, শরীরের শক্তি কিছুই কাজে এলো না সেদিন। ছেলে দু'টো দুই মিনিটে বাগে আনল তাকে। আয়তি চিৎকার করতে গিয়েও থেমে গেল। চেপে ধরা শক্ত হাতের আড়ালে তার চিৎকার গুমোট আওয়াজে রূপ নিল। আয়তি গোঙাতে থাকল নিরীহ, নির্বাক পশুর মতো। কোনোরকমে হাত জোর করে বলতে চাইল,"এটা করো না প্লিজ। ব্যাগে যা আছে, সব নিয়ে যাও। কিন্তু...এটা করো না প্লিজ।"

আয়তি তড়াপাতে লাগল যন্ত্রণায়। ছেলে দু'টোর সাথে ধস্তাধস্তিতে সে পরাস্ত হয়েছে। তার শরীর দুর্বল হচ্ছে। বুকের কাছে নিঃশ্বাস আটকে অসহ্য অনুভূতি হলো ভেতরে। আয়তি শেষ একবার প্রতিরোধের চেষ্টা করল। তারপর টপ টপ করে কয়েক ফোটা জল গড়াল তার দুই চোখ বেয়ে। ছেলে দু'জনের একজন একেবারে চমকে গেল তার কান্না দেখে। অবাক হয়ে অন্য জনকে বলল,"এই মাইয়া এতো অল্পতেই কান্দে কেন? ভাই তো বলছিল এই মেয়ে নাকি খুব শক্ত। এখন তো দেখতাসি এক ধরাতেই কাইত।"

***

পারমিতা বাড়ি এসে সোজা ঢুকল নিনীতের ঘরে। নিনীত তাকে এ যাবত কালে কখনো মেসেজ দেয়নি। আজ দিয়েছে। টাইপ করে বার্তা পাঠিয়েছে- kokhon ashben? amra opekkha korchi.

পারমিতা অবাক হয়ে গেল মেসেজ দেখে। আমরা মানে? সাথে আর কাকে নিবেন জনাব?

ঘরের ভেতরে পা রেখে সামনে তাকাতেই সে তব্দা খেয়ে গেল। ঘরের দরজা জানালা টান টান করে খোলা। বারান্দা থেকে দমকা বাতাস ছুটে আসছে ঘরে। ঘরের সব কটা বাল্ব জ্বলছে, পূর্ণ জ্যোতি ছড়াচ্ছে আনাচে কানাচে।

এর মধ্যে নিনীত হাঁটু গেড়ে বসল। নিকিতার পায়ে একটা সাদা রঙের জুতা। জুতার উপরে থাকা বো টা জায়গা থেকে সরে গেছে। নিনীত মেঝেতে বসে সেটা ঠিক করে দিল। তারপর পা টা নিজের কোলের পর তুলে শক্ত করে বেল্ট আটকে দিল। পারমিতা হতভম্ব হয়ে গেল তাকে দেখে।

নিকিতা একটা গোল ফ্রক পরেছে। চেরী রেড কালারের হাঁটু ছুঁই ছুঁই ফ্রক। মাথায় একটা ক্লিপ বাঁধা। প্রজাপতির হেয়ারবেন্ড। পারমিতার মনে হলো, সে নিজেই একটা প্রজাপতি। ঐ যে তার ডানাও আছে দু'টো। গুরুগম্ভীর ভদ্রলোক নিনীত, উনিই তো তার ডানা।

নিকিতা তাকে দেখে হেসে উঠল। খুশিতে আত্মহারা হয়ে বলল,"মমা। আমি এতা কি পচছি দেখু। ফ্লক পচছি।জুতু পচছি। পাপাই পয়িয়েছে। ততো সুন্দল লাগছে। দেখু।"

নিকিতা দুই হাতে ফ্রকের দুই কোণা ধরে ঘুরে ঘুরে দেখাল। তারপর খুশির চোটে দু'হাতে হাততালি দিল। এরপর নিনীতের গলা জড়িয়ে ধরে অনর্গল চুমু খেতে খেতে বলল,"পাপাই আমাকি গুসুল কয়িয়েছে, জামা পয়িয়েছে, তুল বেধি দিসে। পাপাই কতু ভালু।"

পারমিতা গলা ধরে গেল। অভিভূত চোখে তাকিয়ে সে দেখল তাদের। নিনীত আজ একটা ধবধবে সাদা শার্ট পরেছে। আর কোনো আলাদা আয়োজন নেই। তবুও পারমিতা চোখ সরাতে পারল না। অবাক হয়ে বলল,"আপনাকে তো নায়ক লাগছে নিনীত সাহেব। ভেরি হ্যান্ডসাম। চোখ সরাতে পারছি না।"

নিনীত হেসে ফেলল। মাথা নেড়ে মেঝে থেকে মুখ তুলে পারমিতার দিকে তাকিয়ে বলল,"আপনি একটা যা তা। এতো কমপ্লিমেন্টস দিতে হবে না।"

"দিব না? চোখই তো সরাতে পারছি না।"

নিনীত সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল,"দাঁড়ান, আপনাকে আরেকটা সারপ্রাইজ দেই। এবার আপনি চোখ সরাতে পারবেন না শিওর।"

"কি সারপ্রাইজ?"

পারমিতা সরু চোখে প্রশ্ন ছুড়ে। নিনীত হালকা স্বরে ডাকল,"নিবেদিতা! এখানে এসো তো।"

ঠিক তখুনি বারান্দা থেকে ঘরের ভেতরে উঁকি দিল সে। পারমিতা হতচকিত হয়ে তাকাল সেদিকে। নিবেদিতা অনুমানে পা ফেলে ঘরের ভেতর ঢুকল। দুই কদম এগোতেই নিনীত সহজাত হাত বাড়িয়ে চেপে ধরল তার কবজি। কাছে এনে নিজের গা ঘেঁষে দাঁড় করিয়ে বলল,"আমার বড় মেয়েকে কেমন লাগছে বলুন?"

পারমিতা পলক ফেলতেও ভুলে গেল। মনে হলো দু'চারটা হার্টবিট ছুটে গেছে। একটা প্রিন্টেড মিডি গাউন, আর মাথার দুই পাশে ছোট ছোট দু'টো ফ্লোরাল ক্লিপ বেঁধে তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে নিবেদিতা। তার মুখ ভর্তি হাসি, আনন্দে ঝলমল করছে দুই চোখ। পারমিতা জানত, ঐ আনন্দ কিসের। সে দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল। ভেজা চোখ দু'টো সামলে নিয়ে বলল,"মাশাআল্লাহ। খুবই সুন্দর। আপনার মতোই ঐশ্বরিক।"

নিবেদিতা তার উপস্থিতি টের পেতেই চঞ্চল হলো কিছুটা। অস্থির হয়ে, আবার কিছুটা লজ্জা পেয়ে বলল,"পরী মা, জানো আজকে পাপাই আমার চুল বেঁধে দিয়েছে। গাউনের ফিতাও আটকে দিয়েছে। আর...জুতুও পরিয়েছে।"

নিবেদিতার দুই চোখ জ্বলজ্বল করতে লাগল আনন্দে। ঐ চোখে আলো নেই। কিন্তু জ্যোতি ছিল ঠিকই। পারমিতা ঘোরের মধ্যে বলল,"তোমার পাপাই সাজিয়েছে তো। তাই তোমাদের দুই বোনকেই অপার্থিব লাগছে। আসলে বাবা ঠিকই বলে। তোমরা হলে পাপাইয়ের প্রিন্সেস। পাপাই যে কেন বুঝে না!"

নিনীত ম্লান হাসল। দুই হাতে দুই মেয়েকে ধরে প্রসঙ্গ পাল্টে বলল,"ম্যাডাম। আপনি রেডি হন। বেন হতে হবে তো আমাদের।"

"ওবাবা। ওরা দু'জনও যাবে নাকি?"

"যাবে তো। ওরা কি আপনার সংসারের বাইরে। আপনার দুই মেয়েকে ছাড়া আপনার ঘর পূর্ণ হবে?"

পারমিতা থমকাল। অবাক হয়ে সামনে তাকিয়ে পুতুলের মতো মাথা নাড়ল। তার মেয়ে। তাই তো। ওদের ছাড়া সংসার পরিপূর্ণ হবে কেমন করে?

পারমিতা দৌড়ে গেল শাড়ি খুঁজবে বলে। নিকিতা উৎসাহী গলায় বলল,"মমা। ছুন্দুল একতা জামা পরো। পাপাইয়ের পিমসেস হতি হবি কিনতু।"

পারমিতা হেসে উঠল শব্দ করে। নিবেদিতা সাথে সাথে তাকে শুধরে দিল,"না না। পরী মা সবসময় পরীই থাকবে। পরী ছাড়া অন্য কিছু না।"

পারমিতা হাসতে হাসতেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তাকে এখন দশ মিনিটের মধ্যে শাড়ি পরতে হবে। সে বেরিয়ে যেতেই নিনীত দম ছাড়ল। আওয়াজ নামিয়ে বিড়বিড় করে বলল,"এতো কিছু হতে হবে না। আমার ঘরে থাকার জন্য এতো পদবির দরকার নেই। আমার বউ হয়েছে, আমার মেয়েদের মা হয়েছে, আর কিসের পদবি চাই তার? ওহহ হ্যাঁ, ম্যাডামও তো হয়েছে আমার। হ্যাহ, আমার সিলি,স্টুপিড এন্ড ডাম্ব ডাক্তার ম্যাডাম।"

চলবে-

[উহহ স্যরি। কাল শেষ করতে পারিনি। বড় হয়ে গেছে একটু। পড়ার পর মন্তব্য চাই কিন্তু।]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 26 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন