ফন্ট সাইজ:
থিম:
আম পাতা জোড়া জোড়া

পর্ব 31

লেখক: মেহরিমা আফরিন

#আম_পাতা_জোড়া_জোড়া
লেখনীতে #মেহরিমা_আফরিন

৩১.

আয়তি এখন সুস্থ কিছুটা। নিজ থেকে হাঁটাচলা করতে পারে, সবার সাথে কথা বলতে পারে, লোকমা তুলে খেতে পারে। সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সামনের সপ্তাহ থেকে আবার পড়াশোনাও শুরু করবে। ইয়াজিদ বলল,"পড়াশোনার জন্য এতো মাথাব্যথা! আমি হলে এক বছর আর বই খাতা ধরতাম না।"

"তুমি আর আমি তো এক মানুষ না চাচ্চু।"

"হয়েছে। তুই অনেক জ্ঞানী বুঝতে পারছি।"

ইয়াজিদ হেলান দিয়ে বসল সোফায়। লিভিং রুমে এখন সে, আয়তি আর ইমতিহা। ইমতিহা পিটপিট চোখে ইয়াজিদকে দেখছে। তারা আজ বেরিয়েছিল বাগানে হাঁটবে বলে। দুই মিনিট হাঁটার পরেই ইমতিহা কপাল কুঁচকে নিল। দুই পা ছুঁড়ে ভ্যাঁ করে কাঁদল কিছুক্ষণ।

ইয়াজিদ অবাক হয়ে বলল,"এবাবা! কাঁদিস কেন? আমি কি করলাম?"

ইমতিহা ছোট মুখটা তার বুকে চেপে ধরে আরেকদফা কাঁদল। সূর্যের তীর্যক আলো তার মুখ লাল করে রেখেছে। ইয়াজিদ বেদিশা হয়ে কিছুক্ষণ পায়চারি করে তারপর বাড়ির ভেতর ঢুকল।

রাশেদা পান চিবুচ্ছিলেন ঘরে বসে। ইয়াজিদ হন্তদন্ত পায়ে তার ঘরে ছুটে গেল। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,"আম্মা দেখো না। ইমতিহা কি করে। কান্দে শুধু।"

"কান্দে কেন? তুই ঠিক মতো রাখতে পারছ না। এজন্য কান্দে।"

"কইসে তোমারে। ভালা ভালা বাগানে নিয়া গেলাম রোদ লাগাইতে। তবুও তোমার পুতি কান্দে। দুনিয়াতে ভালো মানুষের দাম না আম্মা।"

রাশেদা ঘাড় বাঁকিয়ে জানালার দিকে তাকিয়ে রোদের তেজ অনুমান করলেন। পরক্ষণেই ইয়াজিদের পিঠ বরাবর থাবা বসিয়ে খেঁকিয়ে উঠে বললেন,"আহাম্মদ। তুই এই কড়া রোদে এইটুকুন বাচ্চারে নিয়া বাইর হইলি কেন? তোর মাথা খারাপ?"

"মাথা খারাপের কি হইলো? মেহরোজই তো বলল, ইমতিহা নাকি রোদ পোহায়।"

"ঐটা সকালের রোদ। ভরদুপুরের রোদ না। গাধা কোনখানের!"

ইয়াজিদ কাচুমাচু মুখে বলল,"এমনে কও কেন? আমি এতো কিছু জানি?"

"জানবি কেমনে? নিনীতের বাচ্চা সংসার করব কয়দিন পরে। তুই এখনো আবিয়াত্তা। এসব জানার জন্য বিয়া করতে হয়।"

রাশেদা ফোঁস করে শ্বাস ছাড়লেন। ইমতিহা কান্না থামিয়ে শান্ত হয়ে ইয়াজিদের বুকে মাথা রেখে ঘরের সিলিং দেখছে। নিজের অস্তিত্বের জানান দিতে একটু পর পর পা নাড়ছে। রাশেদা বললেন,"বাচ্চা পালার জন্য আগে বাচ্চা হওয়াইতে হয় ইয়াজিদ। বাচ্চা হওয়ানের জন্য বিয়া শাদি করতে হয়। তুই..."

রাশেদা কথা শেষ করতে পারলেন না। তার আগেই ইয়াজিদ বিরক্ত মুখে উঠে এলো ঘর থেকে।
ঘর থেকে বের হওয়ার পর তার দেখা হলো নিকিতার সাথে।

নিকিতা তার সাদা রঙের খরগোশদের একটিকে হাতে তুলে দৌড়াচ্ছিল সিঁড়ির দিকে। ইয়াজিদকে দেখতেই থামল। তীক্ষ্ণ চোখে তার কোলে থাকা বাচ্চাটিকে দেখে কপাল কুঁচকাল। মুখ ফুলিয়ে রাগ আটকে বলল,"এতা কে?"
"কে আবার? ইমতিহা।"

"ইমথিহা কে কুলে নিয়েছো?"

"হ্যাঁ,তো নিব না?"

"আমাকে নিবে না?"

"নিব তো।"

নিকিতা হাত বাড়াল। বলল,"নাউ তাহুলে।"

"তোমার হাতে তো খরগোশ। কিভাবে নিব?"

নিকিতা খরগোশটা মেঝের একপাশে রেখে হাত খালি করে বলল,"এবার নাউ।"

ইয়াজিদ ঠোঁট ভেজাল। বিপাকে পড়ে কাচুমাচু মুখে বলল,"দু'জনকে তো একসাথে নিতে পারব না?"

"কেনু?" নিকিতা চেঁচিয়ে উঠে বলল,"তাহুলে ওকে নামাউ। আমাকে নাউ।"

"ওকে নামানো যাবে না। ও একটা নরম, তুলতুল বেবি। ও ব্যাথা পাবে নামালে।"

নিকিতার দুই চোখ মলিন হলো। এতো করুণ চোখে ইয়াজিদের দিকে তাকাল, মনে হলো ইয়াজিদ তাকে জীবনের সবচেয়ে বড় দুঃখটা এই মুহূর্তে দিয়ে ফেলেছে। নিকিতা অভিমানী গলায় বলল,"আচছা। থাকু তুমি ইমথিতা কে নিয়ে। আমি পাপাইকে ছব বলব।"

বলেই খরগোশটা আবার হাতে নিয়ে দৌড়ে গেল নিনীতের ঘরে।

"পাপাই পাপাই!"

নিনীত পুরাতন সেলফ থেকে বইপত্র নামিয়ে ঝাড়ছিল ভালো মতো। সেলফে অনেক অপ্রয়োজনীয় বই জমেছে। সেগুলো সরিয়ে নতুন জায়গা করতে হবে। পারমিতার কয়েকটা বই রাখতে হবে সেখানে।

নিকিতা ঘরে এসেই বাবার দিকে ছুটল। নিনীত তাকে দেখে দ্রুত গলা তুলে বলল,"নিকি, পাপাই ঘর পরিষ্কার করছি। এখন না। পরে এসো।"

নিকিতা শুনল না তার কথা। ছুটে এসে ছোট ছোট হাত দিয়ে বাবার পা জড়িয়ে ধরে হাঁটুর উপর কপাল ঠেকিয়ে বলল,"পাপাই। ছোতো দাদু আমাকে কোলে নেয় না।"

অভিমানে ঠোঁট কাঁপল নিকির। টলটলে চোখে আবার পাপাইয়ের দিকে তাকিয়ে ভেজা গলায় বলল,"তুমি বকা দিবে উকে। ঠিকাছে?"

নিনীত হাসল। বলল,"আচ্ছা। দিব বকা। ইয়াজিদকে অনেক বকা দিব। ঠিক আছে? এবার তুমি ঘর থেকে বের হও। ঘরে অনেক ধূলা মা।"

"না", নিকিতা জেদ করে বলল,"কুলে নাও।"

"আহা। ঘর পরিষ্কার করছি তো মা।"

"এততু নাউ। কেউ আমাকে কুলে নিচছে না।"

নিনীত ঝুকল। একটানে নিকিতাকে কোলে তুলে কপাল থেকে চুল সরিয়ে বলল,"ঠিক আছে। নিলাম কোলে। খুশি এবার?"

নিকিতা বাবার ডান কাঁধে মাথা রেখে চোখ বুজল। মিহি স্বরে বলল,"ছোতো দাদুকে বকা দিবে কবে?"

"দিব তো। আগে বলো তার অপরাধ কি?"

"উ শুদু ইমথিহাকে আদর করে। আমাকে না।"

"এটা তো খুবই সাংঘাতিক ব্যাপার।"

"হু। ছবছময় শুদু ইমথিহাকেই কুলে রাখে।"

"মারে! এটাই তো নিয়ম। যখন ছোট একটা বাবু আসে বাড়িতে, তখন সবাই তাকে কোলে কোলে রাখে। তুমি যখন ছোট ছিলে, ইমতিহার মতো বয়সে ছিলে, তখনও সবাই তোমাকে কোলে রাখত। নিবি কি তখন রাগ করত? নিবি তো রাগ করত না। এটাই নিয়ম মা। এখন যদি আরেকটা বেবি আসে বাড়িতে, তখন আবার সবাই ইমতিহাকে ফেলে তাকে কোলে নিয়ে হাঁটবে। এটাই নিয়ম মা। ছোট বেবিদের একটু বেশি বেশি আদর করতে হয়। এই যে আমি তোমাকে আদর করছি।"

নিনীত ছোট একটা চুমু খেল মেয়ের গালে। নিকিতা খুশি হয়ে বলল,"ছোতো দাদু সুত্যি ভালোবাসে আমাকে?"

"অবশ্যই ভালোবাসে। সেদিন কতো সুন্দর সুন্দর চুড়ি আনল তোমার জন্য। ভালো না বাসলে কি কেউ কারো জন্য গিফট আনে?"

নিকিতা জবাব দিল না। বাবার কাঁধে নিশ্চিন্তে রাখা মাথাটা সামান্য নেড়ে সায় দিল কেবল। নিনীত বলল,"নিকি, অনেক ময়লা এই ঘরে। তুমি নিবির কাছে যাও।"

"না। তুমার কাছে থাকব।"

"আহ। কি জ্বালা। ময়লার ভেতরে থাকবে?"

"হু। তুমার সাতে।"

"পাগল মেয়ে।"

"পাপাই।"

"বলো।"

নিকিতা মাথা তুলল। নিনীতের কপালে কপাল ঠেকিয়ে বলল,"তুমি আমাকে কতু ভালোবাসো?"

"অনেক বাসি।"

"আমিও বাসি। তুমি আমার পিমস পাপাই।"

নিকিতা চুমু খেল দুইটা। নিনীত হেসে ফেলল। নিকিতার গালে ঠেসে একটা চুমু খেয়ে বলল,"আর তোমরা আমার রাজকন্যা, আমার হীরা মানিক, আমার চাঁদ তারা।"

_____

দরজা খুলতেই মণিষা চমকে উঠল। মেরুদন্ড বেয়ে শীতল এক স্রোত নেমে এলো। দরজার সামনে সোহাইল দাঁড়িয়ে আছে। এতো দিন, এতো মাস, এতো বছর পর তাকে দেখে কিছুক্ষণের জন্য মণিষা স্তব্ধ হয়ে গেল। এই তো, দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে তার সাথে সোহাইলের কোনো যোগাযোগ নেই। সে তার নতুন বউ নিয়ে সুখে আছে। শেষবার যখন মণিষার সাথে দেখা হলো, তখন হেসে বলল,আম্মার কথা শুনে আমি ঠিকই করেছি মণিষা। তোমার আর চাঁদনীর মধ্যে অনেক পার্থক্য। চাঁদনী আমাকে যা দেয়, ওটা তুমি কখনোই দিতে পারতা না আমাকে।"

কণ্ঠনালি কাঁপতে থাকে মণিষার। অসহ্য অনুভূতি জেঁকে ধরে আষ্টেপৃষ্ঠে। বিস্ময়ঠাসা দুই চোখে সে বোকার মতো কিছুক্ষণ চেয়ে থাকে লোকটার দিকে। সোহাইল দাঁড়িয়ে আছে নত মুখে। পরনে একটা সাদামাটা শার্ট। মুখটা গম্ভীর। সাথে কিছুটা মলিনও। সে আগ বাড়িয়ে কোনো কথা বলল না। মণিষাই গলা তুলে বলল,"তুমি? তুমি কেন এসেছ? ঠিকানা কোথায় পেলে?"

এইবারে মুখ খুলল সোহাইল। মাথা তুলে মণিষার জ্বলজ্বলে দুই চোখে চোখ রেখে নরম গলায় বলল,"ঠিকানা জোগাড় করেছি।"

"কেন এসেছ?"

"তোমার সাথে দেখা করতে। আমার ছেলের সাথে দেখা করতে।"

দুই আড়াই বছরে যেই জড়তা তৈরি হয়েছিল মণিষার ভেতর, সেই জড়তা ততক্ষণে কমে এসেছে। মণিষা আবার নিজের পুরাতন স্বত্তাটায় ফিরে গেল। অগ্নিদৃষ্টিতে সোহাইলের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে বলল,"কেন? আমি কে? আমার সাথে কেন দেখা করবে? আর তোমার ছেলে? এ্যাই সোহাইল! সহস্রের কাস্টডি আমি পেয়েছি। ও আমার ছেলে। তুমি বলেছিলে তোমার বউ বাচ্চা কিচ্ছু চাই না। বলো নি তুমি? বলো, বলো নি?"

ফুঁসছিল মণিষা। রাগে ওর দাঁতের পাটি কিড়মিড় করছে। সোহাইলের সাথে একটা লম্বা সময় তার দেখা হয়নি। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর মণিষা নিজের মতো সবকিছু গুছিয়েছে। কখনো আবার তার সামনে দাঁড়ালে কেমন অনুভূতি হবে,সেটাও ভাবেনি। মণিষা পাথুরে চোখে তাকিয়ে ছিল তার প্রাক্তন স্বামীর দিকে।

সোহাইল কাচুমাচু মুখে বলল,"মণিষা! আজকের জন্য অন্তত আগের কথা ছাড়ো। আমি খুব খারাপ সময়ে তোমার কাছে এসেছি। আমার অবস্থা একটু বোঝো।"

"তুমি যাবে সোহাইল? আমি খুব বিরক্ত হচ্ছি। তোমার সাথে আমার কোনো কথা নেই। তুমি যাও। দয়া করে যাও।"

"মণিষা, মানুষ হিসেবে কি একদিনের জন্য তুমি আমার ব্যাপারটা বুঝবে না? আমার পরিস্থিতি, আমার অবস্থার কথা একবার শোনো। সম্পর্কের কথা বাদ দাও। ধরে নাও আমাদের কোনো সম্পর্ক নাই। মানুষ হিসেবে অন্তত শুনো।"

মণিষা কাঁপা স্বরে বলল,"আমার ছেলে কোচিংয়ে গেছে। আমার ওকে আনতে হবে। পরে কথা বলব।"

"আমার কথা বেশি বড় হবে না। আচ্ছা থাক, তুমি গিয়ে ওকে নিয়ে আসো। আমি অপেক্ষা করছি।"

মণিষা আঁতকে উঠল। চমকানো স্বরে বলল,"কিহ! অপেক্ষা করবে মানে? তুমি কি তোমার সীমা জানো না সোহাইল? দয়া করে এখান থেকে যাও। প্লিজ।"

"মণিষা! কথাটা জরুরি।"

মণিষা দরজা ধরে দাঁড়াল। শক্ত, কাট কাট গলায় বলল,"কি কথা? এখান থেকেই বলো। শুনছি আমি।"

সোহাইল আর সময় ব্যয় করে না। অনুমতি পেতেই দ্রুত স্বরে বলতে থাকে,"চাঁদনীর সাথে বাড়িতে খুব অশান্তি চলছে আমার। আম্মারও মন ভার। সে এখন তার বাপের বাড়ি গেছে দুই দিনের জন্য। আম্মার তার উপর নারাজ। চাঁদনী খুব বেয়াদব হয়েছে আজকাল। আম্মা....আম্মা আবার তোমাকে ফেরত আনতে চায় বাড়িতে।"

সোহাইল এক দমে পুরো কথা শেষ করে। তারপর বড় করে নিঃশ্বাস ছাড়ে। ওর মুখটা শান্ত ভীষণ। তবে চেখে মুখে অনুতপ্ত ভাব আছে। গলার স্বর ঝরঝরে। এতো বড় কথাটাও বলেছে খুব অবলীলায়।

মণিষা হতবাক হয়ে গেল। ঘড়িতে তখন বিকেল পাঁচটা তিন। সহস্রর ছুটি হয়ে গেছে এতক্ষণে। বাচ্চাটা অফিসরুমে বসে থাকবে তার অপেক্ষায়। মণিষা ঐ ব্যস্ততা টুকু ভুলে। সোহাইলের কথা শুনতেই সবকিছু এলোমেলো লাগল। সে ধরা গলায় যন্ত্রের মতো বলল,"এসব তুমি কি বলছ?"

"হ্যাঁ, সত্যি বলছি। আম্মা আর চায় না চাঁদনীকে।"

"চাঁদনী তোমার আম্মার পছন্দ করা মেয়ে। চাইবে না কেন?"

"আম্মা তো তোমাকেও পছন্দ করেছিল। এখন আম্মা বুঝে, তুমিই সবদিক থেকে আমাদের বাড়ির যোগ্য বউ ছিলে। চাঁদনী এমন না।"

"তোমার লজ্জা লাগে না সোহাইল? তুমি বলেছিলে, চাঁদনী তোমায় যা দিয়েছে, সেটা আমি কখনো দিতে পারি নি তোমায়। এমনটাই তো বলেছিলে।"

"সেসময় আমি ঠিক আর ভুল বুঝতাম না। ঐটা আমার ভুল ছিল।"

"সোহাইল! তুমি দয়া করে আর আমার কাছে আসবে না। তোমাদের পারিবারিক সমস্যা তোমরা তোমাদের মতো সমাধান করো। আমি তোমাদের কেউ নই।"

সোহাইল আবার একই সুরে বলল,"আম্মা তোমাকে চায়।"

"তাতে আমার কিছুই যায় না।"

দু'হাত কাঁপছিল মণিষার। আলগোছে কপালের ঘাম মুছে শক্ত গলায় বলল,"তোমার কোনো কিছুতেই আমার আর কিছু যায় আসে না এখন।"

______

সহস্র ভীত গলায় বলল,"মা কখনো এতো দেরি করে না। আমার ভয় লাগছে আঙ্কেল।"

ইয়াজিদ বাইরের রাস্তায় তাকিয়ে ভদ্রমহিলার অস্তিত্ব খুঁজতে খুঁজতে বলল,"ভয়ের কিছু নেই সহস্র। এসে যাবে তোমার মা। হয়তো জ্যামে পড়েছে।"

সহস্র অস্থির হয়ে বলল,"কিন্তু মা তো সবসময় সময় হাতে নিয়ে বের হয়। এতো দেরি মা কখনো করে না।"

সহস্রর কোচিং ছুটি হয় পাঁচটা। এখন ঘড়িতে সময় পাঁচটা সাতচল্লিশ। মণিষা এখনো আসেনি তাকে নিতে। ভয়ে, আতঙ্কে সহস্রর মুখ শুকিয়ে গেছে। অসহায় চোখে সে আবার তাকালো দরজার দিকে। এখনো আসেনি মা। মা এতো দেরি করার মানুষই না। সহস্র নিশ্চিত জানে, তার কোনো বিপদ হয়েছে।

সে আবার মিন মিন করে বলল,"আঙ্কেল, মা কে একটা ফোন দিন না প্লিজ।"

"দিয়েছি তো। চারবার দিলাম। ধরেন নি।"

"আরেকবার দিন?"
সহস্র অনুনয় করে বলল। তার ফ্যাকাসে মুখের দিকে তাকিয়ে ইয়াজিদ আবার ডায়াল করল মণিষার নম্বরে। এবারও কেউ ফোন ধরল না। ইয়াজিদ সহজ গলায় বলল,"চিন্তা করো না সহস্র। তোমার মা ঠিক আছে একদম।"

সহস্র তবুও ব্যাকুল হয়ে মা কে খুঁজছিল। তার মন খারাপ হচ্ছে। মনে হচ্ছে মা একদম ঠিক নেই।

একটু পরে একটা ছেলে হন্তদন্ত হয়ে অফিস কক্ষে ঢুকল। ব্যস্ত গলায় শ্বাস টেনে টেনে বলল,"ভাই, সামনের রাস্তায় তো এক মহিলা এক্সিডেন্ট করছে। রাকিব বলল, এই মহিলারে নাকি আপনের সেন্টারে দেখছে আগে। একবার আইসা দেখেন তো চিনেন নাকি।"

_____

দরজার মুখে দাঁড়িয়ে সীমান্ত গলা খাকারি দিল। আয়তি বুজে রাখা চোখ মেলে তার দিকে তাকাল। এশার আযান দিয়েছে মাত্র। সীমান্তকে এই সময়ে বাড়িতে পাওয়া যায় না। ইদানিং দেখা যাচ্ছে সে বাড়িতেই থাকে দিনের বেশিরভাগ সময়।

সীমান্ত নত মুখের দরজার ধরে দাঁড়ায়, অপেক্ষা করে আয়তির সম্মতির। আয়তি রুগ্ন গলায় বলল,"তুমি? আসো। ভেতরে আসো।"

সীমান্ত ভেতরে এলো। আজকাল সে আয়তির ঘরের আশেপাশে ঘুর ঘুর করে। সাহসের অভাবে ভেতরে ঢুকতে পারে না। আজ অনেক সাহস দেখাল। আয়তি বলল,"কি চাই তোমার?"

সীমান্ত মাথা নামিয়ে বলল,"একটা সাহায্য দরকার আয়তি। তাই তোমার কাছে এলাম।"

"আমি আবার কি সাহায্য করব?"

সীমান্ত মুখ না তুলেই বলল,"ভাবছি আবার পড়াশোনা শুরু করব। চাকরির চেষ্টা করে দেখব।"

আয়তি চোখ বড় বড় করে বলল,"কিহ! তুমি? চাকরি করবে?"

"হ্যাঁ।"

"কে তোমাকে চাকরি দিবে?"

অবাক হয়ে জানতে চাইল আয়তি। সীমান্ত অপমানিত বোধ করল ভীষণ। তবুও সেটা গায়ে না মেখে সহজ গলায় বলল,"যোগ্যতা থাকলে অবশ্যই চাকরি দিবে।"

"আছে তোমার কোনো যোগ্যতা?"

"না, নাই।"

"তো? কিভাবে চাকরি পাবে?"

"যোগ্যতা অর্জন করব। সেজন্যই তো তোমার কাছে এলাম।"

আয়তি কপাল কুঁচকে বলল,"আমি কিভাবে যোগ্যতা অর্জন করাব? সারা বছর না পড়ে আরেকজনের কাছে আসার মানে কি? আশ্চর্য।"

"এতো আশ্চর্য হবে না। বেশি আশ্চর্য হওয়া শরীরের জন্য ভালো না।"

"তোমার উদ্দেশ্য কি বলো তো?"

"উদ্দেশ্য কিছু না। আমি আবার পড়াশোনা করব। কোনো কিছু না পারলে তোমার থেকে সাহায্য নিব।"

"আমার থেকে কেন সাহায্য নিবে? তিন নম্বর লেনের মারুফ ভাইয়ের সাথে তো খুব খাতির তোমার। তার থেকে সাহায্য নাও।"

সীমান্ত চোয়াল শক্ত করে বলল,"মারুফ ভাই এখন ব্যস্ত থাকে। তার সময় নাই।"

"তো আমি কি বেকার নাকি? যাও তো এখান থেকে।"

আয়তি বিরক্তিতে চোখ বুজল আবার। সীমান্ত বড় বড় শ্বাস ফেলে শান্ত রাখে নিজেকে। কয়দিন ধরে আয়তির চারপাশে ঘুরছে, একটু চেষ্টা করছে তার সাথে সব স্বাভাবিক করতে। আয়তিই তাকে দু'পয়সার দাম দিচ্ছে না।

পড়াশোনা সে মূলত শুরু করছে আয়তির জন্য। এটা তার প্রায়শ্চিত্ত। পড়াশোনা করে একটা চাকরি জোগাড় করে সে তার বেকার জীবন ধন্য করবে। আয়তি তো সবসময় এটাই চেয়েছে।

সীমান্ত গম্ভীর মুখে বলল,"তুমি তার মানে আমাকে সাহায্য করবে না?"

"তোমার কি সাহায্য নেওয়ার জন্য লোকের অভাব পড়েছে?"

"তুমি এদের সবার চেয়ে ভালো।"

"আমার এতো সময় নেই।"

"আচ্ছা।"

সীমান্ত তপ্তশ্বাস ছেড়ে ধীর গলায় বলল,"আসি তাহলে। আসসালামু আলাইকুম।"

"ওয়ালাইকুমুস সালাম। যাওয়ার আগে এসির পাওয়ার চব্বিশে দিয়ে যাবে।"

সীমান্ত দাঁত কিড়মিড় করে বলল,"আচ্ছা। দিতাসি।"

চলবে-

(অনেকদিন পর লিখেছি। বাজে হয়েছে নাকি জানি না। আরেকটু বড় করার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু পারলাম না। কেমন লেগেছে জানাবেন। সবার ফিডে গল্পটি পৌঁছে দেওয়ার জন্য আনুমানিক ১৪০০-১৫০০ রিয়েক্ট তুলবেন। তাহলে আশা করি সবাই পড়তে পারবে।)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 31 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন