ফন্ট সাইজ:
থিম:
আম পাতা জোড়া জোড়া

পর্ব 28

লেখক: মেহরিমা আফরিন

#আম_পাতা_জোড়া_জোড়া -২৮
লেখনীতে #মেহরিমা_আফরিন

সীমান্ত সবেমাত্র বাইক থামিয়েছিল। কাইয়ুমদের বাড়ির ছাদটা দেখা যায় এখান থেকে। আনমনে একবার ছাদের দিকে তাকাতেই তার চোখ কপালে উঠল। ছাদের একদম শেষ মাথায় আয়তি দাঁড়িয়ে আছে। পা দু'টো টলটলে। দেখে মনে হলো, যেকোনো সময় ঝাপিয়ে পড়বে নিচে।

সীমান্ত তড়াক করে বাইক থেকে উঠে সামনে ছুটল। নিচ থেকে চেঁচিয়ে বলল,"এ্যাই আয়তি! দাঁড়াও।"

তার আগেই আয়তি ভয়ার্ত মুখে ঝাপিয়ে পড়ল নিচে। ঠিক সীমান্তর চোখের সামনে। তিন তালার ছাদ থেকে হালকা পাতলা শরীরটা শব্দ করে আছড়ে পড়ল মাটিতে। সীমান্ত হতবিহ্বল চোখে সেদিকে তাকিয়ে বোকার মতো বলল,"আয়তি! এটা তুমি কি করলা?"

আয়তির চোখ দু'টো অল্প খোলা। মাথার একপাশ থেকে রক্ত ছুটছে গলগল করে। ডান হাতটা নিথর হয়ে পড়ে আছে একপাশে। চোখের আবছা দৃষ্টিতে সে একবার তাকাল সীমান্তর দিকে। সীমান্ত দেখল, রক্তে আয়তির কপাল, গাল, মুখ, সব ঢেকে যাচ্ছে।

সম্বিত ফিরতেই সে ছুটে গেল তার কাছে। গিয়েই এক টানে তার শরীরটা নিজের দু'হাতের আয়ত্তে নিল। গালের উপর হালকা করে আঙুল চেপে ফর্সা মুখটা এদিক ওদিক ঘুরিয়ে বলল,"এ্যাই মেয়ে! তাকাও আমার দিকে।"

আয়তি অর্ধেক বুজেছিল চোখ। বড় বড় শ্বাস টেনে শরীরটা তখন হাল ছাড়ছিল। চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা, ঘোলাটে। মাথার একপাশ দিয়ে রক্তের স্রোত অনুভব হচ্ছিল। আয়তি লম্বা একটা নিঃশ্বাস টেনে দুর্বল হাতে জড়িয়ে ধরল সীমান্তকে।

সীমান্তর ধূসর রঙের শার্ট তখন তার তাজা রক্তে টকটক করছিল। আয়তি বুকের কাছে মাথা রাখতেই সে এক হাতে মাথাটা চেপে ধরল আলতো করে। কাঁপা স্বরে বলল,"তু...তুমি ছাদ থেকে কেন পড়লা? আয়তি, আমি...আমি তোমাকে কিচ্ছু করতাম না। বিশ্বাস করো। তুমি এতো ভয় কেন পাইলা?"

অনুশোচনা আর অনুতাপে সীমান্তর কণ্ঠস্বর জড়িয়ে গেল। সে আরেকবার আয়তির এলোমেলো চুলে হাত ছোঁয়াতে ছোঁয়াতে বোকার মতো বলল,"ওদের দুই জনকে ফালাইতা। ওদের মারতা। নিজে কেন এই কাজ করতে গেলা?"

আয়তি জবাব দিল না। সামান্য উঠে বসে সীমান্তর দিকে তাকিয়ে কাঁপা স্বরে থেমে থেমে বলল,"বাবা....বাবাকে ফোন করে...জানাবে। অ..অন্য কেউ না। কাউকে ধ..ধরতে দিবে না আমায়। কেউ...না।"

এরপর আর কোনো শব্দ নেই। সীমান্ত হতবাক হয়ে তার শরীরটা আগলে ধরে বসে। আয়তি দু'হাতের ভর ছেড়ে দিয়েছে। কাঁপতে থাকা শরীরটা হঠাৎ করেই শান্ত হয়েছে। সীমান্ত আরো শক্ত করে তার শরীরটা নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে এদিক সেদিক তাকায়। অবাক হতে হতে সে তার পরবর্তী পদক্ষেপও দিব্যি ভুলে বসেছে।
___

আয়তিকে হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করাতে করাতে রাত হলো। রাত আটটা নাগাদ সীমান্ত ফোন দিল খালিদ সাহেব কে। খালিদ তখন রাস্তায়। খবরটা পেতেই কোনোরকমে ছুটে এলেন হাসপাতালে। তিন তালায় উঠেই খোলা জায়গায় সীমান্তকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন,"কি হয়েছে সীমান্ত? আয়তি...ও এখন কোথায়?"

"ঐ তো। তিনশো ছয় নম্বর রুমে। অপারেশন করতে হবে দুইটা। ডাক্তার বাবা মায়ের সাইন চায়।"

খালিদ সাহেব আঁতকে উঠলেন। দুর্বল গলায় জানতে চাইলেন,"অপারেশন লাগবে? কি হয়েছে ওর? কিভাবে এক্সিডেন্ট হলো।"

সীমান্ত বড় করে শ্বাস টানে। সে খালিদ সাহেবকে একটা মিথ্যা কথা বলেছে। বলেছে আয়তির এক্সিডেন্ট হয়েছে। সীমান্ত যেই এলাকায় আড্ডা দেয় বন্ধুদের সাথে, সেখানেই। খালিদ সাহেব তখন আর সত্য মিথ্যা যাচাইয়ের চেষ্টায় ছিলেন না। সীমান্ত মুখ দেখেই বুঝল, ভদ্রলোক আর নিজের মধ্যে নেই।

সীমান্তর কাছ থেকে সব খবর নিয়ে তিনি আবার ছুটে গেলেন তিনশো ছয় নম্বর রুমের দিকে। ওখানকার ডাক্তারদের সাথে কথা বললে আয়তির অবস্থা সম্পর্কে ভালোভাবে বোঝা যাবে।

সীমান্ত পাথরের মতো খোলা করিডরে দাঁড়িয়ে আনমনে নিঃশ্বাস ছাড়ল। আয়তির সাথে যা ঘটেছে, সেটা এই মুহূর্তে খালিদ সাহেবকে বলার সাহস নেই তার। আয়তি যখন সুস্থ হবে, তখন সে নিজেই সবটা জানাবে তাকে। মাথা পেতে বলবে, তুমি যেই শাস্তি দিবা, আমি সব শুনব। ঘর থেকে বের করলে ঐটাও শুনব, মনে যেতে বললে ঐটাও করব। তুমি যা চাইবা, তা ই হবে।"

কিছুটা সময় অতিবাহিত হয়। সীমান্ত যন্ত্রের মতো হেঁটে করিডরে পাতানো চেয়ারগুলোর একটিতে বসে। এই অনুশোচনা তার এই জীবনেও যাবে না। আয়তি...মেয়েটা এতো বোকামি না করলেও পারত।

*

*

ভীষণ গম্ভীর মুখে গাড়ির স্টিয়ারিং ঘোরাচ্ছিল নিনীত। শক্ত চোয়ালের আড়ালে তার মনের অবস্থা ঢাকা পড়ে গেল। তার কোলে নিকিতা। যে কিনা এখনো পাপাইয়ের নতুন রূপে মুগ্ধ।

পারমিতা গোল গোল চোখে তাকাল তার দিকে। একটু আগেই ঐ বাড়ি থেকে বেরিয়েছে তারা। নিনীতের আচরণ নির্লিপ্ত। শফি সাহেব যখন হতভম্ব হয়ে বললেন, তুমি কেন ওকে মারছো? তখনও বিশেষ ভাবান্তর হয়নি তার মাঝে। সে কেবল হাতে লেগে থাকা রক্তের দাগ মুছতে মুছতে মাথা তুলে বলল,"ঐ প্রশ্ন আপনি আপনার ভগ্নিপুত্র প্রতীককেই করবেন কেমন? সে ভালো বলতে পারবে কেন আমি তাকে মেরেছি।"

পকেট থেকে একটা রুমাল বের করে হাত মুছল নিনীত। বাঁকা চোখে আরেকবার তাকালো প্রতীকের বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলতে থাকা শরীরের দিকে। তারপর তাকাল পারমিতার দিকে। নিকিতা দাঁড়িয়ে ছিল পারমিতার পেছনে। ছোট ছোট হাতে পারমিতার হাঁটুর দিকটা চেপে ধরে আস্তে করে উঁকি দিল সামনে। ভয়ার্ত চোখে পিট পিট পলক ফেলে বলল,"পাপাই তুমান কি হইচে? রেগি গেলা কেনু? চক্কেত লাগবি নাকি?"

নিনীত সামনে তাকাল। নির্বিকার চোখ জোড়া এবার প্রশান্ত হলো কিছুটা। মৃদু হাসি আর অদ্ভুত তৃপ্তিতে দুই চোখ ভরে উঠল তার। এগিয়ে এসে সে এক টানে নিকিতাকে কোলে তুলে নিল। গাঢ় স্বরে বলল,"রেগে আছি। তবে তার জন্য চকোলেট লাগবে না।"

"কি লাগবে?"

"তোমাকে লাগবে। তুমি একটু কথা বলে বলে আমার মাথা খারাপ করে দাও তো।"

*

নিনীত এক মনে গাড়ি চালাচ্ছে। পাপাইয়ের বুকের উপর পড়ে থাকা নিকিতা একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে দেখছে তাকে। প্রিন্স পাপাই যে মারামারিতেও এতো দুর্দান্ত, সেটা ভেবেই চোখে মুখে বিস্ময় খেলে যাচ্ছে তার। সে এক হাত বাড়িয়ে গাল ধরল নিনীতের। নরম মাথাটা বাবার বুকের উপর ফেলে কোমল স্বরে বলল,"পাপাই! উ কি ময়ে যাবে? নাকি বেচি যাবে?"

"মরবে না। তবে সাতদিন বিছানা থেকে উঠতে পারবে না।"

"উ। ও কি খানাপ মানুশ?"

"হু। অনেক।"

নিবেদিতা বসেছিল পারমিতার পাশে। নিকিতা কথা বন্ধ করতেই মিন মিন করে বলল,"পাপাই কি দিয়ে মারল ওকে?"

নিকিতা নরম গাল দু'টো পাপাইয়ের বুকে ঘঁষতে ঘঁষতে জবাব দিল,"ওয়াতার গান। ফুচ ফুচ কয়ে পানি বের হই।"

নিবেদিতা চমকে উঠে বলল,"ওয়াটার গান?"

পারমিতা মাথা নাড়ল। আওয়াজ নামিয়ে ধীরে ধীরে বলল,"না, আসল গান।"

নিনীত ওর মরা মরা কণ্ঠটা শুনেই দ্রুত মিররে তাকাল। কপালে ভাঁজ ফেলে ভৎসনা করে বলল,"আওয়াজ এতো ঠান্ডা কেন? মন খারাপ করেছেন মারলাম বলে? হাসপাতালে যেতে চান নাকি?"

পারমিতা চট করে মাথা তুলল। শক্ত গলায় প্রতিবাদের সুরে বলল,"সেটা কখন বললাম?"

"নাহ, আওয়াজ শুনে মনে হলো।"

"আপনার একটু বেশিই মনে হয়।"

"ওহহ, স্যরি ম্যাডাম। মাফ করবেন।"

নিনীত আবার গাড়ি চালানো তে মনোযোগ দিল। পুরো রাস্তা আর কেউ কোনো কথা বলল না।

বাড়িতে আসার পরেই খবরটা পারমিতার কানে গেল। বাড়ির পরিবেশ থমথমে। কোনো সাড়াশব্দ নেই। অথচ রাতের এই সময়ে পুরো হলঘর আর খাবার ঘর জুড়ে মানুষ থাকে, আড্ডা দেয়, গল্প গুজব করে।

আমিনা খালা জানালেন, আয়তি নাকি হাসপাতালে ভর্তি। খুব বড় এক্সিডেন্ট করেছে। এই খবর শুনেই পারমিতা আর সিঁড়িতে উঠল না। বাচ্চা দু'জনকে আজমেরির কাছে রেখে সে গেল হাসপাতালে।

নিনীত আসেনি সাথে। সে এমন রক্তে ভেজা শার্ট নিয়ে ওখানে যেতে পারবে না। গোসল করে আগে পরিপাটি হতে হবে।
পারমিতা একাই গেল হাসপাতালে।

আয়তির অবস্থা ভালো ছিল না। পারমিতা যতক্ষণে গেল, ততক্ষণে তাকে আইসিইউ তে ভর্তি করা হয়েছে। তার মুখে দুইটা বড় বড় সার্জারি করতে হবে।
পারমিতা গিয়ে দেখল, সুষ্মিতা খুব বিধ্বস্ত হয়ে চেয়ারে বসে আছে।

করিডরের অবস্থা তখন গমগমে। নাসির আর খালিদ সাহেব মিলে কাগজপত্র নিয়ে ব্যস্ত। মুবিন ফার্মেসী গেছে জরুরি কয়েকটা জিনিস কিনে দিতে হবে বলে।

ইশান আর আহিল আইসিইউর সামনেই ছিল। ইশানের কোলে ভীষণ নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমাচ্ছিল ইমতিহা।

ইয়াজিদ কে পাওয়া গেল একটু দূরে। মাথা নামিয়ে শান্ত হয়ে বসেছিল একটা চেয়ারে। সুষ্মিতা ভাবি বাচ্চাদের মতো কান্না করেছে এতোক্ষণ। এই বিপদের দিনে তার সব পুরাতন কথা মনে পড়ছে। তার মনে হচ্ছে, আয়তিকে তারা ঠিক ঠাক ভালোবাসেনি।

ইয়াজিদ বলল,"এখন এসব বলে কি লাভ সুষ্মি ভাবি? ওর জন্য দোয়া করা বাদে আর কি করতে পারি আমরা? এসব পুরান কথা টেনো না প্লিজ।"

সুষ্মিতা আঁচলে চোখ মুছে অসহায় চোখে এদিক ওদিক তাকান। জেবা ভাবি অনেক বুঝিয়েছে তাকে। কিন্তু ঘুরে ফিরে তার সেই এক কথা। আইসিইউতে নেওয়ার আগে কিছুক্ষণ মেয়েটাকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। একবার দেখার পরেই এমন ভাবে হাত পা জমে গেল! সুষ্মিতা আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারলেন না।

খালিদ খুব শক্ত ধাঁচের লোক। আহিলের যখন একবার ডেঙ্গু হয়ে খুব খারাপ অবস্থা হলো, তখনও তাকে কাঁদতে দেখেনি সুষ্মিতা। অথচ আজ যখন সুষ্মিতা কাঁদতে কাঁদতে হয়রান হয়ে তার কাছে গেলেন, তখন খালিদ টুপ করে দুই চোখ লুকিয়ে ফেলল তার থেকে। ঐ চোখে জল ছিল। সুষ্মিতা স্পষ্ট দেখেছেন। এরপর থেকে তার সব মনোবল ফুরিয়ে গেল। সুষ্মিতা কেবল অসহায় মুখে একবার জানতে চাইলেন,"ও বাঁচবে তো খালিদ?"

সীমান্ত অনেক দূরে, তিনতালার একদম শেষ মাথায় দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ছিল। ওদের কাছে গিয়ে দাঁড়াতে লজ্জা লাগছিল ভীষণ। আয়তির এই অবস্থার পেছনে তার হাত ছিল। আর কেউ না জানুক, সীমান্ত তো জানত। এই অনুশোচনায় সে আর তাদের কাছে গেল না।

দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়েই সে আনমনে ভাবছিল, কেমন শাস্তি হওয়া দরকার তার?
থাক, শাস্তির হিসাব নিকাশ আয়তি সুস্থ হলে তখনই হবে। কিন্তু তবুও সে সুস্থ হোক। সীমান্ত দরকার হয় পা ধরে মাফ চাইবে তার কাছে।

পারমিতা এই দুঃখ দুঃখ পরিবেশ ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এলো। কাছের কোনো মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হলে তার ভীষণ হাঁসফাঁস লাগে। তার উপর সুষ্মিতার চাপা কান্নার শব্দে তার বুক ধ্বক ধ্বক করছিল। নীরব নির্জন করিডরে একজন ভদ্রমহিলা থেমে থেমে কাঁদবেন, এই বিশ্রী দৃশ্যটা তার ভালো লাগছিল না। কিছুক্ষণ সেখানে থেকে সে বাড়ি ফিরে এলো।

রাশেদার ঘরে তখন কেবল উনি আর আজমেরি। পারমিতা ঘরের ভেতর উঁকি দিয়ে বলল,"ফুফু, নিকি নিবি ওরা কোথায়?"

আজমেরি রাশেদার পান খাওয়ার সুপারি ভাঙতে ভাঙতে বললেন,"ঘুমায় গেছে ওরা দুই জন।"

"রাতে কিছু খেয়েছে?"

"হ্যাঁ। খাওয়াইছি আমি।"

"আচ্ছা।"

রাশেদা ব্যস্ত হয়ে বললেন,"আয়তির কি খবর? ও ভালো আছে তো?"

"চিন্তা করবেন না। এখন যদিও আইসিইউতে। কিন্তু ঠিক হয়ে যাবে। আমি ডাক্তারের সাথে কথা বলেছি। সময় লাগবে একটু।"

রাশেদা বললেন,"কয়দিন লাগব?"

"একটু সময় তো লাগবেই।"

"আমি তো যাইতে চাই। মাইয়াডারে একটু দেইখা আসতে চাই। তোমার বাবা আমারে নেয় না।"

পারমিতা ঠান্ডা গলায় বলল,"আপনি এখন বাসাতেই থাকুন। ওখানে আরো দুইটা দিন পরে যান। আমি বললাম তো, ইনশাআল্লাহ, সব ঠিক থাকবে।"

'সুষ্মিতা কিছু খাইসে তো?'

"হ্যাঁ। আহিল আর ইশান আছে ওখানে। ওরাই সবাইকে একটু একটু করে খাইয়েছে। আপনি চিন্তা করবেন না।"

রাশেদার ঘর থেকে বেরিয়ে পারমিতা আগে একবার বাচ্চাদের দেখে এলো। তারপর গেল নিনীতের ঘরে। নিনীত উপুড় হয়ে শুয়েছিল খাটে। একপাশে তার সাদা রঙের তোয়ালে। চুল মোছার পর সেটা এভাবেই ফেলে রেখেছে। পরনে একটা হালকা নীল শার্ট। সে সচরাচর এই সময় ঘুমায় না। পারমিতা আস্তে করে দরজা টেনে নিজের ঘরে এলো।

ঘরে ঢুকেই প্রথমে পর্দা চাপিয়ে দিল জানালার দুই পাশে। বাইরে থেকে খুব অল্প আলো ভেতরর আসছে। পারমিতা টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে চেয়ার টেনে বসল। আজকের দিনটা নিয়ে কিছু শব্দ না লিখলেই নয়। সে লিখল-

"আজ আমি খুব সাহসের একটা কাজ করেছি। যদিও কাজটা খুব বেশি সাহসের না। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, এতো মনের জোর আমার আগে কখনো ছিল না।

আজ আমি প্রতীকের সামনে দাঁড়িয়েছি কোনোরকম ভয় ছাড়া। সে কাছাকাছি থাকলেই, তার কথা ভাবলেই যেই পুরাতন ঘা তাজা হয়ে উঠতো আমার, সেই যন্ত্রণা আজ একবারের জন্যও হয়নি আমার।

ওহহ, নিনীত। জানি না তাকে কিভাবে লিখব। তাকে আপনারা কিভাবে পড়বেন সেটাও জানি না। আমার কলমে আবার পুরুষদের নিয়ে লম্বা লম্বা লিখা পড়ে বিরক্ত হবেন হয়তো। তবে নিনীত বাদে এই ডায়েরি সম্পূর্ণ হবে না কখনো।

নিনীত লোকটা অদ্ভুত। আবার হয়তো এটাই স্বাভাবিক। ছেলেরা বোধহয় এমনই হয়। কিন্তু...না থাক, দেলুলু হতে চাইছি না আমি।

কিন্তু কি করব? বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না। হয়তো আমাকে ডাম্ব আর ষ্টুপিড বলে ভ্রুকুটি করবেন। নাক ছিটকে বলবেন,"এতো কিছুর পরেও তোর শিক্ষা হয়নি মিতা? আবার সেই পুরুষ মানুষ!"

কিন্তু সত্যি বলতে নিনীতকে আমার ভালো লাগে। ঐ ভালো লাগাটা মনের। সেখানে আবেগ, ভালোবাসা, আকাঙ্ক্ষা ওসব কিছু নেই। আমার মনে হয় নিনীতের একটা চমৎকার ব্যক্তিত্ব আছে।

নিকিতার পিমস পাপাই, নিবেদিতার হিরো পাপাই, এবং সরেজমিনে খুবই রুক্ষ একজন পাপাইয়ের আড়ালে নিনীত আসলে খুব কোমল ধাঁচের মানুষ। কোমল বলছি কারণ নিনীত বাচ্চাদের ধমকাতে জানে না। আমাকেও পারে না ধমকাতে। ওর আচরণে কটকটে ভাবটাই নাই। ও গম্ভীর, একগুঁয়ে, কিন্তু ভীষণ শান্ত। ঐ যে, ইশানের সেই প্রিয় ভাই, যে কাউকে দুঃখ দেয় না, অনেকটা ওমন।

নিনীতের সাথে আমার সংসারের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি আসলে কিছু ভাবি না। হবে হয়তো সাদা কালো কিছু একটা। তবে একটা রাতের কথা প্রায়ই ভাবি। একটা রাত, যখন নিনীত এসে দাঁড়িয়েছিল আমার ঘরের সামনে। আমি বোকার মতো জড়িয়ে ধরেছিলাম তাকে। সেই রাতে আমি আমার সব দুঃখ জানিয়েছিলাম তাকে। আমার কাছে আমার সংসার তো সেই রাতটাই। যেই রাতে আমি আমার অতীতের ভয়ংকর রাতগুলোর স্মৃতিচারণ করেছিলাম। নিনীত শুনেছে। কিন্তু দাঁড়িপাল্লায় তুলে আমাকে মাপেনি। কারণ টা হয়তো এটা না যে সে আমায় দুঃখ দিতে চায়নি। কারণ হলো এটা যে নিনীত আসলে আমাকে নিয়ে ভাবেই না। আমার জীবনের কোনো কিছুই তাকে স্পর্শ করে না। হাহাহা।

আয়তির আজ এক্সিডেন্ট হয়েছে। খুব দ্রুত সুস্থ হবে আশা করি। কাল থেকে সংসারে আরো দ্বিগুণ ব্যস্ত হবো। মেহরোজের ছোট বাচ্চা। আমি বাদে রসাইঘরের দায়িত্ব নেওয়ার মতো কাউকে খুঁজে পাচ্ছি না। অন্তত কিছু একটা করতে হবে কাল সকালে।

আর নিনীত। উফফ! এই লোকটা কেন আগে আগে ঘুমিয়ে গেল? আমার মন চাইছে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে কারো সাথে কথা বলতে। এনিওয়েজ। এনাফ ফর টুডে। আজ আর না।

*

পারমিতা লিখা শেষ করে উঠে দাঁড়াল। টেবিল ল্যাম্প টা বন্ধ করতেই ঘর অন্ধকার হয়ে এলো। খাটে তখন নিবেদিতা আর নিকিতা ঘুমাচ্ছে। নিকিতা ছোট ছোট পা দু'টো তুলে দিয়েছে নিবেদিতার গায়ে। পারমিতা হাসল তাদের দেখে।

গভীর রাত অব্দি ঘর জুড়ে পায়চারি করা তার স্বভাব। খুব সহজেই সে ঘুমাতে পারে না। আর চোখের সামনে যখন বাচ্চা দু'টোকে দেখে, তখন তার নিজের কথক খুব মনে পড়ে। এমন একটা তারও হতে পারত।

পারমিতা নীরবে নিঃশ্বাস ছাড়ল। বিয়ের সময় সে ভেবেছিল এই বাচ্চা দু'জনকে পেলে তার সব কষ্ট দূর হয়ে যাবে। সে নিজের সমস্ত অতীত ভুলে যাবে। অথচ এরা জীবনে আসার পরেও পারমিতার পুরোনো দুঃখটা গেলনা ঠিক। এখনো রাতের মাঝামাঝি সময় তার বুকটা ফাঁকা হয়ে আসে। মনে হয়, তার খুব আপন মানুষ তাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে। একটা ফুটফুটে নবজাতক আধো আধো স্বরে ডাকছে তাকে। ঐ নবজাতকের সাথে আর কখনো দেখা হবে না তার।

পারমিতা স্থির হয়ে বসে দেয়ালের ফকফকা রংটা দেখছিল। ঘরের ভেতরটা একেবারে নীরব। আরেকদফা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল সে।

ঠিক এমন সময় ফোনে একটা মেসেজ এলো। পারমিতা অবাক হয়ে ফোন হাতে তুলতেই দেখল নিনীতের নাম। নিনীত মেসেজ পাঠিয়েছে-ki korchen?

কপাল কুঁচকাল পারমিতা। দ্রুত জবাব পাঠাল-"কিছু না। ঘুমাবো এখন। আপনি উঠে গেছেন?"

"ji"

ব্যাস, ওপাশ থেকে এইটুকুই জবাব এলো। পারমিতা আর প্রতিউত্তর করার মতো কিছু খুঁজে পেল না। একটু পরে নিনীত নিজেই আবার মেসেজ দিল,"Coffee khaben?"

"এতো রাতে?"

"hmm.I will make."

চমকে উঠে ফোনের স্ক্রিনে তাকাল সে। ঐ লোক কফি বানাবে? তাও এতো রাতে?

সে দ্রুত খাট থেকে নেমে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।
নিনীতের ঘরের দরজা খোলা। ভেতরটা অন্ধকার। পারমিতা ভ্রু কুঁচকে বলল,"আছেন?"

ভেতর থেকে জবাব এলো,"আছি। বাম দিক থেকে তিন নম্বর সুইচ টা চেপে দিন। লাইটের সুইচ ওটা।"

পারমিতা বাতি জ্বালালো। খাটের দিকে তাকাতেই দেখল, নিনীত চোখের উপর এক হাত চেপে রেখেছে। সে ভেতরে আসতেই মৃদুস্বরে বলল,"আপনি চলে এসেছেন? ভেবেছিলাম ঘুমিয়ে যাবেন। এখন আবার কষ্ট করে কফি বানাতে হবে।"

বলেই চোখের উপর থেকে হাত সরাল সে। দেখল, হাত দু'টো কোমরে রেখে খুবই বিরক্ত চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে পারমিতা। সে তাকাতেই গাল ফুলিয়ে বলল,"আমি বলেছি কফি বানাতে? ডেকে এনে অপমান। এসব কেমন কথা? লাগবে না কফি। আমি নিজেই বানিয়ে নিব।"

বলা শেষ করে আর দাঁড়াল না। সোজা ঘুরে দাঁড়িয়ে পা ফেলল সামনে।

নিনীত তৎক্ষনাৎ উঠে বসল। দ্রুত এক হাত বাড়িয়ে চেপে ধরল পারমিতার কবজি। এক হ্যাঁচকা টানে তাকে ঘুরিয়ে এনে নিজের সামনে বসালো। পারমিতা অবাক হয়ে বলল,"আবার কি সমস্যা?"

"চলে কেন যাচ্ছেন?"

"তো যাব না?"

"না।" নিনীত একটু থেমে বলল,"আমার জীবন আর আমার ঘর, দু'টোতেই এন্ট্রি আর এক্সিটের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আছে।"

"সেটা কেমন?"

"সেটা হলো, এখানে ঢোকার আগেও আপনাকে আমার অনুমতি নিতে হবে। আর বের হওয়া? ওটাও আমার ইচ্ছেতেই হতে হবে। অন্তত আমার ঘর থেকে তো এমন পিঠ দেখিয়ে বের হওয়া যাবে না ম্যাডাম।"

"ও মাই গড। খুব অ'রা আপনার।"

খিলখিল করে হাসল পারমিতা। নিনীত ওর হাতটা ছেড়ে খাট থেকে নামল। আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে বলল,"চলুন, রান্না ঘরে গিয়ে হাসবেন। একা একা কাজ করতে ভালো লাগে না।"

____

নিনীত স্টোভ জ্বালিয়ে দুই কাপ পানি ঢাললো সসপ্যানে। পারমিতা কিচেনের কেবিনেটের উপর দুই পা ঝুলিয়ে বসে ঘাড় বাঁকিয়ে দেখছিল তাকে। আনমনে পা নড়ছিল তার। নিনীত বলল,"কফি কতোখানি? বেশি না অল্প?"

"দিন। যতো খুশি দিন। কফির ব্যাপারে আমার কোনো চয়েজ নেই। যা দিবেন, তাই চলবে।"

"এজন্যই তো রাতে ঘুম হয় না।" নিনীত পাশ ফিরে তার দিকে তাকিয়ে বলল,"রাতে কফি খাবেন না। আপনি ডাক্তার মানুষ। আপনার তো আরো ভালো বোঝার কথা।"

"নিজের ভালো আমি একটু কমই বুঝি।"

"তা তো দেখতেই পাচ্ছি।"

নিনীত বলল,"আরেকটা কাজ করেন আপনি। রাতে ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসল করেন। ঐটাও করবেন না। ভালো না এসব।"

পারমিতা অবাক হয়ে বলল,"কে বলল আপনাকে এসব? নিবি?"

"হু। শি ইজ সো টেনসড এবাউট ইউ।"

নিনীত কফির কাপটা এগিয়ে দিল তার সামনে। পারমিতা তার চোখে চোখ রাখতেই গাঢ় স্বরে বলল,"এন্ড মি টু।"

পারমিতা কাপটা হাতে নিল। হাসতে হাসতে বলল,"গ্রীন ফ্ল্যাগ নাকি?"

নিনীতও হাসল তার কথার জবাবে। কাপের ভেতর ছলকে উঠে কফিটা পারমিতার হাত স্পর্শ করার আগেই সে হাত বাড়াল সামনে। উত্তপ্ত তরলের কয়েক ফোঁটা ছিটকে পড়ল তার টান টান চামড়ায়। পারমিতা ফ্যালফ্যাল করে তাকাতেই লোকটা গভীর স্বরে বলল,"ইয়েস, আই অ্যাম। বাট অনলি ইফ ইউ আর লয়্যাল টু মি।"

চলবে-

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 28 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন