#আম_পাতা_জোড়া_জোড়া-৩০[প্রথম পরিচ্ছেদ অন্তিম পাতা]
লেখনীতে #মেহরিমা_আফরিন
জনি ওয়াকারের কালচে কমলা রঙের তরল দিয়ে গ্লাসের এক তৃতীয়াংশ ভরাট করে থামল নিনীত। তিন দির পর সে এই কাঁচের বোতল হাতে নিয়েছে। তার মতো লোকের কাছে তিনদিন অনেক। দুই বছর আগেও সে এমন দিনের কথা ভাবতে পারত না। তবে জীবন তাকে আরেকবার এমন জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে। যেই জায়গায় দাঁড়িয়ে সংসারের লোভটা আবার প্রকট হচ্ছে তার।
নিনীত নিজের সমস্ত ভালো লাগাদের নিজ হাতে মুক্তি দিয়েছিল। হোক সেটা কর্পোরেট জীবন, হোক সেটা ব্যবসার প্রতি প্যাশন, কিংবা তার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান বস্তু, তার দুই মেয়ে। সাজানো গোছানো জীবনের সবকিছু লণ্ডভণ্ড করে ম্যাকালন আর জনি ওয়াকারের বোতল যখন জীবনের সব বিষাদ কাটানোর একমাত্র মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছিল, তখন দরজা জানালা আটকে ঘন্টার পর ঘন্টা নিজেকে পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন রাখাই তার কাছে সবচেয়ে আনন্দের মনে হতো। নিনীত ঐ জীবনে একটু একটু করে ক্ষয়ে যাচ্ছিল।
নিকিতা রোজ রাতে কান্না জুড়ে দিত তার কোলে আসবে বলে। কখনো দরজা খোলা পেলে পিট পিট চোখে উঁকি দিত ভেতরে। নিবেদিতার অপমানবোধ ছিল প্রখর। একবার যখন অবহেলা আঁচ করেছে, দ্বিতীয়বার আর আগ বাড়িয়ে কাছে আসতে চায়নি। বন্ধ ঘরের ভেতর হাত পা ছড়িয়ে মেঝেতে বসে নিনীত তাদের কথা ভাবত মাঝে মাঝে। এক ছাদের নিচে, এক সংসারে, এতো গুলো বছর ঢেলে দেওয়ার পর জীবনে প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তির হিসাব মেলাতে গিয়ে বুক ভার হতো তার। পাওয়ার তালিকা ক্রমেই ছোট হতো। সেই তালিকায় মেয়ে দু'জন বাদে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকত না তার। মায়া, ভালোবাসা, প্রেম, প্রতীক্ষা, অভিযোগ, অনুযোগ কিছুই না। শুধু মনে হতো, সময় আর অনুভূতি গুলো বিরান কোনো উপত্যকায় পড়ে হারিয়ে গেছে।
মেয়েদের সাথে বড় দাগে দূরত্ব টেনেছিল সে। মেয়েরা তার ঘরে আসতে পারবে না। জীবনেও না। মেয়েদের ঘরে আসা আটকান গেল। কিন্তু মনে আসা থামান গেল না। মাঝ রাতে নেশার ঘোরে টলতে টলতে মনে হতো, নিবেদিতা ঔষধ খেয়েছে তো? নিকিতার যে অল্পতেই ঠান্ডা লেগে যায়? ওর রুমের জানালা বন্ধ করেছে তো মেহরোজ?
জীবন সেখানেই স্থির হয়ে থামেনি যদিও। দিশাহীন জীবন একসময় তাকে ডাক্তার ইবনাতের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। অবেলার অতিথি এবং মাথা নষ্ট ঐ মেয়ে মানুষটাকে নিনীত দায়সারা ভাবেই জীবনে আসার সুযোগ দিয়েছিল। ডাক্তার সাহেবার সাথে তার চুক্তি পাকা। ভদ্রমহিলার সন্তানের শখ, আর নিনীতের শখ দুই দণ্ড শান্তির।
এরপরের গল্প অবশ্য ভিন্ন। পারমিতা ইবনাত বাড়ি এলো, তার স্ত্রী হলো, মেয়েদের মা হলো, আর এইসবের ফাঁকে কোনো এক সময় নিনীতের পরম বন্ধুও হয়ে গেল। এখন অবশ্য বন্ধু নেই। তাকে এখন শিউলি আর দোলনচাঁপার মতো মনোরম মনে হয় নিনীতের। ঐ যে, এই যুগের ছেলে মেয়েরা যেন কোন ফুল নিয়ে খুব মাতামাতি করে? লিলিই বোধহয়। নিনীতের কাছে তাকে এর চেয়েও বেশি স্নিগ্ধ মনে হয়।
মনে হয় বিলে ফোঁটা পদ্মের উপর দুই ফোঁটা জলের মতো স্নিগ্ধ।
পারমিতা তার কতোখানি আপন হলো, সেই হিসাব নিনীত রাখেনি। হিসাব রাখেনি চুক্তিপত্র আর বিধিনিষেধের। তবে ডাক্তার ইবনাতকে সে মেয়েদের মা হিসবেই কল্পনা করত। সত্যিকারের মা। যে তার মেয়েদের ভালোবাসত।
ডাক্তার ইবনাত আসার পর সে ঘরের জানালা খুলেছে, বারান্দার থাই গ্লাস এক পাশে সরিয়ে দিয়েছে, দরজা লক তুলে ফেলেছে। আর মনের জানালা?
নাহ, ঐ উত্তর সে দিবে না।
পারমিতা দরজায় এসে উঁকি দিল ভেতরে। দু চোখে তার আনন্দ ছলকাচ্ছিল তখন। নিনীত কাঁচের গ্লাসটা হাতে তুলে নিতেই বলল,"আমি আসি?"
নিনীত ঘাড় কাঁত করে তাকাল। শান্ত গলায় বলল,"আসুন।"
পারমিতা ভেতরে এলো। আনন্দে আত্মহারা হয়ে বলল,"এতো গুলো কফির জার আপনি কিনেছেন আমার জন্য?"
হাতের গ্লাসটা সাইডবক্সের উপর রেখে নিনীত পুরোপুরি ঘুরে তাকাল তার দিকে। শান্ত গলায় বলল,"হু। তো আর কে কিনবে?"
"থ্যাংক ইউ। থ্যাংক ইউ সো মাচ।"
পারমিতা ভেতরে এলো। সাইডবক্সের উপর থাকা কাঁচের গ্লাসটা দেখেই মুখ কালো হলো তার। সব আনন্দ মাটিচাপা দিয়ে শুকনো মুখে বলল,"আজ কি আপনার হুইস্কি ডে নাকি?"
"উমম। ভাবছিলাম।"
পারমিতা হতাশ হয়ে বলল,"আমি তো আরো ভাবছিলাম কফি বানাব দু'জনের জন্য। আচ্ছা সমস্যা নেই। কাল দু'জন একসাথে খাব, কেমন?"
বলেই সে মৃদু হাসল। ঘুরে দাঁড়িয়ে বেরিয়ে যেতে চাইল ঘর থেকে। নিনীত তৎক্ষনাৎ পিছু ডাকল তাকে। ভারি গলায় বলল,"দাঁড়ান। যেতে হবে না।"
পারমিতা ঘাড় ঘুরিয়ে অবাক হয়ে বলল,"তবে কি করব?"
সাইড বক্সের উপর থেকে ডায়মন্ড কাটের গ্লাসটা তুলে নিয়ে জানালার দিকে এগোল নিনীত। পর্দা সরিয়ে খোলা জানালা দিয়ে এক ঢিল মেরে ভেতরের তরল টুকু ছুড়ে ফেলল বাড়ির পেছনের জংলায়। পারমিতা হা করে দাঁড়িয়ে দেখছিল তাকে।
পুনরায় ফাঁকা গ্লাসটা বেডসাইড টেবিলের উপর রাখে সে। ভাবলেশহীন হয়ে তাকায় পারমিতার আশ্চর্য মুখের দিকে। বেশ ঠান্ডা স্বরে বলে,"যান, কফি করে আনুন, ম্যাডাম।"
"ফেলে দিলেন আপনার প্রিয় জিনিস?"
"ওটা আমার প্রিয় না।" নিনীত নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল,"প্রিয় জিনিস থেকে ডিটাচমেন্টের জন্য ওসব গিলি।"
"তো এখন ফেলে দিলেন যে?"
"প্রিয় জিনিস কাছাকাছি এলে আগ বাড়িয়ে ডিটাচমেন্টের কি দরকার?"
পারমিতা হঠাৎ লজ্জা পেয়ে গেল। দ্রুত মাথা নামিয়ে তাড়াহুড়া করে বলল,"জি, বানিয়ে আনছি আমি।"
সেদিন কফির কাপটা নিনীতের হাতে দিয়েই তার গা ঘেঁষে বসল মিতা। আলতো করে মাথাটা নিনীতের কাঁধের উপর ফেলে খোলা বারান্দা দিয়ে রাতের আকাশ দেখতে দেখতে বলল,"নিনীত, আপনার প্রিয় রং কি?"
নিনীত কফির কাপে এক চুমুক দিয়ে স্থির হয়ে বসে বলল,"কালো।"
"প্রিয় সিনেমা?"
"ইন্টারস্টেলার।"
"প্রিয় ফুল?"
"সূর্যমুখী।"
"হোয়াই?"
"আই লাইক ইট।"
"প্রিয় মানুষ?"
পারমিতা চোখ তুলে তাকাল। নিনীত কফির কাপে আরেকটা চুমুক দিয়ে বলল,"ভেরি টাফ টু স্যে।"
"হাহাহা। আই নৌ।"
"বাট আই হ্যাভ স্পেশাল ফিলিংস ফর নিবেদিতা। ব্যাপারটা এমন না যে আমি ভেদাভেদ করছি দুই মেয়ের মধ্যে। কিন্তু কেন যেন আমার মনে হয় নিকিতার সব আছে, সবাই আছে। কিন্তু নিবির কিছু নেই। কিছু মানুষ থাকে না, যারা শান্ত হওয়ার কারণে নিজেদের প্রকাশ করতে পারে না ঠিক মতো? আমার নিবি ওমন। ট্রাস্ট মি। ও ইন্ট্রোভার্ট না। শী জাস্ট নিড স্পেস। কম্ফোর্টজোন দিতে হয় ওকে। সময় দিতে হয়। গুরুত্ব বোঝাতে হয়। কিন্তু কে বোঝাবে বলেন? ও তো অন্ধ। চোখে দেখে না।"
পারমিতা অবাক হলো ভীষণ। সোজা হয়ে বসে আহত স্বরে বলল,"এমন করে বলছেন কেন?"
"সত্য বলছি। আল্লাহ আমার নিবিকে সব দিয়েছেন, ঐটা বাদে।"
"এটা নিয়ে আপনার দুঃখ আছে?"
"না, কখনো না।"নিনীত আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল,"ওর যা আছে, যেভাবে আছে, সেভাবেই ভালো আছে। ওর কোনো কিছু নিয়ে আমার অভিযোগ নেই। অভিযোগ আমার নিজের উপর। ওর বাবা হওয়ার জন্য আমার আরো বেশি যোগ্য হতে হতো।"
পারমিতা ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল। নিনীত প্রসঙ্গ পাল্টে বলল,"আপনার প্রিয় রং?"
"লেভেন্ডার।"
"প্রিয় সিনেমা?"
"লা লা ল্যান্ড।"
"প্রিয় ফুল?"
"উমমম, কনফিউজিং। সব ফুলই ভালো লাগে। তবে শিউলি ফুলের প্রতি আলাদা একটা ফ্যাসিনেশন আছে। রিয়েলি লাইক ইট।"
"প্রিয় মানুষ?"
পারমিতা এবার থামল। আগের মতো চট করেই এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারল না। শান্ত দৃষ্টিতে কয়েক পল নিনীতের দিকে তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিল। কণ্ঠস্বর খাঁদে নামিয়ে বলল,"জানি না।"
"কেন জানেন না?"
"প্রিয় মানুষ আসে ঘর থেকে। আমার তো কোনো ঘর নেই নিনীত সাহেব।"
নিনীত কিছুক্ষণ স্থির চোখে তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
"স্ট্রেঞ্জ! নিবির পরী মা, নিকির মমা, আমার ম্যাডাম হয়েও বলছেন আপনার কোনো ঘর নেই! আমরা তাহলে কারা?"
"আপনারা আমার ঘর?"
নিনীত জবাব দিল না। শেষ বারের মতো কফির কাপে চুমুক দিয়ে দু'হাতে পেছনে ঠেস দিয়ে বসল। হাহ, দ্যাট সিলি, স্টুপিড গার্ল এগেইন। নিনীত বলল,"অনেক রাত হয়েছে। সকালে আবার ক্লিনিকে যেতে হবে। যান, ঘরে গিয়ে চট করে শুয়ে পড়ুন, ম্যাডাম।"
_____
সীমান্ত দুই কাপ চা হাতে কেবিনের ভেতর ঢুকল। আয়তি তখন এক ধ্যানে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে ছিল। সীমান্ত গলা খাকারি দিতেই সম্বিৎ ফিরে পেল। কপাল কুঁচকে বলল,"তুমি? এতো রাতে?"
সীমান্ত চোখ নামিয়ে হাতে থাকা কাপ দু'টো দেখাল। কাপ থেকে ধোঁয়া উঠে হাওয়ায় মিলিয়ে যাচ্ছে। আয়তি বলল,"চা নাকি?"
"হু।"
সীমান্ত কাপ দু'টো বেডের পাশের লম্বা টেবিলের উপর রাখল। তারপর আয়তির দিকে তাকিয়ে বলল,"তোমার শরীর এখন কেমন?"
"ভালো তো। আগের চেয়ে বেশ ভালো।"
"তোমার গলায় এটা কি?"
আয়তি কণ্ঠনালির উপর আটকে থাকা গোলাকার বস্তুটা স্পর্শ করতে করতে বলল,"জানি না কি। হবে কোনো যন্ত্রপাতি।"
"ব্যথা করে না?"
"করে, হালকা।"
"ঢোক গিল কেমন করে?"
"তুমি যেমন করে গিল, ওমন করে। উদ্ভট কথা বলবে না। পৃথিবীর সব মানুষের ম্যাকানিজম সেম।"
সীমান্ত চুপচাপ মাথা নাড়ল। টেবিলের উপর চায়ের কাপ থেকে সাদা ধোঁয়া উপড়ে উঠছে। সেদিকে তাকিয়ে আয়তি শীতল কণ্ঠে, ধীরে ধীরে বলল,"কিন্তু আমি তো এই অবস্থায় চা খেতে পারব না। আমার নিষেধ আছে।"
সীমান্ত মলিন মুখে বলল,"তাই? স্যরি, জানতাম না আমি।"
"তোমার চোখ মুখ এমন কেন?"
"কেমন?"
"কালো।"
"আমি কালোই।"
আয়তি হালকা হেসে বলল,"হাত পা ভাঙল আমার। অপারেশন হলো আমার। আর তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে, আমার চেয়ে বেশি অসুখ তোমার। ঘুমাও না নাকি?"
"জানি না।"
সীমান্ত ভারি নিঃশ্বাস ছাড়ল। কিছুটা অধৈর্য হয়ে বলল,"তুমি আমারে কোনো শাস্তি দিলা না কেন?"
"কি শাস্তি দিব?"
"অন্তত তোমার বাবাকে বলতা।"
"শাস্তি পেলে তোমার কি লাভ হতো?"
"মন একটু শান্তি পাইতো।"
সীমান্ত ক্ষীণ আওয়াজে বলল,"তোমাকে এতো কষ্ট দিতে চাই নাই আয়তি। মাফ কইরো আমাকে।"
"বললাম তো মাফ করেছি।"
"এতো সহজে?"
আয়তি হাসল। বলল," তুমি ছোটবেলায় একবার আমার সাহায্য করেছিলে। আমি সেই সাহায্যের শোধবোধ করে দিলাম সীমান্ত। বুঝলে?"
"কি সাহায্য করসিলাম?"
"আমি লুকোচুরি খেলতে গিয়ে বাড়ির টাংকিতে পড়ে গিয়েছিলাম পা পিছলে। তুমি আমায় টেনে তুলেছিলে। মনে আছে?"
সীমান্ত অবাক হলো। কিছু একটা ভেবে চমকে উঠে বলল,"এতো আগের কথা তোমার মনে আছে আয়তি?"
আয়তি গম্ভীর হয়ে বলল,"আমার সবই মনে আছে।"
"তখন কতো ভাব ছিল আমাদের।"
সীমান্ত মাথা নামিয়ে দুই পা নাড়তে নাড়তে বলল,"বাড়ির বাগানে কতো লুকোচুরি খেলছি আয়তি।"
"হুম। গাছ থেকে আম পেড়েছি। লুকিয়ে রেললাইন দেখতে গিয়েছি। পুকুরে নেমে পা ভিজিয়েছি। তুমি কদম ছিঁড়ে এনে দিতে।"
সীমান্ত আরেক দফা চমকাল।
"এসবও মনে আছে তোমার! কতো আগের কথা! আমিই ভুইলা যাই বার বার।"
"বললাম তো, আমার সব মনে থাকে।"
সীমান্ত মাথা না তুলেই বলল,"তখন তো বন্ধু ছিলাম আমরা।"
"এরপর শত্রু হলাম কেমন করে?"
কপাল কুঁচকে জানতে চাইল আয়তি। সীমান্ত মুখ তুলে বলল,"তা তো জানি না।"
"হুট করে বন্ধুবান্ধব, আড্ডাবাজি, ক্রিকেট খেলা, আর সিগারেট টানার ভূত মাথায় চেপেছিল কার?"
সীমান্ত নিচু স্বরে বলল,"আমার।"
"এসব করেই জীবন বরবাদ করেছ। নিজেরও, নিজের মায়েরও, নিজের বোনেরও।"
মেয়েলি কণ্ঠটা কিঞ্চিৎ বিরক্তি দেখাল। শান্ত চোখ দু'টো শক্ত করে আয়তি বসে থাকলো স্থির হয়ে। সীমান্ত বলল,"এখন থেইকা ভালো হমু।"
"এই ভালো হওয়ার মধ্যে কোনো মাহাত্ম্য নেই।"
"মহান হইতে চাই না আমি।"
"তাহলে কি চাও?"
"তোমার সাথে যা করসি, ঐটার প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে যা যা করতে হবে, তাই করমু।"
"আমি তো বললাম, কোনো শাস্তি নেই তোমার। পুরো দোষ আসলে তোমার না সীমান্ত। আমারই কিছু পার্সোনাল ইস্যু আছে। পাস্ট ট্রমা আছে আমার।"
"ট্রমা কি?"
"ভয়। আতংক। কোনো বিষয় নিয়ে মাত্রাতিরিক্ত প্যানিক করা।"
"কিসের এতো ভয় তোমার?"
"সেটা তোমার জানতে হবে না। বি ইন ইউর লিমিট। নিজের সীমায় থাকো।"
কঠিন গলায় জবাব দিল আয়তি। যেমনটা সে বরাবরই করে। অন্য সময় হলে সীমান্তর রাগ হতো ভীষণ। আজ রাগ করল না। গাল ভর্তি হেসে বলল,"আচ্ছা, থাকমু লিমিটে।"
"যাও, এবার তোমার চায়ের কাপ নিয়ে বিদায় হও এখান থেকে।"
"ট্রমাটা বলো না। একটু শুনি। ভবিষ্যতে সতর্ক থাকমু।"
"চড় খাবে, নাকি যাবে?"
আয়তি অন্য পাশে মুখ সরিয়ে দুই চোখ বুজল। এই প্রসঙ্গে সে কারো সাথে আলাপ করতে ইচ্ছুক না। সীমান্ত বলল,"তুমি সত্যিই মাফ করলা আমারে?"
"তুমি প্লিজ যাও তো। বিরক্ত লাগছে আমার।"
সীমান্ত তখুনি গেল না। আরো কিছুক্ষণ বসল। মাথা নামিয়ে দেয়াল ঘড়ির টিক টিক শব্দ শুনল। আয়তি চোখ বুজেই বলল,"তোমার সাথে আমার রাগ, ঝগড়া, পুরাতন ঝামেলা, যা কিছু ছিল, সব শেষ। আমার কোনো রাগ নেই, কোনো প্রতিশোধের ইচ্ছে নেই। এখন থেকে তুমি তোমার পথে। আমি আমার পথে।"
সীমান্ত নত মুখে শুনল তার কথা। একেবারে নীরব থেকে মনে মনে জবাব দিল,"না। এখন থেকে তুমি তোমার পথে। আর...আর আমিও তোমার পথে।"
____
প্রথম মাসের বেতন জ্যোতি হাতে পেয়েছে দু'দিন আগে। আজ তার মন ভালো। জাবির একটা ক্লাস টেস্টে ফুল নম্বর পেয়েছে। আব্বার শরীর ভালো। তারও দিনকাল দারুণ কাটছে।
অফিসে আসার পরেই নিজের ডেস্কে বসে একবার বড় করে নিঃশ্বাস ছাড়ল। এখানকার মানুষদের সে এখনো বুঝতে পারে না ঠিকঠাক। সেরকম কারো সাথে সখ্যতা হয়নি এখনো। সবাই ব্যস্ত যার যার কাজ নিয়ে। লাঞ্চ টাইমে অবশ্য বিস্তর আড্ডা বসে। বসের মন জয় করার একশো এক উপায় নিয়ে আলোচনা চলে। সাথে চলে বসের অকর্মন্য ছেলেদের নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ। জ্যোতি বরাবরই চুপ থাকে ঐসবে। ঠান্ডা মুখে বসে ডালপুরিতে ছোট করে কামড় বসায়।
সেদিন সকালে আহিল এলো তার ডেস্কে। তাকে খুঁজে পেলে সময় লাগল ছেলেটার। কাছে এসেই ক্লান্ত গলায় বলল,"ওহ, তুমি এখানে?"
জ্যোতি কম্পিউটার স্ক্রিন থেকে চোখ সরাল। কিছুটা অবাক হয়ে বলল,"আপনি?"
লম্বা শ্বাস ছাড়ল আহিল। তার চোখ মুখ বেজার। মুখে ক্লান্তি আর বিষন্নতার ছাপ। পাশের টেবিল থেকে অন্য কর্মচারীরা বাঁকা চোখে দেখছিল তাদের।
আহিল উদাস গলায় বলল,"আমার একটা হেল্প করতে পারবে জ্যোতি?"
"কি হেল্প?"
"একটা কাজে একটু সাহায্য করতে পারবে? আমি পারছি না একদমই।"
জ্যোতি আড়চোখে চারপাশে তাকাল। সন্দিগ্ধ, উৎসুক আর কৌতূহলী দৃষ্টি জোড়া খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছিল তাদের। মেঝ স্যারের ছেলে এমন রুম থেকে বেরিয়ে মাত্র জয়েন করা একটি মেয়ের ডেস্কের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, বিষয়টা হজম হলো না কয়েকজনের। জ্যোতি জানত না, কর্পোরেট জবে এতো কুচুটে স্বভাবের লোক থাকে।
"কাজটা জরুরি? আজই করতে হবে?"
"জি। তাও দুপুর দুইটার মধ্যে।"
"স্যার কোথায়?"
"বাসায় গেছে। আমার বোন অসুস্থ তো। বাবা তাই কাজের ফাঁকে ফাঁকে তাকে দেখে আসে।"
"ওহ।"
আহিল দু'হাত জোড় করে বলল,"প্লিজ জ্যোতি, একটু হেল্প করো। ইউ আর সো ব্রিলিয়ান্ট।"
জ্যোতি আরেকবার সাবধানে চারপাশে নজর বুলায়। উৎসুক চোখ জোড়া আরো বেশি সূঁচালো হওয়ার পূর্বেরই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। গলা নামিয়ে শান্ত মুখে জবাব দেয়,"জি চলুন। আমি আসছি।"
____
বিকেল তিনটা ছাপ্পান্ন। মিস মণিষা মাত্র ঢুকলেন সংশপ্তকের হলদে রঙের দালানে। ইয়াজিদ তখন কি নিয়ে যেন হাসি ঠাট্টা করছিল তাশরিফের সাথে। ভদ্রমহিলাকে দেখতেই মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
মণিষা ভেতরে ঢুকেই এক নজর তাকাল তার দিকে। বরাবরের মতো সেই কঠিন, ধাঁরালো দৃষ্টি। ইয়াজিদ ঢক গিলে একটা ম্যাগাজিন হাতে তুলে নিল। তারপর দ্রুত আড়াল করল নিজের মুখ। ফনসার শান্ত মুখটাই ভালো লাগে তার। এমন রাগী আর গম্ভীর মুখ দেখলে সে কেমন অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। কে জানে, হয়তো ভয় পায় কিছুটা।
ইয়াজিদ ম্যাগাজিনের আড়ালে বাঁকা চোখে এক পলক দেখল তাকে। মণিষা গিয়ে একেবারে শেষ মাথার বেঞ্চে বসেছে। সহস্র গেছে ভেতরে। মণিষা হাতে থাকা চিকন বেল্টের ঘড়িতে সময় দেখল একবার। তারপর আবার কঠিন দৃষ্টিতে তাকাল লোকটার দিকে। একে আজ সে কয়টা কড়া কথা শুনিয়ে দিবে, যদি ভুল করেও তাকে জ্বালায় তো।
এসব লোকদের ভালো করে চেনা আছে তার। প্রথমে মরা বউয়ের গল্প শুনিয়ে সহানুভূতি নেয়। তারপর সুযোগ বুঝে ফায়দা লুটে। একে মণিষা উচিত শিক্ষা দিবে।
তাশরিফ সামনে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলল,"কিরে? হঠাৎ ম্যাগাজিন ধরলি যে?"
ইয়াজিদ ম্যাগাজিনের পাতা থেকে মুখ না তুলেই গম্ভীর মুখে বলল,"এমনিই। পড়তে মন চাইছে হঠাৎ।"
বিকেল চারটা দশ।
হঠাৎ করে একটা মেয়ে দৌড়ে ঢুকল ঘরের ভেতর। ইয়াজিদ আর তাশরিফ হকচকিয়ে মুখ তুলল। মেয়েটা দৌড়ে এসে ঝড়ের বেগে জাপটে ধরল ইয়াজিদকে। ছোট্ট মাথাটা চেপে ধরল বুকের সাথে। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল,"চাচ্চু, ও চাচ্চু। বাঁচাও প্লিজ।"
ইয়াজি আশ্চর্য হলো। নিজেও হাত বাড়িয়ে মেয়েটাকে আগলে ধরে নরম গলায় বলল,"ইশু! হয়েছে টা কি? আছি আমি। চিন্তা নাই কোনো।"
ইশি মুখ তুলল। হেঁচকি টানতে টানতে কাঁপা স্বরে বলল,"তুমি তোমাকে নিয়ে আগে চিন্তা করো চাচ্চু। তারপর আমার কথা ভেবো।"
"কেন? কি হবে আমার?"
ঠিক তখনই বড় বড় পায়ে বেলী ভেতরে ঢুকল। প্রথমেই অগ্নিচোখে, কটমট করে তাকাল ইয়াজিদের দিকে। ঐ এক চাহনিতে ইয়াজিদের মুখের হাসি উড়ে গেল, বুক ধ্বক করে উঠল। ফাঁকা মুখে একটা ঢোক গিলে ভীত চোখে সে তাকাল তার দিকে।
বেলী হনহনিয়ে এগিয়ে এলেন সামনে। ক্ষুদ্ধ চোখে দু'জনের দিকে তাকিয়ে শব্দ করে একটা খাতা রাখলেন ডেস্কের উপর।
ইয়াজিদ সাথে সাথে তাকাল সেদিকে।
ইশির গত সপ্তাহের ক্লাস টেস্টের খাতা। খাতার উপর বড় করে লিখা ৩/২০। বিশে মাত্র তিন। পাশে আবার একটা সই। সইয়ে মুবিন সাহেবের নাম লিখা। নির্নিমেষ চোখে সেদিকে তাকিয়ে কপালের ঘাম মুছল ইয়াজিদ।
বেলী গলা তুলে বললেন,"ইয়াজিদ! তোমার এতো সাহস! তুমি মুবিনের সাক্ষর নকল করেছ?"
এক ধমকেই ইয়াজিদের চোখ মুখ শুকিয়ে গেল। বেলী ভাবি কোনো বাঘ ভাল্লুক না। উনি মানুষ খেতে পারবেন না। তবুও তাকে বাঘের মতোই হিংস্র মনে হয় ইয়াজিদের। তার সামনে ইয়াজিদ একটা ভেজা বেড়াল, নাদান বাচ্চা। ছাগল, গরু, ভেড়া, সব।
সে আমতা আমতা করে বলল,"ভাবি, ঐ...মানে। ছোট ভাইজান তখন...ব...ব্যস্ত ছিল। তাই আমি-"
"তো ব্যস্ত থাকলে? তোমার ছোট ভাইজান ব্যস্ত থাকলে তুমি ওর বাবার সই দিয়ে দিবে? তুমি নিজেই ছোট ভাইজান হয়ে যাবে? আমি কি মরে গিয়েছিলাম? আমার সই নিতে। আমাকে কেন জানালে না তুমি? এ্যাই ইশি! এদিকে তাকাও। তুমি আমাকে কেন জানালে না? এ্যাই বেয়াদব! তাকাও বলছি।"
ইশি আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরল তাকে। শক্ত বুকে চোখ চেপে ধরে মাথা নাড়তে নাড়তে বলল,'স্যরি স্যরি। চা-চাচ্চু স্যরি বলো প্লিজ।"
ইয়াজিদ পুতুলের মতো বলল,"স্যরি ভাবি। আর হবে না কখনো।"
"আর হবে না মানে? তুমি কি করেছ জানো? তুমি প্রশ্রয় দিয়েছ ইশিকে। তুমি ওকে বুঝিয়েছ, ও পরীক্ষায় যতোই খারাপ করুক, তবুও ওর কোনো শাস্তি হবে না। তুমি খারাপ করছ আমার মেয়েকে। নিজের জীবন তো ধ্বংস করেছোই।"
ইয়াজিদ মাথা নামিয়ে এক নাগাড়ে হজম করল তার কথা। বেলী চাপা স্বরে বললেন,"একে আমার হাতে দাও। সই নকল করা একে শেখাচ্ছি আমি। দাও বলছি।"
ইয়াজিদ ছাড়ল না। মাথা হেট করে বিড়বিড় করে বলল,"ভাবি! আর এমন করবে না কখনো। আজকের মতো মাফ করে দাও।"
বেলী শীতল চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন দু'জনের দিকে। রাগে তার দুই চোখ জ্বলছে। ইশিকে ঠাটিয়ে দু'গালে চড় মারতে পারলে শরীর শান্ত হতো। আপাতত সেটা সম্ভব না। ঘরে অন্য মানুষ আছে। পাশের ঘরে বাচ্চারা ক্লাস করছে। বেলী সুপ্ত ইচ্ছে টুকু ভেতরে চেপে সংশপ্তক থেকে বেরিয়ে এলেন।
ইয়াজিদ প্রাণ ভরে শ্বাস নিল। হাঁফ ছেড়ে শান্তিতে বসল। ইশিকে ছেড়ে দিয়ে টেবিলের উপর থেকে পানি গ্লাসটা হাতে নিয়ে বলল,"যাক বাবা, বাঁচলাম। এই নে ইশি, পানি খা।"
"আপনি তাহলে ইশির বাবা না?"
ইয়াজিদ স্তব্ধ হয়ে সামনে তাকায়। তার থেকে কয়েক হাত ধরে মণিষা দাঁড়িয়ে আছে বুকে হাত বেঁধে। চোখ দু'টো জ্বলন্ত, কণ্ঠে রোষ। ইয়াজিদ ভাষাহীন হয়ে পড়ে।
ইশি চোখ মুছে সামনে তাকাতেই ভ্যাবাচ্যাকা খেল। হতভম্ব হয়ে চোখ কচলাতে কচলাতে বলল,"মিস! আপনি?"
মণিষা আরো দুই কদম সামনে এলো। আগের মতোই সরোষ চোখে দু'জনের দিকে তাকিয়ে ক্রুদ্ধ গলায় বলল,"আমাকেও মিথ্যা বলেছেন তাই না? বলেছেন আপনি ওর বাবা। আরেকটা জঘন্য মিথ্যা বলেছেন।"
ইয়াজিদ কাচুমাচু মুখে বলল,"সেটা কি?"
"বলেছেন ইশির মা নেই।"
ইয়াজিদ তৎক্ষনাৎ প্রতিবাদ করল। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,"জি না। আমি বলেছি আমার কোনো স্ত্রী নেই। এটা সত্যি। আমার নেই।"
মণিষার চোখের দৃষ্টি নরম হলো না। সেই ভয়ানক, রক্তিম চোখেই সে কিছুক্ষণ দেখল দু'জনকে। ইয়াজিদ শ্বাস ফেলতে ফেলতে বলল,"সেই সময় ইশিকে বাঁচাতে এটকই একমাত্র পথ ছিল।"
"একমাত্র? আপনার ভাবি ঠিক বলেছেন। আপনার জন্যই সে নষ্ট হচ্ছে। আপনি ওর মানসিক বিকাশ নষ্ট করছেন। ভুল জিনিস শেখাচ্ছেন ওকে।"
ইয়াজিদ চুপ থাকল। ভেতর থেকে একটা জবাব উথলে বেরিয়ে আসছিল মুখ দিয়ে। বলতে মন চাইল,"এতো জ্ঞানের আলাপ মারাইয়েন না আপা। আপনার এতো জ্ঞান থাকলে ল্যাদা বয়সে বিয়ে কইরা এত্ত বড় বাচ্চা নিয়া ঘুরতেন না। বুদ্ধিমতি হইলে আমার জন্য অপেক্ষা করতেন। আমার মূল্য বুঝতেন।"
মণিষা বলল,"আমি ইশির মা কে বিচার দিব দাঁড়ান। কাজটা আপনারা একদমই ঠিক করেন নাই।"
ইশি কেঁপে উঠল সহসা। এখানে, এই জায়গায় মিস কে সে আশাই করে নি। ভয়ে সিটিয়ে গিয়ে এক হাতে চাচ্চুর শার্ট খাবলে ধরে কাঁপা গলায় বলল,"প্লিজ মিস। আমি আর কখনো এমন করব না।"
"তুমি আর এমন করবে না? তোমাকে আমি আর বিশ্বাস করব? তুমি আর তোমার চাচা, দু'জনই আস্ত মিথ্যুক।"
মণিষা ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছাড়ল। ইয়াজিদ আবার নরম গলায় বলল,"ইশির মা অনেক রাগী। জানতে পারলে খুব মারত।"
"সেটা আপনি আমাকে জানাতে পারতেন।"
"ভুল হয়েছে। স্যরি।"
মণিষা আর কোনো জবাব দিল না। শক্ত মুখে কিছুক্ষণ ওদের দিকে তাকিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে আবার বেঞ্চে গিয়ে বসল।
ঠিকই ভেবেছিল সে। এই লোক সুবিধার না। আস্ত মিথ্যুক। বেয়ারা লোক একটা। মণিষা আর তাকাল না সেদিকে। তাকালে দেখতে পারত, বেয়ারা লোকটা দফায় দফায় ধমক খেয়েও কেমন মুচকি হাসছিল তাকে দেখে।
____
তার নাম আয়তি মজুমদার। দেখতে সে সুন্দর, রূপবতী। থুতনির কয়েক ইঞ্চি নিচে একটা ছোট তিল আছে। মুখটা ফর্সা। চুলগুলো মসৃণ, উচ্চতা পিঠ অব্দি।
আয়তির মুখ ছিল ফকফকা। কোথাও কোনো দাগ, চিহ্ন কিচ্ছু নেই। সেই মুখে পর পর অগণিত দাগ বসল একটা দুর্ঘটনার পরেই। পর পর দু'টো ফেসিয়াল সার্জারি। আয়তি নিজের সমস্ত লাবণ্য হারিয়ে ফেলল।
সার্জারির পর তার মুখ দেখা যেত না ঠিক মতো। ব্যান্ডেজ সরানোর পর সার্জারির চিহ্ন মুছল না পুরোপুরি। তবে দুই সপ্তাহ যেতে দাগ সামান্য হালকা হলো। সতেরো তম দিনে আয়তিকে বিশেষ বিবেচনায় ডিসচার্জ করা হলো। হাসপাতালে তার ভালো লাগছিল না। ভীষণ বিরক্ত লাগত। সাথে অসুস্থ ভাবটাও কাটত না। খালিদ অথোরিটির সাথে কথা বলে অনুমতি নিলেন। বললেন বাড়িতেই পরিপূর্ণ অবজারভেশনে রাখবেন।
আঠারো দিন পরে আয়তি বাড়ি ফিরল, তার নিজস্ব ঘরে। বাড়িতে এসেই তার শরীরের ক্লান্তি অর্ধেক কমে গেল, রোগটাও সেরে গেল। তবে আয়না দেখলে দুঃখ হতো মাঝে মাঝে। শরীরে আর মুখে এতো কাটা ছেঁড়া, এতো খুঁত। বড্ড বিষন্ন হতো মন।
তবুও আয়তি বিকার দেখাত না সেসবে। এর চেয়েও খারাপ কিছু হতে পারত তার সাথে। এমন হতে পারত,যে ছেলেগুলো ঘন্টার পর ঘন্টা আটকে রাখত তাকে। ও আর কোনোদিন বাড়ি ফিরতে পারত না। হতেই পারত। আয়তি অন্তত সেই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেয়েছে।
বাড়িতে আসার পর সে এক মুহূর্তের জন্যও তার ঘর ফাঁকা পায়নি। তার সাথে স্থায়ীভাবে যেই নার্স মেয়েটিকে নিয়োগ করা হয়েছিল, সে বাকিদের বলতে বলতে হয়রান হয়ে গেল "আপনারা এতো ঘন ঘন এই ঘরে আসবেন না"। পাঁচ মিনিট পর পর কেউ না কেউ আসতো তার ঘরে।
আয়তি বিরক্ত হতো না একদমই। সে নিজেই ধীরে ধীরে কথা বলত এদের সবার সাথে। এদের সে বরাবরই অবহেলা করেছে। অসুস্থ হওয়ার পর তার মনে হলো, এরা বাদে তার আর কেউ নেই।
প্রথমদিন সুষ্মিতা তাকে এক বাটি পায়েস খাওয়ালেন। জেবা খাওয়ালেন তার পছন্দের মতিচুরের লাড্ডু। খুব বেশি খেতে পারেনি। ডাক্তারের নিষেধাজ্ঞা আছে কিছু বিষয়ে। স্যালাইন চলছিল হাতে। সবাই এসে এসে একবার দেখে যেত তাকে। খালিদ সাহেবই সাথে থাকতেন বেশি। তিনি সেই একমাত্র পুরুষলোক, যার বুকে আয়তি নিশ্চিন্ত মাথা রাখতে পারত, ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলতে পারত। বাড়ির বাকিরাও হয়তো মাঝেমধ্যে টের পেত, পুরুষ মানুষের প্রতি প্রবল অনিহা আছে তার। আগ বাড়িয়ে তার ঘরে এসে তাকে অপ্রস্তুত করত না কেউ। তবে একজন আসতো। ঘরে না আসলেই ঘরের চারপাশে পায়চারি করত,আর মাঝে মাঝে সুযোগ পেলে একটু ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখত।
তার নাম সীমান্ত। সে প্রতিদিন তিন চার বার নিয়ম করে আয়তির ঘরের সামনে আসে। তাকে দেখে যায় বাইরে থেকে। ভেতরে ঢোকে না। চোখ লুকিয়ে, নিজেকে আড়ালে রেখে, কোনোরকমে একটু দেখে যায় তাকে। বেকারত্ব যে কতো বড় সমস্যা সেটা আয়তি তাকে দেখলে টের পায়।
সীমান্ত কয়েক বার মাফ চেয়েছিল তার কাছে। আয়তি প্রতিবারই বলেছে, তোমার সাথে আমার সমস্ত ব্যাপার এখানেই শেষ। রাগ দুঃখ কোনোকিছুই আর নেই আমাদের মধ্যে। আজ থেকে আমি আর তোমার কোনো কিছু নিয়ে প্রশ্ন তুলব না।
কিন্তু এই উত্তর সীমান্তকে শান্তি দিল না। মনে হলো, আয়তি পিছিয়ে গিয়ে তাকে চরম অনুতাপ আর লজ্জায় ফেলেছে। সীমান্ত অনুশোচনার বোঝা সইতে না পেরে রোজ একবার দেখে যেত তাকে। একবার না, কয়েকবার। সেই মন খারাপের দিন গুলিতে সীমান্ত জ্যোতি নামের মেয়েটিকে পুরোপুরি ভুলে গেল। তার মস্তিষ্ক তখন আর জ্যোতির টিউশন শেষের ক্লান্ত মুখটা কল্পনা করত না। জ্যোতির নিম্নমধ্যবিত্ত জীবন, তার দায়িত্বশীলতা, শান্ত আচরণের আড়ালে জ্যোতির চমৎকার ব্যক্তিত্ব, সবকিছুই সে ভুলে বসল।
চোখের সামনে তখন শুধু ভাসতো আয়তির রক্তাক্ত মুখ, সেলাইয়ের কারণে দাগ বসা একটা কপাল, হাতে পায়ে ব্যান্ডেজ, ইলেক্ট্রোকার্ডিয়ামের টুট টুট শব্দ, আরো কতো কি। যার পেছনে দায় ছিল সীমান্তর। সীমান্ত কেমন করে ভুলবে সেই কথা?
_____
শনিবার বিকেল। পারমিতা সবেমাত্র ক্লিনিক থেকে ফিরেছে। পায়ের গতি ধীর। হাঁটতে হাঁটতে একবার হাই তুলল সে।
তার হাতে একটা সূর্যমুখীর তোড়া। এই ফুল সে এনেছে তার স্বামী নিনীতের জন্য। কারণ ভদ্রলোকের প্রিয় ফুল সূর্যমুখী।
পারমিতা দ্রুত পায়ে সিঁড়ি ভাঙল। নিনীত তখন তার ঘরে বসে নিকিতার সাথে গুরুত্বপূর্ণ আলাপ করছিল। নিকিতা তার কোলে। অন্য পাশে কোলে দুইটা সাদা রঙের খরগোশ। পারমিতা ঘরে গিয়ে চোখ কপালে তুলে বলল,"এসব কি?"
নিনীত মাথা তুলে তাকাল। সহজ গলায় বলল,"খরগোশ। কি কেমন নাম নিকি?"
"জুনজুনি আর বুলবুলি।"
"হু। ঝুনঝুনি আর বুলবুলি।"
পারমিতা কোমরের দুই পাশে হাত রেখে বলল,"ঝুনঝুনি আর বুলবুলি খাঁচা ছেড়ে খাটে কেন?"
নিনীত জবাব দিতে পারল না। তার আগেই নিকিতা মাথা তুলে বলল,"কানন ওদেল অনিক জ্বম।"
"জ্বর ওদের?"
"হু।"
"কি হবে এখন?"
"উষুধ খাবি।"
"ওহহ আচ্ছা। নিবি কোথায়?"
"পচছে। তিচার এসেছে।"
"পড়াশোনা করছে টিচারের কাছে?"
"হু।"
"আর তুমি এই সুযোগে পাপাইয়ের সাথে একা একা আহ্লাদ করছো?"
নিকিতা কপাল কুঁচকে তাকাল। আরেকটু চেপে বসল নিনীতের গা ঘেঁষে। ছোট ছোট হাতে তাকে জড়িয়ে ধরে বলল,"পাপাই উষুধ খাওয়াবি খরগুশকে। পাপাই কতু ভালু। পিমস পাপাই!"
বলেই বসা থেকে উঠে টুপ টুপ দু'টো চুমু খেল তার গালে। তারপর আবার মিশে গেল বুকের সাথে। পা দু'টো আড়াআড়ি রেখে নতুন শেখা একটা ছড়ার লাইন আবৃত্তি করা শুরু করল।
নিনীত মুচকি হাসছিল তাকে দেখে। আলতো করে মাথায় হাত বুলিয়ে এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে দিল। দুইটা চিকন ঘাস খরগোশ দু'টোর মুখের সামনে ধরল। এরপর কোমল চোখে পারমিতার দিকে তাকিয়ে বলল,"মাত্র এলেন নাকি? যান, ফ্রেশ হয়ে আসুন।"
"যাচ্ছি।"
পারমিতা এগিয়ে এসে বলল,"তার আগে এটা রাখুন।"
বলেই সে হাত বাড়ালো সামনে। নিনীত সেদিকে তাকাতেই দেখল সূর্যমুখী ফুল দিয়ে ভরা একটা ফুলের তোড়া। চারপাশে পুরাতন নিউজপেপারের র্যাপ। কপাল কুঁচকে জানতে চাইল,"কেন রাখব?"
"কারণ এটা আপনার জন্য।"
পারমিতা হাসল। হাত দু'টো আরেকটু এগিয়ে দিয়ে ঠিক নিনীতের মুখের সামনে এনে ধরল। বলল,"আপনার প্রিয় ফুল সূর্যমুখী। তাই আপনার জন্য সূর্যমুখী ফুল। নিন, ধরুন।"
নিনীত যন্ত্রের মতো হাত বাড়ায়। আস্তে করে তোড়াটা হাতে নেয়। স্থির চোখে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখে ফুল গুলো। পারমিতা বলল,"কি? সুন্দর?"
নিনীত তার দিকে না তাকিয়েই জবাব দিল,"জি। ভীষণ।"
তার মনোযোগ তখন হলুদ রঙের তাজা ফুলগুলোর দিকে। সে অভিভূত হয়ে দেখছিল, হাত বাড়িয়ে খুব যত্নে এদের স্পর্শ করছিল। পারমিতা শাড়ির আঁচলের দিকের সেফটি পিন টা খুলতে খুলতে বলল,"দাঁড়ান, আমি চেঞ্জ করে ফ্রেশ হয়ে আসি।"
বলতে বলতেই সে বেরিয়ে গেল।
সে বেরিয়ে যাওয়ার পর নিনীত আরো কিছুক্ষণ ফুলের তোড়াটা দেখে তারপর উঠে দাঁড়াল। সেটাকে খুব সাবধানে, যত্ন করে টেবিলের এক পাশে সাজিয়ে রাখল। সাথে মনে করে রিবনের নিচে খালি অংশে স্টিকি নোটে একটা কোটেশন লিখে তোড়ার সাথে আটকে দিল। সেখানে লিখা ছিল-
"My wife Paromita gifted me this flower bouquet. I will keep this forever with me."
[আমার স্ত্রী পারমিতা আমাকে এটি উপহার দিয়েছে। আমি সারাজীবন এটিকে নিজের সাথে রাখব।"
____
গোসল সেরে বেরিয়ে পারমিতা গেল রান্নাঘরে। আয়তি বাড়িতে আসার পর থেকে রোজ কেউ না কেউ আসছে তাকে দেখতে। এতো বড় বাড়ি, তার উপর অতিথি আপ্যায়ন, আয়তির সেবাযত্ন করা, সবকিছু মিলিয়ে জেবার আর তখন দুপুরে বিশ্রাম করার সময় থাকত না।
পারমিতা গিয়ে বলল,"মা, কাজ কি কি করতে হবে, আপনি আমাকে বলুন। আপনি একটু গিয়ে রেস্ট নিন।"
জেবা পেয়াজু গুলো একে একে গরম তেলে ছাড়তে ছাড়তে তার দিকে তাকালেন। দুই দিকে মাথা নেড়ে বললেন,"আরে না। হয়ে যাবে মিতা। তুমি মাত্র এলে। যাও, বসার ঘরে গিয়ে বসো। এমনিতেও বুধবারে তো তুমিই সব করো।"
পারমিতা এগিয়ে এলো। শাড়ির আঁচলটা কোমরে গুজতে গুজতে বলল,"মা, আমি পারব তো। ক্লান্ত হলে নিজেই একটু শুয়ে রেস্ট নিয়ে আসতাম। আজ মেজাজ ভালো। দিন, আমাকে দিন। আপনি নাহয় গিয়ে ওদের সাথে কথা বলুন। সুষ্মি চাচি কোথায়?"
"আয়তির কাছে।"
"বেলি চাচি?"
"ইশি আর ইমিকে টিউশনে দিতে গেছে।"
"ওহহ আচ্ছা।" পারমিতা লোহার খুন্তিটা তার হাত থেকে নিজের হাতে নিতে নিতে বলল,"আমার কলিগ নাসরিন আপার ছিল এই অবস্থা। বাড়ির সব বড় বউদের এমনই হয় মা।"
"তোমারও হবে। আর কয়টা বছর পরেই।"
পারমিতা হাসল।
"আমি কিন্তু খুব অপেক্ষা করে আছি মা। যদিও আপনার মতো পারব না। কিন্তু এই যে সবাই সবকিছুতে আপনাকে খোঁজে, আপনার উপর ভরসা করে, আমার যে কি ভালো লাগে! কিন্তু আমি আপনার মতো হতে পারব না। যা ভুলোমনা আমি! সব ভুলে যাই।"
"ভুলে গেলে সমস্যা কি? আমার ছেলে আছে না?"
পারমিতা থামল। ঘাড় ঘুরিয়ে একবার তাকাল জেবার দিকে। অবাক হয়ে বলল,"আপনার ছেলেও একদিন বাবার মতো হবে?"
জেবা মাথায় হাত রেখে বললেন,"পারমিতা, তুমি কি কিছুই বোঝো না? শোনো মিতা, পৃথিবীর সব বোঝাপড়া শুধু ভাষা দিয়েই হয় না। সব স্বীকারোক্তিও না। এটা যেদিন বুঝবে, সেদিন টের পাবে, এই সংসারে তোমার শেকড় কতোদূর ছড়িয়ে গেছে।"
জেবা শাড়ির জমিনে ভেজা হাত মুছতে মুছতে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। পারমিতা গরম তেলে পেয়াজু ভাজতে ভাজতে এই সংসারে তার শেকড় খোঁজার চেষ্টা করল।
নাসির সাহেব বড় স্নেহ করেন তাকে। রোজ বিকেলে নাস্তা আনার সময় তার জন্য মনে করে কলিজার সিঙ্গারা আনেন। ঐ সিঙ্গারা পারমিতা বাদে অন্য কাউকে খেতে দেন না।
নিবি রোজ যা যা শিখে, সব গুছিয়ে বলে তাকে।
অরুণা আসে তার কাছে বায়োলজি পড়তে।
মেহরোজ মন খারাপ হলেই তার ঘরে গিয়ে বসে। মিহি গলায় বলে,"আমি অল্পতেই এতো অভিমানী কেন হচ্ছি বলুন তো আপু?"
ইয়াজিদ চাচা বলেছে, পারমিতার মুখ দেখেই তার মনে হচ্ছে এই বাড়ির ভবিষ্যৎ খুবই উজ্জ্বল। খালিদ সাহেব বলেছেন,পারমিতা মাল্টিটাস্কিং জানে।
আর বেলি মুখ কালো করে বলেছেন,"নিনীতের মতো দায়সারা ছেলে এতো চমৎকার একটি মেয়ের যোগ্যই না।"
হাহাহা। গরম, মুচমুচে পেয়াজুগুলো তেল থেকে তুলে সে প্লেটে সাজায়। মুখজুড়ে তার চওড়া হাসির রেখা। প্লেট গুলো ট্রে তে রাখতে রাখতে জেবার বলা সেই সংসারের চিত্র মনে মনে আঁকে সে।
একটা আটপৌরে জীবন। পারমিতা রান্নাঘরে ব্যস্ত থাকবে। নিনীত এসে শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে বসার ঘরের সোফায় বসে ক্লান্ত স্বরে বলবে,"মিতা একটু পানি দাও তো।"
পারমিতা ব্যস্ত পায়ে বসার ঘরের দিকে এগোয়। আজ তার অনেক কাজ।
সব কাজ শেষ করে রাতে ঘরে আসতেই দেখল ঘর ফাঁকা। এরা কেউ ঘরে নেই।
এদের পাওয়া গেল নিনীতের ঘরে। দুই বোন মাথা একসাথে করে কি নিয়ে যেন কথা বলছিল।
পারমিতা ভেতরে যেতেই নিকিতা চমকে উঠল। চটজলদি নিবেদিতার হাত খাঁমচে ধরে তার পেটের সাথে চোখ মুখ চেপে মুখ লুকিয়ে বলল,"তুপ তুপ। মমা এসি গেছে।"
নিবেদিতা সোজা হয়ে বসল। নিকিতা এখনো তার পেটে মাথা গুজে আছে। নিবি ওর মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল,"উহু, ভয় পেতে হবে না। সোজা হয়ে বসো নিকি।"
পারমিতা কপাল কুঁচকে বলল,"কি আলোচনা হচ্ছে দু'জনের মধ্যে? এ আবার এতো লজ্জা পাচ্ছে কেন?"
নিকিতা অল্প করে মুখ তুলল। তারপর আঙুল দিয়ে সিলিং ফ্যান দেখিয়ে বেড়ালের মতো মিঁও মিঁও করে বলল,"এতা ছাড়ু তো মমা।"
বলেই আবার দ্রুত বেগে মুখ লুকালো নিবেদিতার পেটে।
নিবেদিতা বলল,"উহ না। মা, ও উল্টা পাল্টা কথা বলছে। তুমি যা খুশি করো। আমরা এমনিই গল্প করছি।"
ভ্রুকুটি করে কিছুক্ষণ তাদের দিকে তাকাল মিতা। তারপর একটু সামনে আসতেই হঠাৎ চোখ গেল ডান পাশের টেবিলের উপর।
পুরাতন নিউজপেপারের উপর অসংখ্য শিউলি ফুল ছড়িয়ে রাখা। শত শত তাজা শিউলি। পারমিতা গুনে শেষ করতে পারবে না। সাদা রঙের শিউলি গুলো চিরশান্ত রূপে পড়েছিল কাগজের উপর। পারমিতা আশ্চর্য হয়ে এগিয়ে গেল সামনে।
ফুলগুলোর মাঝখানে একটা ছোট্ট কাগজ। পারমিতা সাবধানে টেনে বের করল সেটা। কাগজে দুই লাইনে লিখা-" পারমিতা বলেছে, তার কোনো ঘর নেই। এই মিথ্যা কথার শাস্তি হিসেবে তাকে আজীবনের জন্য এই ঘরটি উপহার দেওয়া হলো।"
পারমিতা চমকে উঠে কয়েক কদম পিছিয়ে এলো। দু'চোখ কচলে আবার পড়ল কাগজের লিখাটুকু। ঠিক তখনই কেউ শব্দ করে সুইচবোর্ডের একটি সুইচ চাপলো। পারমিতা তাকাতেই দেখল নিনীত দাঁড়িয়ে আছে দরজার কাছে। খসখসে আঙুল দু'টো সুইচবোর্ডের উপর।
মূহুর্ত। ঠিক মুহূর্তের ব্যবধানে উপর থেকে শত শত শিউলি ফুল ছিটকে এসে তার শরীরে পড়ল। পারমিতা মুখ হা করে সবিস্ময়ে তাকাল সিলিংয়ের দিকে। দেখল ফ্যান ব্লেডের আড়াল থেকে ঝরঝরি ফুল ঝরছে তার শরীরে। সব শিউলি ফুল।
পারমিতা ভাষাহীন হয়ে, অপলক চোখে কেবল দেখছিল এদের।
নিনীত গিয়ে কাউচের উপর বসল। সোজাসুজি তাকালো ভদ্রমহিলার দিকে। একটু ধাতস্থ হতেই পারমিতা সবার প্রথমে ছুটে এলো তার কাছে। এসেই ঝড়ের বেগে ঝাপিয়ে পড়ে তার বুকে, শক্ত করে জাপ্টে ধরল তার শরীর।
নিনীত স্থির হয়ে বসে। একটু পরে নিজেও হাত তুলে তার পিঠে রাখে, আলতো করে মালিশ করে। নিবেদিতা চিন্তায় পড়ে বিড়বিড় করল,"এ্যাই নিকু! মা এতো চুপচাপ কেন? কি হয়েছে?"
নিকিতা সামনে তাকিয়ে বলল,"মমা আদুর কচছে পাপাইকে।"
"কিহ?" নিবেদিতা কপাল কুঁচকে বলল,"কেমন করে আদর করছে?"
নিকিতা পারমিতার মতোই আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল তাকে। বুকের উপর মাথা ঠেকিয়ে জোর গলায় বলল,"এভাবি আদুর কচছে। কতো সুন্নর লাগছি!"
নিবেদিতা হাসল। হাত তালি দিয়ে বলল,"কতো মজা! পাপাইয়ের অসুখ ভালো হয়ে গেছে।"
নিকিতাও তার দেখাদেখি হাত তালি দেয়। মাথা নেড়ে বলে,"পাপকই তো ভালুই। পিমস পাপাই। পাপকইয়ের সাতে মমার ভাব হয়ি গেছে।"
"কি মজা! কি মজা!"
পারমিতা সেদিন তাদের খাটের সামনে একটা ট্রাইপড স্ট্যান্ডে মোবাইল সেট করে ওদের চারজনের একটা ছবি তুলে রাখল।
একটা সাজানো ঘর, শিউলি ফুলে ভরা মেঝে, আর চারজন সাদাসিধে মানুষ।
নিনীত, ওর পাশে নিবোদিতা। অন্য পাশে পারমিতা, আর তার কোলে নিকিতা।
রঙিন ঐ ছবিতে ঝলমলে হাসছিল পারমিতা। নিকিতা মুচকি হেসে তাকিয়ে ছিল মায়ের দিকে। নিবেদিতা বসে ছিল ঠিক পাপাইয়ের গা ঘেঁষে। ছবির আড়ালে পাপাই তখন আলতো করে হাত বুলাচ্ছিল তার চুলে। নিবেদিতা হাসল নীরবে। নিনীত শান্ত মুখে, কোমল দৃষ্টিতে চেয়ে রইল ক্যামেরার লেন্সের দিকে।
সুন্দর ঐ ছবিটা একমাস পরে নিনীত ফ্রেমে বাঁধিয়ে তাদের ঘরের দেয়ালে টানিয়ে দিল যত্ন করে। এর এক বছর পর হেমন্তের এক সন্ধ্যায় মজা করে তার নিচে লিখল-"আমার ম্যাডামের সংসার"।
সাদামাটা ঐ ছবিটা এরপর বছরের পর বছর নিনীত-পারমিতা দম্পতির ঘরে ছিল। ঘরের কর্ত্রী মিতা খুব যত্ন করত ঐ ছবিটার। ছবিটা তার সংসার জীবনের সবচেয়ে অর্থবহ কিছু মুহূর্তের সাক্ষী। পূর্বাহ্ণ বাড়ি যতদিন ছিল, ততদিন পূর্বের ঐ ঘরটা এমনই অক্ষত ছিল। দেয়াল জুড়ে ছিল বিশাল ঐ ফটোফ্রেম। যার নিচে লিখা-"আমার ম্যাডামের ঘর।"
সমাপ্ত-(প্রথম পরিচ্ছেদ)
[প্রিয় পাঠক, দুশ্চিন্তা করবেন না। ইনশাআল্লাহ খুব দ্রুত দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ নিয়ে লিখালিখিতে ফিরে আসব। আপাতত শারীরিক এবং মানসিক শান্তির কথা ভেবে একটু বিশ্রাম নিচ্ছি। খুব দ্রুত পরের পরিচ্ছেদ পেয়ে যাবেন ইনশাআল্লাহ।]
[ত্রিশ পর্বে আমি আনুমানিক এক লক্ষ শব্দ লিখেছি।।একটা পরিবারের গল্প সাজিয়েছি। আমার কয়েক শ ঘন্টার ফলাফল এই লিখা। আপনারা পড়ার পর নিজেদের অনুভূতি জানালে খুশি হবো ভীষণ। চাইলে সাজেস্ট করতে পারেন, যারা ফেসবুকে গল্প পড়ে তাদের।]